কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

দ্রোণপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

দ্রোণবধ পর্ব্বাধ্যায়

দ্রোণপর্ব্ব

দ্রোণবধ পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষীয় মহারণ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এইরূপে ব্যাসদেবের আজ্ঞানুসারে স্বয়ং কর্ণ বিনাশে নিবৃত্ত এবং ঘটোৎকচ-বধজনিত দুঃখ ও ক্রোধে একান্ত অভিভূত হইলেন। তিনি ভীমসেনকে অসংখ্য কৌরবসেনা বিদারিত করিতে দেখিয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে দ্রুপদতনয়। দ্রোণাচার্য্যকে নিবারণ কর। তুমি দ্রোণ-বিনাশের নিমিত্ত শর, কবচ, খড়া ও ধনুর্দ্ধারণপূর্ব্বক হুতাশন হইতে উৎপন্ন হইয়াছ। হৃষ্টচিত্তে সমরে ধাবমান হও, তোমার কিছুমাত্র ভয় নাই। জনমেজয়' শিখণ্ডী, যশোধর, দৌম্মুখি, নকুল, সহদেব, পুত্র ও ভ্রাতৃগণে পরিবেষ্টিত দ্রুপদ ও বিরাট, মহাবল সাত্যকি ও অর্জুন এবং প্রভদ্রক, কেকয় ও দ্রৌপদীতনয়গণ- ইঁহারাও সন্তুষ্টচিত্তে দ্রোণবধ-বাসনায় বেগে ধাবমান হউন। রথিগণ হস্তী, অশ্ব ও পদাতিগণে পরিবৃত হইয়া মহারথ দ্রোণকে নিপাতিত করুন।

হে মহারাজ! তখন সেই সমস্ত যোধগণ মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞাক্রমে দ্রোণজিগীষু হইয়া মহাবেগে ধাবমান হইল। শস্ত্রধরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য সেই সমরে সহসা সমাগত বীরগণকে অনায়াসে প্রতিগ্রহ করিলেন। রাজা দুর্য্যোধন তদ্দর্শনে রোষাবিষ্টচিত্তে দ্রোণের জীবন রক্ষার্থ সুসজ্জিত হইয়া পাণ্ডবগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন শ্রান্তবাহন পাণ্ডব ও কৌরবগণ পরস্পর তর্জন-গর্জন করত যুদ্ধ আরম্ভ করিলে মহারথগণ নিদ্রান্ধ ও পরিশ্রান্ত হইয়া সমরে নিশ্চেষ্টপ্রায় হইলেন। সেই প্রাণিগণের প্রাণনাশিনী ত্রিযামা রজনী তাঁহাদিগের পক্ষে সহস্রযামা বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। এইরূপে সেই অর্দ্ধরাত্র সময়ে সৈন্যগণ ক্ষত-বিক্ষত ও বধ্যমান হইলে উভয় পক্ষীয় ক্ষত্রিয়গণ দীনচিত্ত, উৎসাহশূন্য এবং অস্ত্র-শস্ত্রবিহীন হইয়াও লজ্জা ও স্বধর্ম পরিপালন-নিবন্ধন স্ব স্ব সৈন্য পরিত্যাগ করিলেন না। সৈন্যগণ নিদ্রান্ধ হইয়া নিশ্চেষ্টভাবে কেহ অশ্বে, কেহ গজে ও কেহ বা রথোপরি শয়ন করিতে লাগিলেন। অন্য যোধগণ তাহাদিগকে অনায়াসে যমালয় প্রেরণ করিল। অনেকে স্বপ্নে বিপক্ষদলকে অবলোকন করিয়া নানা প্রকার বাক্যোচ্চারণপূর্ব্বক আপনাকে, আত্মীয়গণকে ও শত্রুগণকে সমরে সমাহত করিতে লাগিল। আমাদের পক্ষীয় অসংখ্য বীর শত্রুগণের সহিত সংগ্রাম করিবার মানসে নিদ্রারক্তলোচনে অবস্থান করিতে লাগিল। কতকগুলি নিদ্রান্ধ বীরপুরুষ নিদারুণ অন্ধকারে গমনপূর্ব্বক পরস্পরের প্রাণ বিনাশ করিতে লাগিল। অনেকে নিদ্রায় এরূপ আচ্ছন্ন হইল যে, শত্রুহস্তে নিহত হইয়াও কিছুই অবগত হইতে সমর্থ হইল না।

অর্জুনকর্তৃক সাময়িক যুদ্ধ বিরতি ও চতুৰ্দ্দশ দিবসের নিশাকালীন যুদ্ধারম্ভ।

হে মহারাজ! মহাবীর অর্জুন তাহাদিগের এইরূপ চেষ্টা অবগত হইয়া উচ্চস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে সেনাগণ! তোমরা বাহনগণের সহিত অন্ধকার ও ধূলিপটলে সমাবৃত এবং নিতান্ত পরিশ্রান্ত ও নিদ্রান্ধ হইয়াছ; অতএব যদি তোমাদিগের মত হয়, তাহা হইলে কিয়ৎক্ষণ সমরে নিবৃত্ত হইয়া এই রণভূমিতেই নিদ্রা যাও। অনন্তর নিশানাথ সমুদিত হইলে তোমরা বিনিদ্র হইয়া স্বর্গলাভের নিমিত্ত পুনরায় পরস্পর সমরে প্রবৃত্ত হইবে। তখন কৌরবপক্ষীয় ধর্মজ্ঞ বীরগণ ধার্মিক ধনঞ্জয়ের সেই বাক্য শ্রবণে তাহাতে সম্মত হইয়া, হে কর্ণ! হে মহারাজ দুর্য্যোধন, পাণ্ডবসেনা যুদ্ধে নিবৃত্ত হইয়াছে; অতএব তোমরাও নিবৃত্ত হও, পরস্পর উচ্চস্বরে বারংবার এই কথা কহিতে লাগিলেন। এইরূপে অর্জুনের বাক্য শ্রবণে সমুদায় কৌরব ও পাণ্ডবসৈন্য সমরে নিবৃত্ত হইল। সমুদায় দেব ও মুনিগণ সন্তুষ্ট হইয়া অর্জুনের বাক্যের প্রশংসা করিতে লাগিলেন। পরিশ্রান্ত সৈনিক পুরুষগণ অর্জুনবাক্যের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিতে আরম্ভ করিল। আপনার সৈন্যগণ বিশ্রামের অবকাশ পাইয়া অর্জুনকে এই বলিয়া প্রশংসা করিতে লাগিল, হে মহাবাহো! তোমাতে বেদ, অস্ত্রসমূহ, বুদ্ধি, পরাক্রম, মঙ্গল ও জীবের প্রতি 'অনুকম্পা বর্তমান রহিয়াছে, অতএব আমরা আশ্বাসিত হইয়া প্রার্থনা করিতেছি, তোমার মঙ্গল হউক। তুমি বাঞ্ছিত ফল লাভ করিয়া পরিতুষ্ট হও। মহারথগণ তাঁহাকে এইরূপ প্রশংসা করিতে করিতে নিদ্রায় আচ্ছন্ন হইয়া তৃষ্ণীভূত হইলেন। কেহ কেহ অশ্বপৃষ্ঠে, কেহ কেহ রথে, কেহ কেহ গজস্কন্ধে, কেহ কেহ ক্ষিতিতলে শয়ন করিলেন। অনেকে বাণ, গদা, খড়া, পরশু, প্রাস ও কবচ ধারণ করিয়াই পৃথক্ পৃথক্ স্থানে নিদ্রিত হইল। নিদ্রান্ধ মাতঙ্গগণ ভূরেণু'-ভূষিত ভুজগ-ভোগসদৃশ শুশুদ্বারা নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত পৃথিবীতল শীতল করিয়া নিশ্বসন্ত পন্নগ-পরিবৃত পর্ব্বতসমুদায়ের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। সুবর্ণ যোক্ত পরিশোভিত অশ্বগণ কেশরালম্বিত যুগকাষ্ঠ ও খুরাগ্রদ্বারা সমরভূমি বিষম করিয়া ফেলিল। এইরূপে সেই সংগ্রামস্থলে অশ্ব, হস্তী ও যোধগণ নিতান্ত শ্রান্ত ও যুদ্ধ বিরত হইয়া নিদ্রিত হইল। তৎকালে বোধ হইতে লাগিল যেন, সুনিপুণ চিত্রকরগণ ঐ সমস্ত বল চিত্রপটে চিত্রিত করিয়াছে। পরস্পরের শরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ কুণ্ডলধারী তরুণবয়স্ক ক্ষত্রিয়গণ গজকুম্ভের উপর শয়ান থাকাতে বোধ হইতে লাগিল যেন, তাঁহারা কামিনীগণের কুচকলস আলিঙ্গন-পূর্ব্বক শয়ান রহিয়াছেন।

হে মহারাজ! অনন্তর নয়নপ্রীতিবন্ধন কামিনীর গণ্ডদেশের ন্যায় পাণ্ডু-বর্ণ ভগবান্ কুমুদনায়ক চন্দ্রমাঃ মাহেন্দ্রী দিক্ অলঙ্কৃত করিলেন। তিনি উদয় পর্ব্বতের সিংহের ন্যায় পূর্ব্ব দিরূপ দরী হইতে বিনিঃসৃত হইয়া তিমিররূপ হস্তি বিনাশ করত সমুদিত হইতে লাগিলেন। তখন সেই হরবৃষ-সমপ্রভ, কন্দর্পচাপসদৃশ, নববধূর হাস্যের ন্যায় মনোহর কুমুদবান্ধব প্রথমতঃ আলোক মাত্র প্রদর্শন করিয়া ক্রমে ক্রমে সুবর্ণবর্ণ রশ্মিজাল প্রকাশ করিতে লাগিলেন। চন্দ্রকিরণপ্রভাদ্বারা তমোরাশি উৎসারিত করিয়া শনৈঃ শনৈঃ দিঘণ্ডল, ভূমণ্ডল ও আকাশমণ্ডলে গমন করিল। তখন মুহূর্ত্তমধ্যে ভূমণ্ডল জ্যোতির্ময় হইল। তিমিররাশি অবিলম্বেই বিনষ্ট হইয়া গেল। নিশাচর জন্তুগণ কেহ কেহ বিচরণে প্রবৃত্ত ও কেহ কেহ ক্ষান্ত হইল। হে মহারাজ। এইরূপে চন্দ্রমাঃ সমুদিত হইলে সৈন্যগণ সূর্য্যাংশুসন্নিভ পদ্মবনের ন্যায় প্রবোধিত হইতে লাগিল এবং তাহারা মহাসাগরের ন্যায় চন্দ্রোদয় দর্শনে উদ্ধৃত হইয়া উঠিল। তখন লোক-বিনাশের নিমিত্ত পরমগতি লাভার্থী বীরপুরুষ-গণের যুদ্ধ আরম্ভ হইল।

দ্রোণাচার্য্যকে দুর্য্যোধনের তিরস্কার।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন দ্রোণ-সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহার হর্ষ ও তেজঃ সঙ্কুক্ষিত' করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে আচার্য্য! দীনমনাঃ শ্রমাপনোদনে প্রবৃত্ত আরাতিগণকে ক্ষমা করা লব্ধলক্ষ্য বীরপুরুষদিগের কর্তব্য নহে। আমরা আপনার প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিবার নিমিত্ত পাণ্ডবগণকে ক্ষমা করিয়াছিলাম, উহারা সেই অবসরে সমুদায় সমরপরিশ্রম অপনোদন করিয়াছে। যাহা হইক, আপনি উহাদিগকে রক্ষা করিতেছেন বলিয়াই বারংবার উহাদিগের অভ্যুদয় লাভ হইতেছে এবং আমরা ক্রমশঃ তেজঃ ও বলবীর্য্য পরিশূন্য হইতেছি। হে ব্রহ্মন্! আপনি ব্রহ্মাস্ত্র ও দিব্যাস্ত্র সমস্ত সম্যক্ অবগত আছেন। আমি সত্যই কহিতেছি, কি পাণ্ডবগণ, কি কৌরবগণ কি অন্যান্য ধনুর্দ্ধরগণ কেহই যুদ্ধকালে আপনার সদৃশ পরাক্রম প্রদর্শন করিতে সমর্থ নহে। আপনি দিব্যাস্ত্রজাল বিস্তার করিয়া দেব, দানব ও গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি সমুদায় লোক উচ্ছিন্ন করিতে পারেন, সন্দেহ নাই। পাণ্ডবগণ আপনার পরাক্রম দর্শনে নিতান্ত ভীত হইয়াছে। কিন্তু তাহারা আপনার শিষ্য এই বলিয়া হউক বা আমার ভাগ্যদোষেই হউক, আপনি তাহাদিগকে উপেক্ষা করিতেছেন।

