| আদিবংশাবতরণিকা | |
| সম্ভব পর্ব্বাধ্যায় |
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! ভৃগুবংশ বর্ণন প্রভৃতি অতি রমণীয় উপাখ্যান সকল কীর্ত্তন করিয়া তুমি আমাদিগকে পরম সন্তুষ্ট করিলে, এক্ষণে সেই অতি বিস্তীর্ণ সর্পযজ্ঞে দৈনন্দিন কৰ্ম্ম সমাধানানন্তর সদস্যমণ্ডলী প্রসঙ্গক্রমে যে সমস্ত বিচিত্র কথা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহা বর্ণনা করিয়া আমা-দিগকে চরিতার্থ কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সর্পসত্রে দৈনন্দিন কর্মানুষ্ঠানের মধ্যাবকাশে দ্বিজগণ বেদগান করিতেন, তৎপরে মহর্ষি ব্যাসদেব মহাভারতীয় উপাখ্যান শ্রবণ করাইতেন। শৌনক কহিলেন, ভগবান্ বাদরায়ণি রাজা জনমেজয় কর্তৃক প্রার্থিত হইয়া পাণ্ডবদিগের গুণগানস্বরূপ মহাভারত নামে যে ইতিহাস কীর্ত্তন করেন, আমি তাহা শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি। হে সূতপুত্র! তোমার মুখে যে সকল মনোহর ইতিবৃত্ত শ্রবণ করিলাম, তাহাতেও আমার অন্তঃকরণ পরিতৃপ্ত হইতেছে না; অতএব সেই বিশুদ্ধাত্মা মহর্ষির মনঃ-সাগর সমুদ্ভূত অমৃত-নির্বিশেষ মহাভারতীয় কথা কীর্ত্তন কর। তখন উগ্রশ্রবাঃ ঋষিপ্রশ্নে সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে মুনিবর! কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত সেই অতি মহৎ মহাভারতীয় কথা প্রথমাবধি কীর্ত্তন করিতেছি। উহা বর্ণনা করিতে আমারও অতিশয় কৌতুক হইতেছে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, যিনি যমুনাদ্বীপে শক্তিপুত্র পরাশরের ঔরসে অবিবাহিতা কালীর (সত্যবতীর) গর্তে জন্মগ্রহণ করেন, যিনি জাতমাত্রে যাগক্রিয়া দ্বারা আপনার দেহপুষ্টি এবং নিখিল বেদ, বেদাঙ্গ ও ইতিহাস অধ্যয়ন করেন; তপোনুষ্ঠান, বেদাধ্যয়ন, ব্রত, উপবাস, সন্তান ও রোষ দ্বারা যাঁহাকে কেহই অতিক্রম করিতে পারেন নাই; যিনি এক বেদকে চতুর্ধা বিভক্ত করেন, যিনি শান্তনু রাজার বংশরক্ষার্থে ত্বদীয় ক্ষেত্রে পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরকে উৎপাদন করেন, পাণ্ডবগণের পিতামহ সেই ত্রিলোক-বিশ্রুত মহাকবি ব্রহ্মর্ষি বেদব্যাস শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে পরীক্ষিৎপুত্র রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ দর্শনার্থ সভামণ্ডপে প্রবেশপূর্ব্বক রাজগণ ও সদস্যগণ পরিবৃত সুখা-সীন রাজা জনমেজয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। জনমেজয় ঋষিকে সমাগত দেখিয়া সভ্যগণ সমভিব্যাহারে সত্বর উত্থিত হইয়া অতি প্রীতমনে তাঁহার প্রত্যুদ্গমন করিলেন এবং সাদর-সম্ভাষণপূর্ব্বক উপবেশনার্থ সুবর্ণময় আসন প্রদান করিলেন। মহর্ষি আসনে অধ্যাসীন হইলে জনমেজয় বিধিপূর্ব্বক তাঁহার সৎকারাদি করিয়া পিতামহ ব্যাসদেবকে পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয় ও মধুপর্ক নিবেদন করিয়া দিলেন। মহর্ষি তদ্দত্ত পূজা প্রতিগ্রহ করিয়া পরম সন্তুষ্ট হইলেন। রাজা জনমেজয় এইরূপ ভক্তি-সহকারে পূজাবিধি সমাপন করিয়া সমীপে উপবেশনপূর্ব্বক ত্বদীয় কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করিলেন এবং মহর্ষিও রাজার অনাময়-প্রশ্ন' করিলেন। তৎপরে ভগবান্ বাদরায়ণি সভাস্থ সমস্ত ব্যক্তিকর্তৃক পূজিত হইয়া তাঁহাদিগকে প্রতিপূজা করিলেন।
পরিশেষে রাজা জনমেজয় কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! কুরু ও পাণ্ডব এই উভয় পক্ষের যাবতীয় বৃত্তান্ত আপনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, অতএব জিজ্ঞাসা করি, ইঁহাদিগের পরস্পর ভেদ ও তাদৃশ সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর ঘোরতর সংগ্রাম ঘটনার কারণ কি? এই সমস্ত বৃত্তান্ত আদ্যো-পান্ত কীর্ত্তন করিয়া আমাদিগের একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন। বেদব্যাস তাহার প্রার্থনাবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া সম্মুখোপবিষ্ট নিজশিষ্য বৈশম্পায়নকে আদেশ করিলেন, বৎস বৈশম্পায়ন! তুমি আমার নিকট কুরু ও পাণ্ডবদিগের ভ্রাতৃ-বিচ্ছেদ প্রভৃতি যাবতীয় বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়াছ, এক্ষণে তাহা কীর্ত্তন কর। বিপ্রশ্রেষ্ঠ বৈশম্পায়ন উপাধ্যায়ের আদেশক্রমে রাজা, সদস্য ও অন্যান্য ভূপতিগণের সমক্ষে কুরুপাণ্ডবদিগের গৃহবিচ্ছেদঘটিত অতি প্রাচীন মহাভারতীয় ইতিহাস বলিতে আরম্ভ করিলেন।
বৈশম্পায়ন প্রথমতঃ কায়মনোবাক্যে গুরুচরণে প্রণি-পাত করিয়া ব্রাহ্মণগণ ও অন্যান্য বিদ্বদ্গণকে প্রণাম করিলেন। পরে মহর্ষি বেদব্যাস-প্রণীত অপূর্ব্ব উপাখ্যান কীর্ত্তন বিষয়ে কৃতসঙ্কল্প হইয়া রাজা জনমেজয়কে কহিলেন, মহারাজ! ভগবান্ বাদরায়ণির মুখনিঃসৃত এই অমৃতকল্প মহাভারতীয় কথা যেমন রমণীয়, আপনাকেও তদনুরূপ উপযুক্ত পাত্র লাভ করিয়াছি; অতএব ভারত কথনে আমার অন্তঃকরণ অতিমাত্র উৎসাহিত হইতেছে। হে মহারাজ! রাজ্যলোভ প্রযুক্ত কুরুপাণ্ডবদিগের গৃহবিচ্ছেদ ও সর্ব্বভূত-বিনাশক সংগ্রাম এবং পাণ্ডবদিগের দ্যূতমূলক বনবাস সবিস্তর বর্ণন করিতেছি, অবধান করুন।
রাজর্ষি পাণ্ডুর মরণানন্তর যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চপাণ্ডব অরণ্য-বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক স্ব-গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া অচিরকালমধ্যে বেদবিদ্যা ও ধনুর্বিদ্যায় সম্পূর্ণ খ্যাতি লাভ করিলেন। পুরবাসিগণ তাঁহাদিগের এতাদৃশ অসম্ভাবিত নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়া সকলেই নিতান্ত অনুরক্ত হইয়া উঠিল। কৌরবকুল তদ্দর্শনে সহসা অসূয়াপরবশ হইলেন। তৎপরে মহাবল সৌবল, ক্রুরকর্মা কর্ণ ও দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন, ইঁহারা ঐক্যমত্য অবলম্বন-পূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের নিগ্রহচেষ্টা ও নির্বাসনের বাসনা করিলেন। দুর্য্যোধন শকুনির পরামর্শক্রমে রাজ্যলাভার্থ পাণ্ডবদিগের উপর নানাবিধ উপদ্রব করিতে আরম্ভ করিলেন। একদা তিনি অন্নে বিষ-সংযোগ করিয়া ভীমকে উপযোগ করিতে দিলেন। ভীমসেন সবিশেষ না জানিয়া বিষান্ন ভক্ষণ ও তাহা জীর্ণ করিলেন। অপর এক দিবস ভীম গঙ্গাতটে নিদ্রিত ছিলেন, এই অবসরে দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন তাঁহার হস্তপদাদি বন্ধনপূর্ব্বক জলে নিক্ষেপ করিয়া স্ব-নগরে প্রত্যাগমন করেন। পরে ভীম জাগরিত হইবামাত্র স্বয়ং বন্ধন ছেদন করিয়া উত্থিত হইলেন। একদা বৃকোদর নিদ্রায় অভিভূত আছেন, এমন সময়ে দুর্য্যোধন এক ভয়ঙ্কর সর্পদ্বারা তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ দংশন করান, তাহাতেও তাঁহার প্রাণ বিয়োগ হইল না। মহামতি বিদুর পাণ্ডবদিগের সেই বিপদ উদ্ধার বিষয়ে সতর্ক থাকিলেন। যেমন দেবরাজ স্বর্গস্থ হইয়াও জীবলোকের হিতসাধন করেন, তদ্রূপ বিদুর দুর্য্যোধনের পক্ষে থাকিয়াও পাণ্ডবগণের শুভসাধন করিতে লাগিলেন।
দুর্য্যোধন গুহ্য ও বাহ্য বিবিধ উপায় দ্বারা পাণ্ডবদিগকে বিনষ্ট করিতে না পারিয়া পরিশেষে বৃষসেন ও দুঃশাসন প্রভৃতি কতিপয় ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণপূর্ব্বক ধৃতরাষ্ট্রের অনুমত্যানুসারে বারণাবতে জতুগৃহ' প্রস্তুত করাইলেন। তৎপরে পুত্রবৎসল রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যভোগের লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া পাণ্ডবদিগকে নির্ব্বাসিত করেন। পাণ্ডবগণ মাতৃসমভিব্যাহারে হস্তিনা হইতে বারণাবতে প্রস্থান করিলেন। তৎকালে বিদুর তাঁহাদিগের মন্ত্রী ছিলেন। পরে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদিগকে জতুগৃহবাসের আদেশ দিলেন; তাঁহারা এক বৎসর কাল তথায় নির্বিঘ্নে বাস করিয়া পরিশেষে বিদুরের পরামর্শক্রমে এক সুরঙ্গ নির্মাণ করিলেন। পরে সেই জতুগৃহে অগ্নি প্রদান করিয়া এবং দুর্য্যোধনের দুর্ম্মন্ত্রী পুরোচনকে দগ্ধ করিয়া সাতিশয় শঙ্কিত মনে রজনীযোগে জননী সমভিব্যাহারে অরণ্যে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থান কালে পথিমধ্যে বিকটাকৃতি হিড়িম্ব রাক্ষসকে দেখিতে পাইলেন। হিড়িম্ব মুখব্যাদানপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে ভক্ষণ করিতে উদ্যত হইলে ভীমসেন স্ববিক্রমপ্রভাবে তাহাকে বধ করেন। অনন্তর আত্মপ্রকাশ-ভয়ে ভীত হইয়া ঐ রজনীতেই তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানকালে ভীমসেন হিড়িম্বানাম্নী রাক্ষসীর পাণিগ্রহণ করিয়া তাহার গর্তে ঘটোৎকচনামক এক পুত্র উৎপাদন করেন। পরে পাণ্ডবেরা ব্রহ্মচারিবেশে একচক্রা নগরীতে এক ব্রাহ্মণের আবাসে উপনীত হইয়া বেদাধ্যয়নে মনোনিবেশপূর্ব্বক কিয়ৎকাল অতিক্রম করেন। একদা মহাবল মহাবাহু ভীমসেন স্বীয় বাহুবলে ক্ষুধার্ত বকনামক রাক্ষসকে বধ করিয়া একচক্রা নগরের উপদ্রব নিবারণ করিলেন! তৎপরে পাণ্ডবেরা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া পাঞ্চালদেশে আগমনপূর্ব্বক দ্রৌপদীলাভ করেন এবং তথায় এক বৎসর বাস করিয়া পরিশেষে হস্তিনাপুরে প্রত্যাগত হয়েন। তখন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অভ্যাগত পঞ্চপাণ্ডবকে কহিলেন, তোমাদিগের ভ্রাতৃবিগ্রহ' হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা দেখিতেছি, যেহেতু আমি খাণ্ডবপ্রস্থে তোমাদিগের বাসস্থান অবধারণ করিয়া দিয়াছিলাম, কিন্তু তোমরা তাহাতে সম্মত হইলে না। অতএব এক্ষণে তোমরা কতিপয় গ্রাম লইয়া বাসার্থ সেই বিশাল-রথ্যাকলাপমণ্ডিত খাণ্ডবপ্রস্থে প্রস্থান কর। পাণ্ডবগণ তাঁহার আদেশক্রমে বহুমূল্য রত্নরাশি গ্রহণপূর্ব্বক স্বজনগণ সমভি-ব্যাহারে খাণ্ডবপ্রস্থে গমন করিলেন। পরে বাহুবলে অন্যান্য ভূপালগণকে পরাভূত করিয়া একবৎসর তথায় অবস্থিতি করেন। ধর্মপরায়ণ পাণ্ডবগণ এইরূপে শত্রুদমনদ্বারা ক্রমশঃ অভ্যুদয় লাভ করিতে লাগিলেন। মহাযশাঃ ভীমসেন পূর্ব্বদিক্, অর্জুন উত্তরদিক্, নকুল পশ্চিমদিক্ ও সহদেব দক্ষিণদিক্ জয় করিয়া এই সসাগরা ধরণীমণ্ডলে একাধিপত্য স্থাপন করিলেন। - সূর্য্য ও সূর্য্যসদৃশ পঞ্চপাণ্ডব দ্বারা ধরণীমণ্ডল যেন ষট্ সূর্যে উদ্ভাসিত হইল।
