স্বর্গারোহণপর্ব্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| স্বর্গারোহণিক পর্ব্বাধ্যায় |
স্বর্গারোহণিক পর্ব্বাধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, ব্রহ্মন্। আপনি অদ্ভুতকৰ্ম্মা মহর্ষি বেদব্যাসের শিষ্য আপনার অবিদিত কিছুই নাই; অতএব আমার পূর্ব্বপিতামহ পাণ্ডবগণ এবং ধৃতরাষ্ট্রতনয়গণ স্বর্গলাভ করিয়া কে কোন্ স্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন, তাহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত বাসনা হইয়াছে, আপনি তৎসমুদায় কীর্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। আপনার পূর্ব্বপিতামহ-গণ স্বর্গলাভ করিবার পর যেরূপ কার্য্য করিয়াছিলেন, তাহা কীর্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির স্বর্গে গমন করিয়া দেখিলেন, মহারাজ দুর্যোধন সাধ্য ও দেবগণে পরিবেষ্টিত হইয়া প্রভামণ্ডলসম্পন্ন মার্কণ্ডের ন্যায় শোভা ধারণপূর্ব্বক আসনে সমাসীন রহিয়াছেন। তাঁহাকে দর্শন করিবামাত্র যুধিষ্ঠিরের ক্রোধের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি তথা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া দেবগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সুরগণ! যে লোভা কৃষ্টচিত্ত দুরাত্মা দুর্য্যোধনের নিমিত্ত আমরা পৃথিবী উৎসন্ন ও বন্ধুবান্ধবগণকে যুদ্ধে নিহত করিয়াছি, যাহার নিমিত্ত আমাদিগকে বনমধ্যে অশেষবিধ কষ্টভোগ করিতে হইয়াছে এবং যে দুরাত্মা সভামধ্যে গুরুজনসমক্ষে আমাদিগের সহধর্মিণী ধৰ্ম্মচারিণী দ্রৌপদীর কেশম্বরাকর্ষণ' করিয়াছে, সেই দুরাত্মার সহিত স্বর্গলোকে অবস্থান করিতে আমার কিছুমাত্র বাসনা নাই; আর আমি উহার মুখদর্শন করিব না। এক্ষণে যে স্থলে আমার ভ্রাতৃগণ অবস্থান করিতেছে, আমি সেই স্থানেই গমন করিব।
ধর্মরাজ এই কথা কহিলে, দেবর্ষি নারদ হাস্যবদনে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ধৰ্ম্মনন্দন! অমন কথা কহিও না। স্বর্গে অবস্থান করিলে অন্যের সহিত বিরোধ থাকে না। দুর্য্যোধনের প্রতি ওরূপ বাক্য প্রয়োগ করা তোমার কর্তব্য নহে। যে সকল নরপতি স্বর্গে অবস্থান করিতেছেন, তাঁহারা এবং দেবগণ সকলেই দুর্য্যোধনের সৎকার করিয়া থাকেন। উনি সর্ব্বদা তোমাদিগের হিংসা করিতেন বটে, কিন্তু ঐ মহাত্মা এক্ষণে ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে সমরাঙ্গনে স্বীয় কলেবর পরিত্যাগ করিয়া বীরজনোচিত সদ্গতি লাভ করিয়াছেন। উনি পূর্ব্বে মহাভয়ের সময় উপস্থিত হইলেও ভীত হন নাই। উঁহার সেই পুণ্যবলে এই সম্পত্তি লাভ হইয়াছে। যাহা হউক, অতঃপর তোমার দ্যূতপরাজয়, দ্রৌপদীর কেশাম্বরাকর্ষণ, যুদ্ধ ও অন্যান্য ক্লেশসমুদায় স্মরণ করা কর্তব্য নহে। এক্ষণে তুমি রাজা দুর্য্যোধনের সহিত সুহৃদ্ভাবে সঙ্গত হও। এ স্বর্গভূমি, এ স্থলে বৈরভাব অবলম্বন করা উচিত নহে।
দেবর্ষি নারদ এই কথা কহিলে, রাজা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেবর্ষে! যে দুরাত্মা দুর্য্যোধনের নিমিত্ত মনুষ্য ও হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি প্রাণিগণের সহিত পৃথিবী উৎসন্ন প্রায় হইয়াছে, যাহার বৈরনির্য্যাতনার্থ' আমরা কোপানলে দগ্ধ হইয়াছি; যদি সেই দুরাত্মার সনাতন বীরলোক লাভ হইল, তাহা হইলে আমার সত্যপ্রতিজ্ঞ প্রবলপরাক্রম সত্যবাদী ভ্রাতৃগণ কোন্ স্থানে অবস্থান করিতেছেন? কুন্তীতনয় মহাবীর কর্ণের কোন্ লোক লাভ হইয়াছে? ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্নের তনয়গণ কোন্ স্থানে অবস্থান করিতেছেন? বিরাট, দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, শিখণ্ডী, পাঞ্চালরাজ, দ্রৌপদীর পুত্রগণ ও অভিমন্যু প্রভৃতি বীরগণ কোন্ লোক লাভ করিয়াছেন এবং অন্যান্য যে সমুদায় নরপতি ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে সমরে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহারাই বা এক্ষণে কোথায় রহিয়াছেন? আপনি তাহা কীর্তন করুন। ঐ সকল বীরের সহিত সাক্ষাৎকার করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ধর্মাত্মা ধৰ্ম্মতনয় দেবর্ষি নারদকে এই কথা কহিয়া দেবগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সুরগণ! আমি ত এস্থানে অমিতপরাক্রম রাধেয় এবং মহাবীর উত্তমৌজাঃ ও যুধামন্যুকে দেখিতে পাইতেছি না। তাঁহারা কোথায়? আর শার্দুলতুল্য মহাবল পরাক্রান্ত যে সকল নরপতি ও রাজপুত্রগণ আমার নিমিত্ত সমরানলে শরীর আহুতি প্রদান করিয়াছেন, এক্ষণে তাঁহারই বা কোন্ স্থানে অবস্থান করিতেছেন? তাঁহারা কি এই স্বর্গলোক পরাজয়ে সমর্থ হন নাই? যদি সেই মহারথগণ এই স্বর্গলোক লাভ করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমি তাঁহাদিগের সহিত এই স্থানেই অবস্থান করিব। আমি সেই সমুদায় মহাত্মা এবং জ্ঞাতি ও ভ্রাতৃগণ ব্যতীত এ স্থানে বাস করিতে বাসনা করি না। জ্ঞাতিগণের উদকক্রিয়াসময়ে "বৎস তুমি কর্ণের উদ্দেশে জলাঞ্জলি প্রদান কর” মাতার এই বাক্য শ্রবণাবধি আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। বিশেষতঃ এই আমার এক মহাদুঃখের কারণ যে, আমি মাতার তুল্য সেই অমিতপরাক্রম কর্ণের চরণযুগল দর্শন করিয়াও তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করিলাম না। আমরা কর্ণের সহিত মিলিত হইয়া সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হইলে ইন্দ্রও আমাদিগকে পরাজিত করিতে সমর্থ হইতেন না।