দ্রোণের পাঞ্চাল-বিনাশের প্রতিজ্ঞা ও অর্জুনের প্রশংসা।

হে মহারাজ! মহাবীর দ্রোণ আপনার আত্মজ দুর্য্যোধন-কর্তৃক এই রূপে তিরস্কৃত হইয়া ক্রোধভরে কহিলেন, হে দুর্য্যোধন। আমি বৃদ্ধ হইয়াও সাধ্যানুসারে যুদ্ধ করিতেছি। আমি অস্ত্রবেত্তা, কিন্তু এই সমস্ত বীর অস্ত্রবিদ্যায় তাদৃশ সুনিপুণ নহে। বিজয়াভিলাষে এই সকলকে সংহার করিতে হইলে আমাকে নিতান্ত ক্ষুদ্রজনের ন্যায় কার্য্যানুষ্ঠান করিতে হইবে। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি যাহা বিবেচনা করিতেছ, তাহা ভালই হউক বা মন্দই হউক, আমি তোমার বাক্যানুসারে তদনুরূপ কার্য্য করিব, সন্দেহ নাই। আমি আয়ুধ স্পর্শ করিয়া শপথ করিতেছি যে, রণস্থলে পরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক পাালগণকে বিনাশ করিয়া কবচ পরিত্যাগ করিব। হে মহারাজ! তুমি মহাবীর ধনঞ্জয়কে পরিশ্রান্ত বিবেচনা করিতেছ; কিন্তু আমি তাহার প্রকৃত বলবীর্য্যের বিষয় কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। অর্জুন রণস্থলে ক্রোধাবিষ্ট হইলে দেবতা, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ বা রাক্ষসগণ তাহার বলবীর্য্য সহ্য করিতে সমর্থ নহেন। ঐ মহাবীর খাণ্ডবদাহ-সময়ে সুররাজ ইন্দ্রের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক তাঁহাকে নিবারণ এবং বলদৃপ্ত যক্ষ, নাগ ও দানবদলকে দলন করিয়াছিল, ইহা কিছুই তোমার অবিদিত নাই। ঐ মহাবীর তোমাদের ঘোষযাত্রাকালে চিত্রসেন প্রভৃতি গন্ধর্বব-গণকে পরাজয় করিয়া তোমাদিগকে তাহাদের হস্ত হইতে বিমুক্ত করিয়াছে। ঐ মহাবীর সুরগণের অজেয় নিবাতকবচ ও হিরণ্য-পুরবাসী সহস্র সহস্র দানবদিগকে পরাজয় করিয়াছে। অতএব সামান্য মনুষ্য কিরূপে সেই মহাবল পরাক্রান্ত ধনঞ্জয়কে পরাজয় করিবে। হে মহারাজ! তোমার সৈন্যসকল আমাদের বহু প্রযত্নে সুরক্ষিত হইলেও ধনঞ্জয় তাহাদিগকে যেরূপ বিনাশ করিতেছে, তুমি তৎসমুদায় অবলোকন করিতেছ।

হে মহারাজ! রাজা দুর্য্যোধন এইরূপে দ্রোণাচার্য্যকে অর্জুনের প্রশংসাবাদে প্রবৃত্ত দেখিয়া ক্রোধভরে পুনরায় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আজি আমি দুঃশাসন, কর্ণ ও মাতুল শকুনি আমরা সৈন্যগণকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া অর্জুনকে বিনাশ করিব। মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণানন্তর হাস্য-মুখে তাহাতে অনুমোদন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে মহারাজ! কোন্ ক্ষত্রিয় স্বীয় তেজঃপ্রভাবে প্রদীপ্ত ক্ষত্রিয়প্রধান অক্ষয় ধনঞ্জয়কে বিনাশ করিতে সমর্থ হইবে? ধনাধিপতি কুবের, দেবরাজ ইন্দ্র, জলেশ্বর বরুণ ও লোকান্তকর কৃতান্ত এবং অসুর, রাক্ষসগণও আয়ুধধারী অর্জুনকে বিনাশ করিতে সমর্থ নহেন। হে বৎস! তুমি অর্জুনকে লক্ষ্য করিয়া যাহা কহিলে মূর্খেরাই ঐরূপ বাক্য প্রয়োগ করিয়া থাকে। মহাবীর অর্জুনের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইয়া নির্বিঘ্নে গৃহে প্রস্থান করা কাহারও সাধ্য নহে। হে রাজন! তুমি অতিশয় নিষ্ঠুর ও পাপস্বভাব। যাহারা তোমার শ্রেয়স্কর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছে, সন্দিহান হইয়া তাহাদিগকেই তিরস্কার করিতেছ। যাহা হউক, তুমি সৎকুল-সম্ভূত ক্ষত্রিয় এবং সমরপ্রার্থী; অতএব এক্ষণে স্বীয় কার্য্য সংসাধনার্থ অর্জুনের সমীপে গমনপূর্ব্বক তাহাকে নিবারণ কর। তুমিই এই শত্রুতার মূল কারণ; অতএব এক্ষণে অর্জুন-সন্নিধানে গমন করিয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। তুমি কি নিমিত্ত বিনা অপরাধে এই সমস্ত ক্ষত্রিয়দিগকে বিনাশ করিতেছ? হে গান্ধারীনন্দন! তোমার এই মাতুল শকুনি অক্ষক্রীড়ায় সুনিপুণ, প্রতারণাপরতন্ত্র ও কুটিলহৃদয়, এক্ষণে ইনি ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে অর্জুনের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হউন। আমার বোধ হয়, এই মহাবীরই পাণ্ডবগণকে বিনাশ করিবেন। তুমি কর্ণ-সমভিব্যাহারে মোহাবিষ্ট, শূন্যহৃদয়, শুশ্রূষাপরবশ, রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সমক্ষে হৃষ্টান্তঃকরণে বারংবার গর্ব্ব প্রকাশপূর্ব্বক কহিয়াছ যে, হে মহারাজ! আমি, কর্ণ ও ভ্রাতা দুঃশাসন আমরা সমবেত হইয়া পাণ্ডবগণকে সংহার করিব। আমি প্রতি সভায় তোমার মুখে এইরূপ কথা শ্রবণ করিয়াছি। এক্ষণে তুমি প্রতিজ্ঞানুরূপ কর্মানুষ্ঠান করিয়া কর্ণাদির সহিত সত্যবাদী হও। ঐ দেখ, নিতান্ত দুর্বিষহ শত্রু মহাবীর অর্জুন তোমার সম্মুখে অবস্থান করিতেছে। এক্ষণে তুমি ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া উহার অভিমুখীন হও। অর্জুনের হস্তে মৃত্যুও তোমার শ্লাঘনীয়। হে বৎস! তুমি অভিলষিত ঐশ্বর্য্য লাভ, দান ও ভোজন করিয়াছ এবং কৃতকার্য্য ও ঋণশূন্যও হইয়াছ; অতএব এক্ষণে নিঃশঙ্কমনে অর্জুনের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও।

হে মহারাজ! মহাবীর দ্রোণ রাজা দুর্য্যোধনকে এই কথা বলিয়া সমরে প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর কৌরবসৈন্যসকল দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া একভাগ দ্রোণকে ও অপর ভাগ দুর্য্যোধনাদিকে আশ্রয়পূর্ব্বক ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিল।

দ্রোণের সহিত বিরাট ও দ্রুপদের যুদ্ধ।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ত্রিযামার' একভাগ মাত্র অবশিষ্ট রহিয়াছে, এমন সময়ে কৌরব ও পাণ্ডবগণ পুনরায় হৃষ্টচিত্তে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সূর্য্যসারথি অরুণ শশধরকে ক্ষীণকান্তি ও নভোমণ্ডল তাম্রবর্ণ করিয়া গগনে সমুদিত হইলেন। সূর্য্যমণ্ডল অরুণকিরণে অরুণিত হইয়া তপ্তকাঞ্চন নির্মিত চক্রের ন্যায় পূর্ব্বদিকে বিরাজিত হইতে লাগিল। তখন কৌরব ও পাণ্ডবপক্ষীয় যোধগণ সকলে রথ, অশ্ব ও নরযানসকল পরিত্যাগপূর্ব্বক দিবাকরের অভিমুখীন হইয়া সন্ধ্যোপাসনার জন্য করপুটে দণ্ডায়মান হইলেন।

হে মহারাজ! অনন্তর কৌরবসৈন্যসকল দ্বিধা বিভক্ত হইলে দ্রোণাচার্য্য রাজা দুর্য্যোধনকে পুরোবর্তী করিয়া সোমক, পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। বাসুদেব তদ্দর্শনে অর্জুনকে কহিলেন, হে সব্যসাচিন্! তুমি কৌরবগণকে বামভাগে ও দ্রোণকে দক্ষিণভাগে রাখিয়া সমরে প্রবৃত্ত হও। মহাবীর ধনঞ্জয় বাসুদেবের নির্দেশানুসারে দ্রোণ ও কর্ণের বামভাগে অবস্থান করিলেন। ঐ সময়ে অরাতিনিপাতন ভীমসেন হৃষীকেশের অভিপ্রায় অবগত হইয়া সমরাঙ্গনের মধ্যবর্তী অর্জুনকে কহিলেন, হে ভ্রাতঃ! আমার বাক্য শ্রবণ কর, ক্ষত্রিয়-কামিনীরা যে কার্য্যসাধনের নিমিত্ত পুত্র প্রসব করে, এক্ষণে সেই কাৰ্য্যসাধনের সময় উপস্থিত হইয়াছে। অতএব যদি তুমি এ সময় আপনার বলবীর্য্যানুরূপ কার্য্যানুষ্ঠান না কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তোমার নিতান্ত নৃশংসের কার্য্য করা হইবে। এক্ষণে তুমি দ্রোণসৈন্যগণকে দক্ষিণভাগে রাখিয়া শত্রুসংহারপূর্ব্বক সত্য, শ্রী, ধৰ্ম্ম ও যশের আনৃণ্য লাভ কর।

হে মহারাজ! মহাবীর অর্জুন কেশব ও ভীমসেনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া দ্রোণ ও কর্ণকে অতিক্রমপূর্ব্বক চারি দিকে অরাতি-সৈন্য বিদারণ করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় ক্ষত্রিয়গণ সেই বর্দ্ধমান অনলসদৃশ ক্ষত্রদাহন মহাবল পরাক্রান্ত অর্জুনকে আক্রমণ করিয়া নিবারণ করিতে পারিলেন না। তখন দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনি শরনিকরদ্বারা ধনঞ্জয়কে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। সুবিখ্যাত অস্ত্রবেত্তা জিতেন্দ্রিয় অর্জুন হস্ত-লাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক শরবর্ষণ করিয়া তাঁহাদিগের সমুদায় অস্ত্র নিবারণপূর্ব্বক সকলকে দশ দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। ঐ সময় ধূলিপটল সমুদ্ধৃত চতুৰ্দ্দিক্ হইতে শরজাল সমাগত, ঘোরতর অন্ধকার আবির্ভূত ও ভীষণ শব্দ সমুত্থিত হইতে লাগিল। তখন কি ভূমণ্ডল, কি দিক্সণ্ডল কি আকাশমণ্ডল কিছুই বোধগম্য হইল না। ধূলিপটলপ্রভাবে সকলেই অন্ধপ্রায় হইল। আমাদের উভয় পক্ষীয় যোধগণ পরস্পর কেহ কাহাকে অবগত হইতে সমর্থ হইল না। তখন ভূপালগণ কেবল স্ব স্ব নাম গ্রহণ করিয়া যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। রথবিহীন রথিগণ মিলিত হইয়া পরস্পরের কেশ, কবচ ও ভুজে সংলগ্ন হইতে লাগিলেন। অশ্ব সারথিবজ্জিত নিশ্চেষ্ট রথিগণ ভয়াদিত হইয়া কেবল জীবন বৃক্ষা করত সংগ্রামে সমবস্থিত হইলেন। অশ্ব ও অশ্বারোহিগণ গতজীবিত হইয়া পৰ্ব্বতাকার নিহত গজসমূহকে আলিঙ্গন করিয়া রহিল।

অনন্তর মহাবীর দ্রোণাচার্য্য রণক্ষেত্রের মধ্যস্থল হইতে উত্তরদিকে গমনপূর্ব্বক প্রজ্বলিত বিধূম পাবকের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবসেনাগণ তেজঃপ্রজ্বলিত দ্রোণাচার্য্যকে সংগ্রামক্ষেত্রের মধ্যস্থল হইতে একান্তে গমন করিতে দেখিয়া ভীত, কম্পিত ও বিচলিত হইয়া উঠিল। দানবগণ যেমন বাসবকে পরাজিত করিতে সাহসী হয় না, তদ্রূপ তাহারা সেই অরাতিনিপাতন মদমত্ত মাতঙ্গসদৃশ দ্রোণকে পরাভূত করিব, বলিয়া কোনক্রমেই সাহস করিতে পারিল না। তখন কেহ কেহ নিরুৎসাহ, কেহ কেহ কোপাবিষ্ট ও কেহ কেহ বা বিস্ময়াপন্ন হইল। ভূপালগণের মধ্যে কেহ কেহ করদ্বারা করাগ্রনিষ্পেষণ, কেহ কেহ ক্রোধভরে ওষ্ঠ দংশন, কেহ কেহ আয়ুধ নিক্ষেপ ও কেহ কেহ বা ভুজমর্দ্দন করিতে লাগিলেন। তখন অনেক অসাধারণ তেজঃসম্পন্ন বীরপুরুষ দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইলেন। ঐ সময় পাঞ্চালগণ দ্রোণবাণে নিতান্ত নিপীড়িত ও বেদনায় একান্ত অভিভূত হইয়া দ্রুপদরাজকে আশ্রয় করিল।