একদা ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির কোন বিশেষ কারণবশতঃ প্রাণ হইতে প্রিয়তর ভ্রাতা অর্জুনকে বনে যাইতে কহিলেন; পুরুষ-শ্রেষ্ঠ অর্জুন ত্বদীয় আজ্ঞাক্রমে বনে প্রবেশ করিয়া ত্রয়োদশ মাস তথায় বাস করিলেন। পরে এক দিবস দ্বারবতী নগরীতে গমন করিয়া কৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁহার সুভদ্রা-নাম্নী ভগিনীর পাণিগ্রহণ করেন। যেমন শচী ইন্দ্রকে পাইয়া এবং লক্ষ্মী কৃষ্ণকে পাইয়া আহ্লাদিত হইয়া ছিলেন, সুভদ্রা অর্জুনকে পতিলাভ করিয়া তদ্রূপ আহ্লাদিত হইলেন; পরে বাসুদেব সমভিব্যাহারে অর্জুন খাণ্ডব বন দগ্ধ করিয়া ভগবান্ হুতাশনকে পরিতৃপ্ত করিলেন। অগ্নি পরিতুষ্ট হইয়া অর্জুনকে গাণ্ডীবধনুঃ, অক্ষয় তৃণীর ও কপিধ্বজ রথ প্রদান করিলেন। অর্জুন সেই সমস্ত বস্তু প্রতিগ্রহ করিলেন এবং খাণ্ডবাগ্নি হইতে ময়দানবকে মোচন করিয়া দিলেন। ময়দানব তাঁহার প্রসাদে পরিত্রাণ পাইয়া নানাবিধ মণিকাঞ্চনমণ্ডিত ও পরম রমণীয় এক সভামণ্ডপ নির্মাণ করিয়া দেন। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন ময়নির্মিত সভার লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া শকুনির পরামর্শা-নুসারে কূট পাশ-ক্রীড়া' দ্বারা যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করিয়া দ্বাদশ বর্ষ বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাসের আদেশ দিলেন। ধর্মরাজ তদনুসারে ত্রয়োদশ বৎসর অতিবাহিত করিয়া নিজ রাজ্যে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বকীয় ধন-সম্পত্তি প্রার্থনা করেন। তাহা না পাওয়াতেই তাঁহাদিগের ঘোরতর সমরানল প্রজ্বলিত হয়। পরিশেষে তাঁহারা বিপুলপরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের প্রাণসংহার করিয়া পুনর্ব্বার আপন রাজ্য সম্পত্তি সমুদায় অধিকার করেন। হে মহারাজ! উভয় পক্ষে যেরূপে আত্মবিচ্ছেদ ও সংগ্রাম উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিলাম।
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র। আমি ভারতীয় উপাখ্যান সংক্ষেপে শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে কুরুবংশীয়দিগের অতিবিচিত্র চরিত্র সবিস্তর কীর্ত্তন করিয়া আমার কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তকে সন্তুষ্ট কর। পূর্ব্বপুরুষদিগের বিশুদ্ধ চরিতাবলী সংক্ষেপে শ্রবণ করিয়া আমার অন্তঃকরণ পরিতৃপ্ত হইল না। ধৰ্ম্মপরায়ণ পাণ্ডবগণ যে কারণে অবধ্য জ্ঞাতিকুল সংহার করিয়াও লোকের প্রশংসাপাত্র হইয়াছিলেন, বোধ করি সে কারণ সামান্য কারণ নহে। আর তাঁহারা নিরপরাধী ও প্রতিবিধানসমর্থ হইয়াও শত্রুকৃত দুঃসহ ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন, ইহারই বা কারণ কি? মহাবল মহাবাহু ভীমসেন এত কষ্ট স্বীকার করিয়াও কি কারণে ক্রোধ সংবরণ করিয়াছিলেন? পতিব্রতা দ্রৌপদী সভামধ্যে তাদৃশ অপমানিত হইয়াও কেন ক্রোধ-চক্ষুঃ দ্বারা সেই দুরাত্মা কৌরবদিগকে ভস্মাবশেষ করিলেন না? যখন ধৰ্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির দ্যুতে আসক্ত হয়েন, তখন ভীমার্জুন ও নকুল সহদেব কেন তাঁহাকে নিবারণ করিলেন না? কি প্রকারেই বা অর্জুন একাকী হইয়া একমাত্র কৃষ্ণের সহায়তায় সেই প্রভৃত কুরুসেনা পরাভূত করিয়াছিলেন? হে তপোধন! আপনি এই সকল বৃত্তান্ত এবং পাণ্ডবদিগের আচরিত অন্যান্য বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত এই পবিত্র উপাখ্যান অতি বিস্তীর্ণ, অতএব ইহা শ্রবণ করিবার সময় নিৰ্দ্দেশ করুন, আমি আপনার নিকট উহা সবিস্তর কীর্ত্তন করিব। সত্যবতীপুত্র ভগবান্ ব্যাসদেব এই গ্রন্থে একলক্ষ শ্লোক রচনা করিয়াছেন। যে সকল ব্যক্তি ইহা শ্রবণ করাইবেন এবং যাঁহারা শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে শ্রবণ করিবেন, তাঁহারা ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া দেবতুল্য হইবেন। বেদব্যাস-প্রণীত এই পরম পবিত্র রমণীয় ইতিহাস সাক্ষাৎ বেদস্বরূপ। মহর্ষিগণ এই মহাভারতের যথেষ্ট প্রশংসা করিয়া থাকেন। ইহাতে অর্থ ও কামবিষয়ক অশেষ উপদেশ প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং এতৎশ্রবণে পরিনিষ্ঠাবতী' বুদ্ধি জন্মে। বিদ্বান্ ব্যক্তিরা দানশীল সত্যস্বভাব ধর্মপরায়ণ ও অকৃপণ ব্যক্তিদিগকে মহাভারত শ্রবণ করাইয়া প্রচুর অর্থলাভ করেন। শ্রোতা অতি নিষ্ঠুর হইলেও এই অপূর্ব্ব ইতিহাস শ্রবণে রাহু হইতে মুক্ত চন্দ্রের ন্যায় ভ্রুণহত্যাদি মহাপাতক হইতেও আশু বিমুক্ত হইতে পারে। বিজিগীষু' ব্যক্তিদিগের এই জয়াখ্য ইতিহাস শ্রবণ করা কর্তব্য। রাজারা ইহা শ্রবণ করিলে রাজ্যলাভ ও শত্রু পরাজয় করিতে পারেন। যদি কোন যুবা রাজা মহিষীর সহিত এই পুত্রফলপ্রদ পরম স্বস্ত্যয়নস্বরূপ মহাভারত শ্রবণ করেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগের বীরপুত্র বা রাজ্যভাগিনী কন্যা জন্মে। মহর্ষি বেদব্যাসরচিত এই মহাভারতই পবিত্র ধর্মশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র ও মোক্ষশাস্ত্র। এক ব্যক্তি বক্তা ও অন্যে ইহার শ্রোতা হয়েন। শ্রোতাদিগের পুত্র পৌত্রেরাও শুশ্রূষাপরায়ণ এবং ভৃত্যেরা প্রভুপরায়ণ হইয়া থাকে। যে নর মহাভারত শ্রবণ করেন, তিনি কায়িক, বাচিক ও মানসিক ত্রিবিধ পাপরাশি হইতে বিমুক্ত হয়েন। যাঁহারা বিদ্বেষবুদ্ধিশূন্য হইয়া এই ভারতবংশীয় ইতিবৃত্ত শ্রবণ করেন, তাঁহাদিগের ব্যাধিভয় ও পরলোেকভয় নিবারণ হয়। বেদব্যাস স্বগ্রন্থে সর্ব্ববিদ্যাপারদর্শী মহাপ্রভাবশালী পাণ্ডবদিগের ও অন্যান্য রাজর্ষিদিগের কীর্তি বিস্তার করিয়াছেন। ইহা অতি বিচিত্র ও পবিত্র; শ্রবণ করিলে শ্রোত্রযুগল চরিতার্থ হয়। যে মানব জীবলোকে পুণ্যসঞ্চয় করিবার মানসে সদাচার পরায়ণ ব্রাহ্মণগণকে ইহা শ্রবণ করান, তিনি সনাতন ধর্মলাভ করেন। যিনি অতি পূতমনে সর্ব্বলোকপ্রখ্যাত এই কুরুবংশীয় ইতিহাস কীর্তন করেন, তাঁহার বংশপরম্পরা ক্রমশঃ বিস্তার হইতে থাকে। যদি বেগপারগ ব্রাহ্মণ ব্রতানুষ্ঠান পরতন্ত্র হইয়া চারি বৎসর ও চারিমাস মহাভারত অধ্যয়ন করেন, তিনি সকল পাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন। এই মহাভারতে দেবতা, রাজর্ষি ও ব্রহ্মর্ষিদিগের বিষয় বর্ণিত ও ভগবান্ বাসুদেবের সুচরিত কীৰ্ত্তিত আছে। ইহাতে ভগবান্ ভূতভাবন ভবানীপতি ও দেবী পার্ব্বতীর অনির্বচনীয় মহিমা এবং কার্তিকেয়ের উৎপত্তি ও গো-ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। এই মহাভারত নিখিল বেদের সমষ্টিস্বরূপ। অতএব ধৰ্ম্মবুদ্ধি লোকদিগের ইহা সর্ব্বদা শ্রবণ করা কর্তব্য। যিনি প্রতিপর্ব্বাহে ব্রাহ্মণগণকে মহাভারত শ্রবণ করান, তাঁহার পাপনাশ ও নিত্যকাল ব্রহ্মলোকে বাস হয়। শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণদিগকে ভারতের অন্ততঃ এক চরণ মাত্রও শ্রবণ করাইলে পিতৃলোক অক্ষয় অন্নপানে পরিতৃপ্ত হয়েন। মন ও ইন্দ্রিয় দ্বারা অহোরাত্রে জ্ঞানাজ্ঞানকৃত যে সকল পাপ সঞ্চিত হয়, মহাভারত শ্রবণ করিলে তাহা তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়। এই গ্রন্থে ভরতবংশীয় রাজাদিগের মহাবংশ বর্ণিত আছে বলিয়া ইহার নাম মহাভারত হইয়াছে। যিনি এই মহাভারতের সমুদায় সিদ্ধান্ত স্থির করিতে পারেন, তাঁহার সকল পাপ অপগত হয়। এই অদ্ভুত ইতিহাস শ্রবণ করাইলে শ্রোতা মহাপাতক হইতে পরিত্রাণ পায়। মহর্ষি ব্যাস প্রতিদিন প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপনানন্তর নিয়মিত তপোজপাদির অব্যাঘাতে' তিন বৎসরে এই মহাভারত রচনা করেন, অতএব নিয়মবিশিষ্ট হইয়া ইহা শ্রবণ করা কর্তব্য। কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত এই অপূর্ব্ব মহাভারতীয় কথা যিনি শ্রবণ করান ও যাঁহারা ভক্তি সহকারে শ্রবণ করেন, তাঁহাদিগকে জন্মমৃত্যুরূপ দুর্ভেদ্য শৃঙ্খলে বদ্ধ থাকিয়া আর পাপ পুণ্যের ফলভোগ করিতে হয় না। যে নর ধর্ম্মকামনায় এই ইতিহাসের আদ্যোপান্ত সমুদায় শ্রবণ করেন, তাঁহার সকল বাসনা সফলা হয় ও চরমে দেবলোকে গমন করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করেন।
সমুদ্র ও মহাগিরি সুমেরু যেমন রত্নাকর বলিয়া প্রসিদ্ধ, সেই-রূপ বহুবিধ সুচারু শব্দে অলঙ্কৃত এই রমণীয়তর মহাভারতও এক অত্যুৎকৃষ্ট ইতিহাস বলিয়া প্রসিদ্ধ। যে ব্যক্তি অর্থীদিগকে এই শ্রবণ-সুখকর মহাভারত প্রদান করেন, তাঁহার সসাগরা পৃথ্বীদানের ফল লাভ হয়। মহারাজ। পুণ্যসঞ্চয় ও বিজয়লাভের নিমিত্ত এই অদ্ভুত কথা শ্রবণ করুন। এই মহাভারতে যাহা বর্ণিত আছে, তাহা অন্যত্রও থাকিতে পারে, কিন্তু ইহাতে যাহা নাই, তাহা আর কুত্রাপি দেখিতে পাইবেন না।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, পুরুবংশে উপরিচর নামে এক পরম ধার্মিক রাজা ছিলেন। তাঁহার অপর নাম বসু। তিনি সর্ব্বদা মৃগয়ায় আসক্ত থাকিতেন। মহারাজ বসু ইন্দ্রের উপদেশক্রমে রমণীয় চেদিরাজ্য অধিকার করেন। পরে অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক আশ্রমে প্রবেশ করিয়া অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিলেন। একদা ইন্দ্রাদি দেবগণ ত্বদীয় আশ্রমে উপস্থিত হইয়া ভাবিলেন, ইনি যেরূপ তপস্যা করিতেছেন, ইহাতে বোধ হয় ইন্দ্রত্ব গ্রহণ করিবেন, এই ভাবিয়া সান্ত্বনা বাক্য দ্বারা তাঁহাকে তপস্যা হইতে নিবৃত্ত করিলেন। দেবতারা কহিলেন, মহারাজ! যাহাতে পৃথিবী-মধ্যে ধৰ্ম্ম সঙ্কীর্ণ না হয়, তাহাই তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। তুমি ধৰ্ম্ম প্রতিপালন করিতেছ বলিয়া লোকসকল স্বধর্ম্মে ব্যবস্থিত আছে। ইন্দ্র কহিলেন, হে নরনাথ! তুমি অবহিত ও নিয়মশালী হইয়া সতত ধর্মের অনুষ্ঠান কর, তাহা হইলেই নিত্য ও পবিত্র লোক দেখিতে পাইবে। তুমি ভূর্লোকে থাকিয়াও আমার প্রিয়সখা হইলে। তোমাকে এক সদুপদেশ দিতেছি শ্রবণ কর, এই ভূমণ্ডলের মধ্যে যে প্রদেশ অতি রমণীয়, পবিত্র ও উর্ব্বরাক্ষেত্রবিশিষ্ট এবং পশ্বাদির আবাস ও বিচিত্র ধনধান্য-সম্পন্ন, তুমি সেই দেবমাতৃক প্রদেশে অবস্থিতি কর।