যাহা হউক, এক্ষণে সেই মহাবীর যেখানে অবস্থান করুন না কেন, তাঁহাকে দর্শন করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। আমার মতানুসারে মহাবীর অর্জুন তাঁহাকে নিপাতিত করিয়াছে বলিয়া আমার হৃদয় শোকানলে দগ্ধ হইতেছে। ভীমপরাক্রম ভীমসেন আমার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়তর। এক্ষণে আমি সেই বৃকোদর, ইন্দ্রপ্রতিম মহাবীর অর্জুন, যমসদৃশ যমজ নকুল ও সহদেব এবং ধৰ্ম্মচারিণী পাঞ্চালীকে দর্শন করিতে বাসনা করি। আমি আপনাদিগকে সত্য কহিতেছি, আর আমার এস্থানে অবস্থান করিবার বাসনা নাই। ভ্রাতৃহীন হইয়া স্বর্গে অবস্থান করিলে আমার কি সুখোদয় হইবে? যে স্থানে আমার ভ্রাতৃগণ অবস্থান করিতেছে, সেইখানই আমার স্বর্গ।
ধর্মাত্মা ধৰ্ম্মনন্দন এই কথা কহিলে দেবগণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! যদি তোমার ভ্রাতৃগণের নিকট গমন করিবার একান্ত বাসনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে শীঘ্র তথায় গমন কর, আর বিলম্ব করিও না। আমরা সুরপতি ইন্দ্রের আদেশানুসারে তোমার সমুদায় অভিলাষ পরিপূর্ণ করিব। এই কথা বলিয়া তাঁহারা একজন দেবদূতকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, দূত! তুমি অচিরাৎ যুধিষ্ঠিরকে উঁহার আত্মীয়গণের নিকট নীত করিয়া তাঁহাদের সহিত উহার সাক্ষাৎকার করাও।
দেবগণ এই কথা কহিবামাত্র দেবদূত যুধিষ্ঠিরের অগ্রবর্তী হইয়া এক অতিভীষণ পথ দিয়া তাঁহাকে তাঁহার আত্মীয়গণের নিকট লইয়া চলিলেন। ঐ পথ অতি দুর্গম ও ঘোরতর অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন। পাপাত্মারাই সতত ঐ পথে গমনাগমন করিয়া থাকে। উহা পাপাত্মাদিগের দুর্গন্ধ, মাংস শোণিতের কদম, দংশ, মশক, ভল্লুক, মক্ষিকা, মৃতদেহ, অস্থি, কেশ, কৃমি ও কীটে পরিপূর্ণ। উহার চতুর্দিকে প্রদীপ্ত হুতাশন প্রজ্বলিত হইতেছে। অয়োমুখ' কাক ও গৃধু'গণ এবং সূচীমুখ' পর্ব্বতাকার প্রেতগণ উহাতে নিরন্তর পরিভ্রমণ করিতেছে। ঐ প্রেতগণের মধ্যে কাহার কাহার কলেবর মেদ ও রুধিরে লিপ্ত এবং কাহার কাহার বাহু, কাহার কাহার উরু, কাহার কাহার হস্ত, কাহার কাহার উদর ও কাহার কাহার চরণ ছিন্ন।
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই শবদুর্গন্ধাযুক্ত অতি ভয়ঙ্কর স্থানে নানা প্রকার চিন্তা করিয়া গমন করিতে করিতে দেখিলেন, উষ্ণোদক পরিপূর্ণ নদী, নিশিত' ক্ষুরসমাকীর্ণ অসিপত্রবন, লৌহময় ফলকসমুদায় ও তীক্ষ্ণ কণ্টকযুক্ত শাল্মলিবৃক্ষ' ঐ স্থানে বর্তমান রহিয়াছে; চতুৰ্দ্দিকে লৌহকলস' পরিপূর্ণ তৈল কাথিত হইতেছে এবং পাপাত্মারা নিরন্তর বিষম যন্ত্রণাভোগ করিতেছে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই নিতান্ত দুর্গম স্থান দর্শন করিয়া দেব-দূতকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহাত্মন্! আর আমাদিগের এরূপ পথে কতদূর গমন করিতে হইবে? ইহা কোন্ স্থান এবং আমার ভ্রাতৃগণই বা কোন্ স্থানে অবস্থান করিতেছে, তাহা কীর্তন কর।
ধর্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র দেবদূত প্রতিনিবৃত্ত হইয়া যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, রাজন। আগমনকালে দেবগণ আমাকে এই আদেশ করিয়াছেন যে, যুধিষ্ঠির যে স্থানে গমন করিয়া পরিশ্রান্ত হইবেন, তুমি তথা হইতে উহাকে লইয়া প্রতিনিবৃত্ত হইবে। অতএব আপনি যদি নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে এই স্থান হইতে প্রতিগমন করুন। তখন দুঃখশোকসন্তপ্ত রাজা যুধিষ্ঠির ঐ স্থানের দুর্গন্ধে একান্ত পরিক্লিষ্ট” হইয়া তথা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তিনি প্রতিনিবৃত্ত হইবামাত্র চতুর্দিকে হইতে এইরূপ করুণবাক্য তাঁহার কর্ণগোচরে হইল যে, "হে ধৰ্ম্মনন্দন! আপনি আমাদিগের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া মুহূর্তকাল এই স্থানে অবস্থান করুন। আপনার আগমনে সুগন্ধ পুণ্য সমীরণ প্রবাহিত হওয়াতে আমরা পরম সুখী হইয়াছি। আমরা বহুকালের পর আপনাকে দর্শন করিয়া পরম আহ্লাদিত হইতেছি; অতএব আপনি ক্ষণকাল এই স্থানে অবস্থান করিয়া আমাদিগকে সুখী করুন। আপনার আগমনে আমাদিগের অনেক যন্ত্রণা দূর হইয়াছে"।
পরম দয়ালু রাজা যুধিষ্ঠির সেই করুণবাক্য শ্রবণে একান্ত দুঃখিত হইয়া তথায় দণ্ডায়মান হইলেন। ঐ সময় বারংবার এরূপ বাক্য তাঁহার শ্রবণগোচর হইতে লাগিল; কিন্তু কোন্ কোন্ ব্যক্তি যে ঐ বাক্য প্রয়োগ করিতেছে, তিনি কোন মতে তাহা অবধারণ করিতে পারিলেন না। তখন তিনি সেই পরিবেদনশীল ব্যক্তিদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া কহিলেন, হে দুঃখার্ত ব্যক্তিগণ! তোমরা কে? আর কি নিমিত্তই বা এ স্থানে অবস্থান করিতেছ?
ধৰ্ম্ম রাজ এই কথা কহিবামাত্র তাঁহারা সকলেই একবারে চতুৰ্দ্দিক্ হইতে "আমি কর্ণ, আমি ভীমসেন, আমি অর্জুন, আমি নকুল, আমি সহদেব, আমি ধৃষ্টদ্যুম্ন, আমি দ্রৌপদী এবং আমরা দ্রৌপদী পুত্র”, এই বলিয়া আত্মপরিচয় প্রদান করিতে লাগিলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির তাঁহাদের বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, হায়! কি দৈববিড়ম্বনা! আমার ভীমসেন প্রভৃতি ভ্রাতৃগণ, কর্ণ, দ্রৌপদী ও দ্রৌপদীর পুত্রগণ এমন কি দুষ্কর্ম করিয়াছেন যে, উঁহাদিগকে এই পাপ-গন্ধযুক্ত ভীষণ স্থানে অবস্থান করিতে হইল। আমি ত ঐ পুণ্যাত্মাদিগের কোন দুষ্কৃত দেখিতে পাই না। এক্ষণে ধৃতরাষ্ট্র-তনয় রাজা দুর্য্যোধন কি নিমিত্ত পাপপরায়ণ হইয়াও অধর্মনিরত অনুচরগণের সহিত ইন্দ্রের ন্যায় সমৃদ্ধিসম্পন্ন ও পরম পূজিত হইয়া এই স্বর্গলোকে অবস্থান করিতেছে, আর আমার ভ্রাতৃগণই বা কি নিমিত্ত পরমধার্মিক, সত্যপরায়ণ, শাস্ত্রপারদর্শী ও ক্ষত্রিয়ধম্মনিরত হইয়াও ঘোর নরকে নিমগ্ন রহিয়াছে, আমি ইহার কিছুই নির্ণয় করিতে সমর্থ হইতেছি না। এ কি আমার নিদ্রিতাবস্থা না জাগরিতাবস্থা? আমার কি চিত্তবিভ্রম উপস্থিত হইয়াছে?