তখন মহারাজ দ্রুপদ ও বিরাট সেই সমরচারী দুর্জর দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তদ্দর্শনে দ্রুপদের তিন পৌত্র ও চেদিগণ দ্রোণের অভিমুখে আগমন করিলেন। মহাবীর দ্রোণ তিন নিশিত শরে সেই দ্রুপদ পৌত্রত্রয়ের প্রাণ সংহার করিলে, তাঁহারা ভূতলে নিপতিত হইলেন। তৎপরে মহারথ দ্রোণাচার্য্য যুদ্ধে চেদি, কৈকেয়, সৃঞ্জয় ও মৎস্যগণকে পরাজিত করিলেন। দ্রুপদ ও বিরাটরাজ তদ্দর্শনে ক্রোধভরে দ্রোণের উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। ক্ষত্রিয়মৰ্দ্দন দ্রোণ অনায়াসে তাঁহাদের বাণবর্ষণ নিরাকৃত করিয়া তাঁহাদিগকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। দ্রুপদ ও বিরাট ভূপতি দ্রোণশরে সমাচ্ছন্ন হইয়া ক্রোধভরে তাঁহাকে শরজালে বিদ্ধ করিতে লাগলেন। তখন মহাবীর দ্রোণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সুতীক্ষ্ণ ভল্লদ্বারা বিরাট ও দ্রুপদের কার্ম্মকদ্বয় খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত বিরাট তদ্দর্শনে নিতান্ত ক্রোধপরবশ হইয়া দ্রোণের ব্যসাধনার্থ দশ তোমর ও দশ শর নিক্ষেপ করিলেন।

রণবিশারদ দ্রুপদও ক্রোধভরে দ্রোণের রথাভিমুখে এক সুবর্ণখচিত ভুজগেন্দ্রোপম ভীষণ লৌহময় শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর দ্রোণ সুতীক্ষ্ণ ভল্ল প্রয়োগপূর্ব্বক সেই বিরাট নিক্ষিপ্ত দশ তোমর ও নিশিত সায়কদ্বারা দ্রুপদের সেই শক্তি ছেদন করিয়া সুশাণিত ভল্লদ্বারা বিরাট ও দ্রুপদকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিলেন।

ভীমের ক্রোধ।

মনস্বী ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের অস্ত্রবলে বিরাট, দ্রুপদ ও দ্রুপদের তিন পৌত্র এবং কৈকেয়, চেদি, মৎস্য ও পাঞ্চালগণকে নিহত দেখিয়া ক্রোধ ও দুঃখভরে মহারথগণের মধ্যে শপথ করিয়া কহিলেন যে, অদ্য দ্রোণ যদি আমার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ বা আমাকে পরাভব করেন, তাহা হইলে যেন আমার ইষ্টাপূর্ত্ত বিনষ্ট এবং আমি ব্রহ্ম-তেজঃ ও ক্ষত্রিয়-তেজঃ হইতে পরিভ্রষ্ট হই। হে মহারাজ! মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন এইরূপ শপথ করিয়া সৈন্যগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন একদিকে পাঞ্চালগণ ও অন্যদিকে অর্জুন অবস্থানপূর্ব্বক দ্রোণকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। মহারাজ দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনি এবং দুর্য্যোধনের ভ্রাতৃগণ তদ্দর্শনে দ্রোণাচার্য্যকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। এইরূপে দ্রোণাচার্য্য সেই সমস্ত মহাত্মাদিগের প্রযত্নে সুরক্ষিত হইলে পাঞ্চালগণ তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতেও সমর্থ হইল না। তখন ভীমসেন ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে অতি কঠোর বাক্য প্রয়োগপূর্ব্বক কহিলেন, হে ক্ষত্রিয়সত্তম! কোন্ ব্যক্তি ক্ষত্রিয়াভিমানী ও দ্রুপদের কুলে উৎপন্ন হইয়া সম্মুখস্থ শত্রুকে উপেক্ষা করিয়া থাকে। কোন্ পুরুষ পিতৃবধ ও পুত্রবধ সহ্য এবং ভূপালগণ-সমক্ষে শপথ করিয়া শত্রুর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে? ঐ দেখ, মহাবীর দ্রোণ স্বীয় তেজঃপ্রভাবে প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় অবস্থান-পূর্ব্বক ক্ষত্রিয়গণকে দগ্ধ করিতেছেন। উনি কিয়ৎক্ষণ মধ্যেই সমগ্র পাণ্ডবসৈন্য বিনষ্ট করিবেন। অতএব আমি সংগ্রামার্থ দ্রোণ-সন্নিধানে চলিলাম। তোমরা এই স্থানে অবস্থান করিয়া আমার অদ্ভুত কার্য্য নিরীক্ষণ কর।

মহাবীর বৃকোদর এই বলিয়া ক্রোধভরে দ্রোণসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়া আকর্ণ পূর্ণ শরনিকরদ্বারা তাঁহাদিগকে বিদ্রাবিত করিতে লাগিলেন। মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া দ্রোণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন উভয় পক্ষে গুরুতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। হে মহারাজ! সেই সূর্যোদয়কালে যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, আমরা কদাচ তদ্রূপ যুদ্ধ দর্শন বা শ্রবণ করি নাই। ঐ সময় সৈন্যসকল অতিশয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। রথসমূহ পরস্পর সংশ্লিষ্ট হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল। প্রাণিগণ নিহত ও ইতস্ততঃ বিশীর্ণ হইল। কোন কোন ব্যক্তি একস্থান হইতে অন্যত্র গমন করত বিপক্ষগণকর্তৃক বিদ্রাবিত হইতে লাগিল। যাহারা সমরে পরাম্মুখ হইয়া প্রস্থান করিতেছিল, অরাতিগণ কেহ কেহ তাহাদের পৃষ্ঠভাগে ও কেহ কেহ বা পার্শ্বদেশে প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। এইরূপে অতি নিদারুণ সংগ্রাম আরম্ভ হইলে ক্ষণকালমধ্যে ভগবান্ মরীচিমালী সমুদিত হইলেন।

উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধে বহু সৈন্য নিধন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! বর্ম্মধারী বীরগণ সমরা-ঙ্গনেই নবোদিত দিবাকরের উপাসনা করিলেন। অনন্তর তপ্ত-কাঞ্চন ভাস্কর সমুদিত হওয়াতে সমুদায় জগৎ প্রকাশিত হইলে পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হইল। সূর্যোদয়ের পূর্ব্বে যে যে সৈন্যগণ যাহাদিগের সহিত সংগ্রামে মিলিত হইয়াছিল, এক্ষণে তাহারা সকলেই পুনরায় সেই সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। অশ্বারোহিগণ রথীদিগের সহিত, গজারোহিগণ অশ্বরোহীদিগের সহিত, পদাতিগণ হস্ত্যারোহীদিগের সহিত, অশ্বগণ অশ্বগণের সহিত, পদাতিগণ পদাতিগণের সহিত, রথিগণ রথীদিগের সহিত এবং মাতঙ্গগণ মাতঙ্গদিগের সহিত মিলিত হইয়া সংগ্রাম করিতে লাগিল। হে মহারাজ! যোধগণ রজনীযোগে বহু যত্ন-সহকারে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাঁহাদিগের মধ্যে অনেকেই আতপতাপে উত্তপ্ত ও ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত কাতর হইয়া অচেতনপ্রায় হইলেন। শঙ্খনাদ, ভেরীনিস্বন, মৃদঙ্গধ্বনি, বৃংহিত-শব্দ, ধনুষ্টঙ্কার, ধাবমান পদাতিগণের চীৎকার, নিপতিত অস্ত্রসমুদায়ের নিম্বন, অশ্বের হ্রেষারব ও রথসমুদায়ের ঘর্ঘর নির্ঘোষে মহা তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইয়া আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিল। ঐ সময় বিবিধ অস্ত্রাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত কলেবর রণনিপতিত বিচেষ্টমান হস্তী, অশ্ব, রথী ও পদাতিগণের আর্তনাদ শ্রুতিগোচর হইল। তখন সৈন্যগণ শত্রুপক্ষীয় ব্যক্তিদিগকে সংহার করিতে প্রবৃত্ত হইয়া আত্মপক্ষীয়গণকেও বিনাশ করিতে লাগিল। বীরগণনিক্ষিপ্ত তরবারিসকল নিজ্যমান' বসনরাশির ন্যায়' নিরীক্ষিত ও সেই খড়াসমুদায়ের শব্দ নিজ্যমান বসন শব্দের ন্যায় শ্রুত হইল। অনন্তর বীরগণ খড়া, তোমর ও পরশু নিক্ষেপপূর্ব্বক ভীষণ যুদ্ধ উপস্থিত করিলে সমরস্থলে গজ, অশ্ব ও নরদেহসম্ভূত শোণিতদ্বারা এক অতি ভীষণ নদী প্রবাহিত হইল। শস্ত্রসমুদায় উহার মৎস্য, মাংস কৰ্দ্দম, পতাকা ও বস্ত্রসমুদায় ফেন এবং সৈন্যগণের আর্তনাদ উহার শব্দস্বরূপ শোভা পাইতে লাগিল। অশ্ব ও গজসমুদায় রজনীতে শর ও শক্তিদ্বারা নিতান্ত নিপীড়িত হইয়াছিল, সুতরাং এক্ষণে স্তব্ধভাবে অবস্থান করিতে লাগিল। শুষ্কবদন বীরগণ চারুকুণ্ডলমণ্ডিত মস্তক ও বিবিধ যুদ্ধোপকরণদ্বারা অসাধারণ শোভা ধারণ করিলেন। ঐ সময় ক্রব্যাদ্গণ এবং মৃত ও অর্দ্ধমৃত সৈন্য-সমুদায়দ্বারা রথসঞ্চালনের পথরোধ হইল। বারণসদৃশ বলবান্ সৎকুলসম্ভূত বাজিগণ নিতান্ত শ্রান্ত হইয়াছিল, সুতরাং রথচক্র নিমগ্ন হইলে কম্পিত-কলেবরে বলপূর্ব্বক অতি কষ্টে রথ আকর্ষণ করিতে লাগিল।

হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর দ্রোণ ও অর্জুন ভিন্ন আর সকলেই ভয়ে নিতান্ত অভিভূত হইয়াছিল। ঐ বীরদ্বয়ই তৎকালে স্ব স্ব পক্ষের আশ্রয় ও ভয়ত্রাতা হইয়াছিলেন। উহাদের প্রভাবে উভয় পক্ষীয় অনেক বীর শমনসদনে গমন করিলেন। কৌরবসৈন্যসমুদায় নিতান্ত ভীত হইল। পাঞ্চালসৈন্যরা কোন স্থানে রহিয়াছে তাহা কিছুমাত্র স্থির হইল না। সেই ভীরুজনের ভয়বর্দ্ধন শ্মশানভূমিসদৃশ সমরাঙ্গনে ক্ষত্রিগণের ক্ষয়কালে ধূলি-পটল সমুত্থিত হইলে কি কর্ণ, কি দ্রোণ, কি অর্জুন, কি যুধিষ্ঠির, কি ভীমসেন, কি নকুল, কি সহদেব, কি ধৃষ্টদ্যুম্ন, কি সাত্যকি, কি দুঃশাসন, কি অশ্বত্থামা, কি দুর্য্যোধন, কি শকুনি, কি কূপ, কি মদ্ররাজ, কি কৃতবর্মা, কি অন্যান্য যোধগণ কাহাকেও লক্ষিত হইল না। তৎকালে ভূমণ্ডল ও দিঘণ্ডল দৃষ্ট হওয়া দূরে থাকুক, আত্মদেহ পর্য্যন্ত অদৃশ্য হইয়া গেল। সকলেই ধূলিপটলে সংবৃত হইল। তখন বোধ হইতে লাগিল, যেন পুনরায় নিশা উপস্থিত হইয়াছে। ঐ সময়ে কে কৌরব, কে পাঞ্চাল, কে পাণ্ডব, কিছুই অবধারিত হইল না। ভূমণ্ডল, দিত্মণ্ডল ও আকাশমণ্ডল এবং সম ও বিষম প্রদেশ এককালে অদৃশ্য হইল। বিজয়প্রার্থী নরগণ কি স্বকীয়, কি পরকীয়, যাহাকে প্রাপ্ত হইল, তাহাকেই নিপাতিত করিতে লাগিল। ক্রমে প্রবল বায়ুবেগ ও শোণিত-নিষেক দ্বারা রজোরাশি প্রশমিত হইল। তখন হস্তী, অশ্ব, রথ, রথী ও পদাতিগণ রুধিরোক্ষিত হইয়া পারিজাত বনাবলীর ন্যায় বিরাজিত হইতে লাগিল। ঐ সময় মহাবীর দুর্য্যোধন ও দুঃশাসন, নকুল ও সহদেবের সহিত এবং কর্ণ বৃকোদরের সহিত ও অর্জুন ভারদ্বাজের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। সমুদায় যোধগণ তাঁহাদের সেই আশ্চর্য্য সংগ্রাম অবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা রথের বিচিত্র গতি প্রদর্শনপূর্ব্বক যুদ্ধ করত পরস্পরের পরাজয়-বাসনায় পরস্পরকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া বর্ষাকালীন জলধরের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন।। তাঁহারা সূর্য্যসঙ্কাশ রথে সমারূঢ় হওয়াতে তাঁহাদিগকে শারদ জীমূতের' ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। তখন কোপপূর্ণ মহাধনুর্দ্ধর অন্যান্য যোধগণও পরম যত্নসহকারে স্পর্দ্ধা করত মত্ত মাতঙ্গসমুদায়ের ন্যায় পরস্পরের অভিমুখীন হইতে লাগিলেন। তৎকালে বোধ হইল যে, কেহ কাহার দেহ ভেদ করিতেছেন না, মহারথগণ স্বয়ং নিহত ও নিপতিত হইতেছেন। ঐ সময় যোধগণের ছিন্ন চরণ, বাহু, কুণ্ডলমণ্ডিত মস্তক, কাৰ্ম্মক, বিশিখ, প্রাস, খড়া, পরশু, পট্টিশ, নালীক, ক্ষুর, নারাচ, নখর, শক্তি, তোমর, অন্যান্য বিবিধাকার নিশিত অস্ত্রজাল, বিচিত্র বৰ্ম্ম, নিহত অশ্ব, হস্তী ও বীরগণ, যোধশূন্য ধ্বজবিহীন নগরাকার সহসমুদায়, আরোহীবিহীন শঙ্কিতচিত্তে বায়ুবেগে ধাবমান অশ্বগণ, অলঙ্কৃত নিহত বীরগণ এবং রাশি রাশি ব্যজন, ধ্বজ, ছত্র, আভরণ, বস্ত্র, সুগন্ধি মাল্য, হার, কিরীট, মুকুট, উষ্ণীষ, কিঙ্কিণজাল, বক্ষঃস্থলার্পিত মণি, নিষ্ক ও চূড়ামণিদ্বারা সংগ্রামস্থল নক্ষত্রকুলবিভূষিত নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল।