হে চেদিরাজ! চেদিদেশ প্রভৃত ধনরত্নাদিবিশিষ্ট, তুমি তথায় গিয়া বাস কর। ঐ জনপদের অধিবাসীরা ধর্মপরায়ণ ও সাধু। অধিক কি বলিব, তাহারা পরিহাসক্রমেও কদাচ মিথ্যা ব্যবহার করে না। পুত্রেরা পিতার হিতকার্য্যে তৎপর হইয়া একান্নে বাস করে। তত্রত্য লোকেরা দুর্ব্বল বলীবৰ্দ্দ দিগকে ভারবহন বা কৃষি-কার্য্যে নিয়োগ করে না। তথায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণ সতত সাবধান হইয়া স্ব স্ব ধৰ্ম্ম প্রতিপালন করিয়া থাকেন। হে মানপ্রদ! ত্রিলোকে যে সকল ঘটনা হইবে আমার প্রসাদে কিছুই তোমার অবিদিত থাকিবে না। মনুষ্যের মধ্যে কেবল তুমিই মদ্দত্ত এই দিব্য স্ফটিকনির্মিত আকাশগামী বিমানে আরোহণ করিয়া বিগ্রহবান্' দেবতার ন্যায় গগনমার্গে সঞ্চরণ করিতে পারিবে। আর তোমাকে এই বৈজয়ন্তীনাম্নী অম্লান-পঙ্কজমালা' অর্পণ করিতেছি, এই মালা সংগ্রামকালে তোমাকে রক্ষা করিবে ও ইহার প্রভাবে তুমি অক্ষতশরীরে রণস্থল হইতে প্রত্যাগত হইতে পারিবে। এই সুবিখ্যাত ইন্দ্রমালা তোমার একমাত্র অসাধারণ চিহ্নস্বরূপ হইবে।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র রাজার প্রীতি-বিস্তার করিবার উদ্দেশে শিষ্টপ্রতিপালনী' নামে এক বেণুযষ্টি প্রদান করিলেন। সংবৎসর অতীত হইলে ভূপতি শচীপতির আরাধনার নিমিত্ত সেই বেণুযষ্টি পৃথিবীতে প্রোথিত করিতেন। পরদিবস সেই বেণুযষ্টি গন্ধমাল্য ও বসন ভূষণে বিভূষিত করিয়া উত্থাপনপূর্ব্বক তাহাতে ইন্দ্রের পূজা করিতেন। তদবধি অন্যান্য ক্ষিতিপালেরাও তন্নিদ্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া ইন্দ্রের উপাসনা করিয়া থাকেন। ভগবান্ ইন্দ্র, বসুরাজের প্রতি প্রসন্ন হইয়া হংসরূপ পরিগ্রহপূর্ব্বক অবনীতে অবতীর্ণ হইতেন এবং সেই প্রকার আকারেই পূজা স্বীকার করিয়া কহিতেন, মহারাজ! তুমি যেরূপ সৎকার করিলে তাহাতে আমি পরম প্রীতিলাভকরিলাম। এক্ষণে কহিতেছি, যে সকল রাজা আমার প্রীত্যুদ্দেশে এই উৎসব করিবেন বা অন্য দ্বারা এই উৎসব করাইবেন, তাঁহাদিগের রাজ্যের ধনসমৃদ্ধি ও বিজয়লাভ হইবে এবং তৎপ্রদেশবাসীরা সর্ব্বদা সন্তোষে থাকিবে। হে মহারাজ! এইরূপে বসুরাজ ইন্দ্র কর্তৃক অভিহিত হইয়াছিলেন। ফলতঃ যে নর ভূমি ও রত্নাদি প্রদান করিয়া ইন্দ্রোৎসব করিয়া থাকেন, তিনি পূজিত হয়েন। চেদিশ্বর বসু বরদান ও শক্রোৎসবের উপদেশ কথন দ্বারা ইন্দ্র কর্তৃক সম্মানিত হইয়া এই পৃথিবী ধৰ্ম্মতঃ পালন করিতেন এবং সুরপতির সন্তোষার্থে মধ্যে মধ্যে ইন্দ্রোৎসব করিতেন।
মহারাজ! বসুর মহাবল পরাক্রান্ত পাঁচ পুত্র ছিল। তিনি তাঁহাদিগকে পৃথক্ পৃথক্ রাজ্যে অভিষিক্ত করেন। তাঁহার এক পুত্রের নাম বৃহদ্রথ। ইনি মগধদেশে মহারথ বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিলেন। অপর পুত্রের নাম প্রত্যগ্রহ। আর একটির নাম কুশাম্ব, কেহ কেহ ইহার নাম মণিবাহন বলিয়া নির্দেশ করেন। অন্য পুত্রের নাম মাবেল্ল। অপরের নাম যদু। অমিত পরাক্রম-শালী বসুরাজের এই পঞ্চ পুত্র জন্মে। তন্মধ্যে যিনি যে দেশে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, সেই দেশ তাঁহার নামে বিখ্যাত হইয়াছে। সেই ইন্দ্রতুল্য পঞ্চভূপতির পৃথক্ পৃথক্ বংশাবলী হইয়াছিল। যখন সেই বসুরাজ ইন্দ্রের প্রসাদলব্ধ সেই স্ফটিকনির্মিত রথে আরোহণ করিয়া পৃথিবীর উপরিভাগে আকাশপথে সঞ্চরণ করিতেন, তৎকালে গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাসকল আসিয়া তাঁহার আরাধনা করিতেন। তিনি উপরি ভ্রমণ করিতেন, এই নিমিত্ত উপরিচর নামে প্রখ্যাত হইয়াছিলেন। তাঁহার রাজধানীর নিকটে শুক্তিমতী নামে এক নদী ছিল। কোলাহল নামে এক সচেতন অচল [পর্ব্বত] কামান্ধ হইয়া স্রোতস্বতী-সম্ভোগাভিলাষী হওয়াতে বসুরাজ তাহার শিরোদেশে পদাঘাত করিয়াছিলেন। রাজার পাদপ্রহারে পর্ব্বতবর বিদীর্ণ হইল। অতি বেগবতী স্রোতস্বতী শুক্তিমতী সেই প্রহারমার্গ দ্বারা বহির্গত হইতে লাগিল। উক্ত নদীর গর্তে কোলাহলের এক পুত্র ও এক কন্যা উৎপন্ন হইল। নদী প্রীতমনে সেই কন্যা ও পুত্র লইয়া রাজাকে সমর্পণ করিল। বসুপ্রদ বসুরাজ সেই পুত্রকে আপন সৈন্যা-ধিকারে নিয়োগপূর্ব্বক কন্যাকে পত্নীরূপে স্বীকার করিলেন। গিরিবালা গিরিকা, ঋতুস্নাতা ও শুচি হইয়া সন্তান-বাসনায় রাজাকে আপন অবস্থা নিবেদন করিল! দৈবযোগে সে দিবস রাজার পিতৃলোকেরা প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে মৃগয়া করিতে আদেশ দিলেন। রাজা তাঁহাদিগের আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্রে মৃগয়ার্থ নির্গত হইলেন কিন্তু আলোকসামান্যা রূপলাবণ্যবতী সাক্ষাৎ লক্ষ্মী-স্বরূপা গিরিকা তাঁহার স্মৃতিপথে সতত জাগরূক ছিলেন। রাজা সেই রমণীয় বসন্তকালে মৃগয়াক্রমে অশোক, চম্পক, চূত, অতিমুক্ত, পুন্নাগ, কর্ণিকার, বকুল, পাটল, চন্দন, অর্জুন প্রভৃতি বহুবিধ বৃক্ষে পরিশোভিত, কোকিলালাপ-মুখরিত, মধুমত্ত মধুকরের ঝঙ্কারে সঙ্কুলিত, চৈত্ররথতুল্য মনোহর, এক কাননে প্রবেশ করিলেন। কিন্তু গিরিকাবিরহে নিতান্ত কাতর ও দুর্দান্ত মদনবাণে একান্ত অধীন হইয়া যদৃচ্ছাক্রমে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক বিকসিত অশোক তরু অবলোকন করিলেন। তিনি সেই তরুমূলে সুখাসীন হইয়া বায়ুসেবনদ্বারা অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন। এই অবসরে তাঁহার রেতস্খলন হইল। রেতঃ নিতান্ত নিষ্ফল না হয়, এই মনে করিয়া চেদিরাজ এক পত্রপুটে তাহা ধারণ করিলেন। পরে পত্নীর ঋতুকাল ও আপনার রেতঃ বিফল না হয়, মনে মনে এই বিবেচনা করিয়া রাজা মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক বীজ শোধন করিয়া সমীপবর্ত্তী অতি দ্রুতগামী এক শ্যেন পক্ষীকে কহিলেন, হে সৌম্য! অদ্য আমার মহিষীর ঋতুকাল, অতএব তুমি অতি সত্বর আমার এই রেতঃ লইয়া তাঁহাকে প্রদান কর।
বেগবান্ শ্যেন সেই শুক্র লইয়া আকাশপথে উড্ডীন হইল। পথিমধ্যে আর একটি শ্যেন পক্ষী ঐ দ্রুতগামী শোনের তুণ্ডাগ্রে স্থিত শুক্র দেখিয়া আমিষ আশঙ্কা' করিয়া তাহার নিকট আসিল এবং মাংসখণ্ড বলপূর্ব্বক লইব, এই ভাবিয়া তাহার সহিত তুণ্ডযুদ্ধ আরম্ভ করিল। যুদ্ধ করিতে করিতে সেই শুক্র যমুনার জলে পতিত হইল। তথায় আদ্রিকা নামে এক অপ্সরা ব্রহ্মশাপ প্রভাবে মীনরূপ প্রাপ্ত হইয়া বাস করিত। সেই মৎস্যরূপা আদ্রিকা শীঘ্র আসিয়া শ্যেনতুণ্ডপরিভ্রষ্ট বীজ ভক্ষণ করিল। বীজ ভক্ষণের পর দশম মাসে মৎস্যোপজীবীরা সেই মৎসীকে জালে বদ্ধ করিল। অনন্তর তাহার উদরাভ্যন্তর হইতে এক কন্যা ও এক পুত্র বহির্ভূত হইল। মৎস্যজীবীরা এই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে চমৎকৃত হইয়া ঐ দুই সন্তানকে ভূপাল-সমক্ষে লইয়া গিয়া নিবেদন করিল, "মহারাজ! এক মৎসীর গর্ভে এই দুই মানুষ জন্মিয়াছে।” উপরিচর রাজা সেই মৎসীগৰ্ত্ত-সম্ভূত পুত্রকে গ্রহণ করিলেন। সেই মৎসীপুত্র পরম ধার্মিক ও স্থির-প্রতিজ্ঞ মৎস্যরাজ নামে বিখ্যাত হইয়াছিলেন। শাপপ্রদানকালে ভগবান্ ইন্দ্র অপ্সরা আদ্রিকাকে কহিয়াছিলেন, তুমি মানুষ প্রসব করিয়া শাপ হইতে পরিত্রাণ পাইবে। এক্ষণে সেই নিৰ্দ্দিষ্টকাল উপস্থিত দেখিয়া মৎস্যরূপা অপ্সরা মৎস্যরূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বকীয় পূর্ব্বাকার স্বীকার করিয়া আকাশপথে প্রস্থান করিল।
মৎসীগর্ভসম্ভূতা দুহিতা রাজার আদেশক্রমে সেই মৎস্যজীবীর কন্যা হইল। মৎস্যঘাতীর সম্পর্কে তাহার নাম মৎস্যগন্ধা হইয়াছিল, ফলতঃ তাহার নাম সত্যবতী। সত্যবতী পিতৃ-শুশ্রূষার নিমিত্ত যমুনা নদীতে নাবিকের কার্য্য করিত।
একদা পরাশর ঋষি তীর্থপর্য্যটনক্রমে যমুনায় উপস্থিত হইয়া অলৌকিক রূপলাবণ্যবতী মুনিজনমনোহারিণী সুচারুহাসিনী দাসনন্দিনীকে দেখিবামাত্র মদনবেদনায় অতিমাত্র ব্যাকুল হইয়া কহিলেন, হে কল্যাণি! আমার মনোভিলাষ পূর্ণ কর। সে কহিল, ভগবন্! ঐ দেখুন নদীর উভয় পারে পার হইবার নিমিত্ত ঋষিগণ উপস্থিত আছেন, এ অবসরে কিরূপে আপনার মনোরথ সিদ্ধ হইবে? তাঁহার এই কথা শুনিয়া ঋষিবর পরাশর কুদ্ধটিকা সৃষ্টি করিয়া তৎপ্রদেশ তমোময় করিলেন। ঋষিসৃষ্ট কুষ্মটিকা দৃষ্টে কন্যা লজ্জিতা ও বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কহিল, ভগবান! আমি পিতার অধীন। অদ্যাবধি আমার বিবাহ হয় নাই। আপনার সহযোগে আমার কুমারীভাব দূষিত হইবে। কন্যাভাব দূষিত হইলে কিরূপে গৃহে প্রবেশ করিব এবং কি প্রকারেই বা লোকসমাজে জীবন ধারণ করিব? হে ভগবন্! এই সমস্ত আদ্যোপান্ত অনুধাবন করিয়া যাহা উচিত হয়, বিধান করুন। পরাশর শুনিয়া প্রীতমনে কন্যাকে কহিলেন, হে ভীরু! আমার অভিলাষ পূর্ণ করিলে তোমার কন্যাভাব দূষিত হইবে না। আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি। ইচ্ছানুরূপ বর প্রার্থনা কর। আমার প্রসন্নতা কখনই নিষ্ফল হয় নাই। তাঁহার এই কথা শুনিয়া কন্যা কহিল, আমার সর্ব্বাঙ্গ হইতে সৌগন্ধ নির্গত হউক। ঋষি "তথাস্তু” বলিয়া তাহার অভিলাষানুরূপ বর প্রদান করিলেন। অনন্তর ধীবরকন্যা অভীষ্ট বরলাভে সন্তুষ্ট হইয়া মহর্ষির মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করিল। তদবধি সেই যুবতীর নাম গন্ধবতী বলিয়া ত্রিভুবনে বিখ্যাত হইল। লোকে এক যোজন অন্তর হইতে তাহার গাত্রগন্ধের আঘ্রাণ পাইত, এই নিমিত্ত তাহার অপর একটি নাম যোজনগন্ধা হইয়াছিল।
সত্যবতী এইরূপে যমুনা নদীর দ্বীপে এক পুত্র প্রসব করিলেন। প্রভূততেজাঃ পরাশরপুত্র মাতৃনির্দেশক্রমে তপস্যায় অভিনিবেশ করিলেন এবং জননীকে কহিলেন, মাতঃ। কার্য্যকাল উপস্থিত হইলে আমাকে স্মরণ করিলেই আমি আসিব। এইরূপে পরাশরের ঔরসে ও সত্যবতীর গর্তে ব্যাসদেব জন্মপরিগ্রহ করেন। তিনি যমুনা-দ্বীপে জন্মেন, এই নিমিত্ত তাঁহার নাম দ্বৈপায়ন হইল এবং যুগে যুগে ধর্ম্মের পাদক্ষয় ও মনুষ্যদিগের আয়ু ও শক্তির হাস দেখিয়া বেদের স্থায়িত্ব ও ব্রাহ্মণগণের প্রতি অনুকূলতা প্রযুক্ত বেদের বিভাগ করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তাঁহার নাম বেদব্যাস হয়। মহর্ষি বেদব্যাস সুমন্তু, জৈমিনি, পৈল, বৈশম্পায়ন এবং আপন পুত্র শুকদেবকে বেদ ও মহাভারত অধ্যয়ন করান। তাঁহারাই ভারতের পৃথক্ পৃথক্ সংহিতা প্রকাশ করেন।
