কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

সভাপর্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

রাজসূয়িক পর্ব্বাধ্যায়
অ্যাভিহরণ পর্ব্বাধ্যায়
শিশুপালবধ পর্ব্বাধ্যায়
দ্যূত পর্ব্বাধ্যায়

সভাপর্ব

রাজসূয়িক পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নরোত্তম নর, দেবী সরস্বতী এবং বেদব্যাসকে প্রণাম করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

যুধিষ্ঠিরের রাজ্য বর্ণন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! রাজা যুধিষ্ঠির প্রযত্নাতিশয়-সহকারে প্রজামণ্ডলীর রক্ষণাবেক্ষণ, সত্য প্রতিপালন ও অরাতিকুল সমূলে উন্মুলন করিলে প্রজাসকল স্ব স্ব কর্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠানে তৎপর হইল। যথাশাস্ত্র কর গ্রহণ ও ধৰ্ম্মতঃ রাজ্যশাসন করাতে জলদমালা যথাকালে পর্যাপ্ত পরিমাণে বারি বর্ষণ করিতে লাগিল; জনপদ সমৃদ্ধ হইয়া উঠিল; রাজার পুণ্যবলে কৃষি, বাণিজ্য ও গোরক্ষণ প্রভৃতি সমুদায় কার্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতে লাগিল; কেহ কাহাকে প্রতারণা করিত না; দস্যু, তস্কর, ধূর্ত্ত ও রাজপুরুষদিগের মুখে মিথ্যাকথা শুনিতে পাওয়া যাইত না; তৎকালে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ব্যাধিভয় ও অগ্নিভয় প্রভৃতি কিছুমাত্র অমঙ্গল ঘটনা ঘটিত না। সামন্ত ভূপতিগণ জিগীষাশূন্য হইয়া কেবল উপহার প্রদান ও প্রিয়কার্য্য করিবার নিমিত্ত যুধিষ্ঠিরের অনুসরণ করিতেন, তিনি কখন অধর্মাচরণপূর্ব্বক ধনাগমের চেষ্টা পাইতেন না, তথাপি তাঁহার এত ঐশ্বর্য্য হইয়াছিল যে, শত শত বৎসর অকাতরে ব্যয় করিলেও ক্ষয়প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল না। মহীপতি কৌন্তের স্বীয় বাসভবন ও কোষাগারের পরিমাণ সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া যজ্ঞানুষ্ঠানে মানস করিলেন। তদীয় সুহৃদ্বর্গ একত্র ও পৃথক্ হইয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিল। হে মহারাজ। আপনার যজ্ঞানুষ্ঠানের উপযুক্ত অবসর উপস্থিত হইয়াছে, অতএব অবিলম্বে আরম্ভ করুন।

যুধিষ্ঠিরের নিকটে কৃষ্ণের আগমন ও যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞোদ্যোগ।

সকলে উক্ত প্রকার জল্পনা করিতেছেন, ইত্যবসরে চরাচরশ্রেষ্ঠ ভগবান্ ভূতভাবন সনাতন বাসুদেব তথায় সমু-পস্থিত হইলেন। যেমন প্রাচীরদ্বারা পুরী রক্ষিত হয়, তদ্রূপ তিনি যদুকুলের পরিরক্ষক ছিলেন। কৃষ্ণ বসুদেবকে সৈন্যা-ধিকারে নিযুক্ত করিয়া ধর্মরাজের নিমিত্ত অসংখ্য ধন ও অবিনশ্বর রত্নজাত গ্রহণপূর্ব্বক চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে নগরে প্রবেশ করিলেন। তদীয় সৈন্যস্থ রথনির্ঘোষে রাজপুরী প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। যেমন সূর্য্যোদয়ে লোকের অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হয় এবং নির্ব্বাত স্থানে বায়ু সঞ্চারিত হইলে সকলে অনির্বচনীয় সুখানুভব করে, তদ্রূপ কৃষ্ণের সমাগমে ভারত-কুল সুখহ্রদে ও আনন্দসাগরে নিমগ্ন হইলেন। তৎকালে জনপূর্ণ ভারতকুল সমধিক সঙ্কুল হইয়া উঠিল। তত্ৰত্য জনগণ প্রত্যুদ্গমনপূর্ব্বক কৃষ্ণের যথাবিধি সৎকার করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃচতুষ্টয়, পুরোহিত ধৌম্য ও মহর্ষি দ্বৈপায়ন প্রমুখ ঋষিগণে পরিবৃত হইয়া অনাময় প্রশ্নপূর্ব্বক সুখাসীন কৃষ্ণকে কহিতে লাগিলন, হে বাসুদেব! কেবল তোমার অনুগ্রহে এই সসাগরা বসুন্ধরা আমার বশবর্তিনী হইয়াছে, তোমারই প্রসাদে আমি এই অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি হইয়াছি। এক্ষণে উক্ত সমস্ত ধনসম্পত্তি বিপ্রসাৎ করিতে বাসনা করি, কিন্তু আমার নিতান্ত অভিলাষ যে, তোমার ও অনুজগণের সহিত মিলিত হইয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করি; অতএব কার্য্যারম্ভে অনুমতি করিয়া আমাকে চরিতার্থ কর। হে গোবিন্দ। তোমাকে ঐ যজ্ঞে দীক্ষিত হইতে হইবে, তুমি দীক্ষিত হইলেই আমি নিষ্পাপ হইব, সন্দেহ নাই। অথবা অনুজগণের সহিত আমাকেই দীক্ষিত হইতে আজ্ঞা কর, তৎকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইলেই আমি অনুত্তম যজ্ঞানুষ্ঠানের ফলভাগী হইব, সন্দেহ নাই।

যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অনুমতি।

কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের ভূরি ভূরি গুণকীর্ত্তনপূর্ব্বক প্রত্যুত্তর করিলেন, হে মহারাজ! আপনিই মহাক্রতু রাজসূয় অনুষ্ঠানের উপযুক্ত পাত্র; অতএব অবিলম্বে যজ্ঞে দীক্ষিত হউন। আপনি যজ্ঞ সমাপন করিলে আমরা সকলেই কৃতকার্য্য হইব। আমি আপনার হিতানুষ্ঠানে তৎপর থাকিলাম, আপনি স্বাভিলষিত যজ্ঞ আরম্ভ করুন। আপনি আমাকে যে কার্য্যে নিয়োগ করিবেন, আমি তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিব। যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে কৃষ্ণ! আমার ইচ্ছানুসারে যখন তুমি স্বয়ং উপস্থিত হইয়াছ, তখন আমার সঙ্কল্প সফল হইয়াছে এবং সিদ্ধিলাভে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

রাজা যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের নিমিত্ত দ্রব্যসামগ্রী আহরণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর অমাত্যগণ ও সহদেবকে আজ্ঞা করিলেন, ব্রাহ্মণেরা যে সমস্ত যজ্ঞাঙ্গ দ্রব্য আয়োজনের অনুমতি করিয়াছেন, তাহা এবং অন্যান্য সমুদায় উপকরণসামগ্রী, মাঙ্গল্য দ্রব্য ও ধৌম্যোক্ত যজ্ঞসম্ভার-সকল সত্বর আনয়ন করাও। ইন্দ্রসেন, বিশোক এবং অর্জুনসারথি পুরু, ইঁহারা আমার প্রিয়চিকীর্ষার্থ অন্নাদি আহরণে নিযুক্ত হউন। তুমি ব্রাহ্মণগণের প্রিয়কার্য্য সাধনার্থ মনোহর, সুরস, সুগন্ধি সমুদায় কাম্য বস্তুর আয়োজন কর। যুধিষ্ঠিরের বাক্য সমাপ্ত না হইতেই সহদেব অতি বিনীতভাবে নিবেদন করিলেন, প্রভো! আপনার আদেশের পূর্ব্বেই ঐ সকল কার্য্য সম্পন্ন হইয়াছে।

অনন্তর মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন মূর্ত্তিমান্ বেদস্বরূপ কতিপয় ঋত্বিক্ আনয়ন করিলেন এবং তিনি স্বয়ং সেই যজ্ঞের ব্রহ্মকার্য্যে দীক্ষিত হলেন। ধনঞ্জয়-গোত্রশ্রেষ্ঠ সুসামা সামগানার্থ ব্রতী হইলেন। ব্রহ্মিষ্ঠ যাজ্ঞবন্ধ্য অধ্বর্য্য, বসুপুত্র পৌল ও ধৌম্য হোতা এবং বেদবেদাঙ্গপারগ তাঁহাদের শিষ্যবর্গ ও পুত্রগণ সদস্য হইলেন। তাঁহারা যজ্ঞ বিষয়ে নানাবিধ তর্ক বিতর্ক করিয়া স্বস্তিবাচনপূর্ব্বক সঙ্কল্প করিয়া সেই মহৎ যজ্ঞস্থানের শাস্ত্রোক্ত পূজা করিলেন। পরে শিল্পকারেরা অনুজ্ঞাত হইয়া তথায় দেবগৃহ সদৃশ উত্তমোত্তম গৃহসমূহ নির্মাণ করিল।

রাজগণের নিমন্ত্রণার্থ দূতপ্রেরণ।

অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির সহদেবকে আজ্ঞা করিলেন, হে ভ্রাতঃ! নিমন্ত্রণার্থ দ্রুতগামী দূতসকল সর্ব্বত্র প্রেরণ কর। সহদেব রাজবাক্য শ্রবণমাত্র চতুৰ্দ্দিকে দূতগণ প্রেরণ করিলেন, তাহাদিগকে কহিয়া দিলেন, জনপদস্থ সমস্ত ব্রাহ্মণ ও রাজ-গণকে নিমন্ত্রণ করিয়া আইস এবং বৈশ্য ও সম্মানযোগ্য সদ্বিদ্বান্ শূদ্রদিগকে সমভিব্যাহারে আনয়ন করিও। দূতেরা আজ্ঞা পাইয়া সমুদায় ব্রাহ্মণ ও রাজাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া অপরাপর ব্যক্তিদিগের সহিত শীঘ্র প্রত্যাগমন করিল।

ব্রাহ্মণগণকর্তৃক যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞাভিষেক।

সেই সকল ব্রাহ্মণেরা যথাকালে যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞে দীক্ষিত করিলেন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির যজ্ঞে দীক্ষিত ও সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ, ভ্রাতৃগণ, সুহৃদ্বর্গ, জ্ঞাতিকুল, সহচারিগণ, নানাদেশ-সমাগত প্রধান প্রধান ক্ষত্রিয়সকল ও অমাত্যবর্গে পরিবৃত হইয়া মূর্ত্তিমান ধর্মের ন্যায় যজ্ঞায়তনে গমন করিলেন। রাজ্যের চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সর্ব্ববিদ্যাকুশল বেদবেদাঙ্গপারগ ব্রাহ্মণেরা তথায় সমাগত হইতে লাগিলেন। শিল্পকারেরা ধর্মরাজের শাসনক্রমে তাঁহাদিগের নিমিত্ত পৃথক্ পৃথক্ বাসস্থান নির্মাণ করিল। সেই সকল আবসথ' বহুবিধ অন্নপানীয়ে পরিপূর্ণ, বিচিত্র চন্দ্রাতপে বিভূষিত এবং সর্ব্বসুখপ্রদ দ্রব্য-জাতে সমাকীর্ণ। ব্রাহ্মণেরা রাজাকর্তৃক সৎকৃত হইয়া তথায় বাস করত নৃত্যগীতাদি সন্দর্শনপূর্ব্বক নানাবিধ কথাপ্রসঙ্গে পরম সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। তৎপ্রদেশে ভোজনাসক্ত, আখ্যায়িকা-তৎপর ও আহ্লাদসাগরে নিমগ্ন বিপ্রগণের কোলাহলশব্দ সর্ব্বদা শ্রুত হইতে লাগিল। ফলতঃ তথায় সর্ব্বদা কেবল 'দীয়তাং ভুজ্যতাং" এইমাত্র শব্দ শ্রুতি-গোচর হইত। ধর্মরাজ সমস্ত নিমন্ত্রিত জনগণকে পৃথক্ পৃথক্ গোসমূহ, শয্যা, অসংখ্য সুবর্ণ ও দিব্যাভরণবিভূষিতা রূপ-যৌবনবতী সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী রমণী প্রদান করিলেন। সুরলোকা-ধিপতি ইন্দ্রের ন্যায় পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধীশ্বর মহাত্মা পাণ্ডবের যজ্ঞ এইরূপে উত্তরোত্তর সুসমৃদ্ধ হইয়া উঠিল। অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম, দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, কৃপাচার্য্য ও দুর্য্যোধনাদি ভ্রাতৃবর্গের নিমন্ত্রণার্থ নকুলকে হস্তিনাপুরে প্রেরণ করিলেন।

ভূপতিগণের যজ্ঞে আগমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! নকুল হস্তিনাপুরে যাইয়া বিনয়নম্রবচনে পরম সৎকারপূর্ব্বক ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র ও আচার্য্য প্রমুখ বিপ্রগণকে নিমন্ত্রণ করিলেন। তাঁহারা প্রীতমনে নিমন্ত্রণ - স্বীকার করত যজ্ঞ দর্শনার্থ গমন করিলেন। যজ্ঞের সমারোহ শ্রবণে কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া নানা দিগন্তনিবাসী ক্ষত্রিয়গণ তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারে চলিলেন। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, মহামতি বিদুর, দুর্য্যোধন প্রভৃতি ভ্রাতৃবর্গ, গান্ধাররাজ সুবল, মহাবল শকুনি, অচল, বৃষক, কর্ণ, শল্য, বাহীক, সোমদত্ত, ভূরিশ্রবাঃ, শাল, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য্য, দ্রোণাচার্য্য, সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথ, সপুত্র যজ্ঞসেন, ভগদত্ত, মহাসাগরের উপকূলনিবাসী ম্লেচ্ছগণ, পার্ব্বতীয় ভূপালবৃন্দ, রাজা বৃহদ্বল, পৌণ্ড্রক, বাসুদেব, বঙ্গ ও কলিঙ্গাধিপতি আকর্ষ, কুন্তল, মালবদেশীয় ভূপালসকল, অন্ধকগণ, দ্রাবিড় রাজ্যাধিপতি, সিংহলেশ্বর, কাশ্মীরদেশীয় রাজা কুন্তিভোজ, গৌরবাহন, বাহ্লীকদেশীয় অপরাপর রাজগণ, বিরাট ভূপতি এবং তাঁহার পুত্রদ্বয়, সপুত্র শিশুপাল এবং অন্যান্য নানাজনপদেশ্বর ও রাজপুত্রেরা সকলে বিবিধ রত্নজাত গ্রহণপূর্ব্বক ধর্মরাজের যজ্ঞ সন্দর্শনে আগমন করিলেন।

বলরাম, অনিরুদ্ধ, গদ, প্রদ্যুম্ন, শাম্ব, বীর্য্যবান, চারুদেষ্ণ, কঙ্ক, উন্মুক, নিশঠ, মহাবীর, অঙ্গবাহ প্রভৃতি নিখিল যাদব এবং মধ্যদেশীয় রাজগণ পরমানন্দে মহাসমৃদ্ধ রাজসূয় যজ্ঞে সমাগত হইলেন।

ধর্মরাজ সমাগত রাজগণের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে পৃথক্ পৃথক্ বাসস্থান প্রদান করিতে অনুমতি করিলেন। সকল গৃহই নানাপ্রকার ভক্ষ্য দ্রব্যে পরিপূর্ণ এবং রমণীয় দীর্ঘিকা ও পাদপসমূহে সুশোভিত ছিল। সেই প্রাসাদমালা কৈলাশশিখরের ন্যায় উন্নত, শুভ্র এবং মণিময় কুট্টিমে অলঙ্কৃত। তাহার চতুৰ্দ্দিক্ সুধাধবলিত অত্যুচ্চ প্রাচীরদ্বারা পরিবেষ্টিত, তাহার গবাক্ষসকল, সুবর্ণজালে জড়িত, দ্বারসকল সমসূত্রপাতে বিন্যস্ত, ভিত্তি অশেষপ্রকার ধাতুতে সুগঠিত এবং সোপানপংক্তি এমত সুসংঘটিত যে, আরোহণ ও অবরোহণ করিতে কিছুমাত্র কষ্টবোধ হইত না। তথায় মহার্হ আসনসকল বিস্তীর্ণ ছিল। সমুদায় গৃহ অতি মনোহর রাজোপকরণে সুসজ্জিত এবং কুসুমমালায় বিভূষিত হওয়াতে তাহার শোভার আর পরিসীমা ছিল না। সুরভি অগুরুগন্ধে চতুৰ্দ্দিক্ আমোদিত হইয়াছিল। রাজগণ তথায় প্রবেশমাত্র গতক্রম হইয়া সভার পরম রমণীয় শোভা এবং সদস্যগণ, ব্রহ্মর্ষিগণ ও রাজর্ষিসমূহে পরিবৃত রাজা যুধিষ্ঠিরকে সন্দর্শন করিতে লাগিলেন।