অনন্তর অমর্ষিত' নকুলের সহিত ক্রোধোন্মত্ত দুর্য্যোধনের ঘোর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। মাদ্রীপুত্র দুর্য্যোধনকে অসংখ্য শরে সমাচ্ছন্ন করত হৃষ্টচিত্তে তাঁহাকে দক্ষিণপার্শ্বস্থ করিলেন। ঐ সময় তুমুল কোলাহল সমুত্থিত হইল। রাজা দুর্য্যোধন নকুলের দক্ষিণপার্শ্বে থাকিয়াই তাঁহার প্রতীকার চেষ্টা করিতে লাগিলেন; তখন বিচিত্রযুদ্ধমার্গাভিজ্ঞ' তেজস্বী নকুল দক্ষিণপার্শ্বস্থ প্রতিচিকীর্ষু দুর্য্যোধনকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। দুর্য্যোধনও তদ্দর্শনে ক্রোধভরে নকুলকে নিবারণ করিয়া শরজালে পীড়িত ও সমরে পরাজুখ করিলেন। কৌরবসৈন্যগণ তদ্দর্শনে তাঁহাকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিল। তখন মহাবীর নকুল আপনার কুপরামর্শজনিত বহু দুঃখ স্মরণপূর্ব্বক দুর্য্যোধনকে থাক্ থাক্, বলিয়া তর্জন করিতে আরম্ভ করিলেন।

দুঃশাসনের সহিত সহদেবের ও ভীমের সহিত কর্ণের মহারণ।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে মহাবীর দুঃশাসন রোষাবিষ্ট হইয়া রথবেগে ভূমণ্ডল বিকম্পিত করত সহদেবের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর সহদেব তাঁহাকে আগমন করিতে দেখিয়া ভল্লাস্ত্রদ্বারা তাঁহার সারথির শিরস্ত্রাণ সমলঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তিনি এত শীঘ্র উহার শিরশ্ছেদন করিলেন যে, দুঃশাসন ও অন্যান্য সৈনিক পুরুষেরা উহার কিছুমাত্র অবগত হইতে পারিলেন না। তখন দুঃশাসনের অশ্বগণ যন্ত্রি বিহীন হইয়া স্বেচ্ছানুসারে ইতস্ততঃ গমন করিতে লাগিল। মহাবীর দুঃশাসন তদ্দর্শনে সারথি নিহত হইয়াছে অবগত হইয়া স্বয়ং নির্ভয়ে অশ্বরশ্মি গ্রহণ ও লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন কি বিপক্ষ, কি স্বপক্ষ, সকলেই তাঁহার সেই অদ্ভুত কার্য্য অবলোকন করিয়া ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিল। মহাবীর সহদেব তদ্দর্শনে ক্রোধভরে দুঃশাসনের অশ্বগণের উপর সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। অশ্বগণ মাদ্রীতনয়ের শরজালে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া অবিলম্বে ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। তখন দুঃশাসন একবার অশ্বরশ্মি গ্রহণ ও শরাসন পরিত্যাগ এবং একবার কার্ম্মক গ্রহণ ও অশ্বরশ্মি পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। মহাবীর সহদেব এই সুযোগে তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন।

অনন্তর মহাবীর কর্ণ দুঃশাসনের সাহায্যার্থ তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাবল পরাক্রান্ত বৃকোদর তদ্দর্শনে পরম যত্নসহকারে আকর্ণপূর্ণ তিন ভল্লে কর্ণের বাহু ও বক্ষঃস্থল আহত করিলেন। তখন সূতপুত্র দণ্ডঘটিত ভুজঙ্গের ন্যায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া নিশিত শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক ভীমসেনকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে কর্ণ ও ভীমসেনের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। তাঁহারা নেত্র বিঘূর্ণন-পূর্ব্বক বৃষভদ্বয়ের ন্যায় ঘোরতর নিনাদ পরিত্যাগ করত ক্রোধভরে মহাবেগে পরস্পরকে শরবিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তৎকালে ঐ দুই মহাবীর পরস্পর অতিশয় সন্নিকৃষ্ট ছিলেন; সুতরাং শরপ্রয়োগ-বিষয়ে নিতান্ত অসুবিধা উপস্থিত হওয়াতে তাঁহারা তৎক্ষণাৎ গদাযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর ভীম গদাঘাতে কর্ণের রথকূবর চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। তখন মহারথ কর্ণ ভীমের রথাভিমুখে গদা নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার গদা চূর্ণ করিলেন। অনন্তর ভীমসেন পুনরায় কর্ণের প্রতি এক গুর্ব্বী গদা নিক্ষেপ করিলে মহাবীর কর্ণ মহাবেগসম্পন্ন সুপুঙ্খ বহুসংখ্যক সায়কদ্বারা উহা বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন সেই ভীমনিক্ষিপ্ত ভীষণ গদা কর্ণের শর প্রভাবে মন্ত্রাভিহত ভুজঙ্গীর ন্যায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া ভীমসেনের বিপুল ধ্বজ নিপাতিত ও সারথিকে বিমোহিত করিল। পরে বিপুলবিক্রম ভীমসেন ক্রোধমূর্ছিত হইয়া কর্ণের প্রতি আট বাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক অম্লান মুখে তাঁহার শরাসন, তৃণীর ও ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কর্ণও সত্বর অন্য এক সুবর্ণপৃষ্ঠ দুরাসদ শরাসন ধারণপূর্ব্বক শরনিকর-দ্বারা বৃকোদরের অশ্বসমুদায়, পার্ফি ও সারথিদ্বয়কে সংহার করিলেন। তখন অরাতিনিসূদন ভীমসেন স্বীয় রথ পরিত্যাগ-পূর্ব্বক সিংহ যেমন পর্ব্বতশৃঙ্গে অরোহণ করে, তদ্রূপ নকুলের রথে সমারূঢ় হইলেন।

দ্রোণার্জুনের যুদ্ধ ও দেবগণের সমর দর্শন।

হে মহারাজ! ঐ সময় মহারথ দ্রোণাচার্য্য ও তাঁহার শিষ্য অর্জুন উভয়ে লঘুসন্ধান ও রথের বিচিত্র গতিদ্বারা মানবগণের নয়ন ও মনঃ বিমোহিত করত বিচিত্র যুদ্ধ করিতে আরম্ভকরিলেন। অন্যান্য যোধগণ সেই গুরু-শিষ্যের অদ্ভুত সংগ্রাম অবলোকনে সমরে নিবৃত্ত হইয়া কম্পিত হইতে লাগিল। তখন সেই বীরদ্বয় রথের বিচিত্র গতি প্রদর্শনপূর্ব্বক পরস্পরকে দক্ষিণপার্শ্বস্থ করিতে চেষ্টা করিলেন। যোধগণ তাঁহাদিগের অসামান্য পরাক্রম দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইল। হে মহারাজ! গগনমার্গে আমিষলোলুপ শ্যেনদ্বয়ের যেরূপ যুদ্ধ হইয়া থাকে; দ্রোণ ও অর্জুনের সেইরূপ তুমুল সংগ্রাম হইতে লাগিল। দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে পরাজিত করিবার নিমিত্ত যে যে কৌশল করিলেন, মহাবীর ধনঞ্জয় স্বীয় কৌশলপ্রভাবে তৎসমুদায় নিবারণ করিতে লাগিলেন। এইরূপ অস্ত্রকোবিদ আচার্য্য অর্জুনকে কৌশলক্রমে পরাজিত করিতে অসমর্থ হইয়া অবশেষে ঐন্দ্র, পাশুপত, ত্বাষ্ট্র, বায়ব্য ও বরুণ অস্ত্র আবিষ্কৃত করিলেন। মহাবীর অর্জুনও ঐ সমুদায় অস্ত্রকে দ্রোণের শরাসন বিমুক্ত হইবামাত্র ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে মহাবীর অর্জুন অস্ত্রদ্বারা আচার্য্যের অস্ত্রজাল ছেদন করিলে মহাবীর দ্রোণ দিব্যাস্ত্রদ্বারা তাঁহাকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। অর্জুনও অনায়াসে তৎসমুদায় নিরাকৃত করিলেন। ফলতঃ দ্রোণাচার্য্য জিগীষু হইয়া ধনঞ্জয়ের প্রতি যে যে অস্ত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন, অর্জুনশর প্রভাবে তৎসমুদায়ই ব্যর্থ হইয়া গেল। এইরূপে পার্থশরে দিব্যাস্ত্রসমুদায়ও ধ্বংস প্রাপ্ত হইলে মহাবীর দ্রোণাচার্য্য মনে মনে অর্জুনের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং অর্জুন তাঁহার শিষ্য এই নিমিত্ত তিনি আপনাকে ভূমণ্ডলস্থ সমুদায় অস্ত্রবেত্তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিলেন। তিনি ধনঞ্জয়কর্তৃক নিবারিত হইয়া আনন্দ ও গর্ব্ব প্রকাশপূর্ব্বক পরম প্রীতিসহকারে তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় নভোমণ্ডল সহস্র সহস্র দেব, ঋষি, গন্ধর্ব্ব ও সিদ্ধ, অপ্সরাঃ যক্ষ ও রাক্ষসগণে সমাকীর্ণ হওয়াতে বোধ হইল যেন, উহা পুনরায় ঘনঘটায় আচ্ছন্ন হইয়াছে। তখন মহাত্মা অর্জুন ও দ্রোণের স্তুতি সংযুক্ত দৈববাণী বারংবার শ্রুতিগোচর হইতে লাগিল। পরিত্যক্ত শরজালপ্রভাবে দশদিক্ আলোকময় হইলে সিদ্ধ ও মুনিগণ সমরক্ষেত্রে সমাগত হইয়া কহিতে লাগিলেন, ইহা মানুষ, অসুর, রাক্ষস, দৈব বা গান্ধর্ব্ব যুদ্ধ নহে; ইহা ব্রাহ্মযুদ্ধ, তাহাতে সন্দেহ নাই। কখন দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডবকে, কখন পাণ্ডবও দ্রোণকে অতিক্রম করিতেছেন; ইহাদের দুই জনের মধ্যে কাহারও বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হয় না। এইরূপ বিচিত্র যুদ্ধ আর কখন আমাদের দৃষ্টিগোচর বা শ্রুতিগোচর হয় নাই। যদি সাক্ষাৎ রুদ্র আপনার দেহ দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া আপনি আপনার সহিত যুদ্ধ করেন, তাহা হইলেই এই যুদ্ধের উপমাস্থল হইতে পারে; নচেৎ ইহার উপমা নাই। দ্রোণাচার্য্য জ্ঞান ও শৌর্য্যে অদ্বিতীয়; অর্জুনও উপায় ও বলে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। বিপক্ষগণ ইঁহাদিগকে কদাচ সংগ্রামে বিনষ্ট করিতে সমর্থ হয় না। ইহারা ইচ্ছা করিলে দেবগণের সহিত সমুদায় জগৎকে বিন্যস্ত করিতে পারেন। হে মহারাজ! অন্তর্হিত' ও প্রকাশিত প্রাণিগণ এইরূপে সেই বীরদ্বয়ের বিক্রম দর্শনে তাঁহাদিগকে। প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