মহাবীৰ্য্য মহাযশাঃ শান্তনুপুত্র ভীষ্ম অষ্টবসুর সহযোগে গঙ্গাগর্তে জন্মগ্রহণ করেন। আণীমাণ্ডব্য নামক এক মহর্ষি ত্রিলোকে বিখ্যাত ছিলেন। সেই বেদবেত্তা মহাযশাঃ ভগবান্ চৌর্য্যাপবাদে শূলে আরোপিত হয়েন। তিনি শূলারোহণকালে ধর্মকে আহ্বান করিয়া এই কথা কহিলেন, হে ধৰ্ম্ম। আমি শৈশবকালে ইষীকাস্ত্র' দ্বারা এক শকুস্তিকা'কে বিদ্ধ করিয়া-ছিলাম। আমার স্মরণ হইতেছে, সেই এক দুষ্কর্ম করিয়াছি। তদ্ভিন্ন আর কোন পাপকর্ম করি নাই। কিন্তু আমি তদপেক্ষা সহস্রগুণ তপস্যা করিয়াছি, তদ্দ্বারা কি আমার সেই পাপের শান্তি হয় নাই? অন্যান্য প্রাণিবধ অপেক্ষা ব্রাহ্মণবধ গুরুতর পাতক। হে ধৰ্ম্ম। তুমি ব্রাহ্মণবধ করিতে উদ্যত হওয়াতে এক্ষণে তোমার অন্তরে পাপের সঞ্চার হইয়াছে, অতএব আমি অভিশাপ দিতেছি, তুমি শূদ্রযোনি প্রাপ্ত হইবে। ধৰ্ম্ম ত্বদীয় শাপপ্রভাবে বিদুররূপে শূদ্রযোনিতে জন্মগ্রহণ করেন। বিদুরের শরীরে সাক্ষাৎ ধৰ্ম্ম আবির্ভূত আছেন। সূত গবল্পণ হইতে মুনিতুল্য সঞ্জয় সঞ্জাত হয়েন। কুন্তীর কন্যকাবস্থায় সূর্য্যের ঔরসে ত্বদীয় গর্তে মহাবল কর্ণ জন্মগ্রহণ করেন। সর্ব্বলোক-পূজিত জগৎকর্তা অনাদিনিধন নারায়ণ, লোকদিগকে অনুগ্রহ করিবার নিমিত্ত বসুদেবের ঔরসে দেবকীগর্ভে আবির্ভূত হয়েন। লোকে যাঁহাকে অব্যক্ত, অবিনাশী, ব্রহ্ম, ত্রিগুণাত্মক, আত্মা, অব্যয়, প্রকৃতি, প্রভাব, প্রভু, পুরুষ, বিশ্বকর্মা, সত্ত্বগুণসম্পন্ন, ধ্রুব, অক্ষয়, অনন্ত, অচল, দেব, হংস, নারায়ণ, বিধাতা, অজ, মোক্ষস্বরূপ এবং নির্গুণ বলিয়া নির্দেশ করে, সেই সৰ্ব্বভূত-পিতামহ ধর্মসংবর্দ্ধনের নিমিত্ত অন্ধক বৃষ্ণিবংশে অবতীর্ণ হয়েন অস্ত্রজ্ঞ ও সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি ও কৃতবর্মা সত্যক ও হৃদিকের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিলেন। এক দ্রোণীতে অর্থাৎ কুম্ভে উগ্রতপাঃ মহর্ষি ভরদ্বাজের রেতঃপাত হয়, তাহাতেই দ্রোণাচার্য্যের জন্ম হইল। অশ্বত্থামার জননী কৃপী ও মহাবল কূপ, শরৎকালীন শরস্তম্বে প্রসিক্ত গৌতমের রেতঃ হইতে উদ্ভূত হইলেন। দ্রোণাচার্য্য হইতে অশ্বত্থামা জন্মগ্রহণ করিলেন। প্রভূত পরাক্রমশালী প্রদীপ্ত অনলসম তেজস্বী ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণ বিনাশের নিমিত্ত ধনুগ্রহণপূর্ব্বক যজ্ঞবেদী হইতে আবির্ভূত হয়েন। ঐ যজ্ঞবেদী হইতে অলৌকিক রূপলাবণ্যবতী গুণবতী দ্রৌপদীও জন্মগ্রহণ করেন। পরে প্রহ্লাদের শিষ্য নগ্নজিৎ ও সুবলের জন্ম হইল। গান্ধাররাজ সুবলের শকুনি নামে এক পুত্র ও দুর্য্যোধনের জননী গান্ধারী নামে কন্যা জন্মিল। কিন্তু দৈবকোপে শকুনি অধার্মিক হইয়াছিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও মহাবলপরাক্রান্ত পাণ্ডু ব্যাসের ঔরসে মহারাজ বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে জন্মগ্রহণ করিলেন। দ্বৈপায়নের ঔরসে শূদ্রযোনিতে ধর্মার্থবেত্তা ধীমান, বিদুর জন্মিলেন। পাণ্ডু রাজার দুই স্ত্রীর গর্বে পাঁচ পুত্র হয়। ধৰ্ম্ম হইতে যুধিষ্ঠির, বায়ু হইতে ভীম, ইন্দ্র হইতে সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ অর্জুন এবং অশ্বিনীতনয়ন্বয় হইতে অতি রূপবান্ যমজ নকুল ও সহদেব। তন্মধ্যে যুধিষ্ঠির সর্ব্বাপেক্ষা অধিক গুণবান্ ছিলেন। ধীমান্ ধৃতরাষ্ট্রের দুর্য্যোধন প্রভৃতি একশত পুত্র জন্মে এবং তাঁহার যুযুৎসু ও করণ নামে আর দুই পুত্র জন্মিয়াছিল। তদনন্তর দুঃশাসন, দুঃসহ, দুৰ্ম্মর্ষণ, বিকর্ণ, চিত্রসেন, বিবিংশতি, জয়, সত্যব্রত, পুরুমিত্র, বৈশ্যাপুত্র, যুযুৎসু, এই একাদশ মহারথ জন্মিয়াছিলেন। অর্জুনের ঔরসে সুভদ্রার গর্তে অভিমন্যুর জন্ম হয়। অভিমন্যু কৃষ্ণের ভাগিনেয় ও মহাত্মা পাণ্ডুর পৌত্র। এক দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের ঔরসে প্রতিবিন্ধ্য, ভীমসেনের ঔরসে সূতসোম, অর্জুনের ঔরসে শ্রুতকীর্ত্তি, নকুলের ঔরসে শতানীক এবং সহদেবের ঔরসে শ্রুতসেন, এই পঞ্চপুত্র জন্মে। ভীমের ঔরসে হিড়িম্বার গর্তে ঘটোৎকচের জন্ম হয়। দ্রুপদ রাজার শিখণ্ডী-নাম্নী এক কন্যা জন্মে। স্থূল নামে এক যক্ষ আপন প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিবার অভিপ্রায়ে যাহাকে পুরুষ করিয়া রাখিয়াছিল। এতদ্ভিন্ন কুরু-পাণ্ডবদিগের যুদ্ধে শত সহস্র রাজা সংগ্রাম-বাসনায় সমাগত হইয়া ছিলেন। সেই অসংখ্য রাজগণের নাম অযুত বর্ষেও নির্দেশ করা দুষ্কর, অতএব এই উপাখ্যানের মধ্যে যাঁহারা প্রধান তাঁহাদিগেরই নাম কীর্ত্তিত হইল।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! যে সমস্ত রাজার নাম কীর্ত্তন করিলেন এবং যাঁহাদিগের নাম অকীর্ত্তিত রহিল, তাঁহাদিগের সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। হে মহাভাগ! সেই মহারথ, দেবকল্প ভূপালেরা যে নিমিত্ত এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তাহার আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্ত বলুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! আপনি যাহা আদেশ করিতেছেন, এই রহস্য দেবতারাও জানেন কি না সন্দেহ! এক্ষণে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মাকে নমস্কার করিয়া সেই রহস্য আপনার নিকট নিবেদন করিতেছি, অবধান করুন। পূর্ব্বকালে পরশুরাম পৃথিবীকে এক-বিংশতি বার নিঃক্ষত্রিয়া করিয়া মহেন্দ্র পর্ব্বতে আরোহণপূর্ব্বক তপস্যায় মনোনিবেশ করেন। ভগবান্ ভার্গব ক্ষত্রিয়কুলক্ষয় করিলে ক্ষত্রিয়রমণীগণ সুতার্থিনী হইয়া ব্রাহ্মণ-দিগের নিকট গমন করিলেন। ব্রাহ্মণগণ ঋতুকালে সমাগত ক্ষত্রিয়কুলকামিনীদিগের অভিলাষ পরিপূর্ণ করিতেন। কিন্তু কামতঃ বা ঋতুকালাতিক্রমে তাঁহাদিগের সহবাস করিতেন না। ক্ষত্রিয়াঙ্গনারা এইরূপে ব্রাহ্মণসহযোগে গর্ভবতী হইয়া যথাকালে সাতিশয় বীর্য্যবান্ পুত্র ও কন্যাসকল প্রসব করিতে লাগিলেন। তাহাতেই ক্ষত্রিয়বংশ পুনর্ব্বার ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইল এবং ব্রাহ্মণ প্রভৃতি চারি বর্ণ পুনঃসংস্থাপিত হইল। তৎকালে তির্য্যগ্যানি প্রভৃতি অন্যান্য প্রাণিগণও ঋতুকাল উপস্থিত হইলেই ভার্য্যা-সম্ভোগ করিত। কামতঃ বা ঋতুকালাতিক্রমে কদাচ স্ত্রীসংসর্গ করিত না। কেবল ঋতুকালে স্ত্রীসম্ভোগ করিলে যে সন্তান জন্মে, তাহারা ধর্মপরায়ণ, নির্ব্যাধি ও নিরাধি' হইয়া দীর্ঘকাল জীবিত থাকে। ক্ষত্রিয়েরা পর্ব্বতবন-সমাকীর্ণা এই সসাগরা পৃথ্বীর অধীশ্বর হইয়া ধর্মানুসারে প্রজাপালন করিতে লাগিলেন দেখিয়া, ব্রাহ্মণ প্রভৃতি বর্ণচতুষ্টয় সকলেই অতিশয় প্রীত হইলেন। তাঁহারা কাম ক্রোধ প্রভৃতি দুষ্পবৃত্তির বশীভূত না হইয়া দোষাশ্রিত ব্যক্তিদিগের প্রতি ধৰ্ম্মতঃ দণ্ডবিধানে তৎপর হইলেন এবং তাঁহাদিগের ধর্মপরায়ণতা প্রযুক্ত দেবরাজ ইন্দ্র যথাকালে বারি বর্ষণ করিয়া প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! তৎকালে লোকের অকালমৃত্যু হইত না বা যৌবন কাল অবগত না হইলে কেহ দারপরিগ্রহ করিত না। এইরূপে সসাগরা ধরা দীর্ঘজীবী প্রজাপুঞ্জে পরিপূর্ণ হইল। সেই সময়ে ক্ষত্রিয়েরা প্রচুর ধনদানপূর্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করিতেন। ব্রাহ্মণগণ বেদ, বেদাঙ্গ, উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যয়ন করিতেন। তাঁহারা কদাচ বেদ বিক্রয় বা শূদ্র-সন্নিধানে বেদোচ্চারণ করিতেন না। বৈশ্যেরা বলবান্ বলীবৰ্দ্দ দ্বারাই কৃষি কৰ্ম্ম করিত। দুর্ব্বল গোসকলকে ভারবাহন কার্য্যে নিযুক্ত না করিয়া তাহাদিগকে প্রতিপালন করিত। ফেনপায়ী বৎস সত্ত্বে' ও কেহ গো দোহন করিত না। বণিকেরা কূট-পরিমাণে দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করিত না। সকল লোকই ধর্মপরায়ণ ও সদাচার-তৎপর ছিল। তৎকালে ধর্মের কিছুমাত্র অপচয় হয় নাই। নারীগণ ও ধেনুগণ যথাকালে সন্তান প্রসব করিত। তরুমণ্ডলী যথাসময়ে ফলপুষ্পে পরিপূর্ণ হইত। সত্যযুগে পৃথিবী এইরূপ বহুসংখ্যক লোকে সমাকীর্ণ হয়।
মনুষ্যলোকের অভ্যুদয়কালে রাজাদিগের ক্ষেত্রে অসুরেরা জন্মগ্রহণ করিতে আরম্ভ করিল। অসুরেরা সুরগণ-কর্তৃক বহুশঃ পরাজিত এবং ঐশ্বর্য্য ও স্বর্গ হইতে দূরীকৃত হইয়া ধরাতল আশ্রয় করিতে লাগিল। তাহারা ভূর্লোকে দেবতুল্য প্রভাব অভিলাষ করিয়া গো, মৃগ, হস্তী, অশ্ব, গৰ্দ্দভ, উষ্ট্র, মহিষ, রাক্ষস প্রভৃতি ভূতযোনিতে উৎপন্ন হইতে লাগিল। জাত ও জায়মান অসুরের ভয়ে ধরামণ্ডল আপনাকে ধারণ করিতে অক্ষম হইল। অনন্তর দনুর ঔরসে দিতির গর্তে কতকগুলি অসুর জন্মিল। প্রবল পরাক্রান্ত অতি দুর্দান্ত মদোৎসিক্ত দানবেরা এইরূপে সসাগরা পৃথিবী ব্যাপিয়া ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চারিবর্ণ ও অন্যান্য প্রাণিগণকে নানাপ্রকারে উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা দলবদ্ধ হইয়া প্রাণীদিগকে নিহত ও আহত করিয়া আশ্রমবাসী মহর্ষিদিগের উপর বহুবিধ উপদ্রব করিত এবং পৃথিবীর চারিদিকে ভ্রমণ করিয়া সর্ব্বদা লোকের অনিষ্ট চেষ্টা করিত। হে মহারাজ! তৎকালে অনন্তদেব ও দৈত্যভারাক্রান্তা সসাগরা সপর্ব্বতা ধরা ধারণ করিতে অসমর্থ হইলেন। পরে বসুমতী নিতান্ত শঙ্কিতা হইয়া সৰ্ব্বভূত-পিতামহ ব্রহ্মার শরণাগত হইলেন। ধরণী তথায় উপনীতা হইয়া মহানুভব দেব, দ্বিজ ও মহর্ষিগণে পরিবৃত, গন্ধর্ব্ব অপ্সরোগণকর্তৃক সেবিত, অবিনাশী, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে দেখিলেন এবং তাঁহার সম্মুখীনা হইয়া প্রণাম করিলেন। শরণার্থিনী অবনী সমাগত সমস্ত লোকপালদিগের সমক্ষে ব্রহ্মাকে আত্মসংবাদ নিবেদন করিলেন। সর্ব্বান্তর্যামী ভগবান্ ব্রহ্মা ইতিপূর্ব্বেই ভূমির অভিপ্রায় অবগত হইয়াছিলেন। বিশ্বনির্মাতা বিধাতা সর্ব্বদা সকল লোকের মনোমন্দিরে জাগরূক আছেন, সুতরাং তাঁহার পৃথিবীর অভিপ্রায় জানা নিতান্ত বিস্ময়কর ব্যাপার নহে। তখন তিনি পৃথ্বীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বসুন্ধরে! তুমি যে কারণে আমার শরণাপন্না হইয়াছ, আমি তোমার সেই বিপদ্ নিরাকরণের নিমিত্ত দেবতাদিগকে নিয়োগ করিব। এইরূপ সান্ত্বনাবাক্যে পৃথিবীকে বিদায় করিয়া ভূতভাবন ভগবান্ ব্রহ্মা দেবগণকে আদেশ করিলেন, তোমরা ভূমির ভারহরণ ও অসুরদিগের অনিষ্টসাধন করিবার নিমিত্ত অংশক্রমে ভূতলে জন্মগ্রহণ কর এবং গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, তোমরা নরলোকে যাইয়া উদ্ভূত হও। সুরগুরু ব্রহ্মার এই হিতকর বাক্য শুনিয়া ইন্দ্রাদি দেবগণ তাহাতে সম্মতি প্রদান করিলেন এবং পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইতে কৃতনিশ্চয় হইয়া বৈকুণ্ঠে নারায়ণের নিকট উপনীত হইলেন। ইন্দ্র ভগবান্ চক্রপাণিকে ভূভারহরণের নিমিত্ত জিজ্ঞাসা করিলে তিনি তাঁহাদিগকে অংশক্রমে ভূতলে অবতীর্ণ হইতে পরামর্শ দিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র নারায়ণের সহিত এইরূপ মন্ত্রণা করিয়া দেবগণকে অংশক্রমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইতে আদেশ দিলেন। হে রাজন। তদনন্তর দেবগণ অসুর-বিনাশ দ্বারা প্রজাগণের হিতসাধন করিবার মানসে স্বর্গ হইতে অবতীর্ণ হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে কেহ ব্রহ্মর্ষিবংশে, কেহ বা রাজর্ষিবংশে জন্মগ্রহণ করিলেন। তাঁহারা বাল্যকালেই এরূপ বলিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন যে, দানব, গন্ধর্ব্ব, পন্নগ, রাক্ষস ও নরমাংস-লোলুপ অন্যান্য জন্তুগণকে অবলীলাক্রমে বধ করিতে লাগিলেন।
