কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

সভাপর্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

সভাক্রিয়া পর্ব্বাধ্যায়
লোকপাল-সভাখ্যান পর্ব্বাধ্যায়
রাজসূয়ারম্ভ পর্ব্বাধ্যায়
জরাসন্ধবধ পর্ব্বাধ্যায়
দিগ্বিজয় পর্ব্বাধ্যায়

সভাপর্ব

সভাক্রিয়া পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নরোত্তম নর, দেবী সরস্বতী এবং বেদব্যাসকে প্রণাম করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

ময়ের প্রার্থনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ময়দানব কৃতাঞ্জলি হইয়া বাসুদেবের সন্নিধানে অর্জুনের বারংবার সৎকার ও পূজা করিয়া মধুরবাক্যে কহিতে লাগিল, হে কৌন্তেয়! আপনি ক্রোধান্বিত কৃষ্ণ এবং দহনোন্মুখ হুতাশন হইতে আমাকে পরিত্রাণ করিয়াছেন; অতএব আজ্ঞা করুন, আপনার কি প্রত্যুপকার করিব? অর্জুন কহিলেন, হে মহাসুর! তোমার সমস্ত প্রত্যুপকার করাই হইয়াছে; তোমার মঙ্গল হউক; এক্ষণে স্বস্থানে প্রস্থান কর, তুমি আমার প্রতি সতত সন্তুষ্ট থাকিও, আমিও তোমার প্রতি সম্যক্ প্রীত রহিলাম। ময় কহিল, হে বিভো! আপনি স্বীয় মহত্ত্বানুরূপ বাক্যই প্রয়োগ করিলেন, কিন্তু আমার একান্ত ইচ্ছা যে প্রীতিপূর্ব্বক আপনার কিঞ্চিৎ উপকার করি। আমি দানবকুলের বিশ্বকর্মা; কেবল আপনার গুণগ্রামের নিতান্ত বশীভূত হইয়া কার্য্য করিতে উদ্যত হইয়াছি। অর্জুন কহিলেন, হে কৃতজ্ঞ। তুমি আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইয়াছ বলিয়া আমার প্রত্যুপকার করিতে ইচ্ছা করিতেছ, এই নিমিত্ত তোমা দ্বারা কোন কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিয়া লইতে আমার ইচ্ছা নাই; কিন্তু তোমার অভিলাষ যে ব্যর্থ হয়, ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে, অতএব তুমি কৃষ্ণের কোন কর্ম কর, তাহা হইলেই আমার প্রত্যুপকার করা হইবে। তখন ময় আদেশলিন্স হইয়া কৃষ্ণকে অনুরোধ করিল। কৃষ্ণ তাহার আগ্রহাতিশয় সন্দর্শনে আদেষ্টব্য বিষয়ের নিমিত্ত ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, হে শিল্পকর্মবিশারদ! যদি তুমি নিতান্তই আমার প্রিয়কার্য্যানুষ্ঠানে মানস করিয়াছ, তবে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের এরূপ এক সভা নির্মাণ কর যে, মনুষ্যগণ তাহাতে উপবেশনপূর্ব্বক সম্যক্ নিরীক্ষণ করিয়াও যেন তাহার অনুকরণ করিতে না পারে। ঐ সভাতে যেন দিব্য, মানুষ ও আসুর অভিপ্রায় সকল স্পষ্টরূপে লক্ষিত হয়।

ময়দানবদ্বারা সভানির্মাণার্থ স্থান পরিমাণ।

ময়দানব কৃষ্ণের অনুজ্ঞা লাভে পরমাহ্লাদিত হইয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের নিমিত্ত বিমানসদৃশ পরম সুন্দর সভা নির্মাণ করিতে মনস্থ করিল। এদিকে কৃষ্ণ ও অর্জুন রাজা যুধিষ্ঠিরের নিকট গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে সমস্ত বৃত্তান্ত বিজ্ঞাপন করিয়া ময়দানবকে লইয়া দেখাইলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির তাহাকে যথাযোগ্য সম্মান করিলেন। ময়ও তাঁহার সমুচিত সৎকার ও তদ্দত্ত পূজা গ্রহণ করিয়া ক্ষণকাল বিশ্রামের পর পাণ্ডুনন্দনগণ সমীপে দানবদিগের বিচিত্র চরিত্রসকল বর্ণন করিতে আরম্ভকরিল। অনন্তর মহাত্মা কৃষ্ণ ও পাণ্ডবগণের অভিপ্রায়ানুসারে পুণ্য দিনে কৃতকৌতুকমঙ্গল হইয়া পায়স ও বহুবিধ ধনদ্বারা ব্রাহ্মণগণকে পরিতৃপ্ত করিয়া সর্ব্বঋতুগুণসম্পন্ন দিব্যরূপ মনোহর সভাস্থলীর পরিসর পঞ্চ সহস্র হস্ত পরিমাণ করিয়া লইল।

শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা যাত্রা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ভগবান্ বাসুদেব পরম প্রীত পাণ্ডবগণকর্তৃক অভিপূজিত হইয়া কিয়দ্দিন খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করিলেন। পরিশেষে পিতৃদর্শনে সাতিশয় উৎসুক হইয়া স্বভবনে গমন করিতে নিতান্ত অভিলাষী হইলেন। তিনি প্রথমতঃ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে আমন্ত্রণ করিয়া পশ্চাৎ স্বীয় পিতৃম্বসা কুস্তীদেবীর চরণ বন্দন করিলেন। ভোজরাজদুহিতা তাঁহার মস্তকাঘ্রাণপূর্ব্বক তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন। তখন বাসুদেব সাক্ষাৎকারমানসে স্বীয় ভগিনী সুভদ্রার সমীপে উপস্থিত হইয়া অর্থযুক্ত, হিতকর, অল্পাক্ষর ও অখণ্ডনীয় বাক্যে তাঁহাকে নানাপ্রকারে বুঝাইলেন। ভদ্রভাষিণী' সুভদ্রাও তাঁহাকে জননী প্রভৃতি স্বজনসমীপে বিজ্ঞাপনীয় বাক্যসমুদায় কহিয়া দিয়া বারংবার পূজা ও অভিবাদন করিলেন। বৃষ্ণিবংশাবতংস কৃষ্ণ তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া দ্রৌপদী ও ধৌম্যের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। ধৌম্যকে যথাবিধি বন্দন এবং দ্রৌপদীকে সম্ভাষণ ও আমন্ত্রণ করিয়া অর্জুন সমভিব্যাহারে তথা হইতে যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতৃ চতুষ্টয়ের নিকট উপস্থিত হইলেন। তথায় ভগবান্ বাসুদেব পঞ্চপাণ্ডবকর্তৃক বেষ্টিত হইয়া অমরগণ-পরিবৃত মহেন্দ্রের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন।

তৎপরে কৃষ্ণ যাত্রাকালোচিত কার্য্য করিবার মানসে স্নানান্তে অলঙ্কার পরিধান করিয়া মাল্য, জপ, নমস্কার ও নানাবিধ গন্ধদ্রব্যদ্বারা দেবদ্বিজগণের পূজা সমাধা করিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে তৎকালোচিত সমস্ত কার্য্য সমাপন করিয়া স্বপুর গমনোদ্যোগে বহিঃকক্ষায় বিনির্গত হইলেন। স্বস্তিবাচক ব্রাহ্মণগণ দধিপাত্র, ফল, পুষ্প ও অক্ষত প্রভৃতি মাঙ্গল্য বস্তু হস্তে করিয়া তথায় উপস্থিত ছিলেন। বাসুদেব তাঁহাদিগকে ধনদানপূর্ব্বক প্রদক্ষিণ করিলেন। পরে অত্যুৎকৃষ্ট তিথি নক্ষত্রযুক্ত মুহূর্তে গদা, চক্র, অসি, শাঙ্গ প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র-পরিবৃত গরুড়কেতন' বায়ুবেগগামী কাঞ্চনময় রথে আরোহণ করিয়া স্বপুরে গমন করিতেছেন, এমন সময়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির স্নেহপরতন্ত্র হইয়া সেই রথে আরোহণপূর্ব্বক দারুক সারথিকে তৎস্থান হইতে স্থানান্তরে উপবেশন করাইয়া স্বয়ং সারথি হইয়া বল্গা গ্রহণ করিলেন। মহাবাহু অর্জুনও তাহাতে আরোহণ করিয়া স্বর্ণদণ্ডবিরাজিত শ্বেত চামর ধারণপূর্ব্বক শ্রীকৃষ্ণকে বীজন করত প্রদক্ষিণ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন, নকুল এবং সহদেব, ঋত্বিক্ ও পুরোহিতগণ সমভিব্যাহারে তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। শত্রুবলান্তক বাসুদেব যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতৃগণ কর্তৃক অনুগম্যমান হইয়া শিষ্যগণানুগত গুরুর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তিনি অর্জুনকে আমন্ত্রণ ও গাঢ় আলিঙ্গন, যুধিষ্ঠির ও ভীমসেনকে পূজা এবং নকুল সহদেবকে সম্ভাষণ করিলেন। যুধিষ্ঠির, ভীমসেন ও অর্জুন তাঁহাকে আলিঙ্গন এবং নকুল ও সহদেব তাঁহাকে অভিবাদন করিলেন। তৎপরে ক্রমে ক্রমে অর্দ্ধ যোজন গমন করিয়া শত্রুনিসূদন কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে আমন্ত্রণপূর্ব্বক 'প্রতিনিবৃত্ত হউন' বলিয়া তাঁহার পাদদ্বয় গ্রহণ করিলেন।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির চরণপতিত পতিতপাবন কমললোচন কৃষ্ণকে উত্থাপিত করিয়া তাঁহার মস্তকাঘ্রাণপূর্ব্বক স্বভবনে গমন করিতে অনুমতি করিলেন। তখন ভগবান্ বাসুদেব পাণ্ডব-গণের সহিত যথাবিধি প্রতিজ্ঞা করত অতি কষ্টে তাঁহাদিগকে প্রতিনিবৃত্ত করিয়া অমরাবতীপ্রস্থিত মহেন্দ্রের ন্যায় দ্বারাবতী প্রতিগমন করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবগণ কৃষ্ণকে যতক্ষণ দেখিতে পাইলেন, ততক্ষণ তাঁহারা নিমেষশূন্য নয়নে তাঁহাকে নিরীক্ষণ ও মনে মনে তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। কৃষ্ণকে দেখিয়া তাঁহাদিগের মনঃ পরিতৃপ্ত না হইতে হইতেই তিনি তাঁহাদিগের দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলেন। তখন পাণ্ডবগণ কৃষ্ণদর্শনে নিতান্ত নিরাশ হইয়া তদ্বিষয়ণী চিন্তা করিতে করিতে স্বপুরে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। দেবকীনন্দন কৃষ্ণও অনুগামী মহাবীর সাত্বত এবং দারুক সারথির সহিত বেগবান্ গরুড়ের ন্যায় সত্বরে দ্বারকাপুরে সমুপস্থিত হইলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ-সমভিব্যাহারে সুহৃজ্জনপরিবৃত হইয়া স্বপুরে প্রবেশ করিলেন এবং ভ্রাতা, পুত্র ও বন্ধুদিগকে বিদায় দিয়া দ্রৌপদীর সহিত আমোদ প্রমোদে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এদিকে কৃষ্ণও পরমাহ্লাদিতচিত্তে দ্বারকাপুরে প্রবেশ করিলেন। উগ্রসেন প্রভৃতি যদুশ্রেষ্ঠগণ তাঁহার পূজা করিতে লাগিলেন। বাসুদেব পুরপ্রবেশ করিয়া অগ্রে বৃদ্ধ পিতা আহুক ও যশস্বিনী মাতাকে পরে বলভদ্রকে অভিবাদন করিলেন। অনন্তর তিনি প্রদ্যুম্ন, শাম্ব, নিশঠ, চারুদেষ্ণ, গদ, অনিরুদ্ধ ও ভানুকে আলিঙ্গন করিয়া বৃদ্ধগণের অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক রুক্মিণীর ভবনে উপস্থিত হইলেন।

অর্জুনের প্রতি ময়দানবের বাক্য ও তাহার মৈনাকপৰ্ব্বতে গমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। অনন্তর ময়দানব অর্জুনকে কহিলেন, হে মহাভাগ। আপনাকে আমন্ত্রণ করিয়া এক্ষণে বিদায় হইতেছি, পুনর্ব্বার প্রত্যাগমন করিব। পূর্ব্বকালে কৈলাসের উত্তরভাগে মৈনাকসন্নিধানে দানবগণ যজ্ঞানুষ্ঠানের বাসনা করেন। ঐ দানবযজ্ঞে আমি বিন্দুসরোবরসন্নিধানে মণিময় রমণীয় দ্রব্যসম্ভার আহরণ করিয়াছিলাম। যে সমস্ত দ্রব্যজাত দানবরাজ বৃষপর্ব্বার সভামণ্ডপে অবস্থাপিত ছিল, যদি এক্ষণে তাহা বিনষ্ট হইয়া না থাকে, তবে গ্রহণ করিয়া অবিলম্বে আগমন করিব। পরে আপনার মনঃপ্রহ্লাদিনী যশস্বিনী অতি বিচিত্রা সর্ব্বরত্নভূষিতা সভাস্থলী নির্মাণ করিয়া দিব। আর বিন্দুসরোবরে এক গদা নিহিত রহিয়াছে, বোধ করি, দানবরাজ বৃষপর্ব্বা সংগ্রামে শত্রুসংহার করিয়া সুবর্ণমণ্ডিতা শত্রুনাশিনী ভারসহা সুদৃঢ়া ঐ গদা বিন্দুসরোবরে রাখিয়া দেন। যাদৃশ গাণ্ডীব আপনার উপযুক্ত হইয়াছে, সেইরূপ শতসহস্র গদাপ্রভাবশালিনী উক্ত গদাও ভীমসেনের অনুরূপ হইবে। আর বরুণ-পরিগৃহীত দেবদত্ত সুম্বন' মহাশঙ্খও তথায় নিহিত রহিয়াছে। আমি এই সমস্ত বস্তু আনিয়া নিঃসন্দেহ আপনাকে প্রদান করিব। এই বলিয়া অর্জুনের নিকট বিদায় গ্রহণপূর্ব্বক ময়দানব পূর্বোত্তর দিগ্বিভাগে প্রস্থান করিল এবং কৈলাসের উত্তরাংশে মৈনাকসন্নিধানে মণিমণ্ডিত হিরণ্ময় শৃঙ্গশালী সুমহান্ এক পৰ্ব্বত দেখিতে পাইল। সেই স্থানেই রমণীয় বিন্দুসরোবর নিখাত রহিয়াছে। রাজা ভগীরথ, ভগবতী ভাগীরথীর দর্শন-মানসে বহুকাল তথায় বাস করিয়াছিলেন। ভূতভাবন ভগবান্ প্রজাপতি সেই স্থানেই অত্যুৎকৃষ্ট যজ্ঞশত অনুষ্ঠান করেন। মণিময় যূপ ও হিরণ্ময় চৈত্যসকল দৃষ্টান্তরূপে তথায় রক্ষিত হয় নাই, কেবল তৎপ্রদেশের শোভা সম্পাদনার্থই নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্র যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া সেই স্থানে সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন, ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতি তথায় প্রজাসমস্ত সৃষ্টি করিয়া শত সহস্র ভূতগণকর্তৃক উপাসিত হইয়াছিলেন। নর, নারায়ণ, ব্রহ্মা, যম ও স্থাণু যুগসহস্র অতিক্রান্ত হইলে তথায় যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। বাসুদেব ধৰ্ম্ম সঞ্চয় করিবার নিমিত্ত শ্রদ্ধাবান্ হইয়া অবিচ্ছেদে বহু বৎসর তথায় যজ্ঞকার্য্য সমাধান করেন। কেশবের সুবর্ণমালালঙ্কৃত যূপ ও শতসহস্র-সংখ্যক ভাস্বর চৈত্যে তথাকার রমণীয় শোভা সম্পাদিত হইয়াছে। ময়দানব সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া দানবরাজ বৃষগর্ব্বার অধিকৃত স্ফটিকময় সভা-নির্মাণোপযোগী সমুদায় দ্রব্যসামগ্রী, মহতী গদা, দেবদত্ত শঙ্খ ও কিঙ্কর এবং রাক্ষসরক্ষিত ধনসমস্ত গ্রহণ করিল।

ময়দানবের ইন্দ্রপ্রস্থে প্রত্যাগমন, তৎকর্তৃক সভানির্মাণ ও ভীমাদিকে গদাদি প্রদান এবং সভা বর্ণন।

অনন্তর মহাসুর ময় সমস্ত বস্তু সমভিব্যাহারে প্রত্যাগত হইয়া অলোকসামান্য ত্রিলোকবিখ্যাত মণিময়ী সভাস্থলী নির্মাণ করিল। ভীমসেনকে গদা ও অর্জুনকে দেবদত্ত মহাশঙ্খ সমর্পণ করিল। ঐ শঙ্খ ধ্বনিত হইলে লোকসকল কম্পিত হইত। সুবর্ণনির্মিত তরুরাজি বিরাজিত সভামণ্ডপ চতুর্দিকে পঞ্চসহস্র হস্ত বিস্তীর্ণ হইয়াছিল। পাণ্ডবসভা হুতাশন, সূর্য্য ও চন্দ্রের সভার ন্যায় সমধিক শোভা পাইতে লাগিল। তদীয় প্রভাপ্রভাবে প্রভাকরের অতি ভাস্বর প্রভাও নিতান্ত প্রতিহত হইল। তৎকালে অলোকসামান্য সেই সভা স্বীয় তেজঃপুঞ্জদ্বারা যেন প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। নবীননীরদসঙ্কাশ, অতি বিশাল, বিপুল, রমণীয়, পাপনাশক, শ্রমাপহারক, রত্নপ্রাকারমণ্ডিত, বহুচিত্রোপ-শোভিত, অত্যুত্তম দ্রব্যসম্ভারশালী, বহুলধনসম্পন্ন, গগনব্যাপী বিশ্বকর্মানিৰ্ম্মিত যাদবসভা, দেবসভা এবং ব্রহ্মসভাও পাণ্ডবগণের সভার নিকট পরাজিত হইয়াছিল। ময়দানবের আদেশানুসারে গগনচর মহাঘোর, মহাকায়, মহাবল, রক্তনেত্র, শুক্তিকর্ণ আয়ুধধারী অষ্ট সহস্র কিঙ্কর ও রাক্ষস ঐ রমণীয় সভার রক্ষণাবেক্ষণ করিত এবং আবশ্যকমতে বহন করিয়া উহাকে স্থানান্তরেও লইয়া যাইত। ময়দানব ঐ সভাস্থলে এক অপূর্ব্ব সরোবর প্রস্তুত করিয়াছিল, ঐ সরোবরের সোপান-পরম্পরা স্ফটিকময়, পরিসরবেদিকা' সকল মণিনিৰ্ম্মিত, জল অতি স্বচ্ছ, পঙ্কশূন্য ও সুবর্ণনির্মিত মৎস্য-কুৰ্ম্ম-সার্থ-সঙ্কুল। মণিময় মৃণালে পরিশোভিত ও বৈদূর্য্যপত্রে সমালঙ্কৃত, বিকসিত কনক-কমল-কহারজালে উহার অত্যদ্ভুত মনোহারিণী শোভা সম্পাদন করিয়াছিল। হংস, কারণ্ডব, সারস, চক্রবাক্ প্রভৃতি জলবিহঙ্গমগণ তীরে ও নীরে বিহার করিয়া জনগণের নয়নের - সার্থকতা সম্পাদন করিল। মুক্তাফল ও নানাবিধ রত্নে উহার চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন হইয়াছিল। রাজাদিগের মধ্যে কেহ সরোবর-সন্নিধানে উপস্থিত হইয়াও সহসা উহাকে সরোবর বলিয়া বুঝিতে পারেন নাই। প্রত্যুত তাঁহারা অজ্ঞানতাবশতঃ সরোবরের উপরিভাগ দিয়া গমন করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। সেই সভার উভয় পার্শ্বে ফল পুষ্প কিশলয়োপশোভিত, সুশীতল নীলবর্ণ ছায়াসম্পন্ন, মনোরম বহুবিধ উন্নত পাদপাবলী সন্নিবেশিত ছিল। অতি সুরভি কানন ও হংস-কারণ্ডব-চক্রবাকো-পশোভিত পুষ্করিণীসকল সভার চারিদিকে শোভা বিস্তার করিল। সমীরণ তরতম জলজ ও স্থলজ পদ্মের গন্ধগ্রহণপূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের সেবা করিতে লাগিল। ময়দানব চতুৰ্দ্দশ মাসে রমণীয় সভাভূমি নির্মাণ করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সমাপ্তি সংবাদ প্রদান করিল।

পাণ্ডবগণের সভাপ্রবেশ এবং গন্ধর্ব্বাদি কিন্নরগণের যুধিষ্ঠিরকে উপাসনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ঘৃত মধুমিশ্রিত পায়স, ফল, মূল, হরিণাদি মৃগমাংস, বিবিধ চোষ্য, নানাবিধ পেয় ও মিষ্টান্নদ্বারা নানাদিদেশাগত অযুতসংখ্যক ব্রাহ্মণগণকে ভোজন করাইলেন। পরে অখণ্ড বস্ত্র ও মাল্যদ্বারা তাঁহাদিগের তৃপ্তিসাধন ও একৈক ব্যক্তিকে সহস্র সহস্র গোদান-পূর্ব্বক সভাপ্রবেশ করিলেন। সভামধ্যে গগনস্পর্শী পুণ্যাহধ্বনি হইতে লাগিল। তৎপরে মহারাজ যুধিষ্ঠির বিবিধ বাদ্য-বাদন ও গন্ধপুষ্পাদি দ্বারা দেবতাদিগের অর্চ্চনা ও স্থাপনা করিলেন। সভাস্থলে মল্ল, ঝল্ল, নট, বৈতালিক ও সূতসকলে উপস্থিত হইয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের উপাসনা করিতে লাগিল। যুধিষ্ঠির দেবপূজা সম্পাদনপূর্ব্বক ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে সেই রমণীয় সভায় ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের ন্যায় বিহার করিতে লাগিলেন। মহর্ষিগণ পাণ্ডবদিগের সহিত সভামণ্ডপে উপবেশন করিলেন। ভূপালগণ নানাদেশ হইতে আগমনপূর্ব্বক তথায় উপবিষ্ট হইলেন। আর অসিত, দেবল, সত্য, সর্পমালী, মহাশিরাঃ, অর্ব্বাবসু, সুমিত্র, মৈত্রেয়, শুনক, বলি, বক, দণ্ড, স্কুলশিরাঃ, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, শুক, সুমন্তু, জৈমিনি, পৈল, তিত্তিরি, যাজ্ঞবল্ক্য, সপুত্র লোমহর্ষণ, অঙ্গুহোম্য, ধৌম্য, অণীমাণ্ডব্য, কৌশিক, দামোষ্ণীষ, ত্রৈবলি, পর্ণাদ, বরজানুক, মৌঞ্জায়ন, বায়ুভক্ষ, পারাশর্য্য, সারিক, বলীবাক, সিলীবাক, সত্যপাল, কৃতশ্রম, জাতুকর্ণ, শিখাবান্, আলম্ব, পারিজাতক, মহাভাগ পৰ্ব্বত, মহামুনি মার্কণ্ডেয়, পবিত্রপাণি সাবর্ণ, ভালুকি, গালব, জঙ্ঘাবন্ধু, রৈভ্য, কোপবেগ, ভৃগু, হরিবভ্রু, কৌণ্ডিল্য, বজ্রমালী, সনাতন, কাক্ষীবান, ঔষিজ, নাচিকেতা, গৌতম, পৈঙ্গ, বরাহ, শুনক, মহাতপাঃ শাণ্ডিল্য, কুকুর, বেণুজঙ্ঘ, কালাপ, কঠ ও অন্যান্য বেদবেদাঙ্গপারগ, ধৰ্ম্মজ্ঞ, জিতেন্দ্রিয়, বিশুদ্ধস্বভাব মহর্ষিগণ এবং ব্যাসশিষ্য আমরা তথায় অতিপবিত্র কথা কীর্তন করত মহাত্মা যুধিষ্ঠিরকে উপাসনা করিতে লাগিলাম। শ্রীমান্ মহাত্মা ধৰ্ম্মশীল মুঞ্জকেতু, বিবর্দ্ধন, সংগ্রামজিৎ, দুর্মুখ, বীর্য্যবান্ উগ্রসেন, ক্ষিতিপতি কয়েন অপরাস্থিত ক্ষেমক কাম্বোজরাজ কমঠ, বজ্রধরসদৃশ প্রভাবশালী যবনজিৎ মহাবল কম্পন, জটাসুর, মদ্রকরাজ, কুন্তী, কিরাতরাজ পুলিন্দ, পুণ্ড্রক, অঙ্গ, বঙ্গ, অন্ধ্রক, পাণ্ডু, ওড্ররাজ, সুমিত্র, শত্রুঘাতী শৈব, কিরাতরাজ সুমনাঃ, যবনাধি-পতি চানূর, দেবরাত, ভীমরথ, ভোেজ, শ্রুতায়ুধ, কালিঙ্গ, জয়সেন, মাগধ, সুকর্মা চেকিতান, শত্রুমৰ্দ্দন পুরু, কেতুমান, বসুদান, বৈদেহ, কৃতক্ষণ, সুধৰ্ম্মা, অনিরুদ্ধ, মহাবল শ্রুতায়ুঃ, দুর্দ্ধর্ষ অনুপরাজ, সুদর্শন ক্রমজিৎ, শিশুপাল, সপুত্র করূষাধিপতি, বৃষ্ণিবংশীয় দেবরূপী কুমারগণ, আহুক, বিপৃথু, গদ, সারণ, অক্রুর, কৃতবর্মা, শিনিপুত্র সত্যক, ভীষ্মক, অস্কৃতি, | বীর্য্যবান্ দ্যুমৎসেন, ধনুর্দ্ধর কৈকেয়বর্গ, সৌমকি, যজ্ঞসেন, কেতুমান, বসুমান্ ও অন্যান্য প্রধান প্রধান ক্ষত্রিয়গণ সভায় উপস্থিত হইয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের উপাসনা করিতে লাগিলেন। যে সমস্ত রাজকুমার মৃগচৰ্ম্ম পরিধানপূর্ব্বক অর্জুনের নিকট অস্ত্র শিক্ষা করিয়াছিলেন, তাঁহারা ও তাঁহাদিগের সতীর্থ রৌক্সিণেয়, শাম্ব, যুযুধান, সাত্যকি, সুধৰ্ম্মা, অনিরুদ্ধ, শৈব্য প্রভৃতি বৃষ্ণিবংশীয় কুমারগণ এবং ধনঞ্জয়ের সখা তুম্বুরু তথায় উপস্থিত হইলেন। গীতবাদ্যবিশারদ, তানলয়কুশল, অমাত্য সমবেত চিত্রসেন এবং গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও কিন্নরগণ তুম্বুরুকর্তৃক আদিষ্ট হইয়া তান-লয়-বিশুদ্ধ স্বর-সংযোগে সঙ্গীত করিয়া পাণ্ডুনন্দন ও মহর্ষিগণের প্রীতি সম্পাদনপূর্ব্বক তাঁহাদিগের উপাসনা করিতে লাগিলেন। যাদৃশ স্বর্গে দেবতারা ব্রহ্মাকে আরাধনা করেন, সেইরূপে সেই মহতী সভায় সকলে সমাসীন হইয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের উপাসনা আরম্ভ করিলেন।

সভাক্রিয়া পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


সভাপর্ব

লোকপাল-সভাখ্যান পর্ব্বাধ্যায়।

দেবর্ষি নারদের পাণ্ডব সভায় আগমন ও তাঁহার গুণকীর্ত্তন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতর্ষভ! মহানুভব পাণ্ডব ও গন্ধর্ব্বগণ তথায় অধ্যাসীন হইলে দেবর্ষি নারদ পারিজাত, রৈবত, সুমুখ, ধৌম্য প্রভৃতি কতিপয় তেজঃপুঞ্জ ঋষিসমভি-ব্যাহারে ভুবনতলে বিচরণ করিতে করিতে সভায় উপনীত হইলেন। তিনি সমস্ত বেদ, উপনিষদ্, ন্যায়, সাংখ্য, পাতঞ্জল, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দঃ, জ্যোতিষ প্রভৃতি সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ ছিলেন। ইতিহাস ও পুরাণসমুদায় তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল, তাঁহার মত রাজনীতি এবং ধৰ্ম্মনীতি পারদর্শী প্রায় দৃষ্ট হইত না, তিনি প্রগল্ভ, স্মৃতিমান্ প্রমাণনিষ্ঠ কবি ও পুরাকল্প-বিশেষবিৎ ছিলেন; ষাড়ুগুণ্য প্রয়োগ-বিষয়ে তাঁহার তুল্য কেহই ছিলেন না। ফলতঃ তাদৃশ সন্ধিবিগ্রহকাৰ্য্যকুশল ব্যক্তি সে সময়ে অতীব বিরল ছিল। তিনি অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন, মেধাবী এবং ন্যায়বান্ ছিলেন। শিষ্যমণ্ডলীকে কিরূপে জ্ঞানোপদেশ প্রদান করিতে হয়, তাহা তিনিই যথার্থ জানিতেন। তাঁহার ন্যায় সদ্বক্তা ও যুদ্ধগান্ধর্ব্বসেবী আর দৃষ্টিগোচর হইত না, তিনি বৃহস্পতি অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট বক্তৃতা করিতে পারিতেন; তাঁহার নিকট বাক্যের গুণ দোষ বিবেচনা হইত। তিনি ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ চতুর্ব্বর্গই যথাবিধি সেবা করিয়াছিলেন; যোগবলে ত্রিলোক্ সর্ব্বক্ষণ তাঁহার প্রত্যক্ষ হইত এবং অতীত ও অনাগত কাল বর্তমানের ন্যায় দেখিতে পাইতেন।

দেবর্ষির যুধিষ্ঠিরের প্রতি কুশল ও রাজনীতি-বিষয়ক প্রশ্ন।

দেবর্ষি সভাসীন পাণ্ডবগণকে নয়নগোচর করিয়া পরম প্রীত হইলেন এবং জয়াশীর্ব্বাদদ্বারা ধর্মরাজের পূজা ও সৎকার করিলেন। নারদকে সমাগত দেখিয়া পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির এবং তাঁর অনুজগণ সহসা গাত্রোত্থানপূর্ব্বক অতি বিনীতভাবে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত পুরঃসর বসিতে আসন প্রদান করিয়া গো, সুবর্ণ, মধুপর্ক, অর্ঘ্য এবং অন্যান্য অভিলষিত বস্তুদ্বারা তাঁহার যথাবিধি অর্চ্চনা করিলেন। মহর্ষি রাজার সৎকারে সম্যক্ প্রসন্ন হইয়া ধৰ্ম্মকামার্থযুক্ত বাক্যে তাঁহাকে জিজ্ঞাসাচ্ছলে উপদেশ করিতে লাগিলেন। মহারাজ! অর্থচিন্তায় নিরত হইয়া ধৰ্ম্মচিন্তা ত বিস্মৃত হয়েন না? সুখানুভবে অত্যন্ত ব্যাসক্ত হইয়া মনকে ত একে- বারে দূষিত করেন না? ত্রিবর্গসেবায় ত ত্বদীয় পূর্ব্বপুরুষদিগের আচরিত বৃত্তির অনুবর্তী হইয়া চলিতেছেন? অর্থলুব্ধ হইয়া ধর্মোপার্জনে ত বিরক্তি প্রকাশ করেন না? ধর্মানুরক্ত হইয়া অর্থচিন্তায় ত একান্ত নিবৃত্ত হয়েন না? অবিশ্রান্ত কামরসাস্বাদ দ্বারা আপনার ধর্মার্থের ত হানি হইতেছে না? উচিত সময়ে ত উহাদিগের যথাবিধি সেবা করিয়া থাকেন? ষড়বিধ রাজগুণ-দ্বারায় সপ্ত উপায় এবং বলাবল প্রয়োগদ্বারা শত্রুপক্ষের চতুৰ্দ্দশ প্রকার দোষ সম্যরূপে ত পর্যালোচিত হইয়া থাকে? কৃষি, বাণিজ্য, দুর্গসংস্কার, সেতুনির্মাণ, আয়ব্যয়শ্রবণ, পৌরকার্য্য-দর্শন ও জনপদপর্যবেক্ষণ প্রভৃতি অষ্টবিধ রাজকার্য্য ত সম্যক্ প্রকারে সম্পাদিত হয়? আপনার সপ্ত প্রকৃতি ত কুশলে রহিয়াছে? তাহারা ত সমৃদ্ধিসম্পন্ন? তাহাদিগের ত প্রভুভক্তির লঘুতা দৃষ্ট হয় না? তাহারা ত ব্যসনে লিপ্ত নহে? নিঃশঙ্কচিত্তে কপট দূতগণ ত আপনার বা আপনার অমাত্যদিগের গূঢ়মন্ত্রণা-সকল ভেদ করিতে পারে না? মিত্র, উদাসীন ও শত্রুদিগের অভিসন্ধি সমস্ত আপনি ত বুঝিয়া থাকেন? যথাকালে ত সন্ধিস্থাপন ও বিগ্রহবিধানে প্রবৃত্ত হয়েন? উদাসীন ও মধ্যমের প্রতি ত মাধ্যস্থ ভাব অবলম্বন করিয়া থাকেন?