অনন্তর মহামতি দ্রোণাচার্য্য সমরে মহাবীর অর্জুন ও অন্তর্হিত প্রাণিগণকে সন্তপ্ত করত ব্রাহ্ম-অস্ত্র আবিষ্কৃত করিলেন। তখন পৰ্ব্বতপাদপ-সংবলিত সমুদায় ভূমণ্ডল বিচলিত, বিষম সমীরণ প্রবাহিত, সাগরসকল সংক্ষুব্ধ এবং উভয় পক্ষীয় সেনা ও অন্যান্য জীবগণ নিতান্ত ভীত হইতে লাগিল কিন্তু মহাবীর অর্জুন অসম্ভ্রান্তচিত্তে ব্রাহ্ম-অস্ত্রদ্বারা দ্রোণের ব্রাহ্মাস্ত্র নিরাকৃত করিয়া সমুদায়কে প্রশান্ত করিলেন। এইরূপে সেই বীরদ্বয় কেহ কাহাকে পরাভব করিতে সমর্থ না হইলে পরিশেষে সঙ্কুল যুদ্ধ সমুপস্থিত হইল। তখন আর কোন বিষয়ই অবগত হইতে পারিলাম না। আকাশমণ্ডল শরজালে সমাচ্ছন্ন হওয়াতে খেচরগণের গতিরোধ হইল।

উভয় পক্ষীয় মহাসংগ্রাম।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে ঐ সময়ে অসংখ্য নর, অশ্ব ও গজ নিহত হইতে আরম্ভ হইলে মহাবীর দুঃশাসন ধৃষ্টদ্যুম্নের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন সুবর্ণ রথারূঢ় ধৃষ্টদ্যুম্ন দুঃশাসনের শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া ক্রোধভরে তাঁহার অশ্বগণের উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন ক্ষণকালমধ্যে দুঃশাসনের কি রথ, কি ধ্বজ, কি সারথি সকলই অদৃশ্য হইল। মহাবীর দুঃশাসন মহাত্মা পাঞ্চালনন্দনের শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া তাঁহার সম্মুখে অবস্থান করিতে সমর্থ হইলেন না।

এইরূপে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দুঃশাসনকে পরাজুখ করিয়া অসংখ্য শরনিক্ষেপ করত দ্রোণাচার্য্যের অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। কৃতবর্মা ও তাঁহার তিন সহোদর তদ্দর্শনে পাঞ্চাল-তনয়ের নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন পুরুষপ্রধান নকুল ও সহদেব সেই প্রজ্বলিত পাবকসদৃশ ধৃষ্টদ্যুম্নকে দ্রোণাভিমুখে

গমন করিতে দেখিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিবার মানসে তাঁহার অনুগমন করিলেন। হে মহারাজ! তখন আপনার পক্ষীয় কৃতবর্মা ও তাঁহার তিন সহোদর এই চারিজন বীরের সহিত পাণ্ডবপক্ষীয় ধৃষ্টদ্যুম্ন, নকুল ও সহদেব এই তিন মহাবীরের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। ঐ বিশুদ্ধাত্মা, বিশুদ্ধচরিত্র, বিশুদ্ধবংশসম্ভূত, অমর্ষ-পরায়ণ বীরগণ স্বর্গলাভার্থে জীবিত

নিরপেক্ষ হইয়া ধৰ্ম্মযুদ্ধ অবলম্বনপূর্ব্বক পরস্পরকে পরাজয় করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ঐ যুদ্ধে কর্ণী, নালীক এবং বিষলিপ্ত, শৃঙ্গঘটিত, বহুশল্য, তপ্ত, গজাস্থি বা গবাস্থিযুক্ত, জীর্ণ ও কুটিলগতি শরসকল ব্যবহৃত হয় নাই। সকলেই ধর্মযুদ্ধদ্বারা স্বর্গ ও কীর্ত্তি বাসনা করত অতি সরল বিশুদ্ধ অস্ত্র ধারণ করিয়াছিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে তিনজন পাণ্ডবের সহিত কৌরবপক্ষীয় চারিজনের দোষবিহীন তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। ঐ সময়ে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন, নকুল ও সহদেবকে সেই কৌরব-পক্ষীয় চারি বীরকে নিবারণ করিতে দেখিয়া স্বয়ং দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন কৌরবপক্ষীয় বীর চতুষ্টয় মাদ্রী-তনয়দ্বয়কর্তৃক নিবারিত হইয়া তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে মাদ্রীনন্দনদ্বয়ের প্রত্যেকের সহিত কৌরব-পক্ষীয় দুই দুই বীরের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইলে মহাবীর দ্রুপদতনয় নির্ভয়ে দ্রোণের উপর শরজাল বর্ষণ করিতে আরম্ভকরিলেন। তখন রাজা দুর্য্যোধন যুদ্ধদুৰ্ম্মদ পাঞ্চালনন্দনকে দ্রোণের ও মাদ্রীপুত্রদ্বয়কে আপনাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত দেখিয়া মর্মভেদী শরবর্ষণ করত ধৃষ্টদ্যুম্নের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাবীর সাত্যকি তদ্দর্শনে দুর্য্যোধনের অভিমুখে আগমন করিলেন। এইরূপে নরশাদুল মহাবীর দুর্য্যোধন ও সাত্যকি পরস্পর মিলিত হইয়া বাল্যবৃত্তান্ত স্মরণ ও ঈক্ষণাবেক্ষণ' করত বারংবার হাস্য করিতে লাগিলেন।

অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন প্রিয়সখা সাত্যকিকে সম্বোধন-পূর্ব্বক আপনার চরিত্রের নিন্দা করিয়া কহিলেন, হে সখে! ক্ষত্রিয়গণের ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরাক্রম ও আচারে ধিক্! আমরা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করিতেছি। তুমি আমার প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর ছিলে, আমিও তোমার তদ্রূপ ছিলাম, এক্ষণে আমাদিগের সে সকল বাল্যবৃত্তান্ত আমার স্মরণ হইতেছে। কি আশ্চর্য্য! সমরভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া আমাদের সে সকলই একেবারে তিরোহিত হইয়া গেল। ক্রোধ ও লোভের প্রভাবে অদ্য আমাকে তোমার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে হইল।

হে মহারাজ! তখন অস্ত্রবিদ্যাবিশারদ সাত্যকি হাসিতে হাসিতে তীক্ষ্ণ বিশিখ সমুদ্যত করিয়া দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে রাজপুত্র! আমরা যে স্থলে সমাগত হইয়া ক্রীড়া করিতাম, এ সে সভা বা আচার্য্যনিকেতন নহে। তখন দুর্য্যোধন কহিলেন, হে শিনিপুঙ্গব! কালের কি আশ্চর্য্য মহিমা! আমাদিগের সেই বাল্যক্রীড়া অন্তর্হিত হইয়া এক্ষণে যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছে; আমরা ধনতৃষ্ণানিবন্ধন সকলে সমাগত হইয়া সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছি।

অনন্তর মহাবীর সাত্যকি দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে দুর্য্যোধন! ক্ষত্রিয়গণের এই ধৰ্ম্ম যে ইঁহারা আচার্য্যের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন। হে রাজন। যদি আমি তোমার প্রিয়পাত্র হই, তবে আর কেন বিলম্ব করিতেছ, শীঘ্র আমাকে বিনাশ কর, তাহা হইলে আমি তোমার কৃপায় স্বর্গলোকে গমন করিতে সমর্থ হইব। অতএব তোমার যতদূর পরাক্রম থাকে, তাহা প্রদর্শন কর, আর আমি আত্মীয়গণের ব্যসন নিরীক্ষণ করিতে অভিলাষ করি না। মহাবীর সাত্যকি এই বলিয়া নির্ভীকচিত্তে নিরপেক্ষ হইয়া অগ্রসর হইলেন। 'মহারাজ দুর্য্যোধন সাত্যকিকে সমাগত সন্দর্শন করিয়া তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন সিংহ ও মাতঙ্গের যেরূপ যুদ্ধ হয়, তদ্রূপ সেই বীরদ্বয়ের ঘোরতর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। মহাবীর দুর্য্যোধন আকর্ণ আকৃষ্ট শরনিকরে যুদ্ধদুৰ্ম্মদ সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলে সাত্যকিও সত্বর তাঁহাকে প্রথমতঃ পঞ্চাশৎ, তৎপরে বিংশতি ও দশ শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন আপনার পুত্র হাসিতে হাসিতে শরাসন আকর্ণ আকষর্ণপূর্ব্বক সাত্যকির উপর ত্রিংশৎ শর নিক্ষেপ করিয়া ক্ষুরপ্রদ্বারা তাঁহার শরাসন দুই খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর যাদবপুঙ্গব অন্য এক সুদৃঢ় শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের সংহারার্থ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলে কুরুরাজ তৎসমুদায় খণ্ড খণ্ড করিলেন। সৈন্যগণ তদ্দর্শনে চীৎকার করিতে লাগিল। অনন্তর দুর্য্যোধন মহাবেগে শরাসন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক সুবর্ণপুঙ্খ নিশিত ত্রিসপ্ততি শরে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি দুর্য্যোধনের সশর শরাসন ছেদন করিয়া তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। কুরুরাজ যুযুধানের শরনিকরে গাঢ় বিদ্ধ ও নিতান্ত ব্যথিত হইয়া সত্বর অন্য রথে পলায়ন করিলেন এবং সত্বরই পরিশ্রমাপনোদনপূর্ব্বক সাত্যকির সম্মুখীন হইয়া তাঁহার রথের উপর শরজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন সাত্যকিও কুরুরাজের রথোপরি বাণ বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। সায়কসমুদায় সমন্তাৎ বিনিক্ষিপ্ত হওয়াতে সংগ্রামক্ষেত্রে কক্ষদহন প্রবৃত্ত হুতাশনের শব্দের ন্যায় তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইল। ঐ বীরদ্বয়ের শরনিকরে বসুধাতল সমাচ্ছন্ন ও আকাশমার্গ দুর্গম হইয়া উঠিল।

তখন মহাবীর কর্ণ, সাত্যকিকে দুর্য্যোধন অপেক্ষা সমধিক বলশালী অবলোকন করিয়া কুরুরাজের হিতার্থ মহারথ যুযুধানকে লক্ষ্য করিয়া ধাবমান হইলেন। ভীমপরাক্রম ভীমসেন উহা সহ্য করিতে না পারিয়া সত্বরে কর্ণের সম্মুখীন হইয়া তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ অবলীলাক্রমে ভীমসেনের শরসমুদায় নিবারণপূর্ব্বক শরনিকরে তাঁহার শর ও শরাসন ছেদন এবং সারথিকে শমন-সদনে প্রেরণ করিলেন। ভীমসেন তদ্দর্শনে ক্ষুব্ধ হইয়া গদা গ্রহণপূর্ব্বক সূতপুত্রের শরাসন, রথের একখানি চক্র এবং ধ্বজ ও সারথিকে চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কর্ণ সেই একচক্র রথে অবস্থিত হইয়াও হিমালয়ের ন্যায় অবিচলিত রহিলেন। সাত অশ্ব যেরূপ সূর্য্যের একচক্র রথ বহন করিয়া থাকে, তদ্রূপ কর্ণের অশ্বগণ তাঁহার সেই রুচির একচক্র রথ বহন করিতে লাগিল। তখন তিনি কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া বিবিধ শর ও শস্ত্র নিক্ষেপপূর্ব্বক ভীমসেনের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। বৃকোদরও ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন।

হে মহারাজ! এইরূপে সঙ্কুল যুদ্ধ উপস্থিত হইলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মহারথ পাঞ্চাল ও মৎস্যগণকে কহিলেন, হে বীরগণ! যাহারা আমাদিগের প্রাণ ও মস্তকস্বরূপ, যে যোধ-গণ সর্ব্বাপেক্ষা পরাক্রান্ত, সেই সকল পুরুষপ্রধান বীরগণ দুর্য্যোধনাদির সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অতএব এক্ষণে তোমরা কি নিমিত্ত বিচেতনের ন্যায় নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিয়াছ? যে স্থানে সোমকগণ যুদ্ধ করিতেছেন, অবিলম্বে সেই স্থানে গমন কর। ক্ষাত্রধর্ম অবলম্বনপূর্ব্বক যুদ্ধ করিলে জয়লাভই হউক বা প্রাণনাশ হউক, উভয় পক্ষেই সদ্গতি লাভ হইবে, সন্দেহ নাই। দেখ, জয়লাভ করিলে ভূরিদক্ষিণ বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে পারিবে এবং নিহত হইলে দেবস্বরূপ হইয়া শ্রেষ্ঠলোক প্রাপ্ত হইবে। হে মহারাজ! মহারথ বীরপুরুষেরা যুধিষ্ঠিরকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া ক্ষাত্রধৰ্ম্ম অবলম্বনপূর্ব্বক দ্রুতপদে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন পাঞ্চালগণ এক দিক্ হইতে শরনিকরে দ্রোণকে আহত করিতে লাগিলেন এবং ভীমসেন প্রভৃতি বীরগণ অন্য দিক্ হইতে তাঁহাকে আক্রমণ করিলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় তিন মহারথ ভীমসেন, নকুল ও সহদেব উচ্চস্বরে ধনঞ্জয়কে কহিলেন, হে অর্জুন! তুমি শীঘ্র ধাবমান হইয়া দ্রোণরক্ষণে নিযুক্ত কৌরবগণকে নিপাতিত কর। আচার্য্য সহায়বিহীন হইলে পাঞ্চালগণ উঁহাকে অনায়াসে বিনষ্ট করিবেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তাঁহাদের বাক্য শ্রবণে সহসা কৌরবগণের সম্মুখীন হইলেন। দ্রোণাচার্য্য সেই পঞ্চম দিবসে ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালগণকে মৰ্দ্দিত করিতে লাগিলেন।