জনমেজয় কহিলেন, হে মুনিসত্তম! আমি দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা, মানব ও যক্ষ, রাক্ষস প্রভৃতি অন্যান্য জীবগণের জন্মবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শুনিতে বাসনা করি, অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তর বর্ণন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! আমি ভগবান্ স্বয়ম্ভূকে' নমস্কার করিয়া সুরাসুর প্রভৃতির জন্মমরণ বৃত্তান্ত সবিশেষরূপে বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মার মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরাঃ, পুলস্ত্য, পুলহ ও ক্রতু নামে ছয় মানস পুত্র জন্মেন। মরীচির পুত্র কশ্যপ, কশ্যপ হইতেই এই সমস্ত প্রজার সৃষ্টি হইয়াছে। হে মনুজশ্রেষ্ঠ। অদিতি, দিতি, দনু, কালা, দনায়ু, সিংহিকা, ক্রোধা, প্রধা, বিশ্বা, বিনতা, কপিলা, মুনি ও কদ্রু, এই ত্রয়োদশ দক্ষকন্যা কশ্যপের ভাৰ্য্যা ছিলেন। ইঁহাদের গর্ভে কশ্যপের মহাবল পরাক্রান্ত অসংখ্য সন্তান সমুৎপন্ন হয়। হে রাজন। অদিতির গর্তে যথাক্রমে ধাতা, মিত্র, অ্যমা, শত্রু, বরুণ, অংশ, ভগ, বিবস্বান, পৃষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু নামে দ্বাদশ আদিত্য জন্মেন। আদিত্যগণের সর্ব্বকনিষ্ঠ বিষ্ণু সর্ব্বাপেক্ষা গুণজ্যেষ্ঠ। দিতির গর্ন্তে একমাত্র পুত্র জন্মে। তাঁহার নাম হিরণ্যকশিপু। হিরণ্যকশিপুর পঞ্চপুত্র; প্রহ্লাদ, সংহ্লাদ, অনুহ্লাদ, শিবি ও বাস্কল; ইঁহারা সকলেই সুবিখ্যাত ছিলেন। প্রহ্লাদের তিন পুত্র; বিরোচন, কুম্ভ ও নিকুম্ভ। বিরোচনের পুত্র বলি; ইনি ভুবন-বিশ্রুত ছিলেন। বলির পুত্র মহাবল পরাক্রান্ত বাণ; ইনি বহুকালাবধি ভূতনাথ ভবানীপতির আরাধনা করিয়া মহাকাল নামে বিখ্যাত হন। প্রথম, রাজা, বিপ্রচিত্তি, মহাযশাঃ, শম্বর, নমুচি, পুলোমা, বিশ্রুত, অসিলোমা, কেশী, দুর্জয়, দানবন, অয়ঃশিরাঃ, অশ্বশিরাঃ, অশ্বশঙ্কু, বীর্য্যবান্, গগনমূদ্ধা, বেগবান্, কেতুমান, স্বর্ভানু, অশ্ব, অশ্বপতি, বৃষপর্ব্বা, অজক, অশ্বগ্রীব, সূক্ষ্ম, তুহুণ্ড, মহাবল, একপাদ, একচক্র, বিরূপাক্ষ, মহোদর, দিনচন্দ্র, নিকুম্ভ, কুপট, কপট, শরভ, শলভ, সূর্য্য, চন্দ্রমাঃ, এই চত্বারিংশৎ পুত্র দনুর গর্বে জন্মে। একাক্ষ, অমৃতপ, প্রলম্ব, নরক, বাতাপী, শত্রুতাপন, শঠ, গরিষ্ঠ, চ্যবনায়ু, দীর্ঘজিহ্, এই দশ দানবের পুত্র পৌত্রাদি অসংখ্য। চন্দ্রার্কবিদ্বেষী, রাহু, সুচন্দ্র, চন্দ্রহন্তা ও চন্দ্রমৰ্দ্দন, এই কয়েকটি পুত্র সিংহিকার গর্তে জন্মগ্রহণ করেন। সিংহিকা ক্রুরস্বভাবা ছিলেন, এই নিমিত্ত তাঁহার পুত্র-পৌত্রগণ ক্রোধ-পরবশ, ক্রুরকর্মা ও অরিমদ্দন বলিয়া লোকে বিখ্যাত। দনায়ুর চারি পুত্র; বিক্ষর, বল, বীর ও বৃত্র। বিনাশন, ক্রোধ, ক্রোধহন্তা, শত্রু প্রভৃতি শমনসদৃশ প্রহর্তা দানবেরা কালার পুত্র। ইঁহারা সকলেই মহাবল পরাক্রান্ত ও অরিমর্দ্দন ছিলেন। ঋষিপুত্র শুক্র অসুরগণের উপাধ্যায় ছিলেন। শুক্রের চারিপুত্র; ত্বষ্টাধর, অত্রি এবং অপর দুইজন। ইঁহারা চারিজনই সূর্য্যতম তেজস্বী ও ব্রহ্মলোক-পরায়ণ ছিলেন। ইঁহারাই অসুরগণের যাজনক্রিয়া সমাধা করিতেন। হে রাজন! পুরাণে যেরূপ শ্রুত আছে, তদনুসারে দেবাসুরগণের বংশ কীর্ত্তন করিলাম। কিন্তু যে যে দেবতা বা দানবের নামোল্লেখ করিলাম, তাঁহাদের পুত্র-পৌত্রাদি অসংখ্য। অশেষরূপে তাঁহাদিগের নাম নির্দেশ করা অতিশয় | দুঃসাধ্য। তার্য্য, রিষ্টনেমি, গরুড়, অরুণা, আরুণি ও বারুণি, ইঁহারা বিনতার পুত্র। শেষ, অনন্ত, বাসুকি, তক্ষক, কুৰ্ম্ম ও কুলিক, ইঁহারা কদ্রুর পুত্র। ভীমসেন, সুপর্ণ, বরুণ, গোপতি, ধৃতরাষ্ট্র, সূর্য্যবর্চ্চাঃ, সত্যবাক্, অর্ক, পর্ণ, প্রযুত, ভীম, চিত্ররথ, শালিশিরাঃ, পর্জন্য, কলি, নারদ, এই ষোড়শ পুত্র মুনির গর্তে জন্মেন। ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ দেবতা, কেহ কেহ গন্ধর্ব্ব। প্রধার গর্ভে অনবদ্যা, মনু, বংশা, অসুরা, মার্গণপ্রিয়া, অনূপা, সুভগা ও ভাসী, এই কয়েকটি কন্যা এবং সিদ্ধ, পূর্ণ, বহী, পূর্ণায়ু, ব্রহ্মচারী, রতিগুণ, সুপর্ণ, বিশ্বাবসু, ভানু ও সুচন্দ্র, এই দশ পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। পুরাণে কথিত আছে, মহাভাগা প্রধাদেবী দেবর্ষির ঔরসে পরম পবিত্র সুবিখ্যাত অপ্সরোবংশে সমুৎপন্ন হন। অলম্বুষা, মিশ্রকেশী, বিদ্যুৎপর্ণা, তিলোত্তমা, অরুণা, রক্ষিতা, রম্ভা, মনোরমা, কেশিনী, সুবাহু, সুরতা, সুরজা ও সুপ্রিয়া, এই কয়েকটি কন্যা এবং অতিবাহু, হাহা, হুহু, তুম্বুরু প্রভৃতি গন্ধর্ব্বগণ ও ব্রাহ্মণ, অমৃত, গো, গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি নানাবিধ অপত্য কপিলা হইতে সমুৎপন্ন হয়। হে রাজন! আমি তোমার নিকট গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা, ভুজঙ্গ, সুপর্ণ, রুদ্র, মরুৎ এবং গো-ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সমস্ত জীবগণের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণন করিলাম। যে ব্যক্তি অসূয়াশূন্য হৃদয়ে এই শ্রবণানন্দদায়ক সর্ব্বপ্রাণিগণের জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করে ও অন্যকে শুনায়, তাহার আয়ু, পুণ্য ও যশঃ বৃদ্ধি হয়। আর যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণসন্নিধানে নিয়মপূর্ব্বক ইহা পাঠ করে, তাহার ইহকালে ধন ও যশঃ এবং পরকালে সদ্গতি লাভ হয়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! পূর্ব্বে আপনাকে কহিয়াছি যে, মরীচি প্রভৃতি অতি বীর্য্যবান্ ছয়জন মহর্ষি ব্রহ্মার মানস পুত্র। মৃগব্যাধ, সর্প, নির্ঝতি, অজৈকপাদ, অহি, বুধ্য, পিনাকী, দহন, কপালী, স্থাণু ও ভর্গ, মরীচির এই একাদশ পুত্র; ইঁহাদিগকে একাদশ রুদ্র কহে। অঙ্গিরার তিন পুত্র; বৃহস্পতি, উতথ্য ও সম্বর্ত্তা; ইঁহারা সর্ব্বলোকবিখ্যাত। হে নরনাথ! শ্রুত আছে অত্রির অনেক পুত্র; তাঁহারা সকলেই বেদজ্ঞ, সিদ্ধ ও শমগুণাবলম্বী মহর্ষি। হে নরশ্রেষ্ঠ। রাক্ষস, বানর, কিন্নর ও যক্ষগণ ধীমান্ পুলস্ত্যের পুত্র। শলভ, সিংহ, কিংপুরুষ, ব্যাঘ্র ও ঈহামৃগগণ পুলহ হইতে সমুৎপন্ন হয়। ক্রতুর পুত্রগণ স্বীয় পিতার সদৃশ প্রতাপশালী সূর্য্যসহচারী ত্রিভুবন-বিশ্রুত ও সত্যনিষ্ঠ ছিলেন। হে ধরানাথ। শান্তিগুণাবলম্বী, তপঃপরায়ণ ভগবান্ দক্ষ-ঋষি ব্রহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হইতে ও তাঁহার পত্নী প্রজাপতির বামাঙ্গুষ্ঠ হইতে উৎপন্ন হয়েন। মহর্ষি দক্ষ ঐ ভার্য্যার গর্বে পঞ্চাশৎ কন্যা উৎপাদন করেন। মহর্ষির পুত্র জন্মে নাই, এই নিমিত্ত তিনি ঐ সকল সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী কন্যাগণকে পুত্রিকা করিয়াছিলেন। হে রাজন! মহর্ষি দক্ষ ঐ পঞ্চাশটি কন্যার মধ্যে ধর্মকে দশটি, কশ্যপকে ত্রয়োদশটি ও চন্দ্রকে সাতাইশটি বেদবিধানানুসারে সম্প্রদান করেন। ধৰ্ম্ম, চন্দ্র ও কশ্যপের ধৰ্ম্মপত্নীদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কীর্ত্তি, লক্ষ্মী, ধৃতি, মেধা, পুষ্টি, শ্রদ্ধা, ক্রিয়া, বুদ্ধি, লজ্জা ও মতি এই দশটি ধর্ম্মের পত্নী। লোকবিশ্রুতা সময়বোধিকা নক্ষত্ররূপিণী অশ্বিনী ভরণী প্রভৃতি সাতাইশটি চন্দ্রের ভার্য্যা। সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মার পুত্র মনু। মনুর পুত্র প্রজাপতি। ধর, ধ্রুব, সোম, অহঃ, অনিল, অনল, প্রত্যুষ, প্রভাস, এই অষ্ট বসু প্রজাপতি হইতে সমুৎপন্ন হয়েন। ইঁহাদের মধ্যে ধর ও ব্রহ্মবিৎ ধ্রুব ধূম্রার গর্তে জন্মেন; সোম মনস্বিনীর গর্ভে, অহঃ রতার গর্তে, অনিল শ্বাসার গর্তে, অনল শাণ্ডিল্যের গর্তে, প্রত্যূষ ও প্রভাস প্রভাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ধরের দুই পুত্র, দ্রবিণ ও হুতহব্যবহ। সংহার কর্তা ভগবান্ কাল ধ্রুবের পুত্র। সোমের পুত্র বর্চ্চাঃ, যদ্দারা লোক বচ্চস্বী হয়। শিশির, প্রাণ ও রমণ ইঁহারা মনোহরার পুত্র। জ্যোতিঃ, শম, শান্ত ও মুনি ইঁহারা অহের ঔরসে জন্মেন। শরবনবাসী শ্রীমান্ কুমার অগ্নির পুত্র। শাখ, বিশাখ ও নৈগমেয় এই তিন জন কার্তিকেয় অনুজ। কুমার কৃত্তিকাকর্তৃক পালিত হইয়াছিলেন বলিয়া কার্তিকেয় নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। অনিলের ভার্য্যা শিবা, তাঁহার গর্তে মনোজব ও অবিজ্ঞাতগতি নামে অনিলের দুই পুত্র জন্মে। দেবল ঋষি প্রত্যুষের পুত্র। দেবলের দুই পুত্র, তাঁহারা সাতিশয় ক্ষমাবান্ ও বিদ্বান্ ছিলেন। বৃহস্পতির ভগিনী ব্রহ্ম-বাদিনী যোগাসক্তা বরস্ত্রী সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণ করেন। ইঁহার গর্ভে অষ্টম বসু প্রভাসের ঔরসে শিল্পপ্রজাপতি দেবসূত্রধর বিশ্বকর্মা জন্মগ্রহণ করেন। ইনি সর্বশিল্পকরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দেবতাদিগের সমুদায় অলঙ্কার বিমানাদি বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেন। ইঁহার শিল্পকার্য্য উপজীব্য করিয়া মনুয্যেরা জীবিকা নির্বাহ করে এবং শিল্পো-পজীবী লোকেরা সেই অক্ষয় বিশ্বকর্মাকে পূজা করিয়া থাকে।
সর্ব্বলোক সুখাবহ ভগবান্ ধৰ্ম্ম নর-কলেবর ধারণ পুরঃসর ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন ভেদ করিয়া বিনির্গত হয়েন। ধর্ম্মের তিন পুত্র; শম, কাম ও হর্ষ। শমের পত্নী প্রাপ্তি, কামের স্ত্রী রতি ও হর্ষের ভার্য্যা নন্দা। ইঁহাদিগকে অবলম্বন করিয়া লোকযাত্রা নির্ব্বাহ হইতেছে। ঘোটকীরূপধারিণী ত্বাষ্ট্রী সবিতার স্ত্রী। ইনি অন্তরীক্ষে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে প্রসব করেন। হে রাজন! মরীচির পুত্র কশ্যপ হইতে সুরাসুরগণ জন্মেন। অতএব ভগবান্ কশ্যপ হইতেই সমস্ত লোকের উৎপত্তি হইয়াছে বলিতে হইবে।