যুধিষ্ঠিরকর্তৃক দুঃশাসন প্রভৃতিকে ভিন্ন ভিন্ন কার্য্যে নিয়োগ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর যুধিষ্ঠির পিতামহ ও গুরুকে অভিবাদন করিয়া ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য্য, দ্রৌণায়ণি, দুর্য্যোধন ও বিবিংশতিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আপনারা সকলে সর্ব্বতোভাবে এই যজ্ঞানুষ্ঠান-বিষয়ে আমাকে অনুগ্রহ করুন। আমার সমস্ত ধনসম্পত্তিতে আপনাদিগের সম্পূর্ণ প্রভুত্ব আছে, যাহাতে আমার শ্রেয়োলাভ হয়, তদ্বিষয়ে মনোযোগী হউন। ব্রত-দীক্ষিত পাণ্ডবাগ্রজ সকলকে এই কথা বলিয়া যোগ্যতানুসারে তাঁহাদিগকে এক এক কার্য্যে নিয়োগ করিলেন। দুঃশাসনের প্রতি নিখিল ভোজ্য দ্রব্যের তত্ত্বাবধারণের ভারার্পণ করিলেন, অশ্বত্থামাকে বিপ্র-সেবায় নিযুক্ত করিলেন, সঞ্জয় রাজপরিচর্যায় তৎপর হইলেন এবং মহানুভব ভীষ্ম ও দ্রোণ কর্তব্যাকর্তব্য বিবেচনা করিতে লাগিলেন। রজত সুবর্ণ প্রভৃতি নানাবিধ রত্নসমূহের রক্ষণাবেক্ষণে ও দক্ষিণাপ্রদানে কৃপাচার্য্য-কে আদেশ করিলেন। অন্যান্য প্রধান প্রধান ব্যক্তিকে অপরাপর কার্য্যে প্রেরণ করিলেন। বাহ্লীক, ধৃতরাষ্ট্র, সোমদত্ত এবং জয়দ্রথ, ইহারা গৃহপতির ন্যায় বিরাজমান রহিলেন। দুর্য্যোধন উপায়ন-প্রতিগ্রহে' এবং শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ব্রাহ্মণগণের পাদপ্রক্ষালনে নিযুক্ত হইলেন। সমাগত জনগণ সভার শোভা ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নয়নগোচর করিয়া অনুত্তম ফল লাভের প্রত্যাশায় তথায় গমন করিলেন। কেহই সহস্রের ন্যূন উপায়ন প্রদান করেন নাই, সকলেই প্রচুর রত্নোপহার দ্বারা যুধিষ্ঠিরের সম্মান বর্দ্ধন করিয়াছিলেন। কৌরব-নন্দন মৎপ্রদত্ত ধনদ্বারাই আরব্ধ যজ্ঞ সমাপন করুন, মনে মনে এইরূপ স্পর্দ্ধা করিয়া সকল রাজারাই বিপুল ধন দান করিয়াছিলেন। সেনা-পরিবৃত বিমানপ্রতিম বিচিত্র রত্ন ও অশেষপ্রকার সমৃদ্ধিসম্পন্ন পরম রমণীয় প্রাসাদমালা, লোকপালদিগের বিমান, ব্রাহ্মণগণের গৃহসমূহ ও সমাগত রাজলোকদ্বারা মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞের অতীব শোভা হইয়াছিল। তিনি ঐশ্বর্য্যে বরুণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন, যজ্ঞ সমাপনকালীন অকাতরে দক্ষিণা প্রদান করাতে ব্রাহ্মণেরা যৎপরোনাস্তি প্রীত হইলেন এবং অকপটে মুক্তকণ্ঠে রাজাকে আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। ঋষিগণকর্তৃক সুচারুরূপে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হইলে দেবতারা পরিতৃপ্ত হইলেন। তৎপরে রাজা যুধিষ্ঠির সমাগত সকল ব্যক্তিকেই অভিলষিত বস্তুদ্বারা সন্তুষ্ট করিয়াছিলেন।

রাজসূয়িক পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।

সভাপর্ব

অ্যাভিহরণ পর্ব্বাধ্যায়।

অভিষেক দিবসে রাজাদির অন্তর্ব্বেদীতে প্রবেশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর অভিষেক দিবসে সৎ-কারার্হ মহর্ষি ও ব্রাহ্মণগণ, রাজগণ সমভিব্যাহারে অন্তর্ব্বেদীতে প্রবেশ করিলেন। নারদপ্রমুখ মহাত্মারা রাজগণের সহিত তথায় অধ্যাসীন হওয়াতে সেই প্রদেশ কি অনির্বচনীয় শোভিত হইয়াছিল। অমিততেজাঃ দেবতা ও দেবর্ষিগণ ব্রহ্মভবনে সমবেত হইয়া কৰ্ম্মান্তর উপাসনাপূর্ব্বক নানাপ্রকার কল্পনা করিতে লাগিলেন। কেহ কহিলেন, ইহা এইরূপ হইবে, কেহ কহিলেন, এ প্রকার নহে; এইরূপ ঘোরতর বিসংবাদিতাপ্রযুক্ত অত্যন্ত বিতণ্ডা উপস্থিত হইল। কেহ কেহ শাস্ত্রপ্রতিপন্ন যুক্তিপ্রদর্শনদ্বারা সামান্য অর্থের গৌরব ও গুর্ব্বর্থের লাঘব করিতে লাগিলেন। মেধাবী ব্যক্তি অন্যকর্তৃক উদাহৃত অর্থ অগ্রাহ্য করিলেন। ধর্মার্থকুশল মহাব্রতসকল, ভাষ্যার্থকোবিদ পণ্ডিতবর্গ কত প্রকার বিচার করিতে লাগিলেন। বেদীবেদজ্ঞ, দেব, দ্বিজ ও মহর্ষিগণে সমাকীর্ণ হইয়া নক্ষত্রমালা বিভূষিত অতি বিস্তীর্ণ নভোমণ্ডলের ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিল। রাজা যুধিষ্ঠিরের সেই বেদীসন্নিধানে শূদ্র বা কোন ব্রতবিহীন অশুচি ব্যক্তির বাসাধিকার ছিল না।

নারদের যজ্ঞবিষয়ক চিন্তা।

দেবর্ষি নারদ ধর্মরাজের যজ্ঞবিধানজা লক্ষ্মী নিরীক্ষণ করত সাতিশয় সন্তোষলাভ করিলেন। অনন্তর সমস্ত ক্ষত্রিয়গণ অবলোকন করিয়া চিন্তার্ণবে নিমগ্ন হইলেন। পূর্ব্বে ব্রহ্মভবনে ভগবানের অংশাবতরণবিষয়ে যে পুরাবৃত্ত শ্রবণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহা তাঁহার স্মৃতিপথে আবির্ভূত হইল। তখন সেই ক্ষত্র-সমাগম দেবসঙ্গম জানিয়া তিনি মনে মনে পুণ্ডরীকাক্ষ নারায়ণকে স্মরণ করিলেন। সুরারিনিসূদন নারায়ণ প্রতিজ্ঞা প্রতিপালনার্থ স্বয়ং ক্ষত্রিয়কুলে অবতীর্ণ হইলেন এবং দেবতা-দিগকে আদেশ করিলেন, তোমরা পরস্পর হিংসা করত পুনর্ব্বার স্ব স্ব লোক প্রাপ্ত হইবে। ভগবান্ নারায়ণ দেবতাদিগকে এইরূপ আদেশ করিয়া স্বয়ং যদুবংশে জন্ম পরিগ্রহ করিলেন। নক্ষত্রমধ্যগত চন্দ্রমাঃ যেমন শোভা পান, তদ্রূপ ভগবান্ অন্ধকবৃষ্ণিবংশমধ্যে বিরাজিত হইতে লাগিলেন। ইন্দ্রাদি সুরগণ যাঁহার বাহুবলের উপাসনা করেন, সেই অরিবিমৰ্দ্দন হরি এক্ষণে মনুষ্যভাব অবলম্বন করিলেন। কি আশ্চর্য্য! ভগবান্ স্বয়ম্ভূ পুনর্ব্বার এই ক্ষত্রিয়দিগের সংহার করিবেন। যাঁহার উদ্দেশ্যে লোক যাগ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে, সেই যজ্ঞেশ্বর স্বয়ং আসিয়া বহুমান প্রদর্শনপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের মহাব্বরে অবস্থিতি করিতেছেন। সর্ব্বজ্ঞ নারদ নারায়ণকে স্মরণ করিয়া এই সমস্ত চিন্তা করিতে লাগিলেন।

ভীষ্মের বাক্যানুসারে সর্বাগ্রে শ্রীকৃষ্ণকে অর্ঘ্যপ্রদান।

অনন্তর ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, হে ভারত! রাজা-দিগের যথার্হ সৎকার বিধান কর। আচার্য্য, ঋত্বিক্, সম্বন্ধী, স্নাতক, নৃপতি এবং প্রিয় ব্যক্তি, এই ছয় জন অ্যার্হ। ইঁহারা অর্ঘ্য পাইবার মানসে বহু দিবসাবধি আমাদিগের অনুগত হইয়া রহিয়াছেন। অতএব ইহাদিগের সকলের নিমিত্ত এক একটি অর্ঘ্য আনয়ন কর; পরে যিনি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ও সমর্থ হইবেন; তাঁহাকেই অর্ঘ্য প্রদান করিবে। যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে পিতামহ। আপনি কাহাকে অর্ঘ্যদানের উপযুক্ত পাত্র মনে করিয়াছেন, বলুন। ভীষ্ম স্বীয় বিবেকশক্তিদ্বারা কৃষ্ণকে অ্যার্হ নিশ্চয় করিয়া কহিলেন, যেমন জ্যোতিষ্কসমুদায়ের মধ্যে ভাস্করের প্রভা সর্ব্বাতিশায়িন, তদ্রূপ এই সমস্ত লোকের মধ্যে তেজঃ, বল ও পরাক্রম বিষয়ে কৃষ্ণই শ্রেষ্ঠ; যেমন তিমিরাবৃত প্রদেশে সূর্যরশ্মিসমাগমে লোকের অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হয়, যেমন নির্ব্বাত-স্থানে বিশুদ্ধ বায়ু সঞ্চালিত হইলে আহ্লাদের পরিসীমা থাকে না, তদ্রূপ কৃষ্ণের সমাগমে আমাদিগের সভা উদ্ভাসিত ও আহ্লাদিত হইয়াছে। অতএব তাঁহাকে অর্ঘ্য প্রদান করা কর্তব্য। অনন্তর সহদেব ভীষ্মকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া কৃষ্ণকে যথাবিধি অর্ঘ্য প্রদান করিলেন। কৃষ্ণ শাস্ত্রদৃষ্ট বিধিপূর্ব্বক সেই অর্ঘ্য প্রতিগ্রহ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত শিশুপাল কৃষ্ণের পূজা সহ্য করিতে না পারিয়া সভামধ্যে ভীষ্ম, যুধিষ্ঠির এবং কৃষ্ণকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন।

শ্রীকৃষ্ণকে অর্ঘ্যপ্রদানে শিশুপালের ক্রোধ ও কৃষ্ণনিন্দা।

শিশুপাল কহিলেন, হে পাণ্ডব! এই সমস্ত রাজগণ উপস্থিত থাকিতে কৃষ্ণ কোনক্রমেই পূজার্হ হইতে পারেন না। তুমি কামতঃ কৃষ্ণের অর্চ্চনা করিয়াছ, এরূপ ব্যবহার তোমাদিগের উপযুক্ত হয় নাই। তোমরা বালক; সুতরাং ধর্ম্মের কিছুই জান না, ধৰ্ম্ম অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, আর এই ভীষ্ম অদূরদর্শী এবং স্মৃতিশক্তিবিহীন। হে ভীষ্ম! তোমার ন্যায় প্রিয়চিকীর্ষু ধার্মিক ব্যক্তি সাধু-সমাজে অত্যন্ত অবমানিত হয়। যে কৃষ্ণ কখন রাজা নয়, তাহাকে তোমরা কি বলিয়া অর্ঘ্য প্রদান করিলে এবং সেই বা কিরূপে সকল মহীপালের মধ্যে পূজা প্রতিগ্রহ করিল? অথবা কৃষ্ণকে স্থবির মনে করিয়া থাকিবে, যাহা হউক, বৃদ্ধতম বসুদেব থাকিতে তাঁহার পুত্র কেন পূজার্হ হইল? হে কুরুনন্দন! কৃষ্ণ সর্ব্বদাই তোমার অনুবৃত্তি করে এবং তোমার প্রিয়ার্থী যথার্থ বটে, কিন্তু দ্রুপদ থাকিতে কৃষ্ণের পূজা করা তোমার উচিত হয় নাই। যদি কৃষ্ণকে আচার্য্য মনে করিয়া থাক, তথাপি দ্রোণ থাকিতে কৃষ্ণ কেন অর্চ্চিত হইল? অথবা কৃষ্ণকে ঋত্বিক্ মনে করিয়া থাকিবে, যাহা হউক, বৃদ্ধ দ্বৈপায়ন উপস্থিত থাকিতে কৃষ্ণকে পূজা করা তোমার উচিত হয় নাই। হে রাজন! স্বেচ্ছামরণ পুরুষসত্তম শান্তনব ভীষ্ম, মহাবীর সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ অশ্বত্থামা, রাজেন্দ্র দুর্য্যোধন, ভারতাচার্য্য কৃপ, কিংপুরুষাচার্য্য দ্রুম, রাজা রুক্মী এবং মদ্রাধিপ শল্য, এই সমস্ত মহাত্মারা থাকিতে কৃষ্ণকে কেন অর্ঘ্য প্রদান করিলে? হে রাজন! যিনি জামদগ্ন্যের প্রিয় শিষ্য, যিনি আত্মবল আশ্রয় করিয়া রণক্ষেত্রে সমুদায় রাজলোক পরাভব করিয়াছিলেন, সেই মহাবল পরাক্রান্ত বর্ণকে অতিক্রম করিয়া কিরূপে কৃষ্ণের পূজা করিলে? বাসুদেব ঋত্বিক্ নয়, আচার্য্য নয় এবং রাজাও নয়। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! কেবল প্রিয়চীকির্ষু হইয়া তুমি কৃষ্ণকে অর্ঘ্য প্রদান করিয়াছ। অথবা যদি কৃষ্ণকেই অর্ঘ্য প্রদান করিবে মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়াছিলে, তবে কি নিমিত্ত এই সকল রাজগণকে আহ্বান করিয়া তাঁহাদিগের অপমান করিলে? আমরাও মহাত্মা কৌন্তেয়ের ভয়, সান্ত্বনা, অথবা লোেভবশতঃ তাঁহাকে কর প্রদান করি নাই, তিনি ধর্মাচরণে প্রবৃত্ত এবং সাম্রাজ্যে দীক্ষিত, এই বলিয়াই কর প্রদান করিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদিগের সম্মান রক্ষা করিলেন না। এই রাজসভায় অপ্রাপ্তলক্ষণ কৃষ্ণকে অর্ঘ্য প্রদান করিলেন, ইহার পর আর আমাদিগের অপমানের বিষয় কি আছে? ধর্মপুত্রের "ধর্মাত্মতা” এই যশঃ নিতান্ত অকারণ, সন্দেহ নাই। কোন্ ধার্মিক পুরুষ ধৰ্ম্মভ্রষ্ট ব্যক্তিকে সজ্জনোচিত পূজা করিয়া থাকে? যে বৃষ্ণিকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছে এবং পূর্ব্বে অন্যায়াচরণ দ্বারা মহাত্মা জরাসন্ধের প্রাণ সংহার করিয়াছে, সেই দুরাত্মা কৃষ্ণকে অর্ঘ্য নিবেদন করাতে অদ্য যুধিষ্ঠিরের নীচত্ব প্রদর্শিত ও ধাৰ্ম্মিকতা বিনষ্ট হইল। কুন্তীতনয়েরা ভীত, নীচস্বভাব ও তপস্বী, কিন্তু ওহে কৃষ্ণ! তোমার সবিশেষ পর্যালোচনা করা কর্ত্তব্য; তাহারাই যেন নীচতাপ্রযুক্ত তোমাকে পূজা প্রদান করিল, তুমি স্বয়ং অযোগ্য হইয়া কিরূপে তাহা স্বীকার করিলে? যেমন গোপনে ঘৃতের কণামাত্র ভক্ষণ করিয়া কুক্কর আত্মশ্লাঘা করে, তাহার ন্যায় তুমি আপনার অনুপযুক্ত পূজার বহুমান করিতেছ। ওহে কৃষ্ণ! ইহাতে রাজেন্দ্রগণের অবমাননা হয় নাই; স্পষ্টই প্রতীতি হইতেছে যে, পাণ্ডবেরা তোমাকেই বিদ্রূপ করিয়াছে। যেমন ক্লীবের দারপরিগ্রহ ও অন্ধের রূপদর্শন নিরর্থক, সেইরূপ রাজ্যবিহীনের রাজসম্মান অতীব লজ্জাকর। রাজা যুধিষ্ঠির ও ভীষ্মের যেরূপ বিদ্যাবুদ্ধি এবং কৃষ্ণ যাদৃশ, তাহাও দৃষ্ট হইল। শিশুপাল তাঁহাদিগকে এই কথা বলিয়া আসন হইতে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক রাজগণ-সমভিব্যাহারে সভা হইতে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলেন।

