কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

মহাপ্রস্থানিকপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

মহাপ্রস্থানিক পর্ব্বাধ্যায়

মহাপ্রস্থানিকপর্ব্ব

মহাপ্রস্থানিক পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও বেদব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

পাণ্ডবদিগের কর্ত্তব্য নিরূপণ।

জনমেজয় কহিলেন, ব্রহ্মন্! আমার পূর্ব্বপিতামহগণ মুষলপ্রভাবে বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশের ক্ষয় এবং মহাত্মা বাসুদেবের স্বর্গগমনবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কি করিলেন, তাহা কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ধৰ্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির অর্জুনের মুখে বৃষ্ণিবংশীয়দিগের বিনাশ ও কৃষ্ণের স্বর্গগমন বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া স্বয়ং মহাপ্রস্থান' করিবার মানসে অর্জুনকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভ্রাতঃ! কালই প্রাণিগণের কার্য্যসমুদায় সম্পাদন করিয়া থাকে। কালপ্রভাবেই মনুষ্যের বিনাশ হয়। আমি অচিরাৎ সেই কালের অপরিহার্য্য কবলে নিপতিত হইব বলিয়া স্থির করিয়াছি। এক্ষণে তোমার যাহা কর্তব্য হয় স্থির কর।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিবামাত্র অর্জুন জ্যেষ্ঠ-ভ্রাতার বাক্যে অনুমোদনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আমি অচিরাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হইতে বাসনা করি। তখন ভীমসেন, নকুল ও সহদেব অর্জুনের অভিপ্রায়' অবগত হইয়া "আমরাও অচিরাৎ প্রাণত্যাগ করিব” বলিয়া অঙ্গীকার করিলেন।

পরীক্ষিতের রাজ্যাভিষেক।

এইরূপে সকলে প্রাণপরিত্যাগে কৃতনিশ্চয় হইলে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পরীক্ষিতকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া, বৈশ্যাপুত্র যুযুৎসুর প্রতি রাজ্যপালনের ভার' সমর্পণপূর্ব্বক সুভদ্রাকে কহিলেন, ভদ্রে তোমার এই পৌত্র অভিমন্যুতনয় কৌরবরাজ্যে অভিষিক্ত হইলেন। আর আমি পূর্ব্বেই বাসুদেবের পৌত্রকে ইন্দ্রপ্রস্থে রাজ্য প্রদান করিয়াছি। অতঃপর এই অভিমন্যুতনয় হস্তিনায় অবস্থানপূর্ব্বক আমাদের রাজ্য এবং বজ্র ইন্দ্রপ্রস্থে অবস্থানপূর্ব্বক হতাবশিষ্ট যাদবগণকে প্রতিপালন করিবেন। তুমি এই বালকদ্বয়ের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখিয়া উহাদিগকে সাবধানে রক্ষা করিবে।

যুধিষ্ঠির এই কথা কহিয়া ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে ধীমান্ বাসুদেব, মাতুল বসুদেব ও বলদেব প্রভৃতি অন্যান্য বৃষ্ণি-বংশীয়দিগকে জলাঞ্জলি প্রদান ও তাঁহাদের শ্রাদ্ধকার্য্য সম্পাদন-পূর্ব্বক বাসুদেবের উদ্দেশ্যে মহর্ষি বেদব্যাস, নারদ, মার্কণ্ডেয় ও যাজ্ঞবল্ক্যকে সুস্বাদু দ্রব্যসকল ভোজন করাইয়া ব্রাহ্মণদিগকে রত্ন, পরিধেয় বস্ত্র, গ্রাম, অশ্ব, রথ, ও দাসীসমুদায় প্রদান করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি কুলগুরু কৃপাচার্য্যকে অর্চ্চনা করিয়া পরীক্ষিতকে তাঁহার হস্তে সমর্পণপূর্ব্বক কহিলেন, ব্রহ্মন্! আপনি যত্নসহকারে এই অভিমন্যুতনয়কে ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করাইবেন।