অদিতির গর্ভে ইন্দ্রাদি দ্বাদশ পুত্র জন্মেন। সর্ব্বজগৎ-পালনকর্তা ভগবান্ বিষ্ণু তাঁহাদিগের সর্ব্বকনিষ্ঠ। রুদ্র, সাধ্য, মরুৎ, বসু, ভার্গব ও বিশ্বদেব, এই নবতি দেবতার নাম কীর্ত্তিত হইল। এক্ষণে ইঁহাদের বংশাবলী, পক্ষ ও গণ কীর্ত্তন করিতেছি। বিনতানন্দন গরুড় ও বলবান্ অরুণ এবং বৃহস্পতি ইঁহারা আদিত্য মধ্যে পরিগণিত। অশ্বিনীকুমারদ্বয়, গুহ্যকগণ যাবতীয় ওষধি ও সমস্ত পশুগণ দেবতামধ্যে পরিগণিত। লোকে আনুপূর্ব্বিক ইহাদের নাম কীর্ত্তন করিলে সর্ব্বপাপ হইতে বিমুক্ত হয়। ভগবান্ ভৃগু ব্রহ্মার হৃদয়দেশ ভেদ করিয়া বিনির্গত হয়েন। ভৃগুর পুত্র শুক্র, ইনি পরম প্রাজ্ঞ কবিশ্রেষ্ঠ। যিনি ত্রৈলোক্যের প্রাণযাত্রার্থে বর্ষাবর্ষ ও ভয়াভয় বিষয়ে ভগবান্ স্বয়ম্ভূকর্তৃক নিযুক্ত হইয়া ত্রিভুবন ভ্রমণ করিতেছেন সেই অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন যোগাচার্য্য শুক্রাচার্য্য দৈত্যগণের গুরু। তিনি যোগক্ষেম' সম্পাদনার্থে বিধাতাকর্তৃক নিযুক্ত হইলে,
ভগবান্ ভৃগু চ্যবন নামে আর এক পুত্র উৎপাদন করেন। যিনি স্বীয় জননীর দুঃখ-মোচনের নিমিত্ত ক্রোধভরে গর্ভ হইতে বহির্গত হয়েন। মনুর কন্যা আরুষী বিচক্ষণ চ্যবনের ভার্য্যা। আরুষীর উরুদেশ ভেদ করিয়া ঔর্ব্ব নামে এক পুত্র নির্গত হয়েন। ইনি বাল্যকালেই সাতিশয় তেজঃশালী, মহাবল পরাক্রান্ত ও নানাগুণযুক্ত হইয়াছিলেন। ঔর্য্যের পুত্র ঋচীক। ঋচীকের পুত্র জমদগ্নি। মহাত্মা জমদগ্নির চারি পুত্র। রাম' তাঁহাদের সর্ব্বকনিষ্ঠ কিন্তু সর্ব্বাপেক্ষা গুণজ্যেষ্ঠ, সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ও ক্ষত্রিয়কুলান্তক। ঔর্ব্বপুত্র ঋচীকের জমদগ্নি প্রভৃতি এক শত পুত্র। এই শত পুত্রের সহস্র সহস্র পুত্রগণ পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইয়াছেন এবং তাঁহার ধাতা ও বিধাতা নামে অপর দুই পুত্র আছেন; পদ্মালয়া লক্ষ্মী তাঁহাদের ভগিনী। আকাশগামী তুরঙ্গমগণ লক্ষ্মীর মানস পুত্র। বরুণের জ্যেষ্ঠা ভার্য্যা শুক্রাদেবী, তাঁহার গর্তে বল নামে পুত্র ও সুরানাম্নী কন্যা জন্মে; অন্নার্থী প্রজাগণের পরস্পর ভক্ষণ হইতে সর্ব্বভূতনাশকারী অধর্মের জন্ম হয়। অধর্ম্মের ভার্য্যা নির্ঝতি, নির্ঝতির গর্তে রাক্ষসগণের জন্ম হয়, এই নিমিত্ত উহারা নৈঋত নামে বিখ্যাত। অধর্মের নিরন্তর পাপকারী তিন পুত্র; ভয়, মহাভয় ও ভূতান্তক মৃত্যু। মৃত্যুর পুত্র কলত্র কিছুই নাই। তাম্রা দেবী সর্ব্বলোক-বিশ্রুতা কাকী, শ্যেনী, ভাসী, ধৃতরাষ্ট্রী ও শুকী, এই পাঁচটি কন্যা প্রসব করেন। তন্মধ্যে কাকীর গর্তে কাক, শ্যেনীর গর্তে শ্যেন, ভাসীর গর্বে ভাস ও গৃধ, লোক বিখ্যাতা ধৃতরাষ্ট্রীর গর্ভে হংস, কলহংস ও চক্রবাক্ এবং যশস্বিনী শুকীর গর্তে শুক জন্মে। কল্যাণ-গুণযুক্তা সর্ব্বলক্ষণ-সম্পন্না মৃগী, মৃগমন্দা, হরী, ভদ্রমনাঃ, মাতঙ্গী, শাদ্দুলী, শ্বেতা, সুরভি ও সর্ব্বলক্ষণোপেতা সুরমা, এই নয় কন্যা ক্রোধ হইতে জন্মে। হে নরোত্তম। মৃগ সমুদায় মৃগীর পুত্র। ভল্লুক ও ক্ষুদ্র জাতীয় হরিণ মৃগমন্দার পুত্র। ভদ্রমনাঃ হইতে মহাগজ দেবনাগ ঐরাবত সমুৎপন্ন হয়েন। বলশালী বানরগণ হরীর গর্তে জন্মে। গোলাঙ্গুল নামে যে বানরবিশেষ তাহারাও হরী হইতে সমুৎপন্ন। মহাসত্ত্ব সিংহ, ব্যাঘ্র ও দ্বীপিগণ শাদ্দুলীগর্ভসম্ভূত। মাতঙ্গগণ মাতঙ্গীর গর্ভে ও শ্বেতাখ্য দ্রুতগতি দিগজ শ্বেতা হইতে জন্মে। হে মহারাজ! সুশীলা রোহিণী ও যশস্বিনী গন্ধর্ব্বী, সুরভির কন্যা। বিমলা, অমলা এবং গো সমুদায় রোহিণী হইতে জন্মে। অশ্বগণ গন্ধর্ব্বীর পুত্র। অমলা হইতে পিণ্ডফল, সপ্তবৃক্ষ ও শুকীনাম্নী কন্যা সমুৎপন্ন হয়। সুরসা হইতে কঙ্ক পক্ষীর উৎপত্তি। অরুণের ভার্য্যা শ্যেনীর গর্বে সম্পাতি ও জটায়ুঃ নামে দুই মহাবল পরাক্রান্ত পুত্র জন্মে। হে ধীমন্। সমস্ত মহৎ প্রাণিগণের জন্মবৃত্তান্ত বিশেষ রূপে কীর্ত্তন করিলাম। ইহা শ্রবণ করিলে লোক পাপপুঞ্জ হইতে বিমুক্ত হয়, সর্ব্বজ্ঞত্ব লাভ করে ও চরমে পরম পদ প্রাপ্ত হয়।
জনমেজয় বৈশম্পায়নকে কহিলেন, হে ভগবন্! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, রাক্ষস, সিংহ, ব্যাঘ্র, মৃগ, সর্প, বিহঙ্গম প্রভৃতি সমুদায় জীবগণ কি উদ্দেশে মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করেন ও তাঁহারা মনুষ্যলোকে জন্মিয়া কি কি কৰ্ম্ম করিয়াছেন, এই সমুদায় আনুপূর্ব্বিক শ্রবণে আমার সাতিশয় বাসনা হইতেছে। মহাশয়! অনুগ্রহ করিয়া কীর্তন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মনুষ্যলোকে যে যে দেবগণ ও দানবগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, অগ্রে তাঁহাদের বিষয় কহিতেছি, শ্রবণ করুন। বিপ্রচিত্তি নামে যে দানবেন্দ্র ছিলেন, তিনি মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করিয়া জরাসন্ধ নামে বিখ্যাত হয়েন। হিরণ্যকশিপু নামে যে দিতির পুত্র, তিনি নরলোকে জন্মিয়া শিশুপাল নামে বিখ্যাত হয়েন। প্রহ্লাদের অনুজভ্রাতা সংহ্লাদ পৃথিবীতে জন্মিয়া শল্য নামে বাহ্লীক দেশের অধীশ্বর হয়েন। অনুহ্লাদ নামে প্রহ্লাদের অপর এক অনুজ, নরলোকে জন্মিয়া মহারাজ ধৃষ্টকেতু নামে বিখ্যাত হয়েন। শিবি নামে দিতিপুত্র ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া মহারাজ দ্রুম নামে বিখ্যাত হয়েন। বাঙ্কলনামা অসুররাজ ভূতলে জন্মিয়া ভগদত্ত নামে বিখ্যাত হরেন। অয়ঃশিরা, অশ্বশিরাঃ অয়ঃশঙ্কু, গগনমূদ্ধা ও বেগবান্, এই পাঁচ মহাবল পরাক্রান্ত মহাসুর কেকয় দেশে জন্মিয়া অতি প্রধান প্রধান ভূপতি হয়েন। কেতুমান্ নামে মহাপ্রতাপবান্ অসুর ভূমণ্ডলে জন্মিয়া প্রমিতৌজাঃ নামে অতি নিৰ্দ্দয় নরপতি হয়েন। স্বর্ভানুনামা সুবিখ্যাত দানব উগ্রসেন নামে অতি নৃশংস ভূপতি হয়েন। ভুবনবিখ্যাত অশ্ব নামে মহাসুর অবনীমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া অশোক নামে বিখ্যাত হয়েন; ইনি অসাধারণ বলশালী ছিলেন; কোন ব্যক্তি কখন ইঁহাকে পরাজিত করিতে পারেন নাই। অশ্বপতি নামে অশ্বের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভূমণ্ডলে হাৰ্দ্দিক্য ভূপতি নামে বিখ্যাত হয়েন। বৃষপর্ব্বা নামে সুবিখ্যাত মহাসুর দীর্ঘপ্রজ্ঞনামা ভূপতি হয়েন। বৃষপর্ব্বার অনুজ অজক শাল্ব নামে সুবিখ্যাত মহীপাল হয়েন। যে বীর্য্যবান্ মহাসুর অশ্বগ্রীব নামে বিখ্যাত, তিনি অবনীমণ্ডলে রোচনাম নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। সূক্ষ্ম নামে অসুর ভূতলে বসুধাধিপ বৃহদ্রথ নামে বিখ্যাত হয়েন। দানবেন্দ্র তুহুণ্ড সেনাবিন্দু নামে মহীপতি হয়েন। ইষুপ নামে মহাবল পরাক্রান্ত মহাসুর নগ্নজিৎ নামে প্রভৃত প্রতাপশালী নরপতি হয়েন। একচক্রনামা যে মহাসুর ছিলেন, তিনি ভূতলে জন্মগ্রহণ করিয়া প্রতিবিন্ধ্য নামে বিখ্যাত হয়েন। বিরূপাক্ষ নামে চিত্রযোধী দানবাগ্রণী ভূতলে জন্মিয়া চিত্রধৰ্ম্মা নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। শত্রুপক্ষক্ষয়কারী সুহরনামা দানব অবনীতলে সুবিখ্যাত বাহীকী নামে ভূপতি হয়েন। নিচন্দ্র নামে পরম সুন্দর দানব ভূতলে মহারাজ মুঞ্জকেশ নামে বিখ্যাত হয়েন। নিকুম্ভ নামে যে মহাবল পরাক্রান্ত দানব ছিলেন, তিনি নরলোকে ভূপতিশ্রেষ্ঠ দেবাধিপ নামে বিখ্যাত হয়েন। শরভনামা মহাদানব রাজর্ষি পৌরব নামে বিখ্যাত হয়েন। কুপথ নামে মহাবল পরাক্রান্ত মহাসুর সুপার্শ্ব নামে সুবিখ্যাত ভূপতি হয়েন। ক্রম নামে মহাসুর ধরাতলে জন্মিয়া পার্ব্বতেয় নামে বিখ্যাত হয়েন। ইঁহার কলেবর সুমেরু পর্ব্বতের সদৃশ ছিল। শলব নামে মহাসুর, বাহীক দেশে প্রহ্লাদ নামে নরপতি হয়েন। চন্দ্রসদৃশ রূপবান্ চন্দ্রনামক অসুর মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করিয়া কম্বোজ দেশা-ধিপতি চন্দ্রবর্মা নামে সুবিখ্যাত ভূপতি হয়েন। অর্ক নামে যে সুবিখ্যাত দানবশ্রেষ্ঠ ছিলেন, তিনি মর্ত্যলোকে রাজর্ষি ঋষিক বলিয়া বিখ্যাত হয়েন। মৃতপা নামে দানবেন্দ্র, ভূতলে পশ্চিমা-নূপক নামে প্রথিত হয়েন। গরিষ্ঠ নামে ত্রিভুবন বিখ্যাত মহা-বল পরাক্রান্ত মহাসুর নরলোকে দ্রুমসেন নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। ময়ূরনামা শ্রীমান্ মহাসুর, ধরাতলে বিশ্ব নামে ভূপতি হয়েন। সুপর্ণ নামে তাঁহার সহোদর, অবনীমণ্ডলে কালকীর্তি নামে মহীপাল হয়েন। অসুরপ্রধান চন্দ্রহন্তা, রাজর্ষি শুনক নামে বিখ্যাত হয়েন। যে দানব বিনাশন বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন, তিনি ভূতলে জানকি নামে বিখ্যাত ভূপাল হয়েন। দীর্ঘজিহ্ নামে দানবশ্রেষ্ঠ, পৃথিবীতে কাশিরাজ নামে বিখ্যাত হয়েন। চন্দ্রসূর্য্য-মদনকারী যে ক্রুর গ্রহ সিংহিকাগর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি ক্রাথ নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। অনায়ুর চারি পুত্রের মধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ বিক্ষর নামক অসুর, ভূমণ্ডলে বসুমিত্র নামে বসুধাপতি হয়েন। দ্বিতীয়, পাণ্ড্যরাষ্ট্রাধিপ নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। বলীন নামে সুবিখ্যাত অসুর, ভূতলে পৌন্ড্রমৎস্যক নামে ভূপতি হয়েন। মহাসুর বৃত্র রাজর্ষি মণিমান্ নামে প্রথিত হয়েন। মণিমানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ক্রোধহন্তা, দণ্ড নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। ক্রোধবর্দ্ধন নামে যে অসুর ছিলেন, তিনি দণ্ডাধার নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। কালেয়দিগের ব্যাঘ্রতুল্য বিক্রমশালী যে আট পুত্র ভূমণ্ডলে জন্মেন, তাঁহাদের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ মগধ দেশে জয়ৎসেন নামে সুবিখ্যাত নৃপতি হয়েন। দ্বিতীয় ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী ছিলেন, তিনি অপরাজিত নামে নৃপাল হয়েন। মহাতেজাঃ মহাবলপরাক্রান্ত মহামায়াবী তৃতীয়, নিযাদ দেশের অধিপতি হয়েন। চতুর্থ, শ্রেণিমান্ নামে বিখ্যাত নৃপতি হয়েন। পঞ্চম, মহৌজাঃ নামে শত্রুকুলান্তক নৃপতি হয়েন। তাঁহাদিগের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান্ ষষ্ঠ মহাসুর, অভীরু নামে সুবিখ্যাত রাজর্ষি হয়েন। সপ্তম, সমস্ত অবনীমণ্ডলে সুবিখ্যাত সমুদ্রাসন নামে নরপতি হয়েন। কালেয়দিগের অষ্টম বৃহৎ নামে দানব, ভূতলে সর্ব্বলোকহিতৈষী পরম ধার্মিক ভূপতি হয়েন। কুক্ষি নামে- মহাবলপরাক্রান্ত মহাসুর, ক্ষিতিতলে পার্ব্বতীয় নামে বিখ্যাত ভূপতি হয়েন। ইঁহার কলেবর কাঞ্চন পর্ব্বতের সমান ছিল। মহাবীর্য্যসম্পন্ন মহাসুর ক্রথন সূর্য্যাক্ষ নামে বিখ্যাত হয়েন। সূর্য্য নামে পরম সুন্দর মহাসুর, বাহীক দেশে দরদ নামে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ভূপতি হয়েন। হে রাজন! গণ নামে যে ক্রুদ্ধস্বভাব দানবের নাম পূর্ব্বে উল্লেখ করা গিয়াছে, তাঁহা হইতে অনেকানেক মহাবল পরাক্রান্ত মহীপতি মহীতলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। মদ্রক, কর্ণবেষ্ট, সিদ্ধার্থ, কীটক, সুবীর, সুবাহু, মহাবীর, বাহ্লীক, ক্রথ, বিচিত্র, সুরথ, নীল, চীরবাসাঃ, ভূমিপাল, দন্তবক্র, দুর্জয়, রুক্মী, আষাঢ়, বায়ুবেগ, ভূরিতেজাঃ, একলব্য, সুমিত্র, বাটধান, গোমুখ, কারুষক, ক্ষেমমূর্তি, শ্রুতায়ুঃ, উদ্বহ, বৃহৎসেন, ক্ষেম, অগ্রতীর্থ, কুহর, মতিমান্ ও ঈশ্বর, এই সমস্ত মহাবীর্য্য মহাযশাঃ ভূপতিগণ ক্ষিতিতলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত মহাসুর কালনেমি, উগ্রসেনের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া কংস নামে বিখ্যাত হয়েন। দেবরাজ-তুল্য দেবক নামে দানব, ধরাতলে গন্ধর্ব্বপতি-নামক প্রধান ভূপতি হয়েন।