ভীমকর্তৃক "অশ্বত্থামা হত' সংবাদ দান।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! পূর্ব্বকালে দেবরাজ রোষা-বিষ্ট হইয়া যেমন সংগ্রামে দানবগণকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ দ্রোণাচার্য্য পাঞ্চালগণের প্রাণনাশ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবপক্ষীয় মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ নিঃশঙ্কচিত্তে দ্রোণের সম্মুখীন হইলেন এবং পরিশেষে দ্রোণের শর ও শক্তিদ্বারা সমাহত হইয়া চতুৰ্দ্দিকে ভীষণ নিনাদ করিতে লাগিলেন। এইরূপে পাঞ্চালগণ দ্রোণশরে নিপীড়িত ও | আচার্য্যের অস্ত্রসমুদায় ভীষণরূপে চতুৰ্দ্দিকে সমাকীর্ণ হইলে পাণ্ডবেরা অশ্ব ও যোধবর্গের নিধন দর্শনে ভয়ে নিতান্ত অভিভূত হইয়া জয়াশা পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, বসন্তসময়ে সমৃদ্ধ হুতাশন যেমন বন দগ্ধ করে, তদ্রূপ পরমাস্ত্রবিৎ দ্রোণাচার্য্য আমাদিগকে বিনষ্ট করিলেন। সংগ্রামে উহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে কেহই সমর্থ নহেন। ধর্মপরায়ণ অর্জুন কখনই উহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইবেন না।

হে মহারাজ! ঐ সময় পাণ্ডবহিতৈষী ধীমান্ বাসুদেব কুন্তীপুত্রদিগকে দ্রোণশরে পীড়িত ও নিতান্ত ভীত দেখিয়া অর্জুনকে কহিলেন, হে অর্জুন! ধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য সংগ্রামে শরাসন ধারণ করিলে ইন্দ্রাদি দেবগণও তাঁহাকে নিহত করিতে সমর্থ নহেন; কিন্তু উনি অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করিলে মনুষ্যেরাও উঁহাকে বিনাশ করিতে পারে। অতএব তোমরা ধৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক কৌশল করিয়া উঁহাকে পরাজয় করিবার চেষ্টা কর; নচেৎ আচার্য্য তোমাদের সকলকে বিনাশ করিবেন। আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে যে, অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছেন, ইহা জানিতে পারিলে দ্রোণ আর যুদ্ধ করিবেন না; অতএব কোন ব্যক্তি তাঁহার নিকট বলুন যে, অশ্বত্থামা সংগ্রামে বিনষ্ট হইয়াছেন। হে মহারাজ! কুন্তীপুত্র অর্জুন কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণে তাহাতে কোনক্রমেই সম্মত হইলেন না, অন্যান্য যোধগণ সম্মত হইলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অতি কষ্টে উহা অঙ্গীকার করিলেন। অনন্তর মহাবাহু ভীমসেন গদাঘাতে আত্মপক্ষ অবন্তীদেশীয় ইন্দ্রবর্মার অরাতিঘাতন অশ্বত্থামা নামক মহাগজকে নিপাতিত করিয়া সলজ্জভাবে দ্রোণসমীপে আগমন-পূর্ব্বক "অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছেন, অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছেন" বলিয়া উচ্চস্বরে চীৎকার করিতে লাগিলেন। এইরূপে বৃকোদর অশ্বত্থামা নামক গজ নিপাতিত করিয়া মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিলে দ্রোণাচার্য্য ভীমসেনের সেই দারুণ অপ্রিয় বাক্য শ্রবণ করিয়া প্রথমতঃ নিতান্ত বিষণ্ণমনাঃ হইলেন। পরিশেষে স্বীয় পুত্রকে অজিত পরাক্রমশালী ও অরাতিকুলের অসহ্য মনে করিয়া আশ্বাসযুক্ত হইয়া ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আপনার মৃত্যুস্বরূপ ধৃষ্টদ্যুম্ন বিনাশ-বাসনায় তাঁহার অভিমুখে গমন করত তাঁহার উপর সুতীক্ষ্ণ কঙ্কপত্রভূষিত সহস্র শর নিক্ষেপ করিলেন। তখন পাঞ্চালদেশীয় বিংশতি সহস্র মহারথ সেই রণচারী দ্রোণাচার্য্যের উপর চতুৰ্দ্দিক্ হইতে শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। আচার্য্য তাহাদের শরনিকরে পরিবৃত হইয়া বর্ষা-কালীন জলধর সমাচ্ছন্ন দিবাকরের ন্যায় অদৃশ্য হইলেন। অনন্তর তিনি অবিলম্বে পাঞ্চালগণের শরজাল নিবারণপূর্ব্বক তাঁহাদিগের বিনাশার্থ ক্রোধভরে ব্রহ্মাস্ত্র প্রাদুর্ভূত করিয়া বিধূম প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি পুনরায় রোষাবিষ্ট হইয়া সোমকদিগকে বিনাশ এবং পাঞ্চালগণের মস্তক ও পরিঘাকার কনকভূষিত বাহুসমুদায় ছেদন করিতে আরম্ভ করিলেন। নরপতিগণ ভারদ্বাজকর্তৃক নিহত হইয়া বায়ুভগ্ন বনস্পতির ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিলেন। নিপাতিত হস্তী ও অশ্বগণের মাংস শোণিতে গাঢ় কদম সমুৎপন্ন হওয়াতে সমরভূমি অগম্য হইয়া উঠিল। হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য এইরূপে পাঞ্চালদেশীয় বিংশতি সহস্র মহারথের প্রাণনাশ করিয়া ধূমবিরহিত প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় রণস্থলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি পুনরায় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া এক ভল্লে বসুদানের শিরশ্ছেদনপূর্ব্বক পঞ্চাশৎ মৎস্য, ষসহস্র সৃঞ্জয়, অযুত হস্তী ও অশ্বের প্রাণ-বিনাশ করিলেন।

বিশ্বামিত্রাদি ঋষিগণকর্তৃক দ্রোণকে যুদ্ধত্যাগের উপদেশ দান।

হে মহারাজ। ঐ সময় বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, বশিষ্ঠ, অত্রি, ভৃগু, অঙ্গিরাঃ, সিকত, পৃশ্নি, গর্গ, বাল-খিল্য, মরীচিপ ও অন্যান্য ক্ষুদ্রতর সাগ্নিক ঋষিগণ আচার্য্যকে নিঃক্ষত্রিয় করিতে অবলোকন করিয়া তাঁহাকে ব্রহ্মলোকে নীত করিবার বাসনায় সকলে শীঘ্র সমাগত হইয়া কহিতে লাগিলেন, হে দ্রোণ! তুমি অধৰ্ম্মযুদ্ধ করিতেছ; অতএব এক্ষণে তোমার বিনাশসময় উপস্থিত হইয়াছে। তুমি আয়ুধ পরিত্যাগ করিয়া একবার আমাদিগকে নিরীক্ষণ কর। আর তোমার এরূপ ক্রুর কার্য্যের অনুষ্ঠান করা কর্তব্য নহে। তুমি বেদ-বেদাঙ্গবেত্তা ও সত্যধর্ম-পরায়ণ, বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ; অতএব এরূপ কার্য্য করা তোমার নিতান্ত অনুচিত; তুমি অবিমুগ্ধ হইয়া আয়ুধ পরিত্যাগ-পূর্ব্বক শাশ্বতপথে অবস্থান কর। অদ্য তোমার মর্ত্যলোক নিবাসের কাল পরিপূর্ণ হইয়াছে। হে বিপ্র! অস্ত্রানভিজ্ঞ ব্যক্তি-দিগকে ব্রহ্মাস্ত্রে বিনাশ করিয়া নিতান্ত অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ; অতএব অবিলম্বে আয়ুধ পরিত্যাগ কর; আর ক্রুর কার্য্যের অনুষ্ঠান করা তোমার কর্তব্য নহে।

হে মহারাজ! মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ইতিপূর্ব্বে ভীমসেনের মুখে অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছেন, শ্রবণ করিয়া নিতান্ত বিষণ্ণ হইয়াছিলেন, এক্ষণে ঋষিদিগের এই বাক্য শ্রবণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে অবলোকন করিয়া অধিকতর বিমনায়মান হইলেন। তখন তিনি একান্ত ব্যথিত হৃদয়ে যুধিষ্ঠিরকে স্বীয় পুত্র বিনষ্ট হইয়াছে কি না জিজ্ঞাসা করিলেন। হে মহারাজ! আচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে বাল্য-কালাবধি সত্যবাদী বলিয়া জানিতেন। তাঁহার নিশ্চয় জ্ঞান ছিল যে, যুধিষ্ঠির ত্রিলোকের ঐশ্বর্য্য লাভ হইলেও কদাচ মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করেন না। তন্নিমিত্তই তিনি অন্য কাহাকে জিজ্ঞাসা না করিয়া যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন।

যুধিষ্ঠিরের মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ।

অনন্তর হৃষীকেশ দ্রোণাচার্য্য জীবিত থাকিলে পৃথিবী পাণ্ডবশূন্য করিবেন, স্থির করিয়া দুঃখিতচিত্তে ধৰ্ম্মরাজকে কহিলেন, হে রাজন! যদি দ্রোণাচার্য্য রোষপরবশ হইয়া আজি অর্দ্ধদিন যুদ্ধ করেন, তাহা হইলেই নিশ্চয়ই আপনার সমস্ত সৈন্য বিনষ্ট হইবে। আপনি মিথ্যাকথা কহিয়া আমাদিগেকে পরিত্রাণ করুন। এরূপ স্থলে মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হইতেছে। প্রাণরক্ষার্থ মিথ্যা কহিলে পাপস্পৃষ্ট হইতে হয় না। কামিনীদিগের নিকট, বিবাহ স্থলে এবং গো ও ব্রাহ্মণের রক্ষার্থ মিথ্যা কহিলেও পাতক নাই।

হে কুরুরাজ! ঐ সময়ে ভীমসেন যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, হে মহারাজ! আমি দ্রোণাচার্য্যের বধোপায় শ্রবণ করিয়া আপনার সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট অবন্তীনাথ ইন্দ্রবর্মার ঐরাবতসদৃশ অশ্বত্থামা নামক হস্তী সংহারপূর্ব্বক আচার্য্যকে কহিলাম, হে ব্রহ্মন্! অশ্বত্থামা বিনষ্ট হইয়াছে, আর কেন আপনি যুদ্ধ করিতেছেন? হে মহারাজ! ভারদ্বাজ তৎকালে আমার সেই বাক্যে অনাস্থা প্রদর্শন করিয়াছেন। এক্ষণে আপনি বিজয়াভিলাষী গোবিন্দের বাক্যানুসারে আচার্য্যকে অশ্বত্থামার বিনাশ-বার্তা প্রদান করুন, তাহা হইলে তিনি কখনই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবেন না। আপনি সত্যপরায়ণ বলিয়া ত্রিলোকমধ্যে বিখ্যাত আছেন। আচার্য্য আপনার বাক্যে অবশ্যই বিশ্বাস করিবেন।

হে কুরুরাজ! রাজা যুধিষ্ঠির ভীমসেনের বাক্য শ্রবণ করিয়া কৃষ্ণকর্তৃক প্রেরিত হইয়া অবশ্যম্ভারী কার্য্যের অনুল্লঙ্ঘনীয়তাবশতঃ মিথ্যাবাক্য প্রয়োগে উদ্যত হইলেন। তিনি জয়াভিলাষ ও মিথ্যা-কথনভয়ে যুগপৎ আক্রান্ত হইয়া দ্রোণ-সমক্ষে অশ্বত্থামা হত হইয়াছেন, এই কথা স্পষ্টাভিধানে বলিয়া অব্যক্তরূপে কুঞ্জরশব্দ' উচ্চারণ করিলেন। হে মহারাজ! ইহার পূর্ব্বে যুধিষ্ঠিরের রথ পৃথিবী হইতে চারি অঙ্গুলি উর্দ্ধে অবস্থান করিত; কিন্তু তৎকাল তিনি এইরূপ মিথ্যাকথা কহিলে তাঁহার বাহনগণ ধরাতল স্পর্শ করিল। তখন মহারথ দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরের সেই বাক্য শ্রবণে পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর হইয়া জীবিতাশা পরিত্যাগ করিলেন এবং ঋষিগণের সেই বাক্য স্মরণ করিয়া আপনাকে মহাত্মা পাণ্ডবগণের নিকট অপরাধী জ্ঞান ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে সম্মুখে নিরীক্ষণপূর্ব্বক বিচেতনপ্রায় হইয়া আর পূর্ব্ববৎ যুদ্ধ করিতে সমর্থ হইলেন না।