আত্মানুরূপ, বৃদ্ধ, বিশুদ্ধস্বভাব, সম্বোধনক্ষম, সৎ-কুলজাত, অনুরক্ত ব্যক্তিগণ মন্ত্রিপদে ত অভিষিক্ত হয়? কারণ, মন্ত্রণা জয়লাভের অদ্বিতীয় হেতু। অতএব আপনি ত রাজ্য-রক্ষার্থে সংবৃতমন্ত্র' শাস্ত্রবিদ্যাবিশারদ অমাত্যদিগকে নিযুক্ত করিয়াছেন? বিপক্ষেরা ত আপনার রাজ্য আক্রমণে ও বিলুণ্ঠনে সমর্থ নহে? যথাকালে ত নিদ্রিত ও জাগরিত হন? অপর রাত্রিতে ত অর্থ চিন্তা করিয়া থাকেন? একাকী অথবা বহুজনপরিবৃত হইয়া ত মন্ত্রণা করেন না? মন্ত্রির মন্ত্র ত জন-পদমধ্যে অপ্রচারিত থাকে? স্বল্পায়াসসাধ্য মহোদয় বিষয়সকল ত শীঘ্রই সম্পন্ন করিয়া থাকেন? আলস্যপরতন্ত্র হইয়া তাদৃশ কার্য্যে কখন ত বিঘ্নোৎপাদন করেন না? কৃষীবলেরা ত আপনার পরোক্ষে প্রকৃতরূপে ব্যবহার করিয়া থাকে? কারণ প্রভুর প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ না থাকিলে এরূপ হওয়া নিতান্ত অসম্ভব, সন্দেহ নাই। অনারব্ধ কার্য্যের পরীক্ষার্থে ধর্মজ্ঞ শাস্ত্রকোবিদ বিচক্ষণ পরীক্ষকসকল ত নিযুক্ত করিয়া থাকেন? যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ বীরপুরুষদ্বারা কুমারদিগকে ত যুদ্ধশিক্ষা কাইতেছেন? সহস্র মুখবিনিময়দ্বারা একজন পণ্ডিতকে 'ত ক্রয় করিয়া থাকেন? কারণ কোন প্রকার বিপদ উপস্থিত হইলে পণ্ডিত ব্যক্তি অনায়াসে তাহার প্রতিবিধান করিতে সমর্থ হয়েন? দুর্গসকল ত ধন, ধান্য, উদক ও যন্ত্রে পরিপূর্ণ করিয়া রাখিয়াছেন? তথায় শিল্পিগণ ও ধনুর্দ্ধর পুরুষসকল সর্ব্বদা ত সতর্কতাপূর্ব্বক কালযাপন করে? একজন মেধাবী, শূর, দান্ত, বিচক্ষণ অমাত্য রাজা এবং রাজপুত্রকে রাজ্য লক্ষ্মীর প্রণয়াস্পদ করিতে পারেন, এইরূপ রাজমন্ত্রী আপনার আছে ত?

মহারাজ! গূঢ়চরদ্বারা শত্রুপক্ষীয় চরস্থান ত বিশিষ্টরূপ অবগত হইয়া থাকেন? অপ্রমত্ত হইয়া বিপক্ষবর্গের অজ্ঞাত-সারে ত তাহাদিগের কার্য্যসকল নিরীক্ষণ করেন? বিনয়সম্পন্ন অসূয়াশূন্য, সৎকুলজাত বহুশ্রুত ব্যক্তিকে ত সৎকার করিয়া পৌরোহিত্যে বরণ করিয়াছেন? এবং বিধিজ্ঞ, বুদ্ধিমান, সরল ও কার্য্যদক্ষ ব্যক্তিকে ত হোমকার্য্যে নিযুক্ত করিয়াছেন? আপনার দৈবজ্ঞ ত জ্যোতির্বিদ্যাবিশারদ, রাজ্যাঙ্গকুশল ও সর্ব্বপ্রকার উৎপাতগণনায় সমর্থ? আপনি কার্য্যের লাঘব গৌরব বিবেচনা করিয়া ত লোকসকলকে নিযুক্ত করিয়া থাকেন? প্রধান ভৃত্যের প্রতি প্রধান, মধ্যমের প্রতি মধ্যম এবং নিকৃষ্টের প্রতি ত নিকৃষ্ট কার্য্যের ভার সমর্পণ করিয়াছেন? পিতৃপিতামহাগত শুচিস্বভাব বৃদ্ধ সচিবেরাই ত শ্রেষ্ঠ কার্য্য-সম্পাদনে নিযুক্ত আছে? প্রচণ্ড দণ্ডবিধানদ্বারা প্রজাদিগকে ত অত্যন্ত উত্তেজিত করেন না? যাজকেরা পতিত ব্যক্তিকে যেমন অবজ্ঞা করেন এবং প্রমদারা যেমন তীক্ষ্ণস্বভাব কামপরতন্ত্র পতিকে অনাদর করিয়া থাকে, তদ্রূপ আপনার রাজ্যশাসনকারী মন্ত্রিগণ ত আপনাকে অশ্রদ্ধা করিয়া থাকেন না? মহাকুলপ্রসূত, প্রগল্ভ, শৌর্যবীর্য্য-গাম্ভীর্য্যসম্পন্ন, কার্য্যদক্ষ ও প্রভুপরায়ণ ব্যক্তিকেই ত সেনানীর কার্য্যে নিযুক্ত করিয়াছেন? সর্ব্বযুদ্ধ-বিশারদ, প্রবলপরাক্রান্ত সচ্চরিত্র, সাহসী সৈনিক পুরুষদিগকে ত যথোচিত সম্মান করিয়া থাকেন? এবং নির্দিষ্ট সময়ে তাহাদিগের বেতনাদি প্রদানে ত বিমুখ হয়েন না? তাহা হইলে সুচারুরূপে কার্য্য নির্ব্বাহ হওয়া দূরে থাকুক, প্রত্যুত তাহাদিগের দ্বারা পদে পদে অনিষ্টঘটনা ও বিদ্রোহের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা হইয়া উঠে।

সৎকুলজাত প্রধান প্রধান লোক ত আপনার প্রতি অনুরক্ত রহিয়াছে? তাহারা ত আপনার নিমিত্ত রণক্ষেত্রে প্রাণ-পরিত্যাগ করিতেও সম্মত আছে? সমস্ত রণকার্য্য নির্ব্বাহার্থে একজন শাসনাতিগ যথেচ্ছাচারী ব্যক্তিকে ত নিযুক্ত করেন না? যদি কোন ব্যক্তি স্বীয় পুরুষকারদ্বারা প্রভুকার্য্য সুসম্পন্ন করে, তাহা হইলে সে ত আপনার নিকটে সম্যক্ পুরস্কৃত ও সমধিক সম্মানিত হইয়া থাকে? জ্ঞানালোকসম্পন্ন, কৃতবিদ্য, অতিবিনীত গুণবান্ ব্যক্তিদিগকে ত যথোচিত ধনদান করেন? মহারাজ! যাহারা কেবল আপনার উপকারের নিমিত্ত কালকবলে নিপতিত ও যৎপরোনাস্তি দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছে, তাহাদিগের পুত্র-কলত্র প্রভৃতি পরিবারবর্গকে ত ভরণপোষণ করিতেছেন? ক্ষীণবল বা যুদ্ধে পরাজিত শত্রু ভীত হইয়া আপনার শরণাগত হইলে তাহাকে ত পুত্রনির্বিশেষে রক্ষা করিয়া থাকেন? শত্রুকে ব্যসনাসক্ত দেখিয়া স্বীয় মন্ত্র, কোষ ও ভৃত্য ত্রিবিধ বল সম্যক্ বিবেচনা করিয়া অবিলম্বে তাহাকে ত আক্রমণ করেন? যেমন পিতা মাতা সকল সন্তানকে সমান স্নেহ করেন, তদ্রূপ আপনিও ত সমদৃষ্টিতে সমুদ্রমেখলা সমুদায় পৃথিবী অবলোকন করিতেছেন? সৈন্যগণের ব্যবসায় ও জয়লাভ সামর্থ্য বুঝিয়া তাহাদিগকে ত অগ্রিম বেতন প্রদানপূর্ব্বক উপযুক্ত সময়ে যুদ্ধযাত্রা করিয়া থাকেন? পরস্পরের ভেদ উপস্থিত করিবার নিমিত্ত শত্রুপক্ষীয় প্রধান প্রধান সৈন্যদিগকে ত যথাযোগ্য ধনদান করেন? স্বয়ং জিতেন্দ্রিয় হইয়া আত্মপরাজয় পূর্ব্বক ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র প্রমত্ত বিপক্ষদিগকে ত পরাজয় করিতেছেন? যুদ্ধার্থে প্রবৃত্ত হইবার পূর্ব্বে সাম, দান, ভেদ, দণ্ড ত যথাবিধি প্রয়োগ করিয়া থাকেন? বিপক্ষের রাজ্য আক্রমণ কালে আপন অধিকার ত দৃঢ়রূপে সুরক্ষিত করেন? এবং তাহাদিগকে পরাজিত করিয়া পুনর্ব্বার স্ব স্ব পদে ত প্রতিষ্ঠিত করিয়া থাকেন? অষ্টাঙ্গযুক্ত বলমুখ্যকর্তৃক সুশিক্ষিত আপনার চতুরঙ্গিণী সেনা ত শত্রু-পরাজয়ে সক্ষম হইয়াছে?

পররাষ্ট্রের শস্যচ্ছেদন ও শস্যসংগ্রহ-কাল উপেক্ষা করিয়া শত্রুহিংসায় ত প্রবৃত্ত হয়েন? অর্থচিন্তার নিমিত্ত আপনার অধিকৃত পুরুষেরা ত স্বরাজ্যে ও পররাজ্যে নিযুক্ত হইয়া ত্বৎকার্য্য সম্পন্ন করিতেছে? তাহারা ত বিসংবাদী হইয়া পরস্পরের নন্ত্রণা প্রকাশিত করে না? ভৃত্যেরা ত ত্বদীয় বশবর্তী হইয়া খাদ্যসামগ্রী, গাত্রমার্জনবস্তু ও গন্ধদ্রব্যসকল রক্ষা করিয়া থাকে? আপনাতে অনুরক্ত কর্মচারিগণ ধনাগার, বাহন, দ্বার, আয়ুধ ও আয় ইত্যাদির ত সম্যক্ তত্ত্বাবধান করে? আপনি ত আভ্যন্তরিক ও বাহ্য জনগণ হইতে আপনাকে, আত্মীয়লোক হইতে তাহাদিগকে এবং তাহাদের পরস্পর হইতে পরস্পরকে ত রক্ষা করিয়া থাকেন? আপনার আয়ের চতুর্থ ভাগ, অর্দ্ধভাগ বা ত্রিভাগদ্বারা নিজ ব্যয় ত নির্ব্বাহ করেন? বৃদ্ধলোক, জ্ঞাতিবর্গ, গুরুজন, বণিক্, শিল্পী, আশ্রিত দীন, দরিদ্র ও অনাথ ব্যক্তিদিগকে ধন ধান্য প্রদানদ্বারা ত অনুগ্রহ করিয়া থাকেন? আয় ব্যয়ে নিযুক্ত, গণক ও লেখকবর্গ আপনার আয় ব্যয়সকল পূর্ব্বাহ্ণে ত নিরূপণ করিতেছে? বিষয়কৰ্ম্মচতুর, হিতৈষী কর্মচারিগণ অকৃতাপরাধে আপনার নিকট ত পদচ্যুত হইতেছে না? অধিকৃত স্বর্গের তারতম্য পরীক্ষা করিয়া তাহাদিগকে ত তদনুরূপ কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া থাকেন? লুব্ধ, চৌর, বৈরী বা অপ্রাপ্তব্যবহার' ব্যক্তি ত্বদীয় কার্য্যে ত নিয়োজিত হয় না? তস্কর, লুব্ধক, কুমারগণ বা স্ত্রীদিগের প্রবলতা অথবা স্বয়ং রাষ্ট্রপীড়া ত উৎপন্ন করেন না? রাজ্যস্থ কৃষকেরা ত সন্তুষ্টচিত্তে কালযাপন করিতেছে? রাজ্যমধ্যে স্থানে স্থানে সলিলপূর্ণ বৃহৎ বৃহৎ তড়াগ ও সরোবরসকল ত নিখাত হইয়াছে? কৃষিকার্য্য ত বৃষ্টিনিরপেক্ষ হইয়া সম্পন্ন হইতেছে? কৃষকদিগের গৃহে বীজ ও অন্নাদির ত অসম্ভাব নাই? আবশ্যক হইলে, তাহাদিগের ত পাদিক (শতচতুর্থাংশ) বৃদ্ধিতে অনুগ্রহস্বরূপ শতসংখ্যক ঋণ প্রদান করিয়া থাকেন? সাধুলোকদ্বারা আপনার বার্তাসকল ত সম্যক্ অনুষ্ঠিত হইতেছে? কারণ, তগুণে লোকে সুখী হইয়া থাকে।

জনপদস্থ সমস্ত প্রাজ্ঞ বীর-পুরুষেরা ত মহারাজের হিতচিন্তায় তৎপর রহিয়াছেন? নগর রক্ষার নিমিত্ত পল্লীগ্রামসকল নগরের ন্যায় এবং ঘোষপল্লী পল্লীগ্রামের ন্যায় ত করিয়া রাখিয়াছেন? নগরাদি ত আপনার সম্যক্ বশংবদ রহিয়াছে? তস্করেরা ত ত্বদীয় বিষয়ে সমবিষম স্থলে দলবদ্ধ হইয়া নগরের অনিষ্ট উৎপাদনে সমর্থ হইতেছে না? প্রমদাগণের রক্ষণাবেক্ষণ ও তাহাদিগকে ত সমুচিত সান্ত্বনা করিয়া থাকেন? বিশ্বাস করিয়া ত তাহাদিগের নিকটে কোন গুহ্যকথা ব্যক্ত করেন না? কোন অমঙ্গলবার্তা শ্রবণ করিয়া তদ্বিষয়ক চিন্তা করিতে করিতে অনুঃপুরে প্রবিষ্ট হইয়া স্রচন্দনাদি প্রিয়বস্তুর অনুভবসুখে ত নিদ্রিত হয়েন না? রজনীর প্রথম দুই প্রহর নিদ্রায় অতিবাহন করিয়া গাত্রোত্থানপূর্ব্বক পশ্চিম নিশায় ত ধর্মার্থ চিন্তা করিয়া থাকেন? হে মহারাজ! যথাকালে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক বেশভূষা সমাধান করিয়া কালজ্ঞ মন্ত্রিগণে পরিবৃত হইয়া দর্শনার্থী প্রজাগণকে ত দর্শন প্রদান করেন? আপনার শরীর রক্ষার্থে রক্তাম্বরধারী অলঙ্কৃত রক্ষকেরা ত খড়্গধারণপূর্ব্বক উভয় পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকে? যমের ন্যায় আপনার নিকটে ত পূজার্হ ব্যক্তি সমুচিত পূজা ও দণ্ডাই ব্যক্তি সমুচিত দণ্ড লাভ করে? কে প্রিয়, কে অপ্রিয়, তাহা ত সম্যরূপ পরীক্ষা করিয়া চলেন? শারীরিক পীড়া হইলে নিয়ম ও ঔষধ সেবনদ্বারা ত তাহার প্রতীকার বিধান করিয়া থাকেন? মানসিক পীড়া হইলে বৃদ্ধ ব্যক্তিদিগের সহিত সতত আলাপ করিয়া ত স্বাস্থ্য লাভ করেন? আপনার বৈদ্যগণ ত অষ্টাঙ্গ চিকিৎসাবিদ্যায় বিশারদ, সুহৃদ্ ও অনুরক্ত? তাহারা ত সতত আপনার শারীরিক হিতচেষ্টায় রত থাকে? আপনি ত লোভ, মোহ ও অভিমানরহিত হইয়া অর্থিপ্রত্যর্থিদিগের কার্য্য দর্শন করেন? লোভ, মোহ, বিশ্রন্ত' অথবা প্রণয়ের বশীভূত হইয়া ত আশ্রিত লোকদিগের বৃত্তি-রোধ করেন না?

পৌরবর্গ ও জনপদবাসী লোকেরা ত মিলিত হইয়া শত্রুর নিকট হইতে বিপুল অর্থগ্রহণপূর্ব্বক আপনার সহিত বিরোধ উপস্থিত করিতেছেন না? দুর্ব্বল শত্রুকে ত বল-প্রয়োগপূর্ব্বক সাতিশয় পীড়িত করেন না? মন্ত্রবলে ত বলবান, শত্রুকে সমধিক যন্ত্রণা প্রদান করিতেছেন না? বলপ্রয়োগ ও মন্ত্রদ্বারা কাহার ত একেবারে সর্ব্বনাশ হইতেছে না? প্রধান প্রধান রাজগণ ত আপনার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত? তাঁহারা ত ত্বদীয় সমাদরে বশীভূত হইয়া উপকারার্থে প্রাণপরিত্যাগ করিতেও সম্মত হয়েন? আপনি ত সর্ব্ববিদ্যাবিষয়ে গুণ বিবেচনা করিয়া ব্রাহ্মণগণের ও সজ্জনদিগের পূজা করিয়া থাকেন? কারণ, উহা আপনার মোক্ষহেতু ও মঙ্গলবিধায়িনী। মহারাজ! যত্নপূর্ব্বক পূর্ব্বপুরুষাচরিত ত্রয়ীমূলক ধর্মের ত অনুষ্ঠান করিতেছেন? সুস্বাদ অন্নপান দ্বারা গুণবান্ ব্রাহ্মণদিগকে ত ভোজন করাইয়া দক্ষিণা প্রদান করিয়া থাকেন; একাগ্রচিত্ত হইয়া ত বাজপেয় ও পুণ্ডরীক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে যত্নবান্ হয়েন? গুরুজন, বয়োবৃদ্ধ জ্ঞাতি, দেবতা, তাপসগণ, চৈত্যবৃক্ষ ও শুভফলপ্রদ ব্রাহ্মণদিগকে ত নমস্কার করিয়া থাকেন? আপনি ত শোক ও ক্রোধে একান্ত অভিভূত হয়েন না? লোক সকল মাঙ্গল্য বস্তু হস্তে লইয়া ত আপনার পার্শ্বে অবস্থিতি করে? হে মহারাজ! আপনার বুদ্ধি ও ক্রিয়া ত মদীয় প্রশ্নের অনুবর্তিনী হইয়াছে? কারণ, এরূপ হইলে উভয়ই আয়ুষ্য, যশস্য ও ধৰ্ম্মকামার্থদর্শিনী হইবে। এতদনুসারে কার্য্য করিলে রাজ্যের কোন বিঘ্ন উপস্থিত হয় না, রাজাও পৃথিবী জয় করিয়া পরম সখে কালযাপন করেন। লোভান্ধ অনভিজ্ঞ ত্বদীয় অধিকৃত লোককর্তৃক চৌরাপবাদগ্রস্ত আর্য্যচরিত বিশুদ্ধস্বভাব শুচি ব্যক্তি নিধনদণ্ডে ত দণ্ডিত হয়েন না? দুষ্ট, অহিতকারী, কদর্য্যস্বভাব, দণ্ডাই তস্কর লোপ্রুসহ গৃহীত হইয়াও তাহাদিগের নিকটে ত ক্ষমালাভে সমর্থ হয় না? নাস্তিক্য, অনূত, ক্রোধ, প্রমাদ, দীর্ঘসূত্রতা, জ্ঞানবান্ ব্যক্তিদিগের সাক্ষাৎকার-ত্যাগ, আলস্য, চিত্তচাপল্য, নিরন্তর অর্থচিন্তা, অনর্থজ্ঞ ব্যক্তির সহিত পরামর্শ, নিশ্চিত বিষয়ের অনারম্ভ, মন্ত্রণার অপরিরক্ষণ, মঙ্গলকার্য্যের অপ্রয়োগ ও প্রত্যুত্থান, এই চতুৰ্দ্দশ রাজদোষ ত আপনি সর্ব্বতোভাবে বর্জন করিয়াছেন? উক্ত চতুৰ্দ্দশ রাজদোষ বদ্ধমূল ভূপালদিগকেও উন্মুলিত করে। আপনার বেদাধ্যয়ন ত সফল হইয়াছে? ধনোপার্জনের ত সার্থকতা লাভকরিয়াছেন? দার-পরিগ্রহের ত ফল লাভ হইয়াছে এবং বিদ্যাশিক্ষাও ত ফলবতী বটে?

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে তপোধন। আপনি যে আমার বেদাধ্যয়নাদির সফলতার বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তৎসমস্ত কিরূপে সফল হয়? নারদ কহিলেন, মহারাজ। বেদাধ্যয়নের ফল অগ্নিহোত্র; ধনোপার্জনের ফল দান ও ভোজন; দার-পরিগ্রহের ফল রতিক্রীড়া ও অপত্যোৎপাদন; বিদ্যাশিক্ষার ফল সুশীলতা ও সদ্ব্যবহার। মহাতপাঃ মুনিবর এই কথা বলিয়া পুনর্ব্বার যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে রাজন! লাভ-প্রত্যাশায় দূরদেশ হইতে সমাগত বণিদ্গণের নিকট আপনার শুল্কোপজীবী রাজপুরুষেরা ত যথোক্ত শুল্ক গ্রহণ করিয়া থাকে? সেই সকল বণিকেরা ত সর্ব্বত্র সম্মানিত হয়? এবং ত্বদীয় লোকদ্বারা পরীক্ষিত হইয়া ত পণ্যদ্রব্য আনয়ন করে? আপনি ত অবহিত হইয়া ধর্মার্থদর্শী বৃদ্ধ পুরুষদিগের ধর্মার্থযুক্ত উপদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া থাকেন? কৃষিতন্ত্র, গো, পুষ্প, ফল ও ধর্মের নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগকে ত ঘৃত মধু প্রদানদ্বারা আপ্যায়িত করেন? শিল্পকারদিগকে ত উপকরণসামগ্রীসকল নিয়ত প্রদান করিয়া থাকেন? হে মহারাজ! কৃতোপকার ত স্মরণ করিয়া রাখেন? সৎকর্ম করিলে তাহাকে ত প্রশংসা ও সাধুগণমধ্যে সমাদর পূর্ব্বক সৎকার করিয়া থাকেন? হস্তী, অশ্ব ও রথ প্রভৃতির লক্ষণসকল ত শিক্ষা করিয়াছেন? গৃহে বসিয়া ত ধনুর্ব্বেদের লক্ষণ ও নাগরযন্ত্রসূত্র সম্যরূপে অভ্যাস করেন? মহারাজ! শত্রুনাশক সর্ব্ব-প্রকার অস্ত্র, ব্রহ্মদণ্ড ও বিষযোগ ত আপনার বিদিত আছে? অগ্নি, ব্যাল, রোগ ও ক্ষোভ হইতে ত স্বীয় রাজ্য রক্ষা করিয়া থাকেন? অন্ধ, মুক, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, বন্ধুবিহীন ও প্রব্রজিত ব্যক্তিদিগকে ত পিতার ন্যায় প্রতিপালন করেন? নিদ্রা, আলস্য, ভয়, ক্রোধ, মাৰ্দ্দব ও দীর্ঘসূত্রতা, এই ছয়টি অনর্থ ত একবারে পরিত্যাগ করিয়াছেন? মহাত্মা কুরুসত্তম যুধিষ্ঠির, দেবর্ষির এবম্প্রকার উপদেশবাক্য শ্রবণানন্তর পরম পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে প্রণাম ও অভিবাদনপূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, হে তপোধন! আপনি যাহা আজ্ঞা করিলেন, আমি তাহাই করিব, আপনার উপদেশে আমার বুদ্ধিবৃত্তি পুনর্ব্বার প্রবৃদ্ধ হইয়া উঠিল। রাজা দেবর্ষি-সমক্ষে যে প্রকার প্রতিজ্ঞা করিলেন, তদনুরূপ কার্য্যও করিতে লাগিলেন এবং অচিরকালমধ্যে সাগরাম্বরা' বসুন্ধরার অধীশ্বর হইলেন। নারদ কহিলেন, মহারাজ। যিনি এইরূপে চতুর্ব্বর্গ রক্ষায় নিযুক্ত থাকেন, তিনি ইহলোকে পরমসুখে বিহার করিয়া চরমে ইন্দ্রলোকত্ব প্রাপ্ত হয়েন।

নারদ-সন্নিধানে যুধিষ্ঠিরের সভাবিষয়ক প্রশ্ন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! ব্রহ্মর্ষি নারদের বাক্যাবসানে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সমুচিত সৎকারপূর্ব্বক তদীয় উত্তরস্বরূপ আনুপূর্ব্বিক কহিতে লাগিলেন, ভগবন্! আপনি যে ধৰ্ম্মনিচয় উপদেশ করিলেন, তাহা ন্যায়ানুগত বটে, আমি সাধ্যানুসারে এতদনুরূপ করিয়া থাকি। পূর্ব্বকালে ভূপালগণ ন্যায়তঃ সংগৃহীতার্থ যে সমস্ত অর্থবৎ কাৰ্য্যানুষ্ঠান করিতেন, আমিও সেইরূপ করিতেছি। আর তাঁহারা যে সকল সৎকর্ম প্রদর্শন করিয়াছেন, আমি তাহা আশ্রয় করিতে ইচ্ছা করি, কিন্তু অনিয়তাত্মতাপ্রযুক্ত কৃতকার্য্য হইতে পারি না।

যুধিষ্ঠির দেবর্ষি নারদকে বিশ্রান্ত দেখিয়া রাজগণমধ্যে সমুচিত সৎকারপূর্ব্বক যথাযোগ্য সময়ে কহিলেন, ভগবন্! আপনি অপ্রতিহত গতিপ্রভাবে ব্রহ্মনির্মিত অনেকানেক লোক সন্দর্শন করত পর্য্যটন করিতেছেন, কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, কোন স্থানে আমাদিগের এই অপূর্ব্ব সভার তুল্য বা ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কোন সভা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন কি না? অনুগ্রহপূর্ব্বক কহিয়া চরিতার্থ করুন। নারদ যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া হাস্যমুখে ও মধুরবচনে কহিলেন, মহারাজ। আপনার এই মণিময়ী সভাসদৃশী দ্বিতীয় সভা মনুষ্যলোকে দর্শন বা শ্রবণ করি নাই, এক্ষণে যদি আপনার শ্রবণবাসনা বলবতী হয়, তবে পিতৃরাজ যম, ধীমান বরুণ, দেবরাজ ইন্দ্র ও কৈলাসনিবাসী কুবেরের সভা কীর্ত্তন করিব। ভগবান্ ব্রহ্মার দিব্যাভি-প্রায়োপেত বিশ্বরূপিণী ক্লমাপহারিণী দিব্য এক সভা আছে, আমি সেই সভা বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। এই সভা দেবগণ, পিতৃলোক, সাধ্যসমূহ এবং শান্ত যতাত্মা যাজ্ঞিকবর্গ, শান্তশীল বেদাধ্যয়নসম্পন্ন ও যজ্ঞানুষ্ঠানপরায়ণ মুনিগণকর্তৃক সেবিত। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির নারদ কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে ভ্রাতৃচতুষ্টয় ও ব্রাহ্মণগণ সমভিব্যাহারে তাঁহাকে কহিলেন, ভগবন্! সেই সমস্ত সভা কিরূপ বিস্তীর্ণ ও আয়ত এবং তাহাতে কতই বা দ্রব্যজাত রহিয়াছে? পিতামহ ব্রহ্মা, দেবরাজ ইন্দ্র, বৈবস্বত যম, বরুণ ও কুবের স্ব স্ব সভায় আসীন হইলে কে কে তাঁহাদিগকে উপাসনা করিয়া থাকেন? আপনি এই সমস্ত কীর্ত্তন করুন, শ্রবণ করিবার নিমিত্ত আমাদের একান্ত কুতূহল হইয়াছে। মহর্ষি নারদ ধৰ্ম্মরাজকর্তৃক এইরূপ কথিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি ক্রমশঃ সমস্ত কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

নারদকর্তৃক ইন্দ্রসভা বর্ণন।

নারদ কহিলেন, হে কুরুনন্দন! দেবরাজ ইন্দ্র বহু প্রযত্ন-সহকারে বিশ্বকর্মাদ্বারা আপনার সভা নির্মাণ করান। ঐ সভার প্রভা সূর্য্যের ন্যায়, উহা শত যোজন বিস্তীর্ণ, সার্দ্ধ শত যোজন দীর্ঘ এবং পঞ্চ যোজন উন্নত। উহা শূন্যমার্গে স্থিত ও যথা ইচ্ছা গমনাগমন করিতে পারে। উহাতে জরা, শোক, ক্লম, আতঙ্ক প্রভৃতি কিছুই নাই। মধ্যে মধ্যে উত্তমোত্তম গৃহ, আসন ও দিব্য পাদপসমুদায় শোভা পাইতেছে। অসামান্য রূপলাবণ্য-সম্পন্ন শ্রীমান্ যশস্বী অমররাজ ইন্দ্র দিব্যকিরীট, দিব্যাম্বর, লোহিতাঙ্গদ ও বিচিত্র মাল্য ধারণপূর্ব্বক শচীসমভিব্যাহারে ঐ সভায় মহার্হ আসনে উপবিষ্ট থাকেন।