পাণ্ডবগণের মহাপ্রস্থান যাত্রা।

অনন্তর ধর্মরাজ প্রকৃতিমণ্ডলকে সমানীত করিয়া তাহা-দিগের নিকট স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলে, তাহারা একান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, মহারাজ! আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া গমন করা আপনার কর্তব্য নহে। প্রজাগণ এইরূপে বারংবার অনুনয় করিলেও কালতত্ত্বজ্ঞ রাজা যুধিষ্ঠির তাহাদিগের বাক্যে সম্মত হইলেন না। পরিশেষে তাহাদিগকে সমুচিত সম্মান করিয়া ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে বনগমনে কৃত-নিশ্চয় হইয়া দিব্য আভরণসমুদায় পরিত্যাগপূর্ব্বক বল্কল পরিগ্রহ করিলেন। তখন মহাত্মা ভীমসেন, অর্জুন, নকুল, সহদেব ও মনস্বিনী দ্রৌপদীও তাঁহার ন্যায় বেশধারণে প্রবৃত্ত হইলেন।

অনন্তর পাণ্ডবগণ তৎকালোচিত যজ্ঞ সমাপনপূর্ব্বক সলিলে' অনল নিক্ষেপ করিয়া পত্নীর সহিত বনগমনার্থ বহির্গত হইলেন। কৌরবকামিনীগণ পূর্ব্বের ন্যায় তাঁহাদিগকে বনপ্রস্থান করিতে অবলোকন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। তখন পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী হস্তিনানগর হইতে বহির্গত হইলেন। ঐ সময় এক কুকুর তাঁহাদিগের অনুগামী হইল। পুরবাসী ও নগরবাসী লোকসমুদায় বহুদূর পর্যন্ত তাঁহাদিগের অনুগমন করিল, কিন্তু "মহারাজ! প্রতিনিবৃত্ত হউন” এ কথা কাহারও মুখ হইতে বহির্গত হইল না। পরিশেষে তাঁহারা সকলেই প্রতিনিবৃত্ত হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিল। কৃপাচার্য্য প্রভৃতি মহাত্মারা যুযুৎসুর নিকট অবস্থান করিতে লাগিলেন। ভুজগনন্দিনী' উলূপী জাহ্নবীজলে প্রবিষ্ট হইলেন। চিত্রাঙ্গদা মণিপুরে প্রস্থান করিলেন এবং অবশিষ্ট পাণ্ডবপত্নীগণ পরীক্ষিতের নিকট অবস্থানপূর্ব্বক তাঁহাকে রক্ষা করিতে লাগিলেন।

এদিকে পাণ্ডবগণ যশস্বিনী দ্রৌপদীর সহিত উপবাস করিয়া ক্রমাগত পূর্ব্বাভিমুখে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাত্মা যুধিষ্ঠির সর্ব্বাগ্রে, তৎ পশ্চাৎ মহাবীর ভীমসেন, তৎপশ্চাৎ মহাবল পরাক্রান্ত অর্জুন, তৎপশ্চাৎ যমজ নকুল ও সহদেব এবং তৎপশ্চাৎ যশস্বিনী দ্রৌপদী গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের হস্তিনা হইতে বহির্গমনকালে যে কুকুর তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারী হইয়াছিল, সে তাঁহাদের সকলের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল।