হে ভরতকুল-তিলক! পবিত্রকীর্ত্তি দেবর্ষি বৃহস্পতির অংশে ভরদ্বাজবংশাবতংস অযোনিজ দ্রোণাচার্য্য জন্মেন। এই মহাত্মা অসাধারণ ধনুর্দ্ধর, অদ্বিতীয় পরাক্রমশালী, অতুল যশস্বী এবং বেদ ও ধনুর্ব্বেদে সুনিপুণ ছিলেন। মহাদেব, যম, কাম ও ক্রোধ, এই চারিজনের সমষ্টীভূত অংশ হইতে মহাবীর অশ্বত্থামার জন্ম হয়। অষ্টবসুগণ বশিষ্ঠের শাপে নিয়ন্ত্রিত হইয়া ইন্দ্রের আদেশানুসারে শান্তনু রাজার ঔরসে গঙ্গাগর্তে জন্মগ্রহণ করেন। ভীষ্ম তাঁহাদের সর্ব্ব কনিষ্ঠ। ইনি কুরুকুলের অভয়প্রদ, বুদ্ধিমান, বিদ্বান্, সদ্বক্তা, শত্রুপক্ষক্ষয়কারী ও সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ছিলেন। মহাত্মা ভীষ্ম জমদগ্নিনন্দন পরশুরামের সহিত যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করেন। অসাধারণ পুরুষকারসম্পন্ন ∎ যে ব্রহ্মর্ষি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কৃকূপ নামে বিখ্যাত - হয়েন, তিনি একাদশ রুদ্রের অংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। শত্রুকুলান্তক মহারথ শকুনি দ্বাপরের অংশে জন্মেন। সত্য--প্রতিজ্ঞ অরাতিকুলনাশক বৃষ্ণিকুলতিলক সাত্যকি বায়ুদেবতা-দিগের অংশে জন্মগ্রহণ করেন। সর্ব্বশাস্ত্রবেত্তা রাজর্ষি দ্রুপদ, ক্ষত্রিয়সত্তম নরনাথ কৃতবর্মা ও পররাজ্যপ্রপীড়ক শত্রুনাশক ভূপতি বিরাট এই তিন ভূপতিও বায়ুর অংশে জন্মগ্রহণ করেন। অরিষ্টার পুত্র হংস, কুরুকুলে জন্মগ্রহণ করিয়া গন্ধর্ব্বগণের রাজা হয়েন। দীর্ঘবাহু, মহাতেজাঃ, প্রজ্ঞাচক্ষুঃ ভূপতি ধৃতরাষ্ট্র, কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে জন্মেন। ইনি মাতৃদোষজন্য কৃষ্ণদ্বৈপায়নের কোপে জন্মান্ধ হয়েন। তৎকনিষ্ঠ পাণ্ডু মহাবল সত্যনিষ্ঠ ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন। ধীমান্ বিদুর অত্রি মুনির পুত্র। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন কলির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি অতি পাপাশয়, ক্রুর ও কুরুকুলের কলঙ্কস্বরূপ ছিলেন। যে কলি সমস্ত জগতের বিদ্বেষা-স্পদ এবং যিনি জীবমাত্রের সংহারকর্তা তিনিই দুর্য্যোধনরূপে অবনীতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। এই দুর্য্যোধন হইতেই ভয়ঙ্কর বৈরাগ্নি উত্তেজিত হয়। পৌলস্ত্যেরা দুর্য্যোধনের ভ্রাতারূপে জন্মেন। দুঃশাসন, দুর্মুখ, দুঃসহ প্রভৃতি দুর্য্যোধনের শত ভ্রাতা। ইঁহারাও অতিশয় ক্রুরকর্মা। এই শত পুত্র ব্যতীত ধৃতরাষ্ট্রের বৈশ্যাগসম্ভূত অপর এক পুত্র জন্মেন, তাঁহার নাম যুযুৎসু।
জনমেজয় কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদিগের মধ্যে কাহার কি নাম ও তাঁহারা কাহার পর কে জন্মেন, আনুপূর্ব্বিক কীর্তন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, দুর্য্যোধন, যুযুৎসু, দুঃশাসন, দুঃসহ, দুঃশল, দুর্মুখ, বিবিংশতি, বিকর্ণ, জলসন্ধ, সুলোচন, বিন্দ, অনুবিন্দ, দুর্দ্ধর্ষ, সুবাহু, সুপ্রধর্ষণ, দুৰ্ম্মর্ষণ, দুর্মুখ, দুষ্কর্ণ, কর্ণ, চিত্র, উপচিত্র, চিত্রাক্ষ, চারুচিত্র, অঙ্গদ, দুৰ্ম্মদ, দুষ্প্রহর্ষ, বিবিৎসু, বিকট, সম, ঊর্ণনাভ, পদ্মনাভ, নন্দ, উপনন্দ, সেনাপতি, সুসেন, কুণ্ডোদর, মহোদর, চিত্রবাহু, চিত্রবৰ্ম্মা, সুকৰ্ম্মা, দুর্ব্বিরোচন, আয়োবাহু, মহাবাহু, চিত্রচাপ, সুকুণ্ডল, ভীমবেগ, ভীমবল, বলাকী, ভীমবিক্রম, উগ্রায়ুধ, ভীমশর, কনকায়ুঃ, দৃঢ়ায়ুধ, দৃঢ়কৰ্ম্মা, দৃঢ়ক্ষেত্র, সোমকীর্তি, অনূদর, জরাসন্ধ, দৃঢ়সন্ধ, সত্যসন্ধ, সহস্রবাক্, উগ্রশ্রবাঃ, উগ্রসেন, ক্ষেমমূর্তি, অপরাজিত, পণ্ডিতক, বিশালাক্ষ, দুরাধন, দৃঢ়হস্ত, সুহস্ত, বাতবেগ, সুর্ব্বচাঃ, আদিত্যকেতু, বহুাশী, নাগদত্ত, অনুযায়ী, কবচী, নিযঙ্গী, দণ্ডী, দণ্ডাধার, ধনুগ্রহ, উগ্র, ভীমরথ, বীর, বীরবাহু, আলোলুপ, অভয়, রৌদ্রকর্মা, দৃঢ়রথ, অনাধুষ্য, কুণ্ডভেদী, বিরাবী, দীর্ঘলোচন, দীর্ঘবাহু, ব্যুঢ়োরু, কনকাঙ্গদ, কুণ্ডজ ও চিত্রক; এই এক শত পুত্র ও দুঃশলানাম্নী কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে জন্মেন। এতদ্ভিন্ন বৈশ্যার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের যে পুত্র জন্মেন তাঁহার নাম যুযুৎসু। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের আনুপূর্ব্বিক নাম কীর্ত্তন করিলাম। ইঁহারা সকলেই বেদবেত্তা রাজনীতিপারদর্শী ও যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ; এবং সকলেই স্বস্বানুরূপ দারপরিগ্রহ করিয়াছিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সৌবলের অনুমতিক্রমে যথাকালে সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথের সহিত দুঃশলার উদ্বাহক্রিয়া সম্পন্ন করিয়াছিলেন।
হে নরনাথ। রাজা যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের অংশে জন্মগ্রহণ করেন; ভীমসেন বায়ুর অংশে, অর্জুন দেবরাজ ইন্দ্রের অংশে এবং সর্ব্বভূত মনোহর অপ্রতিমরূপশালী নকুল এবং সহদেব অশ্বিনী-কুমারদ্বয়ের অংশে জন্মেন। সুবিখ্যাত সোমতনয় বর্চ্চাঃ, অর্জুনপুত্র অভিমন্যুরূপে জন্মগ্রহণ করেন। বর্চ্চার পৃথ্বীতলে অবতীর্ণ হইবার পূর্ব্বে ভগবান্ সোম, দেবগণকে কহিলেন, হে দেবগণ! এই পুত্র আমার প্রাণ হইতেও প্রিয়তর; অতএব ইঁহাকে দিতে আমি সম্মত নহি। তবে যদি তোমরা এই নিয়ম কর, তাহা হইলে প্রিয় পুত্রকে তোমাদিগের হস্তে সমর্পণ করিতে পারি। অসুরবধ কেবল দেবগণের কার্য্য নহে, উহাতে আমা-দিগেরও সাহায্য করা কর্ত্তব্য। এই নিমিত্ত অগত্যা ইহাকে দিতে স্বীকৃত হইলাম, কিন্তু এই বর্চ্চাঃ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া চিরকাল থাকিতে পারিবেন না। হে অমরগণ। ইন্দ্রের অংশে পাণ্ডুরাজার অর্জুন নামে অতি প্রতাপশালী যে পুত্র জন্মিবেন, বর্চ্চাঃ তাঁহারই পুত্র হইয়া পৃথ্বীতলে জন্মগ্রহণ করিবেন ও প্রসিদ্ধ অতিরথ-গণনায় পরিগণিত হইয়া ষোড়শ বৎসর পৃথিবীতে অবস্থান করিবেন। হে দেবগণ! তোমরা অংশাবতার হইয়া যে সংগ্রামে অসুরনিপাত করিবে, ইঁহার ষোড়শবর্ষ বয়ঃক্রম পূর্ণ হইবার অনতিপূর্ব্বেই ঐ যুদ্ধ উপস্থিত হইবে, কিন্তু সেই যুদ্ধে কৃষ্ণ ও অর্জুন থাকিবেন না, কেবল তোমরা চক্রব্যূহ সংস্থাপন করিয়া অসুরগণের সহিত যুদ্ধ করিবে। আমার এই পুত্র সমস্ত শত্রুপক্ষীয় সৈন্যগণকে বিমুখ করিবেন। ইনি দুর্ভেদ্য ব্যূহ ভেদ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দিনার্দ্ধভাগের মধ্যে সংগ্রামনিপুণ অতিরথ ও মহারথগণ এবং চতুর্থাংশ বিপক্ষ পক্ষীয় সৈন্য শমনসদনে প্রেরণ করিবেন। তৎপরে দিবাবসান সময়ে সংগ্রামে নিহত হইয়া পুনরায় আমার সমীপে আগমন করিবেন। অভিমন্যুরূপী মদীয় পুত্রের যে পুত্র জন্মিবে, সেই পুত্র প্রনষ্টপ্রায় ভারতবংশের পুনরুদ্ধার করিবে। দেবগণ ভগবান্ সোমের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া "তথাস্তু” বলিয়া স্বীকার করিলেন এবং তাঁহার যথোচিত পূজা করিলেন। হে নরনাথ। তোমার পিতামহ এইরূপে অবনীমণ্ডলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
হে মহারাজ! মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন অগ্নির অংশে জন্মেন। রাক্ষসের অংশে স্ত্রীপূর্ব্বরূপী (পুরুষলক্ষণহীন) শিখণ্ডী উৎপন্ন হন। দ্রৌপদীর গর্ভে যে পঞ্চপুত্র জন্মেন তাঁহারা পূর্ব্বজন্মে বিশ্বনামে দেবগণ ছিলেন। এই পঞ্চ পুত্রের মধ্যে প্রতিবিন্ধ্য যুধিষ্ঠিরের ঔরসে, শ্রুতসোম ভীমের ঔরসে, শ্রুতকীর্ত্তি অর্জুনের ঔরসে, শতানীক নকুলের ঔরসে ও শ্রুতসেন মহদেবের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। যদুবংশাবতংস শূরনামক রাজা বসুদেবের পিতা। তাঁহার পৃথানাম্নী এক পরমরূপবতী কন্যা ছিল। শূর স্বীয় পিতৃম্বস্রীয়পুত্র অনপত্য কুন্তীভোজের নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, "আমার প্রথম সন্তান তোমাকে প্রদান করিব।” তিনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞানুসারে সেই সর্ব্বাগ্রজাতা কন্যাটি তাঁহাকে প্রদান করিলেন। পৃথা কুন্তীভোজের গৃহে শশাঙ্ককলার ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিতা হইতে লাগিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ ও অতিথিগণের সেবায় নিযুক্ত থাকিতেন। একদা জিতেন্দ্রিয় উগ্রতপস্বী মুনিপ্রবর দুর্ব্বাসাঃ কুন্তীভোজের আলয়ে আতিথ্য স্বীকার করেন। অতিথিসৎকার-নিপুণা পৃথা সাতিশয় যত্নসহকারে তাঁহার যথোচিত পরিচর্যা করিলেন। মুনিবর পৃথার শুশ্রূষায় পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে এক মন্ত্র প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, বৎসে! এই মন্ত্রদ্বারা তুমি যে দেবতাকে আহ্বান করিবে তিনি তৎক্ষণাৎ আগমন করিয়া তোমার গর্ভে স্বানুরূপ পুত্র উৎপাদন করিবেন। দুর্ব্বাসাঃ বিদায় হইলে কুমারী পৃথা বালাসুলভ-চপলতা প্রযুক্ত সেই মন্ত্রদ্বারা সূর্য্যদেবকে আহ্বান করিলেন। ভগবান্ ভাস্কর সেই মন্ত্রপ্রভাবে পৃথাসন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার গর্ভাধান করিলেন। সেই গর্ব হইতে সর্ব্বশাস্ত্রদক্ষ বিচিত্রকুণ্ডলধারী কবচী সূর্য্যসমতেজস্বী এক পুত্র যথাকালে ভূমিষ্ঠ হইল। কুন্তী কন্যকাবস্থায় সন্তান হইয়াছে বলিয়া, লোকাপবাদভয়ে সেই সদ্যঃপ্রসূত পুত্রকে জলে নিক্ষেপ করিলেন। যশস্বী রাধাভর্তা সেই সুকুমার নবকুমারকে জল হইতে গ্রহণ করিয়া