গৃহবাসী যাবতীয় দেবগণ ও দিব্যরূপধারী দিব্যালঙ্কার-শোভিত সিদ্ধ ও সাধ্যগণ, হেমমাল্যধারী তেজস্বী মরুত্বদ্গণ, অন্যান্য দেবগণ এবং অমল, পাপরহিত, অগ্নির ন্যায় জাজ্বল্য-মান, তেজস্বী ও শোকজুররহিত দেবর্ষিগণ অনুচরগণ সমভি-ব্যাহারে প্রত্যহ ঐ সভায় আগমন করিয়া মহেন্দ্রের উপাসনা করেন। মহর্ষি পরাশর, পর্ব্বত, সাবর্ণি, গালব, শঙ্খ, লিখিত, গৌরবশিরাঃ, ক্রোধন দুর্ব্বাসাঃ, শ্যেন, দীর্ঘতমাঃ পবিত্রপাণি, যাজ্ঞবল্ক্য, ভালুকি, উদ্দালক, শ্বেতকেতু, তাণ্ড্য, ভাণ্ডারনি, হবিষ্মান, গরিষ্ঠ, মহারাজ হরিশ্চন্দ্র, হৃদ্য উদার-শাণ্ডিল্য, পারাশর্য্য, কৃষীবল, বাতস্কন্ধ, বিশাখ, বিধাতা, কাল, করালদন্ত, ত্বষ্টা, বিশ্বকর্মা ও তুম্বুরু এবং অযোনিজ ও যোনিজগণ, বায়ুভক্ষসকল ও হুতাশিসমুদায়, সর্ব্বলোকেশ্বর পুরন্দরের উপাসনা করেন। সহদেব, সুনীথ, মহাতপাঃ বাল্মীকি, সত্যবাক্ শমীক, সত্যপ্রতিজ্ঞ প্রচেতাঃ, মেধাতিথি, বামদেব, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, মরুত্ত, মরীচি, মহাতপাঃ স্থাণু, কাক্ষীবান, গৌতম, তার্থ্য, মহর্ষি বৈশ্বানর, কালকবৃক্ষীয়, আশ্রাব্য, হিরণ্ময়, সংবর্ত্ত, দেবহব্য, বীর্য্যবান, বিশ্বসেন, কণ্ঠ, কাত্যায়ন, গার্গ্য, কৌশিক, দিব্য অপ্সমুদায়, ওষধিসকল, শ্রদ্ধা, মেধা, সরস্বতী, অর্থ, ধৰ্ম্ম, কাম, বিদ্যুৎসমুদায়, জলবাহ মেঘগণ, বায়ুগণ, স্তনয়িব্রুগণ, পূর্ব্বদিক্, যজ্ঞবাহ সপ্তবিংশতিসংখ্যক পাবকগণ, অগ্নিসমবেত সোম, ইন্দ্রসমবেত অগ্নি, মিত্র, সবিতা, অর্য্যমা, ভগ, বিশ্বদেবগণ, সাধ্যগণ, গুরু, শুক্র, বিশ্বাবসু, চিত্রসেন, সুমনাঃ, তরুণ, যজ্ঞসকল, দক্ষিণাসকল, গ্রহগণ, তারাসমুদায় ও যজ্ঞবাহ মন্ত্রগণ ঐ সভায় সমুপস্থিত থাকেন। অপ্সরোগণ ও মনোরম গন্ধর্ব্ব-সকল বিবিধ নৃত্য, গীত, বাদ্য, হাস্য, মঙ্গল স্তুতিপাঠ ও বিক্রম প্রকাশদ্বারা বলবৃত্রনিসূদন ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করেন। তেজস্বী ব্রহ্মর্ষিগণ, হুতাশনের ন্যায় জাজ্বল্যমান রাজর্ষিগণ ও দেবর্ষিগণ দিব্যমাল্যাদি ধারণপূর্ব্বক চন্দ্রসদৃশ মনোরম বিমানে আরোহণ করত সর্ব্বদা ঐ সভায় গতায়াত করেন। বৃহস্পতি ও শুক্র তথায় নিত্য সমুপস্থিত হয়েন। চন্দ্রের ন্যায় প্রিয়দর্শন, ব্রহ্মার ন্যায় প্রভাসম্পন্ন এই সমস্ত ব্যক্তি, অন্যান্য মহাত্মগণ, ভৃগু ও সপ্তর্ষিমণ্ডল তথায় আগমন করিয়া থাকেন। হে রাজন! আমি এই নলিনরাজিবিরাজিত ইন্দ্রসভা পূর্ব্বে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। এক্ষণে যমের সভা বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

নারদকর্তৃক যমসভা বর্ণন।

নারদ কহিলেন, হে মহারাজ। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা বৈবস্বত যমের যে সভা নির্মাণ করিয়াছিলেন, তদ্বিষয় বর্ণন করিতেছি, অবহিত হউন। ঐ কামরূপিণী সূর্য্যসদৃশ তেজঃ-সম্পন্না, নাতি-শীতোষ্ণা, মনোহারিণী সভা শত যোজন বিস্তীর্ণা। উহাতে শোক, জরা, ক্ষুধা, পিপাসা, দৈন্য, ক্লম প্রভৃতি কোন অপ্রিয়ই নাই। তথায় দিব্য, মর্ত্য, কাম্য যাবতীয় বস্তু, সরস সুস্বাদু মনোহর প্রচুর চর্ব্য, চূষ্য, লেহ্য, পেয় প্রভৃতি ভক্ষ্যদ্রব্য সুগন্ধ মাল্য কামফল পাদপাবলী এবং সুস্বাদ শীত ও উষ্ণ সলিলসমুদায় সর্ব্বদাই প্রস্তুত রহিয়াছে।

হে রাজন। পরম পবিত্র রাজর্ষি ও দেবর্ষিগণ ঐ সভায় আগমন করিয়া হৃষ্টচিত্তে যমের উপাসনা করেন। যযাতি, নহুষ, পুরু, মান্ধাতা, সোমক, নৃগ, রাজর্ষি এসদস্য, কৃতবীর্য্য, শ্রুতশ্রবাঃ, বেগ, অরিষ্টনেমি, সিদ্ধকৃতবেগ, কৃতি, নিমি, প্রতৰ্দ্দন, শিবি, মৎস্য, পৃথুলাক্ষ, বৃহদ্রথ, বার্ত, মরুত্ত, কুশিক, সাঙ্কাশ্য, সাস্কৃতি, ধ্রুব, চতুরশ্ব, সদম্বোর্মি, মহারাজ কার্তবীর্য্য, সুরথ, ভরত, সুনীত, নিশঠ, নল, সুমনাঃ, দিবোদাস, অম্বরীষ, ভগীরথ, ব্যশ্ব, সদশ্ব, বধ্যশ্ব, বেগবান্ পৃথুশ্রবাঃ, পৃথদশ, বসুমনাঃ, মহাবল ক্ষুপ, বৃহষ্ণু, বৃষসেন, মহারথ পুরুকুৎস, আর্শ্বিষেণ, দিলীপ, মহাত্মা উশীনর, ঔশীনরি, পুণ্ডরীক, শর্যাতি, শুদ্ধাত্মা শরভ, অঙ্গ, অরিষ্ট, বেণ, দুষ্মন্ত, সৃঞ্জয়, জয়, ভাঙ্গাসুরি, সুনীথ, নিষদ, বহীনর, করন্ধম, বাহীক, সুদ্যুম্ন, মহাবল মধু, ঐল, মরুত্ত, কপোতরোমা, তৃণক, সহদেব, অর্জুন, ব্যশ্ব, সাশ্ব, কৃশাশ্ব, মহারাজ শশবিন্দু, দাশরথি রাম, লক্ষ্মণ, প্রতৰ্দ্দন, অলক, কক্ষসেন, গয়, গৌরাশ্ব, জামদগ্ন্য রাম, নাভাগ, সগর, ভূরিদ্যুম্ন, মহাশ্ব, পৃথাশ্ব, জনক, ভূপতি, বৈণ্য, বারিষেণ, পুরুজিৎ, জনমেজয়, ব্রহ্মদত্ত, ত্রিগর্ত, রাজা উপরিচর, ভীমজানু, ইন্দ্রদ্যুম্ন, গৌরপৃষ্ঠ, নল, গয়, পদ্ম, মুচুকুন্দ, ভূরিদ্যুম্ন, প্রসেনজিৎ, অরিষ্টনেমি, সুদ্যুম্ন, পৃথুলাশ, অষ্টক, মৎস্যবংশীয় শত নরপতি, নীপবংশীয় শত ভূপাল, হয়বংশীয় শত রাজা, ধৃতরাষ্ট্রবংশীয় শত জন, জনমেজয়বংশীয় অশীত জন, ব্রহ্মদত্তবংশীয় শত জন, ঈরিবংশীয় শত জন, ভীষ্মবংশীয় দ্বিশতাধিক জন, ভীমবংশীয় শত জন, প্রতিবিন্ধ্য-বংশীয় শত জন, নাগবংশীয় শত জন, পলাশবংশীয় শত জন ও কুশকাশ প্রভৃতি শত জন এবং রাজেন্দ্র শান্তনু, তোমার পিতা পাণ্ডু, উশঙ্গব, শতরথ, দেবরাজ, জয়দ্রথ, মন্ত্রিসমবেত বুদ্ধিমান্ রাজর্ষি বৃষদত্ত ও অনেকানেক ভূরিদক্ষিণ মহৎ অশ্বমেধানুষ্ঠানদ্বারাস্বর্গগত শশবিন্দুবংশীয় সহস্র সহস্র জন ঐ সভায় গমন করিয়া ভগবান যমের উপাসনা করেন। হে রাজন! এই সমস্ত রাজর্ষিগণ পরম পবিত্র, কীর্ত্তিমান্ ও বহুশ্রুত। অগস্ত্য, মতঙ্গ, কাল, মৃত্যু, যজ্বাসকল, সিদ্ধগণ, যোগশরীরি-সমুদায় এবং মূর্তিমান্ অগ্নিস্বাত্ত, ফেনপ, উষ্মপ, স্বধাবান্, বর্হিষদ প্রভৃতি পিতৃগণ, কালচক্র, সাক্ষাৎ ভগবান্ বহ্নি, দুষ্কৃতকর্মা মনুষ্যগণ, দক্ষিণায়ন, মৃত্যুগণ, কালনয়নে নিযুক্ত যমের পুরুষগণ, শিংশপাপলাশসমুদায় ও কাশকুশাদিসকল ঐ সভায় ভগবান্ যমের উপাসনা করেন। এতদ্ভিন্ন অন্যান্য অনেকে আসিয়া ধর্মরাজের উপাসনা করিয়া থাকেন, তাঁহাদের নামের ও কর্মের সংখ্যা করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। হে কুস্তীনন্দন। দেবশিল্পী | বিশ্বকর্মা বহুকাল তপস্যা করিয়া ঐ পরম রমণীয় সভা নির্মাণ করিয়াছিলেন। ঐ সভা যথেচ্ছ গমন করিতে পারে, উহাতে ভয়ের সম্পর্ক নাই এবং উহা স্বীয় তেজঃপ্রভাবে যেন সতত প্রজ্বলিত হইতেছে।

হে রাজন। উগ্রতপাঃ, সুব্রত, সত্যবাদী, শান্তস্বভাব, বিশুদ্ধ, পরম পবিত্র ও শূন্যাসীন সন্ন্যাসিগণ এবং ভাস্বর-কলেবর, দিব্যাম্বর, বিচিত্রাঙ্গদ, চিত্রমাল্য ও উজ্জ্বল কুণ্ডল প্রভৃতি নানাবিধ ভূষণে ভূষিত, পুণ্যশালী অপ্সরা ও গন্ধর্ব্বগণ তথায় গমন করিয়া থাকে। নৃত্য, গীত, বাদ্য, হাস্য, পুণ্য, গন্ধ ও শব্দ এবং দিব্য মাল্যসমুদায় তথায় সতত সমুপস্থিত থাকে। সহস্র সহস্র দিব্যরূপধারী মনস্বী ধাৰ্ম্মিকগণ মহাত্মা যমের উপাসনা করেন। হে মহারাজ! মহাত্মা ধর্মরাজের সভা এই প্রকার, এক্ষণে নলিনমালাশালিনী বরুণের সভা বর্ণন করিব।

নারদকর্তৃক বরুণসভা বর্ণন।

দেবর্ষি নারদ কহিলেন, মহারাজ। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা বরুণের অসীম প্রভাবসম্পন্ন অত্যুন্নত ও শুক্ল প্রাকার-পরিবেষ্টিত যমসভার ন্যায় আয়ত এক অপূর্ব্ব সভা সলিলমধ্যে নির্মাণ করিয়াছিলেন। ঐ সভা ফলপুষ্পোপশোভিত রত্নময় রমণীয় বৃক্ষমালায় অলঙ্কৃত এবং নীল, সিত, লোহিত, কৃষ্ণ, শ্যামলবর্ণ বিতানে ও মঞ্জরীজালধারী' গুল্মসকলে সমাচ্ছন্ন। তথায় বিপুলকলেবর সুমধুর স্বরসংযোগশালী শত সহস্র অনিৰ্দ্দেশ্য বিবিধ বিহগগণ ইতস্ততঃ বিহার করিতেছে। সেই সভাস্থলী নাতিশীতোষ্ণ ও সুখস্পর্শবিশিষ্ট, বেশ্মাবলী ও আসনসমূহে তাহার মনোহর শোভা সম্পন্ন করিয়াছে। বরুণদেব বিদ্যাম্বরধারী ও দিব্যাভরণবিভূষিত হইয়া স্বীয় সহধর্মিণী বারুণীদেবী সমভিব্যাহারে তথায় বিরাজ করেন। সেই স্থানে সুগন্ধি চন্দনচর্চ্চিত দিব্য মাল্যধারী আদিত্যগণ, বাসুকি, তক্ষক, নাগ, ঐরাবত, কৃষ্ণ, লোহিত, প্রভূত বলশালী পদ্মচিত্র, কম্বল, অশ্বতর, ধৃতরাষ্ট্র, বলাহক, মণিমান, কুণ্ডধার, কর্কোটক, ধনঞ্জয়, অণিমান, প্রহ্লাদ, মুষিকাদ, জনমেজয় ও অন্যান্য পতাকী ফশাবান্ মণ্ডলবিশিষ্ট বহুতর সর্পগণ তথায় উপস্থিত হইয়া ভগবান্ বরুণদেবের উপাসনা করিয়া থাকেন। আর বিরোচননন্দন বলি, মহারাজ নরক, সংহ্লাদ, বিপ্রচিত্তি, কালখঞ্জ দানবসকল, সুহনু, দুর্মুখ, শঙ্খ, সুমনাঃ, সুমতি, ঘটোদর, মহাপার্শ্ব, ক্রথন, পিঠর, বিশ্বরূপ, স্বরূপ, বিরূপ, মহাশিরাঃ, দশগ্রীব, বালী, মেঘবাসাঃ, দশাবার, টিট্টিভ, বিটভূত, ইন্দ্রতাপন, সংহ্রাদ, দিব্য কুণ্ডলধারী লব্ধবর বীরাগ্রণী জিতমৃত্যু দৈত্যদানবসকল সুপরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ পরিধান ও দিব্যমালা ধারণপূর্ব্বক বরুণদেবকে উপাসনা করিতেছেন। আর চারি সমুদ্র, ভাগীরথী, কালিন্দী, বিদিশা, বেম্বা, বেগবাহিনী নর্মদা, বিপাশা, শতদ্রু, চন্দ্রভাগা, সরস্বতী, ইরাবতী, বিতস্তা, দেবনদী, সিন্ধু, গোদাবরী, কৃষ্ণবেম্বা, সরিদ্বরা, কাবেরী, কিচ্ছুনা, বিশল্যা, বৈতরণী, তৃতীয়া, জ্যেষ্ঠিলা, মহানদ শোণ, চৰ্ম্মণ্বতী, পর্ণাশা, মহানদী সরযূ, বারবত্যা, লাঙ্গলী, করতোয়া, আত্রেয়ী, মহানদ লৌহিত্য, লঘন্তী, গোমতী, সন্ধ্যা, ত্রিস্রোতসী ও অন্যান্য প্রখ্যাত নদী, তীর্থ, সরোবর, কূপ, বিগ্রহশালী প্রস্রবণ, দেহবিশিষ্ট তড়াগ ও পল্বলসকল, দশদিক্, মহী, মহীধরসমুদায় ও-জলচর জীবসকল মহাত্মা বরুণের উপাসনা করিতেছে। গীত বাদ্যানুরক্ত গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাগণ স্তুতিবাদদ্বারা তাঁহার উপাসনায় প্রবৃত্ত হইয়াছে। রত্নসম্পন্ন পর্ব্বত ও রসসকল সুমধুর কথা প্রসঙ্গে তথায় অধ্যাসীন রহিয়াছে। বরুণ-মন্ত্রী সুনাভ, গোনামক পুষ্কর ও পুত্রপ্রপৌত্রগণে পরিবৃত হইয়া তাঁহার উপাসনা করিতেছেন। হে ধর্মরাজ! এই সমস্ত মহাত্মারা বিগ্রহ পরিগ্রহ-পূর্ব্বক বরুণদেবকে উপাসনা করিয়া থাকেন। আমি পৰ্য্যটন প্রসঙ্গে পূর্ব্বে বরুণসভা দর্শন করিয়াছিলাম, এক্ষণে কুবের সভা বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

নারদকর্তৃক কুবেরসভা বর্ণন।

নারদ কহিলেন, হে রাজন। ধনাধিপতি কুবেরের সভা দীর্ঘে শত যোজন ও প্রস্থে সপ্ততি যোজন বিস্তীর্ণ। ঐ আবরণ-শালিনী সভা শশধর ও কৈলাসশিখরের ন্যায় শ্বেতবর্ণ। কুবের বহু দিবস তপস্যা করিয়া ঐ সভা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। গুহ্যকগণ নিরন্তর উহা বহন করায়, বোধ হয় যেন, শূন্যমার্গেই অবস্থিতি করিতেছে। মহামূল্য বিবিধ রত্ন উহার বিচিত্র শোভা বিস্তার করিয়াছে। দিব্য গন্ধে সকলেরই নাসারন্ধ্র চরিতার্থ হইতেছে। উন্নত হিরণ্ময় প্রাসাদে উহার এক অপূর্ব্ব শ্রী সম্পাদিত হইয়াছে।

তাদৃশ মনোহারিণী সভা প্রায় দৃষ্টিগোচর হয় না। উহা বিদ্যুন্মালার ন্যায় হেমময় অবয়বদ্বারা চিত্রিত হইয়াছে। ঐ সভামধ্যে শ্রীমান্ মহারাজ কুবের বিচিত্র বসন ভূষণ ধারণ-পূর্ব্বক সহস্র সহস্র স্ত্রীগণ পরিবৃত হইয়া সূর্য্যসদৃশ সমুজ্জ্বল, পরম পবিত্র ও বিচিত্র আস্তরণে আবৃত ও দিব্য পাদপীঠসংযুক্ত মহামূল্য আসনে উপবিষ্ট থাকেন। মনোহর শীতল সমীরণ উদার মন্দারবন পরিলোড়ন' পূর্ব্বক বহুবিধ সুরভি কমল, কহ্লার প্রভৃতি এবং অলকাপুরী ও নন্দনবনের গন্ধ বহন করত তাঁহার সেবা করিয়া থাকে। হে মহারাজ! এ সভায় দেবগণ, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণে পরিবৃত হইয়া দিব্য তানে গান করিয়া থাকেন। মিশ্রকেশী, রম্ভা, শুচিস্মিতা চিত্রসেনা, চারুনেত্রা ঘৃতাচী, মেনকা, পুঞ্জিকস্থলা, বিশ্বাচী, সহজন্যা, প্রশ্নোচা, উর্ব্বশী, ইরা, বর্গা, সৌরভেয়ী, সমীচী, বুদ্বুদা, লতা ও অন্যান্য সহস্র সহস্র নৃত্যগীত-বিশারদ গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোবর্গ কুবেরের উপাসনা করেন। সেই সভা দিব্য বাদ্যে, নৃত্য গীতে ও গন্ধর্ব্বাপ্সরাসমূহে পরিপূর্ণ হইয়া কমনীয় শোভায় শোভিত হইয়াছে। মণিভদ্র, ধনদ, শ্বেত-ভদ্র, গুহ্যক, কশেরক, গণ্ডকণ্ডু, মহাবল প্রদ্যোত, কুস্তুম্বুরু, পিশাচ, গজকর্ণ, বিশালক, বরাহকর্ণ, তাম্রৌষ্ঠ, ফলকক্ষ, ফলোদক, হংসচুড়, শিখাবর্ত, হেমনেত্র, বিভীষণ, পুষ্পানন, পিঙ্গলক, শোণিতোদ, প্রবালক, বৃক্ষবাষ্পনিকেত, চীরবাসাঃ ও অন্যান্য শতসহস্র যক্ষ সেই সভায় অধ্যাসীন হয়। ভগবতী কমলালয়া নিয়ত তথায় অবস্থিতি করেন; নলকূবর ও তাহাতে উপবিষ্ট হইয়া থাকে। আমার ও মদ্বিধ অনেক ব্যক্তির কত শত বার তথায় অধিষ্ঠান হইয়াছে। ব্রহ্মর্ষিগণ, দেবর্ষিবর্গ, রাক্ষসসমূহ ও অন্যান্য মহাবল গন্ধর্ব্বসমূহ সভামধ্যে ধনে-শবের উপাসনা করেন। শূলহস্ত ভগবান্ ভবানীপতি বিগতক্লমা ভগবতী কাত্যায়নীসমভিব্যাহারে বামন, বিকট, কুব্জ, লোহিতাক্ষ, মহাবর, প্রভৃতি মেদোমাংসাশন শতসহস্র ভূতগণে পরিবৃত হইয়া তথায় বিরাজমান হয়েন।

বায়ুর ন্যায় মহাবেগশালী নানা প্রহরণে পরিবৃত হইয়া মহাবল পুরন্দর সর্ব্বদা সখা কুবেরের সহাসীন থাকেন। বিশ্বাবসু, হাহা, হুহু, তুম্বুরু, পৰ্ব্বত, শৈলুষ, গীতজ্ঞ চিত্রসেন ও চিত্ররথ প্রভৃতি গন্ধর্ব্বপতি এবং অন্যান্য গন্ধর্ব্বগণ ধনে-শ্বরের উপাসনা করেন। বিদ্যাধরাধিপতি চক্রধৰ্ম্মা অনুজগণের সহিত তাঁহার সন্নিহিত থাকিয়া উপাসনা করিয়া থাকেন। শত শত কিন্নর এবং ভগদত্ত প্রভৃতি রাজারাও তথায় ধনেশ্বরের উপাসনায় লিপ্ত হন। কিম্পুরুষাধিপতি দ্রুম, রাক্ষসাধিপতি মহেন্দ্র, গন্ধমাদন, কুবেরের ভ্রাতা বিভীষণ, যক্ষ, গন্ধর্ব্ব ও বহুসংখ্যক নিশাচর-সমভিব্যাহারে তাঁহার উপাসনা করেন।

হিমালয়, পারিপাত্র, বিন্ধ্য, কৈলাস, মন্দর, মলয়, দদুর, মহেন্দ্র, গন্ধমাদন, ইন্দ্রকীল, সুনাভ, দিব্য গিরিদ্বয় এবং মেরু প্রভৃতি অন্যান্য অনেক পৰ্ব্বতগণ ধনাধিপতির উপাসনা করিয়া থাকেন। নন্দীশ্বর, ভগবান্ মহাকাল, শঙ্কুকর্ণ প্রভৃতি দিব্য সভ্যগণ, কাষ্ঠ, কটীমুখ, দন্তী, তপোধিকা বিজয়া, শ্বেতবর্ণ মহাবল নিনাদকারী বৃষভ, অন্যান্য রাক্ষসগণ ও পিশাচবর্গ কুবেরের উপাসনা করেন। পুলস্ত্যনন্দন কুবের সর্ব্বদাই ভূত-পরিবৃত ভগবান্ ভবানীপতিকে প্রণিপাত করিয়া আজ্ঞানুবর্তী হইয়া তাঁহার সমীপে গমন করেন। মহাদেবও কখন কখন তাঁহার প্রতি সখ্যভাব অবলম্বন করিয়া থাকেন। নিধানপ্রধান শঙ্খ ও পদ্ম সমুদায় রত্ন গ্রহণ করিয়া তাঁহার উপাসনা করেন। হে মহারাজ! আমি মনোহারিণী অন্তরীক্ষগামিনী সেই সভা কতবার নিরীক্ষণ করিয়াছি, এক্ষণে ব্রহ্মার সভা বর্ণন করি, শ্রবণ করুন।

নারদকর্তৃক ব্রহ্মার সভাসৌন্দর্য্য বর্ণন।

নারদ কহিলেন, হে ধর্মরাজ! এক্ষণে পিতামহ ব্রহ্মার সভা বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। ঐ সভার তুলনা নাই। পূর্ব্বকালে সত্যযুগে ভগবান্ আদিত্য, মর্ত্যলোেক দর্শনার্থী হইয়া পরমসুখে ভূলোকে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তিনি নরকলেবর পরিগ্রহ করিয়া অপরিশ্রান্তচিত্তে ইতস্ততঃ সঞ্চরণপূর্ব্বক ব্রহ্মার মানসী সভা অবলোকন করেন। সভা দর্শন করিয়া তিনি আমাকে অকপটে কহিলেন, হে নারদ! ব্রহ্মার মানসী সভা অনির্দেশ্য, অপ্রমেয় ও সর্ব্বভূতমনোরম। আমি আদিত্যমুখে ব্রহ্মাসভার শোভা বর্ণন শ্রবণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তদ্দর্শনে একান্ত কুতূহলা-ক্রান্ত হইয়া তাঁহাকে কহিলাম, ভগবন্! এক্ষণে সর্ব্বপাপনাশিনী শুভা ব্রহ্মাসভা সন্দর্শন করিতে আমার সাতিশয় অভিলাষ হইতেছে, অতএব আমি যেরূপ তপস্যা, ঔষধ, যোগ ও কৰ্ম্মদ্বারা তাহা দেখিতে পাইব, এমত বলিয়া দেন। দিবাকর এই কথা শুনিয়া বর্ষসহস্রসাধ্য ব্রতের কথা উত্থাপন করিয়া | কহিলেন, হে তপোধন। তুমি একান্তমনে ব্রহ্মব্রত অনুষ্ঠান কর।

অনন্তর আমি তদীয় আদেশে হিমালয়ের পৃষ্ঠদেশে ঐ মহাব্রত সাধন করিলাম। তৎপরে তাঁহার সমভিব্যাহারে ব্রাহ্মী-সভায় উপনীত হইয়া দেখিলাম, দৃষ্টান্তপ্রদর্শনপূর্ব্বক ঐ অপূর্ব্ব সভা নির্দেশ করা যায় না, ক্ষণে ক্ষণে উহা নানা রূপ ধারণ করে, পরিমাণ ও সংস্থান বিষয়ে উহার কেহই কিছুই অবধারণ করিতে পারেন না। ফলতঃ আমি ঐরূপ অদৃষ্টপূর্ব্ব বস্তু কদাচ প্রত্যক্ষ করি নাই। ঐ সভা অতিশয় সুখজনক ও নাতিশীতোষ্ণ; তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইলে লোকের ক্ষুৎপিপাসাজনিত ক্লেশ ও গ্লানিচ্ছেদ হয়, আপাততঃ দেখিলে প্রতীতি হয়, যেন সভা নানাবিধ অতিভাস্বর মণিদ্বারা নির্মিত হইয়াছে। স্তম্ভদ্বারা ঐ শাশ্বতী সভা অবলম্বিত নহে, তথাচ স্বস্থান হইতে বিচলিত হইতেছে না। তথায় নানাবিধ দিব্য ও অমিতপ্রভ ভাবসমুদায় আবির্ভূত রহিয়াছে। ব্রাহ্মীসভার প্রভাপুঞ্জ চন্দ্র, সূর্য্য, অগ্নি ও বিদ্যুৎকে উপহাস করিয়া নভোমণ্ডলে শোভা বিস্তার করিতেছে। তন্মধ্যে অদ্বিতীয় ভগবান্ সর্ব্বলোেকপিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং দেবমায়া পরিগ্রহ করিয়া অধ্যাসীন হইয়া থাকেন। প্রজাপতিগণ তাঁহার উপাসনা করিতেছেন। আর দক্ষ, প্রচেতাঃ, পুলহ, মরীচি, কশ্যপ, ভৃগু, অত্রি, বশিষ্ঠ, গৌতম, অঙ্গিরাঃ, পুলস্ত্য, ক্রতু, প্রহ্লাদ, কদম, অথর্ব্ব, আঙ্গিরস, মরীচিপ, বালখিল্য, মনঃ, অন্তরীক্ষ, বিদ্যা, বায়ু, তেজঃ, জল, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ, প্রকৃতি, বিকৃতি ও পৃথিবীর অন্যান্য কারণসমুদায়, মহাতেজাঃ অগস্ত্য, বীর্য্যবান্ মার্কণ্ডেয়, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, সংবর্ত, চ্যবন, মহাভাগ দুর্ব্বাসাঃ, পরমধার্মিক ঋষ্যশৃঙ্গ, ভগবান্ সনৎকুমার, মহাতপাঃ যোগাচার্য্য, অসিত, দেবল, তত্ত্ববিৎ জৈগীষব্য, অজাতশত্রু, ঋষভ, মহাবীর্য্য মণি, অষ্টাঙ্গসম্পন্ন বিগ্রহধারী আয়ুর্ব্বেদ, নক্ষত্রগণ-পরিবৃত চন্দ্র, সহস্রকর দিবাকর, বায়ু, ক্রতুগণ, সঙ্কল্প ও প্রাণ এই সমস্ত মহাব্রতপরায়ণ মূর্তিমান্ মহাত্মা ও অন্যান্য বহুসংখ্যক ব্যক্তিবর্গ ব্রহ্মার উপাসনা করিতেছেন।

ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, হর্ষ, দ্বেষ, তপস্যা ও সপ্তবিংশতি অপ্সরোগণ তথায় আগমন করিয়া থাকেন। লোকপালবর্গ, শুক্র, বৃহস্পতি, বুধ, অঙ্গারক, শনৈশ্চর, রাহু প্রভৃতি গ্রহসমস্ত, মন্ত্র, রথন্তর, হরিমান, বসুমান, নামদ্বন্দ্বোদাহৃত, অধিরাজসহ আদিত্যগণ, মরুৎসমুদায়, বিশ্বকর্মা, বসুবর্গ, পিতৃগণ, সমস্ত হবিঃ, ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্ব্বেদ, অথর্ব্ববেদ, সর্ব্বশাস্ত্র, ইতিহাস, উপবেদ, বেদাঙ্গসমুদায়, যজ্ঞ, সোম, দেবগণ, দুর্গতরণী, সাবিত্রী, সপ্তবিধ বাণী, মেধা, ধৃতি, স্মৃতি, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, যশঃ, ক্ষমা, সাম, স্তুতিশাস্ত্র, বিবিধ গাথা, দেহসম্পন্ন তর্কযুক্ত ভাষ্য, নানাপ্রকার নাটক, বিবিধ প্রকার কাব্য, বহুবিধ কথা, সমস্ত আখ্যায়িকা, সমুদায় কারিকা, এই সমস্ত পাবন ও অন্যান্য গুরুপূজকগণ তথায় অবস্থান করিয়া থাকেন। ক্ষণ, লব, মুহূর্ত্ত, দিবা, রাত্রি, পক্ষ, মাস, ছয় ঋতু, সংবৎসর, পঞ্চযুগ, চতুর্ব্বিধ অহোরাত্র, দিব্য নিত্য অক্ষয় অব্যয়, কালচক্র ও ধৰ্ম্মচক্র, ইঁহারাও প্রতিনিয়ত আসিয়া থাকেন। দিতি, অদিতি, দনু, সুরসা, বিনতা, ইরা, কালিকা, সুরভী, দেবী সরমা, গৌতমী, প্রভা, কদ্রু, দেবমাতৃগণ, রুদ্রাণী, শ্রী, লক্ষ্মী, ভদ্রা, ষষ্ঠী, মূর্তিমতী দেবী পৃথিবী, হ্রী, স্বাহা, কীর্তি, সুরা, দেবী শচী, পুষ্টি, অরুন্ধতী, সংবৃত্তি, আশা, নিয়তি, সৃষ্টি, দেবী রতি ও অন্যান্য দেবীগণ ভগবান্ ব্রহ্মার উপাসনা করিয়া থাকেন। দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, ঊনপঞ্চাশৎ মরুৎ ও অশ্বিনীকুমারযুগল, বিশ্বদেবসমূহ, সাধ্যসার্থ, মনোজব পিতৃগণ সকলে সভাসীন ব্রহ্মার উপাসনা করেন। হে পুরুষর্ষভ! ঐ পিতৃলোকদিগের সপ্ত গণ, তন্মধ্যে চতুষ্টয় শরীরধারী ও এয় অশরীরী। সকলেই বিরাট প্রভব, লোকবিশ্রুত ও চতুর্ব্বর্গপূজিত; প্রথম গণের নাম অগ্নিস্বাত্ত, দ্বিতীয়ের নাম গার্হপত্য, তৃতীয়ের নাম নাকচর, চতুর্থের নাম সোমপ, পঞ্চমের নাম একশৃঙ্গ, যষ্ঠের নাম চতুর্ব্বেদ, সপ্তমের নাম কলা। ইঁহারা প্রথমতঃ আপ্যায়িত হইলে সোম পরিতৃপ্ত হয়েন। রাক্ষসগণ, পিশাচবর্গ, দানবসমুদায়, গুহ্যকসকল, নাগসার্থ, সুপর্ণসমূহ ও পশুসমুদায় পিতামহ ব্রহ্মার আরাধনা করে। স্থাবরজঙ্গমসকল, মহাভূতসমুদায়, দেবেন্দ্র পুরন্দর, বরুণ, কুবের, যম ও উমাসহ মহাদেব তথায় সর্ব্বদা সমাগত হইয়া থাকেন। মহাসেন, দেব নারায়ণ, দেবর্ষিবর্গ, বালখিল্য ঋষিগণ, যোনিজ ও অযোনিজ ঋষিসকল আর ত্রিভুবনে যে সমস্ত স্থাবর জঙ্গম দেখিতে পাওয়া যায়, ইঁহারা সকলেই ব্রহ্মার উপাসনা করেন। হে নরাধিপ! আমি স্বয়ং তথায় উপস্থিত হইয়া এই সমস্ত স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। অষ্টাশীতি সহস্র উর্দ্ধরেতাঃ ঋষি, প্রজাবান্ পঞ্চাশৎ ঋষি ও অন্যান্য দেবতাসকলে ব্রহ্মাকে মনোবাঞ্ছা পূরণপূর্ব্বক দর্শন ও প্রণাম করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিয়া থাকেন।

সর্ব্বভূতদয়াবান্ ভগবান্ ব্রহ্মা অভ্যাগত অতিথিগণ, দেব, দৈত্য, নাগ, দ্বিজ, যক্ষ, সুপর্ণ, কালেয়, অপ্সরা ও গন্ধর্ব্ব সকলেরই সমুচিত অভ্যর্থনা করিয়া থাকেন। তিনি যথাযোগ্য সমাদর প্রদর্শনপূর্ব্বক সান্ত্বনাবাদ, সম্মান ও অর্থপ্রদানদ্বারা তাঁহাদিগের প্রীতি সম্পাদন করেন। এই সমস্ত আগন্তুকদিগের সমাগমে ও দগড়বাদ্যে সেই সুখপ্রদ সভা আকুল হইয়া উঠে। সর্ব্বতেজোময়ী দিব্যা ব্রহ্মর্ষিগণসেবিতা শ্রমাপহারিণী সেই সভা ব্রাহ্মী শ্রীদ্বারা দীপ্যমানা হইয়া অদ্ভুত শোভা পাইয়া থাকে। হে রাজশাদুল। যাদৃশ তোমার এই সভা মনুষ্যলোকে দুর্লভ, তাদৃশ ত্রিলোকমধ্যে ব্রহ্মাসভা দুষ্প্রাপ্য। হে ভরতবংশশ্রেষ্ঠ! আমি দেবলোকে এই সমস্ত সভা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, এক্ষণে মনুষ্য-লোকে সর্ব্বশ্রেষ্ঠতম তোমার এই সভা সন্দর্শন করিলাম।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে তপোধন! আপনি কহিলেন যে, প্রায় সমুদায় রাজলোক যমসভার অন্তর্গত রহিয়াছেন। বরুণ-দেবের সভায় নাগগণ, দৈত্যেন্দ্রসকল ও অনেকানেক সরিৎ ও সাগর অবস্থিত করিতেছেন। ধনপতি কুবেরের সভায় যক্ষ, রাক্ষস, গুহ্যক, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণ এবং ভগবান্ ভবানীপতি বিরাজিত রহিয়াছেন। ব্রহ্মার সভায় মহর্ষিগণ ও দেবসমূহ বাস করেন এবং তথায় সর্ব্বপ্রকার শাস্ত্রও বিদ্যমান রহিয়াছে। ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের সভা কেবল দেবগণে অলঙ্কৃত এবং তাহার কোন কোন প্রদেশ গন্ধর্ব্ব ও মহর্ষিগণকর্তৃক পরিসেবিত। সেই মহতী অমরাধিপতি-সভায় কেবল একমাত্র রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্র পরমসুখে বাস করিতেছেন। হে মুনিবর। রাজা হরিশ্চন্দ্র কি প্রকার তপস্যা বা পুণ্যকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন যে, তিনি দেবরাজের সমকক্ষতা প্রাপ্ত হইলেন? আর পিতৃলোকগত মহাভাগ পিতা পাণ্ডুর সহিত আপনার কিরূপে সাক্ষাৎকার হইল এবং প্রত্যাগমন-সময়ে সেই মহাপুরুষ আপনাকে কি কহিলেন তাহা আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করুন। আপনার নিকট সবিস্তর শ্রবণ করিতে আমি একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইয়াছি।

রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের রাজসূয় যজ্ঞের মহিমা বর্ণন।

তপোধন দেবর্ষি কহিলেন, মহারাজ! যাঁহার বিষয় জানিবার নিমিত্ত এত ঔৎসুক্য প্রকাশ করিতেছেন, আমি আপনার নিকট সেই রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করি, শ্রবণ করুন।

রাজা হরিশ্চন্দ্র সসাগরা সদ্বীপা বসুন্ধরার সম্রাট্ ছিলেন, পৃথিবীস্থ সমস্ত মহীপাল তাঁহার শাসনের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন। তিনি জয়শীল সুবর্ণালঙ্কৃত এক রথে আরোহণ করিয়া অস্ত্রশস্ত্রপ্রভাবে সপ্ত দ্বীপ জয় করিয়া রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। তাঁহার আজ্ঞা পাইবামাত্র রাজগণ ভূরি ভূরি ধন আনয়ন করিলেন এবং তাঁহারা ব্রাহ্মণদিগের পরিবেষ্টুপদে নিযুক্ত হইলেন। সেই যজ্ঞে সমুপস্থিত যাজকেরা যত অর্থ প্রার্থনা করিলেন, রাজর্ষি প্রীতমনে তাঁহাদিগকে প্রার্থিত ধনের পঞ্চ গুণ অধিক প্রদান করিলেন। নানা দিগদেশ হইতে ব্রাহ্মণগণ সমাগত হয়েন। মহারাজ হরিশ্চন্দ্র প্রত্যাগমনকালে বিবিধ রত্নসমূহ প্রদানপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে পরিতৃপ্ত করিয়া বিদায় করিতেন। বিবিধ ভক্ষ্য ভোজ্য ও রত্নসমূহে দ্বিজগণ সন্তুষ্ট হইয়া রাজাকে ভূরি ভূরি আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। রাজা যজ্ঞফলে এবং ব্রাহ্মণগণের আশীর্ব্বাদ প্রভাবে সমস্ত রাজলোক অপেক্ষা সমধিক তেজস্বী ও যশস্বী হইয়া উঠিলেন। সেই প্রবলপ্রতাপ রাজর্ষি মহাক্রতু সমাপনান্তে সাম্রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া অনির্বচনীয় শোভা পাইতে লাগিলেন। হে নরাধিপ। যে সকল মহীপালেরা রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারা পরমাহ্লাদে ইন্দ্রের সহিত কালযাপন করিতে পারেন এবং যাঁহারা যুদ্ধে পলায়ন না করিয়া রণক্ষেত্রে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েন অথবা অতি কঠোর তপস্যাদ্বারা কলেবর পরিত্যাগ করেন, তাঁহারাও ইন্দ্রলোকে গমন করত পরমসুখে কালযাপন করেন। তাঁহারা ইন্দ্রলোকে উত্তীর্ণ হইয়া অপূর্ব্ব শ্রীধারণপূর্ব্বক দীপ্তি পাইতে থাকেন। হে কৌন্তেয়! আপনার পিতা পাণ্ডু রাজা হরিশ্চন্দ্রের লোকাতিশায়িনী শোভা সন্দর্শনে বিস্মিত হইয়া আমাকে মনুষ্যলোকে আসিতে দেখিয়া প্রণতিপূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, মহর্ষে। আপনি নরলোকে যাইতেছেন, যুধিষ্ঠিরকে কহিবেন, - ভ্রাতৃগণ তাঁহার বশীভূত; এবং তিনি সমুদায় পৃথিবী জয় করিতে সমর্থ; অতএব ক্রতুশ্রেষ্ঠ রাজসূয় যজ্ঞের যেন অনুষ্ঠান করেন। তিনি যজ্ঞ সম্পন্ন করিলে আমি রাজা হরিশ্চন্দ্রের ন্যায় বহু দিবস অবিচ্ছিন্ন সুখসম্ভোগ করত ইন্দ্রের সহিত কালযাপন করিতে পারিব। অনন্তর আমি তোমার পিতাকে কহিলাম, মহারাজ; যদি আমি ভূলোকে গমন করি, অবশ্যই আপনার পুত্রকে ত্বদীয় প্রার্থনা জানাইব। হে ভরতর্ষভ! এক্ষণে আপনি প্রযত্নাতিশয়সহকারে পিতার সঙ্কল্পসিদ্ধিবিষয়ে তৎপর হউন। তাহা হইলে পূর্ব্বপুরুষগণ-সমভিব্যাহারে মহেন্দ্রলোকে গমন করিবেন, সন্দেহ নাই। মহারাজ! রাজসূয়, প্রধান যজ্ঞ বলিয়া পরিগণিত, কিন্তু ইহাতে অনেক বিঘ্ন উপস্থিত হয়। যজ্ঞহন্তা ব্রহ্মরাক্ষসেরা সতত ইহার ছিদ্রান্বেষণে তৎপর থাকে, ইহাতে ক্ষত্রিয়ান্তক ও পৃথিবীক্ষয়কারণ যুদ্ধ উপস্থিত হয়। ফলতঃ কোন না কোন অনিষ্টপাত অবশ্যই ঘটিয়া থাকে, অতএব ইহা সম্যক্ পর্যালোচনা করিয়া যাহাতে ক্ষেম লাভ হয়, তাহার অনুষ্ঠান করুন। প্রতিদিন গাত্রোত্থানপূর্ব্বক অবহিত হইয়া চাতুব্বর্য্যের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন এবং ধনদ্বারা যোগানুষ্ঠান, আমোদ প্রমোদ ও দ্বিজাতিগণকে পরিতৃপ্ত করিবেন।

মহারাজ! যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তৎসমুদায় সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম; এক্ষণে বিদায় হই, অদ্য দাশার্হ নগরীতে গমন করিব। নারদ পাণ্ডবগণকে এই কথা বলিয়া সমভিব্যাহারী ঋষিগণে পরিবৃত হইয়া যাত্রা করিলেন। তিনি প্রস্থান করিলে পর রাজা যুধিষ্ঠির অনুজগণের সহিত রাজসূয় যজ্ঞের পরামর্শ করিতে লাগিলেন।

লোকপাল-সভাখ্যান পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


সভাপর্ব

রাজসূয়ারম্ভ পর্ব্বাধ্যায়।

যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের মানস প্রকাশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতকুলতিলক জনমেজয়! মহারাজ যুধিষ্ঠির মহর্ষি নারদের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া নিশ্বাস পরিআাগ করিলেন এবং রাজসূয় যজ্ঞের বিষয় চিন্তা করত যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হইলেন। তিনি মহাত্মা রাজর্ষিগণের মহিমা এবং পুণ্যকৰ্ম্মদ্বারা যজ্ঞাদিগের উত্তমলোেক প্রাপ্তি, বিশেষতঃ রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের বিষয় সমালোচনা করিয়া রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান করিতে মানস করিলেন। তখন সেই কুরুবংশাবতসে পাণ্ডুনন্দন সমস্ত সভাসদ্গণকে পূজা করিয়া ও তাহাদিগের কর্তৃক পূজিত হইয়া বারংবার চিন্তা করত রাজসূয় যজ্ঞ করিতে দৃঢ়নিশ্চয় হইলেন। তৎপরে সেই অদ্ভুততেজাঃ ধৰ্ম্মনন্দন প্রজাদিগের হিতসাধনে মনঃ অভিনিবিষ্ট করিয়া অবশেষে সর্ব্বলোকের উপকার করিতে লাগিলেন। রাজা ক্রোধমদ-বিবর্জিত হইয়া সকলের ঋণ পরিশোধ করিতে আজ্ঞা দিলেন; ফলতঃ তাঁহার রাজ্যমধ্যে কেবল "সাধু ধৰ্ম্ম, সাধু ধৰ্ম্ম,” ভিন্ন আর কোন কথাই ছিল না। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির পুত্রের ন্যায় প্রজাগণকে প্রতিপালন করাতে কেহই আর তাঁহার দ্বেষ্টা রহিল না, এইরূপে তিনি অজাতশত্রু হইয়া উঠিলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের পরিগ্রহ', ভীমসেনের প্রতিপালন, সব্যসাচী অর্জুনের শত্রুনিবারণ, ধীমান্ সহদেবের ধর্মানুশাসন এবং নকুলের স্বাভাবিকী নম্রতা দ্বারা তাঁহাদের অধিকারস্থ সমস্ত জনপদে বিগ্রহ বা ভয়ের সম্পর্কও রহিল না। সকলেই স্ব স্ব কার্য্যে নিরত থাকিল; পর্জন্য যথাকালে বারিবর্ষণ করিতে লাগিল এবং সকল প্রজারাই ধনসম্পত্তিসম্পন্ন হইল। বার্দ্ধষী,২ যজ্ঞসত্ত্ব, গোরক্ষণ, কৃষি, বাণিজ্য, প্রভৃতি কার্য্য সমুদায়ের যথেষ্ট উন্নতি হইল। অনুকর্ষ, নিষ্কর্ষ, ব্যাধি, অগ্নিদাহ, মূর্ছা প্রভৃতি কিছুই রহিল না। দস্যু, বঞ্চক বা রাজবল্লভগণ রাজার কোন প্রকার অনিষ্টাচরণ করিত না। ধার্মিকবর মহারাজ যুধিষ্ঠির যে যে দেশ অধিকার করিয়াছিলেন, তথাকার নৃপগণ, বণিক্সমুদায়, রজোগুণপ্রধান লোভী লোক এবং সামান্য জাতি, সকলেই সর্ব্বদা রাজার প্রিয়কর্ম্ম, দেবোপাসনা এবং স্ব স্ব অদৃষ্টানুসারে ভোগবাসনা চরিতার্থ করিত। সেই সম্রাট্ সর্ব্বগুণান্বিত সর্বংসহ সর্ব্বব্যাপী ও অসীম কীর্ত্তিমান্ ছিলেন। কি দ্বিজাতি, কি গোপজাতি সমস্ত প্রজারাই সেই ভূপতির পিতৃকর্ত্তব্য নীতিশিক্ষা প্রদানাদি ও মাতৃকর্ত্তব্য বাৎসল্যাদি গুণ দ্বারা উপকৃত হইয়া তাঁহার প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত হইয়া উঠিল।

মন্ত্রিগণ, ধৌম্য ও দ্বৈপায়নের সহিত যুধিষ্ঠিরের মন্ত্রণা।

মহারাজ যুধিষ্ঠির স্বীয় মন্ত্রিগণ ও অনুজগণকে আহ্বান করিয়া বারংবার রাজসূয় যজ্ঞের কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। তাঁহারা যজ্ঞানুষ্ঠানেচ্ছুক মহাপ্রাজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের সেই মহার্থ বাক্য শ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইয়া কহিতে লাগিলেন, হে কুরুনন্দন! নৃপতি যদ্দ্বারা অভিষিক্ত হইয়া বারুণ গুণ প্রাপ্ত হন, তদ্দ্বারা তিনি সমস্ত সম্রাজগুণ প্রাপ্ত হইতে পারেন। আমরা আপনার সুহৃদ্, আমাদের মতে আপনার রাজসূয় যজ্ঞ করিবার সময় সমুপস্থিত হইয়াছে। ক্ষত্রিয়বল থাকিলেই ঐ যজ্ঞ অনায়াসে সুসম্পন্ন হয়। এই যজ্ঞে ব্রতচারী ব্রাহ্মণগণ সামবেদ-দ্বারা ষট্ প্রকার অগ্নি সংস্থাপন করেন। এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলে অগ্নিহোত্র প্রভৃতি সমুদায় যজ্ঞের ফল লাভ হয়। এই যজ্ঞের শেষে অভিষেক করিলে লোক সর্ব্বজয়ী হইয়া উঠে। হে মহারাজ। আপনি যজ্ঞানুষ্ঠানে সমর্থ; আমরা সকলেই আপনার বশীভূত। অতএব আপনি অচিরাৎ ঐ রাজসূয় যজ্ঞের ফল লাভ করিবেন। হে রাজন। এক্ষণে কোন বিচার না করিয়া রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে সঙ্কল্প করুন।

ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁহাদের মুখে সেই স্বাভিলষিত ধৰ্ম্ম-সংযুক্ত বাক্য শ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইলেন এবং মনে মনে আপনার ক্ষমতা বুঝিয়া রাজসূয়ানুষ্ঠানে নিশ্চয় করিলেন। তখন তিনি পুনরায় ভ্রাতৃগণ, ঋত্বিক্সণ, মন্ত্রিগণ এবং ধৌম্য ও দ্বৈপায়ন প্রভৃতি মহাত্মাদিগের সহিত মন্ত্রণা করত কহিলেন, হে মন্ত্রবিশারদগণ! আমি সার্ব্বভৌমোচিত রাজসূয় যজ্ঞ করিতে বাসনা করিয়াছি, বলুন, কি প্রকারে আমার মনোবাঞ্ছা সফল হইবে? ধর্মরাজের বাক্য শ্রবণ করিয়া ঋষিগণ ও ঋত্বিকগণ কহিলেন, হে ধর্মরাজ! আপনি রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের উপযুক্ত পাত্র বলিয়াই উৎসাহ প্রদান করিলাম। তখন তাঁহার ভ্রাতৃগণ ও মন্ত্রিগণ তাঁহাদিগের বাক্যে অনুমোদন করিলেন। তখন মহাপ্রাজ্ঞ যুধিষ্ঠির লোকগণের হিতবাসনায় পুনর্ব্বার চিন্তা করিতে লাগিলেন। যে ব্যক্তি আপনার সামর্থ্য, সম্পত্তি, দেশ, কাল, আয় ও ব্যয় দেখিয়া এবং সম্যরূপে বিবেচনা করিয়া কার্য্য করে, তাঁহাকে বিপদ্‌গ্রস্ত হইতে হয় না। মহারাজ যুধিষ্ঠির কেবল আপনার মতে কর্ত্তব্য হইল বলিয়া যজ্ঞারম্ভ করা অনুচিত বিবেচনা করিয়া অপ্রমেয় মহাবাহু সর্ব্বলোকোত্তম কৃষ্ণের সহিত পরামর্শ করিতে স্থির করিলেন। তিনি ভাবিলেন, কৃষ্ণ সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্বোৎকৃষ্ট; তিনি অবশ্যই আমাকে এবিষয়ে সৎপরামর্শ দিবেন। ধর্মরাজ মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া কৃষ্ণসমীপে দূত প্রেরণ করিলেন। দূত শীঘ্রগামী রথে আরোহণপূর্ব্বক সত্বরে দ্বারাবতী গমন করিয়া বাসুদেবের সমীপে সমুপস্থিত হইল। ভগবান্ চক্রপাণি দূতমুখে যুধিষ্ঠিরের দর্শনাকাঙ্ক্ষা শ্রবণ করিয়া ইন্দ্রসেনকে সমভিব্যাহারে লইয়া যাত্রা করিলেন এবং ক্রমে ক্রমে নানাদেশ অতিক্রম করিয়া পরিশেষে ইন্দ্রপ্রস্থে যুধিষ্ঠিরের নিকট উপস্থিত হইলেন। যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সমাগত দেখিয়া পরম সমাদরে পিতার ন্যায় তাঁহাকে পূজা করিলেন। তৎপরে ভীম, অর্জুন ও মাদ্রীনন্দনদ্বয় গুরুর ন্যায় তাঁহাকে অর্চ্চনা করিলেন। তৎপরে ভগবান্ বাসুদেব স্বীয় পিতৃম্বসা কুন্তীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া অন্যান্য সুহৃদ্গণের সহিত আমোদ করিতে লাগিলেন।

কৃষ্ণসমীপে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের অভিলাষ।

এইরূপে ভগবান্ কৃষ্ণ কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম করিলে পর যুধিষ্ঠির আপনার প্রয়োজন জানাইবার নিমিত্ত তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, হে কৃষ্ণ। আমি রাজসূয় যজ্ঞ করিতে অভিলাষ করিয়াছি। ঐ যজ্ঞ কেবল ইচ্ছা করিলেই সম্পন্ন হয়, এমত নহে; যেরূপে উহা সম্পন্ন হয়, তাহা তোমার সুবিদিত আছে। দেখ, যে ব্যক্তিতে সকলই সম্ভব, যে ব্যক্তি সর্ব্বজন পূজ্য ও যিনি সমুদায় পৃথিবীর ঈশ্বর, সেই ব্যক্তিই রাজসূয়া-নুষ্ঠানের উপযুক্ত পাত্র। আমার অন্যান্য সুহৃদ্গণ আমাকে ঐ যজ্ঞ করিতে পরামর্শ দিয়াছেন, কিন্তু আমি তোমার পরামর্শ না লইয়া উহার অনুষ্ঠান করিতে নিশ্চয় করি নাই। হে কৃষ্ণ! কোন কোন ব্যক্তি বন্ধুতার নিমিত্ত দোষোঘোষণ করেন না, কেহ কেহ স্বার্থপর হইয়া প্রিয়বাক্য কহেন। কেহ বা যাহাতে আপনার হিত হয়, তাহাই প্রিয় বলিয়া বোধ করেন। হে মহাত্মন্! এই পৃথিবীমধ্যে উক্তপ্রকার লোকই অধিক; সুতরাং তাহাদের পরামর্শ লইয়া কোন কার্য্য করা হয় না। তুমি উক্তপ্রকার দোষরহিত ও কামক্রোধবিবর্জিত; অতএব আমাকে যথার্থ পরামর্শ প্রদান কর।

রাজসূয়ের অনিষ্টকারী জরাসন্ধ।

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে মহারাজ। আপনি সর্ব্বগুণে গুগরান অতএব রাজসূয় যজ্ঞ করা আপনার অবিধেয় নহে। আপনি সর্ব্বথা রাজসূয়ানুষ্ঠানের উপযুক্ত পাত্র, সন্দেহ নাই। আপনি সর্বজ্ঞ, তথাপি আপনাকে কিঞ্চিৎ কহিতেছি, শ্রবণ করুন। পূর্ব্বে জমদগ্নিনন্দন পরশুরাম পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয়া করেন। তৎপরে যাঁহারা ক্ষত্রকুলে জন্মিয়াছেন, তাঁহারা যথার্থ ক্ষত্রিয় নহেন; কিন্তু ক্ষত্রিয়ের ন্যায় আচার ব্যবহার করিয়া থাকেন, তাঁহারা একত্র হইয়া যে কুলনিয়ম সংস্থাপন করিয়াছেন, তাহাও আপনার বিদিত আছে। হে রাজন! অনেকানেক ভূপতিগণ ও ক্ষত্রিয়গণ ঐলবংশ ও ইক্ষাকুবংশের বৃত্তান্ত কহিয়া থাকেন। যে সকল নরপতিগণ ঐলবংশে ও ইক্ষাকুবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের হইতে একশত কূল সমুৎপন্ন হয়। তন্মধ্যে ভোজবংশীয় ভূপতি যযাতির বংশ ভূমণ্ডলের চতুৰ্দ্দিকে বিস্তীর্ণ রহিয়াছে। হে রাজন। যাবতীয় ক্ষত্রিয়গণ স্ব স্ব বংশলক্ষ্মী অধিকার করিয়া আসিতেছেন। এক্ষণে মহীপতি জরাসন্ধ স্বীয় বাহুবলে সমস্ত ভূপতিগণকে পরাজয় করিয়া স্ববশে আনয়নপূর্ব্বক তাঁহাদের কর্তৃক সেবিত হইয়া অখণ্ড ভূমণ্ডলে একাধিপত্য সংস্থাপন করিয়াছেন। হে মহারাজ! যে রাজা সকলের প্রভু এবং সমস্ত জগৎ যাঁহার হস্তগত; নিয়মানুসারে তিনিই সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হয়েন। প্রতাপশালী শিশুপাল, মহীপতি জরাসন্ধের আশ্রয় লইয়া তাঁহার সেনাপতি হইয়াছেন। মায়াযোধী বীর্য্যবান্ করুষাধিপতি বক্র শিষ্যের ন্যায় তাঁহাকে সেবা করিতেছেন। মহাবল পরাক্রান্ত হংস ও ডিম্ভক তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। দন্তবক্র, করুষ, করভ ও মেঘবাহন তাঁহার বশীভূত হইয়াছেন। যিনি মস্তকে দিব্য মণি ধারণ করেন, যিনি মুরু ও নরকদেশ শাসন করেন, যিনি বরুণের ন্যায় পশ্চিমদেশে বদ্ধমূল হইয়াছেন, আপনার পিতৃবন্ধু মহাবল পরাক্রান্ত যবনাধিপতি বৃদ্ধ ভগদত্ত সতত তাঁহার প্রিয়কার্য্য করিয়া থাকেন। যিনি আপনার প্রতি অতিশয় স্নেহবান, যিনি পিতার ন্যায় আপনাকে ভক্তি করেন, যিনি পশ্চিমভাগের দক্ষিণ সীমার অধিপতি এবং যিনি স্নেহবশতঃ আপনার নিকট সতত সন্নত থাকেন, সেই পুরুজিৎ, কুত্তিবংশবর্দ্ধন, শত্রুনিসূদন, আপনার মাতুল, সেই জরাসন্ধের অনুগত। যে দুরাত্মা চেদিদেশে সুবিখ্যাত, যে আপনাকে পুরুষোত্তম বলিয়া স্বীকার করে, যে মোহবশতঃ সর্ব্বদা আমার চিহ্ন ধারণ করিয়া থাকে, যে বঙ্গ, পুণ্ড্র ও কিরাতদেশের অধিপতি এবং যে ভূমণ্ডলে বাসুদেব বলিয়া বিখ্যাত, সেই মহাবল পরাক্রান্ত পৌন্ড্রক এক্ষণে তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। যিনি পৃথিবীর চতুর্থাংশ ভোগ করিতেছেন, ভোজ ও দেবরাজ ইন্দ্র যাঁহার সখা, যিনি পাণ্ড্য, ক্রুথ ও কৈশিকদেশ জয় করিয়াছেন, পরশুরামতুল্য তেজস্বী আকৃতি যাঁহার ভ্রাতা, সেই বিদ্যাবলসম্পন্ন, শত্রুনিসূদন ভীষ্মকও তাঁহার বশবর্তী হইয়াছেন। ভীষ্মক আমাদের আত্মীয়, আমরা সর্ব্বদা তাঁহার প্রিয়ানুষ্ঠান করি এবং বিনীতভাবে অনুগত থাকি; কিন্তু তিনি তথাপি আমাদের বশীভূত হয়েন না। তিনি জরাসন্ধের কীর্ত্তিশ্রবণে বিমুগ্ধ হইয়া কি কুলাভিমান, কি বলাভিমান সমুদায়ে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার শরণাপন্ন হইয়াছেন। উত্তরদেশবাসী রাজগণ ও অষ্টাদশ ভোজকুল জরাসন্ধের ভয়ে পশ্চিমদিকে পলায়ন করিয়াছেন। শূরসেন, ভদ্রকার, বোধ, শাল্ব, পটচ্চর, সুস্থল, মুকুট্ট, কুলিন্দ, কুস্তি, শালায়নবংশীয় নৃপতিগণ, দক্ষিণ পাঞ্চালস্থ ভূপতিগণ এবং পূর্ব্বকোশলনিবাসী রাজগণ ও সোেদর অনুচরগণ সমভিব্যাহারে পশ্চিমদিকে পলায়ন করিয়াছেন। মৎস্য এবং সন্ন্যস্তপাদদেশীয় নরপতিগণও সাতিশয় ভীত হইয়া উত্তরদিক্ পরিত্যাগপূর্ব্বক দক্ষিণদিকে গমন করিয়াছেন। যাবতীয় পাঞ্চালদেশীয় মহীপতি-গণ স্ব স্ব রাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক ইতস্ততঃ পলায়ন করিয়াছেন।

কিয়ৎকাল অতীত হইল, দানবরাজ কংস যাদবগণকে পরাভূত করিয়া সহদেবা ও অনুজা নামে বার্হদ্রথের দুই কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিল। ঐ দুরাত্মা স্বীয় বাহুবলে জ্ঞাতিবর্গকে পরাজয় করত সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান হইয়া উঠিল। ভোজবংশীয় বৃদ্ধ ক্ষত্রিয়গণ মূঢ়মতি কংসের দৌরাত্ম্যে সাতিশয় ব্যথিত হইয়া জ্ঞাতিগণকে পরিত্যাগ করিবার নিমিত্ত আমাকে অনুরোধ করিলেন। আমি তৎকালে অক্রুরকে আহুককন্যা প্রদান করিয়া জ্ঞাতিবর্গের হিতসাধনার্থে বলভদ্র-সমভিব্যাহারে কংস ও সুনামাকে সংহার করিলাম। তাহাতে কংসভয় নিবারিত হইল বটে, কিন্তু কিছুদিন পরেই জরাসন্ধ প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠিল। তখন আমরা জ্ঞাতিবন্ধুগণের সহিত একত্র হইয়া পরামর্শ করিলাম যে, যদি আমরা শত্রুনাশক মহাস্ত্রদ্বারা তিন শত বৎসর অবিশ্রামে জরাসন্ধের সৈন্য বধ করি, তথাপি নিঃশেষিত করিতে পারিব না। দেবতুল্য তেজস্বী মহাবল পরাক্রান্ত হংস ও ডিম্ভক নামক দুই বীর তাঁহার অনুগত আছে; উহারা অস্ত্রাঘাতে কদাচ নিহত হইবে না, আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, ঐ দুই বীর এবং জরাসন্ধ এই তিন জন একত্র হইলে ত্রিভুবন বিজয় করিতে পারে। হে ধর্মরাজ। এই পরামর্শ কেবল আমাদের অভিমত হইল, এমত নহে; অন্যান্য ভূপতিগণও উহাতে অনুমোদন করিবেন।