ভীষ্মের কৃষ্ণস্তুতি।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির সত্বরে শিশুপালের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনাপূর্ব্বক মধুরবাক্যে কহিতে লাগিলেন, হে মহীপাল। তুমি যাহা কহিলে, তাহা তোমার উপযুক্ত বাক্য হয় নাই, উহা নিতান্ত অধৰ্ম্মযুক্ত, পরুষ এবং নিরর্থক। নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে ধৰ্ম্ম কাহাকে বলে, তুমি নিজেই তাহা জান না, ধর্মজ্ঞান থাকিলে ভীষ্মের অপমান করিতে না! দেখ, যে সকল রাজারা তোমা অপেক্ষা বয়োবৃদ্ধ, কৃষ্ণের পূজা তাঁহাদিগকে অভিলষণীয়, অতএব এ বিষয়ে তোমার ক্ষান্ত হওয়াই উচিত। হে চেদিপতে। কৃষ্ণ এবং ভীষ্মকে যথার্থরূপ পরিজ্ঞাত হও, কৌরবকুল ইঁহাকে যেমন চিনিতে পারিয়াছেন, তুমি সেরূপ জানিতে পার নাই।

ভীষ্ম কহিলেন, হে যুধিষ্ঠির! লোকবৃদ্ধ কৃষ্ণের অর্চ্চনা যাহার অনভিমত, এমন ব্যক্তিকে অনুনয় বা সান্ত্বনা করা অনুচিত। যে ক্ষত্রিয় সমরে ক্ষত্রিয়ান্তরকে পরাজয় ও আপনার বশীভূত করিয়া তাহাকে পরিত্যাগ করেন, তিনি সেই নির্জিত ক্ষত্রিয়ের গুরু হয়েন। এই মহতী নৃপসভায় এক জন মহীপালও দৃষ্ট হয়েন না, যাঁহাকে কৃষ্ণ তেজোবলে পরাভব করেন নাই, অচ্যুত কেবল আমাদিগের অর্চ্চনীয় এমন নহেন, সেই মহাভুজ ত্রিলোকীর পূজনীয়; তিনি যুদ্ধে অসংখ্য ক্ষত্রিয়বর্গের পরাজয় করিয়াছেন এবং অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ড তাঁহাতেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে; এই নিমিত্ত অন্যান্য বর্ষিষ্ঠ ব্যক্তি থাকিতেও আমরা কৃষ্ণকে অর্ঘ্য প্রদান করিয়াছি, তাহাতে তোমার এরূপ গর্ব্ব প্রকাশ নিতান্ত অযোগ্য; অতঃপর আর যেন তোমার বুদ্ধির এরূপ ব্যতিক্রম না ঘটে। আমি অনেকানেক জ্ঞানবৃদ্ধ সাধু পুরুষ-দিগের সহবাস করিয়াছি এবং তাঁহাদিগের নিকট সর্ব্বগুণাধার কৃষ্ণের অনেক প্রকার গুণরাশি শ্রবণ করিয়াছি। কৃষ্ণ জন্মিয়া অবধি যে সকল কর্ম করিয়াছেন, লোকে মৎসন্নিধানে পুনঃ পুনঃ তৎসমুদায় কীর্তন করিয়াছে। তিনি অত্যন্ত বালক হইলেও মারা যাঁহার পরীক্ষা করিয়া থাকি। কৃষ্ণের শৌর্য্য, বীর্য্য ও বিজয়প্রভৃতি সমস্ত পরিজ্ঞাত হইয়া সেই ভূতসুখাবহ জগদর্চ্চিত অচ্যুতের পূজা বিধান করিয়াছি, নতুবা কোন প্রকার সম্বন্ধের অনুরোধে অথবা উপকার প্রত্যাশায় তদীয় সৎকার করি নাই। গুণবাহুল্যপ্রযুক্ত বৃদ্ধ ব্যক্তিদিগকে অতিক্রম করিয়াও কৃষ্ণের অর্চ্চনা করা বিধেয়। ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে যিনি জ্ঞানবৃদ্ধ তিনিই অর্চ্চনীয়, ক্ষত্রিয়দিগের মধ্যে অধিক বলশালী ব্যক্তি পূজনীয়, বৈশ্যকুলে ধনধান্যসম্পন্ন ব্যক্তি সম্মানভাজন এবং শূদ্র বংশজাত বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি সৎকারাহ হয়েন; কিন্তু কৃষ্ণের পূজ্যতাবিষয়ে দুইটি হেতু আছে; তিনি নিখিল বেদবেদাঙ্গ পারদর্শী ও সমধিক বলশালী। ফলতঃ মনুষ্যলোকে তাদৃশ বলবান্ এবং বেদবেদাঙ্গসম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রত্যক্ষ হওয়া সুকঠিন। দান, দাক্ষ্য, শ্রুত, শৌর্য্য, লজ্জা, কীর্ত্তি, বুদ্ধি, বিনয়, অনুপম শ্রী, ধৈর্য্য ও সন্তোষ প্রভৃতি সমুদায় গুণাবলী কৃষ্ণে নিয়ত বিরাজিত রহিয়াছে। অতএব সেই সর্ব্বগুণসম্পন্ন আচার্য্য, পিতা ও গুরুস্বরূপ পূজার্হ কৃষ্ণের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা তোমাদিগের সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য। তিনি একাধারে ঋত্বিক্, গুরু, সম্বন্ধী, স্নাতক, রাজা এবং প্রিয় পাত্র, এই নিমিত্ত অচ্যুত অর্চ্চিত হইয়াছেন। কৃষ্ণই এই চরাচর বিশ্বের সৃষ্টিস্থিতি প্রলয়কর্তা; তিনিই অব্যক্ত প্রকৃতি, সনাতন কর্তা এবং সর্ব্বভূতের অধীশ্বর; সুতরাং পরম পূজনীয় তাহাতে আর সন্দেহ কী? বুদ্ধি, মনঃ, মহত্তত্ত্ব, পৃথিব্যাদি পঞ্চভূত, সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিক্, বিদিক্ সমুদায়ই একমাত্র কৃষ্ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। যাদৃশ বেদচতুষ্টয়ের অগ্নিহোত্র, ছন্দের গায়ত্রী, মনুষ্যের রাজা, নদীর সাগর, নক্ষত্রমণ্ডলীর চন্দ্র, তেজঃপদার্থের আদিত্য, সমস্ত পর্ব্বতের সুমেরু এবং বিহঙ্গজাতির গরুড় মুখস্বরূপ হইয়াছেন, সেইরূপ ত্রিলোকমধ্যে ঊর্দ্ধ, তির্য্যগ্‌ ও অধঃপ্রদেশে জগতের যাবতী গতি নিরূপিত রহিয়াছে, ভগবান্ কেশবই তাহার মুখস্বরূপ হয়েন। এই বালক শিশুপাল সর্ব্বদা সর্ব্বস্থলে কৃষ্ণকে বুঝিতে পারেন না, এই কারণে ইনি এইরূপ কহিতেছেন। যে বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি অত্যুৎকৃষ্ট মৰ্ম্ম অনুসন্ধান করিয়া থাকেন, তিনি যেমন ধর্মের মর্ম বুঝিতে পারেন, চেদিরাজ শিশুপাল তদ্বিষয়ে কদাচ সমর্থ হইবেন না; বালক, বৃদ্ধ ও ভূপালগণমধ্যে কোন্ ব্যক্তি অচ্যুতকে অর্চ্চনীয় বলিয়া বোধ করেন না? কোন্ ব্যক্তিই বা কৃষ্ণের সৎকার বিষয়ে অনাদর করিয়া থাকেন? যদ্যপি কৃষ্ণের পূজা শিশুপালের নিতান্ত অসহ্য বোধ হইয়া থাকে, তবে তাঁহার যেরূপ অভিরুচি হয় করুন।

যাদব ও পাণ্ডবদিগের বিরুদ্ধে চেদিরাজের মন্ত্রণা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাবল ভীষ্ম, এই কথা বলিয়া নিবৃত্ত হইলে পর, সহদেব কহিতে লাগিলেন, কেশিনিহন্তা কেশব অমিত পরাক্রমশালী, তিনি আমাদিগের পরম পূজনীয়; যে সকল নৃপাধমেরা কৃষ্ণের পূজা সহ্য করিতে না পারে, আমি তাহাদিগের মস্তকে পদার্পণ করি, যদি তাহাদিগের ক্ষমতা থাকে, সমুচিত উত্তর প্রদানে সাহসী হউক। যাঁহারা বুদ্ধিমান, সদসৎ বিবেচনা করিতে সমর্থ, সেই নৃপোত্তমেরা অবশ্যই কৃষ্ণকে পূজা করিতে অনুজ্ঞা করিবেন। সহদেব উক্ত প্রকার গর্ব্ব প্রদর্শনপূর্ব্বক পাদোত্তোলন করিলে, সেই সকল অভিমান-পূর্ণ মহাবল রাজগণের মধ্যে কেহই বানিষ্পত্তি করিতে পারিলেন না। অনন্তর সহদেবের মস্তকে পুষ্পবৃষ্টি পতিত হইল এবং আকাশবাণী তাঁহাকে সাধুবাদ করিতে লাগিল। সৰ্ব্বজ্ঞ সর্ব্বসংশয়চ্ছেদী নারদ সর্ব্বসমক্ষে কহিলেন, যাহারা পদ্ম-পলাশলোচন কৃষ্ণের আরাধনায় পরাজুখ, সেই নরাধমেরা জীবস্মৃত, তাহাদিগের সহিত বাক্যালাপ করিতে নাই। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বিশেষজ্ঞ সহদেব পূজার্হ জনগণের পূজা করিয়া কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিলেন। কৃষ্ণ অর্চ্চিত হইলেন দেখিয়া সুনীথনামা এক মহাবল পরাক্রান্ত বীর পুরুষ ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর ও আরক্তনেত্র হইয়া সকল রাজগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, আমি পূর্ব্বে সেনাপতি ছিলাম, সম্প্রতি যাদব ও পাণ্ডবকুলের সমূলোমূলন করিবার নিমিত্ত অদ্যই সমরসাগরে অবগাহন করিব। চেদিরাজ শিশুপাল মহীপালগণের অবিচলিত উৎসাহ সন্দর্শনে প্রোৎসহিত হইয়া যজ্ঞের ব্যাঘাত জন্মাইবার নিমিত্ত তাঁহাদিগের সহিত মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। যাহাতে যুধিষ্ঠিরের অভিষেক এবং কৃষ্ণের পূজা না হয়, তাহা আমাদিগের সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য। রাজারা নির্ব্বেদপ্রযুক্ত ক্রোধপরবশ হইয়া মন্ত্রণা করিতেছেন দেখিয়া কৃষ্ণ স্পষ্টই বুঝিতে পারিলেন যে, তাঁহারা যুদ্ধার্থ পরামর্শ করিতেছেন।

অর্ঘ্যাভিহরণ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।

সভাপর্ব

শিশুপালবধ পর্ব্বাধ্যায়।

ভীষ্মের প্রতি যুধিষ্ঠিরের বাক্য ও শিশুপালের ক্রোধ।

তদনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির সাগরসদৃশ রাজমণ্ডলকে রোষ-প্রচলিত দেখিয়া প্রাজ্ঞতম পিতামহ ভীষ্মকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে পিতামহ! এই মহান্ রাজসমুদ্র সংক্ষোভিত হইয়া উঠিয়াছে, এক্ষণে যাহা কর্তব্য হয়, অনুমতি করুন। যাহাতে যজ্ঞের বিঘ্ন ও প্রজাগণের অহিত না হয়, তাহার উপায় বিধান করুন। কুরুপিতামহ ভীষ্ম কহিলেন, যুধিষ্ঠির! ভীত হইও না, কুকুর কখন সিংহকে হনন করিতে পারে না, আমি পূর্ব্বেই ইহার কল্যাণকর উপায় স্থির করিয়াছি। যেমন সিংহ প্রসুপ্ত হইলে কুকুরগণ সমাগত ও মিলিত হইয়া চীৎকার করিয়া থাকে, সেইরূপ প্রসুপ্ত বৃষ্ণিসিংহ বাসুদেবের সম্মুখে, এই কুপিত রাজমণ্ডল চীৎকার করিতেছে। সিংহস্বরূপ অচ্যুত যাবৎ জাগরিত না হইতেছেন, ততক্ষণ নৃসিংহ চেদিরাজ এই সকল মহীপালকে সিংহ করিয়া তুলিতেছে। পার্থিবশ্রেষ্ঠ শিশুপাল অচেতন হইয়া পার্থিবদিগকে যমালয়ে লইয়া যাইবার কামনা করিতেছে। কিন্তু নারায়ণ শিশুপালের তেজঃ অবিলম্বেই প্রত্যাহরণ করিবেন। হে প্রাজ্ঞতম! চেদিরাজের এবং সমস্ত মহীপতির মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছে। এই নরোত্তম নারায়ণ যখন যে যে ব্যক্তিকে পৃথিবী হইতে গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করেন, তখন চেদিরাজের ন্যায় তাহাদিগের বুদ্ধি এপ্রকার বিপ্লাবিত হইয়া থাকে। ত্রিলোকীমধ্যে রমাপতি চতুর্ব্বিধ জীবের স্রষ্টা ও সংহর্তা। ভীষ্মের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শিশুপাল তাঁহার প্রতি অতি কঠোর বাক্য প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিলেন।

