আদিপর্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| জতুগৃহ পর্ব্বাধ্যায় | |
| হিড়িম্ববধ পর্ব্বাধ্যায় | |
| বকবধ পর্ব্বাধ্যায় | |
| চৈত্ররথ পর্ব্বাধ্যায় | |
| স্বয়ংবর পর্ব্বাধ্যায় |
জতুগৃহ পর্ব্বাধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর সুবলনন্দন শকুনি, দুর্য্যোধন, দুঃশাসন ও কর্ণ দুষ্টমন্ত্রণা করিয়া ধৃতরাষ্ট্রের নিকট গমন করিল এবং তাঁহার সহিত পরামর্শ করিয়া কুন্তী ও যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ ভ্রাতাকে দগ্ধ করিতে মনস্থ করিল। তত্ত্বদর্শী মহাত্মা বিদুর আকার ও ইঙ্গিতদ্বারা ঐ পামরগণের দুষ্টাভিসন্ধি বুঝিতে পারিলেন। ঐ মহাত্মা পাণ্ডবগণের একান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। কুত্তী কুমারগণ সমভিব্যাহারে অনায়াসে পলায়ন করুন, এই অভিপ্রায়ে তিনি একখানি নৌকা প্রস্তুত করাইলেন। ঐ তরণী বাতসহ', যন্ত্রযুক্ত', পতাকাসুশোভিত ও সুদৃঢ়; বায়ুবেগোত্থিত প্রবল সমুদ্র-তরঙ্গও উহাকে হঠাৎ মগ্ন করিতে পারে না। নৌকা প্রস্তুত হইলে বিদুর কুন্তীর নিকটে গমন করিয়া কহিলেন, হে শুভে! কুরুকুলের কীর্তিনাশক বিপরীতবুদ্ধি দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্র নিত্যধর্ম পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছেন, অতএব তুমি এই উত্তাল-তরঙ্গবেগসহা তরণী আরোহণ করিয়া সন্তানগণ সমভিব্যাহারে ত্বরায় পলায়ন কর, তাহা হইলেই তোমাদিগের প্রাণরক্ষা হইবে, নচেৎ আর নিস্তার নাই। কুস্তী বিদুরের বাক্য শ্রবণ করিয়া সাতিশয় ব্যথিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ কুমারগণ সমভিব্যাহারে নৌকারোহণ করিয়া গঙ্গা পার হইলেন। পরে বিদুরদত্ত ধনসম্পত্তি গ্রহণপূর্ব্বক তীরে উত্তীর্ণ হইয়া নির্বিঘ্নে পরম রমণীয় কাননে প্রবেশ করিলেন। এদিকে নিষাদী পঞ্চপুত্র সমভিব্যাহারে পুরোচননিৰ্ম্মিত জতুগৃহে শয়ানা ছিল। ঐ রজনীতে পুরোচন সেই জতুগৃহে বহ্নি প্রদান করিল, সুতরাং উহারা ছয় জন ভস্মসাৎ হইয়া গেল এবং দুৰ্ম্মতি ম্লেচ্ছাধম পুরোচনও ভস্মাবশেষ হইল। নিষাদী ও তাহার পঞ্চপুত্র ভস্মীভূত হওয়াতে ধার্তরাষ্ট্রেরা বোধ করিল, কুন্তী পঞ্চপুত্র সমভিব্যাহারে অগ্নিতে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহারা যে বিদুরের পরামর্শানুসারে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিয়া প্রাণরক্ষা করিয়াছেন, তাহার বিন্দুবিসর্গও জানিতে পারিল না। যাহা হউক, বারণাবতস্থ লোকেরা জতুগৃহ দগ্ধ হইয়াছে দেখিয়া, পাণ্ডবগণের গুণরাশি স্মরণ করিয়া যৎপরো-নাস্তি শোক করিতে লাগিল। পরে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে এই সমাচার পাঠাইল “হে কৌরব্য! তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইয়াছে, আর ভয় নাই, তুমি পাণ্ডবগণকে দগ্ধ করিয়াছ; এক্ষণে পুত্রগণ সমভিব্যাহারে নিঃশঙ্কচিত্তে রাজ্যভোগ কর” ধৃতরাষ্ট্র, জননীসমবেত পাণ্ডবগণের মৃত্যুবার্তা শ্রবণ করিয়া পুত্রগণ-সমভিব্যাহারে কৃত্রিম শোক প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং তদনন্তর ভীষ্ম ও বিদুর বন্ধুবান্ধবগণ সমভিব্যাহারে তাহাদিগের প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিলেন।
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! জতুগৃহ দাহ ও তাহা হইতে পাণ্ডবগণের পরিত্রাণবৃত্তান্ত বিস্তারিতরূপে শ্রবণ করিতে বাসনা করি। হে ব্রহ্মন্! জতুগৃহদাহ অতিশয় দুষ্কৰ্ম্ম ও নিতান্ত নৃশংস ব্যাপার; উহা শুনিতে আমার অত্যন্ত কৌতূহল হইতেছে; আপনি অনুগ্রহ করিয়া সবিশেষ বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! যেরূপে জতুগৃহ দগ্ধ হয় এবং পাণ্ডবগণ তাহা হইতে মুক্ত হন, তৎসমুদায় সবিস্তর বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন ভীমসেনকে মহাবলপরাক্রান্ত ও অর্জুনকে কৃতবিদ্য দেখিয়া সাতিশয় পরিতাপযুক্ত হইল। দুরাত্মা কর্ণ ও শকুনি নানাবিধ উপায়দ্বারা পাণ্ডবগণের হিংসা করিতে লাগিল। পাণ্ডবেরাও বিদুরের মতানুসারে উহার উদ্ভাবন' করিতেন না, কেবল যখন যে দুর্ঘটনা উপস্থিত হইত, যথাসাধ্য তাহার প্রতীকার করিতেন। এদিকে যাবতীয় পুরবাসীরা পাণ্ডবগণকে অশেষ গুণসম্পন্ন দেখিয়া সভামধ্যে তাঁহাদিগের গুণগ্রাম বর্ণন করিতে আরম্ভকরিল। তাহারা কি সভামণ্ডলে, কি চত্বরে, একত্র হইলেই কহে যে, মহাত্মা পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠতনয় যুধিষ্ঠির রাজ্য পাইবার উপযুক্ত পাত্র। প্রজ্ঞাচক্ষুঃ রাজা ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ বলিয়া পূর্ব্বে রাজ্যপ্রাপ্ত হয়েন নাই, তবে তিনি কি বলিয়া এক্ষণে ভূপতি হইবেন? সত্যপ্রতিজ্ঞ মহাব্রত শান্তনুনন্দন ভীষ্ম রাজ্য লইবেন না বলিয়া পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, সুতরাং তিনি রাজ্যভার বহন করিবেন না, অতএব আমরা যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ তরুণবয়স্ক ধৰ্ম্মাত্মা পাণ্ডবজ্যেষ্ঠকে রাজ্যে অভিষেক করিব। সেই ধর্মাত্মা সত্যশীল, কারুণ্যসম্পন্ন ও বেদবেত্তা; তিনি অবশ্যই শান্তনুতনয় ভীষ্ম ও পুত্রগণসমবেত ধৃতরাষ্ট্রকে যথোচিত পূজা করিবেন এবং তাঁহাদিগকে বিবিধ রাজভোগ প্রদান করিবেন। মুঢ়মতি দুর্য্যোধন যুধিষ্ঠিরানুরক্ত পৌরগণের সেই বাক্য শ্রবণ। করিয়া যৎপরোনাস্তি পরিতপ্ত ও ঈর্ষান্বিত হইল এবং সত্বরে স্বীয় পিতা ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে একাকী দেখিয়া পাদবন্দনপূর্ব্বক কহিতে লাগিল, হে পিতঃ। পৌরগণ আপনাকে ও ভীষ্মকে পরিত্যাগ করিয়া যুধিষ্ঠিরকে রাজা করিতে চাহে, রাজ্যভোগপরাজুখ ভীষ্মেরও উহাতে সম্পূর্ণ মত আছে। হে নরনাথ। পৌরবর্গের মুখে এই অশ্রেয়স্কর বাক্য শ্রবণ করিয়া আমার অত্যন্ত মনোব্যথা হইতেছে; দেখুন, পূর্ব্বে মহারাজ পাণ্ডু গুণবান্ বলিয়া পিতৃরাজ্য পাইয়াছিলেন, আপনি জন্মান্ধত্ব-প্রযুক্ত জ্যেষ্ঠ হইয়াও রাজ্যলাভ করিতে পারেন নাই। এক্ষণেও যদি পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির পৈত্রিক রাজ্য প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে তৎপরে তৎপুত্র, তদনন্তর তদীয় পৌত্র, এইরূপে ক্রমশঃ পাণ্ডুবংশীয়েরাই সুখসাম্রাজ্য ভোগ করিতে রহিল; আমরা পুত্রপৌত্রাদিক্রমে রাজবংশে থাকিয়া জনগণের নিকটে হীন ও অবজ্ঞাত হইয়া রহিব। পরপিণ্ডোপজীবী লোকেরা সর্ব্বদা নরক ভোগ করে, অতএব হে রাজন! যাহাতে আমরা ঐ নরক হইতে মুক্ত হইতে পারি, এরূপ কোন পরামর্শ করুন। হে মহারাজ! যদি আপনি পূর্ব্বে এই রাজ্য প্রাপ্ত হইতেন, তাহা হইলে প্রজাগণ যতই অবশ হউক না কেন, আমরা অবশ্যই রাজত্ব লাভ করিতে পারিতাম।
ধৃতরাষ্ট্র তদীয় বাক্য শ্রবণে ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কহিতে লাগিলেন, ধর্মপরায়ণ পাণ্ডু সমস্ত জ্ঞাতিবর্গের বিশেষতঃ আমার প্রতি সর্ব্বদা ধর্মানুযায়ী ব্যবহার করিতেন। তিনি আপনার ভোজনাদি কার্য্যেও কিছুমাত্র মনোযোগ করিতেন না এবং প্রত্যহ আমার নিকটে রাজ্যসংক্রান্ত বৃত্তান্তসকল নিবেদন করিতেন। তাঁহার পুত্র যুধিষ্ঠির তাঁহার ন্যায় ধর্মপরায়ণ, গুণবান্, লোক বিখ্যাত এবং পৌরগণের প্রিয়। এই রাজ্য তাঁহার পৈত্রিক, বিশেষতঃ তিনি সহায়সম্পন্ন; আমি কি প্রকারে তাঁহাকে এস্থান হইতে বিদায় করিতে পারিব? পাণ্ডু পূর্ব্বে অমাত্যবর্গ, সৈন্যগণ এবং তাহাদিগের পুত্র-পৌত্র সকলকে পরম যত্ন-সহকারে প্রতিপালন করিয়াছেন, এক্ষণে তাহারা সেই পাণ্ডুকৃত পূর্ব্বোপকার স্মরণ করিয়া যুধিষ্ঠিরের হিতসাধনার্থ আমাদিগকে সবংশে অবশ্যই বিনাশ করিবে।
দুর্য্যোধন কহিল, হে পিতঃ! আপনি যাহা কহিলেন, যথার্থ বটে, কিন্তু তাহাদিগকে ধন ও সমুচিত সম্মান প্রদানদ্বারা পরিতুষ্ট করিলে তাহারা অবশ্যই আমাদিগের সহায় হইবে। এক্ষণে সমুদায় ধন ও অমাত্যবর্গ আমারই অধীন; অতএব আপনি কোন সহজ কৌশলদ্বারা কুন্তী ও পাণ্ডবগণকে ত্বরায় বারণাবত নগরে প্রেরণ করুন। পরে আমরা সমুদায় সাম্রাজ্য হস্তগত করিলে পর, কুন্তী পুত্রগণসমভিব্যাহারে পুনর্ব্বার এস্থানে আগমন করিবে।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে দুর্য্যোধন! তুমি যাহা কহিলে তাহা আমার অভিপ্রেত বটে, কিন্তু বৎস! এই অভিপ্রায় নিতান্ত পাপপূর্ণ বলিয়া আমি এতাবৎকালমধ্যে প্রকাশ করিতে পারি নাই। আর ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর ও কূপ, ইঁহারাও কেহ পাণ্ডবগণের নির্বাসনে কদাচ সম্মত হইবেন না। ধৰ্ম্মশীল কুরুবংশীয়গণআমাদিগকে ও পাণ্ডবগণকে সমান জ্ঞান করেন; তাঁহারা কখনই পাণ্ডবগণের প্রতি অত্যাচার করিলে সহ্য করিবেন না; অতএব যদি আমরা বিনাপরাধে পাণ্ডবগণকে তাহাদের পৈত্রিক রাজ্য হইতে নির্ব্বাসিত করি, তাহা হইলে মনস্বী কৌরবেয়গণ ও ভীষ্মাদি ধর্মাত্মারা কেনই বা আমাদিগকে সমূলে উম্মলন করিতে পরাজুখ হইবেন?
দুর্য্যোধন কহিলেন, হে তাত। পিতামহ ভীষ্ম আমাদের উভয় পক্ষেই সমপক্ষপাতী। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা আমার অনুগত, সুতরাং দ্রোণাচার্য্যও পুত্রের বিপক্ষ হইতে না পারিয়া আমারই পক্ষে থাকিবেন। মহাত্মা কৃপাচার্য্য স্বীয় ভগিনীপতি দ্রোণ ও ভাগিনেয় অশ্বত্থামাকে কখনই পরিত্যাগ করিতে পারিবেন না, সুতরাং তিনিও আমার পক্ষ হইবেন। ক্ষত্তা বিদুর আমাদিগের অর্থবদ্ধ, কিন্তু বিপক্ষেরা গোপনে তাঁহাকে বশীভূত করিয়াছে; যাহা হউক, তিনি একাকী কখনই আমাদিগের অনিষ্ট করিতে পারিবেন না; অতএব মহাশয়। যাহাতে পাণ্ডুনন্দনগণ মাতৃ-সমভিব্যাহারে অদ্যই বারণাবত নগরে গমন করে, নিঃশঙ্কচিত্তে শীঘ্র তাহার উপায় করুন। হে রাজন। পাণ্ডবগণের নিমিত্ত দিবারাত্রির মধ্যে একবারও নিদ্রা হয় না; তাহারা আমার হৃদয়ে অর্পিত শল্যের ন্যায় ঘোরতর শোকাগ্নি প্রজ্বলিত করিয়াছে; আপনি তাহাদিগকে নির্বাসিত করিয়া আমার শোকানল নির্ব্বাণ করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর অনুজগণসমবেত দুর্য্যোধন ধন ও সমুচিত সম্মান প্রদানদ্বারা ক্রমে ক্রমে সমুদায় প্রজাগণকে বশীভূত করিল। একদা মন্ত্রণাকুশল মন্ত্রিগণ ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শানুসারে সভায় বসিয়া কহিল, বারণাবত নগর অতি মহৎ ও পরম রমণীয়; তাহাতে ভগবান্ ভূতভাবন ভবানীপতি সর্ব্বদা বিরাজমান আছেন, এই সময়ে তাঁহার পূজনার্থে নানা দিগদেশ হইতে জনগণ সর্ব্বরত্নসমাকীর্ণ সুরম্য বারণাবতে সমুপস্থিত হইয়াছে। দৈবদুর্ব্বিপাক অখণ্ডনীয়। মন্ত্রিগণের মুখে বারণাবত নগরের প্রশংসা শ্রবণে পাণ্ডুপুত্র-গণের মনে তথায় গমন করিবার সাতিশয় বাসনা জন্মিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবগণকে বারণাবত গমনের নিমিত্ত একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত জানিয়া কহিতে লাগিলেন, হে বৎসগণ। সকলে প্রত্যহ আমার নিকট কহে যে, পৃথিবীর মধ্যে যত স্থান আছে, বারণাবত নগর সর্ব্বপেক্ষা রমণীয়; অতএব যদি তোমাদিগের তথায় গিয়া আমোদপ্রমোদ করিবার বাসনা থাকে, তবে সবান্ধবে ও সপরিবারে গমন করিয়া অমরগণের ন্যায় বিহার এবং ব্রাহ্মণ ও গায়কগণকে যথাভিলষিত অর্থ প্রদান কর। কিছুদিন পরমসুখে তথায় বাস করিয়া পুনর্ব্বার এই হস্তিনা-নগরে প্রত্যাগমন করিও।
ধীমান যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের বাক্য শুনিয়া তাঁহার দুষ্টাভিপ্রায় বুঝিতে পারিলেন, কিন্তু কি করেন, আপনাকে অসহায় ভাবিয়া অগত্যা "যে আজ্ঞা মহাশয়" বলিয়া তাঁহার আদেশ প্রতিপালনে অঙ্গীকার করিলেন। অনন্তর তিনি শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, মহামতি বিদুর, আচার্য্য দ্রোণ, বাহীক, সোমদত্ত, কৃপাচার্য্য, অশ্বত্থামা, ভূরিশ্রবাঃ, যশস্বিনী গান্ধারী, মাননীয় অমাত্যগণ, ব্রাহ্মণবর্গ, তপোধন পুরোহিত ও পৌরবদিগের নিকটে গমন করিয়া দীন ভাবে ও মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, আমরা পরম পূজ্য পিতৃব্য ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞানুসারে সপরিবারে জনাকীর্ণ ও পরম রমণীয় বারণাবত নগরে চলিলাম, আপনারা প্রসন্নমনে আশীর্ব্বাদ করুন, আপনাদের আশীর্ব্বাদ-প্রভাবে কদাচ কোন অমঙ্গল আমাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিবে না। তাঁহারা যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া প্রসন্নবদনে তাঁহার অনুবর্তী হইলেন এবং কহিতে লাগিলেন, হে পাণ্ডুনন্দন! তোমাদের মঙ্গল হউক, পথে যেন কোন হিংস্র প্রাণী হইতে তোমাদের অমঙ্গল না ঘটে। পাণ্ডুপুত্রেরা গুরুজনের এইরূপ আশীর্ব্বাদে পরিতুষ্ট হইয়া রাজ্য প্রাপ্তির নিমিত্ত যাবতীয় শুভকর্ম সমাধা করিয়া বারণাবত নগরে প্রস্থান করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুপুত্রগণকে বারণাবত নগরে গমন করিতে আদেশ করিলে দুরাত্মা দুর্য্যোধনের আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। ঐ দুৰ্ম্মতি পুরোচননামা সচিবকে নির্জনে আহ্বান করিয়া তাহার দক্ষিণ হস্ত ধারণপূর্ব্বক কহিতে লাগিল, হে পুরোচন। ধনসম্পত্তি সম্পন্ন এই বিপুল রাজ্য কেবল আমারই নহে, ইহাতে তোমারও অধিকার আছে; অতএব ইহা রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। দেখ, যাহার সহিত মিলিত হইয়া অসন্দিগ্ধচিত্তে মন্ত্রণা করি, তোমাভিন্ন আমার এমন বিশ্বস্ত সহায় আর কেহই নাই; অতএব হে তাত! তোমার সহিত যে মন্ত্রণা করিতেছি, তুমি তাহা কদাচ প্রকাশ করিও না। সুনিপুণ উপায় দ্বারা আমার শত্রুকে বিনাশ কর; যাহা বলিতেছি, কোন ক্রমে যেন তাহার অন্যথা না হয়। অদ্য পাণ্ডবগণ পিতার আদেশানুসারে বিহারার্থ বারণাবত নগরে গমন করিবে। তুমি দ্রুতগামী অশ্বতরযোজিত রথে আরোহণ করিয়া যাহাতে অদ্যই তথায় গমন করিতে পার, তাহার বিশেষ চেষ্টা পাও। নগরে উপস্থিত হইয়া উহার প্রান্তদেশে সুসংবৃত ও মহাধন এক চতুঃশাল গৃহ নির্মাণ করাইয়া রাখিবে, তাহাতে শণ ও সজ্জরস প্রভৃতি যাবতীয় বহ্নিভোজ্য দ্রব্য প্রদান করাইবে। মৃত্তিকাতে প্রচুর পরিমাণে ঘৃত, তৈল, বসা ও লাক্ষাদি মিশ্রিত করিয়া তদ্দ্বারা ঐ গৃহের প্রাচীরে লেপ দেওয়াইবে। চতুৰ্দ্দিকে শণ, তৈল, ঘৃত, জতু, কাষ্ঠ প্রভৃতি আগ্নেয় দ্রব্যসমুদায় রক্ষা করিবে; কিন্তু এই সমস্ত বস্তু এমন গোপনীয়ভাবে স্থাপন করিয়া রাখিবে যে, পাণ্ডবগণ বা অন্য ব্যক্তি বিশেষরূপে অনুসন্ধান করিলেও যেন সেই গৃহ আগ্নেয় বলিয়া কোনক্রমে বুঝিতে না পারে। গৃহ নিৰ্ম্মিত হইলে সুহৃদ্গণ-সমবেত পাণ্ডবদিগকে ও কুস্তীকে পরম সমাদরে সম্মানপূর্ব্বক লইয়া গিয়া উহার মধ্যে বাস করিতে দিবে। উহাদিগকে এরূপ দিব্য আসন, যান ও শয্যা প্রদান করিবে যে, পিতা যেন তাহাতে পরম পরিতুষ্ট হন। কিয়দ্দিন অতীত হইলে যখন পাণ্ডবেরা বিশ্বস্ত হইয়া অকুতোভয়ে গৃহমধ্যে শয়ান থাকিবে, সেই সময় তুমি উহার মধ্যে দ্বারদেশে অগ্নিপ্রদান করিবে। তৎপরে ঐ অগ্নি দ্বারা বারণাবত নগরস্থ লোকদিগের গৃহ দগ্ধ হইতে আরম্ভহইলে তাহারা প্রবুদ্ধ হইয়া মনে করিবে যে, অকস্মাৎ অগ্নি লাগিয়া নগর দগ্ধ হইতেছে। হে ধীমন্! তাহা হইলে আমাদিগকে কখনই মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণের বধজনিত কলঙ্কে কলুষিত হইতে হইবে না।
পাপাত্মা পুরোচন দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা শ্রবণ করিয়া "যে আজ্ঞা” বলিয়া স্বীকারোক্তিপূর্ব্বক শীঘ্রগামী অশ্বতরযোজিত রথে আরোহণ করিয়া বারণাবত নগরে গমন করিল এবং তথায় দুর্মতি দুর্য্যোধনের আদেশানুরূপ গৃহ নির্মাণ করাইতে লাগিল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে পাণ্ডবগণ বারণাবত নগরে গমনজন্য বায়ুবেগগামী সদশ্বযুক্ত রথে আরোহণ সময়ে পিতামহ ভীষ্ম, রাজা ধৃতরাষ্ট্র, মহাত্মা দ্রোণ, কূপ ও বিদুর প্রভৃতি সমুদায় কুরুবংশীয় ও অন্যান্য বৃদ্ধগণকে প্রণাম করিলেন এবং সমকক্ষ ব্যক্তিদিগকে আলিঙ্গন করিলেন; বালকগণ তাঁহাদিগকে অভিবাদন করিল। তদনন্তর তাঁহারা সমস্ত মাতৃগণকে প্রদক্ষিণ করিয়া তাঁহাদের অনুমতি গ্রহণ করিলেন এবং সমুদায় প্রজাগণকে বিনয়নম্রবচনে সাদর সম্ভাষণ করিয়া রথে আরোহণ-পূর্ব্বক বারণাবত নগরে যাত্রা করিলেন। মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর প্রভৃতি কতকগুলি কুরুবংশীয় ও পৌরবর্গ শোকাকুলিতচিত্তে তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। তন্মধ্যে কতিপয় সাহসিক ব্রাহ্মণ পাণ্ডুনন্দন-গণের দুঃখে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়া নির্ভয়চিত্তে কহিতে লাগিলেন, "কুরুকুলকলঙ্কী মন্দবুদ্ধি ধৃতরাষ্ট্র কেন এরূপ অধর্মানুষ্ঠান করিতে উদ্যত হইয়াছেন? দেখ, মহাত্মা মাদ্রীনন্দন-দ্বয়, পুণ্যশীল যুধিষ্ঠির, মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন ও ধনঞ্জয়, ইঁহারা কখনই ধৃতরাষ্ট্রের অনিষ্টাচরণে প্রবৃত্ত হয়েন নাই; তথাপি তিনি ইঁহাদিগকে স্বীয় পিতৃরাজ্যে অধিকার প্রদান করিলেন না। মহাত্মা ভীষ্মই বা কি প্রকারে পাণ্ডবগণের নির্বাসনরূপ নিতান্ত অধর্ম ও একান্ত অশ্রদ্ধেয় বিষয়ে অনুমোদন করিলেন? পূর্ব্বে শান্তনুনন্দন নরপতি বিচিত্রবীর্য্য, তৎপরে তাঁহার পুত্র রাজর্ষি পিতার ন্যায় আমাদিগকে প্রতিপালন করিতেন। সেই পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডু সুরলোকে গমন করিয়াছেন। সম্প্রতি দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্র তাঁহার পুত্রগণের সহিত নৃশংস ব্যবহার করিতেছে; অতএব চল, আমরা এই বিষয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়া আপন আপন গৃহ পরিত্যাগপূর্ব্বক এই রম্য হস্তিনানগর হইতে ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের অনুগামী হই।" ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শোকাকুল ব্রাহ্মণ-গণের বাক্য শ্রবণে ও পৌরগণের দুঃখদর্শনে দুঃখিত হইয়া ক্ষণকাল মনে মনে চিন্তা করিয়া কহিলেন, নরপতি ধৃতরাষ্ট্র আমাদিগের পিতৃতুল্য; তিনি যাহা আজ্ঞা করিয়াছেন, তাহা অসঙ্কুচিত-চিত্তে প্রতিপালন করা আমাদিগের অবশ্য কর্তব্য। আপনারা আমাদিগের পরম সুহৃৎ, এক্ষণে আমাদিগকে আশীর্ব্বাদ করিয়া স্ব স্ব গৃহে প্রতিনিবৃত্ত হউন; কার্য্যকাল উপস্থিত হইলে আমাদের প্রিয় ও হিতসাধন করিবেন। তাঁহারা যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণানন্তর "তথাস্তু” বলিয়া পাণ্ডবগণকে প্রদক্ষিণপূর্ব্বক আশীর্ব্বাদ করিয়া হস্তিনাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। পৌরগণ প্রতিনিবৃত্ত হইলে সুচতুর, ধৃতরাষ্ট্রের কৌশলজ্ঞ, সর্ব্বধৰ্ম্মবিৎ ও প্রাজ্ঞ বিদুর সঙ্কেত দ্বারা পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকটে দুর্য্যোধনকৃত মন্ত্রণার মর্ম্মোদঘাটন-পূর্ব্বক এই প্রকার কহিতে লাগিলেন, "যে ব্যক্তি নীতিশাস্ত্রা-নুসারিণী পর-মতির অভিজ্ঞ হয়, তাঁহার উচিত এই যে, যাহাতে আপদ হইতে নিস্তার পাওয়া যায়, সর্ব্বদা এরূপ চেষ্টা করেন। তৃণরাশির মধ্যে বিবর খনন করিয়া অবস্থিতি করিলে তৃণদাহক ও শৈত্যনাশক হুতাশন কখনই দগ্ধ করিতে পারে না। যে ব্যক্তি ইহা জানে সে আত্মরক্ষা করিতে পারে। শত্রুদিগের কুমন্ত্রণারূপ অস্ত্র লৌহনিৰ্ম্মিত নহে, অথচ শরীর ছেদন করে; যিনি ইহা জানেন, শত্রুবর্গ তাঁহাকে নষ্ট করিতে পারে না। যে ব্যক্তি অন্ধ, সে পথ বা দিনির্ণয় করিতে পারে না ও অধীর লোকের বুদ্ধিস্থৈর্য্য থাকে না, আমি এই কথা মাত্র বলিলাম, বুঝিয়া লও। সর্ব্বদা ভ্রমণ করিলে পথ জানিতে পারা যায়, নক্ষত্রদ্বারা দিনির্ণয় হইতে পারে এবং যে ব্যক্তি আপনার পঞ্চেন্দ্রিয় বশীভূত রাখিতে পারে, সে অবসন্ন হয় না।”
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, সুবিদ্বান্ বিদুরের এই কথা শুনিয়া "বুঝিলাম” এই মাত্র উত্তর প্রদান করিলেন। মহাত্মা বিদুর এইরূপে যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ প্রদান করিয়া পাণ্ডবগণের অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক সবিষাদচিত্তে নিজ গৃহে গমন করিলেন। পরে ভীষ্ম, বিদুর ও পুরবাসিগণ প্রতিনিবৃত্ত হইলে পর, কুন্তী যুধিষ্ঠিরের সন্নিকটে গমন করিয়া কহিলেন, বৎস! ক্ষত্তা জনতামধ্যে গোপনীয়ভাবে তোমাকে যাহা কহিলেন এবং তুমিও তাঁহাকে "বুঝিলাম” বলিয়া উত্তর প্রদান করিলে, কিন্তু আমরা ত তাহার কিছুমাত্র বুঝিতে পারিলাম না, যদি উহা প্রকাশ করিলে কোন হানি না হয়, তবে আমাদিগকে সবিস্তর প্রকাশ করিয়া বল, শুনিতে নিতান্ত বাসনা হইতেছে। যুধিষ্ঠির মাতার বচন শ্রবণা-নন্তর অতি বিনীত বচনে কহিলেন, মাতঃ। বিদুর আমাকে কহিলেন যে, দুর্য্যোধন তোমাদিগকে দগ্ধ করিবার মানসে জতুগৃহ নির্মাণ করিয়াছে, তোমরা অত্যন্ত সাবধানে বিচরণ করিবে, সমুদায় পথ উত্তমরূপে চিনিয়া রাখিবে ও সর্ব্বদা জিতেন্দ্রিয় হইয়া থাকিবে, তাহা হইলেই অচিরাৎ রাজ্যলাভকরিতে পারিবে। আমি তাঁহার ঐ উপদেশ বাক্য শ্রবণানন্তর, "বুঝিয়াছি” বলিয়া তাঁহাকে বিদায় করিলাম। হে নৃপতিসত্তম জনমেজয়! তদনন্তর মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণ ফাল্গুনমাসীয় অষ্টদিবসে রোহিণীনক্ষত্রে বারণাবত নগরে সমুত্তীর্ণ হইলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর বারণাবতবাসী প্রজারা পাণ্ডুপুত্রগণের শুভাগমন বার্তা শ্রবণে পরম প্রীত হইয়া দর্শন-মানসে হস্ত্যশ্বরথ প্রভৃতি নানা যানে আরোহণ করিয়া আগমন করিতে লাগিল। ক্রমে সকলে রাজকুমারদিগের নিকটে উপস্থিত হইয়া জয়াশীর্ব্বাদপ্রয়োগ পুরঃসর তাঁহাদের চতুৰ্দ্দিকে দণ্ডায়-মান হইল। নরশ্রেষ্ঠ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বারণাবতবাসী জনগণে পরিবৃত হইয়া অমরসমাজমধ্যবর্তী সুররাজের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। পৌরবর্গ পাণ্ডবগণের সমুচিত সম্মান ও সৎকার করিল। তাঁহারাও তাহাদিগকে যথোচিত বিনয় সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া পরম রমণীয় জনাকীর্ণ বারণাবত নগরে প্রবেশ করিলেন। পুর প্রবেশানন্তর তাঁহারা প্রথমতঃ স্বকার্যনিরত ব্রাহ্মণগণের নিকেতনে, পরে নগরাধিকারীদিগের ভবনে,. তৎপরে রথীদিগের নিলয়ে, পরিশেষে বৈশ্য ও শূদ্রগণের গৃহে গমন করিলেন। তাঁহারা সকলেই পাণ্ডবগণকে যথোচিত সমাদরপুরঃসর পূজা করিলেন। তখন মাতৃসমবেত পাণ্ডুনন্দন-গণ পুরোচন সমভিব্যাহারে বাসোপযোগী নিদ্দিষ্ট সুরম্য হর্থ্যে গমন করিলেন। পুরোচন তাঁহাদিগকে অত্যুৎকৃষ্ট ভক্ষ্য, পেয়, আসন ও শয্যা প্রভৃতি সমুদায় রাজভোগ্য দ্রব্য প্রদান করিল। এইরূপে পুরোচনকর্তৃক সৎকৃত হইয়া সমাতৃক পাণ্ডবগণ দশদিন তথায় বাস করিলেন। পৌরবর্গ প্রত্যহ তাঁহাদিগকে উপাসনা এবং পরিচর্যায় প্রীত ও প্রসন্ন করিল।
একাদশ দিনে পাপাত্মা পুরোচন স্বীয় অভিপ্রায় সিদ্ধ করিবার মানসে কৌতুকোৎপাদন করিয়া পাণ্ডবগণকে স্বনির্মিত জতুগৃহে লইয়া তথায় বাস করিবার অনুরোধ করিল। ঐ অশিব বিধায়ক গৃহের নাম "শিব” রাখিয়াছিল। মাতৃ-সমভিব্যাহারী পাণ্ডবগণ পুরোচনের বচনানুসারে উহার মধ্যে প্রবেশ করিলেন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির গৃহপ্রবেশপূর্ব্বক ভীমসেনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেখ ভাই! এই গৃহ ঘৃত ও জতু মিশ্রিত বসাগন্ধে পরিপূর্ণ; আমার স্পষ্ট বোধ হইতেছে, ইহা আগ্নেয়। গৃহনির্মাণদক্ষ বিপক্ষের পক্ষে বিশ্বস্ত শিল্পিগণ শণ, সজ্জরস এবং ঘৃতাক্ত মুঞ্জ, বল্লজ ও বংশ প্রভৃতি উপাদানে ইহা নির্মাণ করিয়াছে। দুর্য্যোধন বশবর্তী দুরাত্মা পুরোচন তুষ্টিকর ব্যবহারদ্বারা বিশ্বাস জন্মাইয়া দগ্ধ করিবার বাসনায় আমাদিগকে এই বিষম আগ্নেয় গৃহে আনয়ন করিয়াছে।
অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন পিতৃব্য বিদুর শত্রুগণের আকার ও ইঙ্গিতদ্বারা তাহাদের দুষ্টাভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়াছিলেন।
ভীমসেন যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মহাশয়! যদি এই গৃহ আগ্নেয় বলিয়া স্পষ্ট বোধ হইয়া থাকে, তবে আসুন, আমরা যেখানে ছিলাম, এক্ষণে সেই স্থানেই গমন করিয়া বাস করি। যুধিষ্ঠির কহিলেন, ভ্রাতঃ। উত্তমরূপ বিবেচনা করিয়া দেখিলে আমাদের এই খানেই বাস করা কর্তব্য, কিন্তু আমরা অব্যক্তাকার' ও অপ্রমত্ত হইয়া এ স্থান হইতে পলায়ন করিবার নিমিত্ত সর্ব্বদা যত্নবান্ থাকিব, নচেৎ যদি পুরোচন অণুপরিমাণেও আমাদের ইঙ্গিত বুঝিতে পারে, তাহা হইলে অতিশীঘ্র আমাদিগকে ভস্মসাৎ করিবে। ঐ পাপাত্মা পাপিষ্ঠ দুর্য্যোধনের বশবর্তী; ও কি অধৰ্ম্ম, কি লোকনিন্দা কিছুতেই ভীত নহে। হে বৃকোদর। দেখ, এই শত্রুনিৰ্ম্মিত জতুগৃহ দগ্ধ হইলে পর পিতামহ ভীষ্ম ও অন্যান্য কুরুবংশীয় মহাত্মারা "এই অধ্য অস্বর্গ কৰ্ম্ম কে করিল? এবং কি নিমিত্তই বা এ ঘটনা ঘটিল” বলিয়া অবশ্যই সাতিশয় ক্রোধান্বিত হইবেন; কিন্তু যদি আমরা দাহভয়ে ভীত হইয়া এস্থান পরিত্যাগ করিয়া হস্তিনাপুরে পুনর্ব্বার প্রস্থান করি, তাহা হইলে রাজ্যলুব্ধ দুরাত্মা দুর্য্যোধন বলপূর্ব্বক আমাদিগকে সংহার করিবে, সন্দেহ নাই। এক্ষণে সেই দুরাত্মা পদস্থ, আমরা অপদস্থ, সে সহায়বান, আমরা অসহায়; সে ধনবান্, আমরা নির্দ্ধন; সে মনে করিলেই কোন না কোন উপায়দ্বারা আমাদিগকে বধ করিতে পারিবে; অতএব আমরা দুরাত্মা দুর্য্যোধন ও পুরোচনকে বঞ্চনা করিয়া, এ স্থান হইতে গোপনীয়ভাবে পলায়ন করিয়া প্রচ্ছন্নরূপে ইতস্ততঃ বাস করিব। সম্প্রতি মৃগয়াচ্ছলে নানাদেশ ভ্রমণ করিলে পলায়নকালে কোন পথই আমাদের অবিদিত থাকিবে না। আমরা অদ্যাবধি এই গৃহমধ্যে এক গহ্বর প্রস্তুত করিয়া তন্মধ্যে গূঢ়োচ্ছ্বাস' হইয়া বাস করিব, তথায় প্রদীপ্ত হুতাশন কখনই আমাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিবে না। ঐ গর্ভমধ্যে এরূপ গোপনীয়ভাবে আমাদিগকে থাকিতে হইবে, যেন পাপাত্মা পুরোচন বা অত্রস্থ অন্য কেহ জানিতে না পারে।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! ইতিমধ্যে একদিবস বিদুরের সখা একজন খনক পাণ্ডবগণের নিকটে সমুপস্থিত হইয়া নির্জনে নিবেদন করিল; হে মহাত্মাগণ! আমি খনক, পরম হিতৈষী বিদুর প্রাণপণে পাণ্ডবগণের প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান ও হিতসাধন করিতে আমাকে এস্থানে পাঠাইয়াছেন, এক্ষণে অনুমতি করুন, আপনাদের কি প্রিয় অনুষ্ঠান করিব? দুরাত্মা পুরোচন কৃষ্ণপক্ষীয় চতুৰ্দ্দশীতে রজনীযোগে গৃহদ্বারে অগ্নি প্রদান করিবে। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন আপনাদিগকে মাতৃসমভি-ব্যাহারে দগ্ধ করিবার মানসে পুরোচনকে কুমন্ত্রণা প্রদান করিয়াছে। আমার কথায় বিশ্বাস জন্মাইবার জন্য আপনাকে মহাত্মা বিদুর এই কথা কহিতে বলিয়াছেন যে, তিনি ম্লেচ্ছভাষায় আপনাকে কিছু বলিয়াছিলেন, আপনিও "বুঝিলাম” বলিয়া তাঁহাকে উত্তর দিয়াছিলেন।
সত্যপরায়ণ কুন্তীনন্দন যুধিষ্ঠির খনকের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাকে কহিলেন, সৌম্য! আমি তোমাকে দেখিয়াই দৃঢ়ভক্তিশালী, বিশুদ্ধান্তঃকরণ মহাত্মা বিদুরের প্রিয়বন্ধু বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছি। তিনি সর্ব্বজ্ঞ; সর্ব্বজ্ঞ ব্যক্তির কিছুই অবিজ্ঞাত থাকে না। তুমি বিদুরের ন্যায় আমাদেরও পরম সুহৃৎ; সেই ধর্মাত্মা বিদুর যেমন আমাদিগকে রক্ষা করেন, সেইরূপ তুমিও আমাদের রক্ষা কর। দুরাত্মা পুরোচন দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে আমাদিগকে দগ্ধ করিবার জন্য এই গৃহ নির্মাণ করিয়াছে। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন ধনবান্ ও সহায়বান্; সে চিরকাল আমাদিগের হিংসা করে; আমরা নিহত হইলেই তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। তুমি অনুগ্রহ করিয়া এই দারুণ অগ্নিভয় হইতে আমাদিগকে পরিত্রাণ কর। দুরাত্মা দুর্য্যোধন এই জতুগৃহের রন্ধ্রমধ্যে অস্ত্রশস্ত্র এরূপ কৌশলে রাখিয়াছে যে, আমরা এই গৃহে থাকিয়া কোনক্রমে অগ্নি হইতে যদিও মুক্ত হইতে পারি, অস্ত্র হইতে কোনমতেই পরিত্রাণ পাইতে পারিব না। ধৰ্ম্মশীল বিদুর দুর্য্যোধনের এই কুমন্ত্রণা জানিতে পারিয়া সঙ্কেতে আমার নিকটে ব্যক্ত করিয়াছিলেন। হে সৌম্য! এক্ষণে আমরা এই বিপদ্গ্রস্ত হইয়াছি। তুমি পুরোচনের অজ্ঞাতসারে এই আপদ্ হইতে আমাদিগকে উদ্ধার কর।
খনক যুধিষ্ঠিরের বচনান্তে "তথাস্তু” বলিয়া স্বীকার করিয়া বহু যত্নসহকারে পরিখা খননচ্ছলে সেই গৃহের মধ্যে এক মহাগৰ্ত্ত প্রস্তুত করিল। গর্ত প্রস্তুত হইলে পর, পাছে, পুরোচন উহা বুঝিতে পারে, এই ভয়ে কবাটদ্বারা উহার মুখ রুদ্ধ করিয়া তাহার উপরিভাগে মৃত্তিকা দিয়া এরূপ সমতল করিয়া রাখিয়াছিল যে, সহসা সন্দর্শন করিলে উহার নিম্নভাগে গর্ত আছে বলিয়া বুঝিতে পারা নিতান্ত দুঃসাধ্য।
পাণ্ডবগণ পুরোচনকে বঞ্চনা করিবার মানসে বিশ্বস্তের ন্যায় দিবাভাগে মৃগয়াচ্ছলে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেন, রজনী-যোগে খনককৃত গহ্বরে শয়ন করিয়া শঙ্কিতচিত্তে সর্ব্বদা অপ্রমত্ত হইয়া কালযাপন করিতেন। পাণ্ডবগণের ঐ গোপনীয় ব্যাপার বিদুরের পরম সুহৃৎ সেই খনকসত্তম ব্যতীত অন্য কেহই জানিতে পারে নাই।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডবগণের বারণাবত নগরে সংবৎসর পূর্ণ হইলে দুৰ্ম্মতি পুরোচন তাঁহাদিগকে একান্ত বিশ্বস্ত জ্ঞান করিয়া মনে মনে পরম সন্তুষ্ট হইল। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির তাহাকে পরিতুষ্ট দেখিয়া স্বীয় ভ্রাতৃচতুষ্টয়কে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ। পাপাত্মা পুরোচন আমাদিগকে বিশ্বস্ত জ্ঞান করিয়াছে; আমরা কপট ব্যবহারদ্বারা দুরাত্মাকে বঞ্চিত করিয়াছি; সম্প্রতি আমাদের পলায়নের সময় উপস্থিত হইয়াছে; অদ্য আয়ুধাগারে অগ্নি প্রদানপূর্ব্বক পুরোচনকে ভস্মসাৎ করিয়া ছয়জনকে এখানে রাখিয়া অলক্ষিতরূপে পলায়ন করিব।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, যে দিন যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণের সহিত এই পরামর্শ করেন, সেই দিবস রাত্রিকালে ভোজরাজনন্দিনী দান-প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণদিগকে ভোজন করান, স্ত্রীলোকেরাও তথায় উপস্থিত হয়। তাহারা ইতস্ততঃ বিচরণপূর্ব্বক অভিমত পান ভোজন সমাধান করিয়া কুন্তীর নিকটে বিদায় লইয়া স্ব স্ব নিকেতনে প্রতিগমন করিল। ক্ষুধাতুরা এক নিষাদী কালপ্রেরিত হইয়া অন্নলাভ প্রত্যাশায় পঞ্চপুত্র সমভিব্যাহারে তথায় উপস্থিত হইয়াছিল। কুন্তিভোেজদুহিতা দয়ার্দ্রচিত্তে উত্তমরূপে তাহাদিগকে পান ভোজন করাইলেন। নিষাদী পুত্রগণ সমভিব্যাহারে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করিয়া হতজ্ঞান ও মৃতকল্প হইয়া সেই স্থানেই অবস্থান করিল। এদিকে ক্রমে রজনী অধিকা হইল; নগরস্থ সমস্ত লোক নিদ্রায় অভিভূত; তৎকালে ভগবান্ সমীরণ নিরপরাধ পাণ্ডবগণের প্রতি সদয় হইয়াই যেন তাঁহাদের সাহায্য করিবার মানসে প্রবলবেগে বহিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন উত্তম সুযোগ বুঝিতে পারিয়া অগ্রে পুরোচনের গৃহে, পরে জতুগৃহের দ্বারে, তৎপরে সেই বাটীর চতুৰ্দ্দিকে অগ্নি প্রদান করিয়া যখন বুঝিতে পারিলেন যে, অগ্নি সর্ব্বতঃ প্রদীপ্ত হইয়াছে, তখন ভ্রাতৃগণ ও মাতার সহিত খনকনির্মিত গহ্বরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। ক্রমে অগ্নির উত্তাপ ও শব্দ প্রবল হইয়া উঠিল। হুতাশনের উগ্র তাপ ও কঠোর শব্দ প্রভাবে পৌরগণ জাগরিত হইল। তাহারা পাণ্ডবগণের আবাস দগ্ধ হইতেছে দেখিয়া সাতিশয় দুঃখিত হইয়া পরস্পর কহিতে লাগিল, দেখ! দুরাত্মা পুরোচন পাণ্ডবদ্বেষী কুরুকুলকলঙ্ক পাপাত্মা দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে নিরপরাধ সুবিশ্বস্ত সমাতৃক পাণ্ডবগণকে দগ্ধ করিবার মানসে এই গৃহ নির্মাণ করিয়াছিল; এক্ষণে ইহাতে অগ্নি প্রদান করিয়া স্বীয় মনস্কামনা সিদ্ধ করিল। ধর্মের কি অনির্বচনীয় মহিমা! দুরাত্মা আপনিও এই প্রদীপ্ত হুতাশনে দগ্ধ হইয়াছে; পাপাত্মা ধৃতরাষ্ট্রকে ধিক্, উহার কি দুর্বুদ্ধি! ঐ দুরাত্মা পরমাত্মীয় স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে শত্রুর ন্যায় অনায়াসে দগ্ধ করাইল। বারণাবত-নগরস্থ লোকগণ দহমান জতুগৃহের চতুৰ্দ্দিক পরিবেষ্টন করিয়া এইরূপে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিল।