হংস নামে সুবিখ্যাত এক নরপতি ছিলেন। বলদেব তাঁহাকে সংগ্রামে সংহার করেন। ডিম্ভক লোকমুখে হংস মরিয়াছে, এই কথা শ্রবণ করিয়া নামসাদৃশ্যপ্রযুক্ত তাহার সহচর নিধনপ্রাপ্ত হইয়াছে বলিয়া স্থির করিল। পরে হংস বিনা আমার জীবন ধারণে প্রয়োজন নাই, এই বিবেচনা করত যমুনায় নিমগ্ন হইয়া প্রাণত্যাগ করিল। এ দিকে তৎসহচর হংসও পরম প্রণয়াস্পদ ডিম্ভককে আপন মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ শ্রবণে প্রাণত্যাগ করিয়াছে বলিয়া যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়া যমুনাজলে আত্মসমর্পণ করিল। জরাসন্ধ এই দুই বীরপুরুষের নিধনবার্তা শ্রবণে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত ও শূন্যমনাঃ হইয়া স্বনগরে প্রস্থান করিলেন। জরাসন্ধ বিমনা হইয়া স্বপুরে গমন করিলে পর আমরা পরমাহ্লাদে মথুরায় বাস করিতে লাগিলাম।

কিয়দ্দিনানন্তর পতিবিয়োগদুঃখিনী জরাসন্ধনন্দিনী স্বীয় পিতার সমীপে আগমনপূর্ব্বক "আমার পতিহস্তাকে সংহার কর” বলিয়া, বারংবার তাঁহাকে অনুরোধ করিতে লাগিলেন। আমরা পূর্ব্বেই জরাসন্ধের বলবিক্রমের বিষয় স্থির করিয়া-ছিলাম; এক্ষণে তাহা স্মরণ করিয়া সাতিশয় উৎকণ্ঠিত হইলাম। তখন আমরা আমাদের বিপুল ধনসম্পত্তি বিভাগ করত সকলে কিছু কিছু লইয়া প্রস্থান করিব, এই স্থির করিয়া স্বস্থান পরিত্যাগপূর্ব্বক পশ্চিমদিকে পলায়ন করিলাম। ঐ পশ্চিম-দেশে রৈবতোপশোভিত পরম রমণীয় কুশস্থলীনাম্নী পুরীতে * বাস করিতেছি। তথায় এরূপ দুর্গসংস্কার করিয়াছি যে, সেখানে থাকিয়া বৃষ্ণিবংশীয় মহারথগণের কথা দূরে থাকুক, স্ত্রীলোকেরাও অনায়াসে যুদ্ধ করিতে পারে। হে রাজন! এক্ষণে আমরা অকুতোভয়ে ঐ নগরীমধ্যে বাস করিতেছি। মাধবগণ সমস্ত মগধদেশব্যাপী এই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ রৈবতক পর্ব্বত দেখিয়া পরমাহ্লাদিত হইলেন। হে কুরুকুলপ্রদীপ! আমরা সামর্থ্যযুক্ত হইয়াও জরাসন্ধের উপদ্রবভয়ে পর্ব্বত আশ্রয় করিয়াছি। ঐ পৰ্ব্বত দৈর্ঘ্যে তিন যোজন, প্রস্থে এক যোজনেরও অধিক এবং একবিংশতি-শৃঙ্গযুক্ত। উহাতে এক এক যোজনের পর শত শত দ্বার এবং অত্যুৎকৃষ্ট উন্নত তোরণসকল আছে। যুদ্ধদুৰ্ম্মদ মহাবল পরাক্রান্ত ক্ষত্রিয়গণ উহাতে সর্ব্বদা বাস করিতেছেন। হে রাজন! আমাদের কুলে অষ্টাদশ সহস্র ভ্রাতা আছে। আহুকের এক শত পুত্র, তাঁহারা সকলেই অমরতুল্য; চারুদেষ্ণ ও তাহার ভ্রাতা, চক্রদেব, সাত্যকি, আমি, বলভদ্র, যুদ্ধবিশারদ শাম্ব, আমরা এই সাতজন রথী, কৃতবর্মা, অনাবৃষ্টি, সমীক, সমিতিঞ্জয়, কক্ষ, শঙ্কু ও কুন্তী এই সাতজন মহারথ এবং অন্ধক ভোজের দুই বৃদ্ধ পুত্র ও রাজা এই মহাবলপরাক্রান্ত দৃঢ় কলেবর দশ জন মহাবীর; ইঁহারা সকলেই জরাসন্ধাধিকৃত মধ্যম দেশ স্মরণ করিযা যদুবংশীয়দিগের সহিত মিলিত হইয়াছেন।

হে ভরতসত্তম! তুমি সম্রাটুল্য গুণশালী, অতএব তোমার সম্রাট্ হওয়া নিতান্ত আবশ্যক; কিন্তু আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, জরাসন্ধ জীবিত থাকিতে তুমি কখনই রাজসূয়ানুষ্ঠানে কৃতকার্য্য হইতে পারিবে না। সে বাহুবলে সমস্ত ভূপতিগণকে পরাজয় করিয়া সিংহ যেমন পর্ব্বত কন্দরমধ্যে করিগণকে বদ্ধ রাখে, সেইরূপে তাঁহাদিগকে গিরিদুর্গে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছে। ঐ দুরাত্মা রাজসূয় যজ্ঞার্থ প্রতিজ্ঞা করিয়া কঠোর তপোনুষ্ঠানদ্বারা দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রসন্ন করিয়া-ছিল। পরে সমস্ত ভূপতিগণকে পরাজয় করিয়া আপনার প্রতিজ্ঞা পরিপূর্ণ করিল। সে ক্রমে ক্রমে সমস্ত ভূপালগণকে পরাজয় করত আপনার পুরে আনয়নপূর্ব্বক বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। আমরা জরাসন্ধের ভয়ে ভীত হইয়া মথুরা পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্বারাবতী নগরীতে পলায়ন করিতেছি। হে মহারাজ! যদি আপনার রাজসূয় যজ্ঞ করিবার মানস থাকে, তবে অগ্রে জরাসন্ধকর্তৃক বদ্ধ ভূপালগণের মোচন ও দুরাত্মা জরাসন্ধের বধের নিমিত্ত যত্ন করুন; নচেৎ কোন ক্রমেই রাজসূয় সুসম্পন্ন করিতে পারিবেন না। হে কুরুনন্দন! আমার এই মত, এক্ষণে আপনি স্বয়ং বিবেচনা করিয়া যাহা উচিত হয়, বলুন।

জরাসন্ধ বধে ভীমের মত।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে ধীমন্! তুমি আমাকে যেরূপ পরামর্শ দিলে অন্য কেহই এরূপ পারে না; তোমার ন্যায় সংশয়চ্ছেদক ভূতলে আর কেহই নাই। এই ভূমণ্ডলের মধ্যে অনেকানেক রাজা আছেন; তাঁহারা কেবল আপনাদের প্রিয়কার্য্যই করিয়া থাকেন। তাঁহারা কেহই সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হয়েন নাই, সম্রাট্' শব্দ অতি কষ্টে প্রাপ্ত হওয়া যায়। যে ব্যক্তি পরের মর্য্যাদা জানে, সে কখন আত্মপ্রশংসা করে না। যেহেতু অন্যে যাঁহার প্রশংসা করে, তিনিই যথার্থ পূজ্য। পৃথ্বী অতি বিস্তৃত ও নানাবিধ মহারত্নে পরিপূর্ণ। হে বৃষ্ণিবংশাবতংস! লোকে অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে কখনই শ্রেয়োলাভ করিতে পারে না। আমার মতে মমতাই সর্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট; উহা অবলম্বন করিলেই মঙ্গল লাভ হয়, যুদ্ধাদি দ্বারা কোন ক্রমেই উৎকৃষ্ট ফললাভ করিতে পারে না। আমাদের কুলে সমুৎপন্ন এই সমস্ত মনস্বিগণেরও এই মত, বোধ হয় ইহাদের মধ্যে কেহই সৰ্ব্বজয়ী হইতে পারে না। হে মহাভাগ! জরাসন্ধের দৌরাত্ম্য দর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়াছি, কারণ আমি তোমারই বাহুবল আশ্রয় করিয়া আছি, যখন তুমিই সেই জরাসন্ধকে ভয় কর, তখন আমি কি করিয়া আপনাকে বলবান্ জ্ঞান করিব। তুমি, বলভদ্র, ভীমসেন ও অর্জুন, এই চারি জনের মধ্যে কোন ব্যক্তি তাহাকে বিনষ্ট করিতে পারেন কি না, আমি পুনঃ পুনঃ এই চিন্তাই করিতেছি; এক্ষণে তোমার যাহা ইচ্ছা, আমি তোমার মতা-নুসারেই সমস্ত কার্য্য করিয়া থাকি।

যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণানন্তর ভীমসেন কহিলেন, যে রাজা যুদ্ধচেষ্টাপরাজুখ এবং যে দুর্ব্বল ও উপায়শূন্য হইয়া বলীর সহিত যুদ্ধ করিতে যায়, ইহারা উভয়েই অবসন্ন হয়। যে ব্যক্তি দুর্ব্বল কিন্তু আলস্যশূন্য, সে সম্যক্ যুদ্ধাদি প্রয়োগদ্বারা বলবান্ শত্রুকে জয় করিতে পারে এবং নীতিদ্বারা আপনার হিতকর অর্থ লাভ করে। দেখ! কৃষ্ণে নীতি, আমাতে বল এবং অর্জুনে জয় নির্দ্ধারিত আছে, অতএব যেমন ত্রেতাগ্নি' যজ্ঞ সাধন করে, সেইরূপ আমরা তিন জনে একত্র হইয়া জরাসন্ধের বধ সাধন করিব।

জরাসন্ধ বধের মন্ত্রণা।

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে যুধিষ্ঠির! অজ্ঞ ব্যক্তিরা পরিণাম বিবেচনা না করিয়া কার্য্যারম্ভ করে, এই নিমিত্ত লোকে স্বার্থসাধন-তৎপর, অবিজ্ঞ শত্রুকে নিবারণ করে না। পূর্ব্বে মহারাজ যৌবনাশ্বি কর-পরিত্যাগ, ভগীরথ প্রজাপালন, কার্তবীর্য্য তপোবল, ভরত বাহুবল ও মরুৎ অর্থবলদ্বারা সম্রাট্ হইয়াছিলেন। দেখ, ইঁহারা এক এক গুণ থাকাতে সাম্রাজ্য লাভকরিয়া গিয়াছেন, কিন্তু এক তোমাতে সেই সমস্ত গুণ আছে। হে রাজন! সত্যযুগে পূর্ব্বোক্ত ঐ সমস্ত ভূপতিগণ সুসাধ্য মন্ত্রের অনুষ্ঠানদ্বারা ধর্ম, অর্থ ও নীতির সহিত সাম্রাজ্য লাভকরিয়াছেন। এক্ষণে বৃহদ্রথপুত্র জরাসন্ধ সম্রাট্ হইয়াছেন। ভূপতিগণের এক শত কূল তাহার কোন বিঘ্ন করিতে পারে না, এই নিমিত্ত সে বলপূর্ব্বক সাম্রাজ্য অধিকার করিতেছে। রত্নশালী ভূপতিগণ সতত তাহার উপাসনা করেন, কিন্তু সেই নীতিবিরুদ্ধাচারী অজ্ঞ নৃপাপসদ' তাহাতেও পরিতুষ্ট হয় নাই। সে মূদ্ধাভিষিক্ত ভূপতিগণকে বলপূর্ব্বক আয়ত্ত করিতেছে; তাঁহারাও স্বচ্ছন্দে তাহার বশীভূত হইতেছেন। হে ধৰ্ম্মাত্মন্। অপেক্ষাকৃত দুর্ব্বল রাজারা কি প্রকারে তাহার সহিত সংগ্রাম করিবেন? কিন্তু হে ভরতকুলপ্রদীপ! বলি প্রদানার্থে সমানীত ভূপতিগণ প্রোক্ষিত ও প্রমৃষ্ট হইয়া পশুদিগের ন্যায় পশুপতির গৃহে বাস করত অতি কষ্টে জীবন ধারণ করিতেছেন। দুরাত্মা জরাসন্ধ তাঁহাদিগকে অচিরাৎ ছেদন করিবে, এই নিমিত্তই আমি তাহার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে উপদেশ দিতেছি। ঐ দুরাত্মা ষড়শীতি জন ভূপতিকে আনয়ন করিয়াছে, কেবল চতুৰ্দ্দশ জনের অপ্রতুল আছে; ঐ চতুৰ্দ্দশ জন আনীত হইলেই ঐ নৃপাধম উহাদের সকলকে এককালে সংহার করিবে। হে ধর্মাত্মন্! এক্ষণে যে ব্যক্তি দুরাত্মা জরাসন্ধের ঐ ক্রুরকর্মে বিঘ্ন উৎপাদন করিতে পারিবেন, তাঁহার যশোরাশি ভূমণ্ডলে দেদীপ্যমান হইবে এবং যিনি উহাকে জয় করিতে পারিবেন, তিনি নিশ্চয়ই সাম্রাজ্য লাভ করিবেন।

শত্রুবধে অর্জুনের সঙ্কল্প।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে কৃষ্ণ! আমি সাম্রাজ্য লাভ করিবার আশয়ে কেবল সাহসমাত্র অবলম্বন পূর্ব্বক নিতান্ত স্বার্থপরায়ণের ন্যায় কি করিয়া তোমাদিগকে তথায় প্রেরণ করি? দেখ। ভীম ও অর্জুন আমার দুই চক্ষুঃস্বরূপ এবং তুমি মনঃস্বরূপ, অতএব আমি তোমাদের তিন জনকে তথায় প্রেরণ করত মনোহীন ও চক্ষুবিহীন হইয়া কিরূপে জীবন ধারণ করিব? বিশেষতঃ জরাসন্ধের মহাবল পরাক্রান্ত দুর্জয় সৈন্য-গণকে সংগ্রামে যমও পরাজয় করিতে পারেন না; তোমরা যুদ্ধ করিয়া তাহাদের কি করিতে পারিবে? হে জনার্দ্দন! যখন স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, একার্য্যে হস্তক্ষেপ করিলে অনর্থপাত হইবে, তখন আমার মতে এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হওয়া অনুচিত। এক্ষণে আমি যাহা বিবেচনা করিয়াছি, শ্রবণ কর। রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের অভিলাষ একবারে পরিত্যাগ করাই শ্রেয়ঃ; রাজসূয় সম্পন্ন করা নিতান্ত দুষ্কর বোধ হইতেছে।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অর্জুন পূর্ব্বে উৎকৃষ্ট ধনুঃ, অক্ষয় তুণীরদ্বয়, রথ ও ধ্বজ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি সভামধ্যে গমন করত যুধিষ্ঠিরকে কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! ধনুঃ, শস্ত্র, শর, বীর্য্য, স্বপক্ষ, কার্য্যনিশ্চয়, যশঃ ও বল, এই সকল অতি দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আমি এই সমস্ত প্রাপ্ত হইয়াছি। বিদ্বান্ ব্যক্তিরা প্রসিদ্ধবংশজাত লোকদিগকে প্রশংসা করিয়া থাকেন, কিন্তু আমার মতে যে ব্যক্তি বলবান্ ও উৎসাহশীল, তিনিই যথার্থ প্রশংসাপাত্র। দেখ। বীর্য্যবান্দিগের কুলে সমুৎপন্ন দুর্ব্বল ব্যক্তি কিছুই পারে না, কিন্তু নিৰ্ব্বীর্য্য কুলোদ্ভব বীর্য্যবান্ ব্যক্তি সম্ভ্রমাস্পদ হয়। যে শত্রুজয় দ্বারা বর্দ্ধিত হয়, সেই যথার্থ ক্ষত্রিয়।

বীর্য্যবান্ ব্যক্তি অন্যান্য সমস্ত গুণ বিবর্জিত হইলেও শত্রু জয় করিতে পারেন। নির্ব্বীর্য্য ব্যক্তি সর্ব্বগুণসম্পন্ন হইলেও তদ্দ্বারা কোন কার্য্যই সম্পন্ন হয় না। পরাক্রমশালী ব্যক্তিতে সমস্ত গুণ গুণীভূত হইয়া থাকে। অভিনিবেশ জয়ের হেতু, উহা কৰ্ম্ম ও দৈব এই উভয়ের আয়ত্ত। যে ব্যক্তি বলসংযুক্ত হইয়াও অনবধানতাবশতঃ কার্য্যকালে ঔদাসীন্য অবলম্বন করে, সে সসৈন্যে শত্রুকর্তৃক পরাজিত হয়, সন্দেহ নাই। বলবিহীন বিপক্ষপক্ষে দৈন্য অবলম্বন করা যেরূপ দোষাবহ, বলবান্ শত্রুর নিকট অনবহিত হওয়াও তদ্রূপ। অতএব যে রাজা জয়াভিলাষী, তাঁহাকে অবশ্যই উক্ত সাংঘাতিক হেতুদ্বয় পরিত্যাগ করিতে হইবে। দেখুন! যদি আমরা যজ্ঞ করিবার উপলক্ষ্যে জরাসন্ধকে বিনাশ ও অন্যান্য ভূপতিগণকে রক্ষা করি, তাহা হইলে তদপেক্ষা আর কি উৎকৃষ্ট কৰ্ম্ম হইতে পারে? যুদ্ধাদি-চেষ্টারহিত ব্যক্তিকে লোকে নির্গুণ জ্ঞান করে, তবে আপনি কি নিমিত্ত গুণপক্ষ অবলম্বন না করিয়া নির্গুণ হইবার বাসনা করিতেছেন? লোকে যাহাকে নির্গুণ বলিয়া বোধ করে, তাহার শম গুণ অবলম্বন ও কাযায় বসন পরিধানপূর্ব্বক বনে গমন করা শ্রেয়ঃ; অতএব আমরা তাহা না করিয়া সাম্রাজ্যলাভের নিমিত্ত শত্রুগণের সহিত সংগ্রাম করিব।

জরাসন্ধবধার্থ কৃষ্ণের প্রেরণা দান।

কৃষ্ণ কহিলেন, ভরতবংশে জাত ও কুন্তীর গর্তে সম্ভূত ব্যক্তির যেরূপ বুদ্ধি হওয়া উচিত, মহানুভব অর্জুনে তাহা সুস্পষ্ট লক্ষিত হইতেছে। যখন মৃত্যু দিবাভাগে কি রজনীযোগে হইবে, তাহার স্থির নাই এবং কোন ব্যক্তি যুদ্ধ না করাতে অমর হইয়াছে, ইহাও কখন শুনি নাই; অতএব বিধানানুসারে নীতিপূর্ব্বক শত্রুপক্ষ আক্রমণ করিয়া পরিতোষ লাভ করাই পুরুষের কার্য্য। যে ব্যক্তি নয়শালী ও অপায়রহিত, শত্রুকে আক্রমণ করা তাহার কর্তব্য; যুদ্ধে একের উৎকর্ষ ও অন্যের অপকর্ষ অবশ্যই হয়, দুই জনের সাম্য কদাচ হয় না। আর যে ব্যক্তি নয়হীন ও উপায়হীন, সংগ্রামে অবশ্যই তাহার ক্ষয় হয়। কিন্তু উভয় পক্ষ সমপরাক্রমশালী হইলে কাহারও জয়লাভের সম্ভাবনা নাই। অতএব আমরা নীতিমার্গানুসারে স্বীয় রঞ্জ আবরণপূর্ব্বক শত্রুকে রন্ধ্রে আক্রমণ করিলে কি নিমিত্ত জয়লাভে কৃতকাৰ্য্য না হইব? বুদ্ধিমান্ নীতিজ্ঞেরা কহেন যে, যে শত্রু বহু সৈন্যের অধীশ্বর এবং বলবান, তাহার সহিত যুদ্ধ করা অনুচিত; ইহা আমার অভিপ্রেত। আমরা গোপনে শত্রুগৃহে প্রবেশপূর্ব্বক তাহাকে আক্রমণ করত আপনাদের কার্য্য সাধন করি। দুরাত্মা জরাসন্ধ সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইয়া একাকী রাজ্যলক্ষ্মী ভোগ করিতেছে; আমি তাহাকে নিধন করিতে লক্ষ্য করিয়াছি। যদিও আমরা সেই দুরাত্মাকে যুদ্ধে সংহার করিয়া তাহার অন্যান্য স্বপক্ষগণকর্তৃক নিহত হই, তাহা হইলেও তৎকর্তৃক কারাগারে অবরুদ্ধ জ্ঞাতিগণের পরিত্রাণনিবন্ধন স্বর্গলাভ করিতে পারিব।

যুধিষ্ঠিরের জরাসন্ধ সম্পর্কিত প্রশ্ন।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে কৃষ্ণ! জরাসন্ধ কে? তাহার বীর্য্য ও পরাক্রম কি প্রকার? যে দুরাত্মা তোমার অনিষ্টাচরণ করিয়াও প্রজ্বলিত হুতাশনস্পর্শী পতঙ্গের ন্যায় বিনষ্ট হয় নাই?

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে রাজন! জরাসন্ধের যেরূপ বীর্য্য ও পরাক্রম এবং যে নিমিত্ত সে অনেকবার আমার বিপ্রিয়াচরণ করিলেও তাহাকে উপেক্ষা করিয়াছি, তৎসমুদায় শ্রবণ কর। পূর্ব্বে তিন অক্ষৌহিণীর অধীশ্বর, সমরদর্পিত, রূপবান, ধনসম্পন্ন, অতুল বলবিক্রমশালী, নিত্যদীক্ষিত, পুরন্দরসদৃশ, বৃহদ্রথনামা ভূপতি মগধদেশে আধিপত্য করিতেন। ঐ ভূপাল তেজে সূর্য্যের ন্যায়, ক্ষমায় পৃথিবীর ন্যায়, ক্রোধে কালান্তক যমের ন্যায় ও ঐশ্বর্য্যে কুবেরের ন্যায় ছিলেন, ইহার গুণগ্রাম সূর্যকিরণের ন্যায় মহীমণ্ডলে ব্যাপ্ত হইয়াছিল। ঐ মহাবল-পরাক্রান্ত ভূপতি কাশি রাজের দুই পরম রূপবতী যমজ কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। রাজা "আমি তোমাদের উভয়ের প্রতি সমান অনুরক্ত থাকিব" বলিয়া, সেই পত্নীদ্বয়ের নিকট নিয়ম করিলেন। ভূপতি সেই আত্মানুরূপ প্রণয়িনীদ্বয়ের মধ্যবর্তী হইয়া করেণু তদ্বয় মধ্যবর্তী করিরাজের ন্যায় এবং গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী মূর্তিমান্ সাগরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তিনি বিষয়-রসে নিমগ্ন হইয়া যৌবনকাল অতিবাহিত করিলেন। কিন্তু বংশকর পুত্রের মুখাবলোকন করিতে পারিলেন না। পুত্রকামনায় হোম যজ্ঞ প্রভৃতি বহুবিধ মঙ্গল কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলেন, কিন্তু কিছুতেই পুত্রলাভ হইল না।

জরাসন্ধোৎপত্তি।

তিনি একদা শ্রবণ করিলেন, মহাত্মা কাক্ষীবান্ গৌতমের পুত্র উদারস্বভাব ভগবান্ চণ্ডকৌশিক তপস্যায় পরিশ্রান্ত হইয়া যদৃচ্ছাক্রমে আগমন করত এক বৃক্ষমূলে অবস্থিতি করিতেছেন। তখন পত্নীদ্বয় সমভিব্যাহারে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া বিবিধ রত্ন প্রদানদ্বারা তাঁহাকে পরিতুষ্ট করিলেন। সত্যধৃতি, সত্যবাক্, ঋষিসত্তম চণ্ডকৌশিক তাঁহার ভক্তিভাবে বশীভূত হইয়া কহিলেন, হে রাজেন্দ্র! আমি তোমার আস্থা দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে বর প্রার্থনা কর। তখন মহারাজ বৃহদ্রথ ভার্য্যাদ্বয়-সমভিব্যাহারে মহর্ষিকে প্রণাম করিয়া বাষ্পাকুল-লোচনে গদ্গদ বচনে কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি নিঃসন্তান, নিতান্ত হতভাগ্য, রাজ্যপরিত্যাগপূর্ব্বক তপোবনে আগমন করিয়াছি। এখন আর আমার বর লইবার আবশ্যকতা কি?

মহর্ষি, রাজা বৃহদ্রথের সেইরূপ কাতরোক্তি শ্রবণে অনুকম্পা পরবশ হইয়া সেই আম্রতলে উপবেশনপূর্ব্বক ধ্যান করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে অক্ষত এক সরস আম্রফল বৃক্ষ হইতে অকস্মাৎ তাঁহার ক্রোড়দেশে পতিত হইল। মহর্ষি পুত্রোৎপত্তির নিমিত্তভূত সেই পরম রমণীয় আম্রফলটি গ্রহণপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ মনে মনে বিবেচনা করিয়া রাজাকে প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, মহারাজ! তুমি স্বভবনে গমন কর, তোমার মনোরথ পূর্ণ হইয়াছে; অচিরাৎ পুত্রমুখ অবলোকন করিবে।

রাজা বৃহদ্রথ মহর্ষির বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহার পাদবন্দন-পূর্ব্বক পত্নীদ্বয় সমভিব্যাহারে স্বভবনে গমন করিলেন এবং শুভক্ষণে সেই আম্রফলটি দুই সহধর্মিণীকে ভোজন করিতে দিলেন। তাঁহারা সেই ফলটি দুই খণ্ডে বিভক্ত করিয়া পরস্পর এক এক খণ্ড ভক্ষণ করিলেন। ফল ভক্ষণানন্তর কার্য্যের অবশ্যম্ভাবিতা ও মহর্ষির সত্যবাদিতা প্রভাবে তাঁহারা উভয়েই গর্ন্তবর্তী হইলেন। নৃপতি তদ্দর্শনে যৎপরোনাস্তি পরিতুষ্ট হইলেন।

অনন্তর যথাকালে প্রসব সময় উপস্থিত হইলে তাঁহারা উভয়ে একচক্ষুঃ, একবাহু, একচরণ, অর্দ্ধোদর, অর্দ্ধমুখ ও অর্দ্ধস্ফিক্ট বিশিষ্ট এক এক দেহার্দ্ধমাত্র প্রসব করিলেন। রাজপত্নীরা সেই সজীব অর্দ্ধকলেবরদ্বয় দর্শনে ভয়ে কম্পিত-কলেবর ও যৎপরোনাস্তি উদ্বিগ্ন হইয়া পরস্পর মন্ত্রণা করত ধাত্রীদিগকে উহা পরিত্যাগ করিতে আদেশ করিলেন। ধাত্রীরা তাঁহাদের নির্দেশানুসারে সেই সদ্যঃপ্রসূত অর্দ্ধকলেবরদ্বয় সুসংবৃত করত অন্তঃপুর হইতে বহির্গমনপূর্ব্বক এক চতুষ্পথে নিক্ষেপ করিয়া আসিল।

অনন্তর মাংসশোণিতলোলুপা জরা নাম্নী এক রাক্ষসী সেই অর্দ্ধকলেবরদ্বয় গ্রহণ করিল। ভবিতব্যতার কি অনির্বচনীয় মহিমা। রাক্ষসী ঐ দুই দেহার্দ্ধ সুবাহ্য করিবার নিমিত্ত যেমন সংযোজিত করিল, অমনি উহা একত্র হইয়া এক মহাবল পরাক্রান্ত কুমার হইল। নিশাচরী তদ্দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন এবং সেই বজ্রতুল্য দৃঢ়কলেবর শিশুকে বহন করিতে অসমর্থ হইল। বালক বদনে তাম্রবর্ণ মুষ্টি প্রদানপূর্ব্বক সজল জলধরের ন্যায় গভীরস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিল।

অন্তঃপুরবাসিগণ সেই আকস্মিক গভীর ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করিয়া আস্তে ব্যস্তে রাজার সহিত বহির্গত হইল। দুগ্ধপূর্ণ স্তনভারাবনতা পরিম্লানবদনা সেই রাজমহিষীও পুত্র লাভে হতাশ হইয়া সহসা তথায় গমন করিলেন। রাক্ষসী রাজ্ঞীদ্বয়কে তদবস্থাপন্ন, রাজাকে পুত্রাভিলাষী ও বালককে সাতিশয় বলবান্ দেখিয়া চিন্তা করিল, আমি এই রাজার অধিকারে বাস করি; রাজা একান্ত সন্তানাভিলাষী, ইনি পরম ধার্মিক ও মহাত্মা, অতএব ইঁহার এই শিশু সন্তানটি বিনষ্ট করা নিতান্ত অনুচিত। মনে মনে এই প্রকার চিন্তা করিয়া মনুষ্য কলেবর ধারণপূর্ব্বক সেই শিশুকে লইয়া রাজার সমীপে গমন করত কহিল, হে বৃহদ্রথ। এই বালকটি তোমার পুত্র; আমি ইহাকে তোমায় প্রদান করিলাম, গ্রহণ কর। এ, ব্রাহ্মণের বরপ্রভাবে তোমার পত্নীদ্বয়ের গর্বে জন্মিয়াছে। ধাত্রীরা ইহাকে পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছিল। আমি ইহাকে রক্ষা করিয়াছি। তখন রাজমহিষীদ্বয় আনন্দিতচিত্তে সেই বালককে গ্রহণ করিয়া স্তনদুগ্ধদ্বারা অভিষিক্ত করিলেন। রাজা পুত্র লাভে পরম পরিতুষ্ট হইয়া সেই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী মানুষীবেশধারিণী রাক্ষসীকে জিজ্ঞাসিলেন, হে শুভে। তুমি আমাকে পুত্র প্রদান করিলে এক্ষণে পরিচয় প্রদান কর, তুমি কে? আমি তোমাকে দেবতার ন্যায় বোধ করিতেছি।

জরাকর্তৃক সন্ধিত- জরাসন্ধ।

রাক্ষসী কহিল, মহারাজ। তোমার মঙ্গল হউক; আমি কামরূপা রাক্ষসী! আমার নাম জরা। আমি প্রতিদিন লোকের গৃহে গৃহে বাস করি। ভগবান্ ব্রহ্মা আমাকে নির্মাণ করিয়া গৃহদেবী নাম প্রদান করিয়াছেন। আমি দানবগণের বিনাশ-নিমিত্ত স্থাপিত হইয়াছি। যে ব্যক্তি নবযৌবনসম্পন্না সপুত্রা মদীয় প্রতিমূর্তি গৃহভিত্তিতে লিখিয়া রাখিবে, তাহার গৃহ সতত ধনধান্য, পুত্র, কলত্রাদিতে পরিপূর্ণ থাকিবে। তাহা না করিলে অবশ্যই তাহার অমঙ্গল ঘটিবে। তোমার গৃহে বহুপুত্রসমাবৃত মদীয় প্রতিমূর্তি চিত্রিত আছে এবং আমি গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদি দ্বারা সর্ব্বদা পূজিত হইয়া থাকি। হে রাজন! এইরূপে তোমার গৃহে বাস করত সর্ব্বদা ভক্তিসহকারে পূজিত হই বলিয়া আমি নিরন্তর চিন্তা করি, কিরূপে তোমার প্রত্যুপকার করিব? অদ্য দৈববশাৎ তোমার পুত্রের দেহার্দ্ধদ্বয় দেখিতে পাইলাম। উহা গ্রহণপূর্ব্বক যেমন একত্র করিলাম, অমনি উহা এক নবকুমার হইল। হে নরনাথ! এই আশ্চর্য্য ঘটনা তোমারই ভাগ্যক্রমে হইয়াছে, আমি উপলক্ষ্যমাত্র। হে রাজন! আমি রাক্ষসী, সুমেরুও ভক্ষণ করিতে পারি; তোমার শিশুপুত্র ত অনায়াসেই ভক্ষণ করিতে পারিতাম, কেবল তোমার গৃহে সতত পূজিত হই বলিয়াই তোমাকে তোমার পুত্র প্রদান করিলাম।