শিশুপালকর্তৃক ভীষ্মের ভর্ৎসনা।

শিশুপাল কহিতে লাগিলেন, হে ভীষ্ম। পার্থিবগণকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়া লজ্জিত হইতেছ না কেন? বৃদ্ধ হইয়া কি কুলদূষক' হইয়াছ? এক্ষণে স্থবিরাবস্থা উপস্থিত এবং সমস্ত কৌরবের প্রধান হইয়াছ; অতএব ধৰ্ম্মসঙ্গত বাক্য প্রয়োগ করাই তোমার উচিত। যেমন কোন বৃহৎ তরণীর পশ্চাদ্ভাগে একখানি ক্ষুদ্র নৌকা বদ্ধ থাকে, যেমন একজন অন্ধ অন্য অন্ধের অনুসরণ করে, হে ভীষ্ম! তুমি যাহাদের অগ্রণী, সেই কৌরবেরাও সেইরূপ হইয়াছে তাহার সন্দেহ নাই। বিশেষতঃ এই বাসুদেবের পূতনাঘাত প্রভৃতি ক্রিয়াসকল কীর্ত্তন করিয়া আমাদিগের অন্তঃকরণে সমধিক বেদনা প্রদান করিলে। হে ভীষ্ম! তুমি অহষ্কৃত ও বিচেতন হইয়া দুরাত্মা কেশবের স্তুতিবাদ করিতে ইচ্ছা করিতেছ। এক্ষণে তোমার জিহ্বা কেন শতধা বিদীর্ণ হইতেছে না? যাহাকে বালকে-রাও ঘৃণা প্রদর্শন করে, তুমি জ্ঞানবৃদ্ধ হইয়া সেই গোপালের প্রশংসা করিতেছ। কৃষ্ণ বাল্যকালে শকুনি এবং যুদ্ধানভিজ্ঞ অশ্ব ও বৃষভ নষ্ট করিয়া-ছিল, তাহার আশ্চর্য্য কি? চেতনাশূন্য কাষ্ঠময় শকট পাদদ্বারা পাতিত করিয়াছিল, তাহাই বা এত কি অদ্ভুত কৰ্ম্ম? না বল্মীকপিণ্ডমাত্র যে গোবর্দ্ধন পর্বতকে যে সপ্তাহ ধারণ করিয়া-ছিল, তাহাই কি বিস্ময়কর? এই ঔদরিক বাসুদেব পর্ব্বোতপরি ক্রীড়া করিতে করিতে যে রাশীকৃত অন্নভোজন করিয়াছিল, তাহা শ্রবণ করিয়াই সেই মুগ্ধস্বভাব গোপবালকেরা বিস্ময়াপন্ন হইয়াছিল। এই দুরাত্মা বলবান্ কংসের অন্নে প্রতিপালিত হইয়া তাহাকেই সংহার করিয়াছে, এই পৌরুষের কার্য্যেই কি বিস্মিত হইয়াছ? হে কুরুকুলাধম ভীষ্ম! তুমি অধার্মিক, এই নিমিত্ত তোমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। সাধু ব্যক্তিরা সুশীলদিগকে এই প্রকারে অনুশাসন করিয়া থাকেন যে, স্ত্রী, গো, ব্রাহ্মণ ও অন্নদাতা ও প্রতিজ্ঞাশ্বাসিত ব্যক্তির উপর শস্ত্রপাত করিবে না। তোমাতে তৎসমুদায়েরই অন্যথা দৃষ্ট হইতেছে। হে কৌরবাধম! আমি যেন কিছুই জানি না, তুমি যেন বয়োবৃদ্ধ হইয়া জ্ঞানবৃদ্ধ হইয়াছ, এই মনে করিয়া বহুতর প্রশংসা করত কেশবের মহিমার উল্লেখ করিতেছ। হে ভীষ্ম! তোমার বাক্যে গোহত্যা ও স্ত্রীহত্যাকারীকে কি পূজা করিতে হইবে? না এমন ব্যক্তি কোন প্রকারে প্রশংসাভাজন হইতে পারে? হে ভীষ্ম! তোমার কথাতে সে আপনাকে প্রাজ্ঞেশ্বর ও জগদীশ্বর বলিয়া অভিমান করিতেছে, তোমার বাক্যসমুদায় মিথ্যা হইলেও তোমাকে কিছু কহিতে চাই না। স্তাবকের স্তব অত্যুক্তিদোষে দূষিত হইলেও তাহার চাটুকারিতার নিমিত্ত কেহই শাসন করে না, কারণ যাহার যে প্রকার স্বভাব; ভূলিঙ্গনামক শকুনির ন্যায় কে তাহার অনুবর্তী হইয়া চলে? তুমি জঘন্য-প্রকৃতি, অধার্মিক ও সৎপথচ্যুত, অতএব তুমি যাহাদিগের মন্ত্রী, কৃষ্ণ যাহাদিগের পূজনীয়, সেই পাণ্ডবদিগের স্বভাব যে দূষিত. হইবে, তাহার সন্দেহ কি? হে ভীষ্ম! ধর্ম্মের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া তুমি যে সকল কর্ম করিয়াছ, কোন জ্ঞানিশ্রষ্ঠ আপনাকে ধার্মিক জানিয়া সে প্রকার করিয়া থাকে? ধর্মজ্ঞ কাশিরাজের কন্যা অন্যের প্রতি কামনা করিয়াছিল, তুমি প্রজ্ঞাভিমানী হইয়া কোন্ ধর্মানুসারে তাহাকে অপহরণ করিলে? তোমার ভ্রাতা সৎপথানুবর্তী ছিলেন, সুতরাং তোমার অপহৃত কন্যাদিগের প্রতি অভিলাষ করিলেন না। তুমি এমনই ধার্মিক যে, তোমার সম্মুখেই তাহাদের গর্বে অন্যদ্বারা পুত্র উৎপাদিত হইল। হে ভীষ্ম। তুমি ব্রহ্মাচর্য্য অবলম্বন করিয়াছ বলিয়া সেরূপ ঘটিয়াছিল, এমন মনে করিও না; তোমার ধর্ম কি? তুমি যে ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়াছ, তাহা মোেহপ্রযুক্ত বা ক্লীবত্বপ্রযুক্ত, সন্দেহ নাই। হে ধর্মজ্ঞ। আমি কুত্রাপি তোমার উন্নতি দেখিতেছি না, কারণ তুমি যে ধর্ম প্রকাশ করিয়াছ, কোন বিজ্ঞব্যক্তিই তদনুসারে চলে না। ইষ্ট, দান, অধ্যয়ন ও বহুদক্ষিণ যজ্ঞ, এ সমুদায় অপত্যফলের ষোড়শাংশও নাই; অপুত্রব্যক্তির ব্রতো-পবাসাদি সমুদায় বিফল হয়, তাহার সন্দেহ নাই। তুমিও তাদৃশ অপত্যধনে বঞ্চিত, বৃদ্ধ এবং কপট ধার্মিক। তুমি জ্ঞাতিগণের নিকট হংসের ন্যায় সংহার প্রাপ্ত হইবে। প্রাজ্ঞ মনুষ্যেরাও এই প্রকার কহিয়া থাকেন। হে ভীষ্ম! পুরাণবেত্তারা এই গান করিয়া থাকেন, "হে পত্ররথ! কাম-ক্রোধাদি দ্বারা অন্তরাত্মা নিহত হইলে পর রোদন করিতেছ”, এক্ষণে সেই হংসের উপাখ্যান শ্রবণ কর। পূর্ব্বকালে সমুদ্রপ্রান্তে ধৰ্ম্মভাষী অধৰ্ম্মচারী এক বৃদ্ধ হংস ছিল। সে পক্ষীদিগকে ধর্ম্মের অনুষ্ঠান কর, অধর্মাচরণ করিও না, এই প্রকার উপদেশ প্রদান করিত। অন্যান্য সমুদ্রচারী পক্ষিগণ তাহাকে সত্যবাদী জ্ঞান করিয়া তাহার বাক্য শ্রবণ করিত এবং ইহার নিকটে ধর্মার্থের উপদেশ পাইয়াছি; এই ভাবিয়া তাহার আহার আহরণ করিত। তাহারা তাহার নিকটে আপনাপন অন্ডসকল গচ্ছিত রাখিয়া চরিতে চরিতে সমুদ্রজলে নিমগ্ন হইত। পক্ষিরাই তাহার বাক্যে বিশ্বাস করিয়া অনবহিত হইয়াছিল, কিন্তু দুরাত্মা হংস আপনার কার্য্যে বিলক্ষণ মনোযোগী থাকিত। সে তদবসরে তাহাদের অগুগুলি ভক্ষণ করিত। সেই সমুদায় ডিম্ব বিনষ্ট হইলে কোন প্রজ্ঞাবান্ পক্ষী সন্দিহান হইয়া সেই দুরাচারের পাপাচার দৃষ্টিগোচর করিয়া সাতিশয় দুঃখিতচিত্তে অন্যান্য পক্ষীদিগকে বিজ্ঞাপন করিল। তাহারা সমীপবর্তী হইয়া প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়া সেই কপটাচারী মরালের প্রাণসংহার করিল। হে ভীষ্ম! তুমি সেই হংসের সমান ধৰ্ম্মী, নৃপতিগণ পক্ষিগণস্বরূপ; অতএব ইহারা ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকেও সেই প্রকার নিহত করিবে। পুরাণবেত্তারা এই সম্বন্ধে যে গাথাগান করিয়া থাকেন তাহা বলিতেছি। “হে পত্ররথ! কামাদিদ্বারা তোমার অন্তরাত্মা আক্রান্ত হইলেও বাহিরে ধৰ্ম্ম ঘোষণা কর, কিন্তু এই অশুভক্ষণরূপ অশুচি কৰ্ম্ম তোমারই বাক্যকে বিরুদ্ধ করিতেছে।”

শিশুপালকর্তৃক কৃষ্ণনিন্দা।

শিশুপাল কহিলেন, মহাবল জরাসন্ধ আমার অভিমত রাজা ছিলেন। তিনি দাস বলিয়া এই বাসুদেবের সহিত সংগ্রাম করিতে ইচ্ছা করেন নাই। এই কেশব তাঁহাকে বধ করিবার নিমিত্ত ভীমসেন এবং ধনঞ্জয়দ্বারা যাহা করিয়াছিল, কোন্ ব্যক্তি তাহা ন্যায্য বলিয়া স্বীকার করিতে পারে? এই দুরাত্মা ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া ছলপূর্ব্বক অদ্বার দিয়া প্রবিষ্ট হইয়া জরাসন্ধ ভূপতির প্রভাব দৃষ্টিগোচর করিয়াছিল। ধর্মাত্মা জরাসন্ধ এই দুরাত্মাকে পাদ্য প্রদান করিতে উদ্যোগ করিলে আপনাকে অব্রাহ্মণ জানিয়া গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করে নাই। তিনি কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুনকে ভোজন করিতে কহিলে কৃষ্ণ অনৈসর্গিক কাণ্ড করিয়া তুলিল। হে মূর্খ! তুমি ইঁহাকে যে প্রকার মনে করিতেছ, ইনি যথার্থই যদি সেই প্রকার জগতের কর্তা হইতেন, তাহা হইলে ইনি আপনি আপনাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া জানিতেছেন না কেন? কিন্তু আমার এই আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে যে, তুমি পাণ্ডবদিগকে সাধুগণের পথ হইতে আকৃষ্ট করিয়া রাখিয়াছ এবং ইহারা সেই ব্যবহারকে সাধু বলিয়া স্বীকার করিতেছে অথবা তুমি পৌরুষহীন বৃদ্ধ, তুমি যাহাদের সর্ব্বার্থপ্রদর্শক হইয়াছ, তাহাদের বিষয় বিস্ময়কর নহে। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন শিশুপালের সেই কঠোর বাক্য শ্রবণ করিয়া কুপিত হইলেন। তাঁহার সরোজসদৃশ স্বভাব বিস্ফারিত ও লোহিত নেত্রদ্বয় ক্রোধভরে অধিকতর রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। পার্থিবগণ তাঁহার ললাটস্থ ত্রিশিখা ভ্রূকুটী ত্রিকূটস্থ ত্রিপথগামিনী গঙ্গার ন্যায় দর্শন করিতে লাগিল; তিনি দশনে দশন পীড়ন করিতে লাগিলেন, তাঁহার মুখমণ্ডল দেখিয়া বোধ হইল, যেন যুগান্তের কালান্তক সমস্ত সংসার গ্রাস করিতে ইচ্ছা করিতেছে। তিনি ক্রোধবেগে উত্থিত হইতেছেন, এমন সময় মহাবাহু ভীষ্ম তাঁহাকে ধারণ করিলেন, বোধ হইল যেন শশিশেখর ষড়াননকে গ্রহণ করিতেছেন। ভীষ্ম বিবিধ গৌরবান্বিত বাক্যে তাঁহাকে নিবারিত করিলে তাঁহার কোপশান্তি হইল। যেমন সমুদ্বেল মহাসমুদ্র ঘনকাল অতীত হইলে বেলাকে অতিক্রম করে না, তদ্রূপ অরিন্দম ভীম ভীষ্মের বাক্য উল্লঙ্ঘন করিলেন না। ভীমসেন ক্রোধাবিষ্ট হইলেও শিশুপাল নিজ পৌরুষ অবলম্বন করিয়া স্থির হইয়া রহিলেন। কুপিত সিংহ যেমন মৃগের প্রতি উপেক্ষা করিয়া থাকে, প্রতাপবান্ শিশুপাল সেইরূপ ভীমপরাক্রম ভীমসেনকে রোষপরবশ দেখিয়া তাঁহার প্রতি উপেক্ষা করত হাসিতে হাসিতে কহিলেন, হে ভীষ্ম! ইঁহাকে পরিত্যাগ কর, আমার প্রতাপানলে ভীমপতঙ্গ দগ্ধ হইবে, নরপতিরা নয়নগোচর করুন। তদনন্তর কুরুশ্রেষ্ঠ প্রাজ্ঞতম ভীষ্ম চেদিরাজের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভীমসেনকে কহিতে লাগিলেন।

ভীষ্মকর্তৃক শিশুপালের জন্মবৃত্তান্ত কথন।

ভীষ্ম কহিলেন, এই শিশুপাল চেদিরাজকুলে জন্মগ্রহণ করেন, ভূমিষ্ঠ হইবার সময়ে ইনি এ্যম্বক ও চতুর্ভুজ ছিলেন এবং জাতমাত্র রাসভসদৃশ চীৎকার করিতে লাগিলেন। ইহার মাতা, পিতা ও বন্ধু-বান্ধব এই অনৈসর্গিক ব্যাপার অবলোকন করিয়া ভীত হইয়া ইঁহাকে পরিত্যাগ করিতে সঙ্কল্প করেন। চেদিরাজ, তাঁহার ভার্য্যা, অমাত্য ও পুরোহিত আকুলহৃদয়ে চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে দৈববাণী হইল, "হে নৃপতে! তোমার শ্রীমান বলবান্ পুত্র জন্মগ্রহণ করিল, অতএব ইহা হইতে ভীত হইও না, অনুকূল হইয়া প্রতিপালন কর। হে নরাধিপ! যম ইহার অন্তক নহে। ইঁহার প্রাণ কেবল অস্ত্রদ্বারা নিহত হইবে; যিনি ইঁহার জীবনহন্তা, তিনি উৎপন্ন হইয়াছেন।” এই কহিয়া দৈববাণী নিস্তব্ধ হইলে, ইহার জননী অপত্যস্নেহে অভিভূতা হইয়া কহিতে লাগিলেন, যিনি আমার এই পুত্রের প্রতি এই আকাশবাক্য প্রয়োগ করিলেন, তিনি দেবতাই হউন, বা অন্য কেহই হউন, আমি কৃতাঞ্জলি হইয়া তাঁহাকে নমস্কার করিতেছি, তিনি যথার্থতঃ প্রকাশ করিয়া বলুন, কোন্ ব্যক্তি আমার সন্তানের কালান্তক হইবে, আমি তাঁহার নাম শুনিতে ইচ্ছা করি। তখন পুনরায় দৈববাণী হইল, হে দেবি! তোমার পুত্র যাঁহার অঙ্কদেশে আরোহিত হইলে ইহার পঞ্চশীর্ষ ভুজঙ্গপ্রতিম অধিক ভুজদ্বয় ক্ষিতিতলে বিগলিত হইবে এবং যাঁহাকে নেত্রগোচর করিয়া ললাটনিহিত তৃতীয় লোচন তিরোহিত হইবে, তিনিই তোমার প্রাণাধিকের প্রাণসম্পত্তি অপহরণ করিবেন।

অন্যান্য পার্থিবগণ তাহাকে ত্রিনেত্র ও চতুর্ভুজ এবং তাহার প্রতি সেই দৈববাণী শ্রবণ করিয়া দর্শনমানসে তথায় আগমন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন চেদিরাজ সমাগত ভূপতিগণকে সৎকার করিয়া একৈকক্রমে সকলের উৎসঙ্গে পুত্রকে আরোপিত করিলেন। শিশু এই প্রকার যথাক্রমে পৃথক্ পৃথক্ রূপে রাজসহস্রের অঙ্কারূঢ় হইলেন। কিন্তু দৈববাণীর নিদর্শন প্রাপ্ত হইলেন না। মহাবল বলরাম ও বাসুদেব দ্বারাবতী নগরীতে ছিলেন, ইঁহারা এই ব্যাপার শ্রবণ করিয়া পিতৃম্বসাকে দেখিবার নিমিত্ত চেদিপুরী আগমন করিলেন, তাঁহারা জ্যেষ্ঠা-নুক্রমে ভূপতিকে ও পিতৃম্বসাকে অভিবাদন ও অনাময় জিজ্ঞাসা করিয়া এবং তাঁহাদের কর্তৃক অভিনন্দিত হইয়া উপবিষ্ট হইলে দেবী যাদবী আহ্লাদ করিয়া শিশুপালকে দামোদরের ক্রোড়ে প্রদান করিলেন। তাঁহার অঙ্কে অর্পিত হইবামাত্র ভুজদ্বয় ও স্খলিত ললাটস্থ ত্রিলোচন তিরোহিত হইল, তখন শিশুপালজননী ত্রাসিত ও ব্যথিত হইয়া কৃষ্ণকে কহিলেন, হে মহাভুজ! এই ভয়কাতরাকে বরপ্রদান কর, তুমি আর্ত ব্যক্তির আশ্বাসন ও ভীত ব্যক্তির অভয়প্রদ। শিশুপালজননীর এবম্প্রকার কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কৃষ্ণ কহিলেন, হে দেবি! ভীত হইবেন না, আমা হইতে আপনার ভয় নাই, হে পিতৃস্বসঃ! আমি আপনাকে কি বর দিব, আমাকে কি করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন, আমার আয়ত্ত বা ক্ষমতার অতীত হইলেও আমি অবশ্য সম্পাদন করিব, তাহার সন্দেহ নাই। রাজমহিষী কৃষ্ণকর্তৃক এই প্রকার অভিহিত হইয়া কহিলেন, হে মহাবল যদুপ্রধান! শিশুপালের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করিতে হইবে, এই আমার প্রার্থনা। তখন বাসুদেব কহিলেন, হে পিতৃম্বসঃ। আপনি শোক করিবেন না, আমি আপনার এই পুত্রের বধোচিত শত অপরাধ ক্ষমা করিব।

ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বীর। মন্দবুদ্ধি পাপাত্মা শিশুপাল গোবিন্দের এইরূপ বরপ্রদানে দর্পিত হইয়া তোমাকে আহ্বান করিতেছে।