এদিকে মাতৃসমবেত পাণ্ডবেরা গর্ত দিয়া অতিকষ্টে বহির্গত হইয়া দ্রুতবেগে পলায়ন করিতে লাগিলেন। একে রজনী-জাগরণ, তাহাতে আবার গৃহদাহভয়। ভীম ব্যতীত সকলেই দ্রুতগমনে অশক্ত হইয়া পদে পদে স্খলিত হইতে লাগিলেন। তখন মহাবলপরাক্রান্ত বৃকোদর মাতাকে স্কন্ধদেশে, নকুল ও সহদেবকে ক্রোড়ে করিয়া লইলেন এবং যুধিষ্ঠির ও অর্জুনকে হস্তদ্বয়ে ধরিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহার বক্ষের আঘাতে বনরাজি ও তরুগণ ভগ্ন ও পদাঘাতে ধরাতল বিদীর্ণ হইতে লাগিল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতকুল-প্রদীপ। পাণ্ডবগণ বারণাবতনগর হইতে বনে পলায়ন করিলে, মহাত্মা বিদুর একজন সুবিশ্বস্ত পুরুষকে তাঁহাদের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। সে ব্যক্তি তাঁহাদের অনুসরণ করিতে করিতে দেখিল যে, মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণ নদীকূলে দণ্ডায়মান হইয়া উহার জল পরিমাণ করিতেছে। অলৌকিক ধীশক্তিসম্পন্ন মহাত্মা বিদুর অগ্রেই দুরাত্মা দুর্য্যোধনের দুষ্টচেষ্টিত বুঝিতে পারেন, পরে তাঁহার চরও তাহা বুঝিতে পারে, একারণ সে প্রিয় হয়; কিন্তু বিদুর তাহাকেই পাণ্ডবদিগের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। সে ব্যক্তি পবিত্র ভাগীরথীকূলে মনোমারুতগামিনী চন্দ্রপতাকাশালিনী বাতসহা নৌকা লইয়া পাণ্ডবদিগের নিকটে উপস্থিত করিল এবং তাঁহাদের বারণাবতে আসিবার সময়ে বিদুর যাহা বলিয়া দিয়াছিলেন, সেই সাঙ্কেতিক বাক্যে প্রতীতি জন্মাইয়া কহিল, হে মহানুভবগণ! সর্ব্বার্থবেত্তা মহাত্মা বিদুর তোমাদিগকে কহিয়া দিয়াছেন যে, "তোমরা কর্ণ, ভ্রাতৃগণসমবেত দুর্য্যোধন ও শকুনিকে সংগ্রামে পরাজয় করিবে।" হে মহাত্মাগণ! এক্ষণে এই তরঙ্গসহা সুখগামিনী তরণী উপস্থিত, ইহা দ্বারা আপনারা নিঃসন্দেহ এই সমস্ত দেশ অতিক্রম করিতে পারিবেন।
অনন্তর নাবিক মাতৃসমবেত পাণ্ডুনন্দনগণকে সাতিশয় ব্যথিত দেখিয়া তাঁহাদিগকে নৌকায় আরোহণ করাইয়া নৌকা বাহিয়া চলিল। গমনকালে নাবিক কহিল, মহাত্মা বিদুর, উদ্দেশে আপনাদিগকে আলিঙ্গন ও মস্তকাঘ্রাণ করিয়া কহিয়াছেন যে, গমনকালে পথে যেন কোন বিপদ না ঘটে। বিদুরপ্রেরিত নাবিক এই কথা বলিয়া তাঁহাদিগকে নির্বিঘ্নে ভাগীরথীর অপর পারে উত্তীর্ণ করিয়া জয়াশীর্ব্বাদপ্রয়োগ পুরঃসর বিদায় প্রার্থনা করিল। তখন পাণ্ডবগণ বিদুরকে আপনাদিগের প্রণাম জানাইতে কহিয়া নাবিককে বিদায় দিলেন। নাবিক স্বস্থানে প্রস্থান করিল, পাণ্ডবগণও মাতৃসমভিব্যাহারে অতি সত্বরে তথা হইতে গমন করিতে লাগিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, রজনী প্রভাত হইলে পৌরগণ পাণ্ডুনন্দনদিগকে দেখিবার নিমিত্ত তথায় আগমন করিয়া অগ্নি নির্ব্বাণানন্তর দেখিল যে, জতুগৃহ দগ্ধ হইয়াছে এবং অমাত্য পুরোচন ভস্মসাৎ হইয়াছে; তখন তাহারা যৎপরোনাস্তি শোকার্ত হইয়া রোদন করিতে করিতে কহিতে লাগিল, হায়। পাপকৰ্ম্মা দুর্য্যোধনই পাণ্ডবগণকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত এই গর্হিত কাৰ্য্য করিয়াছে। এই কৰ্ম্ম অবশ্যই ধৃতরাষ্ট্রের জ্ঞাতসারে হইয়াছে। তিনিও স্বীয় পুত্রকে ঐ গর্হিতানুষ্ঠান হইতে নিবৃত্ত করেন নাই; মহাত্মা ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর ও কূপ, ইঁহারাই বা কি বলিয়া এই নৃশংস কাৰ্য্যানুষ্ঠানে অনুমোদন করিলেন? যাহা হউক, আইস আমরা দুরাচার ধৃতরাষ্ট্রের নিকট "তোমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইয়াছে, তুমি পাণ্ডবগণকে দগ্ধ করিয়াছ" বলিয়া সংবাদ পাঠাই।
তদন্তর পৌরগণ পাণ্ডবগণের অন্বেষণার্থে অগ্নি নির্ব্বাণ করিতে করিতে ভস্মীভূত নিরপরাধা নিষাদী ও তাহার পঞ্চ পুত্রকে দেখিতে পাইলেন; তাহারা উহাদিগকেই পঞ্চপুত্র সমবেতা কুন্তী বলিয়া স্থির করিল। খনক জতুগৃহ পরিষ্কার করিবার ছলে স্বকৃত গহ্বর পাংশুদ্বারা এরূপ পূরাইয়া দিল যে, কেহই উহার বিন্দুবিসর্গমাত্রও অনুসন্ধান পাইল না। তৎপরে পৌরগণ, গৃহদাহে মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণ ও অমাত্য পুরোচন দগ্ধ হইয়াছে, এই সংবাদ ধৃতরাষ্ট্রের সমীপে পাঠাইল। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবগণের বিনাশবার্তা শ্রবণে সাতিশয় দুঃখিত হইয়া বিলাপ করিতে করিতে কহিলেন, "হায়। মাতৃ, সমবেত যুধিষ্ঠিরাদি বীরগণ বিনষ্ট হওয়াতে এতদিনের পর আমার ভ্রাতা পাও মত হইলেন। মদীয় অধিকৃত পুরুষেরা অতি ত্বরায় বারণাবত নগরে গমন করিয়া পাণ্ডবদিগের ও কুন্তিভোজপুত্রী কুন্তীর সৎকার করুক এবং তাঁহাদিগের স্বর্গার্থে তথায় বৃহৎ বৃহৎ কৃত্রিম নদী প্রস্তুত করুক। আর যাহারা ঐ স্থানে মরিয়াছে, তাহাদের সুহৃদ্বর্গও তথায় গমন করুক। যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে, এক্ষণে ধনব্যয়দ্বারা কুন্তী ও পাণ্ডবগণের পারত্রিক হিতসাধন যতদূর হইতে পারে তাহাতে যেন কোন প্রকারে ত্রুটি না হয়।
অম্বিকানন্দন ধৃতরাষ্ট্র এইরূপ পরিবেদনা'নন্তর জ্ঞাতি-বর্গ সমভিব্যাহারে সমাতৃক পাণ্ডুনন্দনগণের উদকক্রিয়া' সম্পন্ন করিলেন। সকলেই শোকপরবশ হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন। কেহ কেহ "হা যুধিষ্ঠির। হা ভীমসেন। হা অর্জুন। হা নকুল! হা সহদেব।” এবং “হা কুন্তী”। বলিয়া শোক করিতে লাগিল। এইরূপে সমস্ত পৌরবর্গ পাণ্ডবগণের নাম করিয়া যৎপরোনাস্তি অনুতাপ করিতে লাগিল। কেবল সর্ব্ববৃত্তান্তজ্ঞ বিদুর লোক-প্রত্যয়ের নিমিত্ত অতি অল্পমাত্র কৃত্রিম শোক প্রকাশ করিলেন।
এদিকে পাণ্ডবগণ মাতৃসমভিব্যাহারে রজনীযোগে বারণাবত নগর হইতে বহির্গমনানন্তর নৌকারোহণপূর্ব্বক নাবিকের ভুজবল, নদীর স্রোতবেগ ও বায়ুর অনুকূলতাবশতঃ অতি ত্বরায় গঙ্গা পার হইলেন। পরে নক্ষত্রদ্বারা দিনিরূপণ করিয়া স্থলপথে ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা পথিমধ্যে এক মহারণ্যে প্রবেশ করিয়া একান্ত পরিশ্রান্ত ও নিতান্ত পিপাসার্ত্ত এবং নিদ্রান্ধ হইয়া ভীমসেনকে কহিলেন, দেখ এই নিবিড় অরণ্যানীমধ্যে আমাদের সাতিশয় কষ্ট হইতেছে; আমরা কোন প্রকারেই দিনির্ণয় করিতে পারিতেছি না; চলিতে নিতান্ত অসমর্থ হইতেছি, সেই দুরাত্মা পুরোচন দগ্ধ হইয়াছে কি না তাহাও জানিতে পারিলাম না, এক্ষণে কিরূপে এই বিষম ভয় হইতে বিমুক্ত হই? তুমি আমাদের সর্ব্বাপেক্ষা বলবান, অতএব তুমিই পূর্ব্বের ন্যায় আমাদিগকে লইয়া চল। মহাবলপরাক্রান্ত ভীমসেন, ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের বাক্যে স্বীয় জননী কুন্তী ও ভ্রাতৃগণকে পূর্ব্বের ন্যায় লইয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।
মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের গমনকালে তদীয় ঊরুবেগে বনস্থ বৃক্ষসকল শাখা প্রশাখার সহিত কম্পমান হইতে লাগিল। তাঁহার জঙঘাপবনে পার্শ্বস্থ বৃক্ষ ও লতাসকল ভূতলশায়ী হইল। তিনি সমীপস্থ ফল পুষ্পাবনত বৃক্ষসমুদায় ভগ্ন করত গমন করিয়া ক্রোধান্বিত তেজস্বী মদস্রাবী ষষ্টিবর্ষবয়স্ক মাতঙ্গের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। অন্যান্য পাণ্ডবগণ ভীমের গমনবেগ সহ্য করিতে না পারিয়া মূর্ছিতপ্রায় হইলেন।
ভীমসেন উন্নত ও বিষম প্রদেশে স্বীয় জননী কুস্তীকে অতি সাবধানে পৃষ্ঠে করিয়া বহন করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহারা অতি কষ্টে অনেক বন অতিক্রম করিয়াও দুরাত্মা দুর্য্যোধনের ভয়ে প্রচ্ছন্নবেশে যাইতে লাগিলেন। ক্রমে সায়ংকাল উপস্থিত হইল, ঐ সময়ে তাঁহারা আর এক নিবিড় অরণ্যানীমধ্যে প্রবেশ করিলেন। ঐ অরণ্যে জল বা কোনপ্রকার ফলমূল কিছুই নাই। উহার চতুৰ্দ্দিকে হিংস্র জন্তু ও ক্রুর পক্ষিগণ ভ্রমণ করিতেছে। ক্রমে ক্রমে ঘোরতর অন্ধকার সমুপস্থিত হইল, অকস্মাৎ প্রবল বায়ুদ্বারা বৃক্ষের ফল পত্র পতিত, বৃক্ষগুল্মাদি উৎপাটিত ও অবনমিত হইয়া দশদিক্ একেবারে আচ্ছন্ন হইয়া গেল।
পাণ্ডবগণ পরিশ্রান্ত, পিপাসার্ত্ত ও নিদ্রাতুর হইয়া গমনে অসমর্থ হইলেন। তাঁহারা সেই আহার দ্রব্যশূন্য বনে অবস্থিতি করিলেন। তাহার পর কুন্তী নিতান্ত তৃষাতুরা হইয়া স্বকীয় পুত্রদিগকে কহিলেন, হায়! আমি পাণ্ডবগণের মাতা হইয়া এবং তাঁহাদিগের মধ্যে অবস্থিতি করিয়াও পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইলাম। ভোজরাজনন্দিনীর ঐ প্রকার কাতরোক্তি শ্রবণে মাতৃভক্তি-পরায়ণ ভীমসেনের মন কারুণ্যরসে পরিপূর্ণ হইল। তিনি কিঞ্চিন্মাত্র বিলম্ব না করিয়া মাতা ও ভ্রাতৃচতুষ্টয়কে পূর্ব্ববৎ গ্রহণ করিয়া আর এক পরম রমণীয় কাননে উপস্থিত হইলেন। তথায় গিয়া এক বৃহৎ বটবৃক্ষ দেখিতে পাইলেন। তখন তিনি সেই বিপুল ন্যগ্রোধ-পাদমূলে মাতা ও ভ্রাতৃগণকে রাখিয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে ক্ষণেক বিশ্রাম কর, আমি জল অন্বেষণার্থ গমন করি; ঐ দেখ জলচারী সারসগণ কলস্বরে ধ্বনি করিতেছে। বোধ হয় অনতিদূরেই অতি বৃহৎ জলাশয় আছে। তাঁহাদিগকে এই কথা কহিয়া জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক সারসগণের কলরবানুসারে ক্রোশদ্বয় গমন করিয়া এক মহৎ সরোবর দেখিতে পাইলেন। তখন তিনি ঐ সরোবরে অবগাহনপূর্ব্বক স্নান ও জলপান করণানন্তর মাতা ও ভ্রাতাদিগের নিমিত্ত স্বীয় উত্তরীয় বস্ত্রে করিয়া জল গ্রহণপূর্ব্বক মুহূর্ত্তমধ্যে তাঁহাদের সমীপে সমাগত হইলেন! আসিয়া দেখিলেন, মাতৃ সমবেত ভ্রাতৃচতুষ্টয় ধরণীতলে শয়ন করিয়া নিদ্রাভিভূত হইয়াছেন।
তাঁহাদিগের সেই অবস্থা দর্শনে ভীমসেনের শোকের আর পরিসীমা রহিল না। তিনি বিলাপ করিতে করিতে কহিলেন, হায়! কি কষ্ট। আমার কি দুরদৃষ্ট। আজি ভ্রাতাদিগকে ধরাতলে নিদ্রিত দেখিতে হইল। বারণাবত নগরে দুগ্ধফেনসন্নিভ শয্যায় শয়ন করিয়াও যাঁহাদিগের নিদ্রা হইত না, এক্ষণে তাঁহারা ভূমিশয্যায় শয়ান হইয়া অনায়াসে সুষুপ্ত হইয়াছেন। হায়। কি পরিতাপের বিষয়! যিনি শত্রুঘাতী বসুদেবের ভগিনী, যিনি কুন্তিরাজের পুত্রী, যিনি সর্ব্বলক্ষণাসম্পন্না, যিনি মহারাজ বিচিত্রবীর্য্যের সুষা, যিনি মহাত্মা পাণ্ডুর পত্নী, যিনি আমাদিগের জননী, যিনি প্রফুল্ল পুণ্ডরীকের ন্যায় প্রভাশালিনী এবং যিনি ধৰ্ম্ম, ইন্দ্র ও বায়ু হইতে এই সকল সন্তান প্রসব করিয়াছেন, অদ্য সেই সুকুমারাঙ্গী মহার্হ শয়নোচিতা' কুন্তীকে ভূতলশায়িনী দেখিতে হইল! ইহা অপেক্ষা আর দুঃখের বিষয় কি আছে? যে ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির ত্রিলোকীরাজ্যের আধিপত্য পাইতে পারেন, তিনি পরিশ্রান্ত হইয়া ভূতলে শয়ন করিয়া আছেন। নবীন জলধরের ন্যায় শ্যামলবর্ণ অলোকসামান্য অর্জুন প্রাকৃত লোকের ন্যায় ভূমিশয্যায় শয়ন করিয়া আছেন, ইহা কি সামান্য দুঃখের কথা? যে মাদ্রীনন্দনদ্বয় অশ্বিনীতনয়ের ন্যায় রূপবান, ইঁহারা প্রাকৃত মনুষ্যের ন্যায় ধরাতলে শয়ন করিয়া অনায়াসে নিদ্রা যাইতেছেন। ইহার পর আর দুঃখ কি আছে? যাহার কুলকলঙ্কস্বরূপ বিষম জ্ঞাতিবর্গ নাই; সে পরমসুখে কালযাপন করে। গ্রামে একটিমাত্র বৃক্ষ থাকিলে সে পুষ্পফলোপশোভিত হইয়া চৈত্যনামে খ্যাত ও সকলের পূজিত হয়। যাহাদের বলবান্ পরম ধার্মিক জ্ঞাতিসকল থাকে, তাহারা নির্বিঘ্নে পরমসুখে বাস করে। আমাদের এমনই দূরদৃষ্ট যে, পরম সুহৃৎ ধৃতরাষ্ট্র, পুত্রের পরামর্শানুসারে আমাদিগকে দগ্ধ করিবার মানসে দেশ হইতে নির্বাসিত করিয়াছেন, কেবল দৈবের অনুকূলতায় একাল পর্যন্ত জীবিত আছি। দারুণ অগ্নিভয় হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছি টে শো আগেও এই নিবিড় অরণ্যে প্রবেশ করিয়া কোন্ দিকে যাইব বা কি করিব কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। হা দুরাত্মন্ কুরুকুলকলঙ্ক দুর্য্যোধন! তুই এত দিনের পর কৃতার্থ হইলি। নিশ্চয় জানিলাম, তোর দৈব সুপ্রসন্ন, তন্নিমিত্তই ধৰ্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠির কুপিত হইয়া আমাকে আজ্ঞা প্রদান করেন না। যদি পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ একবার ইঙ্গিতে আমাকে অনুজ্ঞা করেন, তাহা হইলে আমি অদ্যই তোমাকে অমাত্য, সহোদর, কর্ণ ও শকুনি সমভিব্যাহারে শমনভবনে পাঠাই। মহাবলপরাক্রান্ত ভীমসেন কহিতে কহিতে ক্রোধে কম্পিতকলেবর হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক করে করে মর্দ্দন করিতে লাগিলেন। তিনি ক্ষণকাল পরে নির্মাণোম্মুখ হুতাশনের ন্যায় ক্রমে ক্রোধশূন্য হইয়া সেই স্থানে উপবেশনপূর্ব্বক ইতরের ন্যায় মহীতলে সুষুপ্তা মাতা ও ভ্রাতাদিগকে নিরীক্ষণ করিতে করিতে কহিলেন, বোধ হয়, এই বনের অনতিদূরেই নগর আছে। এক্ষণে ইহাদের জাগরণ সময় কিন্তু ইঁহারা স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইতেছেন, কি করি, আমি জাগিয়া থাকি, ইঁহারা নিদ্রান্তে গাত্রোত্থান করিয়া জলপান করিবেন, এই বলিয়া ভীমসেন তথায় অপ্রমত্তভাবে জাগরিত হইয়া রহিলেন।
হিড়িম্ববধ পর্ব্বাধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ। ঐ বনের অনতি-দূরবর্তী বিশাল এক শালবৃক্ষ ছিল। তদুপরি মহাবল পরাক্রান্ত নরমাংসাশী হিড়িম্বনামা রাক্ষস বাস করিত। ঐ দুরাত্মা অত্যন্ত ক্রুর ও জলদকালের জলধরের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ ছিল। উহার শরীর সুদৃঢ়, চক্ষুর্বর পিঙ্গলবর্ণ, মুখ অতি ভীষণ, দন্তজাল বিশাল, জঙঘা-মূল ও জঠর লম্বমান, শ্মশ্রু ও নিরোরুহ' তাম্রবর্ণ, স্কন্ধ প্রকাণ্ড বৃক্ষকাণ্ড সদৃশ ও কর্ণদ্বয় রাসভশ্রবণোপম' ছিল। রাক্ষস বৃক্ষে বসিয়া মাতৃসমবেত পাণ্ডবদিগকে নিদ্রিত দেখিতে পাইল। দুরাত্মা বহুদিবসাবধি মনুষ্য-শোণিত পান করে নাই, বিশেষতঃ তৎকালে সাতিশয় ক্ষুধার্ত্ত হইয়াছিল; মনুষ্যগন্ধ আঘ্রাণে ও পাণ্ডবদিগের দর্শনে যৎপরোনাস্তি পরিতুষ্ট হইল; পরে উর্দ্ধাঙ্গুলি দ্বারা শিরঃকভূতি করিতে করিতে মুখব্যাদনপূর্ব্বক জুম্ভণচ্ছলে বারংবার তাঁহাদিগকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। হিড়িম্ব পাণ্ডবগণের মাংস ভক্ষণ ও রুধির পান করিবার নিমিত্ত সাতিশয় ব্যগ্র হইয়া স্বীয় ভগিনী হিড়িম্বাকে আহ্বান করিয়া কহিল, ঐ দেখ, বহুদিনের পর আমার পরম ভক্ষ্যসকল স্বয়ং সমুপস্থিত হইয়াছে, উহাদিগের দর্শনে আমার জিহ্বা হইতে জল নিঃসৃত ও মুখ বিচলিত হইতেছে। অদ্য আমি বহুদিনের পর সুকোমল মাংসযুক্ত মুনষ্যদেহে সুতীক্ষ্ণ বিশাল দশন নিমগ্ন করিব, মনুষ্য-কণ্ঠ আক্রমণ ও ধমনী' চ্ছেদন-পূর্ব্বক অভিনব কবোষ্ণ' রুধির পান করিয়া চরিতার্থ হইব। তুমি শীঘ্র গিয়া জান উহারা কে? উহাদের গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া আমার পরম পরিতোষ হইতেছে। শীঘ্র যাও, উহাদের সকলকে বধ করিয়া আমার নিকট আনয়ন কর। উহারা আমার অধিকারে নিদ্রিত রহিয়াছে, ভয় করিও না। যাও, ত্বরায় উহাদিগকে মারিয়া আন। আমরা দুইজনে একত্র হইয়া নরমাংস ভক্ষণে উদর পূর্ণ ও পরম পরিতোষে তাল প্রদানপূর্ব্বক নৃত্য করিব।
হিড়িম্বা রাক্ষসী ভ্রাতৃবাক্য শ্রবণ করিয়া সত্বরে পাণ্ডব-গণের সমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিল, মাতৃসমবেত পাণ্ডব চতুষ্টয় নিদ্রিত আছেন, কেবল একাকী ভীমসেন জাগরিত হইয়া প্রহরীর কার্য্য করিতেছেন। রাক্ষসী বিশাল শালবৃক্ষসদৃশ মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের অলোকসামান্য রূপলাবণ্য দর্শনে সাতিশয় কামার্তা হইয়া মনে মনে স্থির করিল যে, এই মহাবাহু, সিংহস্কন্ধ, কম্বুগ্রীব, কমলনয়ন, সুরূপ, যুবা পুরুষকে আমি পতিত্বে বরণ করিব। আমি কখনই ভ্রাতার ক্রুর বাক্যানুসারে কার্য্য করিব না। পতিস্নেহ সোেদরস্নেহ অপেক্ষা বলবান; বিশেষতঃ আমি ইহাদিগকে বধ করিয়া ভ্রাতৃসন্নিধানে উপস্থিত করিলে মাংসভক্ষণ ও রুধির পানদ্বারা আমার ক্ষণকালমাত্র তৃপ্তি হইবে, কিন্তু যদি তাহা না করিয়া এই যুবা পুরুষকে পতিত্বে বরণ করি, তাহা হইলে আমি চিরকাল পরমসুখভোগে কালহরণ করিতে পারিব। কামরূপিণী হিড়িম্বা মনে মনে এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া মুহূর্ত্তমধ্যে দিব্যাভরণ ভূষিতা ষোড়শবর্ষদেশীয়া কামিনীর বেশধারণপূর্ব্বক মৃদুমন্দ গমনে ভীমসেনের সন্নিধানে উপস্থিত হইল এবং লজ্জাবনত সহাস্যবদনে গদ্গদস্বরে তাঁহাকে কহিতে লাগিল, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! তুমি কে? কোথা হইতে আসিয়াছ? এই যে দেবরূপী পুরুষগণ ধরাতলে শয়ান রহিয়াছেন, ইঁহারা তোমার কে? আর এই যে তপ্তকাঞ্চন-সন্নিভ রূপশালিনী সুকুমারী আপনার গৃহের ন্যায় এই নির্জন বনে বিশ্বস্তচিত্তে নিদ্রা যাইতেছেন, ইনিই বা তোমার কে? শুনিতে ইচ্ছা করি; তোমরা কি জান না যে এই গহনবন রাক্ষসগণের স্থান? ইহাতে হিড়িম্ব নামে এক পাপাত্মা রাক্ষস বাস করে। সেই দুরাত্মা আমার ভ্রাতা; সে তোমাদিগের মাংস ভক্ষণে ও রুধিরপানে লোলুপ হইয়া তোমাদিগের বধসাধনার্থ আমাকে পাঠাইয়াছে। যাহা হউক, আমি তোমার রূপলাবণ্য দর্শনে মোহিত হইয়া তোমাকে পতিত্বে বরণ করিতে ইচ্ছা করি, হে ধর্মাত্মন্! এক্ষণে যাহা তোমার উচিত হয়, কর। আমি কামাতুরা হইয়া স্বয়ং তোমাকে বরণ করিবার প্রার্থনা করিতেছি, হে মহাত্মন্! বিবাহ করিয়া আমার মনোরথ সফল কর। হে মহাবাহো! আমি স্বীকার করিতেছি, দুরন্ত রাক্ষসভয় হইতে তোমাকে পরিত্রাণ করিব। আমি কি জল, কি স্থল, কি অম্বরতল সর্ব্বত্র ভ্রমণ করিতে পারি, তোমাকে লইয়া গিরি-দুর্গমধ্যে বাস করিব; তুমি আমার সহিত একত্র থাকিলে পরমাহ্লাদে কালযাপন করিতে পারিবে; অতএব অনুগ্রহ করিয়া অধীনার মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ কর।
মহাত্মা ভীমসেন হিড়িম্বার বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাকে কহিলেন, হে রাক্ষসি! আমি তোমার কথায় কিরূপে এই গহন কাননমধ্যে মাতা, জ্যেষ্ঠ সহোদর ও অনুজগণকে পরিত্যাগ করিয়া গমন করি? মদ্বিধ লোক কি কামার্ত হইয়া এই সমস্ত সুখপ্রসুপ্ত মাতৃসমবেত ভ্রাতৃগণকে রাক্ষসমুখে প্রদান করিয়া স্বচ্ছন্দে গমন করিতে পারে? হিড়িম্বা কহিল, হে ধৰ্ম্মাত্মন্! তোমার যাহাতে প্রীতি জন্মে আমি তদনুষ্ঠানে কখনই পরাজুখ হইব না। তুমি ইঁহাদিগকে জাগরিত কর; আমি সকলকেই নরমাংসাদ' রাক্ষসের হস্ত হইতে পরিত্রাণ করিব। ভীমসেন কহিলেন, হে রাক্ষসি! আমি তোমার দুরাত্মা ভ্রাতার ভয়ে সুখ-প্রসুপ্ত জননী ও ভ্রাতৃগণকে কখনই প্রবোধিত করিতে পারিব না। হে ভীরু। কি রাক্ষস, কি মানব, কি গন্ধর্ব্ব কেহই আমার পরাক্রম সহ্য করিতে সমর্থ নহে, আমি কাহাকেও ভয় করি না; অতএব তুমি এই স্থানেই থাক বা এখান হইতে গমন করিয়া তোমার ভ্রাতাকে পাঠাইয়া দাও; যাহা ইচ্ছা হয় কর, আমি সকল বিষয়েই সম্মত আছি, কিছুতেই কিছুমাত্র ক্ষতি বোধ করি না।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন। এদিকে উর্দ্ধকেশ, মহাবাহু, নিবিড়-কাদম্বিনীতুল্য' কলেবর, লোহিত নয়ন, বিকট-দশন, ভয়ঙ্করবদন, দুরাত্মা হিড়িম্ব স্বীয় ভগিনী হিড়িম্বার বিলম্ব দেখিয়া বৃক্ষ হইতে অবতরণপূর্ব্বক স্বয়ং পাণ্ডবগণসমীপে গমন করিতে লাগিল। হিড়িম্বা তদ্দর্শনে সাতিশয় ভীতা হইয়া ভীমসেনকে কহিল, হে মহাত্মন্! ঐ দেখুন, নরমাংসলোলুপ মদীয় সহোদর দুরাত্মা হিড়িম্ব ক্রুদ্ধ হইয়া আসিতেছে, আর নিস্তার নাই; এক্ষণে বিনয় করিয়া কহিতেছি, দাসীর বাক্য গ্রহণ করুন। সকলকে জাগরিত করিয়া ত্বরায় আমার নিতম্বদেশে আরূঢ় হউন, আমি আপনাদিগকে লইয়া আকাশমার্গে উড্ডীন হই। ভীমসেন কহিলেন, হে পৃথুশ্রোণি! কিছুমাত্র ভয় করিও না, স্থির হও, দেখ, তোমার সমক্ষেই দুরাত্মাকে এখনই বধ করিব; এই একাকী রাক্ষসাধমের কথা দূরে থাকুক, সমস্ত রাক্ষসকুল একত্র হইয়া আসিলেও আমি পরাজিত করিতে পারিব; আমার করিশুশুসন্নিভ এই ভুজযুগল, পরিঘতুল্য এই উরুদ্বয় ও বিশাল এই বক্ষঃস্থল দর্শন কর; আর ইন্দ্রসদৃশ মদীয় অতুল পরাক্রমও বলিয়া আমাকে অচিরে দেখিতে পাইবে; হে পৃথুনিতম্বিনি। মনুষ্য অবজ্ঞা করিও না। হিড়িম্বা কহিল, হে দেবরূপ নরশ্রেষ্ঠ! আমি তোমাকে অবজ্ঞা করিতেছি না; এই দুরাত্মা সর্ব্বদাই মানব-দিগকে অনায়াসে পরাজয় করে, এই নিমিত্ত ভীত হইয়া তোমাদিগকে লইয়া পলায়নে উদ্যত হইয়াছিলাম।
রাক্ষস দূর হইতে ভীমসেনের কথা সমস্ত শুনিতে পাইয়া ক্রোধকম্পিত কলেবরে অগ্রসর হইয়া দেখিল যে, হিড়িম্বা মানবীর বেশ ধারণ করিয়াছে; তাহার বদন পূর্ণশশিসম, করবী পুষ্পমালায় পরিবেষ্টিত, ভ্রু, চক্ষুঃ ও কেশান্ত মনোহর, একান্ত সর্ব্বাঙ্গ বিচিত্রাভরণভূষিত ও পরিধানে সূক্ষ্ম বস্ত্র। হিড়িম্ব তাহাকে তাদৃশভাবাপন্ন দেখিয়া কামুকী বলিয়া নিশ্চয় বুঝিতে পারিল। তখন সে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রোধান্বিত হইয়া বিপুল নেত্রদ্বয়, বিস্ফারণপূর্ব্বক ভগিনীকে ভর্ৎসনা করিয়া কহিতে লাগিল, অরে বিপ্রিয়কারিণি' হিড়িম্বে! তুই আমার ভোজনে বিঘ্ন উৎপাদন করিতে উদ্যতা হইয়াছিস্? আমার ক্রোধ কি একেবারে বিস্মৃত হইলি? রে রাক্ষসকুলকলঙ্কিনি পরপুরুষাভিলাষিণি অসতি! তোকে ধিক্! তুই যাহার আশ্রয়বলে আমার এই মহৎ অপ্রিয়ানুষ্ঠান করিলি, আমি তাহাকে তোর সমক্ষে এখনই বধ করিতেছি। হিড়িম্ব ভগিনীর উপর এই প্রকার তর্জন গর্জন করিয়া রোষকষায়িত লোচনে দৃঢ়তররূপে দশনে দশন নিষ্পীড়নপূর্ব্বক পাণ্ডবগণকে বিনাশ করিতে চলিল।
ভীমপরাক্রম ভীমসেন, রাক্ষসকে ভগিনীর প্রতি ক্রুদ্ধ ও ধাবমান দেখিয়া, “রে দুরাত্মন্! তিষ্ঠ তিষ্ঠ” বলিয়া তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন এবং উপহাস করিয়া কহিলেন, অরে হিড়িম্ব! তুই কি নিমিত্ত বৃথা গর্জন করিয়া এই সুখপ্রসুপ্ত জনগণের নিদ্রাভঙ্গ করিতেছিস্? আর কি নিমিত্তই বা স্বীয় ভগিনীকে বধ করিতে উদ্যত হইতেছিস্? ক্ষমতা থাকে আয়, আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর। তোর ভগিনীর অপরাধ কি? শরীরা-ন্তশ্চারী' অনঙ্গই অপরাধী, তাহারই দুর্জয় কুসুমশরে জর্জরিতা হইয়া হিড়িম্বা আমাকে অভিলাষ করিয়াছে। ইহার কিছুমাত্র অপরাধ নাই; জানিস্ না, তুই স্বয়ং ইহাকে আমার নিকটে পাঠাইয়াছিস্? এ এখানে আগমন করিয়াই আমার রূপলাবণ্য দর্শনে কন্দর্পবাণে মোহিত হইয়া যখন আমাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছে, তখন ও অবশ্যই রক্ষণীয়া। রে রাক্ষসকুলকলঙ্ক দুষ্টাত্মন্! তুই কি সাহসে আমি জীবিত থাকিতে আমার স্ত্রীর প্রাণনাশে উদ্যত হইয়াছিস্? যোগ্যতা থাকে আসিয়া আমার সঙ্গে সংগ্রাম কর; আমি এইক্ষণেই তোকে শমনসদনে প্রেরণ করিব। রে নরমাংসলোলুপ দুর্বৃত্ত রাক্ষস! আমি আজি তোর মস্তক চূর্ণ করিব; শ্যেন, কঙ্ক, গোমায়ু প্রভৃতি জত্ত্বগণ পরমাহ্লাদপূর্ব্বক তোর ধরণীলুণ্ঠিত মৃতদেহ আকর্ষণ করিবে। হে রাক্ষসাধম! তুই নিত্য নিত্য নরহত্যা করাতে এই বন পাপে পরিপূর্ণ হইয়াছে; আমি অদ্য মূহূর্তকালমধ্যে ইহা রাক্ষসশূন্য করিব। যেমন সিংহ মহাগজকে আকর্ষণ করে, সেইরূপ অদ্য তোর ভগিনীর সমক্ষে তোকে আকর্ষণ করিব। রে রাক্ষস-কুলাঙ্গার। অদ্য আমার হস্তে তোর মৃত্যু হইলে অরণ্যচারী পুরুষগণ নিঃশঙ্কচিত্তে এই বনে বিচরণ করিবে। হিড়িম্ব কহিল, রে নরাপসদ'! তুই কেন অকারণ গর্জন করিতেছিস? অগ্রে স্বীয় প্রতিজ্ঞানুরূপ কার্য্যানুষ্ঠান কর, পরে আত্মশ্লাঘা করিস্। আমা অপেক্ষা বলবান্ বলিয়া মনে মনে যে তোর অহঙ্কার হইয়াছে, অবিলম্বে তাহা চূর্ণ করিব। আমি এই নিদ্রিত ব্যক্তি-দিগকে এখন কিছুই বলিব না। ইহারা স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাউক; অগ্রে তোকে বধ করিয়া তোর রক্ত পান করে, পরে এই নিদ্রিতদিগকে, তৎপরে এই অপ্রিয়কারিণী পাপীয়সী ভগিনীকে সংহার করিব।
রাক্ষস এইরূপ তর্জন গর্জন করিয়া বাহুপ্রসারণপূর্ব্বক ক্রোধভরে ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হইল। মহাবলপরাক্রান্ত ভীম রাক্ষসকে সম্মুখাগত দেখিয়া হাসিতে হাসিতে তাহার বাহুযুগল ধারণ করিলেন এবং যেমন সিংহ ক্ষুদ্র মৃগকে অনায়াসে টানিয়া লইয়া যায়, সেইরূপ তাহাকে সে স্থান হইতে অষ্ট ধনু' অন্তরে লইয়া গেলেন। রাক্ষস ভীমসেনের পরাক্রম দর্শনে সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া ভীমকে ধারণ করিয়া গর্জন করিতে লাগিল। তখন বৃকোদর জননীসমবেত নিদ্রিত ভ্রাতৃগণের নিদ্রাভঙ্গভয়ে পুনর্ব্বার তাহাকে বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিয়া অপেক্ষাকৃত দূরে লইয়া গেলেন। তদনন্তর তাঁহারা দুইজনে পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ ও স্ব স্ব বিক্রম প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং ষষ্টিবর্ষবয়স্ক' ক্রোধান্বিত মত্ত মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায় বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ ভঞ্জন ও লতাকর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। তাঁহাদের ভীষণ গর্জনে মাতৃসমবেত পাণ্ডবচতুষ্টয় জাগরিত হইয়া সম্মুখস্থিতা হিড়িম্বাকে দেখিতে পাইলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এদিকে কুন্তী পুত্র-চতুষ্টয়ের সহিত জাগরিত হইয়া সমীপস্থিতা হিড়িম্বার অতিমানুষ রূপ দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইয়া সান্ত্ববাদপূর্ব্বক হিড়িম্বাকে সম্বোধন করিয়া সুমধুরস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে বরবর্ণিনি!তুমি কে? কাহার পত্নী? কি নিমিত্ত এই স্থানে আসিয়াছ? হে দেবপর্ব্বাভে'। তুমি কি এই বনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী? কি কোন অপ্সরা? আর কি জন্যই বা এস্থানে রহিয়াছ? সবিশেষ ব্যক্ত করিয়া বল। হিড়িম্বা কহিল, হে দেবি! এই যে গগনস্পর্শী বৃক্ষরাজি সমাকুল সুনীল জলধরসদৃশ শ্যামল অরণ্যানী নিরীক্ষণ করিতেছ, ইহা রাক্ষসেন্দ্র হিড়িম্ব ও আমার আবাসস্থান। ঐ রাক্ষসরাজ আমার সহোদর, সে তোমাকে ও তোমার পুত্রদিগকে সংহার করিবার মানসে এই স্থানে আমাকে পাঠাইয়াছিল। আমি সেই ক্রুরবুদ্ধির বচনানুসারে এখানে আসিয়া তপ্তকাঞ্চন-সদৃশকলেবর, মহাবলপরাক্রান্ত তোমার পুত্রকে নিরীক্ষণ করিলাম। হে শুভে। তাঁহাকে দেখিবামাত্র আমি সর্ব্বভূতচিত্তকারী ভগবান্ কুসুমচাপের শরসন্ধানের বশবর্তিনী হইয়া তাঁহাকে পতিত্বে বরণ করিলাম, আমি তোমাদিগকে লইয়া এস্থান হইতে পলায়ন করিবার অনেক চেষ্টা পাইয়াছিলাম, কিন্তু তোমার পুত্র কোনমতেই আমার বাক্যে সম্মত হইলেন না। হে ভদ্রে। এ স্থানে আমার অনেক বিলম্ব হওয়াতে আমার ভ্রাতা তোমাদিগকে সংহার করিবার নিমিত্ত স্বয়ং আসিয়াছিল। এক্ষণে তোমার সেই পুত্র বলপূর্ব্বক এস্থান হইতে তাহাকে লইয়া গিয়াছেন। ঐ দেখ, তাঁহারা দুইজনে পরস্পর গর্জন ও বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতেছেন।
হিড়িম্বার বচন শ্রবণমাত্র মহাবীর্য্য যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল ও সহদেব সত্বরে ভীমসমীপে সমুপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, ভীমপরাক্রম ভীমসেন ও রাক্ষস পরস্পর জয়াশা করিয়া মহাবলপরাক্রান্ত সিংহদ্বয়ের ন্যায় ঘোরতর সংগ্রাম করিতেছেন। তাহাদিগের চরণাঘাতে পার্থিব ধূলিপটল গগন-মণ্ডলে সমুত্থিত হইয়া দাবাগ্নিধূমের শোভা ধারণ করিয়াছে। তাহারা বসুধারেণু-পরিবাতাঙ্গ' হইয়া নীহারমণ্ডিত শৈলরাজ-দ্বয়ের ন্যায় শোভা পাইতেছে। তখন মহাবলশালী অর্জুন ভীমসেনকে রাক্ষসের যুদ্ধে ব্যথিতপ্রায় দেখিয়া ঈষৎ হাস্য করিতে করিতে কহিতে লাগিলেন, হে মহাবাহু ভীমসেন! তুমি কি এই দুর্বৃত্ত রাক্ষসের সহিত যুদ্ধ করিয়া সাতিশয় পরিশ্রান্ত হইয়াছ? ভয় নাই, আমি তোমার সহায়তা করিতেছি; নকুল ও সহদেব মাতাকে রক্ষা করুক। ভীম কহিলেন, ভ্রাতঃ! কিছুমাত্র শঙ্কা করিও না; নিরুদ্বিগ্নচিত্তে যুদ্ধ দর্শন কর; এই দুরাত্মা আমার হস্তগত হইয়াছে, আর ইহার নিস্তার নাই। অর্জুন কহিলেন, হে ভীম! আর বিলম্ব করিও না, পাপাত্মা রাক্ষসকে শীঘ্রই নিপাত কর; আমাদের এস্থান হইতে অতি ত্বরায় প্রস্থান করা কর্তব্য; ঐ দেখ, পূর্ব্বদিক্ রক্তবর্ণ হইয়াছে; অতি শীঘ্রই প্রভাত হইবে; দিবাভাগে রাক্ষসগণ অধিকতর প্রবল হইয়া উঠে। হে বৃকোদর! সত্বর হও; আর বৃথা ক্রীড়া করিও না। উহাকে শীঘ্র বধ কর। কিঞ্চিৎ বিলম্বেই ঐ দুরাত্মা মায়া প্রকাশ করিবে।
মহাবলপরাক্রান্ত ভীমসেন অর্জুনের বচন শ্রবণে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রোধান্বিত হইয়া স্বীয় জনক বায়ুকে আহ্বান করত তদীয় জগৎসংহারক বল গ্রহণ করিলেন এবং সেই নীলাম্বুদশ্যামল রাক্ষসের প্রকাণ্ড দেহ ঊর্দ্ধে উত্তোলন-পূর্ব্বক মহাবেগে ঘূর্ণিত করিতে করিতে কহিলেন, অরে দুষ্ট নিশাচর। তুই বৃথা এতকাল মাংসভক্ষণ করিয়া বর্দ্ধিত হইয়াছিস, তোকে ধিক্। অতএব তোকে এক্ষণেই পদাঘাতে সংহার করিয়া এই বন নিষ্কণ্টক ও মঙ্গলযুক্ত করিব। আর তুই নরহত্যা করিয়া ভক্ষণ করিতে পারিবি না। অর্জুন কহিলেন, হে ভীমসেন। যদি এই রাক্ষসকে তোমার ভার বোধ হইয়া থাকে, তবে বল, আমি তোমার সাহায্য করিতেছি। ইহাকে শীঘ্র সংহার কর, অথবা আমি ইহাকে বিনাশ করিতেছি। তুমি অনেক পরিশ্রম করিয়াছ, ক্ষণকাল বিশ্রাম কর।
অর্জুনের এই বাক্য শ্রবণে ভীমসেনের ক্রোধ দ্বিগুণিত হইয়া উঠিল। তখন তিনি আর কিছুমাত্র বিলম্ব না করিয়া রাক্ষসকে বলপূর্ব্বক ভূতলে নিক্ষেপ করত পশুর ন্যায় বধ করিলেন। হিড়িম্ব মরণকালে ভয়ঙ্কর স্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহার গভীর গর্জনদ্বারা সেই মহারণ্য পরিপূর্ণ হইল। তৎপরে বৃকোদর রাক্ষসকে বলপূর্ব্বক ধারণ করিয়া তাহার মধ্যদেশ ভগ্ন করিয়া ফেলিলেন। রাক্ষস নিহত হইয়াছে দেখিয়া, পাণ্ডবচতুষ্টয়ের আহ্লাদের পরিসীমা রহিল না। তাঁহারা পরম সমাদরপূর্ব্বক ভীমসেনকে ধন্যবাদ ও আলিঙ্গন প্রদান করিলেন। তখন অর্জুন পরম আহ্লাদে অরাতিবিনাশন বৃকোদরকে পূজা করিয়া কহিলেন, হে মহাত্মন্! বোধ হয়, এই বনের অনতি দূরেই নগর আছে, চল আমরা ত্বরায় এস্থান হইতে প্রস্থান করি; কি জানি দুরাত্মা দুর্য্যোধন কোন না কোন উপায়দ্বারা আমাদের অনুসন্ধান পাইলেও পাইতে পারে। তাঁহারা সকলেই অর্জুনের বাক্যে অনুমোদন করিয়া তথা হইতে গমন করিতে লাগিলেন। রাক্ষসী হিড়িম্বাও তাঁহাদের সমভিব্যাহারে চলিল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! ভীমপরাক্রম ভীমসেন হিড়িম্বাকে আপনাদিগের সমভিব্যাহারে আসিতে দেখিয়া তাহাকে কহিলেন, রাক্ষসগণ মোহিনী মায়া বিস্তার করিয়া বৈরনির্য্যাতন করে; অতএব রে নিশাচরি! তোর আর আমাদের সঙ্গে থাকা উচিত নহে, তুইও স্বীয় সহোদরের পশ্চাৎ পশ্চাৎ শমন ভবনে যাত্রা কর। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির ভীমসেনকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা করত কহিলেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ। স্ত্রীহত্যা করিও না; হে পাণ্ডব। শরীর রক্ষা অপেক্ষা ধর্মরক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই দুরাত্মা হিড়িম্বই আমাদিগকে বধ করিবার মানসে আসিয়াছিল, তাহাকে ত তুমি বিনষ্ট করিয়াছ, এ তাহার ভগিনী; এ ক্রুদ্ধা হইলেই বা আমাদের কি করিতে পারিবে?