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, রাক্ষসী রাজাকে এই কথা বলিয়া অন্তর্হিত হইল। রাজা বৃহদ্রথ পুত্র লইয়া পরমানন্দে গৃহে গমন করিয়া সেই বালকের জাতকৰ্ম্মাদি সম্পাদন করিলেন, পরে মগধরাজ্যে জরা রাক্ষসীর উদ্দেশে মহোৎসব করিতে আজ্ঞা দিলেন। তৎপরে সেই পিতামহসদৃশ রাজা বৃহদ্রথ স্বীয়পুত্র জরারাক্ষসী কর্তৃক সন্ধিত অর্থাৎ সংযোজিত হইয়াছে বলিয়া তাহার নাম জরাসন্ধ রাখিলেন। জরাসন্ধ স্বীয় পিতা বৃহদ্রথের নিকেতনে হুত হুতাশনের ন্যায়, শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায়, দিন দিন বর্দ্ধিত ও বলসম্পন্ন হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে তদীয় পিতা মাতার আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না।

জরাসন্ধের প্রতি কৌশিকের আশীর্ব্বাদ।

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে রাজন। কিয়ৎকাল পরে ভগবান্ চণ্ডকৌশিক মগধদেশে পুনর্ব্বার আগমন করিলেন। মহারাজ বৃহদ্রথ তাঁহার আগমনে যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়া অমাত্য, ভৃত্যবর্গ, ভার্য্যাদ্বয় ও পুত্র সমভিব্যাহারে তাঁহার সমীপে আগমনপূর্ব্বক পাদ্য, অর্ঘ্য ও আচমনীয়দ্বারা তাঁহাকে পূজা এবং পুত্র ও রাজ্য তৎসমীপে নিবেদন করিলেন। মহর্ষি, মহারাজের পূজা গ্রহণানন্তর হৃষ্টচিত্তে তাঁহাকে কহিলেন, রাজন! আমি দিব্য চক্ষুঃ দ্বারা এই সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছি, এক্ষণে তোমার এই পুত্র যেরূপ সৌভাগ্যশালী হইবে তাহা কহিতেছি, শ্রবণ কর। তোমার এই কুমার রূপবান, সত্ত্বশালী, বলবিক্রমসম্পন্ন ও অতুল ঐশ্বর্য্যাধিকারী হইবে, সন্দেহ নাই।

যেমন অন্যান্য পক্ষিগণ উড্ডীন বিহঙ্গমরাজ গরুড়ের অনুগমন করিতে পারে না, সেইরূপ কোন ভূপতিই কুমারের তুল্য বলশালী হইতে পারিবে না। যে ব্যক্তি ইহার শত্রু হইবে, তাহার অবশ্যই মৃত্যু হইবে। যেমন নদীতরঙ্গে পর্ব্বতের কিছুই অপকার হয় না, সেইরূপ দেবগণের অস্ত্রাঘাতেও ইহার কিছুমাত্র ব্যথা হইবে না। এ, সমস্ত ক্ষত্রিয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইবে। যেমন সূর্য্য অন্যান্য জ্যোতিঃপদার্থগণের প্রভা হ্রাস করেন, সেইরূপ এই কুমার সকলের তেজঃ বিনষ্টপ্রায় করিবে। যেমন পতঙ্গসকল অগ্নিতে বিনষ্ট হয়, সেইরূপ ধনবাহনসম্পন্ন সমৃদ্ধ ভূপতিগণ যুদ্ধে ইহার হস্তে প্রাণত্যাগ করিবে। যেমন বর্ষাকালে সমুদ্র অগাধ জলসম্পন্না নদীসকলকে গ্রহণ করে, সেইরূপ এ সমুদায় ভূপতিগণের ঐশ্বর্য্য গ্রহণ করিবে। যেমন সর্ব্বশস্যধরা বসুন্ধরা কি মহৎ, কি নীচ, সকলকেই ধারণ করেন, সেইরূপ এ, চারিবর্ণ পালন করিবে। প্রাণিগণ যেমন সমস্ত জগতের আত্মভূত বায়ুর বশীভূত, সেইরূপ ইহারও বশীভূত হইবে। এই কুমার ত্রিপুরান্তকারী দেবাদিদেব মহাদেবকে সাক্ষাৎ দেখিবে। ভগবান্ চণ্ডকৌশিক মহারাজ বৃহদ্রথকে এই কথা বলিয়া স্বীয় কর্ত্তব্য কার্য্যের অনুরোধে তাঁহাকে বিদায় দিলেন।

মগধাধিপতি নগরে প্রবেশপূর্ব্বক জ্ঞাতিবান্ধব সমভি-ব্যাহারে জরাসন্ধকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া যৎপরোনাস্তি পরিতুষ্ট হইলেন এবং তাহার হস্তে সমস্ত রাজ্যভার সমর্পণ-পূর্ব্বক পত্নীদ্বয় সমভিব্যাহারে তপোবনে প্রস্থান করিলেন। তাঁহারা তপোবনে গমন করিলে জরাসন্ধ স্বীয় ভুজবীর্য্য প্রভাবে ভূপতিগণকে বশীভূত করিলেন।

জরাসন্ধের স্বীয় রাজ্যশাসন এবং শ্রীকৃষ্ণের সহিত শত্রুতা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, নরপতি বৃহদ্রথ ভার্য্যাদ্বয় সমভি-ব্যাহারে তপোবনে বহুদিবস তপোনুষ্ঠান করিয়া স্বর্গে গমন করিলেন। তাঁহার পুত্র জরাসন্ধও চণ্ডকৌশিকোক্ত সমুদায় বর লাভ করিয়া নিষ্কণ্টকে রাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে ভগবান্ বাসুদেব, কংস নরপতিকে সংহার করেন। কংসনিপাত-নিবন্ধন কৃষ্ণের সহিত জরাসন্ধের ঘোরতর শত্রুতা জন্মিল। মহাবল পরাক্রান্ত জরাসন্ধ গিরিশ্রেণীমধ্যে থাকিয়া কৃষ্ণের বধার্থে এক বৃহৎ গদা একোনশতবার ঘূর্ণিত করিয়া নিক্ষেপ করিল। গদা মথুরাস্থিত অদ্ভুতকৰ্ম্মা বাসুদেবের একোনশত যোজন অন্তরে পতিত হইল। পৌরগণ কৃষ্ণসমীপে গদাপতনের বিষয় নিবেদন করিল। তদবধি সেই মথুরার সমীপবর্তী স্থান গদাবসান নামে বিখ্যাত হইল। হংস ও ডিম্ভক নামে দুই মহাবল পরাক্রান্ত বীর পুরুষ, জরাসন্ধের সহায় ছিল। উহারা নীতিশাস্ত্র পারদর্শী, মন্ত্রণাপ্রদানে সুনিপুণ, বুদ্ধিমান্ ও শস্ত্রাঘাতে অবধ্য ছিল। আমি ইতিপূর্ব্বেই কহিয়াছি; উহারা দুই জন এবং জরাসন্ধ এই তিন জন একত্র হইলে ত্রিভুবন জয় করিতে পারে। হে মহারাজ! এইরূপে কুকুর, অন্ধক ও বৃষ্ণিগণ "দুর্ব্বল ব্যক্তি বলবানের সহিত স্পর্দ্ধা করিবে না” এই নীতিবাক্যের অনুসরণ ক্রমে মহাবীর জরাসন্ধকে তৎকালে উপেক্ষা করিয়াছিলেন।

রাজসূয়ারম্ভ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


সভাপর্ব

জরাসন্ধবধ পর্ব্বাধ্যায়।

ভীমার্জুন-সমভিব্যাহারে শ্রীকৃষ্ণের মগধরাজ্যে গমন।

বাসুদেব কহিলেন, হে যুধিষ্ঠির। হংস ও ডিম্ভক নিহত হইয়াছে। কংসও সগণে মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইয়াছে। এক্ষণে জরাসন্ধের সময় সমুপস্থিত। সমস্ত সুরাসুর একত্র হইলেও যুদ্ধে জরাসন্ধকে পরাজয় করিতে পারে না, অতএব আমার মতে উহাকে প্রাণযুদ্ধে জয় করা উচিত। দেখ! আমি নীতিজ্ঞ, ভীমসেন বলবান্ এবং অর্জুন আমাদের রক্ষিতা, অতএব যেমন তিন অগ্নি একত্র হইয়া যজ্ঞ সম্পন্ন করেন, সেইরূপ আমরা তিন জন একত্র হইয়া জরাসন্ধের বধ সাধন করিব। আমরা তিন জন নির্জনে আক্রমণ করিলে জরাসন্ধ অবশ্যই এক জনের সহিত সংগ্রাম করিবে। সে অবমাননা, লোভ ও বাহুবীর্য্যে উত্তেজিত হইয়া ভীমের সহিত যুদ্ধ করিবে, সন্দেহ নাই। যম যেমন উদ্ধত লোকের বিনাশে সমর্থ, সেইরূপ মহাবল পরাক্রান্ত মহাবাহু ভীমসেন বৃহদ্রথতনয়কে সংহার করিতে পারিবেন। অতএব যদি তুমি আমার হৃদয়জ্ঞ হও এবং যদি আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস থাকে, তবে শীঘ্র ভীম ও অর্জুনকে ন্যাসস্বরূপ আমার হস্তে সমর্পণ কর।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভগবান্ কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর প্রফুল্লমুখে উপবিষ্ট ভীম ও অর্জুনের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া কৃষ্ণকে কহিলেন, হে অরাতিনিসূদন মধুসূদন। তুমি আর ওরূপ কহিও না। তুমি পাণ্ডবগণের অধিপতি, আমরা তোমারই আশ্রিত। তুমি যাহা যাহা কহিলে, তৎসমুদায়ই যুক্তিসিদ্ধ বটে, লক্ষ্মী যাহাদের প্রতি প্রতিকূলা, তুমি কখনই তাহাদের নিকট থাক না। যখন আমি তোমার নির্দেশানুবর্তী রহিয়াছি, তখন আমার জরাসন্ধকে বধ করিবার, বদ্ধ ভূপতিদিগকে কারাগার হইতে মুক্ত করিবার এবং রাজসূয় যজ্ঞ সুসম্পন্ন করিবার আর অপেক্ষা কি আছে? অতএব হে নরোত্তম! এক্ষণে যাহাতে এই সমুদায় কার্য্য ত্বরায় সম্পন্ন হয়, অপ্রমত্তচিত্তে তাহাই কর। আমি তোমাদের তিন জন ব্যতিরেকে ধর্মার্থ কামরহিত ও রোগার্তের ন্যায় দুঃখিত হইয়া জীবন ধারণ করিতে নিতান্ত অসমর্থ, অর্জুন তোমা বিনা জীবন ধারণ করিতে পারে না, তুমিও অর্জুন ব্যতীত ক্ষণকাল থাকিতে পার না। এই ভূমণ্ডলে তোমাদের দুই জনের অজেয় কেহই নাই। আর এই মহাবীর্য্য-সম্পন্ন শ্রীমান বৃকোদর তোমাদের দুই জনের সমভিব্যাহারে থাকিলে কি না সম্পন্ন করিতে পারে? সৈন্য সুশিক্ষিত হইলে উত্তমরূপে যুদ্ধকার্য্য সমাধা করে, অশিক্ষিত সৈন্যেরা অকর্মণ্য হয়, তন্নিমিত্ত উহাদিগকে উত্তমরূপে শিক্ষা প্রদান করা বিচক্ষণ ব্যক্তিগণের কর্তব্য। যেমন ধীবরগণ যে স্থানে ছিদ্র থাকে, সেই স্থান দিয়া অভিলষিত স্থানে জল লইয়া যায়, তদ্রূপ বুদ্ধিমান ব্যক্তি উপদ্রবশূন্য প্রদেশেই জড় সৈন্য লইয়া গমন করেন; মহাবীরের নিকট কদাচ লইয়া যান না। অতএব আমরা নীতি-বিধানজ্ঞ লোকবিশ্রুত গোবিন্দকে আশ্রয় করিয়া কার্যসিদ্ধি-বিষয়ে যত্ন করিতেছি, হে যদুবংশাবতংস! তুমি প্রজ্ঞা, নীতি, এ বল, ক্রিয়া ও উপায়সম্পন্ন, অতএব ভীম ও অর্জুন কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত তোমাকেই অগ্রসর করিবে। এইরূপে আমাদের কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত অর্জুন তোমার অনুগমন করুক এবং ভীমও অর্জুনের অনুগমন করুক; তাহা হইলেই বিক্রম, নীতি, জয় ও বল সিদ্ধ হইবে, সন্দেহ নাই।

জরাসন্ধ বধনার্থে ভীমাদির যাত্রা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, বিপুলতেজাঃ বাসুদেব যুধিষ্ঠিরের এই বাক্য শ্রবণানন্তর ভীমার্জুন সমভিব্যাহারে তেজস্বী স্নাতক ব্রাহ্মণগণের পরিচ্ছদ পরিধানপূর্ব্বক মগধদেশে যাত্রা করিলেন। সুহৃদ্গণ মনোহরবাক্যদ্বারা তাঁহাদিগকে অভিনন্দন করিতে লাগিলেন। ক্রোধে অভিতপ্ত জ্ঞাতিবর্গের হিতসাধনে একান্ত উৎসুক এবং চন্দ্র, সূর্য্য ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী সেই তিন জনের কলেবর তৎকালে অধিকতর প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। অগ্রে ভীমসেন, তৎপশ্চাৎ সংগ্রামে বিজিত ধর্মার্থকাম প্রবর্ত্তীয়তা মহাত্মা শ্রীকৃষ্ণ, তদনন্তর অর্জুন গমন করিতেছেন দেখিয়া সকলেই মনে করিল, এইবার জরাসন্ধ নিশ্চয় নিহত হইবে। তখন কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন কুরুদেশে উত্তীর্ণ হইয়া কুরু-জাঙ্গলের মধ্য দিয়া রমণীয় পদ্মসরে গমন করিলেন। তৎপরে কালকূট অতিক্রম করিয়া গণ্ডকী, মহাশোণ, সধানীরা এবং একপর্ব্বতকে' স্থিত নদীসমুদায় ক্রমে ক্রমে উত্তীর্ণ হইলেন। তদনন্তর রমণীয় সরযূ অতিক্রম করিয়া পূর্ব্ব কোশলা দেখিতে পাইলেন। তথা হইতে মিথিলা ও মিথিলা হইতে মালায় গমনপূর্ব্বক চৰ্ম্মন্বতী নদী পার হইলেন। তৎপরে গঙ্গা ও শোণ অতিক্রম করত তিন জনে পূর্ব্বমুখে মগধদেশে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কিয়ৎক্ষণপরে গোধনসমাকীর্ণ হ্রদতড়াগাদি-যুক্ত নানাবিধ বৃক্ষে আবৃত গোরথ পর্ব্বতে আরোহণ করিয়া মগধপুর দেখিতে পাইলেন।

ছদ্মবেশে কৃষ্ণসহ ভীমাদির মগধপুরে প্রবেশ।

বাসুদেব কহিলেন, হে পার্থ! ঐ দেখ! বিবিধ পশুসমাকীর্ণ বাপীতড়াগাদিযুক্ত সুরম্য হ্যে অলঙ্কৃত উপদ্রবশূন্য মগধরাজ্য শোভা পাইতেছে। ঐ দেখ! বৈহার, বরাহ, বৃষভ, ঋষিগিরি ও চৈত্যক নামে পাঁচটি পর্ব্বত রহিয়াছে! এই শীতল দ্রুমসুশোভিত, উন্নতশিখর পর্ব্বতসকল পরস্পর মিলিত হইয়া যেন গিরিব্রজ রক্ষা করিতেছে। সুপুষ্পিত শাখাসমুদায় সুশোভিত সুগন্ধযুক্ত কামিজনপ্রিয়, মনোহর লোধবনরাজি উহাদিগকে যেন গোপন করিয়া রাখিয়াছে। এই স্থানে শংসিতব্রত মহাত্মা গৌতম ঋষি ক্ষত্রিয়দিগের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশপূর্ব্বক কাক্ষীব প্রভৃতি পুত্রগণকে উৎপাদন করেন। হে অর্জুন! এই নিমিত্ত পূর্ব্বে অঙ্গ, বঙ্গ প্রভৃতি মহাবল পরাক্রান্ত মহীপতিগণ গৌতমের আশ্রমে আসিয়া মহোৎসব করিতেন। ঐ দেখ! গৌতমের আশ্রমসমীপে পরম রমণীয় অশ্বত্থ ও লোধবনরাজি জন্মিয়াছে। ঐ দেখ! অর্বুদ পৰ্ব্বত, শত্রুবাপী ও প্রকাণ্ড পন্নগদ্বয় রহিয়াছে। ঐ স্থানে স্বাস্তিক ও মণিনাগের আলয়। মনু মগধরাজ্য মেঘের অপরিহার্য্য করিয়া গিয়াছেন এবং চণ্ডকৌশিক ও মণিমান্ জরাসন্ধকে যথেষ্ট অনুগ্রহ করিয়াছেন। দুরাত্মা জরাসন্ধ এইরূপে ঐ দুরাক্রম্য পুরের অধীশ্বর হইয়া আপনার কার্যসিদ্ধি বিষয়ে স্থিরনিশ্চয় হইয়াছে। আমরা অদ্য তাহার দর্পচূর্ণ করিব।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর বিপুলতেজাঃ কৃষ্ণ মহাবল পরাক্রান্ত ভীমার্জুন সমভিব্যাহারে মগধপুরে গমন করিলেন এবং হৃষ্টপুষ্টজন ও বর্ণচতুষ্টয় সমাকীর্ণ মহোৎসবময় নিতান্ত দুরাক্রম্য গিরিব্রজে সমুপস্থিত হইলেন। তৎপরে দ্বারদেশে গমন করিয়া বৃহদ্রথবংশীয় জনসমুদায় ও অন্যান্য নগরবাসিগণ কর্তৃক পূজ্যমান মগধরাজ্যের শোভাসম্পাদক নগরচৈত্যের সমীপে দ্রুতবেগে গমন করিলেন। মহারাজ বৃহদ্রথ মাংসাশী বৃষরূপধারী দৈত্যকে সংহার করিয়া তাহার চৰ্ম্মদ্বারা তিনটি ভেরী প্রস্তুত করেন; ঐ ভেরীত্রয়ে একবার আঘাত করিলে এক মাসব্যাপী গম্ভীর ধ্বনি হইত। মহারাজ বৃহদ্রথ আপনার পুরে ঐ তিন ভেরী রাখিয়াছিলেন। ভেরীসকল দ্রব্য পুষ্পে সমাকীর্ণ হইয়া ধ্বনিত হইত। কৃষ্ণসমবেত ভীম ও অর্জুন ঐ ভেরীত্রয় ভগ্ন করিলেন এবং নানাপ্রকার অস্ত্র ধারণ করিয়া দ্বারদেশ হইতে যেন জরাসন্ধের মস্তকে আঘাত করিতে করিতেই দ্রুতবেগে চৈত্যপ্রাকারের নিকট গমনপূর্ব্বক সুদৃঢ় বাহুদ্বারা সতত গন্ধমাল্যে অর্চ্চিত, সুপ্রতিষ্ঠিত পুরাতন চৈত্যশৃঙ্গ ভগ্ন ও নিপাতিত করত হৃষ্টচিত্তে মগধপুরে প্রবেশ করিলেন।

এই সময়ে বেদপারগ ব্রাহ্মণগণ দুর্নিমিত্ত দর্শন করিয়া জরাসন্ধকে জানাইলেন। পুরোহিতগণ তাঁহাকে হস্তিপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া অগ্নি প্রদক্ষিণ করাইলেন। প্রতাপশালী রাজা জরাসন্ধ সেই দুর্নিমিত্তশান্তির নিমিত্ত দীক্ষিত ও নিয়মস্থ হইয়া উপবাস করিয়া রহিলেন। এ দিকে স্নাতকবেশধারী কৃষ্ণ, ভীম ও ধনঞ্জয় সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক জরাসন্ধের সহিত বাহুযুদ্ধ করিবার মানসে পুরপ্রবেশ করিলেন। তাঁহারা রাজমার্গে গমন করিতে করিতে নানাবিধ ভক্ষদ্রব্য, মাল্য, আপণ' ও অন্যান্য সমৃদ্ধি নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। মালাকারদিগের নিকট হইতে বলপূর্ব্বক মাল্য গ্রহণ করিলেন। সেই দিব্য মাল্য, দিব্য কুণ্ডলধারী কৃষ্ণ, ভীম ও ধনঞ্জয়, যেমন সিংহ গোনিবাস নিরীক্ষণ করিতে করিতে গমন করে, তদ্রূপ জরাসন্ধের নিকেতন লক্ষ্য করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। তৎকালে চন্দনাগুরুচর্চ্চিত সেই বীর-ত্রয়ের বাহু শালস্তম্ভের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। মগধপুরবাসী জনগণ উদ্যত শালস্কন্ধের ন্যায় ও মদমত্ত কুঞ্জরের ন্যায় সেই তিন জনকে দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। তাঁহারা ক্রমে ক্রমে বহুজনাকীর্ণ তিন কক্ষা অতিক্রম করিয়া অহঙ্কার প্রকাশপূর্ব্বক জরাসন্ধের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন।

জরাসন্ধের সন্দেহ।

মহারাজ জরাসন্ধ তাঁহাদিগকে দর্শন করিবামাত্র গাত্রোত্থানপূর্ব্বক পাদ্য, মধুপর্ক প্রভৃতি দ্বারা পূজা করিয়া স্বাগতপ্রশ্ন করিলেন। ভীম ও ধনঞ্জয় তৎকালে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন ধীমান্ কৃষ্ণ কহিলেন, হে রাজেন্দ্র। ইহারা নিয়মস্থ, এক্ষণে কথা কহিবেন না; পূর্ব্ব রাত্র অতীত হইলে আপনার সহিত আলাপ করিবেন, ভূপতি কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাদিগকে যজ্ঞাগারে রাখিয়া স্বীয় গৃহে গমন করিলেন এবং অর্দ্ধরাত্র সময়ে পুনরায় তাঁহাদের সমীপে সমু-পস্থিত হইলেন। হে মহারাজ জনমেজয়। মগধরাজ জরাসন্ধের এই লোকবিশ্রুত ব্রত ছিল যে, কোন স্নাতক অর্দ্ধরাত্রসময়ে সমুপস্থিত হইলেও তিনি তৎক্ষণাৎ গমন করিয়া তাঁহাকে প্রত্যুদ্গমন করিতেন। তিনি তাঁহাদের তিন জনের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া পূজা করিলেন এবং তাঁহাদের অপূর্ব্ব বেশ নিরীক্ষণ করিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাঁহারা রাজাকে দেখিবা-মাত্র "স্বস্ত্যস্তু” বলিয়া আশীর্ব্বাদ করত কুশল প্রশ্ন করিলেন। রাজা জরাসন্ধ সেই ব্রাহ্মণবেশধারী বীরত্রয়কে বসিতে কহিলেন। তাঁহারাও তদনুসারে যজ্ঞশালায় উপবেশন করিয়া মহাযজ্ঞে ত্রেতাগ্নির ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন সত্যসন্ধ মহারাজ জরাসন্ধ তাঁহাদের বেশদর্শনে বিস্মিত হইয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, হে বিপ্রগণ! আমি জানি স্নাতক ব্রতাচারী ব্রাহ্মণগণ সভাগমনসময় ব্যতীত কখন মাল্য বা চন্দন ধারণ করেন না। আপনারা কে? আপনাদের বস্ত্র রক্তবর্ণ, অঙ্গে পুষ্পমাল্য ও অনুলেপনে সুশোভিত; ভুজে জ্যাচিহ্ন লক্ষিত হইতেছে, আকার দর্শনে ক্ষাত্র তেজের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, কিন্তু আপনারা ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দিতেছেন; অতএব সত্য বলুন, আপনারা কে? রাজসমক্ষে সত্যই প্রশংসনীয়। কি নিমিত্ত আপনারা দ্বার দিয়া প্রবেশ না করিয়া নির্ভয়ে চৈত্যক পর্ব্বতের শৃঙ্গ ভগ্ন করিয়া প্রবেশ করিলেন? ব্রাহ্মণেরা বাক্যদ্বারা বীর্য্য প্রকাশ করিয়া থাকেন, কিন্তু আপনারা কার্য্যদ্বারা উহা প্রকাশ করিয়া নিতান্ত বিরুদ্ধানুষ্ঠান করিয়াছেন। আরও আপনারা আমার কাছে আসিয়াছেন, আমিও বিধিপূর্ব্বক পূজা করিয়াছি, কিন্তু কি নিমিত্ত পূজাগ্রহণ করিলেন না? যাহা হউক, এক্ষণে কি নিমিত্ত এখানে আগমন করিয়াছেন বলুন।

মহারাজ জরাসন্ধ এইরূপ কহিলে, মহামতি কৃষ্ণ স্নিগ্ধ, গম্ভীরস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! তুমি আমাদিগকে স্নাতক ব্রাহ্মণ বলিয়া বোধ করিতেছ; কিন্তু হে নরাধিপ! ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য, এই তিন জাতিই, স্নাতকব্রত গ্রহণ করিয়া থাকেন। ইঁহাদের বিশেষ নিয়ম ও অবিশেষ নিয়ম উভয়ই আছে। ক্ষত্রিয়জাতি বিশেষ নিয়মী হইলে সম্পত্তিশালী হয়। পুষ্পধারী নিশ্চয়ই শ্রীমান হয় বলিয়া আমরা পুষ্প ধারণ করিয়াছি। ক্ষত্রিয় বাহুবলেই বলবান, বাম্বীর্য্যশালী নহেন; এই নিমিত্ত তাঁহাদের অপ্রগল্ভ বাক্যপ্রয়োগ করা নির্দ্ধারিত আছে। বিধাতা ক্ষত্রিয়গণের বাহুতেই বল প্রদান করিয়াছেন। হে রাজন! যদি তোমার আমাদের বাহুবল দেখিতে বাসনা থাকে, তবে অদ্যই দেখিতে পাইবে সন্দেহ নাই; হে বৃহদ্রথনন্দন! ধীর ব্যক্তিগণ শত্রুগৃহে অপ্রকাশ্যভাবে ও সুহৃগৃহে প্রকাশ্য-ভাবে প্রবেশ করিয়া থাকেন। হে রাজন! আমরা স্বকার্য্য সাধনার্থে শত্রুগৃহে আগমন করিয়া তদ্দত্ত পূজা গ্রহণ করি না; এই আমাদের নিত্যব্রত।

জরাসন্ধকর্তৃক স্বীয় অপরাধ জিজ্ঞাসা।

জরাসন্ধ কহিলেন, হে বিপ্রগণ! আমি কোন্ সময়ে তোমাদের সহিত শত্রুতা বা তোমাদের অপকার করিয়াছি, তাহা আমার স্মরণ হইতেছে না, তবে কি নিমিত্ত নিরপরাধে তোমরা আমাকে শত্রু জ্ঞান করিতেছ? দেখ, ধৰ্ম্ম বা অর্থের উপঘাত১ দ্বারাই মনঃপীড়া জন্মে, কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া ধর্মজ্ঞ হইয়া নিরপরাধে লোকের ধর্মার্থে উপঘাত করে, তাহার ইহকালে অমঙ্গল ও পরকালে নরকে গমন হয় সন্দেহ নাই। আর দেখ। ত্রিলোকীমধ্যে সৎপথগামিগণের পক্ষে ক্ষত্রধৰ্ম্মই শ্রেষ্ঠ; ধৰ্ম্মবিৎ ব্যক্তিরা কেবল ক্ষত্রধর্মেরই প্রশংসা করিয়া থাকেন। আমি স্বধর্ম্মে নিরত প্রজাগণের কোন অপকার করি নাই। তবে তোমরা কি নিমিত্ত আমাকে শত্রু বলিয়া স্থির করিয়াছ বোধ হয় তোমাদের প্রমাদ হইয়া থাকিবে।

শ্রীকৃষ্ণসহ পাণ্ডুতনয়ের পরিচয় দান।

শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে মহাবাহো! যে কুলপ্রদীপ একাকী কুলকার্য্যের ভার বহন করিতেছেন, আমরা তাঁহার নিয়োগক্রমে তোমার প্রতি সমুদ্যত হইয়াছি। হে রাজন! ক্ষত্রিয়গণকে পূজো-পহার-স্বরূপ করিবার মানস করাতে তুমি যৎপরোনাস্তি অপরাধী হইয়াছ, তবে কি বলিয়া আপনাকে নিরপরাধ বোধ কর? হে নৃপসত্তম! নিরপরাধ অন্যান্য ভূপতিগণের প্রতি হিংসাচরণ করা কি রাজার কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম? তবে তুমি কি জন্য নৃপতিগণকে আনয়ন-পূর্ব্বক মহাদেবের নিকট উপহার প্রদান করিতে বাসনা করিয়াছ? হে বৃহদ্রথনন্দন। আমাদিগকেও ত্বৎকৃত পাপে পাপী হইতে হইবে, যেহেতু আমরা ধর্মাচারী ও ধর্মরক্ষণে সমর্থ। আমরা কখন নর-বলি দেখি নাই, তুমি কি বলিয়া নরবলি প্রদানপূর্ব্বক ভগবান্ পশুপতির পূজা করিতে বাসনা করিতেছ? রে বৃথামতি জরাসন্ধ। তোমা ব্যতিরেকে আর কোন্ ব্যক্তি সুবর্ণের পশুসংজ্ঞা করিতে পারে? দেখ, যে ব্যক্তি যে যে অবস্থায় যে যে কৰ্ম্ম করে, সে, সেই সেই অবস্থায় তাহার ফলভাগী হয়। আমরা দুঃখার্ত ব্যক্তির অনুসরণ করিয়া থাকি; তুমি জ্ঞাতিক্ষয়কারী, অতএব আমরা এক্ষণে জ্ঞাতি-বৃদ্ধির নিমিত্ত তোমাকে সংহার করিতে সমাগত হইয়াছি। তুমি মনে মনে স্থির করিয়াছ যে, এই ভূমণ্ডলমধ্যে ক্ষত্রিয়কুলে তোমার ন্যায় ক্ষমতাশালী পুরুষ আর কেহ নাই, সে কেবল তোমার বুদ্ধিভ্রমমাত্র। কোন্ স্বজাতীয় পক্ষপাতী ক্ষত্রিয়-কুলসম্ভূত ভূপতি আত্মীয়জনরক্ষার্থে যুদ্ধে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক অতুল স্বর্গভোগ করিতে বাসনা না করে? দেখ, ক্ষত্রিয়গণ স্বর্গে থাকিয়াও রণযজ্ঞে দীক্ষিত হইয়া লোকদিগকে জয় করেন। হে রাজন! বেদাধ্যয়ন, মহৎ যশঃ, তপোনুষ্ঠান ও যুদ্ধে মৃত্যু, এই সমুদায়ই স্বর্গের হেতু বটে, কিন্তু নিয়মপূর্ব্বক বেদাধ্যয়নাদি না করিলে স্বর্গ প্রাপ্তি হয় না; কিন্তু যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ করিলে স্বর্গলাভ হইবে; ইহাতে কিছুমাত্র ব্যতিক্রম নাই। দেখ! সুরপতি ইন্দ্র স্বীয় গুণবান্ পুত্র বৈজয়ন্তের প্রভাবে অসুরগণকে পরাজয় করিয়া জগৎপালন করিতেছেন। সে যাহা হউক, এক্ষণে আমাদের সহিত শত্রুতা তোমার পক্ষে যেরূপ স্বর্গগমনের হেতু হইয়াছে, সেরূপ আর কাহারও ঘটে না। তুমি বহুসংখ্যক মাগধ সৈন্যের বলে দর্পিত হইয়া অন্যান্য ব্যক্তিগণকে অপমান করিও না। প্রত্যেক ব্যক্তিরই পরাক্রম আছে। এই ভূমণ্ডলে তোমার সমতেজাঃ ও তোমা অপেক্ষা অধিক তেজস্বী অনেকে আছেন। হে রাজন! এই বিষয় অজ্ঞাত থাকাতেই তোমার এতাদৃশ অহঙ্কার হইয়াছে। উহা আমাদের নিতান্ত অসহ্য হওয়াতে তোমাকে জানাইয়া দিলাম। হে ভূপতে! তুমি সদৃশ ব্যক্তির উপর অভিমান ও দর্প পরিত্যাগ কর, নতুবা পুত্র, অমাত্য ও সৈন্যগণ সমভিব্যাহারে যমালয়ে গমন করিতে হইবে। মহারাজ কার্তবীর্য্য, উত্তর ও বৃহদ্রথ অতিদর্পে আপন আপন মঙ্গলের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া সসৈন্যে বিনষ্ট হইয়াছেন। হে রাজন! তোমাকে কপটে সংহার করিবার মানসে এরূপ বেশ পরিগ্রহ করিয়াছি, আমরা বস্তুতঃ ব্রাহ্মণ নহি, ক্ষত্রিয়। আমি বসুদেবনন্দন কৃষ্ণ, আর এই দুই বীর পুরুষ পাণ্ডুতনয়। আমরা তোমাকে যুদ্ধ করিতে আহ্বান করিতেছি; এক্ষণে হয় সমস্ত ভূপতিগণকে পরিত্যাগ কর; না হয় যুদ্ধ করিয়া যমালয়ে গমন কর।