অর্জুনের অস্ত্রত্যাগ ও যুধিষ্ঠিরাদির পৃথিবী-পরিক্রমা।

অনন্তর তাঁহারা ক্রমে ক্রমে অসংখ্য দেশ, নদী ও সাগরসমুদায় সমুত্তীর্ণ হইয়া লোহিতসাগরের কূলে সমুপস্থিত হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় একাল পর্যন্ত রত্নলোভনিবন্ধন গাণ্ডীবধনুঃ ও অক্ষয় তৃণীরদ্বয় পরিত্যাগ করেন নাই। পাণ্ডব-গণ ঐ সমুদ্রের উপকূলে উপস্থিত হইবামাত্র ভগবান্ হুতাশন অর্জুনকে সেই শরাসন পরিত্যাগ করাইবার নিমিত্ত পুরুষবিগ্রহ পরিগ্রহ পূর্ব্বক পর্ব্বতের ন্যায় তাঁহাদের পথরোধ করিয়া তাঁহা-দিগকে কহিলেন, পাণ্ডবগণ! আমি অগ্নি; আমি পূর্ব্বে মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেবের পরাক্রমপ্রভাবে খাণ্ডববন দগ্ধ করিয়া-ছিলাম। ভগবান্ হৃষীকেশের নিকট যে চক্র ছিল, তিনি এক্ষণে তাহা পরিত্যাগ করিয়াছেন; অবতারভেদে পুনরায় ঐ চক্র তাঁহার - হস্তগত হইবে। এক্ষণে অর্জুনও গাণ্ডীবধনু' পরিত্যাগ করিয়া - বনগমন করুন। এখন ঐ শরাসনে ইঁহার কিছুমাত্র প্রয়োজন - নাই। পূর্ব্বে আমি উহার নিমিত্ত বরুণের নিকট হইতে ঐ শরাসন আহরণ করিয়াছিলাম। এক্ষণে উনি উহা বরুণকে প্রত্যর্পণ করুন।

হুতাশন এই কথা কহিলে, যুধিষ্ঠিরাদি সকলেই অর্জুনকে গাণ্ডীবধনু পরিত্যাগ করিতে কহিলেন। তখন মহাত্মা অর্জুন সেই গাণ্ডীব-শরাসন ও অক্ষয় তৃণীরদ্বয় অচিরাৎ সলিলে নিক্ষেপ করিলেন। অর্জুন শরাসন ও তৃণীর নিক্ষেপ করিবামাত্র ভগবান্ হুতাশন সেই স্থানে অন্তর্হিত হইলেন।

অনন্তর পাণ্ডবগণ দক্ষিণাভিমুখে গমন করিয়া লবণ সমুদ্রের উত্তরতীর দিয়া দক্ষিণ পশ্চিমাভিমুখী হইয়া সমুদ্রজল-প্লাবিত দ্বারকাপুরী সন্দর্শনপূর্ব্বক পৃথিবী প্রদক্ষিণবাসনায় তথা হইতে উত্তরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

প্রস্থানপথে দ্রৌপদী প্রভৃতির পতন ও প্রত্যেকতঃ কারণ বিশ্লেষণ।

বৈশাম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে মহাত্মা পাণ্ডবগণ পত্নীর সহিত উপবাসনিরত ও যোগপরায়ণ হইয়া ক্রমাগত উত্তরদিকে গমন করিতে করিতে হিমালয়গিরি দেখিতে পাইলেন। ঐ পৰ্ব্বতে আরোহণপূর্ব্বক গমন করিতে করিতে বালুকাময় সমুদ্র ও সুমেরুপৰ্ব্বত তাঁহাদিগের নেত্রপথে নিপতিত হইল। তখন তাঁহারা হিমালয় অতিক্রম করিবার মানসে দ্রুতবেগে ধাবমান হইলেন। ঐ সময় পাণ্ডবমহিষী দ্রৌপদী নিতান্ত পরিশ্রমনিবন্ধন যোগভ্রষ্টা হইয়া তাঁহাদিগের সম্মুখে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। মহাবীর ভীমসেন তদ্দর্শনে ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! রাজপুত্রী দ্রৌপদী কখন কোন অধর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন নাই; তবে কি নিমিত্ত উনি ভূতলে নিপতিত হইলেন?

তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, ভ্রাতঃ! দ্রৌপদী আমাদের সকলের অপেক্ষা অর্জুনের প্রতি সমধিক পক্ষপাত করিতেন, এই নিমিত্ত আজি উহাকে তাহার ফলভোগ করিতে হইল। এই বলিয়া ধর্মরাজ দ্রৌপদীর প্রতি নেত্রপাত না করিয়া সমাহিত-চিত্তে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মহাত্মা সহদেবের সেই স্থান হইতে ধরাতলে পতন হইল। মহাবীর ভীমসেন সহদেবকে নিপতিত হইতে দেখিয়া ধৰ্ম্মরাজকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমাদিগের কনিষ্ঠভ্রাতা সহদেব অহঙ্কারবিহীন এবং আমাদিগের শুশ্রূষায় একান্ত অনুরক্ত ছিল। তবে আজ কি নিমিত্ত উহাকে ধরাতলে নিপতিত হইতে হইল?

তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, ভ্রাতঃ! সহদেব আপনাকে সর্ব্বাপেক্ষা বিজ্ঞ বলিয়া জ্ঞান করিত। সেই পাপে আজি উহাকে ভূমিতলে নিপতিত হইতে হইল। এই বলিয়া ধৰ্ম্মরাজ সহদেবকে পরিত্যাগপূর্ব্বক অনন্যমনে অন্যান্য ভ্রাতৃগণ এবং সেই কুকুরের সহিত গমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মহাত্মা নকুল দ্রৌপদী ও কনিষ্ঠসহোদর সহদেবের পতননিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত ও যোগভ্রষ্ট হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ। নকুল পরমধার্মিক, অলৌকিক রূপসম্পন্ন ও আমাদের আজ্ঞাবহ হইয়া আজ কি পাপে ভূতলে নিপতিত হইল?

যুধিষ্ঠির কহিলেন, ভ্রাতঃ। ধর্মপরায়ণ নকুল "ইহলোকে আমার তুল্য রূপবান্ আর কেহ নাই এবং আমিই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ” বলিয়া মনে মনে অহঙ্কার করিত, এই নিমিত্ত আজি উহাকে ধরাতলে নিপতিত হইতে হইল। তুমি আর উহার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া আমার সহিত আগমন কর। যে যেরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে অবশ্যই তাহার ফলভোগ করিতে হয়। এই বলিয়া ধর্মরাজ নকুলকে পরিত্যাগপূর্ব্বক সমাহিতচিত্তে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে ইন্দ্রতুল্য পরাক্রান্ত মহাবীর অর্জুন দ্রৌপদী, সহদেব ও নকুলের পতন-নিবন্ধন নিতান্ত শোকসন্তপ্ত ও বিমনায়মান হইয়া ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন মহাত্মা ভীমসেন পুনরায় ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! মহাত্মা অর্জুন পরিহাস-চ্ছলেও কখন মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করে নাই, তবে এক্ষণে কি পাপে উহাকে ধরাতলে নিপতিত হইল?

যুধিষ্ঠির কহিলেন, ভ্রাতঃ! অর্জুন শৌর্য্যাভিমানী হইয়া "আমি একদিনেই সমুদায় শত্রু সংহার করিব” বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল; কিন্তু উহা প্রতিপালন করিতে পারেন নাই। বিশেষতঃ ঐ মহাবীর বলদর্প নিবন্ধন সমুদায় ধনুর্দ্ধরকে অবজ্ঞা করিত। এই নিমিত্ত আজি উহাকে ভূমিতলে নিপতিত হইতে হইল।

ধর্মপরায়ণ ধর্মরাজ এই বলিয়া সমাহিতচিত্তে ভীম ও সেই কুকুরের সহিত গমন করিতে আরম্ভ করিলে মহাবীর বৃকোদর অচিরাৎ ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তিনি ভূতলে পতিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আমি আপনার নিতান্ত প্রিয়পাত্র। আজি কোন্ পাপে আমাকে ধরাতলে নিপতিত হইতে হইল?