ভীষ্ম-শিশুপালের পরস্পর ক্রোধপূর্ণ কথোপকথন।

ভীষ্ম কহিলেন, শিশুপাল যে বুদ্ধিতে বাসুদেবকে আহ্বান করিতেছে ইহা উহার নিজের বুদ্ধি নহে, বাসুদেবেরই এইরূপ অভিসন্ধি, সন্দেহ নাই। হে কৌন্তেয়! এই কুলকলঙ্ক অদ্য আমার যে প্রকার অবমাননা করিল, পৃথিবীমধ্যে কোন্ পার্থিব তেমন করিতে পারে? শিশুপালে নারায়ণের যে তেজোভাগ আছে, যাহার প্রভাবে সে দুর্বুদ্ধিপরতন্ত্র হইয়া আমাদিগকে গণনা না করিয়া শার্দুলের ন্যায় তর্জন গর্জন করিতেছে, মহাবাহু বাসুদেব অচিরকালমধ্যে সেই নিজতেজঃ পুনরাদান করিবেন।

শিশুপাল ভীষ্মবাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া ক্রোধভরে তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, ভীষ্ম! তুমি বন্দির ন্যায় উত্থিত হইয়া নিরন্তর যাহার স্তুতিবাদ করিতেছ, আমার প্রভাব সেই কেশবেরই বটে, কিন্তু তোমার মনঃ যদি কেবল পরের তোষামোদ করিয়াই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে কেশবকে পরিত্যাগ করিয়া এই সকল ভূপালগণের স্তুতিবাদ কর, এই পার্থিবপ্রধান বাহীকরাজ দরদের স্তুতিপাঠ কর, যিনি ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র পৃথিবী কম্পিত হইয়াছিল: হে ভীষ্ম। মহাবীর কর্ণের প্রশংসা কর, যিনি অঙ্গ ও বঙ্গদেশের অধ্যক্ষ এবং সহস্রাক্ষসদৃশ বলশালী; যে মহাবাহুর চাপবিকর্ষণ অতি ভয়ানক, কুণ্ডলদ্বয় সহজাত, দিব্য ও দেবনির্মিত এবং কবচ বালার্কসদৃশ, যিনি বাসবের ন্যায় দুর্জয় জরাসন্ধকে বাহুযুদ্ধে পরাজিত ও তাঁহার শরীর ভেদ করিয়াছিলেন। এই মহারথ দ্রোণ ও তৎপুত্র অশ্বত্থামার স্তব কর, যাঁহাদের একজন জাতক্রোধ হইলে চরাচর বিশ্ব নিঃশেষিত করিতে পারেন। ফলতঃ ইঁহাদিগের সমান যোদ্ধা দৃষ্টিগোচর হয় না; কি আশ্চর্য্য। সেই অনন্যসাধারণ বীরযুগলের প্রশংসা করিতে তোমার ইচ্ছা হয় না? হে ভীষ্ম। সাগরাম্বরা পৃথিবীতে যিনি অদ্বিতীয় সেই রাজেন্দ্র দুর্য্যোধনকে অতিক্রম করিয়া কৃষ্ণের স্তুতিবাদ করা কি ন্যায়ানুগত? না বুদ্ধিমানের কার্য্য? কৃতাস্ত্র দৃঢ়বিক্রম রাজা জয়দ্রথ, প্রথিতবিক্রম কিন্নরাচার্য্য দ্রুম, ভরতকুলের শিক্ষক বৃদ্ধ কৃপাচার্য্য, মহাধনুর্দ্ধর রুক্মিরাজ, ভগদত্ত, যুপকেতু, জয়ৎসেন, মাগধেশ্বর বিরাট, দ্রুপদ, বৃহদ্বল, শকুনি অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ, পাণ্ড্য, শ্বেত, উত্তম, মহাভাগ শঙ্খ, বৃষসেন, বিক্রমশালী একলব্য ও মহারথ কালিঙ্গ, এই সমস্ত বীরপুরুষদিগের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শনপূর্ব্বক কেশবের প্রশংসা করিতেছ কেন? হে ভীষ্ম! যদি তোমার নিতান্ত স্তব করিতে বাসনা হইয়া থাকে, তবে কেন শল্য প্রভৃতি ভূপালগণকে স্তব কর না? তুমি প্রাচীন ধর্মবাদীদিগের উপদেশ-বাক্য শ্রবণ কর নাই; অতএব আমি কি করিব। পণ্ডিতেরা কহিয়া থাকেন যে, আত্মনিন্দা ও আত্মপূজা, পরনিন্দা ও পরস্তব সাধুদিগের অকর্তব্য। তুমি মোেহবশতঃ ভক্তিসহকারে অস্তবনীয় কেশবের স্তব করিতেছ, কিন্তু ইহা কাহারও অনুমোদিত নহে, তুমি মুক্তিকামনায় সমস্ত জগৎ দুরাত্মা পুরুষে সমাবেশিত করিতেছ। যাহা হউক, তোমার এই বুদ্ধি প্রকৃতির অনুগত নহে; আমি পূর্ব্বেই কহিয়াছি যে, ভূলিঙ্গনামক শকুনি তোমার উপমার স্থান, শিশুপাল এই কথা বলিয়া কহিলেন, হে ভীষ্ম! শ্রবণ কর। হিমালয়ের অপর পার্শ্বে ভূলিঙ্গ নামে এক শকুনি বাস করে। তাহার বাক্য অর্থবিগর্হিত ও নিন্দনীয়। সে অন্যকে সাহস করিতে নিষেধ করে কিন্তু আপনিই যে অতীব সাহসিক কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিতেছে, তাহা কিছুমাত্র বুঝিতে পারে না। সেই নির্বোধ শকুনি সিংহের বদন হইতে দশনবিলগ্ন মাংসখণ্ড গ্রহণ করিয়া থাকে, কিন্তু সিংহ মনে করিলেই তাহার জীবন বিনাশ করিতে পারে। সে কেবল সিংহের অনুগ্রহে জীবিত আছে, সন্দেহ নাই। হে. অধার্মিক ভীষ্ম! তোমার বাক্যও সেই প্রকার প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং তোমার জীবনও সেই প্রকার ভূপালগণের অনুগ্রহাধীন, ইঁহারা মনে করিলেই তোমার প্রাণ সংহার করিতে পারেন। তোমার তুল্য নিন্দিতকর্মা আর কেহই নাই।

ভীষ্ম শিশুপালের এই প্রকার কটুবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, চেদিরাজ! তুমি কহিতেছ "আমার জীবন এই মহীপালগণের ইচ্ছার অধীন" কিন্তু আমি ইহাদিগকে তৃণতুল্যও বোধ করি না, ভীষ্ম এই প্রকার কহিলে ভূপতিগণ রোষাবিষ্ট হইয়া কেহ হাস্য করিয়া উঠিলেন, কেহ বা তাঁহার কুৎসা করিতে লাগিলেন। কোন কোন ধনুর্দ্ধর ভীষ্মের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, এই পাপগর্বিত দুৰ্ম্মতি ভীষ্ম ক্ষমাযোগ্য নহে, অতএব ইহাকে পশুর ন্যায় বধ কর অথবা প্রদীপ্ত হুতাশনে দগ্ধ কর।

কুরুপিতামহ মতিমান্ ভীষ্ম তাঁহাদিগের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে নৃপতিগণ! তোমাদের কথোপকথন শেষ হইবার নহে, আমি এই অবসরে কিছু বলিতেছি, শ্রবণ কর। তোমরা আমাকে পশুর ন্যায় বধ কর বা কটাগ্নিতে' দগ্ধ কর, আমি তোমাদের মস্তকে এই পদার্পণ করিলাম। আমরা গোবিন্দকে পূজা করিয়াছি, তিনিও সম্মুখে বিদ্যমান রহিয়াছেন, যাঁহার নিতান্ত মরণকণ্ডুতি হইয়া থাকে, তিনি গদাচক্রধারী বাসুদেবকে যুদ্ধে আহ্বান করুন, কিন্তু আমি নিশ্চয় বলিতেছি, আহ্বানকারী ব্যক্তিকে রণশায়ী হইয়া অবশ্যই যাদবদেব শ্রীকৃষ্ণের শরীরে লীন হইতে হইবে।

শিশুপালকর্তৃক শ্রীকৃষ্ণকে যুদ্ধার্থ আহ্বান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, প্রভূত বিক্রমশালী চেদিরাজ, ভীষ্মের বাক্য শ্রবণমাত্রই বাসুদেবের সহিত সংগ্রাম করিবার মানসে তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে জনার্দ্দন! আমি তোমাকে আহ্বান করিতেছি, আমার সহিত সংগ্রাম কর; আইস অদ্য তোমাকে পাণ্ডবগণ সমভিব্যাহারে যমালয়ে প্রেরণ করি। হে কৃষ্ণ! তুমি রাজা নহ; তুমি দাস, দুৰ্ম্মতি ও পূজার অযোগ্যপাত্র, তোমাকে পাণ্ডবগণ বালত্বপ্রযুক্ত ভূপালদিগকে অতিক্রম করিয়া তোমাকে পূজ্যবৎ পূজা করিয়াছে, অতএব আমার মতে অনভিজ্ঞ পাণ্ডবগণকে বধ করা অবশ্য কর্তব্য। শিশুপাল এই বলিয়া ক্রোধভরে তর্জন গর্জন করিতে লাগিলেন।

কৃষ্ণ শিশুপালের বাক্যাবসানে পাণ্ডবগণসমক্ষে মৃদুস্বরে সমস্ত ভূপতিবর্গকে কহিতে লাগিলেন, হে ভূপতিগণ। এই সাত্বতীনন্দন আমাদিগের পরমশত্রু; এই দুরাত্মা সর্ব্বদা অনুপকারী সাত্বতগণের অপকার চেষ্টা করিয়া থাকে। এই দুরাচার আমার পিতৃস্বস্রীয় হইয়াও আমরা প্রাগজ্যোতিষপুরে গমন করিয়াছি জানিতে পারিয়া দ্বারকাপুর দগ্ধ করিয়াছিল। ভোজরাজবিহারার্থ রৈবতক পর্ব্বতে গমন করিলে এই পাপিষ্ঠ তদীয় সহচরগণের মধ্যে অনেককে বিনাশ ও অনেককে বদ্ধ করিয়া স্বপুরে গমন করিয়াছিল। আমার পিতার অশ্বমেধানুষ্ঠান সময়ে বিঘ্নোৎপাদন করিবার মানসে উৎকৃষ্ট রক্ষকগণ পরিবৃত পবিত্র যজ্ঞাশ্ব অপহরণ করিয়াছিল। এই দুরাত্মা নিতান্ত অননুরক্তা সৌবীরদেশগামিনী বদ্রুপত্নীকে এবং কারূষের নিমিত্ত মায়া অবলম্বনপূর্ব্বক স্বীয় মাতুল বিশালাধিপতির কন্যা ভদ্রাকে অপহরণ করিয়াছিল। আমি কেবল পিতৃস্বসার অনুরোধেই এই পাপাত্মার দুষ্কর্মসকল এতাবৎকালপর্যন্ত সহ্য করিয়াছি। দুরাত্মা শিশুপাল অদ্য ভাগ্যক্রমে সমুদায় ভূপতিগণ-সন্নিধানে সমুপস্থিত আছে। এই পাপাশয় অদ্য আমার প্রতি যেরূপ অত্যাচার করিল, তাহা সমস্ত ভূপতিগণ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলেন এবং পরোক্ষে যাহা যাহা করিয়াছিল, তাহাও শ্রবণ করিলেন। এই দুরাত্মা অদ্য সমস্ত রাজমণ্ডলসমীপে আমাকে অপমান করিয়াছে, অতএব কোন ক্রমেই ইহার অপরাধ সহ্য করিব না। মূঢ়মতি শিশুপাল যমালয়ে যাইবার নিমিত্ত রুক্মিণীকে প্রার্থনা করিয়াছিল, কিন্তু অপাত্রের বেদশ্রবণ-প্রার্থনার ন্যায় উহার ঐ প্রার্থনা বিফল হইয়াছিল।

তখন সভাস্থ সমস্ত ভূপতিগণ শ্রীকৃষ্ণের বাক্য শ্রবণা-নন্তর শিশুপালকে যৎপরোনাস্তি নিন্দা করিতে লাগিলেন।

চেদিরাজ বাসুদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া অট্ট অট্ট হাস্য করত তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে কৃষ্ণ। তুমি এই সভামধ্যে বিশেষতঃ পার্থিবগণসমক্ষে রুক্মিণীকে মৎপূর্ব্বা' বলিয়া কি কিছুমাত্র লজ্জিত হইলে না? হে মধুসূদন। তুমি ব্যতিরেকে অন্য কোন্ পুরুষাভিমানী ব্যক্তি স্বীয় পত্নীকে অন্যপূর্ব্বা বলিয়া নির্দেশ করিতে পারে? হে কৃষ্ণ! শ্রদ্ধাপূর্ব্বক আমাকে ক্ষমা করিতে ইচ্ছা হয় কর, না হয় করিও না; ফলতঃ তুমি ক্রুদ্ধ হইলে আমার কোন ক্ষতি নাই এবং প্রসন্ন হইলেও কোন লাভনাই।

ভগবান মধুসদন, দুরাত্মা শিশুপালের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে দৈত্যগর্ব্ববিনাশক স্বীয় চক্রাস্ত্র স্মরণ করিলেন। চক্র স্মরণমাত্রেই তাঁহার হস্তে উপস্থিত হইল। তখন ভগবান্ চক্রপাণি ভূপতিগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহীপাল-গণ! আপনারা শ্রবণ করুন, দুরাত্মা শিশুপালের মাতা পূর্ব্বে আমার নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে, তোমাকে আমার পুত্রের শত অপরাধ মার্জনা করিতে হইবে; আমিও তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত হইয়াছিলাম; তন্নিমিত্তই এতাবৎকাল পর্যন্ত উহাকে ক্ষমা করিয়াছি; এক্ষণে উহার একশত অপরাধ পরিপূর্ণ হইয়াছে; অতএব অদ্য উহাকে তোমাদিগের সমক্ষেই সংহার করিব।

শ্রীকৃষ্ণকর্তৃক চেদিরাজ শিশুপালের মস্তকচ্ছেদন।

অরাতিনিসূদন মধুসূদন এই বলিয়া ক্রোধভরে সুতীক্ষ্ণ চক্রদ্বারা চেদিরাজের মস্তকচ্ছেদন করিলেন। চেদিপতি বজ্রাহত পর্ব্বতের ন্যায় ভূপৃষ্ঠে নিপতিত হইলেন। তাঁহার কলেবর হইতে গগনচ্যুত সূর্য্যের ন্যায় সুমহৎ তেজঃপুঞ্জ সমুত্থিত হইয়া সর্ব্বলোকনমস্কৃত কমললোচন কৃষ্ণকে অভিবাদনপূর্ব্বক তদীয় শরীরে লীন হইল। ভূপতিগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। এইরূপে ভগবান্ বাসুদেবকর্তৃক শিশুপাল নিহত হইলে, জগতে বিনা মেঘে বারিবর্ষণ হইতে লাগিল, স্থানে স্থানে প্রজ্বলিত বজ্রপাত হইতে লাগিল ও ভূমিকম্প হইতে লাগিল। তৎকালে অনেকানেক ভূপতিগণ জনাৰ্দ্দনের অলৌকিক কৰ্ম্মদর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া বানিষ্পত্তি করিতে পারিলেন না। কেহ কেহ ক্রোধভরে করে করে পেষণ, কেহ বা ওষ্ঠ দংশন করিতে লাগিলেন, কোন কোন মহীপতি নিভৃতে কৃষ্ণকে প্রশংসা করিতে লাগিলেন, অনেকে যৎপরো-নাস্তি ক্রুদ্ধ হইলেন; কেহ বা তদ্বিষয়ে ঔদাসীন্য অবলম্বন করিলেন। মহর্ষিগণ, মহাত্মা ব্রাহ্মণগণ এবং কতিপয় ভূপতিগণ বাসুদেবের বিক্রম দর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিলেন। তৎপরে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মহাবীর দমঘোষনন্দনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করিবার নিমিত্ত স্বীয় অনুজগণকে আদেশ করিলেন। তাঁহারাও জ্যেষ্ঠভ্রাতার নির্দেশ প্রতিপালন করিলেন। পরে মহারাজ যুধিষ্ঠির মহীপাল শিশুপালের পুত্রকে চেদিরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন।

রাজসূয় যজ্ঞ সমাপ্ত ও শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় গমন।