রাজা যুধিষ্ঠির শোকাকুলিতচিত্তে এইরূপ চিন্তা করিয়া নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া ধৰ্ম্ম ও দেবগণকে নিন্দা করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি সেই দেবদূতকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্র! তুমি যাঁহাদিগের দূত, তাঁহাদিগের নিকট অচিরাৎ গমন করিয়া নিবেদন কর যে, আমি এই স্থানেই অবস্থান করিলাম। আমি আর তথায় গমন করিব না। আমার দুঃখিত ভ্রাতৃগণ আমার আগমনে পরম আহ্লাদিত হইয়াছে। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, দেবদূত দেবরাজ ইন্দ্রের নিকট গমন করিয়া তাঁহার অভিপ্রায়সমুদায় ব্যক্ত করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অতি অল্পকাল সেই অপবিত্র স্থানে অবস্থান করিলে, মূর্তিমান্ ধৰ্ম্ম ও ইন্দ্রাদি দেবগণ তথায় আগমন করিলেন। তখন সেই তেজস্বীদিগের সমাগমে তত্রত্য তিমিররাশি একবারে তিরোহিত হইল। বৈতরণী নদী, কূটশাল্মলী, লৌহকুম্ভী নরক, উত্তপ্ত লৌহফলক ও পাপাত্মাদিগের যাতনা সমুদায় আর লক্ষিত হইল না; মহাত্মা যুধিষ্ঠির ইতিপূর্ব্বে যে সমুদায় বিকৃত শরীর দর্শন করিতেছিলেন, তৎসমুদায়ও এককালে অদৃশ্য হইয়া গেল এবং পবিত্রগন্ধযুক্ত সুখস্পর্শ সুশীতল বায়ু চারিদিকে প্রবাহিত হইতে লাগিল।
অনন্তর ইন্দ্রের সহিত মরুদ্গণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সহিত বসুগণ এবং সাধ্য, রুদ্র, আদিত্য, সিদ্ধ, পরমর্ষি ও অন্যান্য দেবগণ ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তখন দেবরাজ ধর্মরাজকে সান্ত্বনা করিয়া কহিলেন, মহারাজ! সমুদায় দেবতা তোমার প্রতি প্রীত হইয়াছেন। অতঃপর আর তোমাকে কষ্টভোগ করিতে হইবে না। এক্ষণে তুমি আমার সহিত আগমন কর। তোমার পরমসিদ্ধি ও অক্ষয়লোকলাভহইয়াছে। তোমার নরক দর্শন হইল বলিয়া তুমি আমাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হইও না। সকল রাজাকেই এক একবার নরকদর্শন করিতে হয়। মনুষ্যমাত্রেরই পাপ ও পুণ্য এই উভয়ের শ্রেণী বিদ্যমান থাকে।
যে ব্যক্তি প্রথমে স্বর্গভোগ করে, পশ্চাৎ তাহাকে নরক-যন্ত্রণা ভোগ করিতে হয়, আর যে ব্যক্তি প্রথমে নরকভোগ করে, সে পশ্চাৎ স্বর্গসুখের অধিকারী হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি অশেষবিধ পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান ও অল্পমাত্র পুণ্যসঞ্চয় করে, সে প্রথমে স্বর্গসুখ অনুভব করিয়া থাকে। আর যে ব্যক্তি অধিক পুণ্যসঞ্চয় ও অল্পমাত্র পাপানুষ্ঠান করে, তাহার প্রথমে নরক-ভোগ ও পশ্চাৎ স্বর্গভোগ হয়। এই নিমিত্ত আমি তোমার শ্রেয়োলাভার্থী হইয়া তোমাকে প্রথমে নরকদর্শন করাইলাম।
পূর্ব্বে তুমি ছলপূর্ব্বক গুরু দ্রোণাচার্য্যের নিকট অশ্বত্থামার বিনাশ কীর্তন করিয়া তাঁহাকে বঞ্চনা করিয়াছিলে, এই নিমিত্ত তোমাকে ছলক্রমে নরক প্রদর্শন করা হইল এবং তোমার ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীও সেই পাপে ছলক্রমে নরকভোগ করিলেন। এক্ষণে তোমার ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদী সেই নরক হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছেন। তোমার পক্ষীয় সমুদায় ভূপতিরই স্বর্গলাভহইয়াছে এবং তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা মহাধনুর্দ্ধর কর্ণও পরম সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। এক্ষণে তুমি শোক পরিত্যাগপূর্ব্বক আমার সহিত আগমন কর; অনায়াসে তাঁহাদিগকে স্ব স্ব স্থানে অবস্থিত দেখিয়া পরম পরিতোষ লাভ করিতে পারিবে।
আদিত্যসদৃশ কর্ণের নিমিত্ত আর তোমার অনুতাপ করিবার আবশ্যক নাই। তোমার মনস্তাপ দূর হউক। তুমি প্রথমে বহুতর কষ্টভোগ করিয়াছ; এক্ষণে শোকবিহীন হইয়া আমার সহিত পরমসুখে অবস্থানপূর্ব্বক তপস্যা, দান ও অন্যান্য পুণ্যকার্য্যের ফলভোগ কর। আজি অবধি গন্ধর্ব্ব ও অন্সরোগণ সতত তোমার শুশ্রূষা করিবে। অতঃপর তুমি রাজসূয়জিত' লোকসমুদায় ও তপস্যার মহাফল উপভোগে প্রবৃত্ত হও। মহারাজ হরিশ্চন্দ্র, মান্ধাতা, ভগীরথ ও ভরত অন্যান্য ভূপতি-সমুদায় অপেক্ষা যে অতি উৎকৃষ্ট লোক লাভ করিয়াছেন, তুমি সেই লোকে অবস্থিত হইয়া পরম সুখভোগ করিবে। ঐ দেখ, তোমার অনতিদূরে ত্রৈলোক্যপাবনী' দেবনদী মন্দাকিনী বিরাজমানা রহিয়াছেন, তুমি উহার পবিত্রজলে অবগাহন করিলেই তোমার শোকসন্তাপ ও বৈর প্রভৃতি মানুষভাবসমুদায় একবারে তিরোহিত হইবে।
দেবরাজ এই কথা কহিলে, ভগবান্ ধৰ্ম্ম স্বীয় পুত্র যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, বৎস! আমি তোমার ধর্মপরায়ণতা সত্য-নিষ্ঠা, ক্ষমা, ও দমগুণদর্শনে নিতান্ত প্রীত হইয়াছি। এই আমি তৃতীয়বার তোমাকে পরীক্ষা করিলাম কিন্তু এবারেও তোমাকে স্বভাব হইতে পরিচালিত করিতে সমর্থ হইলাম না। পূর্ব্বে তোমার দ্বৈতবনে অবস্থানসময়ে আমি অরণিকাষ্ঠ অপহরণ করিয়া মায়াবলে তোমার ভ্রাতৃগণকে সংহারপূর্ব্বক তোমার নিকট যে সমুদায় প্রশ্ন করিয়াছিলাম, তুমি অনায়াসে তাহার উত্তর করিয়াছিলে। তৎপরে তোমার মহাপ্রস্থানসময়ে আমি কুকুররূপে তোমাকে পরীক্ষা করিয়াও তোমার বুদ্ধি বিচলিত করিতে পারি নাই। আর এক্ষণেও তুমি ভ্রাতৃগণকে পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গভোগ করিবে না, ইহা আমার বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হইল। এখন বুঝিলাম, তোমার তুল্য বিশুদ্ধস্বভাব আর কেহই নাই। অতঃপর তুমি স্বচ্ছন্দে স্বর্গসুখ অনুভব কর। তোমার ভ্রাতৃগণ নরকভোগের যোগ্যপাত্র নহে। তুমি উঁহাদিগকে যে নরকভোগ করিতে দেখিয়াছ, দেবরাজ ইন্দ্র মায়াবলে ঐ নরকের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সমুদায় রাজাকে অবশ্যই একবার নরকদর্শন করিতে হয়, এই নিমিত্তই মুহূৰ্ত্তকাল তোমাকে সেই ক্লেশ সহ্য করিতে হইয়াছে। মহাত্মা অর্জুন, ভীমসেন, নকুল, সহদেব, কর্ণ ও রাজপুত্রী দ্রৌপদী ইঁহাদিগের সকলেরই স্বর্গলাভহইয়াছে। এক্ষণে তুমি আমার সহিত আগমন করিয়া ঐ মন্দাকিনীর পবিত্রজলে অবগাহন কর।