হিড়িম্বা ভীমের ক্রোধদর্শনে সাতিশয় বিষণ্ণ হইয়া যুধিষ্ঠির সমক্ষে কুন্তীকে কৃতাঞ্জলিপুটে অভিবাদনপূর্ব্বক কহিতে লাগিল, আর্য্যে! অবলাজন অনঙ্গশরে জর্জরিত হইলে কিরূপ দুঃখভোগ করে, তাহা আপনি সবিশেষ অবগত আছেন; হে মাতঃ। আমি ভীমসেনকে নিরীক্ষণ করিয়া অবধি সেই যন্ত্রণা ভোগ করিতেছি। আমি সুখ প্রত্যাশায় এতক্ষণ অপেক্ষা করিয়া-ছিলাম; এক্ষণে আমার সেই সুখ-সম্ভোগের সময় সমুপস্থিত হইয়াছে, এখন আমাকে বঞ্চিত করা নিতান্ত অবিধেয়; আরও দেখুন, আমি স্বকীয় পাতিব্রত্য ধৰ্ম্ম ও বন্ধুবান্ধব প্রভৃতি সমুদায় পরিত্যাগ করিয়া আপনার পুত্রকে পতিত্বে বরণ করত তাঁহার শরণাপন্ন হইয়াছি। হে যশস্বিনি! যদি সেই মহাবলপরাক্রান্ত পুরুষশ্রেষ্ঠ কিংবা আপনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই প্রাণত্যাগ করিব, অতএব আপনি আমাকে মূঢ় বলিয়া হউক, বা ভক্ত বলিয়া হউক, কিংবা অনুগত বলিয়াই হউক, অনুগ্রহ করিয়া যাহাতে ভীমসেন আমার পাণিগ্রহণ করেন, তাহা বিধান করুন। আমি সেই দেবরূপী বৃকোদরকে লইয়া যথেচ্ছ গমন করিব এবং পুনরায় আপনাদিগের সমীপে আনয়ন করিয়া দিব। আপৎকালে আপনারা আমাকে স্মরণ করিলে আমি তদ্দণ্ডে আসিয়া উপস্থিত হইব এবং আপনাদিগকে বিপদ হইতে পরিত্রাণ করিব। আপনারা শীঘ্র গমনে অভিলাষ করিলে আমি স্বীয় পৃষ্ঠে করিয়া আপনাদিগকে লইয়া যাইব। আপনারা অনুগ্রহ করিয়া ভীমের সহিত মিলন করিয়া দিউন। আপদ্ হইতে পরিত্রাণ পাইবার নিমিত্ত যে কোন প্রকারে হউক প্রাণ ধারণ করা কর্তব্য, কিন্তু ধার্মিক ব্যক্তি কি বিপৎ কি সম্পৎ সর্ব্বকালেই স্বকৃত অঙ্গীকার প্রতিপালন করিয়া থাকেন; আপৎকালেই ধার্মিকগণের ধর্ম্মের বিঘ্ন হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা; অতএব যিনি আপৎ সময়েও স্বীয় ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ না করেন, তিনিই যথার্থ ধার্মিক; লোকে পুণ্যবলেই জীবিত থাকে; পুণ্যই প্রাণধারণের একমাত্র উপায়, যে কার্য্য করিলে ধর্মানুষ্ঠান করা হয়, তাহা কাহারও পক্ষে দূষণাবহ নহে।
ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির হিড়িম্বার বাক্য শ্রবণানন্তর তাহাকে কহিলেন, হে সুমধ্যমে। তুমি যাহা কহিলে ইহা যথার্থ বটে, তুমি সূর্যাস্তের প্রাকালে কৃতস্নানাকি ও কৃতকৌতুকমঙ্গল ভীমসেনকে ভজনা করিও; দিবাভাগে উহাকে লইয়া যথেচ্ছ গমন করত স্বচ্ছন্দে বিহারাদি করিও; কিন্তু রজনীযোগে আমাদের সমীপে আনয়ন করিয়া দিতে হইবে। বৃকোদর যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণানন্তর "তথাস্তু” বলিয়া অনুমোদন করিলেন এবং হিড়িম্বাকে কহিলেন, হে রাক্ষসি! আমি জ্যেষ্ঠ-ভ্রাতার আজ্ঞানুসারে তোমার পাণিগ্রহণ করিব যথার্থ বটে, কিন্তু যতদিন পর্যন্ত তোমার গর্ভে সন্তান না জন্মিবে, ততদিন তোমার সহবাস করিব।
মনোবেগগামিনী হিড়িম্বা ভীমের বাক্য শ্রবণ করিয়া "যে আজ্ঞা” বলিয়া স্বীকার করিল এবং তাঁহাকে লইয়া আকাশমার্গে গমন করিল। সে পরম রমণীয় রূপলাবণ্য প্রদর্শন ও সুমধুর বাক্যদ্বারা তাঁহার মনোহরণপূর্ব্বক কখন বা দেবগণের আবাসস্থান মৃগপক্ষিসংকীর্ণ রমণীয় শৈলশৃঙ্গে, কখন সুপুষ্পিত দ্রুমসমাকীর্ণ বনদুর্গে, কখন প্রফুল্ল কমলবনযুক্ত মনোহর সরোবরে, কখন বৈদূর্য্যসিকতাময়' দ্বীপসমূহে, কখন কানন-সুশোভিত সুশীতল জলপরিপূর্ণ গিরিনদীতে, কখন পুষ্পিত দ্রুমলতাচ্ছাদিত কোকিল-কুলকূজিত কাননকুঞ্জে, কখন মণিকাঞ্চনাঢ্য সাগর প্রদেশে, কখন পবিত্র দেবারণ্যে, কখন গুহ্যকগণের নিবাসস্থানে, কখন বা তাপসদিগের আশ্রমে, স্বচ্ছন্দে বিহার করিতে লাগিল। কিয়দ্দিন এইরূপ বিহার করিতে করিতে ভীমের সহযোগে হিড়িম্বা গর্ভবতী হইল। রাক্ষসীরা গর্তধারণমাত্রেই সন্তান প্রসব করে। হিড়িম্বা গর্ভধারণ করিয়াই এক বিরূপাক্ষ মহাবল পরাক্রান্ত, মহাভুজ, মহাধনুর্দ্ধর, অমানুষ পুত্র প্রসব করিল। ঐ পুত্রের মুখ অতি বিশাল, কর্ণ গর্দভকর্ণের ন্যায় দীর্ঘ, ওষ্ঠদ্বয় তাম্রবর্ণ, দশনসকল সুতীক্ষ্ণ, নাসিকা দীর্ঘ ও বক্ষঃস্থল সুবিস্তীর্ণ। পুত্র মাতৃগৰ্ত্ত হইতে বিনির্গত হইবামাত্র যৌবনপ্রাপ্ত ও সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ হইল এবং সত্বরে পিতামাতাকে প্রণাম করত তাঁহাদের পাদগ্রহণ করিল। তাঁহারা পুত্রের নাম ঘটোৎকচ রাখিলেন। ঘট শব্দের অর্থ করিমস্তক ও উৎকচ শব্দের অর্থ কেশশূন্য; উহার মস্তক করিমুণ্ডের ন্যায় কেশশূন্য ছিল বলিয়া ঐ প্রকার নামধেয় হইল। ঘটোৎকচ পাণ্ডবদিগের প্রতি নিতান্ত অনুরক্ত ও একান্ত ভক্তিমান্ ছিল, তাঁহারাও তাঁহার প্রতি যৎপরোনাস্তি স্নেহ প্রকাশ করিতেন। নিশাচরী হিড়িম্বা আপনার স্বামীসহবাসের সময় অতীত বুঝিয়া মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণকে সম্ভাষণপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিল। মহাবীর ঘটোৎকচও প্রস্থানকালে বিনয়গৰ্ব্ববচনে "এ ভৃত্য আপনাদের কার্য্যকালে উপস্থিত হইবে" বলিয়া গুরুজনের নিকট বিদায় লইয়া উত্তরদিকে গমন করিল। মহারথ ঘটোৎকচ অপ্রতিমবীর্য্য কর্ণের সহিত সংগ্রাম নিমিত্ত ইন্দ্রের অংশে পাণ্ডুবংশে জন্মগ্রহণ করেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! অনন্তর মাতৃসমবেত পাণ্ডবগণ বল্কলাজিন পরিধান ও জটাবন্ধন প্রভৃতি তাপসবেশ ধারণপূর্ব্বক বনে বনে ভ্রমণ করত মৎস্য, ত্রিগর্ব, পাঞ্চাল, কীচক প্রভৃতি নানাদেশ মধ্যবর্তী পরম রমণীয় কাননপরম্পরা ও মনোহারিণী সরসিজশালিনী' সরসী' সমূহ নিরীক্ষণ করিয়া বলপূর্ব্বক বহুবিধ মৃগবধ করিতে করিতে সত্বর গমনে চলিলেন। তাঁহারা শীঘ্র গমন করিবার নিমিত্ত স্থানবিশেষে জননীকে নিজ পৃষ্ঠদেশে বহন করিতে লাগিলেন। গমনকালে তাঁহারা উপনিষৎ, সমস্ত বেদাঙ্গ এবং নীতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেন। এইরূপে তাঁহারা গমন করিতে করিতে একদা পিতামহ ব্যাসদেবকে দেখিতে পাইলেন। তখন তাঁহারা মাতৃ-সমভিব্যাহারে ভগবান্ কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে অভিবাদনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। ব্যাসদেব পৌত্রদিগের তাদৃশী দূরবস্থা দেখিয়া সান্ত্বনাবাক্যে কহিলেন, হে ভরতবংশাবতংসগণ। ধৃতরাষ্ট্রতনয়েরা অধৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা তোমাদিগকে যে ঈদৃশ দুরবস্থাগ্রস্ত করিয়াছে, তাহা আমি ইতিপূর্ব্বে বুঝিতে পারিয়াছি এবং তন্নিমিত্ত তোমাদের হিতসাধন মানসে এস্থানে উপস্থিত হইলাম; হে বৎসগণ! বিষণ্ণ হইও না; তোমরা পরিণামে পরমসুখী হইবে। যদিও ধার্তরাষ্ট্রগণ ও তোমরা আমার পক্ষে উভয়ই সমান, কিন্তু আমি এখন তোমাদিগকে ধৃতরাষ্ট্রসন্তান অপেক্ষাও অধিক স্নেহ করি; কারণ দীনজন ও শিশুজন যথার্থ স্নেহের পাত্র। আমি স্নেহবলে তোমাদের হিতসাধনে উদ্যত হইয়াছি। এক্ষণে তোমরা এই অনতিদূরবর্তী নগরে বাস করিয়া আমার পুনরাগমন প্রতীক্ষা কর।
সত্যবতীনন্দন পাণ্ডবগণকে এইরূপ আশ্বাস প্রদান-পূর্ব্বক তাঁহাদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া একচক্রানগরীতে গমন করিলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া কুন্তীকে আশ্বাস দিয়া কহিতে লাগিলেন, হে জীবৎপুত্রি! এই তোমার জ্যেষ্ঠপুত্র পুরুষশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির অসাধারণ ধর্মপরায়ণ; ইনি স্বীয় ধৰ্ম্মবলে ও ভীমার্জুনের ভুজবলে সসাগরা ধরা জয় করিয়া যাবতীয় নৃপতিগণকে শাসন করিবেন। ইঁহারা পঞ্চভ্রাতাই মহাবল-পরাক্রান্ত এবং সুস্থমনে ও স্বচ্ছন্দে স্বরাজ্যে সর্ব্বদা বিরাজমান হইবেন, ভুজবলে সমস্ত পৃথিবী জয় করিয়া বহুদক্ষিণ রাজসূয় ও অশ্বমেধ প্রভৃতি যজ্ঞানুষ্ঠান করিবেন এবং ভোগসাধনদ্বারা সুহৃদ্বর্গকে সুখী করিয়া পরমসুখে স্বীয় পিতৃপৈতামহরাজ্যভোগ করিবেন, কদাচ ইহার অন্যথা হইবে না।
ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কুন্তীকে এইরূপ আশ্বাস দিয়া এক ব্রাহ্মণের আলয়ে তাঁহাদিগকে স্থাপনপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে কহিতে লাগিলেন, হে ধৰ্ম্মাত্মন্! তুমি মাতৃসমভিব্যাহারে দেশকালা-নুসারে কার্য্য করিয়া একমাস এই স্থানে পরমসুখে বাস কর; মাস পূর্ণ হইলে আমি পুনরায় এখানে আগমন করিব। তাঁহারা সকলেই বদ্ধাঞ্জলি হইয়া "যে আজ্ঞা মহাশয়!” বলিয়া তাঁহার উপদেশ বাক্য স্বীকার করিলেন। ভগবান্ ব্যাসদেবও স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।
বকবধ পর্ব্বাধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম। মহারথ পাণ্ডু-নন্দনগণ একচক্রায় বাস করিয়া কি কি কর্ম করিলেন, সবিশেষ কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে নরনাথ। পাণ্ডবগণ একচক্রায় ব্রাহ্মণনিকেতনে দিবসের অল্পভাগমাত্র বাস করিতেন। অধিকাংশ সময় অনেকানেক সরিৎ, সরোবর, কানন ও অন্যান্য প্রদেশ সকল নিরীক্ষণপূর্ব্বক ভিক্ষা করিয়া উদরপূর্ত্তি করিতেন; এইরূপে তাঁহারা স্বীয় স্বীয় গুণগ্রামদ্বারা ক্রমে ক্রমে নগরবাসী সমুদায় জনগণের পরম প্রিয় হইয়া উঠিলেন। পঞ্চভ্রাতা দিবা-ভাগে ভিক্ষা করিয়া সন্ধ্যাসময়ে জননীর নিকটে সমুদায় ভিক্ষালব্ধ দ্রব্য সমর্পণ করিতেন। ভোজরাজদুহিতা সমস্ত ভক্ষ্যবস্তু প্রথমতঃ ভাগদ্বয়ে বিভক্ত করিয়া একভাগ ভীমসেনকে প্রদান করিতেন এবং অন্য ভাগ পাক করিয়া পাঁচ অংশে বিভাগপূর্ব্বক চারি ভাগ অপর পুত্রচতুষ্টয়কে প্রদান ও স্বয়ং একভাগ গ্রহণ করিতেন; এইরূপে মহাত্মা পাণ্ডবগণ তথায় বাস করিতে লাগিলেন।
একদা যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও মাদ্রীনন্দনদ্বয় ভিক্ষার্থে গমন করিলেন, ঘটনাক্রমে বৃকোদর জননী সমভিব্যাহারে আবাসে রহিলেন। তাঁহারা মাতাপুত্রে ব্রাহ্মণের নিকেতনে উপবিষ্ট আছেন, এমন সময়ে ব্রাহ্মণের অন্তঃপুরমধ্যে ঘোরতর ক্রন্দন-ধ্বনি সমুত্থিত হইল। সরল-হৃদয়া দয়ার্দ্রচিত্তা ভোজরাজদুহিতা সেই করুণরসোদ্দীপক ক্রন্দনশব্দ শ্রবণে সাতিশয় দুঃখিত হইয়া ভীমসেনকে কহিলেন, হে পুত্র! আমরা পাপাত্মা দুর্য্যোধনের অজ্ঞাতসারে এই ব্রাহ্মণনিকেতনে পরমসুখে বাস করিতেছি; ব্রাহ্মণ আমাদিগকে যৎপরোনাস্তি স্নেহ ও সমাদর করেন; তন্নিমিত্ত আমি ব্রাহ্মণের উপকার কি প্রকারে করিব, অনুক্ষণ এই চিন্তা করি। যে পুরুষ উপকারী ব্যক্তির প্রত্যুপকার করে এবং যে পুরুষ অন্যে যে পরিমাণে উপকার করে তদপেক্ষা অধিক পরিমাণে উপকার করিয়া তাহার প্রতিশোধ দেয়, সেই যথার্থ পুরুষ; এক্ষণে স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, ব্রাহ্মণের কোন মহদ্দুঃখ উপস্থিত হইয়াছে, এই সময়ে উহার সাহায্য করিলে যথেষ্ট উপকার করা হয়। ভীমসেন কহিলেন, মাতঃ। ব্রাহ্মহ্মণের কি দুঃখ উপস্থিত হইয়াছে এবং দুঃখের কারণই বা কি সবিশেষ জানিয়া আইস; যাহাতে ব্রাহ্মণের উপকার হয়, অতি সুদুষ্কর হইলেও আমি তাহা সাধন করিব।
দুই জনে এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এমন সময়ে পুনর্ব্বার ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণপত্নীর ক্রন্দনধ্বনি তাঁহাদের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। তখন কুন্তী বদ্ধবৎসা সৌরভেয়ীর ন্যায় দ্রুতবেগে ব্রাহ্মণের অন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হইলেন এবং দেখিলেন যে, ব্রাহ্মণ স্বীয় পত্নী, দুহিতা ও পুত্র সমভিব্যাহারে অধোবদনে উপবেশন করিয়া বিলাপ করিতে করিতে কহিতেছেন, হায়! আমার এই পরাধীন জীবনে ধিক্! ইহা নিতান্ত অসার, অনর্থক ও দুঃখের নিদানভূত। এতদিনের পর বুঝিলাম, জীবিত থাকিয়া কিছুমাত্র সুখ নাই; প্রত্যুত, যৎপরোনাস্তি দুঃখভোগ করিতে হয়। দেখ আত্মাই ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কাম, এই ত্রিবর্গ ভোগ করেন। এই তিনের অভাবেই অনন্ত দুঃখ ঘটে। কেহ কেহ এই ত্রিবর্গের অভাবের নাম মোক্ষ কহেন। আমার সেই মোক্ষলাভ করিবার কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই। অর্থপ্রাপ্তি নরকভোগের প্রধান কারণ। অর্থ-লাভাকাঙ্ক্ষায় যৎপরোনাস্তি দুঃখ আছে, অর্থলাভ তদপেক্ষাও দুঃখদায়ক, আর যদি অর্থের উপর একবার স্নেহ জন্মে, তাহা হইলে অর্থনাশে দুঃখের আর পরিসীমা থাকে না। যাহা হউক, এখন কি করিয়া আপদ্ হইতে উত্তীর্ণ হইব; পুত্রকলত্র-সমভি-ব্যাহারে পলায়ন করিয়া নিঃশঙ্ক প্রদেশে বাস করি। প্রিয়ে। তুমি জান, আমি ইতিপূর্ব্বে এই ভয়ে এস্থান পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছিলাম; তুমি তাহাতে অসম্মত হইলে; আমি পলায়ন করিবার জন্য তোমাকে বারংবার কহিলাম, তুমি কোনমতেই আমার কথা শুনিলে না; তখন তুমি কহিলে যে, ইহা আমার পৈত্রিক স্থান, ইহাতে আমার পিতা ও আমি জন্মগ্রহণ করিয়া বর্দ্ধিত হইয়াছি। হে দুরাগ্রহে! তোমার পিতা বহুকাল বৃদ্ধ হইয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন, অন্যান্য বান্ধবগণও পরলোক প্রাপ্ত হইয়াছেন, তবে আর এখানে বাস করিয়া এ যন্ত্রণা ভোগ করিবার আবশ্যকতা কি? তুমি তৎকালে বন্ধু পরিত্যাগের ভয়ে আমার কথা শুনিলে না, কিন্তু এক্ষণে এই সাতিশয় দুঃখকর বন্ধুবিনাশ সমুপস্থিত হইয়াছে, এখন কি করিবে? অথবা আমারই বিনাশ উপস্থিত হইয়াছে, যেহেতু আমি স্বয়ং জীবিত থাকিয়া কি প্রকারে নৃশংসের ন্যায় স্বচক্ষে আত্মীয় বিনাশ দেখিব? দেখ, তুমি আমার সহধর্মিণী; তুমি দমগুণসম্পন্না', স্নেহশালিনী ও পরম বন্ধু।
আমার পিতা মাতা তোমাকে আমার গার্হস্থ্যভাগিনী করিয়াছেন। আমি বেদবিধানানুসারে মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক তোমার পাণিগ্রহণ করিয়াছি; তুমি কুলশীলসম্পন্না, বিশেষতঃ অপত্য প্রসব করিয়াছ; আমি কি বলিয়া আপনার জীবন রক্ষার্থে তোমাকে পরিত্যাগ করিব? আর এই অপ্রাপ্তবয়স্ক, অজাতশ্মশ্রু বালক পুত্রকেও আমি কোনমতে পরিত্যাগ করিতে পারিব না। আরও দেখ, ভগবান্ বিধাতা যে মদীয় কন্যাকে ভর্তৃ লাভার্থ আমার নিকটে ন্যাসস্বরূপ' রাখিয়াছেন, যদ্দ্বারা আমি পিতৃগণ সমভিব্যাহারে দৌহিত্রজ লোক লাভ করিবার প্রত্যাশা করিতেছি, সেই কন্যাকে আমি স্বয়ং উৎপাদন করিয়া কি প্রকারে পরিত্যাগ করিব? কেহ কেহ কন্যা অপেক্ষা পুত্রকে অধিক স্নেহ করিয়া থাকে, কাহারও বা পুত্র অপেক্ষা কন্যাতে অধিক স্নেহ জন্মে, কিন্তু আমি পুত্র কন্যা উভয়কেই সমভাবে স্নেহ করিয়া থাকি। কন্যা প্রসবদ্বারা জগৎ রক্ষা করে, অতএব আমি কি করিয়া আপনার প্রাণরক্ষার নিমিত্ত সেই অপাপা বালাকে পরিত্যাগ করিব? আমি স্বয়ং প্রাণ পরিত্যাগ করিলেও পরলোকে অনুতাপ করিতে হইবে, যেহেতু আমি ইহাদিগকে পরিত্যাগ করিলে পর অবশ্যই ইহারা মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইবে। আমি উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়াছি। দেখ, যদি ইহাদিগের একজনকে পরিত্যাগ করি, তাহা হইলে, নিতান্ত নিষ্ঠুরের কার্য্য করা হয়, আর যদি স্বয়ং প্রাণত্যাগ করি, তাহা হইলেও আমা ব্যতিরেকে ইহারা সকলেই কালগ্রাসে পতিত হইবে। হায়। কি কষ্ট। অদ্য আমি সবান্ধবে কি দুৰ্দ্দশাগ্রস্ত হইলাম। আমাকে ধিক্। ইহাদের সমভিব্যাহারে প্রাণত্যাগ করাই আমার পক্ষে শ্রেয়ঃ, জীবিত থাকিয়া কিছুমাত্র লাভ নাই।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! ব্রাহ্মণের এইরূপ বিলাপবাক্য শ্রবণ করিয়া ব্রাহ্মণী তাঁহাকে সান্ত্বনা করত কহিতে লাগিলেন, মহাশয়। আপনি বিদ্বান্ হইয়াও কি নিমিত্ত প্রাকৃত লোকের ন্যায় অনুতাপ করিতেছেন? দেখুন যে সমস্ত মানবগণ ধরাতলে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, সকলকেই একবার মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইতে হইবে, সন্দেহ নাই; অতএব যাহা অবশ্যম্ভাবী, কোনমতে খণ্ডিবার নহে, তদ্বিষয়ে সন্তাপ করা কর্তব্য হয় না। হে বিদ্বন্! শাস্ত্রকারেরা কহেন, কি পুত্র, কি দুহিতা, সকলই আপনার নিমিত্ত; অতএব আপনি আমাকে পরিত্যাগ করিয়া আত্মরক্ষা করুন। আমি স্বয়ং তথায় যাইব, কারণ প্রাণ পর্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া পতির হিতসাধন করাই সাধ্বী স্ত্রীর প্রধান ধৰ্ম্ম ও অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। বিশেষতঃ আমি আপনার নিমিত্ত অকিঞ্চিৎকর ক্ষণভঙ্গুর দেহত্যাগরূপ এই কৰ্ম্ম করিলে পরলোকে অক্ষয়সদ্গতি ও ইহলোকে অপরিমিত যশোরাশি লাভ করিতে পারিব। আমি আপনাকে যাহা কহিতেছি, ইহাতে আপনার প্রচুরপরিমাণে অর্থ ও ধৰ্ম্ম লাভ হইবে। দেখুন, লোকে যে নিমিত্ত পত্নী কামনা করে, আপনার তাহা হইয়াছে; আপনি আমাতে এক কন্যা ও এক পুত্র উৎপন্ন করিয়াছেন। আমি অনৃণা' হইয়াছি; আমার পরলোক প্রাপ্তি হইলে পর আপনি অনায়াসে ইহাদিগকে প্রতিপালন করিতে পারিবেন; কিন্তু আপনি না থাকিলে আমাদের দুর্দশার আর পরিসীমা থাকিবে না।
আমি বিধবা, অনাথা ও অসহায়া হইয়া কিরূপে সৎপথাবলম্বনপূর্ব্বক এই শিশু কুমার ও কুমারীকে বাঁচাইতে পারিব? সাতিশয় অলঙ্কৃত ও অনুপযুক্ত ব্যক্তিরাও এই কন্যাকে প্রার্থনা করিলে আমি কোনমতেই রক্ষা করিতে পারিব না। যেমন পক্ষিগণ ভূমিনিহিত আমিষখণ্ড গ্রহণে সাতিশয় লোলুপ হয়, সেইরূপ অধার্মিক লোকেরা পতিবিহীনা কামিনীকে বাসনা করে; অতএব হে দ্বিজোত্তম! যখন দুরাত্মাগণ অনাথা দেখিয়া আমাকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইবে, তখন আমি কিরূপে আপনার ধর্মরক্ষা করিব? আর আপনার কুল-রক্ষার এক হেতু এই কন্যাকেই বা কিরূপে পিতৃপিতামহসেবিত পথে নিযুক্ত করিতে পারিব? আপনি ধৰ্ম্মতত্ত্ববেত্তা; আপনি এই বালককে যেরূপ বিদ্যাশিক্ষা করাইতে পারিবেন, আমি কোনমতেই সেরূপ পারিব না। ইহার পর আর দুঃখের বিষয় কি যে, অনুপযুক্ত ব্যক্তিরা বেদশ্রুতিগ্রহণেচ্ছু' শূদ্রদিগের ন্যায় আপনার এই কন্যা প্রার্থনা করিবে। আমি যদি তাহাতে অস্বীকার করি, তাহা হইলে যেমন কাকগণ যজ্ঞ হইতে দ্রব্য অপহরণ করিয়া পলায়ন করে, সেই দুরাত্মারা সেইরূপ অত্যাচার করিয়া বলপূর্ব্বক কন্যাকে হরণ করিয়া লইবে, সন্দেহ নাই। হে ব্রহ্মন্! আমি এই পুত্রকে আপনার অননুরূপ গুণসম্পন্ন, এই কন্যাকে অনুপযুক্ত পাত্রের হস্তগত এবং আপনাকে অলঙ্কৃত জনগণকর্তৃক অবজ্ঞাত দেখিয়াই কখনই জীবন ধারণ করিতে পারিব না। আমি মবিলে এই বালক ও বালিকা অবশ্য প্রাণত্যাগ করিবে; জলক্ষয় হইলে মৎস্য অবশ্যই বিনষ্ট হয়। হে নাথ! এইরূপে আপনার মরণে আমাদের তিন জনেরই মৃত্যু হইবে, নিশ্চয় জানিবেন; অতএব তাহা না করিয়া কেবল আমাকেই পরিত্যাগ করুন। পুত্রবতী রমণীর, পতির অগ্রে পরলোক যাত্রা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। আমি আপনার নিমিত্ত এই পুত্র, দুহিতা, বান্ধব ও স্বীয় প্রাণ পরিত্যাগ করিতে অভিলাষ করিয়াছি। পতিপরায়ণা স্ত্রী পতির হিতসাধন করিয়া যাদৃশ ফল প্রাপ্ত হয়; যজ্ঞ, তপ, দান, নিয়মাদি দ্বারা কদাচ তাদৃশ ফল লাভ করিতে পারে না; আমি যে ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠানে উদ্যত হইয়াছি, ইহা আপনার ও আপনার কুলের ইষ্ট ও হিতকর। সজ্জনেরা কহেন যে, ইষ্ট, অপত্য, অভিলষিত দ্রব্য, প্রিয়বন্ধু ও প্রণয়িনী ভার্য্যা, এই সমস্ত আপদ নিবারণের নিমিত্ত হয়। প্রাচীন পণ্ডিতগণের এই উপদেশবাক্য আছে যে, আপদ নিবারণের নিমিত্ত ধন সঞ্চয় করিয়া রাখিবে, সেই ধনদ্বারা ভার্য্যা রক্ষা করিবে এবং কি ভার্য্যা, কি ধন, যাহা দ্বারা হউক, আত্মরক্ষণে সর্ব্বথা যত্নবান্ হইবে। ভার্য্যা, পুত্র, ধন ও গৃহ, এই চতুষ্টয় দৃষ্টাদৃষ্ট' ফল লাভের নিমিত্ত হয়; অতএব এই সমস্ত দ্বারা দৃষ্ট ফল ও অদৃষ্ট ফল সাধন করিবে। আরও তাঁহারা কহিয়াছেন যে, সমস্ত কুল ক্ষয় করিয়াও যদি আত্মরক্ষা করিতে হয়, তাহাও মনুষ্যের পক্ষে কর্ত্তব্য, কারণ আত্মার সমান আর কেহই নাই; অতএব আপনি আমাকে এই পরম হিতকর কার্যানুষ্ঠানে অনুমতি প্রদান করুন। হে মহাশয়। ধর্মজ্ঞ বাক্তিগণ ধৰ্ম্মনির্ণয় স্থলে কহিয়াছেন, স্ত্রীলোক সকলের অবধ্য, রাক্ষসগণ ধৰ্ম্মবিৎ; বোধ হয়, সে রাক্ষস আমাকে স্ত্রীলোক দেখিয়া বধ করিবে না; অতএব যখন পুরুষের বধে নিশ্চয় ও স্ত্রীলোকের বধে সংশয় রহিল, তখন আমাকে সে স্থানে প্রেরণ করা আপনার অবশ্য কর্তব্য। আমি উত্তমোত্তম দ্রব্য ভোগ করিয়াছি, অভিলষিত দ্রব্যসকল প্রাপ্ত হইয়াছি, আমার ধর্মানুষ্ঠান হইয়াছে এবং আপনা হইতে এই অপত্যদ্বয় লাভ করিয়াছি; এক্ষণে আমার মরণে কিছুমাত্র দুঃখ নাই। আমি পুত্রবতী, বিশেষতঃ বৃদ্ধা হইয়াছি; অধিকন্তু এই কার্য্য করিলে আপনার হিতানুষ্ঠান করা হয়; এই সকল ভাবিয়া আমি ইহাতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। আরও দেখুন, আমি মরিলে আপনি অন্য স্ত্রী গ্রহণ করিয়া গার্হস্থ্য ধর্মানুষ্ঠান করিতে পারিবেন। হে নাথ। পুরুষ-দিগের বহুবিবাহ দোষাবহ নহে, কিন্তু নারীগণের পত্যন্তর স্বীকারে মহান্ অধর্ম জন্মে; অতএব আপনি এই সমস্ত এবং আত্মত্যাগের দোষ বিবেচনা করিয়া আমাকে ত্যাগ করুন; তাহা হইলে আপনার কুল ও এই শিশু সন্তানদ্বয়ের রক্ষা হইতে পারে। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়! ব্রাহ্মণ পতিহিতৈষিণী ভাৰ্য্যার এই সমস্ত বাক্য শ্রবণে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন করত তাঁহার সহিত বাষ্পমোচন করিতে লাগিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, সেই ব্রাহ্মণের কন্যা স্বীয় পিতা-মাতার বিলাপবাক্য শ্রবণে সাতিশয় দুঃখিত হইয়া তাঁহাদিগকে কহিতে লাগিলেন, হে তাত। হে মাতঃ! আপনারা কি নিমিত্ত অনাথের ন্যায় রোদন করিতেছেন? আমি যাহা কহিতেছি, তদনুসারে কার্য্য করিলে আপনাদিগের মঙ্গল হইবে। আমাকে কিছু দিন পরে অবশ্যই পরগৃহে গমন করিতে হইবে। অতএব সংপরিবর্তে এক্ষণেই আমাকে পরিত্যাগ করিয়া সকলের পরিত্রাণ করুন। "সন্তান বিপদ হইতে পরিত্রাণ করিবে” এই ভাবিয়াই লোকে অপত্য কামনা করিয়া থাকে; এক্ষণে আপনাদের এই বিপৎ সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব আমাকে পরিত্যাগ করিয়া এই দুস্তর দুঃখসমুদ্র উত্তীর্ণ হউন। ইহকালে ও পরকালে পরিত্রাণ করে বলিয়া পণ্ডিতগণ পুত্রের পুত্র নাম দিয়াছেন। পিতামহগণ, আমার গর্তে দৌহিত্র উৎপন্ন হইবে, এই অভিলাষ করেন; কারণ তাহা হইলে পিগুলোপের ভয় হইতে পরিত্রাণ হয়। আমি স্বীয় পিতার জীবন রক্ষা করিয়া তাঁহাদিগকে সে ভয় হইতে মুক্ত করিতেছি। হে পিতঃ! যদি আপনি স্বয়ং তথায় গমন করিয়া প্রাণত্যাগ করেন, তাহা হইলে আপনার বিরহে অল্পদিনের মধ্যেই আমার এই অল্পবয়স্ক ভ্রাতাটি বিনষ্ট হইবে, সন্দেহ নাই। আপনিও প্রাণাধিক সহোদর মানবলীলা সংবরণ করিলে পিতৃলোকের পিণ্ডোচ্ছেদ হইবে এবং আমিও আপনাদের বিনাশে যৎপরোনাস্তি শোকসন্তপ্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করিব। কিন্তু যদি আপনি কেবল আমাকে পরিত্যাগ করিয়া এই ঘোর বিপদ হইতে মুক্ত হয়েন, তাহা হইলে আমার মাতা ও শিশু ভ্রাতা রক্ষা পাইবে এবং এই বংশের সন্ততি ও পিশু অবিচ্ছিন্নভাবেই থাকিবে। আরও দেখুন, শাস্ত্রকারেরা কহিয়া গিয়াছেন যে, পুত্র আত্মার স্বরূপ, ভাৰ্য্যা সখি স্বরূপ এবং কন্যা কৃষ্ণ' স্বরূপ হয়, অতএব আপনি আমাকে পরিত্যাগ করিয়া কৃষ্ণ হইতে বিমুক্ত হউন। হে তাত। আপনি না থাকিলে আমার কষ্টের সীমা থাকিবে না। আমি অনাথা ও দীনা হইয়া যথা তথা ভ্রমণ করিব। যদি আমি রাক্ষসসমীপে আত্মপ্রদানরূপ কৰ্ম্ম করি, তাহা হইলে পিতৃলোকের বংশ রক্ষা ও আমার মরণ সফল হয়; আর যদি আপনি আমাকে পরিত্যাগ না করিয়া পরলোক যাত্রা করেন, তাহা হইলে আমাকে যৎপরো-নাস্তি ক্লেশ পাইতে হইবে, অতএব আমার প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ করুন এবং উভয় পক্ষ বিবেচনা করিয়া আমার ক্লেশাবসান নিমিত্ত, ধর্ম রক্ষার নিমিত্ত ও কূলসন্ততির অবিচ্ছেদের নিমিত্ত, অবশ্য পরিত্যাজ্যাকে অবিলম্বে ত্যাগ করিয়া আপনার প্রাণরক্ষা করুন। হে তাত। অবশ্য কর্তব্য বিষয়ে বিমুখ হইবেন না; দেখুন, ইহার পর আর দুঃখের বিষয় কি যে, আপনি স্বর্গপ্রাপ্ত হইলে পর আমরা কুকুরের ন্যায় দ্বারে দ্বারে অন্ন যাজ্ঞা করিয়া ভ্রমণ করিব। আর যদি আপনি কেবল আমাকে পরিত্যাগ করিয়া সবান্ধবে পরিত্রাণ পাইতে পারেন, তাহা হইলে আমি পরলোক-গমন করিয়াও জীবিতার ন্যায় পরমসুখে বাস করিব। হে পিতঃ! আপনি আমাকে রাক্ষসের মুখে ত্যাগ করিলে দেবগণ ও পিতৃগণ ত্বদ্দত্ত তোয়ে পরম পরিতুষ্ট হইয়া আপনার হিতসাধনে তৎপর রহিবেন।
ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী কন্যার এইরূপ পরিবেদন' বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহার সমভিব্যাহারে রোদন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের তিনজনকে এইরূপ ক্রন্দন করিতে দেখিয়া ব্রাহ্মণের শিশু সন্তান প্রত্যেকের নিকট গমন করিয়া উৎফুল্ললোচনে অস্ফুট মধুরস্বরে কহিতে লাগিল, হে তাত! হে মাতঃ! হে ভগিনি! তোমরা ক্রন্দন করিও না, স্থির হও, আমার হস্তে এই যে তৃণটি দেখিতেছ, আমি ইহার আঘাতে সেই দুরাত্মা রাক্ষসের প্রাণনাশ করিব। তাঁহারা তিন জনে যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ ছিলেন, কিন্তু বালকের মুখে মৃদু মধুর এই কথা শ্রবণে পরম আনন্দিত হইলেন। কুন্তী এতাবৎকাল দণ্ডায়মান ছিলেন, এক্ষণে অবসর বুঝিয়া তাঁহাদের দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করিবার নিমিত্ত সমীপবর্তিনী হইলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! কুন্তী তাঁহাদের সন্নিহিত হইয়া অমৃতময় বাক্যে সান্ত্বনা করিয়া কহিতে লাগিলেন, আপনারা কি নিমিত্ত রোদন করিতেছেন? আপনাদের এই দুঃখের কারণ কি? সবিশেষ বলুন; যদি আমাদের সাধ্য হয়, তবে অবশ্য আপনাদের দুঃখ মোচন করিব। ব্রাহ্মণ কুন্তীর এই মধুময় বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে তপোধনে! দুঃখিত ব্যক্তির দুঃখ মোচন করা ভদ্রলোকের কর্তব্য বটে, কিন্তু আমার যে দুঃখ উপস্থিত হইয়াছে, তাহা নিরাকরণ করা মনুষ্যের সাধ্য নহে। হে মনস্বিনী! এই নগরের সমীপে বক নামে এক রাক্ষস বাস করে। মহাবলপরাক্রান্ত দুর্দান্ত নরমাংসাশী সেই দুরাত্মাই এই নগরের অধিপতি; সে নিজ ভুজবলে এই জনপদ, নগর ও সমস্ত দেশ রক্ষা করে। তাহার প্রভাবে পরচক্র' বা অন্যান্য হিংস্র প্রাণী হইতে আমরা কিছুমাত্র ভয় পাই না।
ঐ রাক্ষস আপনার আহারের নিমিত্ত এই গ্রামে এক নিয়ম সংস্থাপন করিয়াছে যে, প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে এক এক গৃহস্থের ভবন হইতে একজন মনুষ্য, বিংশতি খারি' পরিমিত তণ্ডুল ও দুইটা মহিষ লইয়া তাহার নিকটে গমন করিবে। রাক্ষস, উপনীত সেই সমস্ত বস্তু ও উপস্থিত ব্যক্তিকে ভক্ষণ করিয়া আত্মজীবিকা নির্বাহ করিবে। হে ভদ্রে! বহুদিবসাবধি এই নিয়ম প্রচলিত থাকাতে, অত্রত্য সমস্ত লোকই বিরক্ত হইয়াছে। যাহা হউক, যে ব্যক্তি তাহার এ নিয়ম রহিত করিতে উদ্যোগী হয়, দুরাত্মা রাক্ষস অবিলম্বে তাহাকে পুত্রকলত্র সমভিব্যাহারে ধ্বংস করিয়া স্বীয় অভ্যবহার' কার্য্য সম্পাদন করে। এই প্রদেশের অনতিদূরবর্তী বেত্রকীয়গৃহ নামক স্থানে নয়ানভিজ্ঞ এক রাজা আছেন। তিনি নিতান্ত অবোধ; এই নগরের উপর তাঁহার কিছুমাত্র যত্ন নাই। যাহাতে আমাদের ভাল হয়, কদাচ এমন কোন চেষ্টাই করেন না। আমরা অনাময়ের প্রকৃত পাত্র, কিন্তু - অকর্মণ্য ও দুর্ব্বল রাজার রাজ্যে বাস করিয়া আমাদিগকে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকিতে হইয়াছে; নতুবা ব্রাহ্মণদিগকে কি - কাহারও কথা শুনিতে হয়, না কাহারও অভিপ্রায়ানুবর্তী হইয়া চলিতে হয়? ইহারা নিজ গুণগ্রামে কামগ পক্ষীর মত যথায় ইচ্ছা তথায় বাস করিতে পারেন। হে ভদ্রে। লোকে প্রথমে রাজার আশ্রয় গ্রহণ করিবে, পরে ভার্য্যা গ্রহণ, তৎপরে কনসাক্ষর করিবে; কারণ এই তিন প্রকার সমৃদ্ধিদ্বারা জ্ঞাতি-দিগকে ও পুত্রসকলকে রক্ষা করিতে পারে। ভাগ্যক্রমে আমার এই তিনই বিপরীতরূপ সংগ্রহ করা হইয়াছে, তন্নিমিত্তই আমি এই প্রকার বিপদগ্রস্ত হইয়া তাপিত হইতেছি। হে তপোধনে। অদ্য আমার পর্য্যায় উপস্থিত; অবশ্যই আমাকে সেই রাক্ষসসমীপে তাহার ভোজনীয় তন্ডুলাদি ও একজন মনুষ্য পাঠাইতে হইবে। আমার এমন অর্থ নাই যে, একজন মনুষ্য ক্রয় করি; স্বীয় সুহাজ্জনকে প্রদান করাও কোনমতে বিধেয় নহে। এক্ষণে কি করি? কিরূপে রাক্ষসহস্ত হইতে পরিত্রাণ পাই, তাহার কোন উপায়ই দেখিতেছি না; এই নিমিত্ত দুঃখসাগরে মগ্ন হইয়াছি। এক্ষণে স্থির করিয়াছি যে, সবান্ধবে সেই দুরাত্মা রাক্ষসের সমীপে গমন করিব, সে আমাদিগের সকলকে এককালে ভক্ষণ করিয়া এই বিষম দুঃখ হইতে মোচন করিবে।
কুন্তী কহিলেন, হে ব্রহ্মন। আপনি সেই রাক্ষসের ভয়ে আর বিষাদ করিবেন না; যাহাতে সেই দুরাত্মার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারেন, এমন এক উপায় স্থির করিয়াছি। আপনার এক সন্তান, সেও অতি শিশু, কন্যাও একটির অধিক নাই, সেও অতি সুশীলা, অতএব উহাদের অন্যতরের কিংবা আপনার বা আপনার সহধর্মিণীর তথায় গমন করা বিধেয় নহে। আমার পাঁচ পুত্র; তাহাদের মধ্যে একজন আপনার হিতার্থে বলি লইয়া রাক্ষসসমীপে গমন করিবে।