তখন ধৰ্ম্মরাজ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভ্রাতঃ! তুমি অন্যকে ভক্ষ্য বস্তু প্রদান না করিয়া স্বয়ং অপরিমিত ভোজন ও আপনাকে অদ্বিতীয় বলশালী বলিয়া অহঙ্কার করিতে, এই নিমিত্ত তোমাকে ভূতলে নিপতিত হইতে হইল। এই বলিয়া ধর্মরাজ ভীমেরও প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া সমাহিতচিত্তে গমন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় কেবল সেই কুকুর তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল।

দ্রৌপদিসহ যুধিষ্ঠিরের ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের স্বর্গলোকযাত্রা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ধৰ্ম্মাত্মা ধৰ্ম্মনন্দন এইরূপে কিয়দ্দূর গমন করিলে দেবরাজ ইন্দ্র রথশব্দে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল নিনাদিত করিয়া ধর্মরাজের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! তুমি অবিলম্বে এই রথে সমারূঢ় হইয়া স্বর্গারোহণ কর। তখন ধর্মরাজ ভ্রাতৃগণের পতননিবন্ধন শোকাকুল হইয়া দেবরাজকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, সুররাজ! সুখসংবদ্ধিতা সুকুমারী পাঞ্চালী ও আমার পরম প্রিয় ভ্রাতৃগণ ধরাতলে নিপতিত রহিয়াছে। উহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গারোহণ করিতে আমার কিছুমাত্র বাসনা নাই; অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার সহিত উহাদিগকে স্বর্গারোহণ করিতে অনুজ্ঞা করুন।

ধর্মরাজ বিনীতভাবে এই কথা কহিলে, দেবরাজ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! দ্রৌপদী ও তোমার ভ্রাতৃ-চতুষ্টয় মানুষদেহ পরিত্যাগপূর্ব্বক তোমার অগ্রেই স্বর্গারোহণ করিয়াছেন; অতএব তাঁহাদিগের নিমিত্ত শোক করা তোমার কর্তব্য নহে। তুমি এই নরদেহেই স্বর্গারূঢ় হইয়া তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎকার করিতে পারিবে, সন্দেহ নাই।

আশ্রিত বাৎসল্যহেতু যুধিষ্ঠিরের কুকুরত্যাগে অনিচ্ছা।

সুররাজ এইরূপে আশ্বাস প্রদান করিলে ধর্মরাজ পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, দেবরাজ! এই কুকুর আমার একান্ত ভক্ত। এ বহুদিন আমার সমভিব্যাহারে রহিয়াছে; অতএব আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক ইহাকে আমার সহিত স্বর্গারোহণ করিতে আদেশ করুন। উহাকে পরিত্যাগ করিয়া গমন করিলে আমার নিতান্ত নৃশংস ব্যবহার করা হইবে।

ধৰ্ম্মনন্দন এইরূপ অনুরোধ করিলে দেবরাজ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ধর্মরাজ! আজি তুমি অতুল সম্পদ, পরমসিদ্ধি, অমরত্ব ও আমার স্বরূপত্ব লাভ করিবে; অতএব অচিরাৎ এই কুকুর পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গে গমন করা তোমার অবশ্য কর্তব্য। ইহাকে পরিত্যাগ করিলে তোমার কিছুমাত্র নৃশংস ব্যবহার করা হইবে না।

তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, দেবরাজ! অকর্ত্তব্য কার্য্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হওয়া ভদ্রলোকের কদাপি বিধেয় নহে। এক্ষণে যদি স্বর্গীয় সম্পত্তি লাভের নিমিত্ত আমাকে এই পরমভক্ত কুকুরকে পরিত্যাগ করিতে হয়, তাহা হইলে আমার সম্পদে কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই।