ভগবান্ ধৰ্ম্ম এই কথা কহিলে, ধর্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির অচিরাৎ দেবগণের সহিত সেই ত্রিলোকপাবনী মন্দাকিনীর তীরে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার পবিত্রজলে অবগাহন করিলেন। ঐ সলিলে অবগাহন করিবামাত্র তাঁহার মানুষদেহ তিরোহিত ও দিব্য মূর্তি সমুৎপন্ন হইল এবং তাঁহার অন্তর হইতে শোক ও বৈরভাব একবারে দূরীভূত হইয়া গেল। তখন তিনি ধৰ্ম্ম ও অন্যান্য দেবগণে পরিবৃত হইয়া ঋষিদিগের স্তুতিবাদ শ্রবণ করিতে করিতে যে স্থলে তাঁহার ভ্রাতৃচতুষ্টয় ও ধৃতরাষ্ট্রতনয়গণ ক্রোধবিহীন হইয়া পরমসুখে অবস্থান করিতে--ছিলেন, সেই স্থলে গমন করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে ধৰ্ম্মাত্মা ধৰ্ম্মতনয় কৌরবগণের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ঐ স্থানে ভগবান্ বাসুদেব ব্রাহ্মদেহ' ধারণ করিয়া বিরাজমান রহিয়াছেন। তাঁহার পূর্ব্বদৃষ্ট আকৃতির কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হয় নাই। চক্র প্রভৃতি ঘোরতর দিব্যাস্ত্রসমুদায় পুরুষরূপ ধারণপূর্ব্বক তাঁহার চতুৰ্দ্দিক্ পরিবেষ্টন করিয়া তাঁহাকে স্তব করিতেছেন এবং মহাবীর অর্জুন তাঁহার উপাসনায় নিযুক্ত রহিয়াছেন। মহাত্মা যুধিষ্ঠির ঐ স্থানে উপস্থিত হইবামাত্র সেই দেবপূজিত বাসুদেব ও ধনঞ্জয় তাঁহার যথোচিত পূজা করিলেন।
তখন ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির অন্যান্য ব্যক্তিগণের সহিত সাক্ষাৎকার করিবার মানসে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিতে করিতে দেখিলেন, একদিকে শস্ত্রধরাগ্রগণ্য' মহাত্মা কর্ণ আদিত্যর ন্যায় দিব্যমূর্তি ধারণপূর্ব্বক অবস্থান করিতেছেন। আর একদিকে মূর্তিমান্ পবনের পার্শ্বে দিব্যরূপধারী মহাত্মা ভীমসেন মরুদ্গণে পরিবৃত হইয়া শোভা ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। অন্যদিকে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের নিকট মহাত্মা নকুল ও সহদেব তেজঃপুঞ্জ-কলেবরে উপবিষ্ট হইয়াছেন এবং তাঁহাদের অনতিদূরে উৎপলামালাধারিণী দ্রৌপদী স্বীয় রূপলাবণ্যে স্বর্গলোক আলোকময় করিয়া অবস্থান করিতেছেন।
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁহাদিগকে দর্শন করিয়া ইন্দ্রকে তাঁহাদের ও অন্যান্য ব্যক্তিগণের সবিশেষ বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করিলেন। তখন দেবরাজ তাঁহার অভিপ্রায় অবগত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! তুমি যে পুণ্যগন্ধযুক্তা রূপলাবণ্যবতী দ্রৌপদীকে দর্শন করিতেছে, ইনি অযোনিসম্ভূতা লক্ষ্মী। পূর্ব্বে ভগবান্ শূলপাণি তোমাদিগের প্রীতির নিমিত্ত ইহাকে সৃষ্টি করাতে ইনি মহারাজ দ্রুপদের গৃহে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই পাবকের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন পাঁচজন গন্ধর্ব্ব তোমাদিগের ঔরসে দ্রৌপদীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তুমি ঐ যে গন্ধর্ব্বরাজ মহাত্মা ধৃতরাষ্ট্রকে দর্শন করিতেছ। উনি তোমার জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র। ঐ দেখ, তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা সূর্য্যপুত্র কর্ণ সূর্য্যের ন্যায় গমন করিতেছেন। পূর্ব্বে ইঁহারই নাম রাধেয় বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিল।
ঐ দেখ, বৃষ্ণি, অন্ধক ও ভোজবংশীয় সাত্যকি প্রভৃতি মহাবল পরাক্রান্ত বীরগণ সাধ্য, দেবতা ও বিশ্বদেবগণের মধ্যে অবস্থান করিতেছেন এবং সুভদ্রাগর্ভসম্ভূত মহাত্মা অভিমন্যু ভগবান্ চন্দ্রের সহিত একত্র সমাসীন রহিয়াছেন। ঐ দেখ, তোমার পিতা মহারাজ পাণ্ডু কুন্তী ও মাদ্রীর সহিত একত্র হইয়া অবস্থান করিতেছেন। উনি দিব্য বিমানে সমারূঢ় হইয়া সতত আমার নিকট আগমন করিয়া থাকেন। ঐ দেখ, মহাত্মা ভীষ্ম বসুগণের সহিত মিলিত হইয়াছেন; তোমার গুরু দ্রোণাচার্য্য বৃহস্পতির পার্শ্বে অবস্থিত রহিয়াছেন এবং অন্যান্য ভূপাল ও যোধগণের মধ্যে কেহ কেহ গন্ধর্ব্ব ও যক্ষগণ পরিবৃত হইয়া অনুপম স্বর্গসুখ অনুভব আর কেহ কেহ গুহ্যকদিগের গতিলাভকরিয়া উৎকৃষ্ট লোকসমুদায়ে পরিভ্রমণ করিতেছেন।