তদনন্তর বিপুলতেজাঃ পাণ্ডুনন্দন সেই সর্ব্বসমৃদ্ধিসম্পন্ন পরম প্রীতকর, প্রভূত ধনধান্যসংযুক্ত, মহাক্রতু রাজসূয় নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন করিলেন। মহাবাহু বাসুদেব শার্স, চক্র ও গদা ধারণপূর্ব্বক আরম্ভ অবধি সমাপন পর্যন্ত ঐ যজ্ঞ রক্ষা করিলেন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির এইরূপে যজ্ঞ সমাপনানন্তর অবভূথস্নান করিলে পর সমাগত সমস্ত ভূপতিগণ তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, হে ধৰ্ম্মজ্ঞ! আপনার সৌভাগ্যের পরিসীমা নাই; আপনি নির্বিঘ্নে সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হইলেন এবং আজমীঢ় বংশীয় নৃপতিগণের যশোবর্দ্ধন করিলেন। আমরা আপনার মহাযজ্ঞে আসিয়া সর্ব্বপ্রকার কাম্যবস্তুর উপভোগ করিলাম; এক্ষণে অনুমতি করুন, স্ব স্ব রাজ্যে প্রস্থান করি।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভূপতিগণের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহা-দিগকে যথাবিধি পূজা করিয়া ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ! এই সমস্ত মহীপতিগণ প্রীতিপূর্ব্বক আমাদের নিকেতনে আগমন করিয়াছিলেন, এক্ষণে আমার অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক স্ব স্ব রাজ্যে গমন করিতেছেন, তোমরা আমাদের রাজ্যসীমা পর্যন্ত ইঁহাদের অনুগমন কর। ধৰ্ম্মচারী পাণ্ডবগণ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আদেশানুসারে স্ব স্ব নগরাভিমুখে ভূপতিগণের সহিত এক এক জন গমন করিলেন। প্রতাপশালী ধৃষ্টদ্যুম্ন বিরাটের; অর্জুন মহাত্মা মহারথ দ্রুপদের; মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন, ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্রের; যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ সহদেব মহাবীর সপুত্র দ্রোণের, নকুল, পুত্র-সহিত সুবলের, দ্রৌপদীনন্দনগণ ও সুভদ্রাতনয়গণ, পার্ব্বতীয় ভূপালগণ ও অন্যান্য ক্ষত্রিয়দিগের অনুগমন করিলেন। তৎপরে সমুদায় ব্রাহ্মণগণও বিধানানুসারে পূজিত হইয়া স্ব স্ব নিকেতনে প্রস্থান করিলেন।

এইরূপে সমস্ত ভূপতিবর্গ ও ব্রাহ্মণগণ স্ব স্ব স্থানে গমন করিলে ভগবান্ বাসুদেব যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, হে কুরুবংশা-বতংস! মহাক্রতু রাজসূয় সুসম্পন্ন হইয়াছে, এক্ষণে অনুমতি করুন, আমি দ্বারকায় গমন করি। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে গোবিন্দ। কেবল তোমার প্রসাদেই আমার রাজসূয় সুসম্পন্ন হইল। তোমার প্রভাবেই সমস্ত ক্ষত্রিয়গণ আমার বশীভূত হইলেন ও সর্বোত্তম উপহার লইয়া আমার সমীপে আগমন করিয়াছিলেন। হে মহাত্মন্! এখন কি করিয়া তোমাকে বিদায় দিব? আমি তোমা ব্যতিরেকে এক মুহূর্তও প্রসন্নমনে থাকিতে পারি না। কিন্তু কি করি, তোমাকেও অবশ্য দ্বারকাপুরে গমন করিতে হইবে। যুধিষ্ঠিরের বচনাবসানে বাসুদেব তাঁহার সমভিব্যাহারে কুন্তীর সমীপে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে পিতৃম্বসঃ! আপনার পুত্রগণ সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হইলেন, এক্ষণে অনুমতি করুন, দ্বারকায় গমন করি। কৃষ্ণ এইরূপে কুন্তীর অনুজ্ঞা গ্রহণ করিয়া সুভদ্রা ও দ্রৌপদীকে সম্ভাষণপূর্ব্বক যুধিষ্ঠির সমভিব্যাহারে অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইয়া স্নান, জপ ও ব্রাহ্মণগণের স্বস্তিবাচন করিলেন।

তদনন্তর মহাবাহু কৃষ্ণসারথি দারুক মেঘবপুঃনামক মনোহর রথ যোজনা করিয়া কৃষ্ণসমীপে আনয়ন করিল।

মহামতি বাসুদেব সেই গরুড়কেতন রথ সমুপস্থিত দেখিয়া প্রদক্ষিণপূর্ব্বক আরোহণ করিয়া দ্বারাবতী প্রস্থান করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ-সমভিব্যাহারে পদব্রজে তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। তখন কমললোচন কৃষ্ণ ক্ষণকাল রথবেগ সংবরণ-পূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, হে রাজন! পর্জন্য যেমন সমস্ত প্রাণিদিগকে রক্ষা করেন, মহাক্রম যেমন পক্ষিগণকে আশ্রয় প্রদান করে, তদ্রূপ আপনি অপ্রমত্তচিত্তে নিত্য প্রজাদিগকে পালন করুন। অমরগণ যেমন ইন্দ্রকে আশ্রয় করেন, তদ্রূপ আপনার বন্ধুবর্গ আপনাকে আশ্রয় করুন। এইরূপে বিবিধ কথাবসানে তাঁহারা পরস্পর অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক স্ব স্ব আবাসে গমন করিলেন। যাদবপ্রবর কৃষ্ণ দ্বারাবতী গমন করিলে কেবল রাজা দুর্য্যোধন ও সুবলনন্দন শকুনি সেই দিব্য সভায় অবস্থান করিতে লাগিলেন।

শিশুপালবধ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।

সভাপর্ব

দ্যূত পর্ব্বাধ্যায়।

যুধিষ্ঠির-সমীপে ব্যাসের আগমন ও ব্যাসপ্রোক্ত কুরুপাণ্ডবের ভাবী ক্ষয়াশঙ্কা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাযজ্ঞ রাজসূয় পরিসমাপ্ত হইলে ব্যাসদেব শিষ্যগণে পরিবৃত হইয়া পাণ্ডবসম্মুখে সমুপস্থিত হইলেন। রাজা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে আশু আসন হইতে উত্থিত হইয়া পাদ্য এবং আসন প্রদানপূর্ব্বক পিতামহ ব্যাসের পূজা করিলেন। ভগবান্ দ্বৈপায়ন কাঞ্চনময় আসনে আসীন হইয়া যুধিষ্ঠিরকে উপবেশন করিতে কহিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃবর্গের সহিত উপবিষ্ট হইলে বাগ্বিন্যাসবিশারদ ভগবান্ ব্যাস তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে কুরুবংশধর কৌন্তেয়। তুমি অসুলভ সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হইয়া সমস্ত কুরুদেশের উন্নতি সাধন করিলে। তোমা হইতে কুরুবংশ উজ্জ্বল হইল। হে ক্ষত্রিয়প্রধান! আমি পূজিত হইয়াছি; এক্ষণে তোমাকে আমন্ত্রণ করিতেছি, আমি প্রস্থান করিব। রাজা যুধিষ্ঠির পিতামহের পাদগ্রহণ করিয়া কহিলেন, ভগবন্। দেবর্ষি নারদ কহিয়াছিলেন, দিব্য, অন্তরীক্ষ ও পার্থিব এই ত্রিবিধ উৎপাত উপস্থিত হইবে, শিশুপালের পতন হওয়াতে কি সেই উৎপাত বিলুপ্ত হইয়া গেল? হে পিতামহ! এই বিষয়ে আমার অতি দুরূহ সংশয় উপস্থিত হইয়াছে, আপনি ব্যতীত ইহার মীমাংসা করে, এমন কেহই নাই। অনন্তর তাহা শুনিয়া ব্যাস কহিলেন, হে রাজন! সেই ত্রিবিধ উৎপাত ত্রয়োদশ বৎসর ব্যাপিয়া হইবে। তাহাতে সমস্ত ক্ষত্রিয়ের বিনাশ হইবে। দুর্য্যোধনের অপরাধে এবং ভীমার্জুনের বলে তোমাকে উপলক্ষ্য করিয়া সমস্ত ক্ষত্রিয় ভূপতিগণ কালক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হইবে। হে রাজেন্দ্র! নিশাবসানে তুমি স্বপ্নে দেখিবে, ত্রিপুরান্তক মহাদেব বৃষভারূঢ় হইয়া শূল ও পিনাক ধারণ করিয়া শমনাধিষ্ঠিত দক্ষিণদিক্ নিরীক্ষণ করিতেছেন। হে বিশাম্পতে! সেই স্বপ্ন দর্শনে তুমি কিছুমাত্র চিন্তিত হইও না, কারণ কালকে কেহই অতিক্রম করিতে পারে না। তোমার মঙ্গল হউক; তুমি অপ্রমত্ত, স্থিতিমান্ এবং দমপরায়ণ হইয়া পৃথিবী পরিপালন কর। এক্ষণে আমি কৈলাসপর্ব্বতে গমন করি, এই বলিয়া ভগবান্ ব্যাস সমস্ত শিষ্য সমভিব্যাহারে কৈলাসপর্ব্বতে প্রস্থান করিলেন।

ব্যাসের কথায় যুধিষ্ঠিরের শপথ।

পিতামহ প্রস্থান করিলে পর রাজা যুধিষ্ঠির শোকাকুল হইয়া উষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক বারংবার সেই বিষয়েই চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিনি ভাবিলেন, পৌরুষদ্বারা দৈব শক্তি অতিক্রম করা অতীব দুরূহ কৰ্ম্ম। মহর্ষি যাহা কহিয়াছেন, তাহা অবশ্যই ঘটিবে, তাহার সন্দেহ নাই। মহাতেজাঃ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠগণ! দ্বৈপায়ন যাহা কহিয়াছেন, তাহা শ্রবণ করিলে; আমি তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া প্রাণ পরিত্যাগে স্থিরনিশ্চয় হইয়াছি। যদ্যপি কালক্রমে আমিই সমস্ত ক্ষত্রিয় বিনাশের হেতু হইলাম, তবে আমার জীবন ধারণের প্রয়োজন কি? ইহা শ্রবণ করিয়া ধনঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! বুদ্ধিভ্রংশকর ভয়ানক মোহে আবিষ্ট হইবেন না, যাহা কল্যাণকর হয়, বিবেচনা করিয়া তাহার অনুষ্ঠান করুন। সত্যধৃতি যুধিষ্ঠির অন্তরে ব্যাসদেবের কথাই চিন্তা করত ভ্রাতৃগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ! তোমাদিগের মঙ্গল হউক, আমার প্রতিজ্ঞা শ্রবণ কর; "আমি অদ্যাবধি ভ্রাতৃগণের বা অন্যান্য ভূপতিবর্গের প্রতি পরুষবাক্য প্রয়োগ করিব না; জ্ঞাতিগণের নির্দেশবর্তী হইয়া যোগ সাধন করিব; কি পুত্র, কি ইতর ব্যক্তি, সকলের প্রতি একরূপ ব্যবহার করিব; তাহা হইলে আমার আর ভেদের আশঙ্কা থাকিবে না; সুহৃদ্ভেদ হইতেই সংগ্রাম ঘটনা হয়; আমি বিগ্রহকে সুদূরপরাহত করিয়া কেবল সকলের প্রিয়কার্য্যই অনুষ্ঠান করিব; তাহা হইলে লোকমধ্যে নিন্দাস্পদ হইব না; যদি এই ত্রয়োদশ বৎসর জীবিত থাকিতে হয়, ইহা ভিন্ন আর কোন কার্য্য করিব না।” যুধিষ্ঠিরের হিতাভিলাষী ভীমাদি ভ্রাতৃগণও জ্যেষ্ঠের বাক্যে অনুমোদন করিতেন। ধৰ্ম্মরাজ ভ্রাতৃগণের সহিত সভামধ্যে সমারূঢ় হইয়া সমস্ত নৃপগণের প্রস্থানানন্তর পিতৃগণ এবং দেবতাদিগকে পরিতৃপ্ত করিতে লাগিলেন। সহামাত্য যুধিষ্ঠির কৃতমঙ্গল ও ভ্রাতৃগণে পরিবৃত হইয়া পুরপ্রবেশ করিলেন। দুর্য্যোধন এবং সুবলনন্দন শকুনি সেই রমণীয় সভাতেই সমাসীন রহিলেন।

শকুনির সহিত দুর্য্যোধনের সভাদর্শন এবং দুরবস্থা ও হস্তিনাপুরে প্রস্থান।

রাজা দুর্য্যোধন শকুনির সহিত উপবেশন করত ক্রমে ক্রমে সেই সভা 'পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। তিনি তাহাতে - যে সকল অদৃষ্টপূর্ব্ব দিব্য চিত্রাদিগত বস্তু দেখিলেন, তাহা কখন - হস্তিনানগরের দৃষ্টিগোচর করেন নাই। দুর্য্যোধন কোন সময়ে - সভামধ্যে এক স্ফটিকময় স্থলে উপস্থিত হইয়া জলভ্রমে আপনার বসন উৎকর্ষণ' করিয়া দুৰ্ম্মনায়মান ও প্রবেশবিমুখ হইয়া সেই সভায় পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর জলভ্রমে সেই স্ফটিকময় স্থলে নিপতিত হইয়া লজ্জিত হইলেন। পরে তথা হইতে বিমুখ হইয়া নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক বিষণ্ণমনে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর স্থলভ্রমে স্ফটিকবৎ নিৰ্ম্মল জলে ও পদ্মে সুশোভিত দীর্ঘিকাজলে সবস্ত্র পতিত হইলেন। মহাবল ভীমসেন এবং তদীয় কিঙ্করগণ সুযোধনকে তদবস্থ দেখিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। পরে যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞানুসারে ভৃত্যেরা তাঁহাকে উত্তমোত্তম বস্ত্র আনিয়া প্রদান করিল। তিনি পুনরায় পূর্ব্বের ন্যায় স্থলভাগে জলের আশঙ্কা ও জলভাগে স্থলের আশঙ্কা করিয়া আগমন করিতেছেন দেখিয়া ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব সকলে উপহাস করিতে লাগিলেন। কোপনস্বভাব দুর্য্যোধন তাঁহাদের উপহাস সহ্য করিতে পারিলেন না বটে, কিন্তু তৎকালে আপনার মনের ভাব গোপনেই রাখিলেন। তাঁহাদের প্রতি আর দৃষ্টিপাত করিলেন না। তিনি পুনরায় এরূপ ভ্রান্ত হইয়াছিলেন যে, পরিচ্ছদ উৎক্ষিপ্ত করিয়া উত্তরণবাসনায় স্থলভাগেই পদবিক্ষেপ করিলেন। তাহা দেখিয়া পুনরায় সকল লোক হাস্য করিয়া উঠিল। তিনি যে কেবল স্ফটিকময় সভাকুট্টিমেই প্রতারিত হইয়াছিলেন, এমন নহে, স্ফটিক ভিত্তিতে দ্বার বিবেচনা করিয়া যেমন প্রবেশ করিতে উদ্যত হইলেন, অমনি আহতমস্তক হইয়া ঘূর্ণিত হইতে লাগিলেন। সেইরূপ অন্য স্থানে স্ফটিক কপাটপুটিত দ্বার কৃস্তদ্বারা বিঘট্টিত করিতে করিতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া পতিত হইলেন।

পরে বিততা'কার অপর এক দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া পূর্ব্বের ন্যায় বিপ্রলম্ভ বিবেচনায় তথা হইতে বিরত হইলেন। হে মহারাজ! রাজা দুর্য্যোধন এইরূপ বিবিধ প্রতারণায় প্রতারিত হইয়া এবং রাজসূয় মহাযজ্ঞে সেই অদ্ভুত সমৃদ্ধি অবলোকন করিয়া যুধিষ্ঠিরের অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক হস্তিনানগরে প্রস্থান করিলেন।