ব্রাহ্মণ কহিলেন, হে শুভে! একে আপনারা ব্রাহ্মণ, তাহাতে আবার অতিথি; অতি অভদ্র অধার্মিক লোকেরাও স্বীয় প্রাণ রক্ষার্থে অতিথি ব্রাহ্মাণের প্রাণ নাশ করেন না। হে তপোধনে। ব্রাহ্মণের নিমিত্ত আপনারা বা তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ স্বীয় আত্মজ পরিত্যাগ করা কর্তব্য। আমি কি করিয়া তাহার বিপরীত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব? ব্রাহ্মণবধ ও আত্মত্যাগ এই উভয়ের মধ্যে আমার মতে আত্মত্যাগ শ্রেয়ঃ; কারণ অজ্ঞানতঃ ব্রহ্মহত্যা করিলেও উহার পাতক হইতে নিষ্কৃতি নাই। হে ভদ্রে। যদি আমি স্বয়ং রাক্ষসসমীপে গমন করিয়া তৎকর্তৃক বিনষ্ট হই, তাহা হইলে আমার আত্মহত্যার পাপ হইবে না; যেহেতু আমি অগত্যা এই বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতেছি। আর যদি তাহা না করিয়া আপনার পুত্রকে সে স্থানে পাঠাই, তাহা হইলে আমি অভিসন্ধিকৃত ব্রাহ্মণবধ জন্য দারুণ পাতক হইতে কখনই পরিত্রাণ পাইতে পারিব না। হে শুভে। পণ্ডিতগণ গৃহাগত, শরণাগত ও ভিক্ষার্থী ব্যক্তির বধ নিতান্ত নৃশংস বলিয়া নিন্দা করিয়া থাকেন। আপদ্ধৰ্ম্মবিৎ প্রাচীন মহাত্মারা কহিয়াছেন, নৃশংস বা নিন্দিত কৰ্ম্ম কদাচ করিবে না; অতএব অদ্য আমি প্রণয়িনীসমভিব্যাহারে রাক্ষসহস্তে প্রাণত্যাগ করিব; ব্রাহ্মণবধে কদাপি সম্মত হইব না।
কুন্তী কহিলেন, হে ব্রহ্মান। আপনি যাহা কহিলেন, উহা আমারও অভিমত; ব্রাহ্মাণ অবশ্য রক্ষণীয়। বিশেষতঃ শত পুত্র থাকিলেও পুত্রের প্রতি মাতা পিতার বিরক্তি জন্মে না, তবে যে আমি স্বীয় পুত্রকে রাক্ষস সমীপে প্রেরণ করিতে সমুদ্যত হইতেছি, তাহার কারণ আমি বিশেষরূপে জানি। রাক্ষস কখনই আমার সেই পুত্রকে বিনাশ করিতে পারিবে না। আমার পুত্র সাতিশয় বলবান, তেজস্বী ও মন্ত্রসিদ্ধ। সে রাক্ষস সমীপে তাহার ভোজ্য দ্রব্যসমুদায় লইয়া যাইবে এবং তাহার হস্ত হইতে অনায়াসে রক্ষা হইয়া প্রত্যাবর্তন করিবে, সন্দেহ নাই। আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি, ইতিপূর্ব্বে অনেক মহাবল-পরাক্রান্ত মহাকায় রাক্ষস আমার সেই পুত্রের সহিত সংগ্রাম করিয়া সমরশায়ী হইয়াছে; হে ব্রহ্মন্! আপনি এ কথা আর কাহাকেও বলিবেন না; কি জানি তাহা হইলে পাছে বিদ্যার্থিগণ এই বার্তা শ্রবণে কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া আমার পুত্রগণকে বিরক্ত করে।
ব্রাহ্মণ কুন্তীর এই অমৃতোপম বাক্য শ্রবণে যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়া ভাৰ্য্যা সমভিব্যাহারে তাঁহাকে পূজা করিতে লাগিলেন। তখন কুন্তী ও ব্রাহ্মণ উভয়ে ভীমসেনের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে রাক্ষসবধার্থ গমন করিতে অনুরোধ করিলেন; ভীম "যে আড্ডা" বলিয়া তাঁহাদের অভিলষিত সম্পাদন স্বীকার করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! ভীমপরাক্রম ভীমসেন ব্রাহ্মণের হিতানুষ্ঠান করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলে যুধিষ্ঠিরাদি অপর ভ্রাতৃচতুষ্টয় ভিক্ষা করিয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। পাণ্ডুনন্দন যুধিষ্ঠির স্বীয় মাতা কুন্তী, ব্রাহ্মাণ ও ভীমসেনের আকার প্রকার দ্বারা সমস্ত বৃত্তান্ত বুঝিতে পারিয়া স্বীয় জননীকে একান্তে লইয়া গিয়া কহিলেন, মাতঃ। মহাবল ভীমসেন এ কি অসম-সাহসিকের কার্য্য করিতে সমুদ্যত হইয়াছে? সেই দুষ্কর কার্য্য করিতে ভীম কি স্বয়ং প্রবৃত্ত হইয়াছে? অথবা আপনি উহাকে অনুমতি দিয়াছেন? কুন্তী কহিলেন, বৎস। ভীমসেন আমার আজ্ঞানুসারে ব্রাহ্মণের উপকারার্থে ও নগরের হিতসাধনের নিমিত্ত এই কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছে। যুধিষ্ঠির কহিলেন, মাতঃ! আপনি এ বিষয়ে ভীমকে অনুমতি প্রদান করিয়া সজ্জন-বিগর্হিত ও অতিমাত্র সাহসের কার্য্য করিয়াছেন। আপনি কি নিমিত্ত পরপুত্ররক্ষার্থে স্বীয় পুত্রবিনাশরূপ লোকবেদবিরুদ্ধ কার্য্যানুষ্ঠান করিতে উদ্যত হইলেন? দেখুন, যাহার বাহুবলমাত্র আশ্রয় করিয়া আমরা দুর্জনাপহৃত রাজ্য পুনঃ প্রত্যুদ্ধার করিতে কৃতনিশ্চয় হইয়া সুখে নিদ্রা যাই, যাহার পরাক্রম চিন্তা করিয়া দুরাত্মা দুর্য্যোধন শকুনি সমভিব্যাহারে রজনীযোগে নিদ্রিত হইতে পারে না; যাহার বীর্য্যপ্রভাবে আমরা জতুগৃহ ও অন্যান্য অনেক অনিষ্ট হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছি, আমরা যে মহাবীরের পরাক্রমমাত্র অবলম্বন করিয়া এই বসু'পূর্ণা বসুন্ধরা আপনা-দিগের হস্তগত বলিয়া মনে করি, আপনি কোন্ সাহসে সেই মহাবল পরাক্রান্ত বৃকোদরকে পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন? বোধহয়, দুরবস্থায় পতিত হওয়াতে আপনার বুদ্ধি শুদ্ধি বিলুপ্ত হইয়াছে।
কুন্তী কহিলেন, বৎস যুধিষ্ঠির! তুমি কেন এ বিষয়ে বৃথা সন্তাপ করিতেছ? আমি যে বুদ্ধিদৌর্ব্বল্যপ্রযুক্ত এই কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছি, এরূপ সন্দেহ করিও না। দেখ, আমরা এই ব্রাহ্মণের নিকেতনে পরমসুখে বাস করিতেছি; ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ ইহার বিন্দুবিসর্গও জানে না। ব্রাহ্মণ আমাদের যথেষ্ট সৎকার ও সম্মান করিয়া থাকেন। হে পুত্র। তজ্জন্য এই মহোপকারক ব্রাহ্মণের হিতসাধনার্থে এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইয়াছি। যে ব্যক্তি পরকৃত উপকার প্রাণান্তেও বিস্মৃত হয় না ও অন্যে যে পরিমাণে উপকার করিয়াছে তদপেক্ষা বহুগুণ উপকারদ্বারা তাহার প্রতিশোধ দেয়, সেই যথার্থ মনুষ্য। বিশেষতঃ আমি জতুগৃহদাহ ও হিড়িম্ব বধ সময়ে ভীমের পরাক্রম বিলক্ষণ জানিতে পারিয়াছি। ভীমপরাক্রম ভীমসেন অযুত মত্ত হস্তিতুল্য বলশালী। ঐ মহাবলপরাক্রান্ত বৃকোদর আমাদিগকে বারণাবত নগর হইতে বহির্গত' করিয়াছে। উহার তুল্য বলশালী আর কেহই নাই; বোধ হয় সে যুদ্ধে পুরুষোত্তম চক্রপাণিকেও জয় করিতে পারে। ভীমসেন জাতমাত্র আমার ক্রোড় হইতে গিরিপৃষ্ঠে নিপতিত হয়, পর্ব্বত উহার দেহভারে চূর্ণ হইয়া যায়। অতএব হে পাণ্ডব! আমি স্বীয় প্রজ্ঞাদ্বারাই ভীমসেনের বলবিক্রম বুঝিতে পারিয়া ব্রাহ্মণের প্রত্যুপকারার্থে এই বিষয়ে অনুমতি প্রদান করিয়াছি। আমি লোভ বা অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হই নাই, বুদ্ধিপূর্ব্বক ইহা করিয়াছি। হে যুধিষ্ঠির! এই কার্য্য সম্পাদনদ্বারা আমাদের দুইটি মহৎকার্য্যানুষ্ঠান হইবে; প্রথম আশ্রয়দাতার প্রত্যুপকার, দ্বিতীয় ধর্মানুষ্ঠান। হে পুত্র! পূর্ব্বে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন আমাকে কহিয়াছেন, যে ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণের কার্য্যকালে তাঁহার সাহায্য করে, সে চরম শুভলোক প্রাপ্ত হয়; যে ক্ষত্রিয় ক্ষত্রিয়ের প্রাণরক্ষা করে, সে ইহকালে ও পরকালে মহতী কীর্ত্তিলাভ করে; যে ক্ষত্রিয় বৈশ্যের সাহায্য করে, সে সর্ব্বলোকে প্রজারঞ্জক হয় এবং যে ক্ষত্রিয় শরণাগত শূদ্রকে বিপদ হইতে পরিত্রাণ করে, সে এই রাজপূজিত ক্ষত্রিয়কুলে পুনর্ব্বার জন্মগ্রহণ করে। হে পৌরবংশাবতংস! আমি বেদব্যাসের এই উপদেশ স্মরণ করিয়া এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিয়াছি।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির স্বীয় জননী কুন্তীর মুখে এই প্রকার ধর্মোপেত বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মাতঃ! আপনি করুণাপ্রযুক্ত দুঃখার্ত ব্রাহ্মণের উপকারার্থে অনুমতি করিয়া যৎপরোনাস্তি সুশীলতার কার্য্য করিয়াছেন। আপনি ব্রাহ্মহ্মণের প্রতি সাতিশয় সদাশয় হইয়াছেন। আপনার এই পুণ্যবলে ভীমসেন অবশ্যই সেই নরমাংসলোলুপ দুষ্ট নিশাচরের প্রাণনাশ করিয়া প্রত্যাবর্তন করিবে, সন্দেহ নাই। আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক ব্রাহ্মণকে কহিবেন যে, নগরবাসী জনগণ যেন এই সমস্ত বৃত্তান্ত জানিতে না পারে।
এইরূপে সমস্ত দিবারাত্রি অতিবাহিত হইলে, প্রাতঃকালে ভীমসেন অন্ন লইয়া রাক্ষসের আবাসস্থানে গমন করিলেন। তথায় সমুপস্থিত হইয়া সেই রাক্ষসের নামোচ্চারণপূর্ব্বক তাহাকে আহ্বান করিতে করিতে আনীত অন্ন স্বয়ংই উপযোগ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাকায় রাক্ষস ভীমের সেই আহ্বান-বাক্য শ্রবণে সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইল। ঐ রাক্ষসের চক্ষুঃ, কেশ ও শ্মশ্রু লোহিতবর্ণ; মুখবিবর আকর্ণবিস্তৃত, কর্ণদ্বয় গর্দভশ্রবণের ন্যায় দীর্ঘ। ভীষণমূর্তি রাক্ষস তথায় আগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে সেই সমস্ত অন্ন ভক্ষণ করিতে দেখিয়া পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুদ্ধচিত্তে ত্রিশিখ, ভ্রুকুটী বন্ধন ও অধরোষ্ঠ দংশন পুরঃসর ঘূর্ণিতনয়নে কহিতে লাগিল, অরে! কোন্ দুর্বুদ্ধি আমার সমক্ষে আমার নিমিত্ত আনীত অন্ন ভক্ষণ করিতেছে? শমনসদনে গমন করিতে কাহার বাসনা হইয়াছে? ভীমসেন রাক্ষসের বচন শ্রবণে ঈষৎ হাস্য করিয়া তাহার বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া ভোজন করিতে লাগিলেন। তখন রাক্ষস ভয়ানক চীৎকার ও বাহুদ্বয় উত্তোলনপূর্ব্বক ভীমসেনকে সংহার করিবার মানসে তাঁহার নিকট ধাবমান হইল। শত্রুপক্ষ-ক্ষয়কারী ভীমসেন তাহাতে কিছুমাত্র মনোযোগ না করিয়া নিঃশঙ্কচিত্তে ভোজন করিতে লাগিলেন।
রাক্ষস ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবরে ভীমসেনের পশ্চাদ্ভাগে দণ্ডায়মান হইয়া তাঁহার পৃষ্ঠে দুইহস্তে চপেটাঘাত করিতে লাগিল। বৃকোদর সেই প্রকারে আহত হইয়াও রাক্ষসের প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্রও না করিয়া স্বচ্ছন্দে উপযোগ করিতে লাগিলেন। রাক্ষস তদ্দর্শনে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রোধান্বিত হইয়া বৃক্ষগ্রহণ পূর্ব্বক ভীমসেনকে আঘাত করিবার মানসে ধাবমান হইল। তখন ভীমসেন ক্রমে ক্রমে সমস্ত অন্ন ভক্ষণান্তর আচমন করিয়া যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত হইলেন এবং হাসিতে হাসিতে বামহস্ত দ্বারা রাক্ষসের হস্তস্থিত বৃক্ষ কাড়িয়া লইলেন। রাক্ষস তদ্দর্শনে যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হইয়া বহুবিধ বৃক্ষ আনয়ন করিয়া ভীমসেনকে প্রহার করিতে লাগিল। বৃকোদরও তাহাকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপ রাক্ষসকৃত বৃক্ষসংগ্রামে সেই বন পাদপশূন্য হইয়া গেল। তখন বক "অরে দুরাত্মন্। তুই বকনিশাচরের হস্তে পতিত হইয়াছিস্, আর তোর নিস্তার নাই" এই বলিয়া দ্রুতবেগে ভুজদ্বয়দ্বারা ভীমসেনকে আক্রমণ করিল। মহাবীর ভীমসেনও বলপূর্ব্বক রাক্ষসকে ধারণ করিয়া আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। রাক্ষস ভীমসেনকর্তৃক কৃষ্যমাণ হইয়া সাতিশয় ক্লান্ত হইল। সেই মহাবীরদ্বয়ের বেগে পৃথিবী কম্পিত হইতে লাগিল এবং বৃক্ষ সমুদায় চূর্ণ হইয়া গেল। এইরূপে দিবারাত্রি যুদ্ধে বৃকোদর রাক্ষসকে ক্ষীণবীর্য্য দেখিয়া তাহাকে ভূতলে নিক্ষেপ করিলেন। তিনি জানুদ্বয়দ্বারা পৃষ্ঠদেশে দৃঢ় নিষ্পীড়ন করিয়া দক্ষিণ হস্তে গ্রীবা ধারণ করিলেন এবং বামহস্তদ্বারা কটিদেশের বস্ত্র ধরিয়া তাহার মধ্যদেশ ভঙ্গ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। দুরাত্মা বক মহাবলপরাক্রান্ত ভীমসেনকর্তৃক দৃঢ়তর নিষ্পীড়িত হইয়া পূর্ব্বাপেক্ষা দ্বিগুণতর চীৎকার করিতে করিতে রুধির বমন করিতে লাগিল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! তদনন্তর বক-নিশাচর ভীমসেনের দারুণ প্রহারে সাতিশয় ব্যথিত হইয়া ভয়ানক স্বরে চীৎকারপূর্ব্বক প্রকাণ্ড পর্ব্বতের ন্যায় ধরাতলে পতিত হইল। বকরাক্ষসের চীৎকারধ্বনি শ্রবণে তাহার আত্মীয়-বর্গ সাতিশয় ত্রাসযুক্ত হইয়া পরিচারকগণ সমভিব্যাহারে গৃহ হইতে বহির্গত হইল। ভীমসেন তাহাদিগকে ভীত ও জ্ঞানশূন্য দেখিয়া সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন এবং কহিলেন, তোমরা প্রতিজ্ঞা কর, অদ্যাবধি আর নরহত্যা করিবে না। যে রাক্ষস মনুষ্যহিংসায় প্রবৃত্ত হইবে, তাহাকে এইরূপে সংহার করিব। রাক্ষসগণ "যে আজ্ঞা" বলিয়া ভীমের বচনে সম্মত হইল এবং তদবধি শান্তমূর্ত্তি হইয়া নগরবাসী জনগণ সমীপে বিচরণ করিতে লাগিল।
তদনন্তর ভীমসেন সেই বকনিশাচরের মৃতদেহ লইয়া দ্বারদেশে নিক্ষেপপূর্ব্বক অলক্ষিতরূপে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। বকের জ্ঞাতিবর্গ তাহাকে মৃত দেখিয়া ভয়াকুলচিত্তে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল। এ দিকে ভীমসেন রাক্ষসবধ সমাপনানন্তর ব্রাহ্মণভবনে প্রত্যাগমন করিয়া যুধিষ্ঠিরের নিকট আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন।
রজনী প্রভাত হইলে নগরস্থ জনগণ নগর হইতে বহির্গত হইয়া দেখিল যে, বকরাক্ষস পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়া রুধিরোক্ষিত' কলেবরে ধরাতলে পতিত রহিয়াছে। তাহারা সেই ভূধরোপম ভূমিনিহিত ভয়ানক বকরাক্ষসকে দেখিয়া রোমাঞ্চিত কলেবরে পুনর্ব্বার একচক্রায় গমন করত তথায় ঐ সমস্ত বার্তা প্রচার করিল। তখন একচক্রানিবাসী আবাল-বৃদ্ধবনিতাগণ মৃত বকরাক্ষসকে দেখিতে গমন করিল। তাহারা সেই বকবধরূপ অতিমানুষ ব্যাপার দর্শনে চমৎকৃত হইয়া দেবার্চ্চনা করিতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর তাহারা "কল্য কাহার পর্যায়' গিয়াছে” এই পর্যালোচনা করিতে করিতে জানিতে পারিল যে, ব্রাহ্মণের পর্য্যায় গিয়াছে। তখন সকলে একত্র হইয়া ব্রাহ্মণের সমীপে গমনপূর্ব্বক উক্ত ব্যাপারের কারণ জিজ্ঞাসা করিল। ব্রাহ্মণ পৌরগণ কর্তৃক এইরূপ জিজ্ঞাসিত পাণ্ডবদিগকে রক্ষা করিবার মানসে গোপন-পূর্ব্বক কহিলেন, হে পৌরগণ। আমি পর্যায়ক্রমে রাক্ষসের আহার প্রদানার্থ আদিষ্ট হইয়া সপরিবারে ক্রন্দন করিতেছিলাম এমত সময়ে এক মহামনাঃ মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ আমার সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তিনি আমার ও পৌরবর্গের দুঃখের বিষয় অবগত হইয়া দয়ার্দ্রচিত্তে আমাকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! অদ্য আমি অন্ন লইয়া সেই দুরাত্মা রাক্ষসের নিকট গমন করিব, আমার নিমিত্ত তোমার কিছুমাত্র ভয় নাই। তিনি আমাকে এই কথা বলিয়া অন্নগ্রহণপূর্ব্বক বকভবনে গমন করিলেন। নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে ইহা সেই ব্রাহ্মণের কার্য্য। পুরবাসী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রগণ ব্রাহ্মণের ঐ কথা শুনিয়া পরমাহ্লাদে উৎসব করিতে লাগিল। এইরূপে সমস্ত জনপদগণ সেই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শন করিয়া নগরে আগমন করিল। পাণ্ডবগণ ব্রাহ্মণ-নিকেতনেই বাস করিতে লাগিলেন।
চৈত্ররথ পর্ব্বাধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। নরশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবেরা বকরাক্ষস সংহার করিয়া পরে কি করিলেন, বলুন, শুনিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ জন্মিয়াছে।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! তাঁহারা এইরূপে বক রাক্ষসের প্রাণনাশ করিয়া বেদপাঠ করত সেই ব্রাহ্মণের আবাসে বাস করিতে লাগিলেন! এইরূপে কিয়দ্দিবস অতীত হইলে একদা এক ব্রাহ্মণ আশ্রয়লিঙ্গু হইয়া ঐ ব্রাহ্মণের ভবনে প্রবেশ করিলেন। আতিথেয়' ব্রাহ্মণ অভ্যাগত অতিথির যথোচিত সৎকার করিয়া তাঁহাকে বিশ্রামার্থ আশ্রয় প্রদান করিলেন। পাণ্ডবেরা জননী সমভিব্যাহারে পরমশ্রদ্ধা ও সাতি-শয় ভক্তিসহকারে ঐ ব্রাহ্মণের পরিচর্যা করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ তাঁহাদিগের সেবায় অতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া প্রসঙ্গক্রমে অতিবিচিত্র পবিত্র কথার উত্থাপন ও নানাদেশ, নগরী, তীর্থস্থান, নদী, অনেকানেক রাজার উপাখ্যান ও বহুবিধ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার সমুদায় কীর্ত্তন করিলেন। এই সমস্ত কথা সমাপন হইলে পাঞ্চালদেশে অতি অদ্ভুত দ্রৌপদীর স্বয়ংবর ব্যাপার, ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং শিখণ্ডীর উৎপত্তি ও মহারাজ দ্রুপদের মহাযজ্ঞে অযোনিসম্ভবা দ্রৌপদীর জন্ম শ্রবণ করাইলেন। পাণ্ডবেরা ব্রাহ্মণের মুখে এই বিস্ময়কর ব্যাপার শ্রবণ করিয়া একান্ত কৌতূহলাক্রান্তচিত্তে কহিলেন, হে মহাশয়। যজ্ঞবেদীস্থিত জ্বলন্ত জ্বলনমধ্য হইতে কিরূপে দ্রুপদপুত্র ও দ্রৌপদী সম্ভূত হইলেন, মহাধনুর্দ্ধর দ্রোণ হইতে কি প্রকারে দ্রুপদ ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করেন, আর তাঁহাদিগের তাদৃশ সখ্যভাবই বা কি কারণে বিচ্ছিন্ন হইল, মহাশয়! অনুগ্রহ করিয়া এই সমস্ত আদ্যোপান্ত কীর্তন করুন। ব্রাহ্মণ তাঁহাদিগের প্রেরণাপরতন্ত্র হইয়া অতিবিচিত্র দ্রৌপদীসম্ভব পবিত্র বৃত্তান্ত কহিতে লাগিলেন।
ব্রাহ্মণ কহিলেন, গঙ্গাদ্বারে মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপাঃ মহর্ষি ভরদ্বাজ অবস্থিতি করিতেন। একদা তিনি স্নানার্থ গঙ্গাতীরে গমন করিয়া দেখিলেন, ঘৃতাচী নাম্নী এক অপ্সরা তাঁহার আসিবার পূর্ব্বে তথায় উপনীত হইয়া জাহ্নবীজলে অবগাহন ও স্নান করিয়া তীরে দণ্ডায়মান আছে। এই অবসরে সমীরণ তদীয় পরিধেয় বসন আকর্ষণ ও অপহরণ করিল; মহর্ষি সহসা অঙ্গরাকে বিবসনা দেখিয়া তাহার সহিত বিহার বাসনায় নিতান্ত কাতর হইয়া উঠিলেন। বলবতী অপ্সরাসম্ভোগস্পৃহায় একান্ত অধীর হইয়া কৌমার ব্রহ্মচারী মহর্ষির চিরসঞ্চিত রেতঃ তৎক্ষণাৎ স্খলিত হইল। রেতঃ স্খলিত হইবামাত্র মহর্ষি দ্রোণীমধ্যে স্থাপন করিলেন; তাহা হইতেই ধীমান্ ভরদ্বাজের সুকুমার দ্রোণ নামে কুমার উৎপন্ন হইলেন। দ্রোণ বয়োবৃদ্ধি-সহকারে সমুদায় বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিলেন।
পৃষত নামক এক মহীপাল মহর্ষি ভরদ্বাজের পরম বন্ধু ছিলেন। তৎকালে তাঁহারও দ্রুপদনামে এক পুত্র উৎপন্ন হয়। দ্রুপদ প্রতিদিন আশ্রম প্রদেশে প্রবেশ করিয়া দ্রোণের সহিত ক্রীড়া ও অধ্যয়ন করিতেন। পৃষতরাজ কলেবর পরিত্যাগ করিলে দ্রুপদ পৈত্রিক সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হইলেন। কিয়দ্দিবস অতীত হইলে একদা দ্রোণ লোকমুখে শুনিলেন, পরশুরাম অর্থীদিগকে প্রার্থনাধিক অর্থ প্রদান করিয়া তপো-নুষ্ঠানের নিমিত্ত অরণ্যে প্রবেশ করিয়াছেন। ভরদ্বাজ-পুত্র দ্রোণ তথায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম। আমি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণ, কিঞ্চিৎ অর্থ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় আপনার নিকট উপস্থিত হইয়াছি। পরশুরাম কহিলেন, হে ব্রহ্মন। আমি যাবতীয় অর্থ সমুদায় পাত্রসাৎ করিয়াছি, এক্ষণে অস্ত্র ও শরীরমাত্র অবশিষ্ট আছে। ইহার অন্যতর কি প্রদান করি, বল। দ্রোণ কহিলেন, ভগবন্! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে প্রয়োগ ও সংহারের সহিত সমুদায় অস্ত্র আমাকে প্রদান করুন। ভৃগুনন্দন রাম "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্য স্বীকারপূর্ব্বক সমুদায় অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করিলেন। দ্রোণ অস্ত্রলাভ করিয়া চরিতার্থ হইলেন এবং অভীষ্ট ব্রহ্মাস্ত্রলাভে হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইয়া আপনাকে সর্ব্বোৎকৃষ্ট বোধ করিলেন।
অনন্তর প্রতাপশালী ভারদ্বাজ দ্রোেণ দ্রুপদ-সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ। তোমার সখা দ্রোণ উপস্থিত হইয়াছে। তাহা শুনিয়া দ্রুপদ কহিলেন, যাদৃশ অশ্রোত্রিয় শ্রোত্রিয়ের ও অরণী রণীর মিত্র হইতে পারে না, সেইরূপ যিনি রাজা নহেন, তিনি কি প্রকারে রাজার সখা হইতে পারেন? এই কথা শ্রবণ করিয়া দ্রোণ ভগ্নমনে হস্তিনানগরীতে গমন করিলেন। ভীষ্ম অভ্যাগত দ্রোণ-সন্নিধানে ধনুর্ব্বেদ-শিক্ষার্থে প্রভূত অর্থের সহিত স্বীয় পৌত্রদিগকে প্রেরণ করিলেন। দ্রোণ দ্রুপদের গর্ব্ব খর্ব্ব করিবার মানসে শিষ্যগণকে সম্মুখে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে শিষ্যগণ। যেরূপ গুরুদক্ষিণা আমার মনোনীত হয়, অস্ত্রশস্ত্র সম্যক্ শিক্ষা করিয়া তোমাদিগকে তাহা দিতে হইবে। এক্ষণে ইহা অঙ্গীকার কর। তখন অর্জুন প্রভৃতি শিষ্যসমবায় "তথাস্তু” বলিয়া গুরুবাক্য স্বীকার করিলেন। তৎপরে পাণ্ডবদিগকে ধনুর্ব্বেদে কৃতবিদ্য দেখিয়া দ্রোণ দক্ষিণা-গ্রহণার্থ পুনর্ব্বার কহিলেন, হে শিষ্যগণ! ছত্রবতী নগরীর অধিপতি পৃষতপুত্র দ্রুপদকে পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত করিয়া অচিরাৎ সেই রাজ্য আমাকে দক্ষিণাস্বরূপে প্রদান কর। পাণ্ডবেরা দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাজয় করিয়া মন্ত্রী সমভিব্যাহারে তদীয় করচরণ বন্ধনপূর্ব্বক দ্রোণ-সন্নিধানে আনয়ন করিলেন। দ্রোণ দ্রুপদকে নেত্রগোচর করিয়া কহিলেন, হে যজ্ঞসেন! তোমার সহিত পুনরায় মৈত্রী স্থাপন করিবার প্রার্থনা করি, তুমি পূর্ব্বে কহিয়াছিলে যে, যিনি রাজা নহেন, তিনি রাজার সখা হইতে পারেন না, এই কারণে আমিও রাজ্যগ্রহণে যত্ন করিয়াছি। এক্ষণে তুমি ভাগীরথীর দক্ষিণ কূলের রাজা হইলে, আমি উহার উত্তরাংশ শাসন করিব।
পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ ভরদ্বাজতনয় দ্রোণের বচনবিন্যাস শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে মহাভাগ! আপনি যাহা কহিতেছেন, আমি তদ্বিষয়ে সম্মত আছি। আপনি কুশলে থাকুন, আপনার অভিমত মিত্রভাব পুনর্ব্বার বদ্ধমূল হইল। পরস্পর পরস্পরকে এইরূপ কহিয়া তাঁহারা পূর্ব্বসখ্য স্থাপনপূর্ব্বক স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু এইরূপ অযোগ্য উপচার দ্রুপদের হৃদয়ে সর্ব্বদা জাগরূক ছিল। তিনি দিনে দিনে নিতান্ত দুর্ব্বল ও একান্ত বিমনাঃ হইতে লাগিলেন।
ব্রাহ্মণ কহিলেন, তখন দ্রুপদরাজ রোষাবিষ্ট হইয়া যাজন-কর্মদক্ষ ব্রাহ্মহ্মণগণের অন্বেষণে আশ্রমে আশ্রমে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। সন্তান নাই বলিয়া তিনি অতিশয় বিলাপ ও পরিতাপ করিতেন এবং একটি উপযুক্ত পুত্রের মুখচন্দ্রমাঃ সন্দর্শনার্থে চিন্তায় একান্ত নিমগ্ন হইলেন। দ্রোণের অপকার করিবার নিমিত্ত তিনি বারংবার দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতেন কিন্তু তদীয় অলৌকিক প্রভাব, বিনয়, শিক্ষা, বিচিত্র-চরিত্র ও ক্ষাত্রবল আলোচনা করিয়া কিরূপে প্রতীকার করিব ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না।
অনন্তর দ্রুপদ ভাগীরথীতীরে কন্মাষী'র উভয় পার্শ্বে ভ্রমণ করিতে করিতে একদা এক আশ্রমে উপনীত হইলেন। তথায় অস্নাতক' ও অব্রতী কেহই ছিলেন না। তন্মধ্যে দেখিলেন, সংশিতব্রত যাজ ও উপযাজ নামক দুই ব্রহ্মর্ষি রহিয়াছেন, তাঁহারা শান্তগুণাবলম্বী, সংহিতাপাঠে অভিনিবিষ্ট, কাশ্যপগোত্র-সম্ভূত ও যুক্তরূপশালী। দ্রুপদ বিলম্ব না করিয়া বিনীতভাবে তাঁহাদিগের যথোচিত সংবর্দ্ধনা করিলেন; উভয়ের বলবুদ্ধি বিবেচনা করিয়া নির্জনে কনিষ্ঠ উপযাজের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং প্রিয়বাদী সর্ব্বকামদাতা হইয়া সর্ব্বপ্রযত্নে তদীয় অনুবৃত্তি ও চরণসেবা দ্বারা মহর্ষিকে তুষ্ট করিয়া যথোচিত সৎকারপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হে ব্রহ্মান্। দ্রোণের বিনাশের নিমিত্ত যদি কোনরূপ দৈবকার্য্যানুষ্ঠানদ্বারা আমার পুত্রোৎপাদন করিতে পারেন, তাহা হইলে আপনাকে এক অর্বুদ গো দান করিব অঙ্গীকার করিতেছি: অথবা আপনার যাহা অভিলাষ হয় তাহাই সফল করিব, সন্দেহ নাই। মহর্ষি দ্রুপদের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, রাজন! আমি তোমার বাক্য স্বীকার করিতে পারি না। দ্রুপদ এইরূপ প্রত্যাখ্যাত হইলেও পুনর্ব্বার তাঁহার আরাধনা ও নানা প্রকারে চিন্তানুবৃত্তি করিতে লাগিলেন।
অনন্তর সংবৎসরকাল অতিক্রান্ত হইলে একদা উপযাজ দ্রুপদকে মধুরবাক্যে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ। একদা মদীয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা এক নিবিড় অরণ্যানীমধ্যে সঞ্চরণ করিতে করিতে ভূতলে পতিত একটি ফল দেখিতে পাইলেন। যে স্থানে ঐ ফল পতিত হইয়াছিল, তাহার শৌচের' বিষয় কিছুই পরিজ্ঞাত ছিলেন না। আমি তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতেছিলাম। দেখিলাম, তিনি ফল গ্রহণে কিছুমাত্র বিবেচনা করিলেন না এবং ফলেরও পাপানুবদ্ধক দোষের প্রতিও কিছুমাত্র দৃষ্টি রাখিলেন না। অতএব যিনি একস্থলে শৌচাশৌচপরিজ্ঞানে নিরপেক্ষ হইলেন, তিনি অন্যত্র তাহার বিচার করিবেন না। আরও যখন গুরুগৃহে বাস ও সংহিতা অধ্যয়ন করিয়া উৎসৃষ্ট অন্ন ভোজন করেন এবং নির্মূণ হইয়া বারংবার উৎসৃষ্ট অন্নের গুণ কীর্ত্তন করিয়া থাকেন, তখন তিনি কিছুতেই শৌচাশৌচের বিচার রাখিবেন না। এক্ষণে আমি বিচার করিয়া দেখিতেছি, তিনিই ফলাকাঙ্ক্ষী; অতএব তুমি তাঁহার নিকট গমন কর, তিনি তোমার পুত্রেষ্টিযজ্ঞে দীক্ষিত হইবেন।
মহারাজ দ্রুপদ এইরূপে প্রত্যাখ্যাত হইয়া অতিশয় চিন্তিত হইলেন এবং তদীয় নির্দেশানুসারে মহর্ষি যাজের আশ্রমে প্রবেশপূর্ব্বক তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, বিভো! আমি আপনাকে অষ্ট অযুত গো দান করিব। আপনি আমার পুত্রেষ্টিযজ্ঞে দীক্ষিত হউন। দ্রোণের নিকট পরাভূত হইয়া আমি নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়াছি, এক্ষণে আত্মবিনোদনের নিমিত্ত আপনার শরণাপন্ন হইলাম। দ্বিজোত্তম দ্রোণ ব্রহ্মাস্ত্রে অদ্বিতীয়, অধিক কি, এই ধরাধামে ক্ষত্রিয়মধ্যেও দ্রোণের সম ধনুর্দ্ধর আর কেহই নাই, একারণ আমি তাঁহার নিকট সখিযুদ্ধে' পরাভূত হইয়াছি। তদীয় শরজাল প্রাণাপহারক, কদাচ ব্যর্থ হইবার নহে। রণস্থলে ষড়রত্নি' শরাসন তাঁহার হস্তে পরিদৃশ্য-মান হয়। তিনি ব্রাহ্মণের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বটে, কিন্তু নিঃসন্দেহ ক্ষত্রিয়তেজঃ প্রতিহত করিতে পারেন; সেই মহেম্বাস' মহাবল দ্রোণ দ্বিতীয় পরশুরামের ন্যায় ক্ষত্রিয়দিগের উচ্ছেদের নিমিত্ত এই জীবলোকে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তাঁহার অমরল মহামোর ও ভয়ঙ্কর, নরলোকে কেহই তাহা সহ্য করিতে পারে না। তিনি লব্ধাহুতি-প্রদীপ্ত' হুতাশনের ন্যায় ব্রাহ্মতেজঃ ধারণ করেন এবং ক্ষত্রিয় ধর্মানুসারে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া লক্ষ লোককে ভস্মসাৎ করিতে সমর্থ হয়েন। হে যাজ! ব্রাহ্ম ও ক্ষাত্রতেজঃ এই উভয়ের মধ্যে ব্রাহ্মতেজই উৎকৃষ্ট, অতএব আমি ক্ষত্রিয়বলে নিরপেক্ষ হইয়া ব্রাহ্মতেজের আশ্রয় লইতে মানস করিয়াছি এবং আপনার অনুকম্পায় আমার প্রবল-পরাক্রান্ত দ্রোণান্তক সন্তান জন্মিবে, এই আশয়ে আপনাকে অষ্ট অর্বুদ গো দান করিতে প্রস্তুত আছি। আপনি যথাবিধানে আমার এই পুত্রেষ্টিযজ্ঞ সমাধান করুন। তখন যাজ "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্য অঙ্গীকারপূর্ব্বক যজ্ঞীয় দ্রব্যসম্ভার আহরণ করিতে আদেশ দিলেন। যদিও উপযাজ বিষয়বাসনাশূন্য ও নিতান্ত নিস্পৃহ, তথাচ মহৎকৰ্ম্ম সম্পাদন করিতে হইবে বলিয়া তিনি তাঁহাকে তদ্বিষয়ে ব্রতী করিলেন এবং যাজ গাঢ়তর অধ্যবসায়সহকারে দ্রোণবধে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন।
অনন্তর মহাতপাঃ মহর্ষি উপযাজ মহীপাল দ্রুপদের পুত্রফলকামনায় যজ্ঞ আরম্ভ করিয়া কহিলেন, মহারাজ। তোমার যাদৃশ অভিলাষ তদনুসারে মহাবীর্য্য মহাবল দ্রোণান্তক পুত্র উৎপন্ন হইবে। তাঁহার এইরূপ উত্তেজনাবাক্যে উৎসাহিত হইয়া দ্রুপদরাজ দ্রোণবিনাশের অভিসন্ধিতে যজ্ঞীয়দ্রব্যসম্ভার আহরণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে উপযাজ জ্বলন্ত হুতাশনে পূর্ণাহুতি প্রদানকালে রাজমহিষীকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, ভদ্রে! তুমি পুত্র কন্যা উভয়ই প্রাপ্ত হইবে, আইস। মহিষী বিনয়বাক্যে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আমার মুখ অবলিপ্ত', গাত্রে দিব্যগন্ধ" ধারণ করিতেছি। আমি সন্তান নিমিত্ত এরূপভাবে আপনার সন্নিধানে উপস্থিত হইতে পারি না, আপনি আমার প্রিয়হেতু ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন।