জনমেজয় কহিলেন, ভগবন্! মহাত্মা ভীষ্ম, দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র, বিরাট, দ্রুপদ, শঙ্খ, উত্তর, ধৃষ্টকেতু, জয়ৎসেন, সত্যজিৎ দুর্য্যোধনের পুত্রগণ, শকুনি, কর্ণের মহাবল পরাক্রান্ত পুত্রগণ, জয়দ্রথ, ঘটোৎকচ প্রভৃতি মহাবীরগণ ও অন্যান্য ভূপালসমুদায় কতকাল স্বর্গভোগ করিয়াছিলেন? তাঁহারা কি ভোগাবসানে স্ব স্ব প্রকৃতিতে লীন হইয়াছিলেন, অথবা তাঁহাদের অন্য কোন্ গতিলাভ হইয়াছিল? ইহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। তপঃপ্রভাবে আপনার কিছুই অবিদিত নাই; অতএব আপনি ঐ সমুদায় আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কৰ্ম্মভোগের অবসানে সকলেই যে স্ব স্ব প্রকৃতি লাভ করিতে পারে, এরূপ নহে। এক্ষণে অগাধবুদ্ধিসম্পন্ন সৰ্ব্বতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন আমার নিকট সংগ্রামনিহত বীরগণমধ্যে যাহার যেরূপ গতি কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, আমি সেই দেবগুহা বিষয় আনুপূর্ব্বিক আপনার নিকট কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
মহাত্মা ভীষ্ম বসুগণের লোকলাভ, দ্রোণ বৃহস্পতির শরীরে প্রবেশ, কৃতবর্মা মরুদগণের মধ্যে প্রবেশ, প্রদ্যুম্ন সনৎকুমারের শরীরে প্রবেশ, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর সহিত কুবেরলোক লাভ, মহাত্মা পাণ্ডু কুন্তী ও মাদ্রীর সহিত ইন্দ্রলোকে এবং মহারাজ বিরাট, দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, নিশঠ অক্রুর, শাম্ব, ভানু, কম্প, বিদূরথ, ভূরিশ্রবাঃ, শল, ভূরি, কংস, উগ্রসেন, বাসুদেব, উত্তর ও শঙ্খ বিশ্বদেবগণের শরীরে প্রবেশ করিয়াছেন। ভগবান্ চন্দ্রের পুত্র মহাত্মা বর্চ্চাঃ অর্জুনের পুত্র হইয়া জন্মগ্রহণপূর্ব্বক অভিমন্যু নামে বিখ্যাত হন। তিনি ক্ষাত্রধর্মানুসারে ঘোরতর সংগ্রামে কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক পরিশেষে চন্দ্রের শরীরে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। মহাবীর কর্ণ সূর্য্যের, শকুনি দ্বাপরের ও ধৃষ্টদ্যুম্ন অনলের শরীরে প্রবেশ করিয়াছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের দুর্য্যোধন ভিন্ন অন্যান্য পুত্রগণ রাক্ষসগণের অংশে জন্মগ্রহণ করে; তাহারা শস্ত্রপূত হইয়া স্বর্গলাভ করিয়াছে। মহাত্মা বিদুর ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ধর্মে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। বলদেব অনন্তরূপী হইয়া রসাতলে গমন করিয়াছেন। উনি সর্ব্বলোেক-পিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মার আদেশ-অনুসারে প্রতিনিয়ত পৃথিবী ধারণ করিতেছেন।
সনাতন নারায়ণের অংশে যাঁহার জন্ম হইয়াছিল, সেই মহাত্মা বাসুদেব নারায়ণে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। তাঁহার ষোড়শসহস্র বনিতাও কালক্রমে সরস্বতীর জলে নিমগ্ন হইয়া কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক অপ্সরোবেশে তাঁহার সহিত মিলিত হইয়াছেন। ভীষণ সংগ্রামে ঘটোৎকচ প্রভৃতি যে সমুদায় রাক্ষস ও যে সমুদায় মহাবীর নিহত হইয়াছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ দেবলোক, কেহ কেহ যক্ষলোক লাভ করিয়াছেন। দুর্য্যোধনের অনুগত নিশাচরদিগের ইন্দ্রলোক, কুবেরলোক ও বরুণলোক প্রভৃতি উৎকৃষ্ট লোকসমুদায় লাভ হইয়াছে।
হে মহারাজ! এই আমি আপনার নিকট কৌরব ও পাণ্ডবগণের চরিত্র আদ্যোপান্ত সবিস্তারে কীর্ত্তন করিলাম।
সৌতি কহিলেন, হে মহর্ষিগণ! সর্পসত্রাবসানে' মহারাজ জনমেজয় ভগবান্ বৈশম্পায়নের মুখ এইরূপ ভারত-ইতিহাস শ্রবণ করিয়া যাহার-পর-নাই বিস্ময়াপন্ন হইলেন। অনন্তর তাঁহার যাজকগণ' সেই যজ্ঞে অবশিষ্ট কার্য্যসমুদায় সমাপন করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি আস্তীক ভুজঙ্গমদিগের মুক্তিলাভ-নিবন্ধন পরম পরিতুষ্ট হইলেন এবং ব্রাহ্মণগণ প্রভৃতি দক্ষিণা ও যথোচিত সম্মান লাভ করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।
মহারাজ জনমেজয় এইরূপে যজ্ঞ সমাপন ও ভারত শ্রবণ করিয়া পরিশেষে সেই তক্ষশিলা হইতে হস্তিনায় প্রত্যাগমন করিলেন।
হে মহর্ষিগণ! এই আমি আপনাদিগের নিকট ব্যাসের আজ্ঞায় বৈশম্পায়নকর্তৃক কীর্ত্তিত পবিত্র ভারতোপাখ্যান সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম। ইহার তুল্য পবিত্র ইতিহাস আর কিছুই নাই। সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় সাংখ্যযোগবেত্তা অণিমাদি ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন, সর্ব্বজ্ঞ, ধর্মজ্ঞানবিশারদ ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন মহাত্মা পাণ্ডব ও অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণের কীর্ত্তি বিস্তার করিবার নিমিত্ত দিব্যজ্ঞান প্রভাবে এই অপূর্ব্ব ইতিহাস রচনা করিয়া গিয়াছেন।
যে ব্যক্তি পর্ব্বে পর্ব্বে এই পবিত্র ইতিহাস অন্যকে শ্রবণ করান, তিনি পাপনিৰ্ম্মক্ত হইয়া ব্রহ্মের স্বরূপত্ব লাভকরিতে পারেন, যে ব্যক্তি সমাহিত হইয়া এই বেদব্যাস প্রণীত ভারতোপাখ্যান শ্রবণ করেন, তাঁহার কোটি কোটি ব্রহ্মহত্যাদি পাপ বিনষ্ট হইয়া যায়। যে ব্যক্তি শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণগণকে ইহার কিয়দংশমাত্রও শ্রবণ করান, তাঁহার পিতৃগণ অক্ষয় অন্নপান লাভ করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ দিবসে মনঃ ও ইন্দ্রিয়গণদ্বারা বিবিধ পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া সায়ংসন্ধ্যাসময়ে ভক্তিপূর্ব্বক ইহার অল্পাংশমাত্র পাঠ করিলে অনায়াসে দিনকৃত পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারেন, আর তিনি রাত্রিযোগে স্ত্রীসংসর্গ-নিবন্ধন যে পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান করেন, প্রাতঃসন্ধ্যাসময়ে ইহার কিয়দংশমাত্র পাঠ করিলে, তাঁহার সেই রাত্রিকৃত পাপ বিনষ্ট হইয়া যায়।