জরাসন্ধ কহিলেন, হে কৃষ্ণ! আমি কোন রাজাকেই জয় না করিয়া আনয়ন করি নাই। যাহাকে আমি পরাজয় করি নাই এবং যে আমার সহিত বিরোধ করিতে সমর্থ এই ভূমণ্ডলে এমত কোন্ ব্যক্তি আছে? হে বাসুদেব! বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক লোককে আপনার বশে আনিয়া তাহার প্রতি স্বেচ্ছানুসারে ব্যবহার করাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। আমি ক্ষাত্রব্রতাবলম্বী; দেবপূজার নিমিত্ত রাজগণকে আনয়ন করিয়াছি, এখন কি নিমিত্ত ভয় পাইয়া তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিব? আমি একাকী ব্যূহমধ্যস্থিত এক দুই বা তিন মহারথের সহিত এককালে পৃথক্ পৃথক্ যুদ্ধ করিতে পারি।

মহারাজ জরাসন্ধ এই কথা বলিয়া ঐ ভীমকৰ্ম্মা ব্যক্তি-গণের সমভিব্যাহারে যুদ্ধ করিবার অভিলাষে স্বীয় পুত্র সহদেবের রাজ্যাভিষেকে আজ্ঞা করিলেন এবং কৌশিক ও চিত্রসেন নামক দুই সেনাপতিকে আহ্বান করিলেন। পুরুষশ্রেষ্ঠ সত্যসন্ধ হলধরানুজ মধুসূদন ঐ ভীমপরাক্রম শাৰ্দ্দুলসম-বিক্রান্ত বৃহদ্রথতনয় জরাসন্ধকে যাদবগণের অবধ্য স্মরণ করিয়া ব্রহ্মার আদেশানুসারে স্বয়ং তাহার সংহারে প্রবৃত্ত হইলেন না।

ভীমের সহিত জরাসন্ধের যুদ্ধ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তখন যদুবংশাবতংস সুবক্তা বাসুদেব, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় মহারাজ জরাসন্ধকে কহিলেন, হে রাজন! আমাদের তিনজনের মধ্যে কাহার সহিত যুদ্ধ করিতে অভিলাষ হয়, বল? কে যুদ্ধ করিতে সজ্জীভূত হইবে? মহাদ্যুতি জরাসন্ধ কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর ভীমসেনের সহিত যুদ্ধ করিতে চাহিলেন।

ঐ সময়ে পুরোহিত রোচনা, মাল্য ও অন্যান্য মাঙ্গল্য দ্রব্যজাত এবং দুঃখ-মূর্ছানিবারক অঙ্গদ ও ঔষধসমুদায় লইয়া সংগ্রামেচ্ছু জরাসন্ধের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। মহারাজ জরাসন্ধ যশস্বী ব্রাহ্মণকর্তৃক কৃতস্বস্ত্যয়ন হইয়া ক্ষাত্রধর্মানুসারে বৰ্ম্ম পরিধান ও কিরীট পরিত্যাগপূর্ব্বক কেশ বন্ধন করত বেগবান্ সমুদ্রের ন্যায় সমুত্থিত হইয়া ভীমসেনকে কহিলেন, হে ভীম। আইস তোমার সহিত যুদ্ধ করিব। মহাতেজাঃ জরাসন্ধ ভীমকে এই কথা বলিয়া, বলাসুর যেমন ইন্দ্রকে আক্রমণ করিয়াছিল, তদ্রূপ বৃকোদরকে আক্রমণ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনও কৃষ্ণের সহিত মন্ত্রণা করিয়া এবং তৎ-কর্তৃক কৃতস্বস্ত্যয়ন হইয়া যুদ্ধাভিলাষে জরাসন্ধের নিকট গমন করিলেন। এইরূপে সেই দুই নরশ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ পরস্পর জিগীষাপরবশ হইয়া স্ব স্ব বাহুমাত্র অবলম্বনপূর্ব্বক উভয়ে মিলিত হইলেন। প্রথমে তাঁহারা কর গ্রহণপূর্ব্বক পাদাভিবন্দন করিয়া কক্ষাস্ফোটন করিতে লাগিলেন এবং স্কন্ধে বারংবার করাঘাত ও অঙ্গে অঙ্গে সমাশ্লেষ করিয়া পুনরায় আস্ফালন করিতে লাগিলেন। পরে চিত্রহস্তাদি বিবিধ বন্ধন করিয়া কক্ষাবন্ধ করিলেন এবং পরস্পর ললাটে ললাটে এরূপ আঘাত করিলেন যে, উভয়ের ললাট হইতে স্ফুলিঙ্গ বিনির্গত ও ঘোরতর শব্দ হওয়াতে বোধ হইল, যেন বজ্রাঘাত হইতেছে। অনন্তর বাহুপাশাদি বন্ধন করিয়া পরস্পর মস্তকে পদাঘাতপূর্ব্বক মত্ত বারণের ন্যায় গভীর গর্জন এবং সুসংক্রুদ্ধ সিংহদ্বয়ের ন্যায় পরস্পর নিরীক্ষণ, করপ্রহার ও বারংবার আকর্ষণ করত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। পরস্পর অঙ্গ ও বাহুদ্বারা অঙ্গ সমাপীড়ন ও বাহুদ্বারা উদর আবরণপূর্ব্বক পরস্পরকে স্ব স্ব পশ্চাৎ ও পার্শ্বদেশে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং স্ব স্ব কণ্ঠ, কক্ষ ও উদরে হস্তাস্ফালন করিতে লাগিলেন। তদনন্তর পরস্পর পৃষ্ঠভঙ্গ ও বাহুদ্বয়দ্বারা সম্পূর্ণ মূর্ছা এবং পূর্ণকুম্ভ' প্রভৃতি করিলেন। তৎপরে তাঁহারা তৃণপীড়' ও সমুষ্টিক পূর্ণযোগ প্রভৃতি নানাবিধ যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।

হে নরশ্রেষ্ঠ! তখন যাবতীয় পুরবাসী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, বনিতা ও বৃদ্ধগণ তাঁহাদের সংগ্রাম দেখিতে তথায় সমুপস্থিত হইলেন। যুদ্ধক্ষেত্র জনতাদ্বারা সমাকীর্ণ হইল। মহাবীর জরাসন্ধ ও ভীমসেন পরস্পর নিগ্রহ ও প্রগ্রহদ্বারা ভয়ানক বাহুযুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। পরস্পর জয়াকাঙ্ক্ষী পরম প্রহৃষ্ট মহাবল বীরপুরুষদ্বয় পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধান করিতে লাগিলেন। হে রাজন! বীরদ্বয়ের বৃত্রবাসবসদৃশ ভয়ানক তুমুল সংগ্রামে অন্যান্য লোক উৎসারিত হইল। তাঁহারা প্রকর্ষণ, আকর্ষণ, অনুকর্ষণ ও বিকর্ষণদ্বারা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ ও জানুদ্বারা আঘাত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর কঠোরশব্দে ভর্ৎসনা করত প্রস্তরাঘাতসদৃশ মুষ্টিপ্রহারে অভিঘাত করিতে লাগিলেন। উভয়েই বিস্তৃতবক্ষাঃ, উভয়েই দীর্ঘবাহু, উভয়েই যুদ্ধকুশল। সুতরাং উভয়ে উভয়কে লৌহার্গলসদৃশ বাহুদ্বারা সংসক্ত করিলেন; দুই মহাত্মার যুদ্ধ কার্ত্তিক মাসের প্রথম দিবসে আরম্ভ হইয়া অনাহারে অবিশ্রান্ত ত্রয়োদশ দিবস দিবারাত্রি সমভাবে চলিয়াছিল। চতুৰ্দ্দশ দিবসে রাত্রিতে মগধরাজ ক্লান্ত হইয়া নিবৃত্ত হইলেন। বাসুদেব জরাসন্ধকে ক্লান্ত দেখিয়া ভীমকৰ্ম্মা ভীমসেনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে কৌন্তেয়! ক্লান্ত শত্রুকে পীড়ন করা উচিত নহে, অধিকতর পীড্যমান হইলে জীবন পরিত্যাগ করে; অতএব ইনি তোমার পীড়নীয় নহেন। হে ভরতর্ষভ! ইঁহার সহিত বাহুযুদ্ধ কর। শত্রুনিসূদন ভীম কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া দুর্জয় জরাসন্ধকে তদবস্থ জানিয়া তাঁহাকে জয় করিবার নিমিত্ত অধিক কোপাবিষ্ট হইলেন।

জরাসন্ধের পরাজয় ও মৃত্যু।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর কৌশলাভিজ্ঞ ভীমসেন জরাসন্ধবধাভিলাষে বাসুদেবকে কহিলেন, হে কৃষ্ণ! এই পাপাত্মার কক্ষদেশ এরূপ বসনবন্ধ আছে যে, ইহাকে প্রাণবিযুক্ত করা সহজ ব্যাপার নহে। পুরুষব্যাঘ্র বাসুদেব জরাসন্ধবধা-ভিলাষে সত্বর হইয়া বৃকোদরকে কহিলেন, হে ভীম! তোমার যে দৈব বল ও বাহুবল আছে, আশু তাহা জরাসন্ধে প্রদর্শন কর। মহাবল ভীম এই প্রকার অভিহিত হইয়া জরাসন্ধকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া ঘূর্ণিত করিতে লাগিলেন। শতবার ঘূর্ণিত করিয়া জানুদ্বারা আকুঞ্চনপূর্ব্বক তাঁহার পৃষ্ঠদেশ ভঙ্গ ও নিষ্পেষণ-পূর্ব্বক সিংহনাদসহকারে তাঁহার চরণদ্বয় করকবলিত করিয়া দ্বিধা বিভক্ত করিলেন। নিষ্পিষ্যমাণ জরাসন্ধের আর্ত্তরবে এবং ভীমসেনের গর্জনে মগধবাসী সমস্ত লোক এ্যস্ত ও গপ্তিণীর গর্ন্ত স্রাব হইয়া গেল। ভীমসেনের ভয়ঙ্কর নিনাদে মাগধেরা বোধ করিল যে, হয় হিমালয়, না হয় মহীতল বিদীর্ণ হইতেছে।

তদনন্তর অরিন্দম কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম গতজীবিত প্রসুপ্তের ন্যায় পতিত জরাসন্ধকে পরিত্যাগ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধের পতাকাশালী রথ সংযোজিত এবং তাহাতে ভ্রাতৃদ্বয়কে আরোহিত করিয়া বান্ধবগণকে কারামুক্ত করিলেন। মহীপালগণ মহাভয় হইতে পরিত্রাণ পাইয়া কৃষ্ণের নিকট গমনপূর্ব্বক রত্নদ্বারা তাঁহার সমুচিত সম্মান করিলেন। অক্ষত, শস্ত্রসম্পন্ন, জিতারি বাসুদেব সেই দিব্য রথে আরোহণ করিয়া রাজগণের সহিত গিরিব্রজ হইতে প্রস্থান করিলেন। ভীমার্জুন দুই যোদ্ধা তাহাতে আরূঢ় এবং কৃষ্ণ সারথি হওয়াতে সেই রথ সমধিক শোভিত হইয়াছিল। যে রথ তারকাজালের ন্যায় সমুজ্জ্বল, ইন্দ্র এবং বিষ্ণু যাহাতে আরোহণ করিয়া সংগ্রাম করিতেন, যদ্দ্বারা পুরন্দর নবনবতিবার দানবগণকে নিহত করিয়াছিলেন, তপ্তকাঞ্চনের ন্যায় যাহার আভা, মেঘ-নির্ঘোষের ন্যায় যাহার শব্দ, সেই কিঙ্কিণীজালজড়িত অপূর্ব্ব রথ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহারা সাতিশয় পরিতুষ্ট হইলেন। মাগধেরা মহাবাহু কৃষ্ণকে ভীম ও অর্জুনের সহিত সেই রথে আরূঢ় দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল। বায়ুবেগশালী সেই রথ দিব্য ঘোটকে সংযুক্ত ও কৃষ্ণকর্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়া অতীব শোভমান হইয়াছিল। সেই দেবনির্মিত রথ শত্রুধনুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দৃষ্ট হইতে লাগিল।

কৃষ্ণকর্তৃক জরাসন্ধের কারারুদ্ধ নৃপগণের মুক্তিদান।

অনন্তর কৃষ্ণ গরুড়কে স্মরণ করিবামাত্র তিনি সমাগত হইলেন। বিস্তৃতানন, মহানাদ, গরুত্মান্ সমারূঢ় হইলে সেই দিব্য রথ উন্নত চৈত্যবৃক্ষের উপমেয় হইয়া উঠিল। সহস্র-কিরণাবৃত মধ্যাহ্ন-সহস্রাংশুর ন্যায় প্রাণিগণের দুর্নিরীক্ষ্য সেই রথ তেজোদ্বারা সমধিক দীপ্যমান হইল। তাহার দিব্য ধ্বজ বৃক্ষেও সংলগ্ন হইত না এবং বাণেও বিদ্ধ হইত না; এক্ষণে মানবের দৃশ্যমান হইতে লাগিল। যে রথ রাজা বসু বাসব হইতে, বৃহদ্রথ বসু হইতে, পরিশেষে জরাসন্ধ বৃহদ্রথ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, পুরুষব্যাঘ্র অচ্যুত ভীম ও অর্জুনের সহিত সেই মেঘনাদ রথে আরোহণ করিয়া প্রয়াণ করিলেন। অনন্তর পুণ্ডরীকাক্ষ বাসুদেব গিরিব্রজ হইতে নির্গত হইয়া বহিঃপ্রদেশে উপস্থিত হইলেন। তখন তথায় ব্রাহ্মণ প্রভৃতি নগরবাসীরা সৎকার ও বিধিবিহিত কৰ্ম্মদ্বারা তাঁহার সমীপবর্তী হইলেন। বন্ধনবিমুক্ত রাজারাও স্তুতিপূর্ব্বক মধুসূদনের পূজা করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে মহাবাহো! ভীমার্জুনের সহিত আপনি যে ধৰ্ম্ম রক্ষা করিলেন, অদ্য যে দুঃখরূপ পঙ্কে পঙ্কিল জরাসন্ধরূপ হ্রদে নিমগ্ন নৃপতিগণের উদ্ধার সাধন করিলেন, ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে। হে বিষ্ণো! হে যদুনন্দন! আপনি দারুণ গিরিদুর্গে অবসন্ন দুর্ভাগ্যদিগের মোচনজনিত দীপ্ত | যশোরাশি প্রাপ্ত হইলেন। আপনি নৃপতিগণের দুষ্কর কর্ম করিলেন, এক্ষণে এই ভৃত্যদিগকে কি করিতে হইবে, অনুমতি করুন।

মনস্বী হৃষীকেশ তাঁহাদিগকে কহিলেন, রাজা যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করিতে অভিলাষ করিয়াছেন, আপনারা সেই সাম্রাজ্য চিকীর্ষু ধার্মিকের সাহায্য করেন, ইহাই প্রার্থনা। নৃপতিগণ "তাহাই করিব" বলিয়া স্বীকার করিলেন। জরাসন্ধ-নন্দন সহদেব অমাত্যের সহিত পুরোহিতকে অগ্রবর্তী করিয়া অতি বিনীতভাবে প্রণিপাত-সহকারে বহুরত্ব প্রদানপূর্ব্বক নরদেব বাসুদেবের উপাসনা করত তাঁহার শরণাপন্ন হইলেন। পুরুষোত্তম কৃষ্ণ ভয়ার্ত্ত সহদেবকে অভয় প্রদান করিয়া তৎপ্রদত্ত মহামূল্য রত্নসমুদায় গ্রহণ করিলেন। কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন একত্র হইয়া সানন্দে সৎকারপূর্ব্বক তাঁহাকে সেই মগধরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহাবাহু সহদেব মহাত্মগণ কর্তৃক অভিষিক্ত হইয়া রাজধানীতে প্রবেশ করিলেন।

ভীমার্জুন সমভিব্যাহারে শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রপ্রস্থে প্রত্যাগমন।

এদিকে শ্রীমান পুরুষোত্তম ভূরি ভূরি রত্নজাত সংগ্রহ করিয়া ভীমার্জুনের সহিত ইন্দ্রপ্রস্থে প্রস্থিত হইলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া আনন্দের সহিত কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! বৃকোদর, বলবান্ জরাসন্ধকে নিপাতিত করিয়াছেন, কারারুদ্ধ ভূপতিগণও বন্ধন মুক্ত হইয়াছেন। ভাগ্যক্রমে ভীমসেন এবং ধনঞ্জয় কৃতকার্য্য হইয়া অক্ষত শরীরে স্বনগরে আগমন করিয়াছেন। রাজা যুধিষ্ঠির শ্রবণমাত্র অতিমাত্র আহ্লাদিত হইয়া বাসুদেবকে সমুচিত পূজা ও ভ্রাতৃদ্বয়কে আলিঙ্গন করিলেন। ভীমার্জুন জরাসন্ধকে নিহত করিয়া জয়লাভ করিয়াছেন, ইহাতে সভ্রাতৃক যুধিষ্ঠিরের আর আহ্লাদের সীমা রহিল না। অনন্তর তাঁহারা বয়োনুসারে সৎকার ও পূজা করিয়া ভূপতিকে বিদায় করিলেন, ভূপতিগণ যুধিষ্ঠিরের অনুজ্ঞাত হইয়া প্রফুল্লচিত্তে উচ্চাবচ' যানে আরোহণ করিয়া স্ব স্ব দেশে গমন করিলেন। বুদ্ধিমান্ শত্রুনিসূদন কৃষ্ণ পাণ্ডবগণদ্বারা চিরশত্রু জরাসন্ধকে বিনষ্ট করিয়া ধর্মরাজের অনুজ্ঞা লইয়া কুন্তী, কৃষ্ণা, সুভদ্রা, ভীমসেন, ধনঞ্জয় এবং ধৌম্যকে আমন্ত্রণ করিয়া ধর্মরাজ প্রদত্ত মনস্তুল্যগামী সেই দিব্য রথে দশদিক্ মুখরিত করিয়া নিজনগরে যাত্রা করিলেন। তাঁহার গমনসময়ে অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পাণ্ডবগণ তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির জরাসন্ধের বধ সাধন ও গিরিদুর্গ হইতে বধার্থানীত নরপতিদিগের উদ্ধার করাতে তাঁহার যশোরাশি ক্রমে চারিদিকে বিস্তৃত হইয়া পড়ল। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়! এইরূপে পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীর প্রীতিবন্ধন ও তৎকালোচিত ধৰ্ম্মকামার্থোপেতভাবে প্রজাপালন করিয়া পরম সুখে বাস করিতে লাগিলেন।

জরাসন্ধ বধপর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


সভাপর্ব

দিগ্বিজয় পর্ব্বাধ্যায়।

যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে অর্জুনাদির দিগ্বিজয় যাত্রা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! অর্জুন উৎকৃষ্ট ধনুঃ, অক্ষয় তৃণীর, রথ, পতাকা ও সভা অধিকার করিয়া যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, রাজন! নিতান্ত অসুলভ অভিলষিত কোদণ্ড, সহায়, দুর্গ, যশঃ ও বল প্রভৃতি আমি সকলই লাভ করিয়াছি। এক্ষণে কোষবৃদ্ধি ও ভূপালগণ হইতে কর আহরণ করাই আমার কর্তব্য কার্য্য; এক্ষণে আপনি অনুমতি করিলে শুভ নক্ষত্র, মুহূর্ত ও তিথি বিশেষ লাভ করিয়া বিজয়ার্থ উত্তরাভিমুখে প্রস্থান করি।

অর্জুনের এই কথা শুনিয়া যুধিষ্ঠির স্নিগ্ধ-গম্ভীরস্বরে কহিলেন, বৎস! তুমি পূজ্য ব্রাহ্মণদিগের আশীর্ব্বাদ গ্রহণপূর্ব্বক শত্রুগণের নিরানন্দ ও সুহৃদ্বর্গের আনন্দ বর্দ্ধনের নিমিত্ত যুদ্ধযাত্রা কর, নিশ্চয়ই তোমার জয়লাভ ও অভীষ্টসিদ্ধ হইবে। তখন অর্জুন সুমহৎ সৈন্যমণ্ডলীপরিবৃত হইয়া অগ্নিদত্ত দিব্যরথে আরোহণপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। ভীমসেন ও যমজ নকুল সহদেব ইঁহারাও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকর্তৃক সৎকৃত হইয়া সৈন্যগণ সমভিব্যাহারে রাজধানী হইতে নির্গত হইলেন।

অনন্তর অর্জুন উত্তরদিক্, ভীম পূর্ব্ব, সহদেব দক্ষিণ ও নকুল পশ্চিমদিক্ জয় করিয়াছিলেন। যুধিষ্ঠির খাণ্ডবপ্রস্থমধ্যস্থ সুহৃদ্বর্গে পরিবৃত হইয়া পরম সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া উঠিলেন।

অর্জুনের দিগ্বিজয়-বৃত্তান্ত।

জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! এক্ষণে পাণ্ডবদিগের দিগ্বিজয়বৃত্তান্ত সবিস্তর কীর্ত্তন করুন। আমি পূর্ব্ব পুরুষদিগের অত্যাশ্চর্য্য বিচিত্র চরিত্র শ্রবণ করিয়া কিছুতেই পরিতৃপ্ত হইতেছি না। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবেরা এককালে পৃথিবী জয় করেন, অতএব প্রথমতঃ অর্জুনের দিগ্বিজয়বৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

প্রাগজ্যোতিষপুর জয়।

মহারাজ! ধনঞ্জয় প্রথমতঃ অনতিভয়ঙ্কর কর্মদ্বারা কুলিন্দবিষয়স্থিত মহীপালগণকে স্ববশে স্থাপন করিলেন। অনন্তর কুলিন্দ, কালকূট ও আনৰ্ত্তদেশ বশীভূত করিয়া তিনি সসৈন্য মহীপাল সুমণ্ডলকে পরাজয় করেন, তৎপরে সুমণ্ডল-সমভিব্যাহারে শাকলদ্বীপ ও বিন্ধ্য ভূধরসন্নিহিত পার্থিবদিগকে জয় করিলেন। সপ্তদ্বীপমধ্যে শাকলদ্বীপে যে সকল ভূপাল বাস করিতেন, অর্জুন-সৈন্যের সহিত তাঁহাদিগের তুমুল সংগ্রাম হইল। অনন্তর অর্জুন ঐ সমস্ত রাজগণকে পরাজয় করিয়া তাঁহাদিগেরই সমভিব্যাহারে প্রাগজ্যোতিষ দেশে উপস্থিত হইলেন। তথায় ভগদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁহার সহিত অর্জুনের ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। প্রাগজ্যোতিষেশ্বর ভগদত্ত কিরাত, চীন ও সাগরের উপকূলবাসী অন্যান্য বহুবিধ যোদ্ধৃবর্গের সহিত পরিবৃত ছিলেন। তিনি অষ্টম দিবস যুদ্ধ করিয়া সংগ্রামবিষয়ে বিগতক্রম অর্জুনকে সহাস্যবদনে কহিলেন, হে মহাবাহো! তুমি দেবরাজ ইন্দ্রের আত্মজ, তোমার এইরপ বলবীর্য্য হইবে, ইহা নিতান্ত অসঙ্গত নহে, আমি ইন্দ্রের প্রিয়সখা, আমিও রণক্ষেত্রে তদপেক্ষা বলবিক্রম প্রকাশে কোন অংশে ন্যূন নহি। তথাচ তোমার সহিত যুদ্ধ করিতে নিতান্ত অসমর্থ হইতেছি। অতএব এক্ষণে তোমার কি অভিলাষ হয় বল? আমি তাহার অনুষ্ঠান করিব। নিশ্চয়ই কহিতেছি, তুমি যে কথা কহিবে, তাহার অন্যথা হইবে না।

অর্জুন কহিলেন, আমি কুরুকুলতিলক ধৰ্ম্মনন্দন ধৰ্ম্ম-পরায়ণ রাজা যুধিষ্ঠিরের পার্থিবত্ব' সংস্থাপনের অভিসন্ধি করিয়াছি। আপনি তাঁহাকে কর প্রদান করুন। আপনি মদীয় পিতা ইন্দ্রদেবের সখা, আর আমার সহিতও আপনার বিলক্ষণ সম্ভাব জন্মিল। সুতরাং এক্ষণে আর আপনাকে আদেশ করিতে পারি না, অতএব প্রীতিপূর্ব্বক কর প্রদান করুন। তখন ভগদত্ত কহিলেন, হে কুন্তীনন্দন অর্জুন। যাদৃশ তুমি আমার প্রণয়ভাজন, রাজা যুধিষ্ঠিরও তদ্রূপ, অতএব আমি অবশ্যই এই সমস্ত অনুষ্ঠান করিব, বরং আর কি করিতে হইবে, বল।

কাশ্মীরসহ বহু রাজ্য জয়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ভগদত্তকর্তৃক এইরপ অভিহিত হইয়া অর্জুন প্রত্যুত্তর করিলেন, মহাশয়! এই বিষয়ে অঙ্গীকৃত হইলে আমাদিগের সকলই অনুষ্ঠিত হয়।

অনন্তর অর্জুন ভগদত্তকে পরাজয় করিয়া উত্তরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া অন্তর্গিরি, বহির্গিরি ও উপগিরি এই সমস্ত স্থান আপন হস্তগত করিলেন। তৎপরে পর্ব্বত, বন ও তত্রত্য অনেকানেক ভূপালগণকে আয়ত্ত ও অনুরক্ত করিয়া তাঁহাদিগের নিকট ধন গ্রহণ করিলেন। অনন্তর মৃদঙ্গনাদ, রথঘর্ঘরশব্দ ও মাতঙ্গগণের বৃংহিত ধ্বনিদ্বারা পর্ব্বত কাননসমাকীর্ণা বসুন্ধরা ধ্বনিত ও বিকম্পিত করিয়া ঐ সকল রাজলোকের সহিত উলুকবাসী বৃহন্তের নিকট উপস্থিত হইলেন। বৃহন্ত অবিলম্বে চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে রাজধানী হইতে নির্গত হইয়া অর্জুনের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। অর্জুনের সহিত পর্ব্বতরাজ বৃহন্তের অতি মহৎ সংঘর্ষ হইতে লাগিল, কিন্তু বৃহন্ত তাঁহার বলবীর্য্য সহ্য করিতে পারিলেন না। পরিশেষে তিনি অর্জুনকে নিতান্ত দুর্বিষহ স্থির করিয়া প্রভূত অর্থের সহিত তথায় সমুপস্থিত হইলেন।

অনন্তর কুন্তীনন্দন বৃহন্তরাজ্য বৃহন্তকেই সমর্পণ করিয়া উলুক সমভিব্যাহারে সেনাবিন্দুর নিকট উপস্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করিলেন। তৎপরে তিনি মোদাপুর, বামদেব, সুদামন, সুসঙ্কুল এবং উত্তর উলুকদেশস্থ অনেকানেক ভূপালগণকে সমানয়ন করিলেন। তিনি তথায় অবস্থান করিয়াই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অপ্রতিহত শাসনপ্রভাবে সেনাসমূহ দ্বারা পঞ্চগণ ও বহুবিধ দেশ জয় করিতে লাগিলেন। তৎপরে চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে সেনাবিন্দুর রাজধানী হইতে নির্গত ও দেবপ্রস্থে উপস্থিত হইয়া স্কন্ধাবার সংস্থাপন করিলেন। তথা হইতে সৈন্যগণ পরিবৃত হইয়া পুরুষর্ষভপৌরবরাজ বিশ্বগণের নিকট উপস্থিত হইলেন। তথায় অনেকানেক পার্ব্বতীয় মহাবীর-গণকে সমরাঙ্গণে পরাজয় করিয়া সৈন্যগণসহকারে পৌরবপুরী অধিকার করিয়াছিলেন। তৎপরে পৌরব ও পর্ব্বতনিবাসী দস্যুদিগকে এবং সপ্তবিধ উৎসবসঙ্কেতনামক ম্লেচ্ছজাতিদিগকে পরাজয় করিলেন।

অনন্তর তিনি কাশ্মীরদেশসম্ভূত ক্ষত্রিয়বীরদিগকে ও দশ রাজমণ্ডলের সহিত ভূপাল লোহিতকে পরাজয় করিলেন। তখন ত্রিগর্ত, দারু ও কোকনদদেশীয় ক্ষত্রিয়েরা অর্জুনসন্নিধানে সমাগত হইতে লাগিলেন। তৎপরে মহাবীর অর্জুন রম্য অভিসারী নগরী অধিকার করিলেন। তাঁহার বাহুবলে রণস্থলে উরগদেশবাসী মহারাজ রোচমান্ পরাজিত হইলেন। তদনন্তর রণস্থলে সৈন্য বিস্তারপূর্ব্বক বহুবিধ আয়ুধরক্ষিত রমণীয় সিংহপুরে অগ্নিসংযোগ করিয়া দিলেন। তৎপরে সৈন্যগণ সমভিব্যাহারে সুদ্ধ ও সুমালানামী নগরী মন্থন করিতে লাগিলেন। তৎপরে পরম বাহুবিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক তিনি নিতান্ত দুর্লভ বাহীকদিগকে নিরতিশয় মর্দ্দন করিয়া পরিশেষে স্ববশে স্থাপন করিলেন। অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত সৈন্য সমভিব্যাহারে লইয়া দরদ ও কাম্বোজ জয় করেন। পূর্ব্ব ও উত্তরদেশে যে সকল দস্যুদল বাস করিতেছিল, আর যাহারা অরণ্যচারী তাহারাও অর্জুনের বশীভূত হইল। তৎপরে মহাবীর অর্জুন লোহ, পরম, কাম্বোজ ও উত্তর ঋষিক, এই সকলকে এককালে পরাজয় করিলেন। ঋষিকদিগের সহিত অর্জুনের ঘোরতর ভয়ঙ্কর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। অর্জুন তাহাদিগকে সমরাঙ্গণে পরাজয় করিয়া শুকোদরশ্যাম আটটি অশ্ব আনয়ন করিলেন। আর রাজকরস্বরূপ ময়ূরসদৃশ উদীচ্য ও পাশ্চাত্য অতিবেগগামী তুরঙ্গ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। তৎপরে নিস্কুট-পর্ব্বত ও হিমাচলকে পরাজয় করিয়া ধবলগিরিপৃষ্ঠে সেনা-নিবেশ করিলেন।