যাজ কহিলেন, হে রাজপত্নি! তুমি যাও বা থাক, যাজদত্ত ও উপযাজের মন্ত্রপূত সংস্কৃত হব্য কদাচ বিফল হইবে না, অবশ্য অভীষ্ট সম্পাদন করিবে, এই বলিয়া তিনি সৎকৃত ও প্রজ্বলিত অনলে আহুতি প্রদান করিলেন। আহুতি প্রদান করিবামাত্র সহসা হুতাশনমধ্য হইতে দেবকুমারতুল্য সুকুমার এক কুমার উত্থিত হইলেন। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার ন্যায় তাঁহার বর্ণ উজ্জ্বল, সুন্দর কিরীটদ্বারা তদীয় মস্তক অলঙ্কৃত, আকার অতি ভয়ঙ্কর, ধনুর্ব্বাণ, বৰ্ম্ম ও খড়াচৰ্ম্ম ধারণ করিয়া বারংবার সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক দিব্য রথারোহণে বহ্নিমধ্য হইতে নির্গত হইলেন। এই অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া পাঞ্চাল-দেশীয় ইতর সাধারণ সকলেই প্রফুল্লমনে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের হর্যবেগ ও সিংহনাদ ভগবতী ধরিত্রীরও অসহ্য হইল। তৎকালে এইরূপ আকাশবাণী হইল যে, “যশস্বী রাজকুমার দ্রোণবধের নিমিত্ত উদ্ভূত হইয়াছেন। ইহার বল অতি অদ্ভুত, ইনি পাঞ্চালদিগের ভয় দূর করিবেন।” ইত্যবসরে সর্বাঙ্গসুন্দরী এক কুমারী যজ্ঞবেদীমধ্য হইতে উত্থিত হইলেন, ত্রিভুবনে তদীয় রূপলাবণ্যের তুলনা ছিল না। তাঁহার বর্ণ শ্যামল, লোচনযুগল পদ্মপলাশের ন্যায় সুশোভন ও অতি বিস্তীর্ণ, কেশজাল নীল ও আকুঞ্চিত, পয়োধর পীন ও উন্নত, ভ্রূদ্বয় দেখিতে সুচারু, কন্যার গাত্র হইতে নীলোৎপলসদৃশ গন্ধ এক ক্রোশ পর্যন্ত ধাবিত হইতেছে। তাঁহাকে দেখিলে বোধ হয়, যেন মানবীমূর্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া কোন দেবী পৃথিবীতে অবতীর্ণা হইয়াছেন। ঐ দেবরূপিণী রমণী দেখিতে এমন চমৎকারিণী যে, দেখিলে দেব, দানব, গন্ধর্ব্বেরও মন মোহিত হয়। "এই কন্যা কালক্রমে ক্ষত্রিয়কুলক্ষয় করিয়া বিস্তর সুরকার্য্য সাধন করিবেন, ইহার নিমিত্ত কুরুবংশীদিগের অন্তঃকরণে সর্ব্বদা আশঙ্কা থাকিবে," সহসা এইরূপ আকাশবাণী উত্থিত হইল। ইহা শ্রবণ করিয়া পাঞ্চালেরা সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন, তাঁহাদিগের ঐরূপ বেগ ভগবতী বসুন্ধরা সহ্য করিতে অসমর্থা হইলেন। তৎকালে রাজসহধর্মিণী পুত্রার্থিনী হইয়া যাজসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন এবং কন্যাপুত্রকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, হে যাজ। ইহারা আমাভিন্ন অন্য কাহাকেও যেন জননী বলিয়া না জানে। যাজ রাজার প্রিয়ানুষ্ঠান মানসে "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্যে অঙ্গীকার করিলেন। পূর্ণমনোরথ ব্রাহ্মণেরা (বালক অতি প্রগল্ভ ও দ্যুম্নসম্ভূত অর্থাৎ কবচাদির সহিত জাত বলিয়া) তাহার নাম ধৃষ্টদ্যুম্ন রাখিলেন এবং কন্যাটি কৃষ্ণবর্ণপ্রযুক্তা বলিয়া তাঁহাকে কৃষ্ণা নাম প্রদান করিলেন। এইরূপে দ্রুপদের মহাযজ্ঞে পুত্র ও কন্যা উভয় উৎপন্ন হইল। প্রবল প্রতাপান্বিত দ্রোণ পাঞ্চালদেশ হইতে ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিজ নিলয়ে আনয়নপূর্ব্বক অস্ত্রশিক্ষা করাইতে লাগিলেন এবং দৈব্য অনতিক্রমণীয় কদাচ অন্যথা হইবার নহে ভাবিয়া মহিয়সী আত্মকীর্ত্তি স্থাপনার্থে ধৃষ্টদ্যুম্নের অস্ত্রশিক্ষা বিষয়ে একান্ত যত্ন করিতে লাগিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এই বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কুন্তীপুত্রদিগের হৃদয়ে যেন শল্য বিদ্ধ হইল; তাঁহারা বিষাদ-সাগরে একান্ত নিমগ্ন হইলেন। অনন্তর সত্যবাদিনী কুন্তী মাতৃভক্তিপরায়ণ সন্তানগণকে আহ্বান করিয়া সর্ব্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, বৎস! আমরা এই রমণীয় নগরীমধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক মহাত্মা ব্রাহ্মণের আবাসে বহুকাল বাস করিলাম। এস্থলে যে সমস্ত বন ও উপবন আছে, তাহা বারংবার দর্শন করিয়াছি। তাহা দেখিয়া আর তাদৃশ প্রীতি জন্মে না। এক্ষণে ভিক্ষাও অপেক্ষাকৃত অল্প লব্ধ হইয়া থাকে, তদ্দ্বারা দিনপাত হওয়া নিতান্ত সুকঠিন। অতএব যদি তোমাদিগের অভিলাষ হয়, তবে চল, আমরা পরম রমণীয় পাঞ্চালদেশে গমন করি। ঐ দেশ অদৃষ্টপূর্ব্ব, দেখিলে অবশ্যই প্রীতিকর হইবে। আর শুনিয়াছি, পাঞ্চালেরা প্রাণান্তেও ভিক্ষুককে পরাজুখ করেন না, তথাকার রাজা যজ্ঞসেন অতিশয় ব্রতপরায়ণ। হে বৎস! যদি মত হয় চল, একস্থলে বহুকাল অতিক্রম করা কদাচ বিধেয় হয় না। অধিক কি, এখানে ক্ষণকাল থাকিতেও আমার আর বাসনা নাই। তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, মাতঃ। আপনি যাহা আদেশ করিতেছেন, তাহা আমাদিগের পক্ষে শ্রেয়ঃকল্প বোধ হয় কিন্তু অনুজদিগের কিরূপ অভিপ্রায় কিছুই জানি না। তৎপরে কুন্তী, ভীমসেন, অর্জুন ও যমজ নকুল সহদেবকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহারা মাতৃবাক্যে কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া কহিলেন, মাতঃ! আপনি যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, আমরা কদাচ তাহার অন্যথা করিব না।
অনন্তর কুন্তী পঞ্চ পুত্র সমভিব্যাহারে ব্রাহ্মণকে সাদর সম্ভাষণ করিয়া দ্রুপদরাজ্যে যাত্রা করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহাত্মা পাণ্ডবগণ প্রচ্ছন্নভাবে বাস করিতেছেন, এই অবসরে সত্যবতীনন্দন ব্যাস, তাঁহাদিগের দর্শনার্থ তথায় আগমন করিলেন। পাণ্ডবেরা তাঁহাকে অভ্যাগত দেখিয়া প্রত্যুদ্গমনপূর্ব্বক প্রণাম ও অভি-বাদন করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান রহিলেন। তখন মহর্ষি বেদব্যাস তাঁহাদিগকে উপবেশনার্থ অনুমতি প্রদান করিয়া প্রীতিপ্রফুল্ল মনে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে পাণ্ডবগণ! তোমরা শাস্ত্র ও ধর্মানুসারে জীবিকা নির্ব্বাহ করিতেছ? এবং পূজার্হ অতিথি ব্রাহ্মণের সৎকার করিয়া থাক? ব্যাস তাঁহাদিগকে এরূপ ধর্মার্থ-সম্বন্ধ বহুবিধ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া প্রসঙ্গক্রমে একটি উপাখ্যান কহিতে আরম্ভ করিলেন।
কোন তপোবনে সর্বাঙ্গসুন্দরী সর্ব্বগুণসম্পন্না এক ঋষিকন্যা বাস করিতেন। সেই রমণী স্বীয় কর্মদোষে নিতান্ত দুরদৃষ্টভাগিনী হইয়াছিলেন, এই কারণে অনুরূপ ভর্ৎলাভে কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। তখন তিনি সাতিশয় দুঃখিত হইয়া পতিলাভার্থে তপস্যায় মনোনিবেশ করিলেন এবং অতি কঠোর তপোনুষ্ঠানদ্বারা অনতিকালমধ্যে ভগবান্ মহাদেবকে প্রীত ও প্রসন্ন করিলেন। দেবাদিদেব মহাদেব তাঁহার প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া তথায় আবির্ভূত হইলেন এবং কহিলেন, হে সুন্দরি! তুমি কুশলে থাক, আমি মহাদেব, তোমাকে বর দান করিবার নিমিত্ত উপস্থিত হইয়াছি, বর প্রার্থনা কর। তখন তপস্বিকন্যা আপনার অভিলাষানুরূপ বর লাভ করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে কহিলেন, ভগবন্! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে ' যাহাতে আমি সর্ব্ব-গুণসম্পন্ন পতি লাভে চরিতার্থ হইতে পারি, এইরূপ বরপ্রদান করুন। এই বলিয়া বারংবার তাঁহার নিকটে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। তৎপরে মহাদেব তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ঋষিকন্যে! আমার বরপ্রভাবে তোমার পঞ্চস্বামী লাভ হইবে। তখন তাপসদুহিতা বরদ দেবতাকে পুনর্ব্বার কহিলেন, ভগবন্! আপনার নিকটে আমি সর্ব্ব-গুণোপেত একমাত্র পতি লাভের বাসনা করি। ঈশ্বর কহিলেন, হে কন্যে! তুমি পাঁচবার "পতি প্রদান করুন” বলিয়া আমার নিকট প্রার্থনা করিয়াছ, অতএব তোমার প্রার্থনামত পরজন্মে পঞ্চপতি লাভ করিবে। সেই দেবরূপিণী রমণী দ্রুপদবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। তিনি তোমাদিগেরই সহধর্মিণী হইবেন; অতএব এক্ষণে তোমরা পাঞ্চালনগরে অবস্থান কর। আমি নিশ্চয়ই কহিতেছি, সেই কন্যা লাভ করিয়া তোমরা ভবিষ্যতে সুখী হইবে। এই বলিয়া মহাতপাঃ মহর্ষি ব্যাস, কুস্তী ও পাণ্ডবগণকে সাদর সম্ভাষণাশীর্ব্বাদ প্রয়োগপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহর্ষি ব্যাস তথা হইতে প্রস্থান করিলে পাণ্ডবেরা সন্তুষ্টচিত্তে জননী কুন্তীকে অগ্রে লইয়া অবন্ধুর মার্গ অবলম্বনপূর্ব্বক উত্তরাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তাঁহারা দিবারাত্রিমধ্যে সোমাশ্রয়ায়ণ নামক এক তীর্থে গমন করিয়া জাহ্নবীতীরে উপনীত হইলেন। অর্জুন সর্ব্বাগ্রে এক প্রদীপ্ত অঙ্গার লইয়া প্রকাশার্থে ও আত্মরক্ষার্থে তথায় গমন করিলেন।
একদা মহাবল পরাক্রান্ত গন্ধর্ব্বরাজ ঐ পবিত্র রমণীয় গঙ্গাজলে অঙ্গনাপরিবৃত হইয়া বিহার করিতেছিলেন। এই অবসরে তিনি গঙ্গাতীর-সন্নিহিত পাণ্ডবগণের পদশব্দ শ্রবণ করিলেন। শ্রবণ করিবামাত্র অতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইলেন। তিনি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতেছেন, এই সময়ে জননী সমভিব্যাহারী পাণ্ডবগণকে তথায় আগমন করিতে দেখিয়া ধনুর্গুণ আস্ফালনপূর্ব্বক কহিলেন, সন্ধ্যার কিয়ৎকাল পূর্ব্বাবধি সমস্ত রজনী কামচারী যক্ষ, গন্ধর্ব্ব ও রাক্ষসদিগের মুহূর্ত্ত; অবশিষ্ট কাল মনুষ্যদিগের কার্য্যসাধনার্থে নিয়মিত আছে। তোমরা লোভপরতন্ত্র হইয়া রাক্ষসী বেলায় পরিভ্রমণ করিতেছ, অতএব তোমরা নিতান্ত অনভিজ্ঞ; সুতরাং আমরা রাক্ষসগণ সমভিব্যাহারে তোমাদিগকে সংহার করিব। রাত্রিকালে নদীকূল-সন্নিহিত হইলে মনুষ্যদিগকে ব্রহ্মবিৎ ব্যক্তিরা অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা করেন; অধিক কি, এই সময়ে মহাবল পরাক্রান্ত ভূপাল-দিগেরও নদীকূলে আগমন করা নিষিদ্ধ। তোমরা আর কেন দূরে রহিয়াছ? সত্বরে আমার সন্নিহিত হও। আমি জলবিহার করিবার নিমিত্ত গঙ্গায় অবগাহন করিয়াছি, ইহা কি তোমরা পূর্ব্বে অবগত হইতে পার নাই? আমার নাম অঙ্গারপর্ণ; আমি স্বকীয় বলবীর্য্যের উপর নির্ভর করিয়া থাকি। আমি অতিশয় অভিমানী, ঈর্ষাপরায়ণ ও কুবেরের প্রিয়সখা। আর অগ্রে যে বন দেখিতেছ, উহা অঙ্গারপর্ণ নামে প্রখ্যাত। আমি যদৃচ্ছাক্রমে ভাগীরথীতীরে সঞ্চরণ করিয়া ঐ স্থলে বিহার করিয়া থাকি। এই স্থানে রাক্ষস, শুঙ্গী, দেবতা বা মনুষ্যেরা আগমন করিতে পারে না, তবে তোমরা কি কারণে এই স্থানে উপনীত হইলে বল?
তদীয় এতাদৃশ উদ্ধতবাক্যে উত্তেজিত হইয়া অর্জুন কহিলেন, হে দুৰ্ম্মতে! সমুদ্র, হিমালয়ের পার্শ্বদেশ, আর এই নদীকূল, এই তিনটি প্রদেশ দিবারাত্রি বা সন্ধ্যাকালে কাহারও অধিকৃত নহে। হে গগনচর। ভুক্ত হউক বা অভুক্তই হউক, দিবস বা রজনী হউক, গঙ্গায় গমন করিতে কালনিয়ম নাই। আর আমরাও মহাবল পরাক্রান্ত; অতএব তোমাকে অকালে কালসদনে প্রেরণ করিব। নিতান্ত দুর্ব্বল মানবেরাই রণক্ষেত্রে তোমাদিগকে সৎকার করিয়া থাকে। পূর্ব্বকালে এই গঙ্গা হিমালয়ের হেমময় উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ হইতে নিঃসৃতা হইয়া গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, রথস্থা, সরযূ, গোমতী ও গণ্ডকী, এই সপ্ত নদীরূপে সমুদ্রজলে মিলিত হন। এই সপ্ত স্রোতস্বতীর জলোপসেবনে লোকে বিগতপাপ হইয়া থাকে। পরম পবিত্রা গঙ্গা আকাশ-পথগামিনী হইয়া দেবলোকে অলকানন্দা নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। ভগবান্ বাদরায়ণি কহেন, এই গঙ্গা পিতৃলোক উদ্ধার করিবার নিমিত্ত বৈতরণীরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণা হয়েন। পাপাচার লোকেরা ঐ নদী পার হইতে পারে না। সকলেই স্বর্গফলদায়িনী দেবনদীতে অবাধে অবগাহন করিয়া থাকে, তুমি সেই সনাতন ধর্মের অপলাপ করিয়া কেনই প্রতিষেধ করিতেছ? ভাগীরথীর জল অতি পবিত্র, আমরা স্বেচ্ছাক্রমে এই পবিত্র জল স্পর্শ করিব; ইহাতে কোনরূপ বাধা মানিব না।
এই কথা শুনিবামাত্র অঙ্গারপর্ণ অতিশয় রোষপরবশ হইয়া শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক মহাবিষ আশীবিষ' সদৃশ সুতীক্ষ্ণ শরসকল নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ধনঞ্জয় হস্তস্থিত আলোক ও চৰ্ম্ম বিঘূর্ণিত করিয়া তৎক্ষণাৎ তদীয় সমস্ত শরজাল নিরাশ করিলেন এবং কহিলেন, হে গন্ধর্ব্ব! অস্ত্রবিদ্যাবিশারদ বীরের নিকটে এরূপ বিভীষিকা প্রদর্শন করা নিতান্ত অনুপযুক্ত; প্রদর্শিত হইলেও ফেনের ন্যায় বিলীন হইয়া যায়। মানুষী-শক্তি সর্ব্বতোভাবে সকল গন্ধর্ব্বদিগকে পরাভব করিতে পারে, এক্ষণে ইহাই লক্ষিত হইতেছে; অতএব আইস, তোমার সহিত অস্ত্রযুদ্ধ করিব। মায়াযুদ্ধে প্রয়োজন নাই। পূর্ব্বকালে দেবরাজ ইন্দ্রের মান্য ও পূজনীয় বৃহস্পতি ভরদ্বাজকে এই আগ্নেয়াস্ত্র প্রদান করিয়াছিলেন। তৎপরে ভরদ্বাজ অগ্নিবেশ্যকে, পরে অগ্নিবেশ্য মদীয় গুরু দ্রোণকে সমর্পণ করেন। অনন্তর দ্রোণাচার্য্য অতি উৎকৃষ্ট বোধে ঐ অস্ত্র আমাকেই প্রদান করিয়াছেন। এই কথা বলিয়া অর্জুন ক্রোধভরে গন্ধর্ব্বের প্রতি সেই প্রদীপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। প্রয়োগ করিবামাত্র তৎক্ষণাৎ তদীয় রথ ভস্মসাৎ হইল। তখন বিরথ, বিপন্ন ও অস্ত্রতেজে বিমোহিত গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে অধোমুখে ভূতলে পতিত দেখিয়া অর্জুন দিব্যমালালঙ্কৃত তদীয় কেশপাশ ধারণ করিলেন এবং বিচেতনাবস্থায় কেশাকর্ষণপূর্ব্বক তাঁহাকে আপন ভ্রাতৃসন্নিধানে লইয়া গেলেন।
এই অবসরে শরণার্থিনী কুন্তীনাম্নী তদীয় সহধর্মিণী পতির প্রাণরক্ষার্থে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের শরণাগতা হইলেন। তিনি কহিলেন, হে মহাভাগ! আমি গন্ধর্ব্বরাজমহিষী কুন্তীনসী, অনুকম্পা করিয়া আপনি আমার ভর্তাকে পরিত্যাগ করুন, আমি আপনার শরণাপন্না হইলাম। তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে অরিনিসূদন অর্জুন! যশোহীন, স্ত্রীসহায় নিতান্ত দুর্ব্বল ও যুদ্ধে পরাজিত শত্রুকে বিনাশ করা অকর্ত্তব্য; অতএব ইহাকে অবিলম্বে পরিত্যাগ কর। অর্জুন তাঁহাকে কহিলেন, হে গন্ধর্ব্ব! অদ্য কুরুরাজ যুধিষ্ঠির তোমাকে অভয়দান করিলেন, অতএব জীবন লইয়া প্রস্থান কর, আর কোন দুঃখ করিও না! তখন গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে সৌম্য! আমি পরাজিত হইলাম, এক্ষণে আমার পূর্ব্বনাম অঙ্গারপর্ণ ছিল, তাহা পরিত্যাগ করিতেছি; আমি জনসমাজে বলবীর্য্য ও নামদ্বারা শ্লাঘা করি না কিন্তু এই আমার পরমলাভ যে, দিব্যাস্ত্রধারী অর্জুনকে গন্ধর্ব্বমায়ায় অধিকৃত করিব। আমার এই বিচিত্র রথ অস্ত্রাগ্নি দ্বারা ভস্মসাৎ হইয়াছে, অতএব আমি চিত্ররথ নামের পরিবর্তে দগ্ধরথ বলিয়া প্রখ্যাত হইলাম। পূর্ব্বে আমি তপোবলে যে বিদ্যা লাভকরিয়াছিলাম, অদ্য প্রাণপ্রদ মহাত্মা অর্জুনকে সেই বিদ্যা প্রদান করিব। যিনি বলদ্বারা শত্রুকে স্তম্ভিত করিয়া পরাজিত ও শরণাগত শত্রুকে প্রাণদান করেন, তিনি সর্ব্ব কল্যাণেরই ভাজন হইতে পারেন। আমি যে বিদ্যা প্রদান করিব, ইহার নাম চাক্ষুষী বিদ্যা। ভগবান্ মনু সোমকে ইহা সমর্পণ করেন। সোম হইতে বিশ্বাবসু; বিশ্বাবসু হইতে এই বিদ্যা আমিই প্রাপ্ত হইয়াছি। এই গুরুপ্রদত্তা বিদ্যা কাপুরুষগামিনী হইয়া বিনষ্ট হইতেছে। হে বীর! এই বিদ্যা প্রাপ্তিবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত সমুদায় নিবেদন করিলাম, এক্ষণে ইহার কিরূপ প্রভাব, তাহাও অবগত করাইতেছি, অবধান কর। এই ত্রিলোকীমধ্যে যে বস্তু অবলোকন করিতে অভিলাষ করিবে, এই বিদ্যা প্রভাবে তাহা তৎক্ষণাৎ দেখিতে পাইবে। যাঁহার যাদৃশী বাসনা, তিনি তদনুসারে সকল বিষয়ই নেত্রগোচর করিতে পারিবেন। নিরবচ্ছিন্ন ছয় মাস একপদে দণ্ডায়মান থাকিয়া এই বিদ্যা লাভ করিতে হয়, কিন্তু ব্রত অনুষ্ঠিত না হইলেও আমি তোমার নিমিত্ত সেই বিদ্যাকে প্রসন্ন করিব। হে মহারাজ! আমরা এই বিদ্যাপ্রভাবে মনুষ্য হইতে অপেক্ষাকৃত উৎকর্ষ লাভ করিয়াছি এবং দেবগণের সমকক্ষ হইয়া গগনমার্গে সঞ্চরণপ্রভৃতি অতি অদ্ভুত ব্যাপার সমুদায় সম্পাদন করিয়া থাকি। এক্ষণে তোমাকে ও তোমার ভ্রাতাদিগকে আমি এক এক শত গন্ধর্ব্বজ অশ্ব প্রদান করিব। সেই সমস্ত গন্ধর্ব্বজ অশ্বের বর্ণ অতি মনোহর, বেগ মন অপেক্ষাও খরতর। ইহারা কখন তরুণ বা জীর্ণ হয় না। ইহাদিগের গমনবেগ কদাচ হীন হইবার নহে। পূর্ব্বকালে বৃত্রাসুর-সংহারার্থ দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র নির্মিত হইয়াছিল। উহা বৃত্রাসুর-শিরে দশধা ও শতধা চূর্ণ হইয়া যায়। তদনন্তর দেবতারা শতভাগে বিভক্ত ঐ বজ্রভাগ সকলের উপাসনা করেন। এই সকল বজ্রাংশের অংশে এই গন্ধর্ব্বজ অশ্বগণ জন্মগ্রহণ করে, এই নিমিত্ত ইহারা অবধ্য। কামবর্ণ, কামজব ও কামতঃ সমুপস্থিত গন্ধর্ব্বজ অশ্বগণ তোমার অভিলাষ সফল করিবে। অর্জুন কহিলেন, হে গন্ধর্ব্ব! তুমি প্রীত হইয়া বা প্রাণসঙ্কট উপস্থিত দেখিয়া আমাকে এই বিদ্যাধন অর্পণ করিতেছ? যদি প্রতিদান না হয়, তবে তাহাতে আমার প্রয়োজন নাই। গন্ধর্ব্ব-রাজ কহিলেন, হে অর্জুন! সাধু লোকের সহিত সমাগম হইলে স্বভাবতই প্রীত হইতে হয়, কিন্তু তুমি আমার প্রাণদান করিয়াছ, এই নিমিত্ত আমি সাতিশয় প্রীত হইয়া এই বিদ্যাদানে উদ্যত হইয়াছি। আর আমি তোমা হইতে অত্যুৎকৃষ্ট আগ্নেয়াস্ত্র ও বৃদ্ধিনামক ঔষধ এই দুইটি এককালে গ্রহণ করিব। অর্জুন কহিলেন, হে গন্ধর্ব্বরাজ! আমি ব্রহ্মাস্ত্র প্রদান করিয়া তোমা হইতে গন্ধর্ব্বজ অশ্ব গ্রহণ করিব, কিন্তু আমার নিতান্ত ইচ্ছা যে, সর্ব্বদা আমাদিগের সমাগম হয়। হে সখে। তোমাদিগের হইতে যে কারণে ভয় উৎপন্ন হয় এবং আমরা বেদবেত্তা সাধুচরিত্র হইলেও রাত্রিকালে আগমন করিয়া যে কারণে এইরূপ তিরস্কৃত ও অপমানিত হইলাম, তাহার কারণ কি সমুদায়, বল।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! তোমরা অনগ্নি' ও অনাহুত' এবং কোন ব্রাহ্মণও তোমাদিগের পুরোবর্তী নহেন। এই কারণে আমি তোমাদিগের তিরস্কার ও অবমাননা করিয়া-ছিলাম। যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব্ব, পিশাচ, উরগ ও দানবেরা কুরুবংশ-বিস্তার কীর্তন করিয়া থাকেন। আর নারদ প্রভৃতি দেবর্ষি মুখেও আমি তোমার পূর্ব্বপুরুষদিগের গুণানুবাদ শ্রবণ করিয়াছি। অধিক কি, এই সসাগরা ধরা পর্য্যটন প্রসঙ্গে আমি স্বয়ংই তোমার সদ্বংশের ভূয়িষ্ঠ' প্রভাব অবগত হইয়াছিলাম। ত্রিলোকপ্রখ্যাত মহাযশাঃ দ্রোণ, যাঁহার নিকটে তুমি বেদ ও ধনুর্ব্বেদে উপদিষ্ট হইয়াছ, তিনিও আমার পরিচিত। দেবপ্রধান ধৰ্ম্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও যমজ অশ্বিনীকুমার আর নরশ্রেষ্ঠ পাণ্ডু, এই ছয়জন কুরুবংশ-বিবর্দ্ধন ও তোমাদিগের জন্মদাতা ও পিতা। আমি তাঁহাদিগের সকলকেই সবিশেষ জ্ঞাত আছি। তোমরা অতি সচ্চরিত্র, মহাত্মা ও মহাবীর; তোমাদিগের মনে সঙ্কল্প ও অধ্যবসায় সম্যক্ অবগত হইয়াও আমি তোমাদিগকে তিরস্কার ও অবমাননা করিয়াছিলাম। বিশেষতঃ বাহুবলসম্পন্ন, বীর-পুরুষেরা স্ত্রীসন্নিধানে অপমানিত হইলে কখনই ক্ষমা প্রদর্শন করিতে পারে না। আমি সস্ত্রীক ছিলাম, রাত্রিকালে আমাদিগের বলবীর্য্য দ্বিগুণতর পরিবর্দ্ধিত হইয়া থাকে, এই সমস্ত কারণে আমার অন্তঃকরণে ক্রোধের সঞ্চার হইয়াছিল। হে অর্জুন। তুমি আমাকে যুদ্ধে পরাজয় করিয়াছ, অতএব যে কারণে জয়ী হইলে, বিধানানুসারে তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
ব্রহ্মচর্য্য পরমোৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম। তুমি সেই ধৰ্ম্মাক্রান্ত বলিয়া আমাকে যুদ্ধে পরাজয় করিয়াছ। যে ক্ষত্রিয় কামপরায়ণ, তিনি রাত্রিকালে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলে কদাচ জীবন রক্ষা করিতে পারেন না। আর সস্ত্রীক হইলেও যিনি সনাতন বেদশাস্ত্র সম্মুখে রাখিয়া পুরোহিতের উপর কার্যভার অর্পণপূর্ব্বক যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন, তিনি নিশ্চয়ই সমস্ত নিশাচরকে পরাস্ত করিতে পারেন। অতএব হে তাপত্য! ইহলোকে যে যে বিষয়ে মনুষ্যের শ্রেয়োলাভের সম্ভাবনা, তৎসমুদায় বিষয়ে ইন্দ্রিয়দমনশীল পুরোহিতকে নিয়োগ করা কর্তব্য। ষড়ঙ্গবেদপারগ, অতি পবিত্র, সত্যবাদী, ধর্মাত্মা ও সুধীর ব্রাহ্মণই রাজাদিগের পুরোহিত হয়েন। যে ভূপতির এতাদৃশ সদ্গুণসম্পন্ন পুরোহিত বিদ্যমান আছেন, তাঁহার ইহলোক জয় ও পরলোকে স্বর্গলাভ হইয়া থাকে। অর্থোপার্জন ও উপার্জিত অর্থ রক্ষা করিবার নিমিত্ত এক গুণবান্ পুরোহিত নিয়োগ করা অতিমাত্র শ্রেয়ঃকল্প। যে রাজা এই সসাগরা পৃথিবী অধিকার করিতে ইচ্ছা করেন, যিনি সর্ব্বসম্পদ লাভের অভিলাষী হয়েন, তাঁহার পুরোহিতের হিতকারিণী বুদ্ধির আশ্রয় লওয়া বিধেয়। যে রাজার পুরোহিত নাই, তিনি কদাচ অভিজন ও শৌর্য্যপ্রভাবে ভূমিসম্পত্তি অধিকার করিতে পারেন না; অতএব হে কুরুবংশবর্দ্ধন অর্জুন! এক্ষণে ইহাই প্রতিপন্ন হইল যে, রাজারা পুরোহিতের সাহায্য গ্রহণ করিলে বহুকাল রাজ্য পালন করিতে পারেন।
অর্জুন কহিলেন, হে গন্ধর্ব্বরাজ! তুমি যে তাপত্য বলিয়া আমাকে সম্বোধন করিলে, তাহার যথার্থ অর্থ কি? আমরা কুস্তীপুত্র, কি কারণে "তাপত্য" বলিয়া আহূত হইলাম? কাহার নামই বা তপতী ছিল? হে সাধো! সবিশেষ জানিতে অভিলাষ করি। গন্ধর্ব্বরাজ অর্জুনের বাক্যে প্রীত হইয়া ত্রিলোক-প্রখ্যাত অদ্ভুত উপাখ্যান কীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। অর্জুনও শ্রবণ-মানসে অবহিতচিত্ত হইলেন। গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! আমি যে কারণে তপতীতনয় বলিয়া তোমাকে সম্বোধন করিলাম, সেই রমণীয় বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলে সমুদায় বুঝিতে পারিবে, স্থিরচিত্তে শ্রবণ কর। যিনি ভূর্লোক ও দ্যুলোকে আলোক প্রদান করিতেছেন, সেই সূর্য্যদেব সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী তপতীর জন্মদাতা। সাবিত্রীর পর ইঁহার জন্ম হয়। তপতী তপোনুরক্তা ও ত্রিলোক-প্রখ্যাতা ছিলেন। সুরাসুরগন্ধর্ব্বাপ্সরো-মধ্যে কোন কামিনীই তপতীসদৃশী রূপশালিনী ছিলেন না। একদা সূর্য্য, পদ্মপলাশলোচনা সদাচারসম্পন্না কন্যাকে প্রাপ্তযৌবনা দেখিয়া ররূপ-গুণ-শ্রুত', শীলসম্পন্ন এক অনুরূপ পাত্র অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন; কিন্তু তিনি ত্রিভুবনমধ্যে কন্যার উপযুক্ত পাত্র দেখিতে পাইলেন না। এই কারণে তাঁহার অন্তঃ-করণ বলবতী চিন্তায় একান্ত আক্রান্ত হইয়াছিল; সমুদায় সুখ ও শান্তি এককালে তাঁহা হইতে তিরোহিত হইল।
এই সময়ে কুরুবংশাবতংস ঝক্ষতনয় মহাবলপরাক্রান্ত মহারাজ সম্বরণ শুশ্রূষাপরতন্ত্র, অহঙ্কারশূন্য, বিশুদ্ধচিত্ত, একান্ত ভক্তিমান্ ও সমধিক শ্রদ্ধাশালী হইয়া অর্ঘ্য, মাল্য, ধূপ, দীপ প্রভৃতি বিবিধোপচারে ও নিয়মোেপবাস, তপস্যা-সহকারে প্রতিদিন উদয়কালে ভগবান্ ভাস্করের আরাধনা করিতেন। সূর্যদেব রাজার আরাধনে সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া মহা-কুলোদ্ভূত, অসামান্য রূপসম্পন্ন, কৃতজ্ঞ, ধর্মার্থবেত্তা নৃপোত্তম সম্বরণকেই স্বীয় দুহিতা তপতীর অনুরূপ পতি বলিয়া বিবেচনা করিলেন। পরিশেষে তাঁহাকেই কন্যা দান করিতে তাঁহার সম্পূর্ণ মনোরথ হইল। যাদৃশ সূর্যকিরণে নভোমণ্ডল আলোকময় হয়, সেইরূপ এই মহীপালের অদ্ভুত প্রভাবে ভূর্লোক উদ্ভাসিত হইয়াছিল। যাদৃশ ব্রহ্মবাদী মহর্ষিগণ উদয়কালে আদিত্যকে আরাধনা করেন, সেইরূপ ব্রাহ্মণেতর প্রজাবর্গ মহারাজ সম্বরণের পূজা করিত। তিনি দেখিতে অতি ক্লান্ত ছিলেন, এই নিমিত্ত মিত্রমণ্ডলীর নিকটে চন্দ্রতুল্য প্রতীয়মান হইতেন এবং অতি তেজস্বী ছিলেন বলিয়া, শত্রুবর্গ তাঁহাকে প্রচণ্ড দিবাকরের ন্যায় নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য বোধ করিত। সূর্য্যদেব সেই সুশীল ও সদ্গুণসম্পন্ন সম্বরণকে তপতী দান করিতে মনোনীত করিলেন।
একদা মহাবল শ্রীমান্ সম্বরণ মৃগয়ার্থ গিরিকাননে গমন করিলে তথায় তাঁহার অপ্রতিম অশ্ব মৃগয়াবিহার পরিশ্রমে ও ক্ষুৎপিপাসার আতিশয্যে একান্ত কাতর হইয়া তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্ব-প্রাপ্ত হইল। অশ্ব বিনষ্ট হইলে রাজা একাকী পর্ব্বতোপরি পাদচারে সঞ্চরণ করিতে করিতে সহসা কমলায়তলোচনা এক সর্বাঙ্গসুন্দরী কুমারীকে দেখিতে পাইলেন। তিনি সেই অসহায় অবলারত্নকে নির্নিমেষলোচনে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। কন্যার অসামান্য রূপলাবণ্য সন্দর্শন করিয়া রাজা অনুমান করিলেন, বুঝি কমলাসনা লক্ষ্মী বা দিবাকরের স্খলিত প্রভা অবনীতে অবতীর্ণা হইয়া থাকিবেন। সেই অঙ্গনারত্নের আকার ও তেজঃপুঞ্জ-প্রভাবে তাঁহাকে প্রদীপ্ত হুতাশনশিখা এবং প্রসন্নতা ও কমনীয়তাগুণে বিমলা শশিকলা বলিয়া ভ্রান্তি জন্মিল। তিনি শৈলশিখরে আরূঢ় থাকিয়া হিরণ্ময়ী প্রতিমার প্রতিরূপ হইয়াছিলেন, এমন কি, তাঁহার রূপ ও বেশবিন্যাস প্রভাবে বৃক্ষলতার সহিত সমুদায় শৈলই সুবর্ণময় প্রতীত হইতেছিল।
তাঁহাকে অবলোকন করিয়া রাজার ত্রিলোকের মহিলার প্রতি অবজ্ঞা জন্মিল। তিনি মনে করিলেন, এই কামিনীকে নয়নগোচর করিয়া এতদিনে চক্ষুদ্বয়ের সম্যক্ ফল লাভকরিলাম। জন্মাবধি যে কিছু দেখিয়াছিলাম, কেহই এই রমণীয় রূপের অনুরূপ নহে বলিয়া তর্ক করিতে লাগিলেন। তিনি তদীয় গুণময় পাশে সংযতচিত্ত ও সংযতনেত্র হইয়া সেস্থান হইতে প্রস্থান করিতে সমর্থ হইলেন না এবং ইতি-কর্ত্তব্য-বিমূঢ় হইয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। কিয়ৎক্ষণপরে তাঁহার মনে উদয় হইল, বুঝি বিধাতা ত্রিলোক-মন্থন করিয়া এই দুর্লভ রূপের সৃষ্টি করিয়াছেন। ফলতঃ রাজা কন্যার এইরূপ রূপসম্পত্তি সন্দর্শন করিয়া তাঁহাকে অলোকসামান্যা বলিয়া জ্ঞান করিলেন। অনুপম রূপের কি অপ্রতিম মহিমা! রাজা দেখিতে দেখিতে মদনবাণে একান্ত পীড়িত হইয়া নিতান্ত চিন্তাকুল হইলেন। পরিশেষে অতি তীব্র স্মরানলে' দগ্ধপ্রায় হইয়া সেই নিরহঙ্কারা মনোহরা কামিনীকে সম্বোধন করিয়া | কহিলেন, হে সুন্দরি। তুমি কে? কাহার পরিগৃহীতা'? এখানেই বা কি নিমিত্ত আসিয়াছ এবং কি কারণেই বা একাকিনী এই জনশূন্য অরণ্যে সঞ্চরণ করিতেছ? তোমার সর্বাঙ্গ অতি সুন্দর ও নানাবিধ অলঙ্কারে অলঙ্কৃত; কিন্তু বোধ হয়, তোমার এই মনোহারিণী মূর্তিই যেন সকল অলঙ্কারের অলঙ্কারস্বরূপ হইয়াছে। তোমাকে দেবনারী বা অসুরকুমারী, যক্ষেশ্বরী বা রাক্ষসী, গন্ধর্ব্বকুলজা বা নাগবনিতা বলিয়া বোধ হয় না। তুমি মানুষীও নও। আমি যত স্ত্রীলোক দেখিয়াছি বা শুনিয়াছি, কেহই তোমার সদৃশী হইতে পারে না। হে চারুবদনে! আমি তোমার চন্দ্র হইতেও কমনীয় মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করিয়া অবধি কন্দর্পশরে একান্ত জর্জরিত হইয়াছি।
ভূপাল সেই নির্জন অরণ্যানীমধ্যে নিতান্ত কাতর ও একান্ত কামার্ত হইয়া কন্যাকে বারংবার এইরূপ কহিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুই প্রত্যুত্তর পাইলেন না; অনন্তর সেই কামিনী সৌদামিনীর ন্যায় তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অন্তর্হিত হইলে রাজা উন্মত্তবৎ তাঁহার অনুসন্ধানে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহাকে আর দেখিতে পাইলেন না। কন্যার অদর্শনে রাজা বহুবিধ বিলাপ ও পরিতাপ করত মুহূর্তকাল নিশ্চেষ্ট হইয়া তথায় দণ্ডায়মান রহিলেন।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! কন্যা অন্তর্হিত হইলে সেই শত্রুপাতন সম্বরণ কামমোহিত হইয়া সহসা ভূতলে নিপতিত হইলেন। রাজাকে তদবস্থ দেখিয়া সেই চারুহাসিনী কামিনী পুনরায় তথায় আবির্ভূত হইলেন এবং হাস্যমুখে ও মধুরবাক্যে সম্বোধন করিয়া রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! গাত্রোত্থান কর, তোমার মঙ্গল হইবে; মোহাবেশপরবশ হইয়া তুমি ধরাতলে শয়ন করিয়া রহিয়াছ, ইহা নিতান্ত অসঙ্গত হইতেছে। ভূপতি কন্যার অমৃতময় বাক্য শ্রবণে গাত্রোত্থান করিয়া দেখিলেন, সেই সর্ব্বসুলক্ষণা কন্যা সম্মুখে দণ্ডায়মানা রহিয়াছেন। তাঁহাকে দেখিয়া রাজা সন্দিগ্ধবচনে কহিতে লাগিলেন, হে সুন্দরি! আমি কামান্ধ হইয়া তোমার ভজনা করিতেছি, তুমি ভক্তজনের প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ কর, আমার প্রাণ বহির্গত হইতেছে দেখ। তোমার নিমিত্ত পঞ্চশর' আমাকে অনবরত তীক্ষ্ণশর প্রহার করিয়াও ক্ষান্ত হইতেছে না। বিষম অনঙ্গরূপ ভুজঙ্গ একেবারেই আমাকে দংশন করিয়াছে। সন্নিহিত হও; যাহা কর্তব্য হয় কর, আমার জীবন নিতান্তই তোমার অধীন হইয়াছে। তোমার সমাগম ব্যতিরেকে আমি ক্ষণকালও জীবন ধারণ করিতে পারিব না। হে বিশাললোচনে! কামশরে প্রাণান্ত হইল; আমার প্রতি অনুকম্পা কর, আমি তোমার একান্ত ভক্ত ও অনুরক্ত; আমাকে পরিত্যাগ করা তোমার উপযুক্ত নহে। তুমি প্রীতি প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাকে পরিত্রাণ কর। তোমার দর্শন-কালাবধি স্নেহসঞ্চার হইয়া আমার মন অতিশয় চঞ্চল হইয়াছে। তোমাকে দেখিয়া আমার কোন মহিলা অবলোকন করিতে অভিরুচি নাই। প্রসন্ন হও; আমি তোমার নিতান্ত বশংবদ, অতএব আমাকে ভজনা কর। হে কমলায়তলোচনে'। যদবধি তোমাকে নয়নগোচর করিয়াছি, সেই অবধিই স্বকীয় শাণিত শরে অনঙ্গ আমার মর্মভেদ করিতেছে। এক্ষণে প্রণয়সলিল সেচন করিয়া আপ্যায়িত কর। তদ্দর্শনজনিত নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ পঞ্চবাণ, প্রচণ্ড ধনুঃ ও প্রচণ্ড শর করে লইয়া মদীয় হৃদয় বিদ্ধ করিতেছ। এক্ষণে তুমি আত্মসমর্পণ করিয়া আমার এ অপ্রতিম দুঃখের অবসান কর। হে রম্ভোরু! বিবাহের মধ্যে গান্ধব্বই শ্রেষ্ঠ, অতএব গান্ধর্ব্ব বিধানে পরিণয়ক্রিয়া সম্পাদন কর।