জীবিতাশাত্যাগপূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্যের সংগ্রাম।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় পাঞ্চালরাজ-কুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্য্যকে অতিশয় উদ্বিগ্ন ও শোকে বিচেতনপ্রায় দেখিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাত্মা দ্রুপদরাজ দ্রোণবিনাশার্থ মহাযজ্ঞে প্রজ্বলিত হুতাশন হইতে উহাকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মহাবীর দ্রুপদতনয় দ্রোণজিঘাংসু হইয়া সুদৃঢ় মৌর্ব্বীসম্পন্ন, জলদগভীরনিস্বন, জয়শীল দিব্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক তাহাতে প্রদীপ্ত অনলের ন্যায়, আশীবিষের ন্যায় শর সংযোজন করিলেন। সেই ধৃষ্টদ্যুম্নের শরাসনমণ্ডলস্থ শর শরৎকালীন পরিবেশমধ্যস্থ দিবাকরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। সৈনিকণণ সেই প্রজ্বলিত শরাসন ধৃষ্টদ্যুম্নকর্তৃক আকৃষ্ট দেখিয়া অন্তকাল উপস্থিত হইয়াছে বলিয়া বোধ করিল। ঐ সময় প্রতাপশালী ভারদ্বাজও দ্রুপদপুত্রের শরসন্ধান সন্দর্শন-পূর্ব্বক আপনার আসন্নকাল সমাগত বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিবারণ করিতে বিশেষরূপে যত্ন করিলেন; কিন্তু তাঁহার অস্ত্রজাল আর প্রাদুর্ভূত হইল না। ঐ বীরপুরুষ চারিদিন ও একরাত্রি ক্রমাগত বাণবর্ষণ করিতে-ছিলেন, তথাপি তাঁহার শর ক্ষয় হয় নাই। এক্ষণে ঐ পঞ্চম দিবসের তৃতীয়াংশ অতীত হইলে তাঁহার শরনিকর নিঃশেষিত হইল।

তখন তেজঃপুঞ্জ শরীর দ্রোণাচার্য্য পুত্রশোক ও দিব্যাস্ত্র-সমুদায়ের অপ্রসন্নবশতঃ নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া বিপ্রগণের বাক্য প্রতিপালনার্থ অস্ত্র পরিত্যাগ করিবার বাসনায় আর পূর্ব্বের ন্যায় যুদ্ধ করিলেন না। কিয়ৎকাল পরে তিনি মহর্ষি অঙ্গিরার প্রদত্ত দিব্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক ধৃষ্টদ্যুম্মের প্রতি ব্রহ্মদণ্ড সদৃশ শরনিকর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। দ্রুপদ-নন্দন তাঁহার শরবর্ষণে সমাছন্ন ও ক্ষত-বিক্ষত হইলেন। তখন ভারদ্বাজ পুনরায় নিশিত শরনিকর বর্ষণ করিয়া দ্রুপদতনয়ের শরাসন, ধ্বজ ও শরসমুদায় শতধা ছেদনপূর্ব্বক সারথিকে নিপাতিত করিলেন। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন তদ্দর্শনে সহাস্যমুখে পুনরায় অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক নিশিত শরদ্বারা তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। মহাধনুর্দ্ধর দ্রোণ দ্রুপদতনয়ের শরে বিদ্ধ ও সম্ভ্রান্ত হইয়া শিতধার ভল্লদ্বারা পুনরায় তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং তৎপরে তাঁহার গদা ও খড়া ব্যতীত অন্য সমুদায় অস্ত্র-শস্ত্র ছেদন করিয়া তাঁহাকে সুতীক্ষ্ম নয় বাণে বিদ্ধ করিলেন।

অনন্তর মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন ব্রাহ্ম-অস্ত্র মন্ত্রপূত করত স্বীয় অশ্বগণের সহিত দ্রোণের অশ্বগণকে মিশ্রিত করিয়া দিলেন। দ্রোণের বায়ুবেগগামী পারাবতসবর্ণ অশ্বসকল ধৃষ্টদ্যুম্নের শোণবর্ণ অশ্বের সহিত মিলিত হইয়া বিদ্যুদ্দামমণ্ডিত গভীর গর্জনশীল জলদপটলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। তখন মহাবীর দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের ঈষাবন্ধ, চক্রবন্ধ ও রথবন্ধ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণশরে ছিন্নকার্মুক, বিরথ, হতাশ্ব ও হতসারথি হইয়া সেই ঘোরতর বিপক্কালে তাঁহার উপর এক গদা নিক্ষেপ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য তদ্দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া নিশিত শরনিকরে সেই ধৃষ্টদ্যুম্ন-নিক্ষিপ্ত গদা খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন স্বীয় গদা নিষ্ফল দেখিয়া দ্রোণকে বধ করাই শ্রেয়ঃকল্প বিবেচনা করিলেন এবং বিমল খড়া ও অতি ভাস্বর চর্ম গ্রহণপূর্ব্বক আপনার রথেষা অবলম্বন করিয়া দ্রোণের রথে গমন করত তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিতে অভিলাষ করিলেন। তৎকালে তিনি কখন যুগমধ্যে, কখন যুগসন্নহনে ও কখন বা শোণবর্ণ অশ্বসমুদায়ের নিতম্বদেশে অবস্থান করিতে লাগিলেন। সৈন্যগণ তদ্দর্শনে তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতে আরম্ভ করিল। তৎকালে দ্রোণাচার্য্য কোনক্রমেই তাঁহাকে প্রহার করিবার উপযুক্ত অবসর প্রাপ্ত হইলেন না। তদ্দর্শনে সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইল। আমিষলোলুপ গৃধুদ্বয়ের যেরূপ যুদ্ধ হইয়া থাকে, দ্রোণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের তদ্রূপ যুদ্ধ হইতে লাগিল।

অনন্তর মহাবীর দ্রোণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া রথশক্তিদ্বারা ধৃষ্টদ্যুম্নের পারাবত সবর্ণ অশ্বগণকে ক্রমে ক্রমে বিনাশ করিলেন। এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্নের অশ্বগণ নিহত ও নিপতিত হইলে দ্রোণাচার্য্যের শোণবর্ণ অশ্বসমুদায় রথবন্ধ হইতে বিমুক্ত হইল। ধৃষ্টদ্যুম্ন তদ্দর্শনে একান্ত অধীর হইয়া খড়া গ্রহণপূর্ব্বক রথ পরিত্যাগ করিয়া পতঙ্গরাজ গরুড় যেমন ভুজঙ্গের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইলেন। পূর্ব্বে হিরণ্যকশিপু সংহারকালে বিষ্ণু যেরূপ বিগ্রহ' পরিগ্রহ করিয়াছিলেন, এক্ষণে দ্রোণ সংহারে প্রবৃত্ত ধৃষ্টদ্যুম্নেরও সেইরূপ আকার হইয়া উঠিল। তখন তিনি খড়া-চৰ্ম্ম ধারণ করিয়া ভ্রান্ত, উদ্ভ্রান্ত আবিদ্ধ,, আপ্লুত, প্রসূত, সৃত, পরিবৃত, নিবৃত্ত, সম্পাত, সমুদ্দীর্ণ, ভারত, কৈশিক ও সাত্যত্ প্রভৃতি একবিংশতি প্রকার গতি প্রদর্শন-পূর্ব্বক দ্রোণকে বিনাশ করিবার বাসনায় সমরে বিচরণ করিতে লাগিলেন। তখন সমুদায় যোদ্ধা ও সমাগত দেবগণ ধৃষ্টদ্যুম্নের সেই বিচিত্র গতি সন্দর্শনে একান্ত বিস্ময়াপন্ন হইলেন। দ্রোণাচার্য্য ঐ সময় সহস্র শরদ্বারা ধৃষ্টদ্যুম্নের খড়া ও শতচন্দ্র-বিভূষিত চৰ্ম্ম ছেদন করিয়া ফেলিলেন। দ্রোণাচার্য্য এক্ষণে যে সকল বাণ লইয়া যুদ্ধ করিতেছিলেন, তৎসমুদায় বিতস্তি প্রমাণ। সমীপবর্ত্তী বিপক্ষের সহিত সংগ্রাম করিবার সময় ঐ সকল শরের বিশেষ আবশ্যক হয়। ঐরূপ বাণ কেবল দ্রোণ, কূপ, অর্জুন, কর্ণ, প্রদ্যুম্ন ও যুযুধান ভিন্ন আর কাহারও নাই। অর্জুনতনয় মহাবীর অভিমন্যুর ঐরূপ শরসমুদায় ছিল। হে মহারাজ! অনন্ত দ্রোণাচার্য্য মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নের বিনাশার্থ এক বেগবান্ বিতস্তি' প্রমাণ সুদৃঢ় শর পরিত্যাগ করিলেন। তখন শিনিপুঙ্গব সাত্যকি নিশিত দশ শরে সেই শর ছেদন করিয়া মহাত্মা দুর্য্যোধন ও কর্ণের সমক্ষে ধৃষ্টদ্যুম্নকে আচার্য্যের হস্ত হইতে মুক্ত করিলেন। মহাত্মা কৃষ্ণ ও অর্জুন সত্যবিক্রম সাত্যকিকে দ্রোণ, কর্ণ ও কূপের সমীপে অবস্থানপূর্ব্বক রথ-মার্গে বিচরণ ও যোধগণের দিব্যাস্ত্রসকলকে ধ্বংস করিতে দেখিয়া তাঁহাকে ভূয়োভূয়ঃ সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। অনন্তর অর্জুন কৃষ্ণ-সমভিব্যাহারে সৈন্যগণের অভিমুখে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে কেশব। ঐ দেখ, শত্রুনাশন সাত্যকি দ্রোণাচার্য্য প্রভৃতি মহারথগণের সমক্ষে শিক্ষা প্রদর্শনপূর্ব্বক বিচরণ করত আমাকে ও আমার ভ্রাতৃগণকে আনন্দিত করিতেছে। সমুদায় সিদ্ধ ও সৈনিকগণ বিস্ময়াপন্ন হইয়া বৃষ্ণিকুলের কীর্ত্তিবর্দ্ধন যুযুধানকে প্রশংসা করিতেছে। হে মহারাজ! অনন্তর উভয় পক্ষীয় যোধগণ সমরে অপরাজিত সাত্যকির অলোকসামান্য কার্য্য দর্শন করিয়া তাঁহাকে বারংবার সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

দ্রোণাচার্য্যের সৃঞ্জয়গণের প্রতি প্রবল বিক্রম।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! তখন দুর্য্যোধন প্রভৃতি বীরগণ সাত্যকির তাদৃশ কৰ্ম্ম দর্শনে সাতিশয় রোযাবিষ্ট হইয়া সম্পূর্ণরূপ যত্ন ও পরাক্রমসহকারে তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর কূপ, কর্ণ ও আপনার পুত্রগণ সমরে সমাগত হইয়া যুযুধানকে নিশিত শরনিকরে নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির, মহাবল ভীমসেন এবং মাদ্রীপুত্র নকুল ও সহদেব ইঁহারা সাত্যকির সাহায্যার্থ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিলেন। মহারথ কর্ণ, কূপ ও দুর্যোধন প্রভৃতি বীরগণ চতুৰ্দ্দিক্ হইতে আক্রমণ করিয়া তাঁহার উপর অসংখ্য শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি সেই মহারথগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাহাদের ঘোররূপিণী শরবৃষ্টি নিবারণপূর্ব্বক দিব্যাস্ত্রদ্বারা তাহাদিগের দিব্যাস্ত্রসকল নিবারণ করিলেন। ঐ সময়ে পশুনিধনে সমুদ্যত পশুপতির ন্যায় কোপাবিষ্ট শত্রুসূদন সাত্যকি সমরে প্রবৃত্ত হইলে রণভূমি অতি দারুণ হইয়া উঠিল। সমরাঙ্গনে রাশি রাশি হস্ত, মস্তক, কাৰ্ম্মক, ছত্র ও চামর ইতস্ততঃ দষ্ট হইতে লাগিল। ভগ্নচক্র রথ, নিপতিত ভুজদণ্ড, নিহত অশ্বারোহী বীরগণদ্বারা ধরাতল পরিব্যাপ্ত হইল। সেই দেবাসুর-যুদ্ধসদৃশ ঘোর সংগ্রামে যোধগণ শরনিকরে ক্ষত বিক্ষতাঙ্গ হইয়া ধরাতলে বিচেষ্টমান হইতে লাগিলেন।

তখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির স্বপক্ষীয় ক্ষত্রিয়গণকে কহিলেন, হে বীরগণ! তোমরা পরম যত্নসহকারে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হও। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্য্য-বিনাশের নিমিত্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেছেন। অদ্য সমরক্ষেত্রে দ্রুপদনন্দনের কার্য্য সন্দর্শনে স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, উনি ক্রুদ্ধ হইয়া দ্রোণকে নিপাতিত করিবেন। অতএব তোমরা মিলিত হইয়া দ্রোণের সহিত যুদ্ধারম্ভ কর।