এই পবিত্র ইতিহাস সর্ব্বাপেক্ষা মহৎ ও ইহাতে ভারত-বংশীয়দিগের চরিত্র কীর্ত্তিত আছে বলিয়া ইহার নাম "মহাভারত" হইয়াছে। যে ব্যক্তি এই মহাভারতের অর্থসমুদায় পরিজ্ঞাত হইতে পারেন, তিনি সমুদায় পাপ হইতে বিমুক্ত হন। এই মহাভারতে ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ - চারিবর্ণই বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে যাহা আছে, তাহা অনুসন্ধান করিলে অন্যত্র প্রাপ্ত হওয়া যাইতে পারে, কিন্তু ইহাতে যাহা নাই তাহা আর কুত্রাপি নাই। মোক্ষাভিলাষী ব্রাহ্মণ, রাজা ও গর্ভবতী স্ত্রীর এই জয়াখ্য পবিত্র ইতিহাস শ্রবণ করা অবশ্য কর্তব্য। ইহা শ্রবণ করিলে স্বর্গকামীদিগের স্বর্গ, জয়কাঙ্ক্ষীদিগের জয় এবং গর্ভবতী রমণীদিগের পুত্র বা সৌভাগ্যবতী কন্যালাভ হইয়া থাকে।
মোক্ষলাভার্থী সিদ্ধপুরুষ মহাত্মা বেদব্যাস ধৰ্ম্মকামনায় যষ্টিলক্ষ শ্লোক রচনা করিয়া এই মহাভারতসংহিতা প্রস্তুত করেন। ঐ ষষ্টিলক্ষ শ্লোকের মধ্যে দেবলোকে ত্রিংশৎ লক্ষ, পিতৃলোকে পঞ্চদশ লক্ষ ও যক্ষলোকে চতুৰ্দ্দশ লক্ষ শ্লোক বিদ্যমান রহিয়াছে। এই মনুষ্যলোকে উহার একলক্ষ মাত্র শ্লোক বর্তমান আছে। পূর্ব্বে দেবর্ষি নারদ দেবগণকে, অসিতদেবল পিতৃগণকে, মহাত্মা শুকদেব রাক্ষস ও যক্ষদিগকে এবং মহর্ষি বৈশম্পায়ন মনুষ্যদিগকে এই ইতিহাস শ্রবণ করাইয়াছিলেন।
যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণকে অগ্রসর করিয়া এই ব্যাসোত্ত বেদসম্মিত পবিত্র ইতিহাস শ্রবণ করেন, তিনি ইহলোকে সুখসম্ভোগ ও কীর্ত্তিলাভ করিয়া চরমে পরম সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন, সন্দেহ নাই। যে ব্যক্তি ভগবান্ বেদব্যাসের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হইয়া মহাভারতের কিয়দংশমাত্র অন্যকে শ্রবণ করান তাঁহারও পরম সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে।
পূর্ব্বে ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন স্বীয় পুত্র শুকদেবকে এই ভারতসংহিতা অধ্যয়ন করাইয়াছিলেন। এই মহাভারত-মধ্যে কীর্ত্তিত আছে যে, "মনুষ্যগণ এই সংসারমধ্যে অসংখ্য মাতা, পিতা ও পুত্র-কলত্রের সহিত মিলিত ও তাহাদের বিয়োগে দুঃখিত হইয়া থাকে। এই সংসারে সহস্র সহস্র হর্ষের কারণ ও শত শত ভয়ের কারণ বিদ্যমান আছে। ঐ সমুদায় প্রতি নিয়ত মূঢ় ব্যক্তিদিগকে আক্রমণ করিয়া থাকে; পণ্ডিতদিগের নিকট কখনই আগমন করিতে পারে না। আমি উর্দ্ধবাহু হইয়া বৃথা রোদন করিতেছি, কেহই আমার বাক্য শ্রবণ করিতেছে না। ধর্মোপার্জনের নিমিত্ত অর্থ ও কামে লিপ্ত হওয়া মনুষ্যের কর্তব্য। কাম, ভয়, লোভ বা জীবনরক্ষার নিমিত্ত ধর্ম পরিত্যাগ করা কখনই কর্তব্য নহে। ধর্ম ও জীব নিত্য এবং সুখ-দুঃখ ও জীবের উপাধি শরীর অনিত্য বলিয়া নিৰ্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে।"
যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া পবিত্রচিত্তে মহাভারতের এই অংশটি পাঠ করেন, তিনি নিশ্চয়ই পরম সিদ্ধিলাভ করিতে সমর্থ হন। সমুদ্র ও হিমাচলের ন্যায় এই মহাভারতও রত্ননিধি' বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। যিনি সমাহিতচিত্তে এই পবিত্র ইতিহাস পাঠ করেন, তাঁহার নিশ্চয়ই পরম সিদ্ধিলাভ হয়। যে মহাত্মা ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ওষ্ঠপুট-বিনিঃসৃত পাপনাশন পরমপবিত্র ভারতকথা শ্রবণ করেন, তাঁহার আর পুষ্করজলে' অভিষিক্ত হইবার আবশ্যক কি?
জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষিগণ! মহারাজ জনমেজয় এইরূপে বৈশম্পায়নের মুখে মহাভারত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ব্রহ্মন্ ! কিরূপ নিয়মে মহাভারত শ্রবণ করা কর্তব্য? ভারত শ্রবণের ফল কি? উহা শ্রবণান্তে পারণ'সময়ে কোন্ কোন্ দেবতার পূজা করা কর্তব্য? কোন্ কোন্ পৰ্ব্ব সমাপন হইলে কি কি বস্তু প্রদান করা উচিত এবং উহার পাঠকই বা কিরূপ হওয়া আবশ্যক, তৎসমুদায় কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! যেরূপ নিয়মে মহাভারত শ্রবণ করা কর্তব্য এবং ভারতশ্রবণে যে ফললাভহয়, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
মহাভারতমধ্যে ক্রীড়ার্থ ভূমণ্ডল অবতীর্ণ দেবগণ, আদিত্যগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, লোকপাল, মহর্ষি, গুহ্যক, গন্ধর্ব্ব, বিদ্যাধর, সিদ্ধ ও অপ্সারোেগণ, গিরি, সাগর, নদী, গ্রহ, বৎসর, অয়ন ও ঋতুসমুদায় এবং মূর্ত্তিমান্ ভগবান্ স্বয়ম্ভূ ও স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সমুদায় জগতের বৃত্তান্ত সন্নিবেশিত রহিয়াছে। ভারতপাঠসময়ে মনুষ্যগণ উঁহাদিগের নাম ও কার্য্যসমুদায় শ্রবণ করিয়া অচিরাৎ ঘোরতর পাপ হইতে বিমুক্ত হয়। সংযত ও শুচি হইয়া আনুপূর্ব্বিক' এই ইতিহাস শ্রবণ করিতে আরম্ভকরিয়া সাধ্যানুসারে ভক্তিপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণকে বিবিধ রত্ন, গাভী, কাংস্যময় দোহনপাত্র', অলঙ্কৃত কন্যা, বিবিধ যান, বিচিত্র হা ভূমি, বস্ত্র, সুবর্ণ, অশ্ব ও মত্তমাতঙ্গ প্রভৃতি বাহন, শয্যা, শিবিকা', অলঙ্কৃত রথ ও অন্যান্য উৎকৃষ্ট দ্রব্যসমুদায় ব্রাহ্মণগণকে দান করা কর্তব্য। অধিক কি কহিব; এই মহাভারত, শ্রবণসময়ে ব্রাহ্মণগণকে আত্মদান, পত্নীদান ও পুত্রদান করিয়াও সন্তুষ্ট করা উচিত। ভারত শ্রবণাভিলাষী ব্যক্তি হৃষ্ট ও অসন্দিগ্ধচিত্তে সাধ্যানুসারে ভক্তিপূর্ব্বক এই সমুদায় বস্তু প্রদান করিলে ক্রমশঃ মহাভারত শ্রবণ সমাপন করিতে সমর্থ হন।