তপতী কহিলেন, মহারাজ! আমি পিতৃমতী ও অবিবাহিতা, অতএব এক্ষণে স্বেচ্ছাচারিণী হইতে পারি না। যদি আমার উপর তোমার নিতান্তই প্রণয় সঞ্চার হইয়া থাকে, তবে তুমি আমার পিতার নিকট প্রার্থনা কর। হে নরেশ্বর! যাদৃশ আমি তোমার প্রাণ হরণ করিয়াছি, ক্ষণমাত্রদর্শনে তুমিও সেইরূপ আমার প্রাণ হরণ করিয়াছ। শাস্ত্রে কহে, স্ত্রীলোকের কোন কালেই স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করা বিধেয় নহে, আমি একান্ত পরাধীন, একারণ তোমার সন্নিধানে গমন করিতে সম্মত নহি। এই ত্রিলোকমধ্যে কোন কন্যা প্রখ্যাতবংশোৎপন্ন ভক্তবৎসল ভূপালকে পতিত্বে অঙ্গীকার করিতে অভিলাষ না করে? অতএব আপনি প্রণাম, নিয়ম ও তপশ্চরণদ্বারা প্রসন্ন করিয়া আমার জন্মদাতা সূর্য্যের নিকট প্রার্থনা কর। যদি তিনি স্বীকার করেন, তাহা হইলে আমি তোমার চিরকাল বশবর্তিনী হইয়া থাকিব। আমি সাবিত্রীর কনীয়সী ভগিনী, লোকপ্রদীপ সূর্য্যদেবের কন্যা, আমার নাম তপতী।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন। অনন্তর সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী সূর্য্যতনয়া তপতী, রাজাকে এইরূপ কহিয়া পুনরায় অতি সত্বরে আকাশপথে উত্থিত ও অন্তর্হিত হইলেন। রাজাও তথায় পূর্ব্ববৎ ভূতলে পতিত রহিলেন। এই অবসরে রাজমন্ত্রী রাজার অন্বেষণার্থ সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে সেই নিবিড় অরণ্যানী-মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দেখিলেন, শারদীয় শত্রুধ্বজের ন্যায় ধরাতলে শয়ন করিয়া আছেন। রাজমন্ত্রী তাঁহাকে তদবস্থায় ভূতলে পতিত দেখিয়া হুতাশন দ্বারা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। তিনি স্নেহবশতঃ আস্তেব্যস্তে সন্নিহিত হইয়া যেমন পিতা পুত্রকে উত্তোলন করেন, তদ্রুপ কামমোহিত মহীপালকে উত্থাপিত করিলেন। প্রজ্ঞা, বয়স, কীর্ত্তি ও নীতিগুণে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রী, রাজাকে ভূতল হইতে উত্থাপিত করিলে তাঁহার মনোজুর দূরীকৃত হইল। তিনি তাঁহাকে উত্থিত দেখিয়া মধুরবাক্যে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! কোন শঙ্কা নাই, আপনার মঙ্গল হউক। মন্ত্রী রাজাকে বলবতী ক্ষুৎ-পিপাসায় একান্ত কাতর দেখিয়া তদীয় মস্তকোপরি সুগন্ধি ও সুশীতল জল সেচন করিলেন। তাহাতে তাঁহার মস্তকস্থিত মুকুট স্ফুটিত' হইয়া গেল।
অনন্তর রাজা চৈতন্য লাভ করিয়া মন্ত্রী ব্যতিরেকে সমুদায় সৈন্য সামন্তকে বিদায় করিয়া দিলেন। তাহারা রাজার আদেশ প্রাপ্তি মাত্রে তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিল। সকলে প্রস্থান করিলে রাজা সেই গিরিপ্রস্থে বাস করিতে লাগিলেন। তথায় তিনি সূর্যদেবের আরাধনা করিবার নিমিত্ত শুচি হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে ও ঊর্দ্ধমুখে ভূতলে অবস্থান করত মনে মনে মহর্ষি বশিষ্ঠকে পুরোহিতত্বে বরণ করিলেন। রাজা এইরূপে দিবারাত্র এক স্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। পরে বিপ্রর্ষি বশিষ্ঠ দ্বাদশ দিবসে তথায় উপনীত হইলেন। তপতী নৃপতির মনোহরণ করিয়াছেন, মহর্ষি ইহা জানিতে পারিয়াও পুনরায় যোগবলে সমুদায় অবগত হইয়া তাঁহার কার্য্য সিদ্ধার্থ প্রস্তাব করিলেন। পরে সূর্য্যসমদ্যুতি ঋষি সূর্য্য-সন্দর্শনের নিমিত্ত উর্দ্ধে উত্থিত হইলেন, রাজা একদৃষ্টে তাঁহার পথ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। মহর্ষি কৃতাঞ্জলিপুটে সূর্য্য সন্নিধানে উপনীত হইয়া প্রীতিপূর্ব্বক আপনার পরিচয় দিলেন। মহাতেজাঃ সূর্য্য তাঁহার পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া স্বাগত প্রশ্নপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মহর্ষে! বল, তোমার অভিলাষ কি? আমার নিকটে তুমি যাহা প্রার্থনা করিবে, নিতান্ত দুর্লভ হইলেও আমি তাহা প্রদান করিব। বিপ্রর্ষি বশিষ্ঠ এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রণিপাতপূর্ব্বক প্রত্যুত্তর করিলেন, হে দিবাকর! আমি আপনার কনীয়সী কন্যা তপতীকে মহারাজ সম্বরণের নিমিত্ত প্রার্থনা করি। ঐ রাজা পরম ধার্মিক, অত্যুদার ও ধীশক্তিসম্পন্ন; তাঁহার কীর্ত্তিকলাপ অতি বিস্তীর্ণ; তিনিই আপনার কন্যার একমাত্র উপযুক্ত পাত্র। এই কথা শুনিয়া সূর্য্য কন্যাদান স্বীকার করিয়া ও তদীয় বাক্যে অভিনন্দন করিয়া কহিলেন, হে মুনে! মহারাজ সম্বরণ সকল রাজলোকের শ্রেষ্ঠ, তুমিও ঋষিদিগের শ্রেষ্ঠ, আর আমার কন্যা তপতীও স্ত্রীলোকের শ্রেষ্ঠ, অতএব এমন সুপাত্রে সম্প্রদান না করিব কেন? এই বলিয়া সূর্য্য স্বয়ং সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী তপতীকে রাজা সম্বরণের নিমিত্ত বশিষ্ঠ হস্তে সমর্পণ করিলেন। তখন মহর্ষি তপতীকে প্রতিগ্রহপূর্ব্বক বিদায় লইয়া পুনরায় কুরুবংশাবতংস মহারাজ সম্বরণের নিকট আগমন করিলেন। রাজা সেই তপনকন্যা তপতীকে বশিষ্ঠ সমভিব্যাহারে আগমন করিতে দেখিয়া একান্ত সন্তুষ্ট হইলেন। যৎকালে তপতী স্বীয় প্রভাপুঞ্জে নভোমণ্ডলে উদ্ভাসিত করিয়া ভূতলে অবতীর্ণ হয়েন, তখন তিনি মেঘস্খলিত সৌদামিনীর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। রাজা সমাধিদ্বারা অতি কষ্টে দ্বাদশ দিবস অতিবাহিত করিলে, মহর্ষি বশিষ্ঠ তথায় উপনীত হইলেন। হে অর্জুন। এইরূপে মহারাজ সম্বরণ বরদ সূর্য্যদেবকে তপস্যাদ্বারা প্রসন্ন করিয়া বশিষ্ঠের তেজঃপ্রভাবে ভার্য্যা লাভ করেন।
তদনন্তর রাজা সম্বরণ সেই দেবগন্ধর্ব্বসেবিত গিরিশৃঙ্গে বিধিপূর্ব্বক তপতীর পাণিগ্রহণ করিলেন। পাণিগ্রহণান্তর তিনি নিতান্ত ভোগ বাসনায় বাধ্য হইয়া উপযুক্ত অমাত্য হস্তে রাজ্যভার সমর্পণ করিলেন। মহর্ষিও রাজাকে বিহারাভিলাষী দেখিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ভূপাল সেই গিরিশিখরে ভার্য্যা সমভিব্যাহারে বিহার করিতে লাগিলেন।
হে অর্জুন। এইরূপে তিনি ক্রমাগত দ্বাদশ বৎসর কাননে ও পর্ব্বতে তপতীর সহিত যদৃচ্ছ' বিহার করেন। অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র তদীয় রাজ্যমধ্যে দ্বাদশ বৎসর অনাবৃষ্টি করিলেন। সেই ঘোরতর অনাবৃষ্টিদ্বারা সমুদায় স্থাবর, জঙ্গম ও প্রজাবর্গ ক্রমশঃ ক্ষয় প্রাপ্ত হইতে লাগিল। সেই দারুণ কাল উপস্থিত হইলে পৃথিবীতে বিন্দুমাত্র জলপাত বা নীহারপাত না হওয়াতে শস্যোৎপত্তির বিলক্ষণ ব্যাঘাত হইতে লাগিল। রাজ্যস্থ লোকেরা ক্ষুধায় একান্ত পীড়িত ও উদ্ভ্রান্তমনাঃ হইয়া স্ব স্ব গৃহ পরিত্যাগপূর্ব্বক দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিতে লাগিল। গ্রাম ও নগরীমধ্যে সকলেই ক্ষুধায় অতিশয় খাতর হইয়া পুত্র কলত্র প্রভৃতি আত্মীয় স্বজন সমুদায় পরিত্যাগপূর্ব্বক দীনভাবে পরস্পর পরস্পরের আশ্রয় লইল। ক্ষুধার্ত্ত, নিরাহার ও শবাকার মনুষ্যসমূহে পরিপূর্ণ নগরী প্রেতপাল'পরিবৃত যমপুরীর ন্যায় বোধ হইতে লাগিল।
অনন্তর ভগবান্ বশিষ্ঠ লোকের এইরূপ দুরবস্থা দর্শন করিয়া বৃষ্টি করিলেন। রাজা রাজকার্য্য পরিত্যাগ করিয়া বহুকাল বিহার করিতেছিলেন, তাঁহাকে পত্নীর সহিত পুনরায় রাজধানীতে আনয়ন করিলেন। মহারাজ সম্বরণ পুনর্ব্বার নগরে প্রবেশ করিলে সমুদায় পূর্ব্ববৎ হইল। দেবরাজ মুষলধারে অজস্র বারি বর্ষণ করিতে লাগিলেন। প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপত্তি হইতে লাগিল। এই অবসরে রাজা নিজ সহধর্মিণী তপতী সমভিব্যাহারে দ্বাদশবর্ষব্যাপী এক যজ্ঞ করিলেন। হে অর্জুন! এই তপন কন্যা তপতী তোমাদিগের পূর্ব্ববংশীয়া ছিলেন। রাজা সম্বরণের ঔরসে তপতীর গর্তে কুরুর জন্ম হয়, এই কারণে তোমাদিগকে তাপত্য বলিয়া সম্বোধন করিলাম।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। অর্জুন পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণের এইরূপ কথা শুনিয়া পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন এবং মহর্ষি বশিষ্ঠের তপোবল শ্রবণে একান্ত কুতূহলাক্রান্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মহারাজ! তুমি যে মহর্ষি বশিষ্ঠের নাম উল্লেখ করিলে, যিনি আমার পূর্ব্বপুরুষদিগের পুরোহিত ছিলেন, তিনি কে? সমুদায় বল, শুনিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে। গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! বশিষ্ঠ ব্রহ্মার মানস পুত্র ও অরুন্ধতীর পতি। দুর্জয় কাম, ক্রোধ পরাজিত হইয়া নিরন্তর তাঁহার চরণসেবা করে। তিনি বিশ্বামিত্রের অপরাধে জাত ক্রোধ হইয়াও কুশিকবংশের উচ্ছেদ করেন নাই, পুত্রশতবিনাশদুঃখে একান্ত কাতর হইয়া সামর্থ্য থাকিতেও নিতান্ত অশক্তের ন্যায় তাঁহার সংহারার্থ কোনরূপ দারুণ কর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন নাই। এবং মৃত পুত্রদিগকে যমালয় হইতে পুনরায় আহরণ করিবার নিমিত্ত কৃতান্তকেও অতিক্রম করেন না, তাঁহার আশ্রয় লাভকরিয়া ইক্ষাকুকুলোদ্ভব ভূপালেরা এই সসাগরা পৃথিবী অধিকার করিয়াছিলেন এবং পুরোহিতত্বে বরণ করিয়া বহুবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। প্রখ্যাত বংশসম্ভূত নৃপতিদিগের পৃথিবী জয় ও রাজ্যবৃদ্ধির নিমিত্ত পুরোহিত নিযুক্ত করা কর্তব্য। যিনি পৃথিবী জয় করিতে ইচ্ছা করেন, তিনি ব্রাহ্মণকে অগ্রসর করিবেন। অতএব হে পার্থ! তুমিও জিতেন্দ্রিয়, ধৰ্ম্মকামার্থবেত্তা, গুণবান্ ও সুবিদ্বান্ পুরোহিত নিযুক্ত কর।
অর্জুন কহিলেন, হে গন্ধর্ব্বরাজ! বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ ইঁহারা দুই জনেই দিব্য আশ্রমে বাস করিতেন, অতএব কি কারণে উভয়ের বৈরভাব জন্মে তাহা আদ্যোপান্ত সমুদায় বর্ণন কর। গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! সর্ব্বলোকমধ্যে বশিষ্ঠো-পাখ্যান অতি প্রাচীন বলিয়া প্রসিদ্ধ, অতএব আমি ঐ উপাখ্যান সম্যরূপে বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।
কান্যকুব্জ দেশে কুশিকতনয় গাধি নামে এক সুবিখ্যাত রাজা ছিলেন। তাঁহার পুত্রের নাম বিশ্বামিত্র। একদা বিশ্বামিত্র অমাত্য সমভিব্যাহারে মৃগয়ার্থ নিবিড় অরণ্যানীমধ্যে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশ করিয়া কোন রমণীয় প্রদেশে মৃগ, বরাহ শিকারপূর্ব্বক ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর মৃগলোলুপ রাজা মৃগের অনুসরণে একান্ত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত্ত হইয়া মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে উপনীত হইলেন। বশিষ্ঠ তাঁহাকে অভ্যাগত দেখিয়া পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয় ও বন্য হবিঃ প্রদান করিয়া স্বাগত প্রশ্নপূর্ব্বক অতিথি সৎকার করিলেন। মহর্ষির এক কামধেনু ছিল। প্রার্থনা করিলেই সেই ধেনু তৎক্ষণাৎ অভিলষিত সম্পাদন করিতেন। বশিষ্ঠ সেই ধেনু দোহন করিয়া গ্রাম্য ও আরণ্য বিবিধ ওষধি, দুগ্ধ, ষডুবিধ রসসম্পন্ন অমৃততুল্য অনুত্তম রসায়ন' চর্ব্ব, চুষ্য, লেহ্য, পেয় চতুর্বিধ মিষ্টান্ন, বহুমূল্য রত্ন ও বিচিত্র বসন প্রভৃতি অপূর্ব্ব দ্রব্যসকল দোহন করিলেন। বশিষ্ঠ সেই সমস্ত ইষ্টবস্তুদ্বারা রাজাকে অর্চ্চনা করিলেন। অমাত্যসহিত রাজা আতিথ্য সৎকার গ্রহণপূর্ব্বক সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। মহর্ষির ধেনু পঞ্চহস্ত আয়ত ও ছয়হস্ত উচ্চ, তাঁহার নেত্রযুগল মঞ্জুকের ন্যায় উচ্ছন', পার্শ্ব ও উরু মনোহর, পুচ্ছ অতি সুন্দর, পয়োধর স্থূল এবং গ্রীবা ও মস্তক পুষ্ট ও আয়ত। গাধিনন্দন সেই সুচারুশৃঙ্গ ও অনিন্দিতা নন্দিনীকে নেত্রগোচর করিয়া সাতিশয় বিস্মিত হইলেন এবং তাঁহার বিস্তর প্রশংসা করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! অর্বুদসংখ্যক গো বা আমার সমুদায় রাজ্য লইয়া তুমি এই হোমধেনুটি আমাকে প্রদান কর। বশিষ্ঠ কহিলেন, মহারাজ! আমি রাজ্যলোভে দেবকার্য্য, পিতৃকার্য্য, অতিথিসৎকার ও যজ্ঞানুষ্ঠান সমাধানের একমাত্র উপায়স্বরূপ পয়স্বিনী নন্দিনীকে প্রদান করিতে পারিব না। তখন বিশ্বামিত্র কহিলেন, আমি ক্ষত্রিয় জাতি, আপনি তপঃস্বাধ্যায়-সম্পন্ন ব্রাহ্মণ। প্রশান্তচিত্ত ব্রাহ্মণের বলবীর্য্যের কথা কাহারও অবিদিত নাই; অতএব যদি অর্বুদসংখ্যক গো গ্রহণপূর্ব্বক আমার মনোভিলাষ সফল করিতে পরাজুখ হয়েন, তাহা হইলে আমি স্বজাতিসুলভ বল প্রকাশ করিয়া আপনার গোধন লইয়া যাইব। বশিষ্ঠ কহিলেন, মহারাজ! তুমি মহাবল পরাক্রান্ত রাজা এবং ভুজবীর্য্যসম্পন্ন ক্ষত্রিয়, অতএব এবিষয়ে কোন বিচার না করিয়া অবিলম্বে যাহা ইচ্ছা হয় কর।
অনন্তর বিশ্বামিত্র বলপূর্ব্বক হংসশশিসম রূপশালিনী সেই নন্দিনীকে অপহরণ করিলেন। নন্দিনী দণ্ডপ্রহারে ও কশাঘাতে একান্ত পীড়িতা হইলেন এবং ইতস্ততঃ নিরোধ্যমান' হইলেও হম্বারবে ধাবমান হইয়া বশিষ্ঠসম্মুখে আগমনপূর্ব্বক ঊর্দ্ধমুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। রাজবল তাঁহাকে অত্যন্ত তাড়না করিতে লাগিল, তথাপি তিনি মহর্ষির আশ্রম পরিত্যাগ করিলেন না। বশিষ্ঠদেব তাঁহাকে কহিলেন, হে ভদ্রে! আমি তোমার করুণস্বরপূর্ণ হম্বারব বারংবার কর্ণগোচর করিতেছি, বিশ্বামিত্র তোমাকে বলপূর্ব্বক হরণ করিতেছেন; আমি ক্ষমাশীল ব্রাহ্মণ কি করি, বল? এই কথা শুনিয়া নন্দিনী সৈন্যভয়ে ও বিশ্বামিত্র-ভয়ে একান্ত ভীত ও উদ্বিগ্ন হইয়া মহর্ষির সন্নিকৃষ্ট হইলেন এবং কহিলেন, ভগবন্! দুৰ্দ্দণ্ড রাজবল প্রচণ্ড কশাদণ্ডদ্বারা বারংবার আমাকে প্রহার করিতেছে। প্রহারবেগে আমি নিতান্ত অশরণা' ও অনাথার ন্যায় অতি কাতরস্বরে রোদন করিতেছি; এ সময় আপনি কি নিমিত্ত আমার প্রতি উপেক্ষা করিতেছেন? নন্দিনী প্রধর্ষিত হইয়া এইরূপ ক্রন্দন করিতে লাগিলেন, তথাপি ধৃতব্রত মহর্ষি ক্ষুব্ধ বা ধৈর্য্য হইতে বিচলিত হইলেন না; কেবল এইমাত্র বলিলেন, হে কল্যাণি। ক্ষত্রিয়দিগের তেজঃ বল, আর ব্রাহ্মণদিগের ক্ষমা বল হয়। আমি ক্ষমাপরায়ণ ব্রাহ্মণ, কি প্রতীকার করিব? এক্ষণে যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে গমন কর। তখন নন্দিনী কহিলেন, হে ভগবন্! আপনার এই কথা শুনিয়া বোধ হইতেছে, আপনি আমাকে ত্যাগ করিলেন, কিন্তু যদি পরিত্যাগ না করেন, তাহা হইলে বলপূর্ব্বক কেহই আমাকে লইয়া যাইতে পারিবে না। বশিষ্ঠ কহিলেন, হে নন্দিনি! আমি তোমাকে ত্যাগ করিতে চাহি না, যদি সমর্থ হও তবে আমার আশ্রমে অবস্থান কর। দেখ, ঐ অরাতিরা বল প্রকাশপূর্ব্বক তোমার বৎসকে সুদৃঢ় রজ্জুবদ্ধ করিয়া অপহরণ করিতেছে।
তখন সেই পয়স্বিনী আশ্রমে বাস করা যে মহর্ষির অভিপ্রায়, ইহা বুঝিতে পারিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ক্রোধে আরক্তলোচন হইয়া অতি ঘোররূপ ধারণপূর্ব্বক গ্রীবাদেশ উন্নত করিয়া ঘন ঘন হম্বারব পরিত্যাগ-সহকারে সৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন। কশাদণ্ডদ্বারা বারংবার আহত ও ইতস্ততঃ নিরোধ্যমান হইলে, তাঁহার ক্রোধানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। তিনি ক্রোধোদ্দীপ্ত হইয়া মধ্যাহ্নকালীন দিবাকরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তদীয় বালধি' হইতে জ্বলন্ত অঙ্গার বৃষ্টি হইতে লাগিল। পুচ্ছ হইতে পহৃব, প্রশ্নব' হইতে দ্রাবিড় ও শক এবং যোনিদেশ হইতে যবনেরা উৎপন্ন হইল। গোময় হইতে কিরাত জাতি, মূত্র হইতে কাঞ্চী ও পার্শ্বদেশ হইতে শবরকুল জন্মগ্রহণ করিল। ফেণপুঞ্জ হইতে পৌণ্ড্র, সিংহল, বর্ব্বর, খশ, চিবুক, পুলিন্দ, চীন, হুন, কেরল ও অন্যান্য বহুবিধ ম্লেচ্ছজাতি উৎপন্ন হইল। দেখিতে দেখিতে নানাবরণ-সংচ্ছন্ন সেই বিপুল ম্লেচ্ছবল বহুবিধ অস্ত্রশস্ত্র ধারণপূর্ব্বক ক্রোধাতিরেকসহকারে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইল। বিশ্বামিত্রের সমক্ষে তাঁহার বহুসংখ্যক সৈন্য বশিষ্ঠ-সৈন্যমণ্ডলীর সুতীক্ষ্ণ শরজালে আহত ও ভীত হইয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল। বশিষ্ঠসৈন্য ক্রোধে নিতান্ত অধীর হইয়াছিল বটে, কিন্তু রণক্ষেত্রে বিশ্বামিত্রের একটি সৈন্যেরও প্রাণ সংহার করে নাই। ঋষিধেনু বিপক্ষ সৈন্যদিগকে অতি দূরতর প্রদেশ পর্যন্ত অবরোধ করিলেন। রাজসংক্রান্ত সৈন্যেরা ত্রিযোজন অবধি অবরুদ্ধ হইয়া আর্তনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। পরিশেষে প্রাণভয়ে একান্ত ভীত ও উদ্বিগ্ন হইয়া আশ্রয়লাভে কৃতসঙ্কল্প হইল, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারিল না।
মহারাজ বিশ্বামিত্র ব্রহ্মতেজঃসম্ভূত এই সুমহৎ ব্যাপার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া সাতিশয় বিস্মিত হইলেন এবং ক্ষত্রিয়ভাবে নিতান্ত বিরাগ প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, ক্ষত্রিয় বলে ধিক্, ব্রহ্মতেজঃ যথার্থ বল। বলাবল নির্ণয়স্থলে তপোবলকেই পরমবল বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে হয়। এইরূপ স্থির সিদ্ধান্ত করিয়া তিনি অতি বিস্তীর্ণ রাজ্য, অসামান্য রাজলক্ষ্মী ও কমনীয় বস্তুর ভোেগাভিলাষ এককালে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক তপস্যায় মনোনিবেশ করিলেন। তৎপরে তিনি তপঃ-সিদ্ধিসম্পন্ন হইয়া তেজঃ প্রভাবে ত্রিলোককে অভিভূত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়া দেবরাজ ইন্দ্রের সহিত সোমরস পান করিয়াছিলেন।
গন্ধর্বাজ কহিলেন, হে অর্জুন! দ্যুলোকে কন্মাষপাদ নামে এক অলৌকিক বলসম্পন্ন ও ইক্ষাকুকুলোৎপন্ন রাজা ছিলেন। একদা তিনি মৃগয়ার্থে রাজধানী হইতে নির্গত হইয়া এক অরণ্যানীমধ্যে প্রবেশ করিলেন। রাজা সেই মহাঘোর অরণ্যে মৃগ, বরাহ, মহিষ, খড়গী' প্রভৃতি অতি ভয়ঙ্কর বন্য জন্তুসকল সংহার করিতে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে একান্ত ক্লান্ত ও নিতান্ত শ্রান্ত হইয়া কথা কহিতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।
তৎকালে মহর্ষি বিশ্বামিত্র যাজ্যক্রিয়ার নিমিত্ত তাঁহাকে অনুরোধ করিতে যান। রাজা ক্ষুধার্ত ও তৃষার্ত হইয়া এক প্রশস্ত পথ দিয়া সত্বরে গমন করিতেছিলেন, ইত্যবসরে ঋষিশ্রেষ্ঠ মহাত্মা বশিষ্ঠের পুত্রশতমধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ শক্ত্রির সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, রাজা তাঁহাকে দেখিয়া কহিলেন, আমাদিগের গমনপথ রোধ করিও না, অপসৃত হও। শক্ত্রি মধুরবাক্যে রাজাকে সান্ত্বনা করিয়া কহিলেন, মহারাজ! এ আমার পথ, শাস্ত্রানুসারে রাজা সর্ব্বাগ্রে ব্রাহ্মণদিগকে পথ দিবেন, ইহাই সনাতন ধৰ্ম্ম বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। পথের নিমিত্ত উভয়ে এইরূপ বান্বিতণ্ডা আরম্ভকরিলেন। "তুমি সরিয়া যাও তুমি সরিয়া যাও” বলিয়া পরস্পর পরস্পরের প্রতি উত্তর প্রত্যুত্তর করিতে লাগিলেন। মহর্ষি স্বধর্ম প্রতিপালন করিবার নিমিত্ত পথ রোধ করিয়া রহিলেন। রাজাও অভিমান-পরতন্ত্র ও ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শক্ত্রির গতি রোধ করিলেন এবং মহাবেশে ভয়ঙ্কর নিশাচরের ন্যায় কশাদণ্ডদ্বারা ঋষিকে প্রহার করিলেন। প্রহারবেগে মহর্ষি ক্রোধে অধীর হইয়া তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে অভিশাপ দিলেন, "রে নৃপাধম। তুই যেমন দুরাচার রাক্ষসের ন্যায় তাপসকে কশাঘাত করিলি, অদ্যাবধি মদীয় শাপপ্রভাবে রাক্ষস হইবি এবং মনুষ্যমাংসলোলুপ হইয়া তোকে এই পৃথিবী পর্য্যটন করিতে হইবে।”
বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ উভয়ের যাজ্যক্রিয়ানিবন্ধন বৈর উৎপন্ন হইয়াছিল, এজন্য বিশ্বামিত্র কন্মাষপাদের নিকট গমন করেন। উভয়ের বিবাদকালে তিনি সন্নিহিত হইলেন। রাজা শক্ত্রিকে বশিষ্ঠসদৃশ প্রভাবসম্পন্ন দেখিয়া পশ্চাৎ বশিষ্ঠতনয় বলিয়া জানিতে পারিলেন। হে অর্জুন! বিশ্বামিত্র আত্মপ্রিয় সাধন মানসে অন্তর্হিত হইয়া রহিলেন, তাঁহাদিগকে দর্শন দিলেন না।
অনন্তর রাজা এইরূপ অভিশাপগ্রস্ত হইয়া প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত শক্ত্রির শরণাপন্ন হইলেন। বিশ্বামিত্র রাজার আন্তরিক অভিপ্রায় অবগত হইয়া কিঙ্করনামা এক রাক্ষসকে তাঁহার শরীরে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত আদেশ করিলেন। সে মহর্ষির শাপ-প্রভাবে ও রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের আদেশানুসারে রাজার শরীরমধ্যে প্রবেশ করিল। বিশ্বামিত্র রাজার শরীরে রাক্ষসের আবির্ভাব দেখিয়া তথা হইতে অপসৃত হইলেন। রাজা অন্তর্গত রাক্ষসদ্বারা একান্ত পীড়িত ও কর্তব্যাকর্ত্তব্য জ্ঞানশূন্য হইলেন।
অনন্তর রাজা বন হইতে প্রস্থান করিতেছেন, এমন সময় এক ক্ষুধার্ত্ত ব্রাহ্মণ তাঁহাকে দেখিয়া তৎসন্নিধানে মাংস ভোজনের প্রার্থনা করিলেন। রাজা কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আপনি এক্ষণে ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন, আমি প্রত্যাগত হইয়া আপনার অভিলষিত ভোজন প্রদান করিব। এই বলিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ব্রাহ্মণ তাঁহার প্রতিগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। রাজা ইচ্ছামত সুখ সঞ্চরণ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। ব্রাহ্মণের নিকট যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, নিশীথসময়ে তাহা স্মরণ হইল। তখন তিনি সত্বর গাত্রোগান করিয়া সূপকারকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, অমুক বনে এক ব্রাহ্মণ বুভুক্ষিত হইয়া আমার প্রতীক্ষা করিতেছেন, অতএব শীঘ্র তথায় গিয়া তাঁহাকে সমাংস অন্ন প্রদান করিয়া আইস।
সূপকার তদীয় আদেশানুসারে ইতস্ততঃ অনেক অনুসন্ধান করিল, কিন্তু কোথাও মাংস পাইল না, তখন ভগ্নান্তঃকরণে রাজসন্নিধানে গিয়া মাংস না পাওয়ার বিষয় নিবেদন করিল। রাজা রাক্ষসাবেশ প্রভাবে অক্ষুব্ধচিত্তে বারংবার সূপকারকে কহিতে লাগিলেন, তুমি নরমাংস আহরণ করিয়া ব্রাহ্মণের আহার কার্য্য সম্পাদন কর। সূপকার তৎক্ষণাৎ রাজাজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া অকুতোভয়ে বধ্যভূমিতে উপস্থিত হইল এবং সত্বর তথা হইতে নরমাংস আহরণপূর্ব্বক যথাবিধি পাক করিয়া অন্নসংযোগে ক্ষুধিত তপস্বী ব্রাহ্মণকে উপযোগের নিমিত্ত প্রদান করিল। ব্রাহ্মণ সিদ্ধচক্ষুঃপ্রভাবে বুঝিতে পারিয়া অন্ন অভোজ্য বলিয়া রোষ-কষায়িতলোচনে কহিলেন, যেহেতু সেই নরাধম আমাকে এই অভোজ্য অন্ন প্রদান করিয়াছে, অতএব সেই মূঢ়ই নরমাংসভোজন স্পৃহালু' হইবে। ইতিপূর্ব্বে শক্ত্রি যে অভিশাপ দিয়াছেন, তদনুসারে মনুষ্যমাংস ভক্ষণে আসক্ত ও সকলের ক্লেশকর হইয়া এই পৃথিবীতলে পৰ্য্যটন করিবে। ব্রাহ্মণ দুই বার এইরূপ কহিলে শক্ত্রিদত্ত শাপ বলবান্ হইয়া উঠিল। তিনি তৎক্ষণাৎ রাক্ষসাবেশে জ্ঞানশূন্য হইলেন। তদীয় ইন্দ্রিয়বৃত্তিসকল বিকল হইয়া উঠিল।
রাজা অনতিকাল মধ্যে শক্ত্রিকে দেখিয়া কহিলেন, যেমন তুমি আমার প্রতি অসদৃশ শাপ প্রয়োগ করিয়াছ, তদনুসারে আমিও এক্ষণে মনুষ্যভক্ষণে কৃতসঙ্কল্প হইলাম। এই বলিয়া তৎক্ষণাৎ মহর্ষি শক্ত্রির প্রাণসংহার করিল এবং ব্যাঘ্র যেমন অভীষ্ট পশু ভক্ষণ করে, সেইরূপ ঋষিকলেবর ভক্ষণ করিল। বিশ্বামিত্র শক্ত্রিকে নিহত দেখিয়া বশিষ্ঠের অপর পুত্রদিগকে ভক্ষণ করিবার নিমিত্ত রাক্ষসকে আদেশ প্রদান করিলেন। সিংহ যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পশুদিগকে সংহার করে, রাক্ষস ক্রোধবশ হইয়া সেইরূপ মহর্ষি শক্ত্রির অনুজদিগকে ভক্ষণ করিল।
অনন্তর বশিষ্ঠদেব "বিশ্বামিত্রের আদেশানুসারে শতপুত্র সংহারিত হইয়াছে" শ্রবণ করিলেন। যাদৃশ মহামহীধর বসুন্ধরাকে ধারণ করে, তিনি সেইরূপ অনিবার্য্য শোকাবেগ ধারণ করিয়া রহিলেন। তথাচ তিনি কৌশিকবংশ উম্মূলনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন না। পরিশেষে আত্মত্যাগ মনস্থ করিয়া মেরুশিখরে আরোহণপূর্ব্বক স্বদেহ পাতিত করিলেন। তদীয় দেহ তুলারাশির ন্যায় শিলাখণ্ডে পতিত হইল, প্রাণবিয়োগ হইল না। তৎপরে মহাবনমধ্যে প্রদীপ্ত হুতাশনে প্রবেশ করিলেন। দেদীপ্যমান দহনে মহর্ষির দেহ দগ্ধ হইল না, প্রত্যুত, গাত্রে অনলের শীতল স্পর্শ অনুভূত হইল। পরিশেষে কণ্ঠদেশে নিতান্ত দুর্ভর শিলাখণ্ড বন্ধনপূর্ব্বক জলধি-জলে নিমগ্ন হইলেন, কিন্তু স্রোতোবেগপ্রভাবে তিনি তীরে উপনীত হইলেন। তখন মহর্ষি সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়া অগত্যা পুনর্ব্বার আশ্রমে প্রবেশ করিলেন।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! তৎপরে মহর্ষি বশিষ্ঠ পুত্রশূন্য আশ্রমপদ দর্শনে সাতিশয় শোকাকুল হইয়া তথা হইতে পুনরায় নিষ্ক্রান্ত হইলেন। কতকদূর যাইয়া দেখিলেন, এক স্রোতস্বতী বর্ষাপ্রভাবে অতি বেগবতী ও বারিপূর্ণা হইয়া তীরস্থিত বহুবিধ বৃক্ষ উৎপাটনপূর্ব্বক লইয়া যাইতেছে। তদ্দর্শনে মহর্ষি পুত্রশোকে অতীব দুঃখিতমনে চিন্তা করিলেন, আমি এই নদী জলে নিমগ্ন হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিব। অনন্তর আপনাকে পাশদ্বারা দৃঢ়তর সংযত করিয়া নদীজলে নিমগ্ন হইলেন। নিমগ্ন হইবামাত্র মহানদী মহর্ষির পাশচ্ছেদ করিয়া দিল এবং স্থলে উত্থাপিত করিল। মহর্ষি পাশবিমুক্ত ও স্থলে উত্তীর্ণ হইয়া ঐ নদীর নাম বিপাশা রাখিলেন। অনন্তর ক্রমশঃ তাঁহার শোক-বুদ্ধিই প্রবল হইতে লাগিল। তিনি একান্ত কাতরতাপ্রযুক্ত আর এক স্থানে অবস্থান করিতে না পারিয়া নদী, পর্ব্বত ও সরোবরে পর্য্যটন করিতে লাগিলেন।
একদা প্রচণ্ডগ্রাহবতী' হৈমবতী নামে এক স্রোতস্বতী দেখিয়া তাহার প্রবাহে ঝম্প প্রদান করিলেন। সরিদ্বরা ব্রাহ্মণকে অগ্নিসম বিবেচনা করিয়া শতধা বিদ্রুতা হইল; এই কারণে তদবধি তাঁহার নাম শতদ্রু বলিয়া বিখ্যাত হইল। অনন্তর মহর্ষি আপনাকে স্থলগত ও আত্মসংহারে অকৃতকার্য্য দেখিয়া পুনরায় আশ্রমে আগমন করিতে লাগিলেন। বিবিধ পৰ্ব্বত ও বহুবিধ দেশ পর্য্যটনপূর্ব্বক তিনি অদৃশ্যন্তীনাম্নী স্বীয় পুত্রবধূ কর্তৃক অনুসৃত হইয়া আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন। পরে পশ্চাদ্ভাগে | ষড়ঙ্গালঙ্কৃত' পরিপূর্ণার্থ সুসঙ্গত বেদাধ্যয়নশব্দ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, কে আমার অনুসরণ করিতেছে? তখন অদৃশ্যন্তী প্রত্যুত্তর করিলেন, হে মহাভাগ! আমি আপনার শক্তির সহ-ধর্মিণী তপস্বিনী অদৃশ্যন্তী। মহর্ষি কহিলেন, পুত্রি! পূর্ব্বে শক্তির মুখে যেরূপ সাঙ্গবেদধ্বনি শ্রবণ করিয়াছিলাম, তদ্রূপ এই ষড়ঙ্গ বেদ কে উচ্চারণ করিতেছে? অদৃশ্যন্তী কহিলেন, আমার গর্ভে আপনার তনয় শক্তির এক পুত্র উৎপন্ন হইয়াছে, দ্বাদশ বৎসর হইল, ঐ পুত্র গর্ন্তমধ্যে বেদাধ্যয়ন করিতেছে।
গন্ধর্ব্ব কহিলেন, মহর্ষি বশিষ্ঠ অদৃশ্যন্তীকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইলে হৃষ্টান্তঃকরণে সন্তান বর্তমান পরিজ্ঞাত হইয়া মরণেচ্ছা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। অনন্তর বধূ সমভিব্যাহারে প্রতিগমনপূর্ব্বক এক নির্জন বনে রাজা কন্মাষপাদকে দৃষ্টি-গোচর করিলেন। রাজা রাক্ষসাবেশ-প্রভাবে মহর্ষিকে দেখিবা-মাত্র অতিমাত্র ক্রোধাবিষ্ট হইয়া গ্রাস করিবার অভিলাষে সহসা উত্থিত হইলেন। তখন অদৃশ্যন্তী ক্রুরকর্মা রাক্ষসকে সম্মুখে দেখিয়া ভীতমনে মুনিসন্নিধানে গিয়া কহিলেন, ভগবন্! সাক্ষাৎ কালান্তক যমের ন্যায় এই বিকটাকার রাক্ষস দণ্ডকাষ্ঠ গ্রহণপূর্ব্বক আমা-দিগের নিকটে আগমন করিতেছে, এক্ষণে আপনি ব্যতীত উহাকে নিবারণ করিতে পারে, পৃথিবীতে এমন আর কেহই নাই। হে মহাভাগ! ঐ দারুণদর্শন' পাপপরায়ণ রাক্ষস হইতে আমাকে পরিত্রাণ করুন। নিশ্চয়ই ও আমাদিগকে গ্রাস করিবার অভিলাষ করিতেছে। তখন মহর্ষি প্রত্যুত্তর করিলেন, হে পুত্রি! তুমি ভয় পাইও না। এই রাক্ষস হইতে কদাচ কোনরূপ ভয়ের আশঙ্কা নাই। তুমি উপস্থিত ভয়কে রাক্ষসভয় বলিয়া বিশ্বাস করিও না। ভূমণ্ডলে মহাবল পরাক্রান্ত ও সুবিখ্যাত কন্মাষপাদ নামে এক রাজা ছিলেন। তিনিই শক্ত্রির শাপপ্রভাবে এই ভীষণ রাক্ষস হইয়া বনমধ্যে বাস করিতেছেন। এই বলিয়া তেজস্বী মহর্ষি হুঙ্কার পরিত্যাগপূর্ব্বক সমীপস্থ রাক্ষসকে নিবারণ করিলেন। তৎপরে মন্ত্রপূত সলিলদ্বারা অভ্যুক্ষণ' করিয়া যোগবলে তাঁহার শাপ মোচন করিয়া দিলেন। রাজা কল্মাষপাদ বশিষ্ঠতনয় শক্তির শাপে রাহুগ্রস্ত পার্ব্বণ' দিবাকরের ন্যায় নিস্তেজ হইয়াছিলেন। সম্প্রতি রাক্ষসাবেশ হইতে বিমুক্ত হইয়া সায়ংকালীন সৌরকিরণস্পর্শে মেঘমণ্ডলীর ন্যায় তেজঃপুঞ্জে সেই সমস্ত বনবিভাগ রঞ্জিত করিলেন। অনন্তর রাজা পূর্ব্ববৎ সংজ্ঞা লাভ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে অভিবাদনপূর্ব্বক অবসর ক্রমে ঋষিসত্তম বশিষ্ঠকে কহিলেন, হে মহাভাগ! আমি ইক্ষাকুবংশীয় রাজা, আমার নাম কন্মাষপাদ। আমি আপনার যজমান; অতএব এক্ষণে আপনার যেরূপ অভিলাষ হয়, আদেশ করুন। বশিষ্ঠ প্রত্যুত্তর করিলেন, মহারাজ! বক্তব্যের কাল অতীত হইয়াছে, এক্ষণে রাজধানীতে প্রতিগমনপূর্ব্বক যথা-বিধানে রাজ্যশাসন কর। কিন্তু আর কদাচ ব্রাহ্মণের অবমাননা করিও না। রাজা করিলেন, হে তপোধন! আমি আর কদাচ ব্রাহ্মণকে অবমাননা করিব না। বরং আপনার নির্দেশা-নুসারে তাঁহাদিগকে সম্যক্ সৎকার করিব। হে বেদজ্ঞপ্রধান-দ্বিজোত্তম! সম্প্রতি আমি যাহাতে ইক্ষাকুবংশীয়দিগের নিকট অঋণী হই, আপনাকে এরূপ প্রতিবিধান করিতে হইবে। হে সাধো! আমি সন্তান অভিলাষ করি, ইক্ষাকুদিগের বংশরক্ষার্থ আপনাকে শ্রুতশীলসম্পন্ন একটি সুসন্তান প্রদান করিতে হইবে। তখন সত্যসন্ধ তপোধন "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্য স্বীকার করিলেন।