ইন্দ্র কহিলেন, ধর্মরাজ! যে ব্যক্তি কুকুরের সহিত একত্র অবস্থান করে, সে কখনই স্বর্গে বাস করিতে সমর্থ হয় না। ক্রোধবশ নামক দেবগণ তাহার যজ্ঞ দানাদির ফল বিনষ্ট করিয়া থাকেন। অতএব তুমি অবিলম্বে এই কুকুর পরিত্যাগ কর। ইহাতে তোমার কিছুমাত্র নৃশংস ব্যবহার করা হইবে না।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, দেবেন্দ্র! ভক্তজনকে পরিত্যাগ করিলে, ব্রহ্মহত্যাসদৃশ মহাপাপে লিপ্ত হইতে হয়। অতএব আজি আমি আত্মসুখের নিমিত্ত কখনই এই কুকুরকে পরিত্যাগ করিব না। ভীত, ভক্ত, অনন্যগতি', ক্ষীণ ও শরণাগত ব্যক্তি-দিগকে আমি প্রাণপণে রক্ষা করিয়া থাকি।

ইন্দ্রকর্তৃক কুকুরের দোষ বর্ণন।

ইন্দ্র কহিলেন, ধর্মরাজ! কুকুর যজ্ঞ, দান ও হোমক্রিয়া দর্শন করিলে, ক্রোধবশ নামক দেবগণ ঐ সমুদায় কার্য্যের ফল ধ্বংস করিয়া থাকেন। কুকুর অতি অপবিত্র জন্তু। অতএব তুমি অচিরাৎ এই কুকুরকে পরিত্যাগ কর, তাহা হইলে তোমার অনায়াসে পরমপবিত্র দেবলোক লাভ হইবে। যখন তুমি প্রাণাধিকা দ্রৌপদী ও ভ্রাতৃগণকে পরিত্যাগ করিয়া স্বীয় উৎকৃষ্ট ধর্মবলে স্বর্গলাভের অধিকারী হইয়াছ, তখন তোমার এই কুকুর পরিত্যাগ করিবার বাধা কি? তুমি সৰ্ব্বত্যাগী হইয়া এক্ষণে এরূপ বিমোহিত হইতেছ কেন?

যুধিষ্ঠির কহিলেন, দেবরাজ! ইহলোকে কাহারও মৃত ব্যক্তিদিগের সহিত সন্ধি' বা বিগ্রহ করিবার ক্ষমতা নাই। আমার ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদী মৃত্যুমুখে নিপতিত হইলে, আমি তাহাদের জীবনদান করিতে সমর্থ নহি বিবেচনা করিয়াই উহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়াছি। উহারা জীবিত থাকিতে আমি উহাদিগকে ত্যাগ করি নাই। আমার মতে ভক্তজনকে পরিত্যাগ করা, শরণাগত ব্যক্তিকে ভয়প্রদর্শন, স্ত্রীহত্যা, ব্রহ্মস্বাপহরণ ও মিত্রদোহ, এই চারিটি কার্য্যের ন্যায় মহাপাপজনক।

ধৰ্ম্মকর্তৃক যুধিষ্ঠিরের পরীক্ষা।

মহাত্মা যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, তাঁহার সমভিব্যাহারী সেই কুকুর সাক্ষাৎ ধর্মরূপী হইয়া প্রীতমনে মধুরবাক্যে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! আমি তোমাকে পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত কুকুরবেশে তোমার সহিত আগমন করিয়া-ছিলাম। এক্ষণে বুঝিলাম, তুমি নিতান্ত ধৰ্ম্মপরায়ণ, বুদ্ধিমান্ ও সর্ব্বভূতে দয়াশীল। পূর্ব্বে আমি দ্বৈতবনে একবার তোমাকে পরীক্ষা করিয়াছিলাম। ঐ সময় তোমার ভ্রাতৃগণ জল অন্বেষণার্থ গমন করিয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিলে, তুমি ভীম ও অর্জুনের জীবন প্রার্থনা না করিয়া মাদ্রীকে স্মরণপূর্ব্বক নকুলের জীবন প্রার্থনা করিয়াছিলে এবং এখনও কুকুরকে আশ্রিত বিবেচনা করিয়া দেবরথ' পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছ। আমি তোমার দুই কার্য্য দর্শনে নিতান্ত প্রীত হইয়াছি। তোমার তুল্য ধর্মপরায়ণ স্বর্গলোকে আর কেহই নাই। তুমি এই দেহেই স্বর্গারোহণপূর্ব্বক অক্ষয় লোকলাভ করিতে পারিবে।