এক্ষণে সত্য, সরলতা, দমগুণ ও শ্রদ্ধাসম্পন্ন জিতক্রোধ ব্যক্তি যে উপায়ে এই মহাভারত শ্রবণে সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি শ্রবণ করুন।
পবিত্রতা ও শিষ্টাচারসম্পন্ন, শুক্লাম্বরপরিধায়ী', জিতেন্দ্রিয়, সর্ব্বশাস্ত্রপারদর্শী, ঈর্ষাপরিশূন্য, রূপবান, দমগুণযুক্ত, সত্যবাদী ও সম্মানার্হ ব্যক্তিকেই ভারতের পাঠকতা কার্য্যে নিযুক্ত করা কর্তব্য। পাঠক পরমসুখে সমাসীন” হইয়া সমাহিতচিত্তে, অদ্রুত, অনতিবিলম্বিত১৪ ও স্পষ্টরূপে পাঠ করিবেন। পাঠকালে ত্রিষষ্টি” বর্ণ উচ্চারণ ও কণ্ঠাদি অষ্ট' স্থলের সাহায্যে বর্ণ নিঃসরণ হওয়া আবশ্যক। পাঠক এই জয়াখ্য গ্রন্থ পাঠের পূর্ব্বে নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসদেবকে নমস্কার করিবেন। শ্রোতা এইরূপ নিয়মে অবস্থানপূর্ব্বক পাঠকের নিকট মহাভারত শ্রবণ করিলে মহাফললাভে সমর্থ হইয়া থাকেন।
যিনি প্রথম পারণসময়ে বিবিধরূপে ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তি-সাধন করেন, তাঁহার অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি অপ্সরোগণ সমাকীর্ণ দিব্য বিমানে আরোহণ করিয়া মহা আহ্লাদে দেবগণের সহিত স্বর্গলোকে গমন করেন। যিনি দ্বিতীয় পারণ সমাপন করেন, তাঁহার অতিরাত্র যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি দিব্য মাল্য, দিব্য বস্ত্র ও দিব্য গন্ধে বিভূষিত হইয়া রত্নময় দিব্য বিমানে আরোহণপূর্ব্বক দেবলোকে গমন করিয়া থাকেন। তৃতীয় পারণ সমাপন করিতে পারিলে দ্বাদশাহ্ উপবাসের ফল লাভ এবং অপরিমিত কাল দেবতার ন্যায় স্বর্গবাস হয়। চতুর্থ পারণ সমাপন করিতে পারিলে বাজপেয় যজ্ঞের ফললাভ হইয়া থাকে। যিনি পঞ্চম পারণ সমাপন করেন, তাঁহার বাজপেয় যজ্ঞের দ্বিগুণ ফললাভ হয়, এবং তিনি অনায়াসে নবোদিত ভাস্করসদৃশ প্রজ্বলিত পাবকতুল্য দিব্য বিমানে আরোহণপূর্ব্বক দেবগণের সহিত স্বর্গে গমন করিয়া ইন্দ্রভবনে অপরিমিত কাল অবস্থান করিতে পারেন। ষষ্ঠ পারণ সমাপন করিতে পারিলে পঞ্চম পারণের ফল অপেক্ষা দ্বিগুণ এবং সপ্তম পারণ সমাপন করিতে পারিলে তদপেক্ষা ফললাভ হয়।
সপ্তম পারণ সমাপনকর্তা কৈলাশশিখরসদৃশ, বৈদূর্য্য-মণিবেদিকাযুক্ত মণিমুক্তা প্রবালখচিত অপ্সরোগণ সমাকীর্ণ দিব্য বিমানে আরোহণ করিয়া দ্বিতীয় দিবাকরের ন্যায় অনায়াসে সমুদায় লোক পরিভ্রমণ করিতে সমর্থ হন। যিনি অষ্টম পারণ সমাপন করেন, তাঁহার রাজসূয় যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি মনের ন্যায় বেগশালী চন্দ্রকিরণসমবর্ণ তুরঙ্গমযুক্ত দিব্যাঙ্গনা সমাকীর্ণ পূর্ণচন্দ্রসদৃশ দিব্য বিমানে আরোহণ করেন ও অতি মনোহরমূর্তি কামিনীগণের কমনীয় ক্রোড়ে নিদ্রাভিভূত হইয়া পুনরায় তাহাদিগের নূপুরধ্বনি ও মেখলা' শব্দশ্রবণে জাগরিত হন। যিনি নবম পারণ সমাপন করেন, তাঁহার যজ্ঞশ্রেষ্ঠ অশ্বমেধের ফললাভ হয় এবং তিনি কাঞ্চনময় স্তম্ভ, বৈদূর্য্য-মণিময় বেদিকা ও সুবর্ণময় অতি উৎকৃষ্ট গবাক্ষযুক্ত, অপ্সরাঃ ও গন্ধর্ব্বগণে সমাকীর্ণ দিব্য বিমানে আরোহণ করিয়া দেব-লোকে গমনপূর্ব্বক দিব্য মাল্য, দিব্য বস্ত্র ও দিব্য গন্ধে বিভূষিত হইয়া দেবগণের সহিত স্বর্গসুখ সম্ভোগ করেন। যে ব্যক্তি দশম পারণ সমাপন করিয়া ব্রাহ্মণগণের পূজা করেন, কিঙ্কিণীজ্জাল-জড়িত, ধ্বজপতাকশোভিত, রত্নময় বেদী, বৈদূর্য্যময় তোরণ ও প্রবালময় বলভী সংযুক্ত অপ্সরাঃ ও গন্ধর্ব্বগণে সমাকীর্ণ বিমানে আরোহণপূর্ব্বক সুবর্ণবিভূষিত হইয়া পরমসুখে দিব্য লোকসমুদায় বিচরণ করেন এবং একবিংশতি সহস্র বৎসর গন্ধর্ব্বগণের সহিত ইন্দ্রালয়ে বাস করিয়া বহুদিন সূর্য্যলোক, চন্দ্রলোক ও শিবলোকে অবস্থানপূর্ব্বক পরিশেষে বিষ্ণুর সালোক্য প্রাপ্ত হন।
আমার উপাধ্যায় মহর্ষি বেদব্যাস কহিয়াছেন যে, শ্রদ্ধান্বিত হইয়া এইরূপে ভারত শ্রবণ করিলে নিশ্চয়ই এইরূপ ফললাভ হয়। পাঠকালে পাঠককে হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি বিবিধ বাহন, রথাদি যানসমুদায়, কটক', কুণ্ডল', ব্রহ্মসূত্র', বিচিত্র বস্ত্র ও গন্ধদ্রব্য প্রদান করিয়া দেবতার ন্যায় তাঁহার পূজা করিলে বিষ্ণুলোক লাভ হয়।
অতঃপর প্রত্যেক পর্ব্বে ক্ষত্রিয়দিগের জাতি, দেশ, সত্য, মাহাত্ম্য ও ধৰ্ম্ম প্রভৃতি শ্রবণ করিয়া ব্রাহ্মণগণকে যে সমুদায় দ্রব্য প্রদান করিতে হয়, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। প্রথমতঃ ব্রাহ্মণগণদ্বারা স্বস্তিবাচনপূর্ব্বক কার্য্য আরম্ভ করিয়া পরিশেষে পর্ব্ব সমাপ্ত হইলে সাধ্যানুসারে তাঁহাদের পূজা করা কর্তব্য।
আদিপর্ব্ব পাঠসময়ে শাস্ত্রানুসারে পাঠককে গন্ধ ও বস্ত্র প্রদানপূর্ব্বক উৎকৃষ্ট মধু ও পায়স ভোজন করাইবে। আস্তীক-পর্ব্বপাঠসময়ে ঘৃত, মধু ও ফলমূলযুক্ত পায়স এবং গুড়ৌদন', অপূপ' ও মোদক দ্বারা পাঠকের ভোজন সম্পাদন করা কর্তব্য। সভাপর্ব্ব-পাঠসময়ে ব্রাহ্মণগণকে হবিষ্যান্ন ভোজন করাইবে। আরণ্যকপর্ব্ব-পাঠসময়ে ফলমূলাদি দ্বারা ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তি-সাধন এবং অরণীপর্ব্ব আরম্ভ হইলে ব্রাহ্মণদিগকে পূর্ণকুম্ভ”, ধান্য, ফলমূল ও অন্ন প্রদান উচিত।