অনন্তর বশিষ্ঠদেব মহারাজ কন্মাষপাদের সহিত সুবিখ্যাত নগরীতে গমন করিলেন। নগর প্রবেশকালে যেমন দেবগণ দেবরাজ ইন্দ্রকে প্রত্যুদ্গমন করেন, প্রজাপুঞ্জ মহানন্দ-সহকারে সেইরূপে সেই নিষ্পাপ রাজাকে প্রত্যুদ্গমন করিতে লাগিল। রাজা বহুদিনের পর মহর্ষি বশিষ্ঠ সমভিব্যাহারে সেই পুণ্যলক্ষণা অযোধ্যা নগরীতে প্রবেশ করিলেন। অযোধ্যাবাসী জনগণ পুরোহিতসহিত উদিত দিবাকরের ন্যায় মহীপালকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। অনন্তর শরৎকালীন শশধর যেমন নভোমণ্ডল উদ্ভাসিত করেন, রাজা সেইরূপে নিজ রাজাধানী অযোধ্যার শোভা সম্পাদন করিলেন। সেই নগরী পতাকা-পরিশোভিত সুসংসিক্ত' ও সুপরিচ্ছন্ন পথসংযুক্ত হইয়া সকলের আনন্দ সঞ্চার করিতে লাগিল। তখন হৃষ্টপুষ্ট ও সন্তুষ্টজনে আকীর্ণ অযোধ্যা সুররাজবিরাজিত অমরাবতীর ন্যায় সুশোভিত হইত।
রাজা পুরপ্রবেশ করিলে রাজমহিষী ভর্তার আদেশানুসারে মহর্ষি বশিষ্ঠের সন্নিধানে উপনীত হইলেন। মহর্ষি সন্তানো-ৎপাদনে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া দিব্য বিধানানুসারে মহিষীর সহবাস করিলেন। অনন্তর তাঁহার গর্ভলক্ষণ আবির্ভূত হইলে মুনি প্রজানাথ কর্তৃক পূজিত হইয়া পুনরায় আশ্রমে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। রাজমহিষী সন্তান উৎপন্ন হইতে অধিকতর বিলম্ব দেখিয়া এক উপলখণ্ড দ্বারা স্বকীয় গর্ন্ত বিদীর্ণ করিলেন। বিদীর্ণ করিবামাত্র দ্বাদশবর্ষ গর্তে স্থিত রাজর্ষি অশ্মক ভূমিষ্ঠ হইলেন।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! অনন্তর অদৃশ্যন্তী ভর্তৃসদৃশ এক বংশধর কুমার প্রসব করিলেন। ভগবান্ বশিষ্ঠদেব জাতমাত্রেই পৌত্রের জাতকৰ্ম্মাদি ক্রিয়াকলাপ নির্বাহ করিয়া তাঁহার নাম পরাশর রাখিলেন। শক্রিনন্দন পরাশর মহর্ষি বশিষ্ঠকেই পিতা বলিয়া জানিতেন এবং জন্মাবধি তাঁহাকেই পিতার ন্যায় অনুসরণ করিতেন। ক্রমশঃ তিনি জননী অদৃশ্যন্তীর সন্নিধানে বিপ্রর্ষি বশিষ্ঠকে তাত বলিয়া আহ্বান করিতে লাগিলেন। তখন অদৃশ্যন্তী পুত্রের এইরূপ মধুর গর্ত বান্বিন্যাস শ্রবণে অশ্রুপূর্ণ-লোচনে কহিলেন, বৎস! বনমধ্যে এক রাক্ষস তোমার পিতাকে ভক্ষণ করিয়াছে, অতএব এক্ষণে পিতামহকে পিতৃবাক্যে সম্বোধন করিও না, তুমি যাঁহাকে পিতা বলিয়া সম্বোধন কর, তিনি তোমার পিতামহ, পিতা নহেন।
অনন্তর শক্তিতনয়, জননী অদৃশ্যন্তীকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া অতিশয় দুঃখিতমনে সর্ব্বলোক বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। মহর্ষি বশিষ্ঠ তদ্বিষয়ে তাঁহাকে কৃতনিশ্চয় দেখিয়া প্রতিষেধবাক্যে কহিলেন, বৎস! পূর্ব্বকালে কৃতবীর্য্য নামে এক সুবিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি বেদবেত্তা মহাত্মা ভার্গবদিগের যজমান। রাজা যজ্ঞান্তে সোমপান করিয়া প্রভূত ধনধান্যদ্বারা তাঁহাদিগের তৃপ্তি সাধন করিতেন। তিনি লোকান্তর প্রস্থান করিলে তদ্বংশীয় নৃপতিদিগের কোন বিশেষ প্রয়োজনার্থ অর্থের আবশ্যকতা হইয়াছিল। অনন্তর তাঁহারা ভার্গবদিগের অর্থের আতিশয্য জানিয়া তাঁহাদিগের নিকটে অর্থিভাবে উপস্থিত হইলেন। তখন ভার্গবগণ কেহ কেহ ক্ষত্রিয়ভয়ে সমস্ত অক্ষয় ধনসম্পত্তি ভূগর্ভে নিক্ষিপ্ত, কেহ বা ব্রাহ্মণসাৎ করিলেন। কেহ কেহ উপস্থিত অর্থীদিগের প্রার্থনানুসারে অর্থদান করিলেন। এই অবসরে কোন এক ক্ষত্রিয় স্বেচ্ছাক্রমে ভূমি খনন করিয়া ভৃগুগৃহে প্রভৃত বিত্ত প্রাপ্ত হইলেন। তখন ক্ষত্রিয়েরা সকলে সমবেত হইয়া সেই উৎখাত ধন নিরীক্ষণ করিলেন। তদ্দর্শনে ভার্গবেরা ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ক্ষত্রিয়দিগকে যথোচিত অবমাননা করিলেন।
ক্ষত্রিয়েরা অপমানিত হইয়া সুতীক্ষ্ণ শর-প্রহারে ভার্গব-দিগের শিরশ্ছেদ ও তৎপত্নী-গর্ন্তস্থিত অর্ভক'-দিগের প্রাণসংহারপূর্ব্বক পৃথিবী পর্য্যটন করিতে লাগিলেন। ভৃগু-নন্দনেরা উচ্ছিন্ন হইলে তাঁহাদিগের পত্নিগণ ক্ষত্রিয়ভয়ে একান্ত ভীত হইয়া হিমাচলে পলায়ন করিলেন। তন্মধ্যে কোন মহিলা ভর্তৃকুলবৃদ্ধির নিমিত্ত সভয়ে উরুদেশে অতি প্রদীপ্ত এক গর্ব ধারণ করিয়াছিলেন। এই গর্ভসংবাদ অবগত হইয়া অনতিবিলম্বে এক ব্রাহ্মণী ভীতমনে নির্জনে ক্ষত্রিয় সন্নিধানে গিয়া ইহা নিবেদন করিল। ক্ষত্রিয়েরা গর্বনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া তথায় আগমনপূর্ব্বক দেখিলেন, ব্রাহ্মণী স্বতেজঃপ্রভাবে দীপ্যমানা রহিয়াছেন। এই অবসরে গর্ভস্থ বালক ব্রাহ্মণীর উরুদেশ বিদীর্ণ করিয়া নির্গত হইলেন। নির্গত হইবামাত্র মধ্যাহ্নসূর্য্যের ন্যায় তিনি ক্ষত্রিয়দিগের দৃশক্তি' সংহার করিলেন। ক্ষত্রিয়গণ চক্ষুহীন হইয়া ঐ গিরিদুর্গে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে তাঁহারা হীনজ্যোতিঃ চক্ষুঃ লাভের প্রত্যাশায় সেই অনিন্দিতা ব্রাহ্মণীর শরণাগত হইয়া দুঃখিতমনে নিবেদন করিলেন, ভগবতি! আমরা অতি নরাধম, এক্ষণে প্রার্থনা এই যে, আমরা আপনার প্রসাদে অসৎ অধ্যবসায় হইতে বিরত হইয়া আপনার অনুকম্পায় পুনরায় চক্ষুলাভপূর্ব্বক প্রতিগমন করিতে পারি। হে শোভনে! আপনি পুত্রের সহিত প্রসন্ন হইয়া পুনর্ব্বার দৃষ্টি' প্রদানপূর্ব্বক আমাদিগকে পরিত্রাণ করুন।
ব্রাহ্মণী কহিলেন, হে বৎস ক্ষত্রিয়গণ! আমি ক্রোধপরায়ণ হইয়া তোমাদিগের চক্ষুঃ গ্রহণ করি নাই। মদীয় উরুসম্ভব ভার্গব তোমাদিগের উপর অদ্য রোষপরবশ হইয়াছেন। তিনিই বন্ধুবান্ধবগণের নিধনদশা স্মরণ করিয়া কোপাকুলিত চিত্তে তোমাদিগের চক্ষুঃ গ্রহণ করিয়াছেন, সন্দেহ নাই। তোমরা যখন ভৃগুমহিলা-দিগের গর্ন্তস্থ সন্তানগণকে সংহার কর, তদবধি আমি একশত বৎসরকাল উরুদেশে এই গর্ন্ত ধারণ করিয়াছিলাম। ভৃগুবংশীয়দিগের হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত ষড়ঙ্গসম্পন্ন বেদ, গর্ভস্থ অবস্থায় এই বালকে প্রবেশ করিয়াছে। এই বালকই পিতৃবধ-জনিত ক্রোধে অধীর হইয়া তোমাদিগকে সংহার করিতে উদ্যত হইয়াছে। ইহারই অলৌকিক তেজোবলে তোমাদিগের চক্ষুঃ অপহৃত হইয়াছে, অতএব তোমরা ইহার নিকট বিনীতভাবে প্রার্থনা কর, ইনিই প্রণিপাতে পরিতুষ্ট হইয়া পুনর্ব্বার তোমাদিগকে দৃষ্টি প্রদান করিবেন। এইরূপ আদিষ্ট হইয়া তাহারা উরুসম্ভব ভার্গবকে কহিলেন, মহাভাগ। প্রসন্ন হউন। এই কথা কহিবামাত্র তিনি তৎক্ষণাৎ প্রসন্ন হইলেন।
হে বৎস! ঐ বিপ্রর্ষি উরুভেদ করিয়া নির্গত হইয়াছিলেন, এই কারণে ত্রিভুবনে ঔর্ব্ব বলিয়া বিখ্যাত হন। ক্ষত্রিয়েরা চক্ষুঃলাভ করিয়া প্রতিনিবৃত্ত হইলে মহর্ষি ঔর্ব্বের মনে হইল, যেন তিনি সকল লোককে পরাভব করিলেন। তৎপরে মহাত্মা মহামনাঃ মুনি নিখিল লোক সংহার করিবার নিমিত্ত একান্ত উন্মুখ হইলেন। মহর্ষি, ভৃগুবংশীয়দিগের নিষ্কৃতি লাভ প্রত্যাশায় সর্ব্বলোক-বিনাশে কৃতসংকল্প হইয়া তপঃপ্রভাবে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিলেন এবং পিতামহগণের অন্তঃকরণে আনন্দ সঞ্চার করিবার নিমিত্ত তপোবলে দেবাসুর ও মনুষ্যের সহিত ত্রিলোককে সন্তপ্ত করিতে লাগিলেন।
অনন্তর পিতৃলোকেরা এই অদ্ভুত ব্যাপার অবগত হইলেন এবং ঔর্ব্বের নিকট আবির্ভূত হইয়া করিলেন, হে বৎস! আমরা তোমার তপোবল দেখিলাম, এক্ষণে লোকের প্রতি প্রসন্ন হও এবং ক্রোধবেগ সংবরণ কর। তৎকালে আমরা প্রতীকারে অশক্ত হইয়া যে প্রাণসংহারোদ্যত ক্ষত্রিয়দিগের তাদৃশ অত্যাচারে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছি, এমত নহে। অতি দীর্ঘ জীবন ভোগ করা অপেক্ষা জীবলোকে ক্লেশকর আর কিছুই নাই, এই জন্য স্বেচ্ছানুসারে আপনারাই আপনাদিগের বধোপায় ক্ষত্রিয়হস্তে অবধারিত করিয়াছিলাম। আমরা কোপের বশীভূত নহি, তথাচ ক্ষত্রিয়দিগের সহিত বিদ্বেষভাব বদ্ধমূল হইবার উদ্দেশেই আমাদের মধ্যে একজন আপন আলয়ে সমুদায় ধনসম্পত্তি ভূগর্তে নিখাত করিয়া রাখেন। ক্ষত্রিয়দিগকে কুপিত করাই তাহার উদ্দেশ্য। আমরা স্বর্গফল কামনা করিয়া থাকি, আমাদিগের ধনে কি প্রয়োজন? প্রয়োজন হইলে ধনাধ্যক্ষ কুবেরই আমাদিগের প্রভূত ধন আহরণ করেন। যখন দেখিলাম, ধর্মরাজ যম স্বয়ং আমাদিগকে গ্রহণ করিতে পারিলেন না, তখন আমরা সর্ব্বসম্মতিক্রমে এইরূপ উপায় অবধারণ করিলাম। আত্মঘাতী পুরুষেরা কদাচ পুণ্য লোক লাভ করিতে পারে না, এই হেতু আমরা আদ্যোপান্ত সমুদায় অনুধাবন করিয়া ক্ষত্রিয়হস্তে প্রাণবিসর্জন করিয়াছিলাম। হে ভৃগুবংশাবতংস ঔর্ধ্ব। যে বিষয় অনুষ্ঠান করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ, তাহা আমা-দিগের নিতান্ত অপ্রিয়। এক্ষণে তুমি সর্ব্বলোক পরাভবরূপ পাপাচার হইতে মন সংযম কর। সপ্তলোক ক্ষয় ও ক্ষত্রিয়দিগকে বধ করিবার কোন প্রয়োজন নাই। উচ্ছলিত ক্রোধ-বেগ তপঃপ্রভাবকে দূষিত ও কলুষিত করিতেছে, আশু তাহার পরিহার করা তোমার অবশ্য কর্তব্য।
ঔর্ব্ব কহিলেন, হে পিতৃগণ! আমি ক্রোধমূর্ছিত হইয়া সর্ব্বলোক সংহারের যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহা অন্যথা হইবে না। বৃথা রোষ ও বৃথা প্রতিজ্ঞা করিতে আমার অভিরুচি হয় না। ক্ষত্রিয়দিগের অত্যাচারের যদি প্রতীকার না হয়, তাহা হইলে প্রজ্বলিত অগ্নি যেমন যজ্ঞীয় কাষ্ঠরাশি দহন করে; সেইরূপ ক্রোধ আমাকে নিরন্তর দগ্ধ করিবে। যিনি কারণবশতঃ উত্তেজিত ক্রোধে ক্ষমা প্রদর্শন করেন, সেই মনুষ্য কদাচ ত্রিবর্গ রক্ষায় সম্যক্ সমর্থ হয়েন না। অশিষ্টের নিয়ন্তা ও শিষ্টের প্রতি-পালয়িতা ক্রোধকে বিজিগীষু প্রজারা অবসর ক্রমে প্রকাশ করিয়া থাকেন। যৎকালে ক্ষত্রিয়গণ ভার্গবদিগকে বধ করেন, আমি তখন উরুস্থ ও গৰ্ত্তশয্যাগত হইয়া মাতৃবর্গের অতি করুণকণ্ঠস্বর শ্রবণগোচর করিয়াছিলাম। যখন ক্ষত্রিয়াপসদেরা' গর্বস্থ শিশু সন্তান অবধি সমুদায় ভৃগুবংশ উচ্ছেদ করিতে আরম্ভকরে; তদবধি আমি তাহাদের প্রতি বিষম ক্রোধাবিষ্ট হইয়াছি। আমার পিতৃ ও মাতৃবর্গ সম্পূর্ণ উদ্বিগ্ন হইয়া ভয়বিহ্বলচিত্তে বিলোকমধ্যে কত্রাপি আশ্রয় পাইলেন না। যখন দুরাত্মারা ভৃগুপত্নীদিগের সংহারে পরাম্মুখ হইল, তখন মদীয় জননী উরুদেশে আমাকে ধারণ করিয়াছিলেন। ইহলোকে পাপের প্রতিষেধকর্তা বিদ্যমান থাকিলে কেহই পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে প্রবৃত্ত হয় না। তাঁহার অবিদ্যমান অনেকেই পাপকর্মে আসক্ত হয়। সামর্থ্য থাকিতেও যিনি সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া পাপাচার পরিহার না করেন, নিগ্রহানুগ্রহাশক্ত হইয়াও তাঁহাকে মহাপাপে লিপ্ত হইতে হয়। সকল রাজলোক ও অধীশ্বরবর্গ, জীবলোকে জীবন রক্ষা করা শ্রেয়ঃকল্প বিবেচনা করিয়া শক্তি-সত্ত্বেও কেহই | আমার পিতৃগণকে মরণভয় হইতে পরিত্রাণ করিলেন না। এক্ষণে আমিই সকলের অধীশ্বর হইয়াছি। বিষম রোষানলে আমার অন্তঃকরণ নিরন্তর দগ্ধ হইতেছে। অতএব আপনাদিগের প্রতিষেধবাক্য অনুমোদন করিতে সমর্থ নহি। আমি ঈশ্বর হইয়াও যদি লোকের পাপভয়ে উপেক্ষা করি, তাহা হইলে আমার যে ক্রোধানল লোকদিগকে দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছে; তাহা নিগৃহীত্ব হইলে নিজ তেজঃপ্রভাবে আমাকেই নিশ্চয় দগ্ধ করিবে। আমি আপনাদিগের সর্ব্বলোেকহিতৈষিতা পরিজ্ঞাত হইয়াছি; অতএব এক্ষণে সকলের পক্ষে যাহা শ্রেয়ঃ বোধ হয়, আপনারা তাহার বিধান করুন।
পিতৃগণ কহিলেন, হে বৎস! তোমার যে ক্রোধানল লোকদিগকে ভস্মসাৎ করিতে অভিলাষ করিয়াছে, তাহা জলমধ্যে নিক্ষেপ কর, তোমার মঙ্গল হইবে। সকল লোকই জলে প্রতিষ্ঠিত, রসসমুদায় জলময় এবং জগৎও জলস্বরূপ, অতএব তোমার ক্রোধানল জলমধ্যে নিক্ষেপ করাই উচিত হইতেছে। যদি অভিলাষ হয়, তাহা হইলে জলনিধির জলে ক্রোধানল স্থাপিত করিয়া শীতল হও। জল দগ্ধ করিলে লোকদিগকেও দগ্ধ করা হইবে; কারণ সমুদায় লোকই জলময়। এইরূপ হইলে তোমার প্রতিজ্ঞা অন্যথা হইবে না। আর দেবতারা ও মনুষ্যেরা সকলেই অপরাভূত থাকিবেন।
বশিষ্ঠদেব কহিলেন, ভৃগুনন্দন ঔর্ব্ব বরুণনিলয়স্বরূপ মহাসাগরে ক্রোধানল পরিত্যাগ করিলেন। সেই অনল সমুদ্রজল ভক্ষশ করিতে লাগিল। ঐ ক্রোধানল অগ্ন্যুদ্গারি মহৎ হয়শিরো-রূপে পরিণত হইয়া সমুদ্রজল পান করিয়া থাকে। বেদবিৎ পণ্ডিতেরা ইহাকেই বাড়বানল কহেন। অতএব হে পরাশর! পরলোক পরিজ্ঞাত হইয়া লোকের প্রাণসংহারে ক্ষান্ত হও, তোমার মঙ্গল হইবে।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! ভগবান্ পরাশর মহর্ষি বশিষ্ঠকর্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া সর্ব্বজন পরাভব হইতে আত্মক্রোধ সংবরণ করিলেন। কিন্তু পিতৃবধরূপ মহাপরাধ স্মরণপূর্ব্বক অতি বিস্তীর্ণ এক রাক্ষসসত্রানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। সেই যজ্ঞে কি বালক, কি বৃদ্ধ, কি যুবা সমুদায় রাক্ষস দগ্ধ হইতে লাগিল। মহর্ষি বশিষ্ঠ পৌত্রের দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞা অন্যথা করা উচিত নহে, ভাবিয়া তাঁহাকে রাক্ষসবধস্বরূপ অধ্যবসায় হইতে নিবারণ করিলেন না। পরাশর সেই রাক্ষসযজ্ঞে প্রদীপ্ত বহ্নিত্রয়মধ্যে চতুর্থ বহ্নির ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। শরৎকালে দিবাকর নভোমণ্ডলকে যাদৃশ প্রকাশিত করেন, সেইরূপ সেই নির্মূল যজ্ঞে আহুতি প্রদত্ত হইলে নভোমণ্ডল উদ্ভাসিত হইল। বশিষ্ঠ প্রভৃতি মহর্ষিগণ শক্তিনন্দন পরাশরকে তেজঃপ্রভাবে দীপ্যমান দ্বিতীয় ভাস্কর বলিয়া মনে করিতে লাগিলেন।
অনন্তর সেই অনন্যসুলভ সত্র সমাপন করিবার নিমিত্ত উদারবুদ্ধিসম্পন্ন মহর্ষি অত্রি তথায় আগমন করিলেন। আর রাক্ষসদিগের প্রাণরক্ষার্থ তথায় পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও মহাক্রতু উপনীত হইলেন। তন্মধ্যে পুলস্ত্য রাক্ষস বধবিষয়ে পরাশরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! তোমার তপস্যার কুশল ত? নির্দোষ ও অপরিজ্ঞাত রাক্ষসদিগকে সংহার করিয়া তোমার মনে কি আনন্দ সঞ্চার হইতেছে? তুমি আমাদিগের প্রজার উচ্ছেদ করিও না। দ্বিজাতি তপস্বীদিগের এরূপ ধৰ্ম্ম নহে। হে পরাশর! শান্তিগুণই আমাদিগের পরম ধৰ্ম্ম, তুমি সেই ধৰ্ম্ম অবলম্বন কর। শ্রেষ্ঠ হইয়া তুমি কেন ধৰ্ম্মবিগর্হিত কৰ্ম্ম অনুষ্ঠান করিতেছ? তোমার পিতা শক্তি পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁহাকে অতিক্রম করা ও মদীয় প্রজাসকল নির্মূল করা তোমার উচিত নহে। শক্তির নিজ শাপপ্রভাবে তৎকালে বিষম বিপদ উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি আত্মদোষেই দেহ পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বর্গলাভকরিয়াছেন। তাঁহাকে ভক্ষণ করিতে কোন রাক্ষসেরই সাহস হইত না। তিনি আপনিই আপনার মৃত্যুপথ পরিষ্কার করিয়া-ছিলেন। কেবল মহর্ষি বিশ্বামিত্র তদ্বিষয়ে নিমিত্তমাত্র হইয়া দোষভাগী হইলেন। এক্ষণে মহারাজ কন্মাষপাদ স্বর্গে আরোহণ করিয়া মহানন্দে কালযাপন করিতেছেন। আর তোমার পিতৃব্য-দিগেরও সুরগণসমভিব্যাহারে মহাহর্ষে কালক্ষেপ হইতেছে। হে বৎস! মহর্ষি বশিষ্ঠ এ সকল বিষয় ও নির্দোষ রাক্ষসদিগের উচ্ছেদ ব্যাপার অবগত আছেন। তুমিই কেবল এই সত্রের কারণমাত্র। অতএব এক্ষণে আর যজ্ঞ করিও না। তোমার যজ্ঞসমাপ্তি-ফললাভ হউক, তুমি কুশলে থাক। গন্ধর্ব্ব কহিলেন, শক্তিনন্দন পরাশর পুলস্ত্য ও মহর্ষি বশিষ্ঠকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সেই রাক্ষসসত্র সমাপন করিলেন এবং যজ্ঞার্থ সঞ্চিত অগ্নিকে হিমালয়ের উত্তরপার্শ্বে এক মহাবনে নিক্ষেপ করিলেন। অদ্যাবধি সেই অগ্নিকে প্রতিপর্ব্বে রাক্ষস, বৃক্ষ ও প্রস্তরসহিত পর্ব্বত দগ্ধ করিতে দেখা যায় এবং ঐ অগ্নিধারী গিরি অদ্যাপি লোকে আগ্নেয় পৰ্ব্বত বলিয়া প্রসিদ্ধ।
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন, হে গন্ধর্ব্বরাজ! রাজা কন্মাষপাদ কোন্ কারণ অবলম্বন করিয়া স্বীয় মহিষীকে বশিষ্ঠের নিকটে নিয়োগ করিলেন এবং সেই ধর্মজ্ঞ মহর্ষিই বা গুরু হইয়া কিরূপে সেই অগম্যা শিষ্যাতে রত হইলেন? তিনি কি ইতিপূর্ব্বে কোনপ্রকার অধর্মাচরণ করিয়াছিলেন? আমি এই বিষয়ে অত্যন্ত সন্দিহান হইয়াছি, অতএব হে সখে! আনুপূর্ব্বিক বর্ণনা করিয়া আমার সংশয় নিরাকরণ কর।
গন্ধর্ব্বরাজ কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! রাজা কল্মাষপাদ ও বশিষ্ঠের বিষয় যাহা জিজ্ঞাসা করিলে, তৎসমুদায় সবিস্তার বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর। হে ভরতশ্রেষ্ঠ। পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে বশিষ্ঠাত্মজ মহাত্মা শক্তিরাজা কল্মাষপাদকে অভিসম্পাত করেন। রাজা শাপগ্রস্ত ও ক্রোধপরবশ হইয়া নগর পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পত্নী সমভিব্যাহারে এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিলেন। সেই অরণ্য নানাজাতীয় জন্তুগণে সমাকীর্ণ, পাদপ-সমূহে আবৃত ও লতাগুল্মে আচ্ছন্ন। রাজা তথায় ভ্রমণ করিতে করিতে শত সহস্র হিংস্র জন্তুর ভয়ঙ্কর গভীর রব শ্রবণ করিতে লাগিলেন। একদা সেই রাক্ষসরূপী ভূপাল ক্ষুধাশান্তির নিমিত্ত আহারান্বেষণ করিতেছিলেন, এমত সময়ে দেখিলেন, এক বিপ্রদম্পতী কামক্রীড়ায় আসক্ত হইয়াছেন। তাঁহারা রাজাকে নয়নগোচর করিয়া কৃতকার্য্য না হইতেই ভয়ে পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। রাজা পলায়নপর ব্রাহ্মণকে বলপূর্ব্বক ধারণ
করিলেন; ব্রাহ্মণী স্বামীকে গৃহীত দেখিয়া কহিলেন, হে রাজন! আমার এক নিবেদন আছে, শ্রবণ করুন। আপনি আদিত্যবংশে প্রসূত, সর্ব্বলোক-সুবিখ্যাত; বিশেষতঃ ধৰ্ম্মানুষ্ঠান ও গুরুজন-শুশ্রূষায় অনুরক্ত, অতএব আপনার পাপাচরণ করা নিতান্ত অবিধেয়। আমি ঋতুকাল উপস্থিত দেখিয়া সন্তানার্থ ভর্তার সহিত সঙ্গত হইয়াছিলাম, অধুনাপি কৃতার্থ হইতে পারি নাই, অতএব হে নরনাথ। এক্ষণে প্রসন্ন হইয়া আমার স্বামীকে পরিত্যাগ করুন। রাজা বিক্রোশমানা' সেই কামিনীর প্রার্থনাবাক্যে উপেক্ষা প্রদর্শনপূর্ব্বক ব্যাঘ্র যেমন মৃগকে গ্রাস করে, সেইরূপ তাঁহার স্বামীকে ভক্ষণ করিলেন, তদ্দর্শনে ক্রোধাভিভূতা ব্রাহ্মণীর যতগুলি অশ্রুবিন্দু ভূতলে পতিত হইল, সমুদায় প্রজ্বলিত হুতাশন হইয়া সেই বনপ্রদেশ দগ্ধ করিতে লাগিল।
অনন্তর ভর্তৃবিয়োগবিধুরা শোকসন্তপ্তা ব্রাহ্মণী ক্রোধভরে রাজর্ষি কন্মাষপাদকে অভিসম্পাত করিলেন, "রে দুর্বুদ্ধি-পরতন্ত্র নৃপাধম! তুই যেমন মনোরথ পরিপূর্ণ না হইতেই আমার সমক্ষে প্রিয়তমের প্রাণ সংহার করিলি, তোকেও সেইরূপ ঋতুকালে পত্নীসহযোগ করিবামাত্র পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইতে হইবে। তুই যাঁহার পুত্র বিনষ্ট করিয়াছিস, সেই মহর্ষি বশিষ্ঠের ঔরসে তোর পত্নী পুত্রোৎপাদন করিবেন। সেই পুত্র তোর বংশধর হইবে” মহর্ষি অঙ্গিরার পুত্রী রাজাকে এইরূপে অভিসম্পাত করিয়া তাহার সমক্ষে প্রদীপ্ত হুতাশনে প্রবেশ করিলেন। মহর্ষি বশিষ্ঠ সমাধিবলে এই সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিলেন।
অনন্তর বহুকাল অতীত হইলে রাজা শাপবিমুক্ত হইলেন। একদা ভূপাল পত্নীর ঋতুকাল উপস্থিত দেখিয়া শাপ-বৃত্তান্ত বিস্মরণপূর্ব্বক কামান্ধচিত্তে তদীয় সহবাসে উদ্যত হইলেন। দেবী তাঁহাকে প্রতিষেধ করিলেন। তখন পত্নীবাক্য শ্রবণে শাপবৃত্তান্ত তাঁহার স্মৃতিপথে উদিত হওয়াতে তিনি যৎপরোনাস্তি পরিতাপ করিতে লাগিলেন। হে পার্থ! রাজা কন্মাষপাদ শাপগ্রস্ত হওয়াতে কুলগুরু বশিষ্ঠের নিকট স্বীয় পত্নীকে নিয়োগ করিয়াছিলেন।
অর্জুন কহিলেন, হে গন্ধর্ব্বরাজ। সকলই তোমার বিদিত আছে; অতএব বল দেখি, কোন্ ব্যক্তি আমাদিগের পুরোহিত হইবার উপযুক্ত পাত্র? গন্ধর্ব্ব কহিলেন, দেবলের যবিষ্ঠভ্রাতা ধৌম্য উৎকোচক নামক তীর্থে তপস্যা করিতেছেন, যদি ইচ্ছা হয় তাঁহাকে পৌরোহিত্য কার্য্যে বরণ কর। অর্জুন গন্ধর্ব্বের প্রতি প্রীত হইয়া তাঁহাকে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, হে গন্ধর্ব্বসত্তম! তোমার মঙ্গল হউক, ঘোটকসকল তোমারই নিকট থাকুক, প্রয়োজন উপস্থিত হইলে গ্রহণ করিব। এই বলিয়া পরস্পর সম্মানবিনিময়পূর্ব্বক রমণীয় ভাগীরথী তীর হইতে নিজ নিজ অভীষ্ট প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর পাণ্ডবেরা উৎকোচক তীর্থে ধৌম্যাশ্রমে উপনীত হইয়া তাঁহাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিলেন। বেদবিত্তম ধৌম্য বন্য ফল মূল প্রদান ও পৌরোহিত্য স্বীকারদ্বারা পাণ্ডবদিগের সৎকার করিলেন। পাণ্ডবেরা মনে মনে আশা করিতে লাগিলেন যে, তাঁহাকে পুরস্কৃত করিয়া স্বয়ংবরে দ্রৌপদী, রাজলক্ষ্মী ও সাম্রাজ্য প্রাপ্ত হইতে পারিবেন। তাঁহারা এতদিন অসহায় হইয়াছিলেন, অধুনা পুরোহিত ধৌম্যের সহিত সঙ্গত হইয়া আপনাদিগকে নাথবান্ মনে করিলেন। পাণ্ডবেরা সেই উদারধী বেদার্থতত্ত্বজ্ঞ পুরোহিতের অনুকম্পায় যাগপ্রিয় পাণ্ডবগণের অবিচলিত উৎসাহ, অপ্রতিহত বলবীর্য্য, মহীয়সী বুদ্ধিবৃত্তি ও ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি সন্দর্শনে মনে মনে স্থির করিলেন, তাঁহারা অচিরাৎ রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হইবেন। অনন্তর পাণ্ডবগণ পুরোহিতকর্তৃক কৃতস্বস্ত্যয়ন হইয়া দ্রৌপদীস্বয়ংবর সমাজারোহণে মানস করিলেন।
স্বয়ংবর পর্ব্বাধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর নরশ্রেষ্ঠ পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে সন্দর্শন করিবার মানসে জননী-সমভিব্যাহারে মহোৎসবময় দ্রুপদজনপদে গমন করিলেন। পথিমধ্যে স্বয়ংবর-দিদৃক্ষু' কতিপয় ব্রাহ্মণের সহিত তাঁহাদিগের সাক্ষাৎ হইল।
ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণেরা পাণ্ডবদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনারা কোথা হইতে আসিয়াছেন এবং কোথায়ই বা গমন করিবেন? যুধিষ্ঠির কহিলেন, মহাশয়! আমরা পঞ্চসহোদর একত্র হইয়া জননী-সমভিব্যাহারে একচক্রা নগরী হইতে আসিতেছি। ব্রাহ্মণেরা কহিলেন, আপনারা অদ্যই পাঞ্চালদেশে চলুন। পাঞ্চালেশ্বরভবনে মহাসমৃদ্ধ স্বয়ংবর হইবে। আমরা তথায় যাইবার মানসে নির্গত হইয়াছি। ভাল হইল, সকলে একসঙ্গে যাইব। অদ্য পাঞ্চালদেশে পরমাদ্ভুত মহোৎসব হইবে। মহারাজ যজ্ঞসেনের যজ্ঞবেদিমধ্য হতে এক পরমাসুন্দরী দুহিতা উৎপন্ন হইয়াছে। সেই কমলনয়না দ্রোণশত্রু ধৃষ্টদ্যুম্নের ভগিনী; ধৃষ্টদ্যুম্ন খড়া, বৰ্ম্ম ও ধনুর্ব্বাণ ধারণ করিয়া প্রজ্বলিত হুতাশন হইতে উদ্ভূত হন। দ্রৌপদীর সর্ব্বাঙ্গব্যাপী নীলোৎপল গন্ধ এক ক্রোশ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। আমরা সেই স্বয়ংবরা দ্রৌপদীকে নয়নগোচর করিবার নিমিত্ত তথায় গমন করিব এবং মহোৎসব সন্দর্শনে অনির্বচনীয় আনন্দ প্রাপ্ত হইব। অদ্য তথায় নানা দিগ্ দেশ হইতে যজ্বা, ভূরিদক্ষিণ, স্বাধ্যায়সম্পন্ন, পবিত্রস্বভাব, মহাত্মা, যতব্রত, তরুণবয়স্ক, পরমসুন্দর, মহারথ, অস্ত্রবিদ্যায় নিপুণ কত শত রাজা ও রাজপুত্র আগমন করিবেন। তাঁহারা পরস্পর জিগীষাপরবশ হইয়া নানা প্রকার দ্রব্যজাত, বিবিধ ভক্ষ্য, ভোজ্য, গোসমূহ ও ধনাদি দান করিবেন। আমরা তৎসমুদায় প্রতিগ্রহ, স্বয়ংবর সন্দর্শন এবং মহোৎসবজনিত আনন্দানুভব করিয়া স্বেচ্ছানুসারে প্রত্যাগমন করিব। তথায় সূত, মাগধ, বৈতালিক, নট, নর্তক ও নানা দেশীয় মহাবল পরাক্রান্ত যোদ্ধৃবর্গ সমাগত হইয়া নৈপুণ্য প্রকাশ করিবে। আপনারাও কৌতুকাক্রান্ত চিত্তে সেই সকল কৌতুকাবহ ব্যাপার অবলোকন করিয়া প্রদত্ত দ্রব্যজাত প্রতিগ্রহপূর্ব্বক আমাদিগের সহিত প্রত্যাগমন করিবেন। আপনারা সকলে দেবতুল্য রূপবান্ কৃষ্ণার নয়নপথের পথিক হইলে তিনি অবশ্যই আপনাদিগের অন্যতমকে বরমাল্য প্রদান করিবেন। আপনার এই মহাভুজ দর্শনীয় ভ্রাতাকে নিয়োগ করিলে ইনি অপরিমিত দ্রবিণ'রাশি জয় করিতে পারিবেন। যুধিষ্ঠির কহিলেন, যে আজ্ঞা; আমরা সকলেই আপনাদিগের সমভিব্যাহারে রাজকন্যার স্বয়ংবর ও তজ্জনিত মহোৎসব সন্দর্শনে গমন করিব।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবেরা ব্রাহ্মণগণের নিকট এইরূপ আদিষ্ট হইয়া দ্রুপদরাজ পরিরক্ষিত দক্ষিণ পাঞ্চালদেশে গমন করিলেন। গমনকালে বিশুদ্ধাত্মা অকল্মষ' মহর্ষি দ্বৈপায়নকে সন্দর্শন করিয়া তাঁহার যথাবিধি সৎকার করিলেন এবং তৎকৃত সৎকার গ্রহণপূর্ব্বক নানা বিষয়ক কথোপকথনান্তে অনুজ্ঞাত হইয়া দ্রুপদ ভবনাভিমুখে গমন করিলেন। পথিমধ্যে য়ে যে স্থানে রমণীয় বন, সুশোভন সরোবর, তাঁহাদিগের নয়নপথে পতিত হইয়াছিল, সেই সেই স্থানে উপবিষ্ট ও গতক্লম' হইয়া ধীরে ধীরে গমন করিতে লাগিলেন। স্বাধ্যায়সম্পন্ন বিশুদ্ধস্বভাব প্রিয়ংবদ পাণ্ডুতনয়েরা ক্রমে ক্রমে পাঞ্চালদেশে উপনীত হইয়া স্কন্ধাবার ও নগর নিরীক্ষণপূর্ব্বক এক কুম্ভকারের আলয়ে বাস করিয়া ব্রাহ্মণের বৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক ভিক্ষাদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। রাজা যজ্ঞসেনের মনে মনে অভিলাষ হইয়াছিল যে, পাণ্ডুতনয় কিরীটীকে স্বীয় দুহিতা সম্প্রদান করিবেন, কিন্তু এ কথা কাহারও অগ্রে ব্যক্ত করেন নাই। এক্ষণে স্বাভিলষিত পাত্র পাইবার মানসে এক সুদৃঢ় দুরানম্য শরাসন প্রস্তুত করাইলেন এবং কৃত্রিম আকাশযন্ত্র নির্মাণ করাইয়া তৎসঙ্গে লক্ষ্য সংস্থাপনপূর্ব্বক ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, যে ব্যক্তি এই সজ্য শরাসনে শরসন্ধানপূর্ব্বক যন্ত্র অতিক্রম করিয়া লক্ষ্যবিদ্ধ করিতে সমর্থ হইবে, আমি তাহাকেই কন্যা দান করিব।
এইরূপ ঘোষণা শ্রবণে চতুৰ্দ্দিক হইতে ভূপালগণ আগমন করিতে লাগিলেন। স্বয়ংবরদিদৃক্ষু ঋষিগণ এবং কর্ণসমভিব্যাহারী দুর্য্যোধন প্রমুখ কুরুবর্গ সমুপস্থিত হইলেন। নানাদিদেশ হইতে কত শত ব্রাহ্মণগণ আসিতে লাগিলেন। দ্রুপদরাজ সমাগত ব্যক্তিদিগের যথোচিত সৎকার করিলেন। রাজগণ তাহা পরিগ্রহ করিয়া স্বয়ংবর দর্শনার্থে মঞ্চোপরি উপবেশন করিলেন এবং পৌরজনেরা মহাকোলাহলপূর্ব্বক দর্শনমানসে মণ্ডপসন্নিকটস্থ শিশুমার বৃক্ষোপরি আরোহণ করিল। নগরের প্রাগুত্তরপ্রান্ত'বর্তিনী এক পরিষ্কৃত সমতল ভূমিতে স্বয়ংবর সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। সভাগৃহ প্রাকার ও পরিখাদ্বারা পরিবেষ্টিত এবং মধ্যে মধ্যে তোরণরাজি’ বিরাজিত ছিল। তাহার চারিদিকে সুধাধবলিত সৌধাবলী, তুষারজালজড়িত হিমালয়শিখরের ন্যায় শোভা পাইতেছে। ঐ সকল প্রাসাদের কুট্টিম' ভূমি রমণীয় মণিময় শিলাপট্টে উদ্ভাসিত, দ্বারসকল সমসূত্রপাতে বিন্যস্ত এবং সোপান-মার্গসমুদায় সুসংঘটিত। বিচিত্র চন্দ্রাতপ ও অপূর্ব্ব মাল্যদাম উহার অতীব মনোহারিণী শোভা সম্পাদন করিতেছে। ঐ প্রদেশ-সুবাসিত গন্ধবারিদ্বারা পরিষিক্ত হইয়াছে। স্থানে স্থানে মহার্হ আসন ও দুগ্ধফেননিভ শয্যাসকল সন্নিবেশিত রহিয়াছে। কোন স্থানে নৃত্যগীত, কোন স্থানে বাদ্যোদ্যম, কোথাও বা জনগণ নানাবিধ মহোৎসব করিতেছে।
ভূপালগণ রমণীয় বেশভূষা সমাধানপূর্ব্বক তত্রত্য বিমান শ্রেণীতে সমাসীন হইলেন এবং পরস্পর স্পর্দ্ধাপূর্ব্বক সমাগত নৃপতিদিগকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। পৌরবৃন্দ ও জানপদগণ দ্রৌপদীদর্শনার্থ পরার্দ্ধ মঞ্চোপরি উপবেশন করিলেন। পাণ্ডবেরা সমাগত ব্রাহ্মণগণ সমভিব্যাহারে আসন পরিগ্রহপূর্ব্বক পাঞ্চাল রাজের ঐশ্বর্য্য সন্দর্শন করিতেন লাগিলেন।
অনন্তর রাজসভায় নৃত্যগীত আরম্ভ হইল। রত্নোপকরণ ও সুনিপুণ নর্তকগণের অভিনয়দ্বারা সভার শোভা দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। সভারম্ভের ষোড়শ দিবসে কৃতস্নানা দ্রৌপদী অপূর্ব্ব বেশভূষা পরিধানপূর্ব্বক বিচিত্র কাঞ্চনী মালা গ্রহণ করিয়া নৃপসমাজে প্রবেশ করিলেন। চন্দ্রবংশীয় পুরোহিত হুতাশনে যথাবিধি আহুতি প্রদানপূর্ব্বক অগ্নির তর্পণ ও ব্রাহ্মণ-গণের স্বস্তিবাচন করিলেন এবং তুর্য্যজীব দিগকে বাদ্যোদ্যম করিতে নিবারণ করিলেন। এইরূপে সেই প্রদেশ নিঃশব্দ হইলে ধৃষ্টদ্যুম্ন স্বীয় ভগিনী দ্রৌপদীকে লইয়া রঙ্গমধ্যে উপস্থিত হইলেন এবং ঘনঘোষণ-গভীরস্বরে অর্থবৎ মধুরবাক্যে কহিতে লাগিলেন। হে সমাগত নরেন্দ্রবর্গ! আপনারা শ্রবণ করুন। এই ধনুর্ব্বাণ ও লক্ষ্য উপস্থিত আছে। যিনি যন্ত্রের ছিদ্রদ্বারা পঞ্চশর নিক্ষেপ করিয়া লক্ষ্য পাতিত করিতে পারিবেন, মদীয় ভগিনী কৃষ্ণা কুলশীল রূপলাবণ্যসম্পন্ন সেই মহাত্মার ভার্য্যা হইবেন সন্দেহ নাই। দ্রুপদপুত্র সভামধ্যে এইরূপ প্রস্তাব করিয়া সমবেত ভূপতিগণের নাম, গোত্র ও কার্য্যাদি কীর্ত্তনপূর্ব্বক ভগিনীকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন।