ভগবান্ ধৰ্ম্ম এই কথা কহিবামাত্র ইন্দ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুদ্গণ এবং অন্যান্য দেবতা ও দেবর্ষিসমুদায় তাঁহার সহিত সমবেত হইয়া যুধিষ্ঠিরকে দিব্য রথে আরোপিত করিয়া আপনারা দিব্য বিমানসমুদায়ে সমারূঢ় হইলেন। তখন ধৰ্ম্মরাজ সেই দিব্যরথে আরোহণপূর্ব্বক তেজঃদ্বারা নভোমণ্ডল পরিব্যাপ্ত করিয়া দেবলোকে গমন করিলেন। তিনি দেবলোকে উপস্থিত হইবামাত্র লোকতত্ত্ববেত্তা' তপোধনাগ্রগণ্য দেবর্ষি নারদ দেব-গণের মধ্যে উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, যে সমুদায় মহর্ষি স্বর্গারোহণ করিয়াছেন, আজি মহারাজ যুধিষ্ঠির স্বীয় যশঃ ও তেজঃদ্বারা তাঁহাদিগের সকলেরই কীর্ত্তি আচ্ছাদন পূর্ব্বক সশরীরে স্বর্গারূঢ় হইলেন। পূর্ব্বে আর কোন ব্যক্তিই সশরীরে স্বর্গারোহণ করিতে সমর্থ হন নাই।

যুধিষ্ঠিরের ভ্রাতৃবাৎসল্য।

দেবর্ষি এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির, দেবগণ ও স্বপক্ষীয় পার্থিবগণকে সম্ভাষণপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহাপুরুষগণ! আমার ভ্রাতৃগণ যে লোকে গমন করিয়াছে, তাহা উৎকৃষ্ট হউক বা অপকৃষ্ট' হউক, আমি সেই লোকেই গমন করিব। তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য লোকে অবস্থান করিতে আমার কিছুমাত্র বাসনা নাই। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির সরলভাবে এই কথা কহিলে, দেবরাজ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! তুমি স্বীয় কৰ্ম্মফলে স্বর্গারোহণ করিয়াছ; অতএব এই স্থানেই অবস্থান কর। কেন তুমি অদ্যাপি মনুষ্যবৎ স্নেহের বশীভূত হইতেছ? আর কেহই কখন তোমার তুল্য সিদ্ধিলাভে সমর্থ হন নাই। তোমার ভ্রাতৃগণ এ স্থানের অধিকারী নহে। এই স্বর্গভূমিতে সমুপস্থিত হইয়া মনুষ্যভাবে সমাক্রান্ত হওয়া তোমার নিতান্ত অনুচিত। এই দেখ, মহর্ষি ও দেবগণ এই স্থানে অবস্থান করিতেছেন।

দেবরাজ এই কথা কহিলে, মহাত্মা যুধিষ্ঠির পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, সুররাজ! আমার প্রণয়িনী বুদ্ধিমতী দ্রৌপদী ও আমার পরমপ্রিয় ভ্রাতৃগণ যে স্থানে বাস করিতেছে, সেই স্থানেই গমন করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া এই স্থানে বাস করিতে আমার কিছুতেই ইচ্ছা হইতেছে না।

মহাপ্রস্থানিক পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।
মহাপ্রস্থানিকপর্ব্ব সমাপ্ত।