অর্জুনের দিগ্বিজয় সম্পূর্ণ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। মহাবীর অর্জুন ধবল-গিরি অতিক্রম করিয়া ক্ষত্রিয়ান্তকর ভয়ঙ্কর সংগ্রামদ্বারা দ্রুম-পুত্ররক্ষিত কিম্পুরুষবর্ষ পরাজয় ও অধিকার করিলেন। তৎপরে সসৈন্যে গুহ্যকপালিত হাটক দেশে উপস্থিত হইলেন। তথায় গুহ্যকদিগের নিকট জয় লাভ করিয়া তিনি মানস সরোবর ও সমস্ত ঋষিকন্যা অবলোকন করিতে লাগিলেন। তৎপরে মানস সরোবরের নিকটস্থ হইয়া হাটকের চতুষ্পার্শ্ববর্তী গন্ধর্ব্বরক্ষিত দেশসকল অধিকার করিলেন। সেই সমস্ত গন্ধর্ব্বনগর হইতে তিনি তিত্তিরি, কল্মাষ ও মণ্ডুক নামে প্রচুর অশ্বরত্ন করস্বরূপ লাভ করিলেন।

অনন্তর অর্জুন উত্তরহরিবর্ষে সমুপস্থিত হইয়া জয়লাভকরিবার নিমিত্ত ইচ্ছা করিলেন। এই অবসরে মহাবীর্য্য মহাকায় মহাবল দ্বারপালসকল অর্জুনসন্নিধানে উপনীত হইয়া হৃষ্টা-ন্তঃকরণে কহিল, হে কুন্তীনন্দন মহাভাগ অর্জুন! আপনি এই গন্ধর্ব্বনগরী অধিকারে কদাচ সমর্থ হইবেন না, অবিলম্বে এ স্থান হইতে প্রস্থান করুন। এই নগরী অপর্যাপ্ত সৈন্যসামন্ত-সম্পন্ন। যিনি এই নগরে প্রবেশ করেন, তিনি নিঃসন্দেহে সামান্য মনুষ্য নহেন। এক্ষণে আমরা আপনার প্রতি প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছি। যখন আপনি এই নগরে প্রবেশ করিয়াছেন, তখন আপনার জয়লাভই হইয়াছে। হে অর্জুন। এস্থলে কোন বিষয়ই জেতব্য লক্ষিত হয় না। এই দেশের নাম উত্তর কুরু। এস্থানে যুদ্ধের প্রসঙ্গও নাই। আপনি নগরপ্রবেশ করিয়াছেন, তথাপি স্থানপ্রভাবে কোন বস্তুই আপনার প্রত্যক্ষ হইতেছে না। এস্থলে কোন বিষয়েই মনুষ্যমাত্রের সাক্ষাৎকার লাভের সম্ভাবনা নাই। এক্ষণে আপনার যদি কোন কার্য্য সংসাধন করিবার অভিলাষ থাকে বলুন, আজ্ঞা পাইলে আমরাই সমস্ত অনুষ্ঠান করিব। তখন অর্জুন হাস্যমুখে প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি ধীমান্ ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের আধিপত্য স্থাপন করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, অতএব যদি তোমাদিগের এই প্রদেশসকল নর-লোকের সঞ্চারবিরুদ্ধ হয়, তাহা হইলে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে যৎকিঞ্চিৎ কর প্রদান কর। তখন দ্বারপালেরা অর্জুনকে দিব্য বস্ত্র, দিব্য আভরণ, দিব্য অজিন ও মহার্হ ক্ষৌম বস্ত্র এই সমস্ত বস্তু কর প্রদান করিলেন।

অনন্তর অর্জুন উত্তর কুরু পরাজয় করিয়া পরিশেষে অন্যান্য অনেকানেক ক্ষত্রিয় ও দস্যুগণের সহিত সংগ্রাম আরম্ভকরিলেন, এবং তাহাদিগকে পরাজিত ও হস্তগত করিয়া বহুবিধ ধন, রত্ন এবং ময়ূরসদৃশ শুকশ্যাম,' বেগশালী অশ্বসকল গ্রহণ করিলেন। তৎপরে তিনি চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে পুনরায় রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থে উপস্থিত হইলেন এবং যুধিষ্ঠির বাহনের সহিত সমস্ত ধন প্রদান করিয়া তাঁহার আদেশানুসারে গৃহে প্রবেশ করিলেন।

ভীমের পূর্বদিকে গমন ও জয়লাভ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এই অবসরে ভীম-পরাক্রম ভীম যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে করিতুরগসঙ্কুল' বহুল বল সমভিব্যাহারে পূর্ব্ব দিগ্বিভাগে যাত্রা করিলেন এবং অনতি-কালমধ্যে পাঞ্চালনগরে উপনীত হইয়া বিবিধ উপায় উদ্ভাবন-পূর্ব্বক পাঞ্চালদিগকে স্ববশে আনিলেন। অনন্তর তিনি বিদেহ ও গণ্ডকদিগকে পরাজয় করিয়া অত্যল্পকালবিলম্বেই দশার্ণদেশ অধিকার করিলেন। তথায় দশার্ণাধিপতি সুধৰ্ম্মা ভীমসেনের সহিত অতি ভয়ঙ্কর বাহুযুদ্ধ করিলেন। সেই মহাবল মহীপালের বাহুবল পরীক্ষা করিয়া ভীম তাহাকে পরাজিত ও সেনাপতিমধ্যে প্রধানভূত করিয়া রাখিলেন।

অনন্তর ভীমসেন বাহিনী-সমভিব্যাহারে বলভরে বসুন্ধরাকে কম্পান্বিত করিয়া পূর্ব্বদিকে যাত্রা করিলেন। তথায় সমরানল প্রজ্বলিত করিয়া বাহুবলে অনুচরবর্গের সহিত অশ্বমেধেশ্বর রোচমানকে পরাজয় করিলেন। ভীম মহারাজ রোচমানকে অবলীলাক্রমে পরাজয় করিয়া পূর্ব্বদেশ অধিকার করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি দক্ষিণ দিগ্বিভাগস্থ পুলিন্দনগরে উপস্থিত হইয়া সুকুমার ও সুমিত্রনামা ভূপালদ্বয়কে বশীভূত করিলেন। তৎপরে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে মহাবল শিশুপালসন্নিধানে উপনীত হইলেন। চেদিরাজ ভীমের অভিপ্রেত সম্যক্ অবগত ও রাজধানী হইতে নির্গত হইয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। সাক্ষাৎ হইবা মাত্রউভয়ে আত্মকুলগত কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তদনন্তর শিশুপাল স্বরাজ্যের অবস্থা নিবেদন করিয়া সস্মিতবদনে কহিলেন, হে মহাবাহো! এক্ষণে কিরূপ কার্য্য সংসাধনে অধ্যবসায় করিয়াছ? ভীমসেন প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে দিগ্বিজয়ার্থ নির্গত হইয়া কর-সংগ্রহ করিতেছি। এই কথা শুনিবামাত্র চেদিরাজ তাঁহাকে কর প্রদান করিলেন। তৎপরে ভীমসেন তথায় ত্রিংশদ্দিবস বাস করিয়া শিশুপালকর্তৃক সমাদৃত ও সৎকৃত হইয়া বলবাহন সমভিব্যাহারে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।

ভীমের পরাক্রম।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ভীম, কুমাররাজ্যে শ্রেণী-মান্ ও কোশলাধিপতি বৃহদ্বলকে পরাজয় করিলেন। তৎপরে অযোধ্যায় উপস্থিত হইয়া অনতিতীব্র কর্মদ্বারা ধর্মজ্ঞ মহাবল দীর্ঘযজ্ঞকে জয় করিলেন। তদনন্তর গোপালকক্ষ, উত্তর কোশল-প্রদেশ ও মল্লাধিপতিকে স্ববশে আনিলেন। তৎপরে হিমালয়ের পার্শ্বদেশে বল প্রকাশপূর্ব্বক অল্পকালমধ্যে সমুদায় জলোদ্ভব-দেশত অধিকার করিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে অনেকানেক দেশ ভীমসেনের অধিকৃত হইল।

তৎপরে ভীমসেন ভল্লাট ও শুক্তিমান্ পৰ্ব্বত পরাজয় এবং নিজ বাহুবলে কাশিরাজসহিত সুবাহুকে বশীভূত করিলেন। অনন্তর সুপার্শ্ব, যুধ্যমান ও রাজপতি ক্রথকে বল-পূর্ব্বক পরাজয় করিলেন। তৎপরে মৎস্য ও মহাবল মলদ-দিগকে এবং পশুভূমি সকল জয় করিতে লাগিলেন। তৎপরে তথা হইতে প্রতিগমনপূর্ব্বক মদধার মহীধর ও সোমধেয়দিগকে জয় করিয়া উত্তরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। উত্তর দেশে উপস্থিত হইয়া মহাবল ভীম বল প্রকাশপূর্ব্বক বৎসভূমি অধিকার করিলেন। তৎপরে ভর্গের অধীশ্বর, নিষাদাধিপতি ও মণিমান্ প্রভৃতি মহীপালদিগকে পরাজয় করিতে লাগিলেন। অনন্তর অনতিতীব্র কর্মদ্বারা দক্ষিণ মল্ল ও ভোগবান্ পর্ব্বতকে পরাজয় করিলেন। তৎপরে সান্ত্ববাদ প্রয়োগপূর্ব্বক শৰ্ম্মক ও বর্ম্মক-দিগকে জয় করিতে লাগিলেন। পরে মহারাজ বৈদেহক ও জগতীপতি জনককে পরাজয় করিলেন এবং ছলপ্রকাশপূর্ব্বক শক ও বর্ব্বরদিগকে আত্মবশে আনিলেন। তৎপরে ইন্দ্রপর্ব্বত-সন্নিধানে বিদেহদেশে বাস করিয়াই তিনি সপ্ত প্রকার কিরাতা-ধিপতিদিগকে পরাজয় করিলেন। অনন্তর স্বপক্ষ হইলেও সুহ্ম ও প্রসুহ্মদিগকে যুদ্ধে জয় করিয়া মগধদিগের প্রতি ধাবমান হইলেন। তথায় দণ্ড, দণ্ডধার ও অন্যান্য মহীপালদিগকে জয় করিয়া তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারে গিরিব্রজে যাত্রা করিলেন। গিরিব্রজে উপস্থিত হইয়া জরাসন্ধতনয়কে সান্ত্বনা ও হস্তগত করিয়া তাঁহাদিগের সহিত কর্ণের প্রতি ধাবমান হইলেন। পরে চতুরঙ্গ বল সমভিব্যাহারে মেদিনীমণ্ডল চালিত করিয়া কর্ণের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে কর্ণকে যুদ্ধে পরাজিত ও আপনার বশীভূত করিয়া পর্ব্বতবাসী রাজগণকে জয় করিলেন।

অনন্তর মোদাগিরিতে উপস্থিত হইয়া নিজ বাহুবলে সেই স্থলের রাজাকে সংগ্রামে সংহার করিলেন। তৎপরে মহাবল মহাবীর পুণ্ড্রাধিপতি বাসুদেব ও কৌশিকী কচ্ছবাসী মহৌজা' রাজা, এই দুই মহাবল পরাক্রান্ত মহাবীরকে পরাজয় করিয়া বঙ্গরাজের প্রতি ধাবমান্ হইলেন। তৎপরে সমুদ্রসেন, চন্দ্রসেন, তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি বঙ্গদেশাধিশ্বরদিগকে ও সুহ্মদিগের অধীশ্বর এবং মহাসাগর-কুলবাসী ম্লেচ্ছগণকে জয় করিলেন।

এইরূপে মহাবীর ভীম অনেকানেক দেশ অধিকার ও তথা হইতে কর সংগ্রহ করিয়া মহারাজ লৌহিত্যের নিকট উপনীত হইলেন। সাগরকূলবাসী ম্লেচ্ছরাজগণ ভীমকে বিবিধ রত্ন, চন্দন, অগুরু, বস্ত্র, মণি, মৌক্তিক, কম্বল, কাঞ্চন, রজত, বিদ্রুম প্রভৃতি মহামূল্য দ্রব্যজাত প্রদান করিয়াছিল। ভীম এই সমস্ত সামগ্রী গ্রহণপূর্ব্বক ইন্দ্রপ্রস্থে উপস্থিত হইয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে প্রদান করিলেন।

সহদেবের দক্ষিণদিকে গমন ও জয়লাভ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর সহদেব ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির কর্তৃক পূজিত হইয়া মহতী সেনা সমভিব্যাহারে দক্ষিণদিকে যাত্রা করিলেন। তিনি প্রথমতঃ মথুরা নগরী জয় করিলেন। তৎপরে মৎস্যরাজ তদীয় বলবীর্য্যের বশীভূত হইলেন। অনন্তর অধিরাজাধিপতি মহাবল দন্তবক্রকে জয় ও তাঁহাকে করদ করিয়া স্বরাজ্যে স্থাপিত করিলেন। তৎপরে সুকুমার ও নরাধিপ সুমিত্রকে বশীভূত করিয়া পটচ্চর ও অপর মৎস্যদিগকে পরাজয় করিলেন। তৎপরে নিষাদভূমি, গোশৃঙ্গ পৰ্ব্বত ও শ্রেণিমান্ পার্থিবকে বল প্রকাশ করিয়া বশীভূত করিলেন। তৎপরে নবরাষ্ট্রকে জয় করিয়া কুন্তিভোজের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। কুন্তিভোজ প্রীতিপূর্ব্বক সহদেবের শাসন শিরোধার্য্য করিলেন। অনন্তর স্রোতস্বতী চৰ্ম্মন্বতীর তীরদেশে পূর্ব্ববৈরী বাসুদেবকর্তৃক পরাজিত জম্ভকাত্মজ মহারাজকে দেখিলেন। তিনি সহদেবের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিলেন। পরিশেষে সহদেব তাঁহাকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তথায় সেক ও অপরসেক সহদেবের নিকট পরাজিত হইলেন। সহদেব তাঁহাদিগের নিকট কর গ্রহণ ও বিবিধ রত্ন আহরণ করিয়া তাঁহাদিগেরই সমভিব্যাহারে নর্মদা নদীর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। তথায় সুমহৎ সৈন্যসমূহ পরিবৃত অবন্তিদেশসমুৎপন্ন মহাবীর বিন্দানুবিন্দদ্বয়কে যুদ্ধে জয় করিয়া তাঁহাদিগের নিকট বিবিধ রত্ন গ্রহণপূর্ব্বক ভোজকটপুরে গমন করিলেন। সেই স্থানে নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ মহারাজ ভীষ্মকের সহিত দুই দিবস ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল, পরিশেষে তাঁহাকে পরাজয় করিয়া কোশলাধিপতি, বেশ্বানদীর তীরস্থ নৃপতি আরণ্যক ও অযোধ্যার পূর্ব্বাংশের অধীশ্বরকে সমরে পরাজয় করিলেন।

তৎপরে নাটকেয় ও হেরম্বকদিগকে যুদ্ধে জয় করিয়া মারুধ ও মুঞ্জগ্রাম বলপূর্ব্বক অধিকার করিলেন। তৎপরে নাটবিক, অব্বুক ও সেই সমস্ত আরণ্যক নৃপতিদিগকে জয় করিতে লাগিলেন। অনন্তর বাতাধিপতিকে হস্তগত ও পুলিন্দ-দিগকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া সহদেব দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করিলেন। পাণ্ড্যরাজের সহিত তাঁহার একদিবস যুদ্ধ হইল। তিনি পাণ্ড্যরাজকে পরাজয় করিয়া দক্ষিণাপথে প্রস্থান করিলেন। ত্রিলোকবিখ্যাতা কিষ্কিন্ধ্যানাম্নী বানরনগরীতে উপস্থিত হইয়া বানররাজ মৈন্দ ও দ্বিবিদের সহিত সাতদিবস ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহারা কিছুতেই পরিশ্রান্ত বা বিকার প্রাপ্ত হইলেন না। তখন তাঁহারা সাতিশয় হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইয়া সহদেবকে প্রীতিপূর্ব্বক কহিলেন, হে পাণ্ডবশাদুল। তুমি আমাদিগের নিকট বিবিধ রত্ন গ্রহণপূর্ব্বক এস্থান হইতে প্রস্থান কর। তুমি যে কার্য্য সমাধা করিতে উদ্যত হইয়াছ, তদ্বিষয়ে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। অনন্তর তিনি তথা হইতে রত্ন গ্রহণপূর্ব্বক মাহিস্মতী নগরীতে গমন করিলেন। তথায় মহারাজ নীলের সহিত সহদেবের সৈন্যক্ষয়কর ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। সকলের প্রাণসঙ্কট উপস্থিত; ভগবান্ হুতাশন ঐ যুদ্ধে নীলরাজকে, সাহায্যদান করিতে লাগিলেন। সহদেবের সৈন্য-মধ্যে অশ্ব, রথ, হস্তী, পুরুষ ও কবচসমুদায় প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। এই বিস্ময়কর ব্যাপার সন্দর্শনে কুরুনন্দন সহদেব ইতি কর্তব্য-তাবিমূঢ় হইয়া রহিলেন।

মাহিস্মতীর অজেয়তা।

জনমেজয় কহিলেন, হে তপোধন! সহদেব রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করিতেছিলেন, ভগবান্ বহ্নি কি নিমিত্ত রণক্ষেত্রে তাঁহার বিপক্ষতাচরণ করিলেন? বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপ কিংবদন্তী আছে যে, পূর্ব্বে মাহিস্মতীবাসী ভগবান্ পাবক পারদারিক বলিয়া গৃহীত হন। নীলরাজের সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী এক কুমারী ছিল, সে সর্ব্বদা পিতার বোধন' সাধনের নিমিত্ত অগ্নির উপাসনা করিত। অগ্নি, ঐ রাজকুমারীর রমণীয় ওষ্ঠপুট বিনির্গত বায়ু ব্যতিরেকে ব্যজনদ্বারা উপবীজ্যমান হইলেও প্রজ্বলিত হইতেন না। অনন্তর বহ্নি ব্রাহ্মণরূপ পরিগ্রহ করিয়া সেই পদ্মপলাশলোচনা সুদর্শনা কন্যার সহিত স্বেচ্ছাক্রমে বিহার করিতে লাগিলেন এবং রাজাকে অনাদর করিয়া সকলের গৃহেই গমনাগমন করিতেন। ধর্মপরায়ণ রাজা এই বৃত্তান্ত অবগত হইয়া শাস্ত্রানুসারে তাহাকে শাসন করিলেন। তখন ভগবান্ অগ্নি ক্রোধে অধীর হইয়া প্রজ্বলিত হইলেন। রাজা এই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া বিপ্ররূপী বহ্নির শরণ গ্রহণপূর্ব্বক শুভ দিনে ও শুভলগ্নে তাঁহাকে কন্যা সম্প্রদান করিলেন। অনল নীলরাজ-দুহিতাকে প্রতিগ্রহ করিয়া প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, মহারাজ! বর প্রার্থনা কর। রাজা এইরূপ অভিহিত হইয়া আপনার ও সৈন্য-সামন্তের অভয় প্রার্থনা করিলেন। তদবধি এই বৃত্তান্ত না জানিয়া যে কোন নরপতি মাহিস্মতী পুরী জয় করিতে ইচ্ছা করেন, ভগবান্ অগ্নি তাঁহাকে দগ্ধ করিয়া থাকেন। তদবধি এই নগরীতে কেহই স্ত্রীলোকদিগকে স্বেচ্ছানুসারে গ্রহণ করিতে পারেন না। অগ্নি মহিলাগণকে "আবরণীয়া হও” এই বলিয়া বর প্রদান করাতে, তদবধিই তাহারা স্বৈরিণী হইয়া ইচ্ছানুসারে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিয়া থাকে। এইরূপ ব্যাপার দেখিয়া ও অগ্নিভয়ে ভীত হইয়া রাজগণ মাহিম্মতী নগরী পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।

এইরূপে উপাখ্যান সমাপন করিয়া বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। সহদেব সৈন্যদিগকে অগ্নিপরীত২ ও একান্ত ভীত দেখিয়া অচলের ন্যায় নিশ্চল হইয়া রহিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে শুচি হইয়া আচমনপূর্ব্বক পাবককে এইরূপ স্তব করিতে লাগিলেন। "ভগবন্। আমি আপনার প্রসাদেই দিগ্বিজয় করিতেছি, আপনাকে নমস্কার করি। আপনি দেবগণের মুখস্বরূপ ও আপনিই যজ্ঞ। জগৎকে পবিত্র করিতেছেন, এই নিমিত্ত আপনার নাম পাবক। বহনীয় দ্রব্যজাত বহন করিয়া থাকেন, এই কারণে হব্যবাহন হইয়াছেন। আপনার নিমিত্ত বেদ জন্মিয়াছে, এই জন্যই সকলে আপনাকে জাতবেদাঃ বলিয়া থাকে। হে বিভাবসো। আপনিই চিত্রভানু, সুরেশ ও অনল। আপনিই স্বর্গদ্বারস্পর্শী হুতাশন, জ্বলন ও শিখী। আপনিই বৈশ্বানর, পিঙ্গেশ ও সর্ব্বতেজোনিধান, কুমারসূত। আপনিই ভগবান্ রুদ্রগর্ত ও হিরণ্যকৃৎ। হে অনল। আপনি আমাকে তেজঃ প্রদান করুন। বায়ু প্রাণদান ও পৃথিবী বলাধান করুন, জল মঙ্গলসাধন করুন। ভগবন্! আপনা হইতে বারি সম্ভূত হয়, আপনি সুরশ্রেষ্ঠ ও দেবগণের মুখস্বরূপ! আপনি এক্ষণে আমাকে পবিত্র করুন। ঋষি, ব্রাহ্মণ, দেবতা ও অসুরগণ যে সমস্ত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, আপনি তথায় অবস্থান করিয়া থাকেন। এক্ষণে সত্যদ্বারা আমাকে পবিত্র করুন। হে অগ্নে! আমি প্রীত ও শুচি হইয়া আপনাকে স্তব করিতেছি, এক্ষণে আপনি আমাকে তুষ্টি, পুষ্টি, শ্রুতি ও প্রীতি প্রদান করুন।”

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! যিনি এইরূপ আগ্নেয় মন্ত্র উচ্চারণপূর্ব্বক হোম করিয়া থাকেন, তিনি সম্পত্তিশালী, দান্ত ও সর্ব্বপাপ হইতে বিমুক্ত হন।

অগ্নির স্তুতিবাদ করিয়া সহদেব তাঁহার নিকট এই প্রার্থনা করিলেন, ভগবন্ হব্যবাহন। আপনি এই যজ্ঞে কোন বিঘ্ন সম্পাদন করিবেন না। এইরূপ প্রার্থনানন্তর তিনি ভূতলে কুশ বিস্তীর্ণ করিয়া বিধিপূর্ব্বক পাবকের অভিমুখে উপবেশন করিলেন। যেমন মহাসাগর তীরভূমি অতিক্রম করে না, সেইরূপ অগ্নি ভীত ও উদ্বিগ্ন সৈন্যগণ এবং সম্মুখে আসীন নরদেব সহদেবকে অতিক্রম করিলেন না। অনন্তর অগ্নি অতিমন্দ গমনে প্রণত সহদেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সান্ত্ববাদ প্রয়োগপূর্ব্বক কহিলেন, হে কুরুনন্দন! উত্থিত হও। তোমার ও ধৰ্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠিরের অভিপ্রায় সম্যক্ অবগত হইয়াছি; তথাচ যে পর্যন্ত নীলরাজের বংশে কোন বংশধর রাজা থাকিবেন, তদবধি আমি এই নগরী রক্ষা করিব। এক্ষণে তোমার যেরূপ মনোরথ, তাহা সফল হইবে।

ইহা শ্রবণে মাদ্রীতনয় হৃষ্টান্তঃকরণে উত্থিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নমস্কার করিয়া বহ্নির পূজা করিলেন। বহ্নি প্রতিনিবৃত্ত হইলে পর, মহারাজ নীল তদীয় আদেশানুসারে সহদেবসন্নিধানে উপনীত হইয়া শাস্ত্রানুসারে তাঁহার অর্চ্চনা করিলেন। সহদেব পূজা গ্রহণপূর্ব্বক নীলরাজকে হস্তগত করিয়া দক্ষিণাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। নরদেব সহদেব প্রভূত পরাক্রমশালী ত্রৈপুররক্ষককে স্ববশে স্থাপন করিয়া পৌরবে-শ্বরকে বলপূর্ব্বক আপনার বশীভূত করিয়া রাখিলেন। অনন্তর দৃঢ়তর যত্নসহকারে সুরাষ্ট্রাধিপতি কৌশিকাচার্য্য আকৃতিকে আপনার বশবর্তী করিলেন। সুরাষ্ট্ররাজ্যে অবস্থান করিয়াই তিনি ভোজকটস্থ মহাপাত্র রুক্মী ও পরম ধার্মিক দেবরাজসখা মহারাজ ভীষ্মকের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন। ভীষ্মক ও তাঁহার পুত্র উভয়েই সহদেবের শাসন শিরোধার্য্য করিলেন। তৎপরে মাদ্রীসুত সহদেব প্রীতিপূর্ব্বক বাসুদেবের সহিত সাক্ষাৎ ও তাঁহার নিকট হইতে উৎকৃষ্ট দ্রব্যজাত গ্রহণপূর্ব্বক পুনরায় গমন করিতে লাগিলেন। তৎপরে শূর্পারক, তালাকট ও দণ্ডকদিগকে বশীভূত করিলেন। তদনন্তর সাগরদ্বীপবাসী ও ম্লেচ্ছযোনি-সম্ভূত ভূপতি, নিষাদ, রাক্ষস, কর্ণ, প্রাবরণ, নবরাক্ষসযোনিজ কালমুখ, কোলগিরি, সুরভীপট্টম, তাম্রাক্ষ দ্বীপ, রামকঃ পর্ব্বত ও তিমিঙ্গিল বশীভূত করিয়া একপাদ পুরুষ, বনবাসী কেরক, সঞ্জয়ন্তী নগরী ও করহাটক, এই সকলকে কেবল দূত দ্বারা আপনার বশবর্তী করিয়া কর আহরণ করিলেন। পরে পাণ্ড্য, দ্রবিড়, ওড্র, কেরল, অন্ধ্র, তালবন, কলিঙ্গ, উষ্ট্র, কর্ণিক, রমণীয়া আটবী পুরী ও যবনপুর দূতদ্বারা নিজায়ত্ত করিয়া কর সংগ্রহ করিলেন। তৎপরে মাদ্রবতীতনয় সমুদ্রের কচ্ছদেশে অবস্থান করিয়াই পুলস্ত্যনন্দন মহাত্মা বিভীষণের নিকট দূত পাঠাইলেন। বিভীষণ প্রীতিপূর্ব্বক তাঁহার শাসন শিরোধার্য্য করিয়া বিবিধ রত্ন, অগুরু, চন্দন কাষ্ঠ, দিব্য আভরণ, মহার্হ বসন, মহামূল্য মণি প্রেরণ করিলেন। মহারাজ! এইরূপে ধীমান্ সহদেব বল, সান্ত্ববাদ প্রয়োগ ও বিজয়দ্বারা পার্থিবদিগকে করদ করিয়া প্রত্যাগমন করিলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে জয়লব্ধ সমস্ত দ্রব্যজাত সমর্পণপূর্ব্বক কৃতকৃত্য হইয়া পরমসুখে বাস করিতে লাগিলেন।

নকুলের পশ্চিমদিকে গমন ও জয়লাভ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর নকুল যেরূপে বাসুদেবজিত দিক্সকল জয় করিলেন, সেই বিজয়বৃত্তান্ত এক্ষণে বর্ণন করিতেছি, অবধান করুন। নকুল খাণ্ডবপ্রস্থ হইতে বিনির্গত হইয়া সেনাগণ সমভিব্যাহারে পশ্চিমাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানসময়ে বীরগণের সিংহনাদ ও রথচক্রের ঘর্ঘরধ্বনিদ্বারা মেদিনীমণ্ডল কম্পিত হইতে লাগিল। নকুল গোকুলসঙ্কুল, প্রভূত ধনধান্যপরিপূরিত, সমৃদ্ধিশালী, সুরম্য, কার্তিকেয়প্রিয় রোহিতক দেশে প্রয়াণ করিলেন। তথায় মহাসুর মত্ত ময়ূরগণ সমভিব্যাহারে তাঁহার তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইল। পরিশেষে তিনি মরুভূমি শৈরীষক ও বহুধান্যসম্পন্ন মহেখদেশ সম্পূর্ণ অধিকার করিতে লাগিলেন। তৎপরে প্রবল যুদ্ধানল প্রজ্বলিত করিয়া আক্রোশনামক রাজর্ষিকে বশীভূত করিলেন। তদনন্তর দশার্ণ, শিবি, ত্রিগর্ত, অম্বষ্ঠ, মালব, পঞ্চকর্পট, মধ্যমকেয়, বাটধান ও দ্বিজগণকে পরাজয় করিয়া প্রস্থান করিলেন। পুনরায় প্রত্যাগমন করিয়া পুষ্করারণ্যবাসী উৎসবসঙ্কেত নামক গণকে পরাজয় করিতে লাগিলেন। তৎপরে সমুদ্রতীরস্থিত ও জনপদবাসী শূদ্র আভীরগণ, যাহারা সরস্বতী নদী আশ্রয় করিয়া মৎসদ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করিয়া থাকে, তাহাদিগকে পরাজয় করিয়া পর্ব্বতবাসী সমস্ত পঞ্চনদ, অমর পর্ব্বত, উত্তর জ্যোতিষ, দিব্যকটপুর ও দ্বারপালকে বলপূর্ব্বক বশীভূত করিলেন। অনন্তর আজ্ঞাক্রমে রামঠ, হারতৃণ ও প্রতীচ্য ভূপালদিগকে আপনার বশে আনিলেন। তৎপরে তথায় অবস্থান করিয়াই বাসুদেবের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন। বাসুদেব ও যাদবগণ তাঁহার শাসন গ্রহণ করিলেন, অবশেষে শাকলে উপস্থিত হইয়া মদ্রদিগের নগর অধিকার 'করিয়া মাতুল শল্যকে প্রীতিপূর্ব্বক বশীভূত করিলেন। মাদ্রীসুত নকুল শল্যকর্তৃক সৎকৃত হইয়া প্রভূত রত্ন গ্রহণপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। পরিশেষে সাগরগর্ভস্থ পরম দারুণ ম্লেচ্ছ, পহৃব, বর্ব্বর, কিরাত, যবন ও শকদিগকে বশীভূত ও তাহাদিগের নিকট হইতে উৎকৃষ্ট দ্রব্যজাত সংগ্রহ করিয়া অবশিষ্ট অন্যান্য পার্থিবদিগকে জয় করিলেন।

এইরূপে নকুল দিগ্বিজয় করিয়া প্রত্যাগমন করিলেন। সহস্র করভ' তাঁহার মহাধনকোষ অতিকষ্টে বহন করিতে লাগিল।

দিগ্বিজয় পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।