হে কুরুরাজ! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এইরূপ আজ্ঞা করিলে মহারথ সৃঞ্জয়গণ যুদ্ধবেশ ধারণপূর্ব্বক দ্রোণজিঘাংসায় ধাবমান হইলেন। মহারথ দ্রোণও মরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া সমাগত বীর-গণের প্রতি মহাবেগে গমন করিতে লাগিলেন। সত্যসন্ধ মহাবীর দ্রোণাচার্য্য মহারথগণের প্রতি ধাবমান হইলে মেদিনী-মণ্ডল কম্পিত ও প্রচণ্ড বায়ু-সেনাগণকে ভীত করত প্রবল বেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল। মহতী উল্কা সূর্য্য হইতে নিঃসৃত হইয়া আলোক প্রকাশপূর্ব্বক সকলকে শঙ্কিত করিল। দ্রোণাচার্য্যের অস্ত্রসকল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। রথের ভীষণ নিম্বন ও অশ্বগণের অশ্রুপাত হইতে লাগিল। তৎকালে মহারথ দ্রোণ নিতান্ত নিস্তেজাঃ হইলেন। তাঁহার বাম নয়ন ও বামবাহু স্পন্দিত হইতে লাগিল। তিনি সম্মুখে ধৃষ্টদ্যুম্নকে অবলোকন করিয়া নিতান্ত উন্মনাঃ হইলেন এবং ব্রহ্মবাদী ঋষিগণের বাক্য স্মরণ করিয়া ধর্মযুদ্ধ অবলম্বনপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিতে ইচ্ছা করিলেন। তখন তিনি দ্রুপদ-সৈন্যগণের সহিত মিলিত হইয়া ক্ষত্রিয়গণকে শরানলে দগ্ধ করত সংগ্রামে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর সেই ধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য মহাবীর নিশিত শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক প্রথমতঃ বিংশতি সহস্র ও তৎপরে দশ অযুত ক্ষত্রিয়ের প্রাণ সংহারপূর্ব্বক ক্ষত্রিয়গণকে নিঃশেষিত করিবার মানসে ব্রাহ্ম-অস্ত্র সমুদ্যত করিয়া সংগ্রামস্থলে প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় দেদীপ্যমান হইলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন মহাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্নকে রথহীন ও আয়ুধবিহীন অবলোকনপূর্ব্বক দ্রুপদতনয়ের সাহায্যার্থ তাঁহার সম্মুখে গমন করিলেন এবং সত্বর তাঁহাকে আপনার রথে সংস্থাপনপূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্য-সমীপে শরবর্ষণ করিতে দেখিয়া কহিলেন, হে পাঞ্চালনন্দন! তুমি ভিন্ন আর কেহই ইঁহার সহিত যুদ্ধ করিতে পারিবে না। তোমার উপরই আচার্য্যের নিধন ভার সমর্পিত হইয়াছে। অতএব তুমি ইঁহার বধার্থ সত্বর হও। মহাবাহু ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীমের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহার নিকট হইতে সর্ব্বভারসহ প্রধান শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সমরদুর্নিবার' দ্রোণাচার্য্যকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন সেই সমরবিশারদ বীরদ্বয় পরস্পরকে নিবারণপূর্ব্বক দিব্য ব্রাহ্ম অস্ত্রসমূহ মন্ত্রপূত করিলেন। তখন মহাবীর দ্রুপদনন্দন মহাস্ত্র-দ্বারা দ্রোণের শরজাল নিরাকৃত ও তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া তাঁহার রক্ষক, বশাতি, শিবি, বাহীক ও কৌরবগণকে নিপাতিত করিতে লাগিলেন। দিনকর কিরণজাল বিস্তার করত যেরূপ শোভা ধারণ করেন, মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন শরজালে দিঘণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিয়া তদ্রূপ সুশোভিত হইলেন। অনন্তর মহাধনুর্দ্ধর দ্রোণাচার্য্য শরনিকরে দ্রুপদতনয়ের শরাসন ছেদনপূর্ব্বক মর্মভেদ করিলেন। দ্রুপদনন্দন আচার্য্যশরে গাঢ়বিদ্ধ হইয়া নিতান্ত ব্যথিত হইলেন।

ভীমসেনকর্তৃক দ্রোণের প্রতি তিরস্কার।

তখন ক্রোধপরায়ণ ভীমসেন ভারদ্বাজের রথ ধারণ-পূর্ব্বক তাঁহাকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। যদি স্বকার্য্যে' অসন্তুষ্ট শিক্ষিতাস্ত্র অধম ব্রাহ্মণগণ সমরে প্রবৃত্ত না হন, তাহা হইলে ক্ষত্রিয়গণের কখনই ক্ষয় হয় না। পণ্ডিতেরা প্রাণিগণের হিংসা না করাই প্রধান ধৰ্ম্ম বলিয়া নির্দেশ করেন। সেই ধৰ্ম্ম প্রতি-পালন করা ব্রাহ্মণের অবশ্যকর্তব্য। আপনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ; কিন্তু চণ্ডালের ন্যায় অজ্ঞানান্ধ হইয়া পুত্র ও কলত্রের উপকারার্থ অর্থলালসা-নিবন্ধন বিবিধ ম্লেচ্ছজাতি ও অন্যান্য প্রাণিগণের প্রাণ বিনাশ করিতেছেন। আপনি একপুত্রের উপকারার্থ স্বধর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বকার্য্য সাধনে প্রবৃত্ত অসংখ্য জীবের জীবন নাশ করিয়া কি নিমিত্ত লজ্জিত হইতেছেন না? যাহা হউক, এক্ষণে আপনি যাঁহার অপেক্ষায় জীবিত রহিয়াছেন, অদ্য তিনি আপনার অজ্ঞাতসারে পশ্চাদ্ভাগে সমরশয্যার শয়ন করিয়াছেন। হে ব্রহ্মন্! যাঁহার বাক্যে আপনার কিছুমাত্র সন্দেহ হয় না, সেই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আপনাকে ইতিপূর্ব্বে এই বৃত্তান্ত জ্ঞাত করিয়াছেন।

ধৃষ্টদ্যুম্নকর্তৃক দ্রোণ বধ ও দ্রোণের ব্রহ্মলোক গমন।

হে মহারাজ! মহাবীর ভীমসেন এইরূপ কহিলে পর, দ্রোণাচার্য্য শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক সমস্ত অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করিবার অভিলাষে কহিলেন, হে মহাধনুর্দ্ধর কর্ণ! হে কৃপাচার্য্য! হে দুর্য্যোধন। আমি বারংবার বলিতেছি তোমরা সমরে যত্নবান্ হও, তোমাদিগের মঙ্গল লাভ হউক; আমি অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করিলাম। মহাত্মা দ্রোণ এই বলিয়া অশ্বত্থামার নামোচ্চারণপূর্ব্বক চীৎকার করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে রথোপরি সমুদায় অস্ত্র-শস্ত্র সন্নিবেশিত করিয়া যোগ অবলম্বনপূর্ব্বক সকল জীবকে অভয় প্রদান করিলেন। ঐ সময়ে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন রন্ধ্র প্রাপ্ত হইয়া স্বীয় রথে ভীষণ সশর শরাসন অবস্থানপূর্ব্বক করবারি' ধারণ করিয়া দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। এইরূপে মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ধৃষ্টদ্যুম্নের বশীভূত হইলে সমরাঙ্গনে মহান্ হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। এদিকে জ্যোতিৰ্ম্ময় মহাতপাঃ দ্রোণাচার্য্য অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক শমভাব অবলম্বন করিয়া যোগসহকারে অনাদি পুরুষ বিষ্ণুর ধ্যান করিতে লাগিলেন এবং মুখ ঈষৎ উন্নমিত, বক্ষঃস্থল বিষ্টম্ভিত' ও নেত্রদ্বয় নিমীলিত করিয়া বিষয়াদি বাঞ্ছা পরিত্যাগ ও সাত্ত্বিকভাব অবলম্বনপূর্ব্বক একাক্ষর বেদমন্ত্র, ওঁকার ও পরাৎপর দেবদেবেশ, বাসুদেবকে স্মরণ করত সাধুজনেরও দুর্লভ স্বর্গলোকে গমন করিলেন। তৎকালে বোধ হইল যেন জগতে দুই দিবাকর বিদ্যমান আছেন। ঐ সময় আকাশমণ্ডল তেজোরাশিতে পরিপূরিত হইলে বোধ হইতে লাগিল, যেন নভোমণ্ডল মার্তণ্ডময় হইয়াছে। তৎকালে নিমেষমধ্যেই সেই জ্যোতিঃ তিরোহিত হইয়া গেল। এইরূপে দ্রোণাচার্য্য ব্রহ্মলোকে গমন করিলে দেবগণ হৃষ্টচিত্তে মহান্ কিলকিলাধ্বনি করিতে লাগিলেন।

হে মহারাজ! তৎকালে মানবযোনির মধ্যে কেবল, আমি ধনঞ্জয়, অশ্বত্থামা, বাসুদেব ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই পাঁচ জনই সেই অস্ত্রত্যাগী যোগারূঢ় মহাত্মা দ্রোণাচার্য্যকে শরবিদ্ধ ও রুধিরাক্ত-কলেবরে ঋষিগণের সহিত স্বর্গলোকে গমন করিতে অবলোকন করিলাম। আর কেহই তাঁহার সেই মহিমা সন্দর্শন করিতে সমর্থ হইলেন না। ঐ সময়ে পাঞ্চালতনয় ধৃষ্টদ্যুম্ন মোহবশতঃ সেই মৌনাবলম্বী গতায়ুঃ দ্রোণাচার্য্যকে জীবিত জ্ঞান করিয়া অসিদণ্ডদ্বারা তাঁর মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং মহা আহ্লাদে তরবারি বিঘূর্ণিত করত সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন সকলেই দ্রুপদতনয়কে ধিক্কার প্রদান করিলেন। হে মহারাজ! কেবল আপনার নিমিত্তই সেই আকর্ণপলিত শ্যামাঙ্গ পঞ্চাশীতিবর্ষ বয়স্ক আচার্য্য ষোড়শবর্ষীয় যুবার ন্যায় রণস্থলে বিচরণ করিতেন।

হে কুরুরাজ! যে সময় ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণের বধার্থ ধাবমান হন, তৎকালে মহাবাহু ধনঞ্জয় তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, হে দ্রুপদাত্মজ! আচার্য্যকে বিনাশ না, করিয়া জীবিতাবস্থায় এই খানে আনয়ন কর, তৎপরে দ্রুপদতনয় দ্রোণসংহারে প্রবৃত্ত হইলে মহাবীর অর্জুন, অন্যান্য সেনাপতি ও সমস্ত ভূপালগণ আচার্য্যকে বিনাশ করিও না বলিয়া বারংবার চীৎকার করিতে লাগিলেন। অর্জুন নিতান্ত অনুকম্পা-পরতন্ত্র হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত তাহার প্রতি ধাবমান হইলেন; কিন্তু ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁহাদের বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া রথোপরি ভারদ্বাজকে সংহারপূর্ব্বক ভূতলে নিপাতিত করিলেন। তৎকালে তাঁহার কলেবর দ্রোণের শোণিত লিপ্ত হওয়াতে মার্তণ্ডের ন্যায় লোহিত ও দুর্দ্ধর্য হইয়া উঠিল। হে মহারাজ। সৈনিক পুরুষেরা এইরূপে দ্রোণাচার্য্যকে নিহত দেখিলেন। অনন্তর মহাধনুর্দ্ধর দ্রুপদপুত্র ভারদ্বাজের সেই প্রকাণ্ড মস্তক লইয়া কৌরবগণের সমক্ষে নিক্ষেপ করিলেন। কৌরবগণ দ্রোণাচার্য্যের সেই ছিন্ন মস্তক দর্শনে পলায়নে কৃতনিশ্চয় হইয়া চারি দিকে ধাবমান হইল। হে রাজন। আমি সত্যবতীতনয় মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অনুগ্রহে দ্রোণাচার্য্যকে বিধূম প্রজ্বলিত উল্কার ন্যায় স্বর্গপথে নক্ষত্রলোকে প্রবেশ করিতে দেখিলাম।

এইরূপে দ্রোণাচার্য্য নিহত হইলে কৌরব, পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ নিরুৎসাহ হইয়া মহাবেগে ধাবমান হইলেন। সৈন্য-সকল ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পড়িল। অনেকে শাণিত শরনিকরে হত ও অনেকে নিহতপ্রায় হইল। অনন্তর কৌরবগণ তাৎকালিক পরাজয় ও ভাবী ভয়ের সম্ভাবনাবশতঃ আপনাদিগকে নিকৃষ্ট জ্ঞান করিয়া অধৈর্য্য হইলেন। নরপতিগণ সেই অসংখ্য কবন্ধ সমাকীর্ণ সমরাঙ্গনে আচার্য্যের দেহ বারংবার অন্বেষণ করিলেন; কিন্তু কোন প্রকারেই তাহা প্রাপ্ত হইলেন না। এদিকে পাণ্ডবগণ জয়লাভ ও ভাবী কীর্ত্তিলাভের সম্ভাবনায় নিতান্ত আহ্লাদিত হইয়া বাণশব্দ, শঙ্খধ্বনি ও সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভীমপরাক্রম ভীমসেন সৈন্যমধ্যে ধৃষ্টদ্যুম্নকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, হে দ্রুপদাত্মজ! দুরাত্মা সূতপুত্র কর্ণ ও ধৃতরাষ্ট্রতনয় দুর্য্যোধন নিহত হইলে আমি পুনরায় তোমাকে সমরবিজয়ী বলিয়া আলিঙ্গন করিব। মহাবীর ভীমসেন এই বলিয়া মহা আহ্লাদে বাহ্বাস্ফোটনদ্বারা ধরাতল কম্পিত করিতে লাগিলেন। কৌরবসৈন্যগণ সেই শব্দে ভীত হইয়া ক্ষাত্রধৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক সমরে অপরাজুখ হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। পাণ্ডুতনয়েরাও জয়লাভ করিয়া হৃষ্টচিত্তে শত্রুক্ষয়-জনিত সুখানুভব করিতে লাগিলেন।

দ্রোণবধ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।