বিরাটপর্ব্ব-পাঠসময়ে ব্রাহ্মণকে বিবিধ বস্ত্র; উদ্দ্যাগপর্ব্ব আরম্ভ হইলে, তাঁহাদিগকে গন্ধমাল্যাদি দ্বারা বিভূষিত করিয়া অভিলাষানুরূপ আহার; ভীষ্মপর্ব্ব পাঠান্তে উৎকৃষ্ট যান ও সুসংস্কৃত অন্ন; দ্রোণপর্ব্ব-পাঠসময়ে অতি উৎকৃষ্ট ভোজ্যদ্রব্য, শয্যা, শরাসন ও খড়া; কর্ণপর্ব্ব-পাঠসময়ে অভিলাষানুরূপ উৎকৃষ্ট ভোজ্যদ্রব্য; শল্যপর্ব্ব-পাঠসময়ে গুড়োদন, মোদক, অপূপ ও বিবিধ অন্ন; গদাপর্ব্ব-পাঠসময়ে মুগ্ধ মিশ্রিত অন্ন; ঐষিকপর্ব্ব-পাঠসময়ে ঘৃতান্ন এবং স্ত্রীপর্ব্ব-পাঠসময়ে বিবিধ রত্ন প্রদান করা কর্তব্য।
শান্তিপর্ব্ব-পাঠসময়ে ব্রাহ্মণগণকে সর্ব্বগুণসমন্বিত হবিষ্যান্ন ভোজন করাইবে। অশ্বমেধপর্ব্ব-পাঠসময়ে অভিলাষ-অনুরূপ ভোজ্যদ্রব্য প্রদান করিবে। আশ্রমবাসিকপর্ব্ব-পাঠসময়ে হবিষ্যান্ন ভোজন করাইবে। মৌষলপর্ব্ব-পাঠসময়ে চন্দনাদি ও মহাপ্রস্থানিকপর্ব্ব-পাঠসময়ে অভিলাষানুরূপ ভোজ্যদ্রব্য প্রদান করা উচিত। স্বর্গপর্ব্ব-পাঠসময়ে ব্রাহ্মণদিগকে হবিষ্যান্ন ভোজন করাইবে এবং হরিবংশ" সমাপন হইলে সহস্র ব্রাহ্মণ ভোজন করাইয়া প্রত্যেক ব্রাহ্মণকে এক এক নিষ্ক সংযুক্ত এক একটি গাভী ও দরিদ্রদিগকে অর্দ্ধনিষ্কসংযুক্ত এক একটি গাভী প্রদান করিবে। সমুদায় পর্ব্ব সমাপ্ত হইলে সুন্দর অক্ষয়যুক্ত এক খণ্ড মহাভারত পাঠককে প্রদান করা এবং হরিবংশপর্ব্ব সমাপন-সময়ে তাঁহাকে পায়স ভোজন করান অবশ্য কর্তব্য।
শাস্ত্রকোবিদ” ব্যক্তি সর্ব্বলক্ষণসম্পন্ন পাঠকদ্বারা সমুদায় মহাভারত সংহিতা পাঠ করাইয়া ক্ষৌম বা শুক্লবস্ত্র, মাল্য ও অলঙ্কার ধারণপূর্ব্বক সংযতচিত্তে পবিত্র স্থানে উপবেশন করিয়া গন্ধমাল্যদ্বারা মহাভারত পুস্তকের অর্চ্চনা, ব্রাহ্মণগণকে যথোচিত সৎকারসহকারে প্রভূত সুবর্ণ দক্ষিণা ও বিবিধ অন্নপানীয় প্রদান এবং নর, নারায়ণ ও অন্যান্য দেবগণের নাম কীর্ত্তন করিবেন। এইরূপ কার্য্যানুষ্ঠান করিলে তাঁহার অতিরাত্র যজ্ঞের ফললাভহয়, সন্দেহ নাই।
এই মহাভারতের এক এক পর্ব্ব পাঠ সমাপ্ত হইলে শ্রোতার এক এক যজ্ঞের ফললাভ হইয়া থাকে। পাঠক উৎকৃষ্ট স্বরসংযোগসহকারে স্পষ্ট স্পষ্ট শব্দসমুদায় উচ্চারণ করিয়া মহাভারত পাঠ করিবেন। ভারত” পাঠ সমাপ্ত হইলে ব্রাহ্মণ-দিগকে ভোজন করাইয়া অলঙ্কারাদি প্রদানদ্বারা পাঠককে পরিতুষ্ট করা শ্রোতার অবশ্য কর্তব্য। পাঠকের তুষ্টিলাভ হইলে শ্রোতার উৎকৃষ্ট প্রীতিলাভ হয় এবং ব্রাহ্মণগণ পরিতুষ্ট হইলে দেবগণ তাহার প্রতি সুপ্রসন্ন হইয়া থাকেন। অতএব ধর্মপরায়ণ মহাত্মারা ভারতপাঠাবসানে বিবিধ বস্তু প্রদানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণ-গণকে পরিতুষ্ট করিবেন।
এই আমি আপনার নিকট ভারত শ্রবণ ও কীর্তনের বিবি সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে আপনি শ্রদ্ধান্বিত হইয়া আমার উপদেশানুরূপ কার্য্যে প্রবৃত্ত হউন। যে ব্যক্তি শ্রেয়ো-লাভের বাসনা করেন, তাঁহার সর্ব্বদা যত্নপূর্ব্বক মহাভারত শ্রবণ ও শ্রবণান্তে পারণ' করা আবশ্যক। নিয়ত মহাভারত শ্রবণ ও কীর্ত্তন করা ধর্মপরায়ণ মানবগণের অবশ্য কর্তব্য।
যে ব্যক্তির গৃহে মহাভারত পুস্তক থাকে, জয় তাহার হস্তগত হয়, সন্দেহ নাই। ভারতের তুল্য পবিত্র ও পবিত্রতা-জনক আর কিছুই নাই। ভারতমধ্যে বিবিধ পবিত্র কথা সন্নিবেশিত রহিয়াছে। দেবগণ সর্ব্বদা ভারতের উপাসনা করিয়া থাকেন। ভারতই পরমপদস্বরূপ। ভারত অপেক্ষা উৎকৃষ্ট শাস্ত্র আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। ভারত হইতেই মোক্ষলাভে সমর্থ হওয়া যায়। যে ব্যক্তি মহাভারত, ক্ষিতি, গো, সরস্বতী নদী, বাসুদেব ও ব্রাহ্মণগণের নাম কীর্ত্তন করেন, তাঁহাকে কখনই অবসন্ন হইতে হয় না। পরমপবিত্র বেদ, রামায়ণ ও মহাভারতের আদি, অন্ত ও মধ্য সর্ব্বত্রই হরিনাম কীর্ত্তিত রহিয়াছে। যাহাতে বিষ্ণুকথা ও বেদবাক্য সন্নিবেশিত আছে এবং যাহা পরমপবিত্র, ধর্ম্মের আকর ও সর্ব্বগুণসম্পন্ন, সেই ভারতসংহিতা শ্রবণ করা পরমপদাকাঙ্ক্ষী মানবগণের অবশ্য কর্তব্য।
যেমন সূর্যোদয় হইলে তিমিররাশি' বিনষ্ট হয়, তদ্রূপ বিষ্ণুভক্তিপরায়ণ হইয়া ভারতকথা শ্রবণ করিলে কায়িক, মানসিক ও বাচনিক এই ত্রিবিধ পাপধ্বংস হইয়া যায়। বিষ্ণু-ভক্তিপরায়ণ মহাত্মারা অষ্টাদশ পুরাণ শ্রবণের ফললাভে সমর্থ হয়, সন্দেহ নাই। কি স্ত্রী, কি পুরুষ, যে হউক না কেন, বিষ্ণুভক্ত হইলেই বৈষ্ণব পদলাভ করিতে পারে। কামিনীগণ পুত্রলাভ-বাসনায় এই বিষ্ণুকথাত্মক মহাভারত শ্রবণ করিবেন। যে ব্যক্তি উন্নতিলাভের নিমিত্ত হরিকথা শ্রবণ করেন, পাঠককে যথাশক্তি সুবর্ণমণ্ডিতশৃঙ্গযুক্তা সবৎসা কপিলা' ধেনু', অলঙ্কার, কর্ণাভরণ ও ভূমি দক্ষিণা প্রদান করা তাঁহার অবশ্য কর্তব্য।
যে ব্যক্তি নিরন্তর মহাভারত শ্রবণ করেন, অথবা অন্যকে উহাকে শ্রবণ করান, তিনি সমুদায় পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া বিষ্ণুপদলাভ করিতে সমর্থ হন এবং তাঁহার উর্দ্ধতন একাদশ পুরুষ ও পুত্র-কলত্রের নিষ্কৃতি লাভ হইয়া থাকে। এই পবিত্র ইতিহাসের পাঠকার্য্য সমাপ্ত হইলে দশসহস্র হোম করা নিতান্ত আবশ্যক। হে মহারাজ! এই আমি আপনার নিকট সমুদায় ভারতোপাখ্যান সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম।