দুর্য্যোধনের খেদ।

রাজা দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের শোভা সমৃদ্ধি অবলোকনে পরিতাপিত হইয়া চিন্তাকুলিতচিত্তে গমন করিতে করিতে তাঁহার দুৰ্ম্মতি উপস্থিত হইল। তিনি মহাত্মা কৌন্তেয়গণের মহান্ মহিমা, মহানুভবতা, পার্থিবগণের বশবর্তিতা এবং আবালবৃদ্ধ বনিতা-গণের হিতকারিতা দেখিয়া বিবর্ণ হইয়া উঠিলেন। ধৃতরাষ্ট্র-নন্দন গমনকালে সেই অনুপম সভার শোভাচিন্তায় এমত নিমগ্ন হইয়াছিলেন যে, তাঁহার মাতুল তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ সম্ভাষণ করিলেও তিনি তাঁহার সহিত আলাপ করিলেন না। সুবলাত্মজ তাঁহাকে চঞ্চল দেখিয়া কহিলেন, দুর্য্যোধন! তুমি কি নিমিত্ত এরূপ বিষণ্ণ মনে গমন করিতেছ? দুর্য্যোধন কহিলেন, হে মাতুল! মহাত্মা ধনঞ্জয়ের শস্ত্র-প্রতাপলব্ধ এই সসাগরা বসুন্ধরাকে যুধিষ্ঠিরের নিতান্ত বশংবদ এবং ইন্দ্রযজ্ঞসদৃশ সেই মহাযজ্ঞনিরীক্ষণ করিয়া অমর্ষভরে দহ্যমান মদীয় শরীর গ্রীষ্মকালীন স্বল্পজল জলাশয়ের ন্যায় পরিশুষ্ক হইতেছে। দেখ, যখন বাসুদেব শিশুপালকে বিনষ্ট করিলেন, তখন সেই রাজসভায় এমত কোন ভূপতি ছিলেন, না যিনি তাঁহার চরণানুগত না হইয়াছিলেন। তৎকালে রাজগণ কৌন্তেয়কৃত পরিভবানলে দহ্যমান হইয়াও অপরাধ ক্ষমা করিলেন, কিন্তু সে অপরাধ কে ক্ষমা করিতে পারে? পাণ্ডবগণের প্রতাপে কেশবকৃত যথোপযুক্ত অনুষ্ঠান সম্পাদিত সেই অযুক্ত কৰ্ম্ম সম্পন্ন হইল এবং নৃপতিগণ বিবিধ রত্নজাত লইয়া করপ্রদ বৈশ্যের ন্যায় ধর্মরাজের উপাসনা করিতে লাগিলেন। পাণ্ডব-গণের প্রতাপলব্ধ রাজলক্ষ্মীকে সেইরূপ প্রদীপ্যমান দেখিয়া আমি অমর্যভরে নিতান্ত দহ্যমান হইতেছি। হে মাতুল। অধিক কি বলিব, আমার এরূপ অন্তর্দাহ উপস্থিত হইয়াছে যে, আমি আর জীবন ধারণ করিতে সমর্থ হইতেছি না। হয় প্রজ্বলিত হুতাশনে প্রবেশ করিব, না হয় হলাহল ভক্ষণ করিয়া জীবন শেষ করিব অথবা জলপ্রবেশ করিয়া এই বিষম জ্বালার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইব। কোন্ সত্ত্ববান্ পুরুষ উন্নতি এবং আপনার অবনতি অবলোকন করিয়া সহ্য করিতে পারে? আমি যখন তাদৃশী রাজশ্রী দেখিয়া পরিতৃপ্ত হইয়াও অদ্যাপি সহ্য করিয়া রহিয়াছি, তখন আমি না স্ত্রী, না পুরুষ, কিছুই নহি; কারণ স্ত্রীলোক হইলে এরূপ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইত না; পুরুষ হইলে প্রতীকার না করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিতাম না। তাদৃশ রাজত্ব, তাদৃশী ধনসম্পত্তি এবং তাদৃশ যজ্ঞ নিরীক্ষণ করিয়া মাদৃশ কোন্ ব্যক্তি না সন্তাপিত হয়? বিশেষতঃ তাহাদিগের সেই রাজলক্ষ্মী অপহরণ করিতে আমার সামর্থ্য নাই এবং কেহই সহকারী নাই, এই নিমিত্তই আমি মৃত্যুচিন্তা করিতেছি। যুধিষ্ঠিরের সেই মহাজনোচিত পবিত্র রাজলক্ষ্মী নিরীক্ষণ করিয়া নিশ্চয় করিলাম, দৈবই প্রধান, পৌরুষ নিরর্থক; কারণ আমি যাহাকে বিনাশ করিবার যত্ন করিলাম, সে দৈবের অনুকূলতাপ্রযুক্ত সমুদায় অতিক্রম করিয়া পুনর্ব্বার উন্নতির পথে আরোহণ করিল। পৌরুষাবলম্বী ধার্তরাষ্ট্রেরা দিন দিন হীন হইতে লাগিল। সেই শ্রী ও তাদৃশী সভা নিরীক্ষণে এবং রক্ষিগণের সেই পরিহাস শ্রবণে আমি সাতিশয় পরিতাপিত ও অসহিষ্ণু হইতেছি, অতএব হে মাতুল! আমাকে প্রাণ পরিত্যাগে অনুজ্ঞা করিয়া পিতাকে এই বৃত্তান্ত নিবেদন করিবে।

দুর্য্যোধনের প্রতি শকুনির সান্ত্বনা।

শকুনি দুর্য্যোধনের পরিতাপবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, দুর্য্যোধন! পাণ্ডবেরা আপন অংশ ভোগ করিতেছে, তদ্দর্শনে তোমার যুধিষ্ঠিরের প্রতি এরূপ ক্রোধাবিষ্ট হওয়া নিতান্ত অবিধেয়। বিশেষতঃ তাহারাও বিবিধবিধানজ্ঞ। হে অরিন্দম! পূর্ব্বেও তুমি তাহাদিগের প্রতি অনেকবিধ উপায় প্রয়োগ করিয়াছিলে, কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য্য হইতে পার নাই। পরিশেষে তাহাদিগকে অংশ প্রদানে পরিতুষ্ট করিয়া পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। তাহারা দ্রৌপদীকে ভার্য্যা, সপুত্র দ্রুপদকে ও তেজস্বী কেশবকে পৃথিবীলাভের সহায় পাইয়াছে এবং পৈত্রিক অংশ লাভ করিয়া আত্মপ্রতাপে সেই অংশ বর্দ্ধিত করিয়াছে, তাহাতে তোমার পরিদেবনার বিষয় কি? ধনঞ্জয় হুতাশনকে পরিতুষ্ট করিয়া গাণ্ডীব ধনুঃ, অক্ষয় তৃণীরদ্বয় ও দিব্য অস্ত্রসমুদায় লাভকরিয়াছে এবং সেই কার্মুকের সাহায্যে ও আপনার বাহুবীর্য্যে সমস্ত মহীপালকে বশংবদ রাখিয়াছে, তাহাতেই বা তোমার পরিদেবনার বিষয় কি? খাণ্ডবদাহনকালে ময়দানবকে অগ্নিদাহ হইতে পরিত্রাণ করিয়া তাহার দ্বারা সেই সভা নিৰ্ম্মাণ করাইয়াছে, ময়দানবের আজ্ঞানুবর্তী কিঙ্করনামক রাক্ষসেরা তাহা বহন করিয়াছে, তাহাতেই বা তোমার পরিদেবনার বিষয় কি? তুমি যে কহিলে "আমার সহায় নাই” সে কেবল তোমার ভ্রান্তিমাত্র, কারণ ভ্রাতৃগণ তোমার অনুগত এবং মহাধনুর্দ্ধর বীর্য্যবান্ দ্রোণ, তাঁহার পুত্র, রাধেয়, মহারথ গৌতম, আমি আমার সহোদরগণ ও রাজা সৌমদত্তি, আমরা সকলেই তোমার সহায়; তুমিও এই সকল সহায়সম্পন্ন হইয়া অখণ্ড ভূমণ্ডল জয় কর।

দুর্য্যোধনের প্রতি শকুনির পাশক্রীড়ার কূটমন্ত্র।

দুর্য্যোধন কহিলেন, হে রাজন! আপনি অনুমতি করুন, আমি আপনাকে ও পূর্ব্বোক্ত মহারথদিগকে সহায় করিয়া অদ্যই সেই পাণ্ডবদিগকে পরাজয় করিব। তাহারা পরাজিত হইলেই অখণ্ড ভূমণ্ডল, সমস্ত মহীপাল ও সেই মহাধন' সভা আমার অধিকৃত হইবে। শকুনি কহিলেন, হে রাজন! ধনঞ্জয়, বাসুদেব, ভীমসেন, যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব ও সপুত্র দ্রুপদকে পরাজয় করা দেবগণেরও সাধ্যায়ও নহে; ইঁহারা সকলেই মহারথ, মহাধনুর্দ্ধর, কৃতাস্ত্র ও যুদ্ধদুৰ্ম্মদ। হে রাজন! যে উপায়দ্বারা যুধিষ্ঠিরকে জয় করিতে পারিবে, আমি তাহা বিশেষরূপে জানি, এক্ষণে শ্রবণ করিয়া সেই উপায় অবলম্বন কর। দুর্য্যোধন জিজ্ঞাসা করিলেন, মাতুল! যে উপায়দ্বারা সুহৃদ্গণের ও অন্যান্য মহাত্মাদিগের মনোযোগে তাহাদিগকে পরাজয় করিতে পারিব, বলুন সে উপায় কি প্রকার? শকুনি কহিলেন, রাজা যুধিষ্ঠির দ্যূতপ্রিয়, কিন্তু তাহাতে তাঁহার নৈপুণ্য নাই; অতএব পাশক্রীড়ার নিমিত্ত তাঁহাকে আহ্বান কর। তিনি আহূত হইলে নিবৃত্ত হইতে পারিবেন না। আমি অক্ষক্রীড়ায় সাতিশয় দক্ষ, এই ত্রিভুবনে আমার তুল্য ক্রীড়াশীল আর কেহই নাই। অতএব তুমি তাঁহাকেও দ্যূতে আহ্বান কর, আমি তোমার নিমিত্ত অক্ষকৌশলে তাঁহার সেই প্রদীপ্ত রাজলক্ষ্মী গ্রহণ করিব; কিন্তু এই বিষয় তোমার পিতাকে অবগত করাও, তাঁহার অনুজ্ঞা লইয়া তাঁহাদিগকে পরাজিত করিব, সন্দেহ নাই। দুর্য্যোধন কহিলেন, হে মাতুল! আপনিই পিতাকে রীতিমত নিবেদন করুন, আমি সেই দুর্দ্ধর্ষ ভূমিপালকে জানাইতে পারিব না।

ধৃতরাষ্ট্রসমীপে দুর্য্যোধনের দীনতা প্রকাশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, সুবলনন্দন শকুনি দুর্য্যোধনের অভিপ্রায় অবগত হইয়া প্রথমেই প্রজ্ঞাচক্ষুঃ, মহাপ্রাজ্ঞ, রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে গমন করিয়া কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! দুর্য্যোধন বিবর্ণ, পাণ্ডুর, কৃশ, দীন ও চিন্তাপরবশ হইয়াছে, জ্যেষ্ঠ পুত্রের শত্রুজনিত অসহ্য হৃদয়শোক কেন অনুসন্ধান করিতেছেন না? ধৃতরাষ্ট্র শকুনি প্রমুখাৎ অবগত হইয়া দুর্য্যোধনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস দুর্য্যোধন! কি নিমিত্ত তুমি এত কাতর হইয়াছ? যদ্যপি আমার শ্রোতব্য হয়, তাহা হইলে প্রকাশ করিয়া বল, তোমার মাতুল কহিতেছেন যে, তুমি বিবর্ণ, পাণ্ডুর ও কৃশ হইয়াছ; কিন্তু চিন্তা করিয়াও তোমার শোকের কারণ দেখিতেছি না। বৎস! প্রচুর ঐশ্বর্য্য তোমাতেই প্রতিষ্ঠিত, তোমার ভ্রাতৃগণ ও সুহৃদ্গণ অপ্রিয়াচরণ করেন না, রাজোচিত পরিচ্ছদ পরিধান ও পিশিতান্ন ভোজন করিতেছ, উত্তমোত্তম তুরঙ্গম তোমাকে বহন করিয়া থাকে, তবে তুমি কি দুঃখে বিবর্ণ ও কৃশ হইতেছ? মহামূল্য শয্যা, মনোহারিণী রমণী, শোভাসম্পন্ন গৃহ ও স্বচ্ছন্দবিহার, এই সমস্ত বস্তু দেবতাদিগের ন্যায় তোমার ইচ্ছামাত্র সুলভ, তবে তুমি কি নিমিত্ত দীনের ন্যায় শোক করিতেছ?

দুর্য্যোধন কহিলেন, হে তাত। কেবল কালযাপন করিবার নিমিত্ত কাপুরুষের ন্যায় ভোজন, পরিধান ও উগ্রতর ক্রোধ ধারণ করিয়াই সন্তুষ্ট রহিয়াছি, কিন্তু যে ব্যক্তি জাতক্রোধ হইয়া আপনার প্রজাগণকে বশীভূত রাখিতে পারে এবং অরিপরিভব হইতে মুক্তি ইচ্ছা করে, সেই যথার্থ পুরুষ। মহারাজ! সন্তোষ শ্রী ও অভিমানকে নষ্ট করে আর যিনি কেবল অনুগ্রহ বা ভয়ের বশীভূত হইয়া চলেন, তিনি কখন মহত্ত্ব প্রাপ্ত হন না। যে দিবস যুধিষ্ঠিরের দীপ্যমান রাজলক্ষ্মী দৃষ্টিগোচর হইয়াছে, তদবধি আমার ভোগ্যবিষয় আর আমাকে পরিতৃপ্ত করিতে পারিতেছে না। আমি সপত্নগণকে উন্নত ও আপনাকে হীন দেখিতেছি এবং যুধিষ্ঠিরের রাজলক্ষ্মী অদৃশ্য হইলেও আমার নয়নপথে স্পষ্টরূপে আবির্ভূত হইতেছে, এই নিমিত্তই আমি বিবর্ণ ও কৃশ হইয়াছি। যুধিষ্ঠির প্রতিদিন অষ্টাশীতি সহস্র স্নাতক' ও গৃহমেধীকে এবং প্রত্যেকের জন্য ত্রিংশৎ দাসী পালন করেন। তাহার আলয়ে অন্যান্য দশ সহস্র ব্যক্তি স্বর্ণপাত্রে উত্তমান্ন ভোজন করিয়া থাকে। কাম্বোজেরা তাঁহাকে কদলী নামক মৃগের বিচিত্রবর্ণ চৰ্ম্ম ও উৎকৃষ্ট কম্বল, করিণীগর্ভসম্ভূত শত সহস্র অশ্ব, ত্রিশত উষ্ট্র ও অশ্বতরী প্রদান করিয়াছে। সমস্ত রাজমণ্ডলী পূজোপকরণ সমভিব্যাহারে ইন্দ্রপ্রস্থে সমাগত হইয়া সেই পৃথক্ পৃথক্ রত্নজাত রাজসূয় যজ্ঞে কৌন্তেয়কে উপহার দিয়াছে। অধিক কি বলিব, যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞে যাদৃশ ধনাগম হইয়াছে, আমি পূর্ব্বে কোন স্থানে সেরূপ নয়নগোচর বা শ্রবণগোচর করি নাই। সেই অসীম ধনরাশি সপত্নের হস্তগত দর্শন করিয়া চিন্তান্বিত হওয়াতে আমি সুখী হইতে পারিতেছি না। স্বর্ণময় কমণ্ডলুধারী শত শত পথিক ব্রাহ্মণ গোসমূহ সমভিব্যাহারে প্রভূত বলি গ্রহণ করিয়া প্রবেশ করিতে না পারিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। অমরাঙ্গনারা যেমন অমররাজের নিমিত্ত মধু ধারণ করিয়া থাকে, রাজা যুধিষ্ঠিরের নিমিত্তও সেইরূপ ধারণ করিয়াছিল। বাসুদেব বহুরত্নবিভূষিত মহামূল্য শৈক্য ও প্রধান শঙ্খ গ্রহণ করিয়া যুধিষ্ঠিরকে অভিষেক করিলেন। শৈক্য লইয়া কেহ কেহ পূর্ব্ব সাগরে কেহ কেহ দক্ষিণ সাগরে, কেহ কেহ বা পশ্চিম সাগরে, গমন করিল। উত্তর সাগরে পক্ষী ব্যতীত কাহারও গতিবিধি নাই, কিন্তু হে পিতঃ। কেমন আশ্চর্য্যের বিষয় শ্রবণ করুন, অর্জুন সেখানেও গমন করিয়া অপরিমিত ধন আহরণ করিয়াছে। লক্ষ ব্রাহ্মণের ভোজনক্রিয়া সম্পন্ন হইলে এক একবার শঙ্খনাদ হয়; এইরূপ শঙ্খধ্বনি প্রতিনিয়তই হইয়াছিল, আমি মুহুর্মুহুঃ শঙ্খনাদ শ্রবণ করিয়া রোমাঞ্চিতকলেবর হইয়াছিলাম। সভাস্থান, দর্শনাভিলাষী পার্থিবগণে সমাকীর্ণ হইয়া, তারকাসঙ্কুল বিমল নভোমণ্ডলের ন্যায় সুশোভিত হইয়াছিল। পার্থিবগণ বৈশ্যের ন্যায় রত্নজাত লইয়া ধীমান যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞে দ্বিজাতিগণের পরিবেশক হইয়াছিলেন। মহারাজ! বলিতে কি যুধিষ্ঠিরের যেরূপ রাজলক্ষ্মী; তাহা দেবরাজেরও নাই, যমরাজেরও নাই, বরুণেরও নাই এবং গুহ্যকাধিপতিরও নাই, সেই শ্রী দেখিয়া অবধি আমার মন এরূপ পরিতপ্ত হইয়াছে যে, আমি আর শান্তিলাভ করিতে সমর্থ হইতেছি না।