দৃষ্টদ্যুম্ন কহিলেন, হে ভগিনি। দেখ দুর্য্যোধন, দুর্বিসহ, দুর্মুখ, দুষ্পধর্ষণ, বিবিংশতি, বিকর্ণ, সহ, দুঃশাসন যুযুৎসু, বায়ুবেগ, ভীমবেগবর, উগ্রায়ুধ, বলাকী, করকায়ুঃ, বিরোচন, সুকণ্ডল, চিত্রসেন, সুবর্চ্চাঃ কনকধ্বজ, নন্দক, তুহুণ্ড ও বিকট এবং অন্যান্য মহাবল পরাক্রান্ত ধার্তরাষ্ট্রেরা কর্ণ সমভিব্যাহারে তোমার নিমিত্ত সমাগত হইয়াছেন। গান্ধাররাজকুমার শকুনি, বৃষক ও বৃহদ্বল এবং মহাবীর অশ্বত্থামা ও ভোজরাজ অলঙ্কৃত হইয়া ত্বদর্থে আগমন করিয়াছেন। বৃহন্ত, মণিমান, দণ্ডধার, সহদেব, জয়ৎসেন, মেষসন্ধি, বিরাট ও তৎপুত্র শঙ্খ ও উত্তর, বার্দ্ধক্ষেমি, সুশর্মা, সেনাবিন্দু, সুকেতু ও তৎপুত্র সুনামা ও সুবর্চ্চাঃ, সুচিত্র, সুকুমার, বৃক, সত্যধৃতি, সূর্য্যধ্বজ, রোচমান, নীল, চিত্রায়ুধ, অংশুমান, শ্রোণিমান, চেকিতান, সমুদ্রসেনের পুত্র, প্রতাপবান্ চন্দ্রসেন, জলসন্ধ, বিদন্ত ও তৎপুত্র, দণ্ড, পৌণ্ড্রক, বাসুদেব, ভগদত্ত, কলিঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, পত্তনাধিপতি, মদ্ররাজ শল্য ও তৎপুত্র, রুক্মাঙ্গদ, রুক্মরথ, কৌরব্য সোমদত্ত এবং তাঁহার পুত্র ভূরি, ভূরিশ্রবাঃ, শল, সুদক্ষিণ, কাম্বোজ, পৌরব, দৃঢ়ধন্বা, বৃহদ্বল, সুষেণ, ঔশীনর, শিবি, পটচ্চর, নিহন্তা, করুষাধিপতি, সঙ্কর্ষণ, বাসুদেব, রৌক্মিণেয়, শাম্ব, চারুদেষ্ণ, প্রাদ্যুন্নি, গদ, অক্রুর, সাত্যকি, উদ্ধব, কৃতবর্মা, হার্দিকা, পৃথু, বিপৃথু, বিদূরথ, কঙ্ক, শঙ্কু, গবেষণ, আশাবহ, অনিরুদ্ধ, শমীক, সারিমেজয়, বাতপতি, ঝিল্লীপিণ্ডারক এবং উশীনর এই সকল যদুবংশীয় ও ভগীরথ, বৃহৎক্ষেত্র, সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথ, বৃহদ্রথ, বাহীক, শ্রুতায়ুঃ, উলুক, কৈতব, চিত্রাঙ্গদ, শুভাঙ্গদ, বৎসরাজ, কোশলাধিপতি, শিশুপাল, জরাসন্ধ, ইঁহারা এবং এতদ্ভিন্ন অন্যান্য নানা জনপদেশ্বরেরা তোমার নিমিত্ত সমাগত হইয়াছেন। ইঁহারা ত্বদীয় পাণিগ্রহণার্থ লক্ষ্যভেদ করিবেন; হে ভদ্রে! যিনি এই লক্ষ্যবিদ্ধ করিতে পারিবেন, তুমি তাঁহারই গলদেশে বরমাল্য প্রদান করিও।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, সেই সমস্ত বলবীর্য্যসম্পন্ন অস্ত্র-শিক্ষানিপুণ তরুণবয়স্ক নরেন্দ্রবর্গ বিচিত্র বেশভূষা সমাধান করিয়া অস্ত্র শস্ত্র ধারণপূর্ব্বক আগমন করিলেন। তাঁহারা রূপ, যৌবন, কুল, শীল ও ঐশ্বর্য্যমদে মত্ত হইয়া মদস্রাবী হৈমবত' মাতঙ্গযুথের ন্যায় ঈর্ষাকষায়িত লোচনে পরস্পর বদন নিরীক্ষণ করত স্পর্দ্ধা করিতে লাগিলেন এবং ত্রিভুবনললামভূতা কৃষ্ণা সন্দর্শনে কামমোহিত হইয়া "দ্রৌপদী আমারই হইবে” বলিয়া রাজাসন হইতে গাত্রোত্থান করিলেন। যেমন দেবগণ পৰ্ব্বত রাজপুত্রী উমাকে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, সমাগত সভাস্থ ভূপালগণ সেইরূপ দ্রৌপদীকে জিগীষা করিতে লাগিলেন। রঙ্গস্থ সমস্ত লোক কৃষ্ণার অনুপম রূপলাবণ্য সন্দর্শনে বিষম কন্দর্পবাণে নিপীড়িত হইয়া তদ্গতহৃদয়ে নিরন্তর কেবল তাঁহাকেই চিন্তা করিতে লাগিলেন। তাঁহারা দ্রুপদরাজকুমারীর নিমিত্ত আপন বন্ধুবান্ধবের প্রতিও ঈর্ষা প্রকাশ করিতে আরম্ভকরিলেন। অনন্তর রুদ্র, আদিত্য, বসুগণ, অশ্বিনীকুমার যুগল, সাধ্য, যম ও কুবের প্রভৃতি দেবগণ বিমানারোহণপূর্ব্বক রাজসভায় আগমন করিলেন। অসংখ্য দৈত্য, সুপর্ণ, মহোরগ, দেবর্ষি, গুহ্যক, চারণ ও বিশ্বাবসু, নারদ, পর্ব্বত প্রভৃতি ঋষি, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণ, সমাগত হইয়াছিলেন। বলভদ্র, জনার্দ্দন, বৃষ্ণিবংশীয় যদুশ্রেষ্ঠগণ কৃষ্ণের মতাবলম্বী হইয়া পাণ্ডবগণকে পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। যদুপ্রবীর কৃষ্ণ ভস্মাবৃত হুতাশনের ন্যায় সেই গজেন্দ্রাকার পঞ্চপাণ্ডবকে নিরীক্ষণ করিয়া কিয়ৎকাল চিন্তা করিলেন। পরে তিনি যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবের কথা বলদেবকে জানাইলেন। বলদেব তাঁহাদিগকে দেখিয়া প্রীতমনে কৃষ্ণের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। কিন্তু অন্যান্য রাজকুমারেরা দুরাশাগ্রস্ত হইয়া কৃষ্ণাতে মনঃপ্রাণ সমুদায় সমর্পণ করিয়াছিলেন, সুতরাং পাণ্ডবদিগকে দর্শন করা দূরে থাকুক, তাঁহারা ঈর্ষাকষায়িত ও রোষপরবশ হইয়া অধর দংশনপূর্ব্বক আরক্ত নয়নযুগল ইতস্ততঃ সঞ্চালন করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবেরাও দ্রৌপদীকে নয়নগোচর করিয়া সকলেই কন্দর্পবাণে অভিভূত হইলেন।
অনন্তর দেবর্ষি ও গন্ধর্ব্বগণে সমাকুল সুপর্ণ, নাগ, অসুর ও সিদ্ধগণকর্তৃক পরিসেবিত সেই সভাভবন রমণীয় গন্ধে সুবাসিত এবং বিকীর্য্যমাণ' দিব্য কুসুমসমূহের সুগন্ধে আমোদিত হইল। মহাস্বন-দুন্দুভিধ্বনিতে গগনমণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইল, চতুৰ্দ্দিক্ বিমানসম্বাধ এবং বেণু, বীণা ও পণবনিনাদে' পরিপুরিত হইল। কর্ণ, দুর্য্যোধন, শাল্ব, শল্য, দ্রৌণায়নি, ক্রাথ, সুনীথ, বক্র, কলিঙ্গ, বঙ্গাধিপ, পাণ্ড্য, পৌণ্ড্র, বিদেহরাজ ও যবনাধিপ প্রভৃতি অনেকানেক রাজতনয়েরা কিরীট, হার, অঙ্গদ ও চক্রবাল প্রভৃতি বিচিত্র অলঙ্কারে অলঙ্কৃত হইয়া স্ব স্ব বলবীর্য্য প্রদর্শন ও সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। কিন্তু সেই ভীষণ শরাসনে জ্যা সংযুক্ত করা দূরে থাকুক, কাৰ্ম্মক সজ্য করিব, এরূপ মনে করিতেও তাঁহারা সমর্থ হইলেন না। সুবিক্রান্ত নরেন্দ্রগণ ধনুঃস্পর্শমাত্র আহত ও ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের অঙ্গের আভরণ সকল বিস্রস্ত হইয়া পড়িল। তাঁহারা নিস্তেজ ও হতশ্বাস হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্রমে ক্রমে শান্তিভাব অবলম্বন করিলেন; কিরীট, হার, বলয়াঙ্গদ প্রভৃতি আভরণসকল অঙ্গ হইতে বিস্রস্ত হইয়া পড়িল এবং দ্রৌপদীলিপ্সা এককালে নিরস্ত হইয়া গেল।
সকল ধনুর্দ্ধরপ্রবর কর্ণ রাজগণের এইরূপ বৃথোদ্যম নিরীক্ষণ করিয়া সত্বরে ধনুঃ উত্তোলনপূর্ব্বক তাহাতে জ্যা সংযুক্ত করিয়া শরাসনে শরসন্ধান করিলেন। পাণ্ডুতনয়েরা কর্ণকে নয়নগোচর করিয়া মনে করিলেন, ইনিই লক্ষ্যভেদ করিয়া কন্যারত্ন লাভ করিবেন, সন্দেহ নাই। দ্রৌপদী কর্ণের ব্যবসায় দর্শনে মুক্তকণ্ঠে কহিলেন, আমি সূতপুত্রকে বরণ করিব না; এই কথা শ্রবণমাত্র কর্ণ সামর্ষ হাস্যে সূর্য্য সন্দর্শনপূর্ব্বক শরাসন পরিত্যাগ করিলেন।
এইরূপে সমুদায় ক্ষত্রিয়বর্গ বিফলপ্রযত্ন হইয়া প্রস্থান করিলে পর, চেদিদেশাধিপতি শিশুপাল শরাসনে শরসন্ধান করিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু অবশেষে ভগ্নজানু হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন। মহাবীর্য্য জরাসন্ধও ঐ প্রকারে ধনুরাঘাতে ভূতলে পতিত হইলেন, পরে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক আপনরাজ্যে প্রস্থান করিলেন। মদ্রাধিপতি শল্যও সেই ধনুকে জ্যা রোপণ করিতে গিয়া জানু পাতিয়া ভূতলে পতিত হইলেন। এইরূপে সভাস্থ সমস্ত নরাধিপগণ ক্রমে ক্রমে পরাজুখ হইলে কুন্তীনন্দন অর্জুন সেই শরাসনে জ্যা রোপণ ও শরসন্ধানের মানস করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ। সমাগত সমস্ত মহীপাল এইরূপে পরাজুখ হইলে অর্জুন উদায়ুধ হইয়া বিপ্র-মণ্ডলীমধ্য হইতে গাত্রোত্থান করিলেন। ব্রাহ্মণেরা পার্থকে কার্মুকাভিমুখে প্রস্থিত দেখিয়া অজিন বিধূননপূর্ব্বক চীৎকার করিয়া উঠিলেন। কেহ কেহ বিমনাঃ হইয়া রহিলেন, কেহ হর্ষিত হইলেন এবং কেহ কেহ বা পরস্পর মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন যে, যাহাতে ধনুর্ব্বেদ পারদর্শী শল্যপ্রমুখ সুবিখ্যাত ক্ষত্রিয়সকল অসমর্থ হইয়া প্রস্থান করিলেন, একজন হীনবল অকৃতাস্ত্র সামান্য ব্রাহ্মণকুমার তদ্বিষয়ে কিরূপে কৃতকার্য্য হইবে? এই ব্যক্তি গর্বিত হইয়াই হউক, অথবা কন্যাগ্রহণহর্ষে মোহিত হইয়াই হউক, কিংবা বিপ্রস্বভাবসুলভ প্রলোভচপলতাপ্রযুক্তই হউক, পূর্ব্বাপর পর্যালোচনা না করিয়া এই দুষ্কর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতেছে। যদি কৃতকার্য্য হইতে না পারে, তাহা হইলে সমস্ত রাজগণের নিকট ব্রাহ্মণদিগকে যৎপরোনাস্তি উপহাসাম্পদ হইতে হইবে, সন্দেহ নাই; অতএব ইহাকে গমন করিতে নিবারণ কর। কেহ কেহ কহিলেন, আমরা উপহাসাস্পদ হইব না, আমাদিগের কোনপ্রকার লাঘবও হইবে না এবং রাজা-দিগেরও দ্বেষ্য হইব না। কেহ কেহ বলিলেন, এই পীনস্কন্ধ', দীর্ঘবাহু, প্রশান্ত, গম্ভীরাকৃতি, গজেন্দ্রবিক্রম ও মৃগেন্দ্রগতি সুরূপ যুবার আকার ও অবিচলিত অধ্যবসায়দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে যে, ইনি কখনও বিফলপ্রযত্ন হইবেন না। ইঁহার মহীয়সী উৎসাহশীলতা লক্ষিত হইতেছে। যে ব্যক্তি অক্ষম, সে কখন কোন কার্য্যে স্বয়ং প্রবৃত্ত হয় না। ফলতঃ ব্রাহ্মণের অসাধ্য কার্য্য ভূমণ্ডলে দৃষ্টিগোচর হয় না। অনাহার, বাযাহার, ফলাহার ও দৃঢ়ব্রত, তন্নিবন্ধন ব্রাহ্মণ দেখিতে দুর্ব্বল হইলেও তাঁহাদিগের অন্তঃসার ও তেজের হ্রাস হয় না। ব্রাহ্মণ সৎকর্মই করুন, অথবা অসৎ কৰ্ম্মই করুন, তিনি কদাপি অবমানিত হয়েন না; কারণ সুখজনক ও দুঃখজনক, সামান্য ও মহৎ সমুদায় কার্য্যই ব্রাহ্মণকর্তৃক সম্পাদিত হইয়া থাকে। দেখ, জামদগ্ন্য পৃথিবীস্থ সমস্ত ক্ষত্রিয়কে পরাভব করিয়াছিলেন, অগস্ত্য স্বীয় ব্রহ্মতেজঃপ্রভাবে অগাধ জলনিধি পান করিয়াছিলেন, অতএব সকলে এই স্থানে অবস্থান করিয়া দেখ, এই ব্রাহ্মণতনয় কাম্মুকে জ্যা রোপণ করিতেছে। এই কথা শুনিয়া সকলে প্রস্তাবিত বিষয়ে সম্মত হইলেন।
অর্জুন শরাসনসমীপে অচলবৎ দণ্ডায়মান হইয়া ব্রাহ্মণগণের কথোপকথন শ্রবণ করিলেন। অনন্তর বরপ্রদ মহাদেবকে প্রণামপূর্ব্বক সেই কাৰ্ম্মক প্রদক্ষিণ করিলেন এবং কৃষ্ণকে স্মরণ করিয়া শরাসন গ্রহণ করিলেন। শিশুপাল, সুনীথ, রাধেয়, দুর্য্যোধন, শল্য ও শাল্ব প্রভৃতি ধনুর্ব্বেদপারগ নৃসিংহ-সকল দৃঢ়প্রযত্নেও যে ধনুঃ সজ্য করিতে পারেন নাই, অর্জুন অবলীলাক্রমে নিমেষমধ্যে সেই শরাসনে জ্যা রোপণপূর্ব্বক পাঁচটি শর গ্রহণ করিলেন; পরে ছিদ্রদ্বারা সেই অতিকষ্টবেধ্য লক্ষ্য বিদ্ধ ও ভূতলে পাতিত করিলেন। অনন্তর অন্তরীক্ষে ও সভামধ্যে মহান্ কোলাহল হইতে লাগিল। দেবতারা অর্জুনের মস্তকোপরি পুষ্পবর্ষণ করিতে লাগিলেন। সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণেরা স্ব স্ব বসন বিধূননপূর্ব্বক' অলক্ষিত হইয়া মহোল্লাস প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং নভোমণ্ডল হইতে চতুৰ্দ্দিকে পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল। বাদ্যকরেরা শতাঙ্গ তূর্য্যবাদন করিতে লাগিল এবং সুকণ্ঠ সূত ও মাগধগণ স্তুতি পাঠ করিতে আরম্ভ করিল।
দ্রুপদরাজ পার্থকে নয়নগোচর করিয়া সাতিশয় প্রীত হইলেন এবং সৈন্যসামন্ত সমভিব্যাহারে তদীয় সহায়তা করিবার মানস করিলেন। অর্জুনের বিজয়শব্দ সমন্তাৎ প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিলে ধাৰ্ম্মিকাগ্রণী যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেবের সহিত সত্বরে আবাসে প্রত্যাগমন করিলেন; কৃষ্ণা লক্ষ্য বিদ্ধ হইয়াছে দেখিয়া এবং শত্রুপ্রতিম পার্থকে নয়নগোচর করিয়া সহর্ষে মাল্যদান ও শুভ্রবসন গ্রহণপূর্ব্বক কুন্তীসুতসমীপে গমন করিলেন। অচিন্ত্যকৰ্ম্মা পার্থ বিজয়লাভ ও দ্রৌপদীদত্ত মালা গ্রহণপূর্ব্বক দ্বিজাতিগণ-পরিপূজ্যমান হইয়া পত্নী-সমভিব্যাহারে রঙ্গ হইতে বহির্গত হইলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, রাজা সেই ব্রাহ্মণকে কন্যাদান করিবার অভিলাষ করিলে ভূপতিগণ সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া পরস্পরের বদন নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। দ্রুপদরাজ সমাগত রাজমণ্ডলকে তৃণতুল্য জ্ঞান করিয়া বরবর্ণিনী দ্রৌপদীকে বিপ্রসাৎ করিবার বাসনা করিয়াছেন। ইনি সমস্ত নরাধিপগণকে আহ্বান ও যথাবিধি সৎকারপূর্ব্বক উত্তমরূপ ভোজন করাইয়া পরিশেষে তাদৃশ সম্মান রক্ষা করিলেন না। বস্তুতঃ বৃক্ষ রোপণ করিয়া ফলকালে উম্মলিত করিলেন। অতএব সমধিক গুণসম্পন্ন হইলেও কোনক্রমে ইনি সম্মান-যোগ্য হইতে পারেন না, প্রত্যুত উক্ত অপরাধে এই দুরাত্মা নৃপাধমকে সপুত্র বিনষ্ট করিব। কি আশ্চর্য্য! দেবতুল্য নৃপ-সমূহের মধ্যে এক ব্যক্তিকেও আপন কন্যার অনুরূপ বিবেচনা করিলেন না, স্বয়ংবরে ব্রাহ্মণের অধিকার নাই, কেবল ক্ষত্রিয়েরই স্বয়ংবরবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। আর যদি এই কন্যা আমাদিগের মধ্যে কাহাকেও মনোনীত না করে, তাহা হইলে উহাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিয়া আমরা স্ব স্ব রাজ্যে প্রতিগমন করিব।
যদি ব্রাহ্মণ লোভাকৃষ্ট হইয়া অথবা নৈসর্গিক চপলতা-প্রযুক্ত রাজাদিগের অনভিমত কার্য্য করেন, তথাপি তিনি অবধ্য। আমরা ব্রাহ্মণের উপকারার্থে রাজ্য, ধন, সম্পত্তি, পুত্র, পৌত্র এবং জীবিত পর্য্যন্তও পরিত্যাগ করিতে পারি। রাজর্ষিগণ অবমান ভয়ে স্বধর্ম রক্ষার নিমিত্ত, আর অন্য স্বয়ংবরে এইরূপ গতি না হয়, এই অভিপ্রায়ে দ্রুপদের প্রাণ সংহার করিবার নিমিত্ত হৃষ্টচিত্তে আয়ুধ গ্রহণপূর্ব্বক ধাবমান হইলেন। সেই সশস্ত্র ক্রোধান্ধ অসংখ্য রাজশাদুল বেগে ধাবমান হইতেছেন দেখিয়া, দ্রুপদরাজ ভয়ে ব্রাহ্মণদিগের শরণাগত হইলেন। অর্জুন ও ভীমসেন মদস্রাবী গজেন্দ্রের ন্যায় বেগাভিদ্রুত রাজেন্দ্রদিগকে নিরীক্ষণ করিয়া ধনুর্ব্বাণ গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহাদিগের সম্মুখীন হইলেন। অমর্য প্রদীপ্ত মহীপালেরাও ভীমার্জুন জিঘাংসু' হইয়া অস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হইলেন।
অনন্তর অবিচলিত অধ্যবসায়সহকারে মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন হস্তদ্বারা এক মহামহীরুহ উৎপাটনপূর্ব্বক নিষ্পত্র করিলেন এবং লোকান্তক যম যেমন ভীষণ দণ্ড গ্রহণ করেন, তদ্রূপ রিপুনিসূদন ভীম সেই বৃক্ষ গ্রহণ করিয়া অর্জুনের সমীপে দণ্ডায়মান হইলেন। লোকাতীত ধীশক্তিসম্পন্ন অচিন্ত্য-কৰ্ম্মা অর্জুন ভ্রাতার পরাক্রম দর্শনে চমৎকৃত হইয়া ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক শরাসন গ্রহণ করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। এই সমস্ত পর্যবেক্ষণ করিয়া মহানুভব কৃষ্ণ মহাবীর্য্য বলদেবকে কহিলেন, মহাশয়। যিনি এই বিস্তীর্ণ শরাসন অনায়াসে আকর্ষণ করিতেছেন, ইনিই, অর্জুন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। আর যিনি বাহুবলে বৃক্ষ উৎপাটনপূর্ব্বক নির্ভয়ে রাজমণ্ডলে প্রবিষ্ট হইতেছেন, ইঁহার নাম বৃকোদর। ভীম ব্যতিরেকে যুদ্ধস্থলে ঈদৃশ পরাক্রম প্রদর্শন করিতে পারে, পৃথিবীতে এমন বীর কে আছে? এবং যে কমললোচন, গৌরবর্ণ পুরুষ অতি বিনীতভাবে অগ্রে অগ্রে গমন করিতেছেন, ইনিই ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির। আর কুমার-তুল্য সুকুমার এই কুমারযুগল দেখিয়া বোধ করিতেছে, ইহারাই নকুল ও সহদেব হইবে। শুনিয়াছিলাম যে পৃথা পুত্রগণ সমভি-ব্যাহারে সেই ভয়াবহ জতুগৃহদাহ হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছেন, তাহা যথার্থ বটে। এই সমস্ত শ্রবণান্তর নির্জলজলদসন্নিভ। বলদেব কৃষ্ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বাসুদেব। পিতৃম্বসা পৃথা এবং পাণ্ডবদিগকে বিপদ বিমুক্ত শ্রবণ করিয়া অদ্য পরম প্রীত হইলাম।
বৈশম্পায়ন কহিলেন; দ্বিজর্যভ'সকল অজিন ও কমণ্ডলু বিধুননপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, তোমাদিগের ভয় নাই, আমরা শত্রুর সহিত যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত আছি; অর্জুন ঈষৎ হাস্য করিয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, আপনারা পার্শ্বে থাকিয়া দর্শন করুন। যেমন মন্ত্রদ্বারা বিষবৈদ্য আশীবিষ নিবারণ করে, তদ্রূপ আমিও সূচ্যগ্র বিশিখশত' দ্বারা ইহাদিগকে নিবারণ করিতেছি। এই কথা বলিয়া অর্জুন শুল্কলব্ধ শরাশন আকর্ষণ করিয়া ভীমের সহিত পর্ব্বতের ন্যায় দৃঢ়রূপে দণ্ডায়মান হইলেন। অনন্তর নির্ভীক ভীমার্জুন যুদ্ধদুৰ্ম্মদ কর্ণপ্রমুখ ক্ষত্রিয়বর্গকে নিরীক্ষণ করিয়া দ্রুতবেগে তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিলেন। রণক্ষেত্রে দ্বিজাতিরও বিনাশ দৃষ্ট হইয়া থাকে, এই বলিয়া যুযুৎসু রাজগণ দ্রুতবেগে ব্রাহ্মণগণের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং মহাতেজা কর্ণ অর্জুনের প্রতি গমন করিলেন। হস্তী হস্তিনীর নিমিত্ত যুদ্ধার্থী হইয়া মহাবেগে যেমন প্রতিপক্ষ গজের প্রতি ধাবমান হয়, সেইরূপ মদ্রেশ্বর শল্য ভীমকে আক্রমণ করিলেন। পরে দুর্য্যোধনাদি সকলে ব্রাহ্মণদিগের সহিত সঙ্গত হইয়া ধীরে ধীরে সমরসাগরে অবতীর্ণ হইলেন।
অনন্তর অর্জুন প্রকাণ্ড শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক শত শত নিশিত শরদ্বারা কর্ণকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। রাধেয় সুতীক্ষ্ণ বিশিখশত প্রহারে বিমোহিত হইয়া অতি কষ্টে অর্জুনের অনুধাবন করিলেন। জিগীষাপরবশ বীরযুগলের ঘোরতর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। পরস্পর পরস্পরকে বীরত্ব প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, "তুমি যাহা করিয়াছ, তাহার প্রতিফল দিতেছি এবং এই মুহূর্তেই আমার বাহুবল প্রদর্শন করিতেছি।” কর্ণ অর্জুনের অনুপম ভুজবীর্য্য দর্শনে ক্রোধান্ধ হইয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তদীয় সেনাগণ অর্জুন প্রযুক্ত তীব্রজব' বাণ বর্ষণ বিফল করিয়া উচ্চৈঃস্বরে স্বপ্রভুর জয়শব্দ উচ্চারণ করিতে লাগিল। কর্ণ কহিলেন, হে বিপ্রবর! তোমার ভুজবীর্য্য অস্ত্রশিক্ষা ও অক্লিষ্টতা দর্শনে আমি পরম প্রীত হইলাম। হে দ্বিজসত্তম! আমার বোধ হইতেছে, তুমি মূর্ত্তিমান্ ধনুর্ব্বেদ অথবা রাম, সূর্য্য বা সাক্ষাৎ ভগবান্ বিষ্ণু হইবে। আত্মপ্রচ্ছাদনের নিমিত্ত বিপ্ররূপ ধারণপূর্ব্বক আমার সহিত যুদ্ধ করিতেছে। আমি ক্রুদ্ধ হইলে সাক্ষাৎ ইন্দ্র বা পাণ্ডুতনয় কিরীটী ব্যতিরেকে অন্য কেহই আমার সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ হয় না।
অর্জুন প্রত্যুত্তর করিলেন, হে কর্ণ। আমি ধনুর্ব্বেদ নহি বা আমি প্রতাপশালী রামও নহি; আমি ব্রাহ্মণ, গুরুর উপদেশে ব্রাহ্মা ও পৌরন্দর অস্ত্রে সুশিক্ষিত হইয়াছি। অদ্য তোমাকে পরাজয় করিবার নিমিত্ত রণক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়াছি। রাধেয় এই কথা শ্রবণ করিয়া অর্জুনের দুর্জয় ব্রাহ্মতেজঃ স্বীকার-পূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ যুদ্ধে পরাজুখ হইলেন। অপর রণপ্রদেশে বলবিদ্যাসম্পন্ন যুদ্ধবিশারদ মত্ত গজেন্দ্রাকার শল্য ও বৃকোদর পরস্পর সমাহ্বানপূর্ব্বক মুষ্ট্যাঘাত ও জানুপ্রহাবুদ্বারা ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। তাঁহারা উভয়েই প্রচণ্ডবেগে উভয়কে আকর্ষণ ও পাষাণপাতসদৃশ মুষ্ট্যাঘাত করিতে লাগিলেন। প্রহারবেগে রণস্থলে ঘোরতর চটচটা শব্দ উঠিল। তাঁহারা দুইজনে ক্ষণকাল তুমুল সংগ্রাম করিলেন। পরে কুরুশ্রেষ্ঠ ভীম বাহুদ্বারা শল্যকে উৎক্ষিপ্ত ও ভূতলে পাতিত করিলেন, তদ্দর্শনে দ্বিজাতিমণ্ডল হাস্য করিতে লাগিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! ভীমসেন শল্যকে ভূতলশায়ী করিয়াও তাঁহার প্রাণ বিনাশ করিলেন না। শল্য নিপতিত ও কর্ণ শঙ্কিত হইলে পর সমস্ত রাজগণ অত্যন্ত ভীত হইয়া বৃকোদরকে পরিবেষ্টন করিলেন এবং সকলে একবাক্যে ভীমার্জুনকে সাধুবাদ করত কহিলেন, এই ব্রাহ্মণকুমারেরা কাহার পত্র, ইহাদিগের বাস কোথায়, তৎসমুদায় পরিজ্ঞাত হওয়া উচিত। মহাবল পরশুরাম, দ্রোণ ও পাণ্ডুতনয় কিরীটী ব্যতিরেকে, কর্ণের সহিত যুদ্ধ করে এমন লোক ভুর্লোকে কে আছে? দেবকীসুত কৃষ্ণ এবং কৃপাচার্য্য ব্যতিরেকে পৃথিবীতে এমন ব্যক্তি লক্ষ্য হয় না যে, দুর্য্যোধনের সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ হয়। বলদেব, পাণ্ডব বৃকোদর ও মহাবলপরাক্রান্ত দুর্য্যোধন ভিন্ন অন্য কোন বীর মদ্রাধিপতি শল্যকে সমরশায়ী করিতে পারে? ব্রাহ্মণেরা অপরাধী হইলেও তাঁহাদিগকে ক্ষমা করা উচিত, অতএব ব্রাহ্মণের সহিত আর যুদ্ধে প্রয়োজন নাই। তবে যদি উহারা পুনর্ব্বার যুদ্ধার্থী হয়েন, তাহা হইলে আমরা হৃষ্টচিত্তে যুদ্ধ করিব সন্দেহ নাই। কৃষ্ণ ক্ষিতীশ্বরদিগের এবম্প্রকার কথোপকথন শ্রবণ এবং ভীমের সেই অদ্ভুত পরাক্রম সন্দর্শন করিয়া তাঁহাদিগকে কুন্তীসুত স্থির নিশ্চয় করিলেন। পরে রাজগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক বিনয় বচনে কহিলেন, হে ভূপালবৃন্দ। ইঁহারাই রাজকুমারীকে ধৰ্ম্মতঃ লাভকরিয়াছেন, তোমরা ক্ষান্ত হও, আর যুদ্ধে প্রয়োজন নাই।
বিস্ময়াবিষ্ট রাজর্ষিগণ কৃষ্ণের অনুনয়ে সংগ্রামে বিরত হইয়া স্ব স্ব গৃহে প্রস্থান করিলেন। "অদ্য রঙ্গস্থলে ব্রাহ্মণ জয়ী হইয়াছেন এবং পাঞ্চালী ব্রাহ্মণকর্তৃক বিবাহিতা হইলেন" এই কথা বলিতে বলিতে সমাগত জনসমূহ প্রস্থান করিল। রৌরবাজিনধারী ভীম ও অর্জুন বিপ্রমধ্যে প্রচ্ছন্ন হইয়া অতি সাবধানে গমন করিলেন। তাঁহারা শত্রুহস্ত হইতে বিমুক্ত হইয়া এবং দ্রৌপদীকে লাভ করিয়া মেঘাবরণনির্মুক্ত পূর্ণিমা-শশধরের ন্যায় ও প্রদীপ্ত সূর্য্যদেবের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। এদিকে পুত্রবৎসলা পৃথা, পুত্রেরা ভিক্ষার্থে গমন করিয়া কি নিমিত্ত অধুনাপি' প্রত্যাগত হইল না ভাবিয়া কতই অনিষ্টাশঙ্কা করিতে লাগিলেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন, হয় ত দুরাত্মা ধার্তরাষ্ট্রেরা তাহাদিগকে নিহত করিয়াছে, অথবা নিদারুণ শত্রু মায়াবী নিশাচরগণ হইতে কোনরূপ অনিষ্টপাত হইয়া থাকিবে; তাহাদিগের দুর্ভেদ্য মায়াজালে মহাত্মা ব্যাসদেবের মতেরও বৈপরীত্য জন্মিয়া থাকে। পৃথা, পুত্রস্নেহে আবৃতা হইয়া এবম্প্রকার চিন্তা করিতেছেন, আকাশ-মণ্ডল ঘনাবলীতে আচ্ছাদিত এবং সমস্ত লোক সুষুপ্তপ্রায় হইয়াছে, এমন সময়ে অর্জুন মেঘোপরুদ্ধ অপরাহুদিবাকরের ন্যায় ব্রাহ্মণগণে পরিবৃত হইয়া ভার্গবালয়ে প্রবেশ করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহানুভব ভীমার্জুন ভার্গব কর্মশালায় উপস্থিত হইয়া পরম প্রীতমনে পৃথাকে নিবেদন করিলেন, মাতঃ! অদ্য এক রমণীয়পদার্থ ভিক্ষালব্ধ হইয়াছে। পৃথা গৃহাভ্যন্তরে ছিলেন সবিশেষ পর্যবেক্ষণ না করিয়াই পুত্রদিগকে কহিলেন, বৎস! যাহা প্রাপ্ত হইয়াছ, সকলে সমবেত হইয়া ভোগ কর। অনন্তর কৃষ্ণাকে নয়নগোচর করিয়া কহিলেন, আমি কি কুকর্ম করিলাম। পরে ধর্মভয়ে একান্ত চিন্তাকুলা হইয়া পরমপ্রীত যাজ্ঞসেনীর হস্ত গ্রহণপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, পুত্র! ইনি রাজা দ্রুপদের নন্দিনী, তোমার অনুজদ্বয় ইহাকে আনিয়া ভিক্ষা বলিয়া আমার নিকটে উপস্থিত করে, আমিও অনবধানতাপ্রযুক্ত আজ্ঞা করিয়াছি, তোমরা সকলে সমবেত হইয়া ভোগ কর। অতএব হে কুরুশ্রেষ্ঠ! এক্ষণে যাহাতে আমার বাক্য মিথ্যা না হয় এবং অধৰ্ম্ম দ্রুপদকুমারীকে স্পর্শ না করে; এমন উপায় বিধান কর। মতিমান কুরুপ্রবীর জননীর এইরূপ উক্তি শ্রবণে ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কুন্তীকে আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক অর্জুনকে কহিলেন, হে ফাল্গুন। যাজ্ঞসেনী তোমার জয়লব্ধ বস্তু, তোমাতেই ইনি শোভা পাইবেন, তুমি অগ্নিসাক্ষী করিয়া যথাবিধানে ইঁহার পাণিগ্রহণ কর।
অর্জুন কহিলেন, নরনাথ। আমাকে অধর্মে লিপ্ত করিবেন না, আমি সাধুবিগর্হিত ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইব না। আপনি জ্যেষ্ঠ, প্রথমতঃ আপনার বিবাহ করা কর্ত্তব্য; অনন্তর মহাবাহু ভীমের তৎপরে আমার তদনন্তর নকুলের পরিশেষে তরস্বী' সহদেবের বিবাহ করা উচিত। বৃকোদর, আমি, নকুল, সহদেব এবং এই রাজকুমারী আমরা সকলেই আপনার নিযোজ্য। অতএব যাহা যশস্কর ও ধর্মকর হয়, সবিশেষ পর্যালোচনাপূর্ব্বক আপনি সেই কর্ম্মের অনুষ্ঠান করুন এবং যাহাতে পাঞ্চালেশ্বরের হিতসাধন হইতে পারে, আমাদিগকে তদনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করুন। আপনি নিশ্চয় জানিবেন, আমরা সকলেই আপনার একান্ত বশংবদ। ভক্তিস্নেহ সহকৃত অর্জুনের বাক্য শ্রবণ করিয়া পাণ্ডুতনয়েরা দ্রৌপদীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তাঁহারা যশম্বিনী কৃষ্ণাকে নয়নগোচর করিয়া পরস্পর বদন নিরীক্ষণ করত উপবিষ্ট ও তদ্গতচিত্ত হইলেন। তাঁহারা দ্রৌপদীর রূপলাবণ্যে এরূপ মোহিত হইয়াছিলেন যে, তাহাদের ইন্দ্রিয়গ্রাম প্রমথিত করিয়া অনঙ্গবিকার' প্রাদুর্ভূত হইল। বোধ হয়, বিধাতা সকল নারী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট করিবার আশয়ে পাঞ্চালীর তাদৃশ কমনীয় রূপ লাবণ্যের নির্মাণ করিয়াছিলেন, নতুবা তাহার দর্শনমাত্রেই কেন সকল প্রাণীর মনোহরণ হইবে?
যুধিষ্ঠির অনুজগণের আকার ও মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া দ্বৈপায়নের বাক্যসমুদায় স্মরণ করিলেন এবং ভেদভয়ে ভীত হইয়া অনুজদিগকে নির্জনে লইয়া কহিলেন, দ্রৌপদী আমাদিগের সকলেরই ভার্য্যা হইবেন। মহানুভব ভীমাদি জ্যেষ্ঠের বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে সেই বিষয়েরই আন্দোলন করিতে লাগিলেন। বৃষ্ণিপ্রবীর কৃষ্ণ বলদেব-সমভিব্যাহারে ভার্গবকর্মশালায় গমন করিলেন এবং দেখিলেন যে, অজাতশত্রু, অগ্নিতুল্য ভ্রাতৃগণে পরিবেষ্টিত হইয়া তথায় উপবিষ্ট রহিয়াছেন।
অনন্তর বাসুদেব, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের নিকট অভিগমন ও চরণ বন্দনপূর্ব্বক আপনার পরিচয় প্রদান করিলেন; মহাবল বলদেবও ঐরূপ আত্মপরিচয় প্রদান করিলে পর পাণ্ডবেরা আনন্দ সাগরে নিমগ্ন হইলেন। তদনন্তর কৃষ্ণ ও বলদেব পিতৃম্বসা কুন্তীর চরণে প্রণাম করিলেন। অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে সাদর সম্ভাষণ ও কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসাপূর্ব্বক কহিলেন; হে বাসুদেব। আমরা গোপনে এস্থানে বাস করিতেছি, তুমি কিরূপে জানিতে পারিলে? কৃষ্ণ হাস্য করিয়া কহিলেন, রাজন। অগ্নি প্রচ্ছন্ন হইলেও অনায়াসে পরিজ্ঞাত হয়; পাণ্ডব ব্যতীত মনুষ্যলোকে অন্য কোন্ ব্যক্তি ঐরূপ বিক্রম প্রদর্শন করিতে পারে? মহারাজ! ভাগ্যবলে আপনারা সেই ভয়ঙ্কর পাবক হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছেন এবং আমাদিগেরই অদৃষ্টফলে দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্রতনয় ও তদীয় অমাত্যের দুরভিসন্ধি সিদ্ধ হইতে পারে নাই। এক্ষণে আপনাদিগের হতপ্রায় মঙ্গল পুনর্ব্বার সমুদ্ভূত হউক, ইন্ধনযুক্ত হুতাশনের ন্যায় উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধিলাভকরুন, প্রার্থনা করি, পার্থিবগণ যেন আপনাদিগের অজ্ঞাতবাস জানিতে না পারেন। অনুমতি করুন, অধুনা শিবিরে গমন করি। অনন্তর পাণ্ডবকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া বাসুদেব, বলদেব-সমভিব্যাহারে স্কন্ধাবারে প্রস্থান করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাঞ্চালাত্মজ ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীমার্জুনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ভার্গবনিকেতনে প্রবেশ করিলেন এবং সকলের অজ্ঞাতসারে অতি নিভৃত প্রদেশে বিলীন হইয়া রহিলেন। তৎসহচর পুরুষেরা ইতস্ততঃ গুপ্তভাবে রহিল। সায়ংকাল উপস্থিত হইলে উদার প্রকৃতি ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব ভিক্ষা করিয়া প্রত্যাগমনপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করিলেন।
অনন্তর বদান্যা কুস্তী দ্রৌপদীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্রে! তুমি ইহার অগ্রভাগ লইয়া দেবতাদিগকে বলি ও ব্রাহ্মণদিগকে ভিক্ষা এবং উপস্থিত অন্নাকাঙ্ক্ষীদিগকে প্রদান কর। অনন্তর অবশিষ্টাংশ দ্বিধা বিভক্ত করিয়া একার্দ্ধ ছয় অংশ কর একার্দ্ধ নাগেন্দ্রবিক্রম মহাবীর ভীমকে প্রদান কর। ভীম চিরকাল অধিক ভোজন করিয়া থাকে। রাজপুত্রী দ্রৌপদী সাধুবাদ প্রদানপূর্ব্বক কুন্তীর আদেশ প্রতিপালন করিলে সকলে পরম-সুখে ভোজন করিলেন। ভোজনান্তে নকুল ও সহদেব ভূমিতলে কুশশয্যা প্রস্তুত করিলে পর স্ব স্ব অজিন বিস্তীর্ণ করিয়া দক্ষিণ-শিরাঃ হইয়া সকলে শয়ন করিলেন। কুন্তী তাঁহাদিগের শিরো-ভাগে শয়ান হইলেন এবং দ্রৌপদী তাঁহাদিগের পদতলে শয়ন করিলেন। দ্রৌপদী পাণ্ডবগণ সমভিব্যাহারে ভূমি শয্যায় শয়ান ও তাঁহাদিগের চরণোপাধান'ভূত হইয়াও কিঞ্চিন্মাত্র দুঃখিতা হইলেন না এবং তাঁহাদিগের প্রতি কোনরূপ অসম্মান প্রদর্শনও করিলেন না। এইরূপে কুশশয্যায় শয়ন করিয়া সেই বীর পুরুষেরা যুদ্ধ ও সেনাসম্পর্কীয় নানা কথাপ্রসঙ্গে ত্রিযামা অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। তাঁহারা বিবিধ প্রকার অস্ত্র, খড়া, গদা, পরশ্বধ, গজ ও রথ প্রভৃতির বিষয় বর্ণন করিতে লাগিলেন। পাঞ্চালরাজনন্দন তাঁহাদিগের সমুদায় কথোপকথন শ্রবণ করিলেন এবং তাঁহার সঙ্গীলোকেরা কৃষ্ণাকে তদবস্থ দর্শন করিলেন। রাজকুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁহাদিগের কথিত বিভাবরী-বৃত্তান্ত সমস্ত দ্রুপদরাজকে নিবেদন করিবার নিমিত্ত সত্বর গমন করিলেন। দ্রুপদরাজ পাণ্ডবদিগকে সবিশেষ চিনিতে না পারিয়া সাতিশয় বিষণ্ণ হইয়া রহিয়াছেন, এমন সময় ধৃষ্টদ্যুম্নকে সমাগত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন পুত্র! দ্রৌপদী কাহার সহিত কোথায় গমন করিলেন? তিনি কি কোন হীনকুলোদ্ভব শূদ্র না কোন করদ বৈশ্যের হস্তগত হইলেন? আমার মস্তকে ত পঙ্কদিগ্ধ'চরণ অর্পিত হয় নাই? সুললিতা কুসুমমালা কি শ্মশানে পতিত হইল? কোন সবর্ণ, কি কোন উত্তমবর্ণ পুরুষ দ্রৌপদীকে হরণ করিলেন? আমার মস্তকে কে বামচরণ অর্পণ করিল? অথবা সৌভাগ্যক্রমে দ্রৌপদী নরোত্তম পার্থের সহিত সঙ্গত হইয়া আমাদিগের প্রীতিবন্ধন করিলেন? হে মহানুভব! তুমি যথার্থ করিয়া বল কে আমার কন্যাকে গ্রহণ করিয়াছে? যথার্থই কি পার্থ শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক লক্ষ্যভেদ করিয়াছেন?