অক্ষক্রীড়ায় বিদুরের অসম্মতি।

দুর্য্যোধনের বাক্যাবসানে শকুনি দুর্য্যোধনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে সত্যপরাক্রম! পাণ্ডবে যে অনুপম রাজ-লক্ষ্মী দৃষ্টিগোচর করিয়াছ, তৎপ্রাপ্তির উপায় কর। আমি অক্ষবিষয়ে অভিজ্ঞ, মৰ্ম্মজ্ঞ, পণজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞ। যুধিষ্ঠিরও দ্যূতপ্রিয়, কিন্তু তদ্বিষয়ে তাঁহার অভিজ্ঞতা নাই। ক্ষত্রিয় রীত্যনুসারে দ্যুতের বা রণের নিমিত্ত আহুত হইলে অবশ্য তাঁহাকে আসিতে হইবে; অতএব তাঁহাকে আহ্বান কর। আমি কপট ক্রীড়ায় পরাজয় করিয়া তাঁহার সেই দিব্য সমৃদ্ধি আনয়ন করিব, সন্দেহ নাই। দুর্য্যোধন শকুনির বচনাবসান হইবামাত্র ধৃতরাষ্ট্রকে কহিলেন, হে রাজন! অক্ষবিৎ গান্ধাররাজ দ্যূতদ্বারা পাণ্ডুপুত্রের রাজলক্ষ্মী হরণ করিতে উৎসাহিত হইয়াছেন, আপনি অনুমতি করুন। ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর আমাদের মন্ত্রী; আমি তাঁহার শাসনানুবর্তী, অতএব তাঁহার সহিত মিলিত হইয়া কিংকর্তব্যতার অবধারণ করিব। তিনি দূরদর্শিতাপ্রভাবে উভয় পক্ষের হিতকর ও ধর্মানুগত মন্ত্রণা দিবেন। দুর্য্যোধন কহিলেন, হে রাজেন্দ্র! যদি বিদুর আগমন করেন, তাহা হইলে আপনাকে নিবারণ করিবেন; আপনি নিবৃত্ত হইলে আমি নিঃসন্দেহ প্রাণত্যাগ করিব।

ধৃতরাষ্ট্র দুর্য্যোধনের বিনয়গর্ন্ত কাতরবাক্য শ্রবণ করিয়া তন্মতস্থ হইয়া অনুচরবর্গকে কহিলেন, "শিল্পিগণকে আনাইয়া ঘৃণা সহস্রশোভিত শতদ্বারবিশিষ্ট লোচন-লোভনীয় এক সভা নির্মাণ করাও, পরে তাহা রত্নাস্তরণ-মণ্ডিত ও সুপ্রবেশ্য করিয়া আমাকে নিবেদন করিবে।" ধৃতরাষ্ট্র দুর্য্যোধনের পরিতাপ | শান্তির নিমিত্ত কেবল অপত্যস্নেহের অনুরোধে পূর্ব্বোক্ত অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন, কিন্তু অক্ষক্রীড়া বহু দোযাকর জানিয়া বিদুরকে জিজ্ঞাসা না করিয়া কিছুই নিশ্চয় করা হইবে না, এই বিবেচনা করিয়া বিদুরের নিকট সংবাদ পাঠাইয়া দিলেন। ধীমান্ বিদুর কলহের দ্বারস্বরূপ, বিনাশের মুখস্বরূপ পাশ-ক্রীড়ার সংবাদ শ্রবণমাত্র অতিশয় ব্যগ্রতাসহকারে জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রের নিকট গমন করিয়া পাদবন্দনপূর্ব্বক কহিলেন, হে রাজন! আপনার এই ব্যবসায়ে অনুমোদন করিতে পারি না; যাহাতে দ্যুতের নিমিত্ত পুত্রগণের পরস্পর বিরোধ উপস্থিত না হয়, তাহা করুন। ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে বিদুর! যদি দেবগণ অপ্রসন্ন হন, তথাপি আমার পুত্রগণের মধ্যে কলহ হইবে না। আমি, তুমি, দ্রোণ ও ভীষ্ম সন্নিহিত থাকিতে কোন প্রকারে দ্যূতজনিত অবিনয় ঘটিবার সম্ভাবনা নাই। তুমি অদ্যই তুর্ণগামী তুরঙ্গ যোজিত রথে আরোহণ করিয়া খাণ্ডবপ্রস্থ হইতে যুধিষ্ঠিরকে আনয়ন কর। হে বিদুর! আমার এ ব্যবসায় বলিও না, দৈবই প্রধান, দৈব হইতেই এই ঘটনা ঘটিতেছে। ধীমান্ বিদুর এই প্রকার অভিহিত হইয়া চিন্তা করত দুঃখিতচিত্তে মহাপ্রাজ্ঞ ভীষ্মের নিকটে গমন করিলেন।

দুর্য্যোধনের পুনরায় দুঃখ প্রকাশ।

জনমেজয় বৈশম্পায়নকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ব্রহ্মবিত্তম! যাহাতে আমার পিতামহ পাণ্ডবগণ ব্যসনাপন্ন হইয়াছিলেন, সেই মহান্ অনর্থকর দ্যূতক্রীড়া কিরূপে হইয়াছিল, তথায় কোন্ কোন্ ব্যক্তি সভ্য ছিলেন, কোন্ কোন্ ব্যক্তিই বা অনুমোদন এবং কে কে বা প্রতিষেধ করিয়াছিলেন? পৃথিবীবিনাশের মূলস্বরূপ এই সকল বৃত্তান্ত বিস্তারিতক্রমে শ্রবণ করিতে বাসনা করি। বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! যদি পুনরায় সবিস্তরে শ্রবণের নিমিত্ত অভিলাষ জন্মিয়া থাকে, তবে শ্রবণ কর। ধৃতরাষ্ট্র বিদুরের অভিপ্রায় অবগত হইয়া নির্জন প্রদেশে পুনর্ব্বার দুর্য্যোধনকে কহিতে লাগিলেন, হে বৎস! মহাবুদ্ধি বিদুর কখনই আমাদের অহিতকর উপদেশ দিবেন না, বিশেষতঃ উদারবুদ্ধি বৃহস্পতি দেবরাজ ইন্দ্রকে যে সকল শাস্ত্রোপদেশ দিয়াছেন, তিনি তাহার মর্ম্ম পর্য্যন্ত অবগত আছেন এবং উদ্ধব যেমন বৃষ্ণিবংশের, উনিও সেইরূপ কুরুবংশের প্রধান; অতএব বিদুর যখন অক্ষদেবনে' অনুমোদন করে নাই, তখন উহাতে আর প্রয়োজন নাই। হে পুত্র! বিদুর যাহা কহিতেছেন, তাহাই উৎকৃষ্ট ও তোমার হিতকর; তাহার অন্যথা করিও না। দ্যূত হইতে সুহৃদ্ভেদ এবং সুহৃদ্ভেদ হইতে রাজ্যনাশ হয়, অতএব পাশক্রীড়ার অধ্যবসায় হইতে নিবৃত্ত হও। হে কৃতপ্রজ্ঞ! পুত্রের প্রতি, পিতামাতার যাহা কর্তব্য, তাহা করা হইয়াছে; প্রতিপালিত অধীতবান্, কৃতবিদ্য, গৃহে লালিত এবং সকলের জ্যেষ্ঠ বলিয়াই রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছ, অনন্যসুলভ ভোজনাচ্ছাদন ভোগ করিতেছ, পৈত্রিক রাজ্য বর্দ্ধিত করিয়াছ ও প্রতিনিয়ত আজ্ঞা প্রচার করত দেবেশ্বরের ন্যায় দীপ্তি পাইতেছে, তবে তোমার দুঃখের বিষয় কি বল?

দুর্য্যোধন কহিলেন, হে রাজন! কাপুরুষেরাই অশন বসনে পরিতৃপ্ত হইয়া থকে এবং অধম পুরুষেরাই অমর্ষশূন্য হয়। হে রাজেন্দ্র! এই সামান্য রাজলক্ষ্মী আমাকে প্রীত করিতে পারিতেছে না, আমি যুধিষ্ঠিরের দীপ্যমানা রাজলক্ষ্মী এবং সমস্ত পৃথিবী তাঁহার বশবর্ত্তিনী দৃষ্টিগোচর করিয়া ব্যথিত হইয়াছি। আমি অত্যন্ত পাষাণহৃদয়, এই নিমিত্ত এরূপ দুঃখেও জীবিত রহিয়াছি। যুধিষ্ঠির-নিকেতনে কদম্ব, চিত্রক, কৌকুর, কারস্কর ও লৌহজঙ্ঘ প্রভৃতি বৃক্ষসকল ফলভরে আবর্জিত হইয়া রহিয়াছে। মহাগিরি হিমালয়, সাগর এবং অন্য কতিপয় জলপ্রায় ভূমি, ইহারা সকলেই রত্নাকর; এই সমস্ত রত্নাকর যুধিষ্ঠিরের সমৃদ্ধ গৃহে পরিভূত হইয়াছে। হে রাজন। যুধিষ্ঠির আমাকে - জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ জানিয়া সৎকারপূর্ব্বক রত্নপরিগ্রহে নিযুক্ত করিয়াছিল। তথায় এত মহামূল্য রত্নজাত সঙ্কলিত হইয়াছিল যে. আমি তাহার ইয়ত্তা করিতে পারি নাই। আমার হস্ত সমুদায় রত্ন গ্রহণ করিতে অসমর্থ হইয়াছিল। আমি পরিশ্রান্ত হইলে ভূপালগণ সেই সমস্ত রত্নজাত হস্তে লইয়া দূরে দণ্ডায়মান রহিলেন। ময়দানব বিন্দুসরোবরের রত্নরাশিদ্বারা এরূপ স্ফটিক দলশালিনী প্রফুল্ল নলিনী নির্মাণ করিয়াছিল যে, আমি তদ্দর্শনে জলস্থ প্রফুল্ল কমল বলিয়া বোধ করিয়াছিলাম এবং সলিলভ্রমে সভাকুট্রিমেই আপনার পরিচ্ছদ উৎক্ষিপ্ত করিলে বৃকোদর আমাকে শত্রুসম্পত্তি দর্শনে বিভ্রান্ত ও রত্নানভিজ্ঞ মনে করিয়া উপহাস করিয়াছিল। আমি সমর্থ হইলে সেইখানেই তাহাকে নিপাতিত করিতাম; কিন্তু ক্রোধ প্রকাশ করিলে আমাদিগকেও শিশুপালের, অনুগমন করিতে হইত, সন্দেহ নাই। হে ভরতবংশাবতংস। সেই শত্রুর উপহাস আমাকে দগ্ধ করিতেছে। হে মহারাজ! আমি পুনরায় সেইরূপ জলজশালিনী দীর্ঘিকাকে সভাস্থলী মনে করিয়া তাহাতে পতিত হইয়াছিলাম। আমাকে পতিত দেখিয়া কৃষ্ণ, পার্থ, দ্রৌপদী ও অন্যান্য স্ত্রীগণ মর্মান্তিক বেদনা প্রদান করত হাস্য করিতে লাগিল। সমধিক দুঃখের বিষয় এই যে, কিঙ্করগণ আমাকে আর্দ্রবস্ত্র দেখিয়া যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞানুসারে তাঁহার বস্ত্রাগার হইতে অন্যান্য বস্ত্র আনিয়া প্রদান করিল। পিতঃ! আর এক প্রতারণার বিষয় শ্রবণ করুন, দ্বারবৎ প্রতীয়মান অদ্বারদ্বারা নির্গত হইতে গিয়া ভিত্তিশিলায় আহত হইয়া ক্ষতললাট হইলাম, নকুল এবং সহদেব দূর হইতে আমাকে আহত দেখিয়া দুঃখ প্রকাশপূর্ব্বক গ্রহণ করিল। সহদেব আমাকে পুনঃ পুনঃ কহিতে লাগিল; হে রাজন! এই দ্বার; এই দিকে আগমন করুন। ভীমসেন হাসিতে হাসিতে আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিল, হে ধৃতরাষ্ট্রাষ্মজ! এদিকে দ্বার। এই সকল কারণে আমি অত্যন্ত পরিতাপিত হইয়াছি।

প্রজাপ্রদত্ত উপহারে দুর্য্যোধনের খেদ।

দুর্য্যোধন কহিলেন, মহারাজ। নানা দিগদেশাগত ভূপালেরা রাজা যুধিষ্ঠিরকে যে সকল অমূল্য বস্তু উপহার দিয়াছেন, তাহার বৃত্তান্ত শ্রবণ করুন; আমি সেই সভায় যে সকল রত্নজাত দেখিয়াছি, পূর্ব্বে সে সকলের নাম পর্যন্ত শ্রবণ করি নাই। কাম্বোজরাজ উর্ণানির্মিত, সামুদ্রিক বিড়ালরোেমরচিত, কাঞ্চনসদৃশ, পরিষ্কৃত পরিচ্ছদসকল প্রদান করিয়াছেন। শত সহস্র গোসেবী ব্রাহ্মণ ও দাসবর্গ মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের প্রীতির নিমিত্ত বিচিত্রবর্ণ ত্রিশত অশ্ব, পরিপুষ্ট ত্রিশত উষ্ট্র ও বড়বা, রাশীকৃত বলি, স্বর্ণময় কমণ্ডলু এবং কার্পাসিক দেশনিবাসিনী লক্ষ দাসীসমভিব্যাহারে প্রবেশ করিতে না পারিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান ছিলেন। শ্যামা কৃশাঙ্গী দীর্ঘকেশী হেমাভরণভূষিতা শূদ্ররা ব্রাহ্মণোচিত রঙ্কুমৃগের অজিন এবং ভরুকচ্ছনিবাসী জনগণ সর্ব্বপ্রকার পূজোপকরণ ও গান্ধারদেশজাত তুরঙ্গম লইয়া উপনীত ছিল। সে সকল মনুষ্য সিন্ধুপারে ও সমুদ্র-সন্নিহিত উপবনে জন্মগ্রহণ করিয়াছে এবং যাহারা ইন্দ্রকৃষ্ট’ ও নদীমুখ২ ধান্যদ্বারা জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করে, সেই সকল বৈরাম, পারদ, আভীর ও কিতবগণ বিবিধ বলি, বহুবিধ রত্ন, সদ্যঃপ্রসূত অজাদুগ্ধ, মেষ, গো, হিরণ্য, গর্দভ, উষ্ট্র, ফলজ মধু ও নানাবিধ কম্বল গ্রহণ করিয়া দ্বারদেশে অবস্থিতি করিয়াছিল। ম্লেচ্ছাধিপতি শৌর্যবীর্য্যসম্পন্ন মহারথ প্রাগজ্যোতিযেশ্বর ভগদত্ত, যবন সমভিব্যাহারে প্রসিদ্ধ তুরঙ্গকুলসম্ভূত বেগশালী অশ্বসমূহ ও সর্ব্ববিধ বলি গ্রহণ করিয়া আসিয়াছিল; তাহারা প্রবেশ করিতে না পারিয়া লৌহনিৰ্ম্মিত অশ্বভূষণ ও নির্মূল গজদন্তনির্ম্মিত-মুষ্টিশোভিত অসিসমুদায় প্রদান করিয়া প্রস্থান করিল। কতিপয় লোক নানা দিগন্দেশ হইতে সমাগত হইয়া দ্বারদেশে উপস্থিত ছিল। তাহাদের মধ্যে কতকগুলি দ্বিনেত্র, কতকগুলির ত্রিনেত্র, কতকগুলির নেত্র ললাটদেশে, কতকগুলি উষ্ণীষধারী এবং কতকগুলি দিগম্বর দৃষ্টিগোচর করিলাম। তৎপরে রোমক, নরমাংসভোজী, একপাদ এবং অনেকগুলি রাজগণ দৃষ্ট হইল। তাঁহারা কৃষ্ণগ্রীব, মহাকায়, দূরগামী, সুশিক্ষিত দশ সহস্র রাসভ আহরণ করিয়াছিলেন। বঙক্ষুতীর-সমুদ্ভব লোকেরা পূজার নিমিত্ত বহুতর হিরণ্য ও কাঞ্চন যুধিষ্ঠিরকে প্রদান করিল। একপাদেরা ইন্দ্রগোপকীটের ন্যায় রক্তবর্ণ, শুক্লবর্ণ, ইন্দ্রায়ুধবর্ণ, সন্ধ্যাকালীন জলদবর্ণ এবং নানাবর্ণ কতকগুলি মহাজব আরণ্য অশ্ব এবং অমূল্য স্বর্ণরাশি প্রদান করিয়া যুধিষ্ঠির-নিবেশনে প্রবেশ করিয়াছিল। তদনন্তর চীন, শক ও ওড্রদেশবাসী এবং বনবাসী বর্ব্বরজাতি, বৃষ্ণিবংশীয়, হারহুণদেশীয়, হিমালয় পার্ব্বতীয় এবং নীপ ও অনূপগণ দ্বারদেশে দণ্ডায়মান ছিলেন। বঙক্ষু তীরনিবাসীরা কৃষ্ণগ্রীব, মহাকায় শতক্রোশগামী সুশিক্ষিত প্রসিদ্ধ দশ সহস্র রাসভ প্রদান করিয়াছিল। শক, তুষার, কঙ্ক, রোমশ ও শৃঙ্গযুক্ত মনুষ্য, ঊর্ণাজ, রাঙ্কব, কীটজ, পটজ, কুটিকৃত, কমলসদৃশ প্রভাসম্পন্ন ও

||অসমাপ্ত||