স্বীয় সহধর্মিণী রাধাকে প্রদান করিলেন; অনন্তর তাঁহারা ঐ পুত্রের বসুষেণ নাম দিয়া লালন পালন করিতে লাগিলেন। বসুষেণ কিয়দ্দিনমধ্যেই অত্যন্ত বলবান্ অস্ত্রবিদ্যা-বিশারদ ও বেদাঙ্গবেত্তা হইয়া উঠিলেন। এই সত্য-পরাক্রম, ধীশক্তিসম্পন্ন বসুষেণ যখন জপ করিতে বসিতেন, তখন যে কোন ব্রাহ্মণ তাঁহার নিকট যাহা প্রার্থনা করিতেন, তিনি তৎক্ষণাৎ তাহা দিতেন। একদা ভগবান্ ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশ ধারণ করিয়া তাঁহার সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক আপন পুত্রের নিমিত্ত তাঁহার কুণ্ডলদ্বয় ও কবচ প্রার্থনা করিলেন। বসুষেণ তৎক্ষণাৎ স্বীয় শরীর হইতে কবচ ও কুণ্ডল উন্মোচন করিয়া তাঁহাকে প্রদান করিলেন। ইন্দ্র তাঁহার এই অসামান্য বদান্যতা দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া তাঁহাকে একপুরুষঘাতিনী এক শক্তি প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, হে দুর্দ্ধর্ষ। তুমি দেব, দানব, মনুষ্য, গন্ধর্ব্ব, উরগ ও রাক্ষস প্রভৃতি যাহার প্রতি এই শক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করিবে, তাহার অবশ্যই মৃত্যু হইবে, সন্দেহ নাই। ইন্দ্র এই বলিয়া তিরোহিত হইলেন। তদবধি বসুষেণের নাম বৈকর্তন ও কর্ণ হইল। যে মহাত্মা বসুষেণ নামে বিখ্যাত ছিলেন, তিনিই কর্ণ নামে প্রথিত হইয়া সূতকূলে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। হে নরনাথ! এই কর্ণকে সর্ব্বাস্ত্রবিশারদ নরশ্রেষ্ঠ দুর্য্যোধনের প্রধান সচিব এবং সূর্য্যের অংশ বলিয়া জানিবেন।
হে রাজন! প্রতাপশালী বাসুদেব দেবদেব নারায়ণের অংশ। মহাবল বলভদ্র শেষ নাগের অংশ। মহৌজাঃ প্রদ্যুম্ন সনৎকুমারের অংশ। এইরূপে বসুদেববংশে দেবগণের অংশে বহুতর নরেন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। হে মহারাজ! পূর্ব্বে যে সমস্ত অপ্সরাগণের কথা কহিয়াছি, তাঁহাদের অংশে ইন্দ্রের আদেশা-নুসারে ষোড়শ সহস্র দেবীগণ ভূতলে জন্মগ্রহণ করিয়া ভগবান্ বাসুদেবের পরিগ্রহ হয়েন। রুক্মিণী নারায়ণের প্রীতি সাধনার্থ লক্ষ্মীদেবীর অংশে ভীষ্মক রাজার কুলে সমুৎপন্ন হয়েন। সর্ব্বলক্ষণসম্পন্না দ্রৌপদী দ্রুপদ রাজার কুলে শচীর অংশে জন্মেন। এই কন্যা বেদিমধ্য হইতে বিনির্গত হয়েন। ইনি নাতিহ্রস্বা ও নাতিদীর্ঘা। ইঁহার গাত্রে নীলোৎপল গন্ধ, চক্ষুঃ পদ্মপত্রের ন্যায় বিশাল, নিতম্ব অতি মনোহর ও বর্ণ বৈদূর্য্য মণির ন্যায় ছিল। ইনি পাঁচ প্রধান পুরুষের চিত্তপ্রমোদ জন্মাইয়া-ছিলেন। সিদ্ধি ও ধৃতির অংশে কুন্তী ও মাদ্রী জন্মেন। ইহারা পঞ্চ পাণ্ডবের মাতা। মতিনাম্নী কন্যা সুবলের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। হে নরনাথ! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও রাক্ষস-দিগের অংশাবতার কীর্ত্তন করিলাম। যে সমস্ত সংগ্রামলোলুপ মহাত্মা ভূপতিগণ বিশাল যদুকুলে জন্মগ্রহণ করেন এবং যে সকল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যগণ ঐ উপলক্ষ্যে ধরাতলে জন্মেন, তাঁহাদিগেরও নাম কীর্ত্তন করিলাম। প্রাজ্ঞ ব্যক্তি অসূয়াশূন্য হৃদয়ে এই পরমোৎকৃষ্ট অংশাবতরণ' বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলে তাঁহাদিগের আয়ুঃ, যশঃ, বংশবর্দ্ধন ও সর্ব্বত্র বিজয়লাভ হয়। ইহা শ্রবণ করিলে লোকে দেবাসুর প্রভৃতির উৎপত্তি ও বিনাশ অবগত হইয়া অত্যন্ত ক্লেশদায়ক অবস্থায়ও অবসন্ন হয় না।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা ও রাক্ষসগণের অংশাবতরণ সবিশেষ শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে কুরুদিগের বংশবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে বাসনা করি, মহাশয়! অনুগ্রহ করিয়া এই সকল ব্রহ্মর্ষিগণ-সন্নিধানে বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতকুল-প্রদীপ! পূর্ব্বকালে পুরুবংশের আদিপুরুষ দুষ্মন্ত নামে এক মহাবল পরাক্রান্ত মহীপাল ছিলেন। সেই মহাত্মা ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়াদি চতুৰ্ব্বর্ণাধিষ্ঠিত ও যবনাদি ম্লেচ্ছজাতি সমাকীর্ণ সসাগরা ধরার প্রধান চারি খণ্ডে এবং নানাবিধ দ্বীপ ও উপদ্বীপে একাধিপত্য করিতেন। তাঁহার রাজ্যশাসন সময়ে বর্ণসঙ্কর এবং পরদারনিরত বা অন্য কোন প্রকার পাপাসক্ত লোক ছিল না। সকলেই ধর্মপরায়ণ ছিলেন। কি চৌর্য্যভয়, কি ক্ষুধাভয়, কি ব্যাধিভয়, তৎকালে কিছুই ছিল না। তৎকালীন সমস্ত লোকই সেই মহীপালকে আশ্রয় করিয়া অকুতোভয় ও অনন্যকৰ্ম্মা হইয়া কেবল স্বধৰ্ম্মে ও দৈবকর্ম্মে তৎপর থাকিত। তাঁহার অধিকারকালে ঘনাবলী যথাকালে বারিবর্ষণ করিত, শস্যসকল অতি সুরস হইত এবং পৃথিবী নানাবিধ রত্নে ও পশুযুথে পরিপূর্ণ থাকিত! সেই অসাধারণ বলবীর্য্যসম্পন্ন রাজার শরীর বজ্রের ন্যায় দৃঢ় ছিল। তিনি স্বহস্তে মন্দরপর্ব্বত উত্তোলন করিয়া অনায়াসে বহন করিতে পারিতেন এবং চতুর্ব্বিধ গদাযুদ্ধে ও সর্ব্ব প্রকার শস্ত্রযুদ্ধে অসাধারণ্য লাভ করিয়াছেন। সেই সর্ব্বলোক-সুবিখ্যাত প্রজারঞ্জক ভূপতি বলে বিষ্ণুতুল্য, তেজে ভাস্করতুল্য, গাম্ভীর্য্যে সাগরতুল্য ও সহিষ্ণুতায় ধরাতুল্য ছিলেন। তিনি ন্যায়পরতা ও ধর্মপরতাদ্বারা সকল লোকের মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিতেন।
জনমেজয় কহিলেন, হে তত্ত্ববিৎ! মহামতি ভরতের জন্ম ও চরিত, শকুন্তলার উৎপত্তি এবং মহাবীর রাজা দুষ্মন্ত কিরূপে শকুন্তলা লাভ করিয়াছিলেন, এই সমস্ত আনুপূর্ব্বিক শুনিতে বাসনা করি। বৈশম্পায়ন কহিলেন, একদা সেই মহাবাহু রাজা দুষ্মন্ত শত শত হস্ত্যশ্বপরিবৃত ও খড়া, শক্তি, গদা, মূষল, প্রাস, তোমর প্রভৃতি বিবিধ অস্ত্রধারী সেনাগণে বেষ্টিত হইয়া মৃগয়ার্থ মহাবনে যাত্রা করিলেন। তাঁহার যাত্রাকালে সেনাগণের সিংহনাদ, শঙ্খদুন্দুভিধ্বনি, রথচক্রনির্ঘোষ, করিবৃংহিত', অশ্বহ্রেষিত' ও নানাবিধ অস্ত্র শস্ত্রের ভয়ঙ্কর নিস্বনদ্বারা ঘোরতর কোলাহল ধ্বনি উপস্থিত হইল। নগরবাসিনী মহিলাগণ অট্টালিকার শিখরদেশে আরোহণ করিয়া সেই যশস্বী, শত্রুহন্তা, ইন্দ্রসদৃশ, নরপতির সৈন্যশোভা সন্দর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইল এবং প্রশংসাপূর্ব্বক ত্বদীয় মস্তকোপরি পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, এই চারিবর্ণ সেই নারায়ণতুল্য পরাক্রমশালী দুষ্মন্তকে আশীর্ব্বাদ ও জয়ধ্বনি করিতে করিতে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কিয়দ্দূর গমন করিয়া রাজার আজ্ঞানুসারে ক্রমে ক্রমে সকলেই প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। পরে রাজা সুবর্ণপ্রভ রথোপরি আরোহণ করিয়া গহন বনমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দেখিলেন; সেই অরণ্য বিশ্ব, অর্ক, কপিথ, ধর, খদির প্রভৃতি নানাবিধ বৃক্ষে সমাকীর্ণ; পৰ্ব্বতভ্রষ্ট অনল্প পাষাণখণ্ডে ব্যাপ্ত এবং সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি বহুবিধ হিংস্র জন্তু দ্বারা সমাবৃত রহিয়াছে; ঐ বন বহুযোজন বিস্তৃত কিন্তু উহার মধ্যে কোন স্থানেই জল নাই এবং মনুষ্যের সমাগম নাই। মহারাজ দুষ্মন্ত সেনাগণ সমভিব্যাহারে বিবিধ মৃগবধদ্বারা সেই বনকে আলোড়িত করিলেন। দূরস্ত মৃগগণকে বাণদ্বারা এবং সমীপস্থদিগকে খড়া দ্বারা বিনাশ করিয়া ভূতল-শায়ী করিতে লাগিলেন। সিংহ, শাৰ্দ্দুল, বরাহ প্রভৃতি পশুগণ, অসাধারণ বলবীর্য্যসম্পন্ন সসৈন্য রাজার আক্রমণভয়ে আলোড়িত বনভূমি পরিত্যাগ করিয়া প্রাণভয়ে ভয়ানক স্বরে চীৎকার করিতে করিতে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা পলায়নবেগ জন্য ক্ষুৎপিপাসায় বিচেতনপ্রায় হইয়া কেহ নদীমধ্যে, কেহ ভূপৃষ্ঠে, কেহ বা তরুতলে পতিত হইতে লাগিল। সৈন্যগণ অগ্নি প্রজ্বালন পূর্ব্বক ঐ সমস্ত হতপশুর মাংস দগ্ধ করিয়া ভক্ষণ করিতে লাগিল। ঐরাবততুল্য পরাক্রমশালী মত্ত গজযূথ সকল শস্ত্রাঘাতে ক্ষত বিক্ষত হইয়া শোণিত মোক্ষণ ও শকৃম্মুত্র' পরিত্যাগপূর্ব্বক শূণ্ডাগ্রসঙ্কোচ করিয়া মহাবেগে পলায়ন করিতে করিতে সহস্র সহস্র জীবের প্রাণ বিয়োগ করিল। এইরূপে রাজা দুষ্মন্ত সেনাগণ সমভিব্যাহারে সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি পশু বধ করিয়া সেই বন এককালে পশুহীন করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে রাজা দুষ্মন্ত সৈন্য সমভিব্যাহারে সহস্র সহস্র মৃগের প্রাণবধ করিয়া অন্য এক বনে প্রবেশ করিলেন। মহারাজ দুষ্মন্ত মৃগের অনুসরণক্রমে সেই বনের প্রান্তভাগে এক বৃহৎ প্রান্তর দেখিতে পাইলেন। অনন্তর সেই প্রান্তর অতিক্রম করিয়া সুশীতল সমীরণভরে সঞ্চালিত, আশ্রমসমাকীর্ণ, অন্য এক পরম রমণীয় মহারণ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। ঐ বন সুপুষ্পিত পাদপসমূহে সমাকীর্ণ, সুকোমল বালতৃণদ্বারা আচ্ছাদিত ও বৃক্ষগণের শাখাচ্ছায়ায় আবৃত। উহার কোন স্থানে ময়ূর, পুংস্কোকিল প্রভৃতি নানাবিধ পক্ষিগণ সুমধুর স্বরে কলরব করিতেছে; কোন স্থানে ঝিল্লিগণ নিনাদ করিতেছে; কোথাও বা ভ্রমরগণ ঝঙ্কার করিতে করিতে এক পুষ্প হইতে পুষ্পান্তরে বসিতেছে। ঐ বনে কোন বৃক্ষই ফলপুষ্পহীন বা কণ্টকাবৃত ছিল না এবং যে পুষ্পে ভ্রমর নাই এমন পুষ্পও ছিল না। রাজা বিহগকুলনিনাদিত, বহুবিধ সুগন্ধি কুসুমে সুশোভিত, সর্ব্বর্ত্ত-কুসুমাকীর্ণ সুখচ্ছায়া সমাবৃত, সেই মনোহর বনে প্রবেশ করিবামাত্র সুপুষ্পিত তরুগণ সমীরণবেগে সঞ্চালিত হইয়া তাঁহার মস্তকোপরি পুনঃ পুনঃ পুষ্পবর্ষণ করিতে লাগিল; বিচিত্র কুসুমযুক্ত অত্যুন্নত বৃক্ষ-শ্রেণীতে পক্ষিগণ সুমধুর স্বরে গান করিতে লাগিল এবং পুষ্পভারাবনত তরুপল্লবে মধুলুব্ধ মধুকরগণ সুমধুর স্বরে গুন্ গুন্ ধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। রাজা কুসুমিত-লতামণ্ডপে' সমাকীর্ণ তত্রত্য পরম রমণীয় প্রদেশসকল অবলোকন করিয়া সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন এবং দেখিলেন, পুষ্পভারাবনত ভিন্ন ভিন্ন বৃক্ষসমূহের শাখাসকল পরস্পর সংশ্লিষ্ট হইয়া ইন্দ্রধ্বজের শোভা সম্পাদন করিতেছে; সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরোগণ, মত্ত বানরযূথ ও কিন্নরসমূহ তথায় নিরন্তর বাস করিতেছে এবং পুষ্পরেণুবাহী সুখস্পর্শ, সুশীতল, সুগন্ধ গন্ধবহ' সর্ব্বদা বহিতেছে।
এইরূপে রাজা সেই পরম রমণীয় নদীকচ্ছস্থ' বনের শোভা নিরীক্ষণ করিতেছেন, ইত্যবসরে তন্মধ্যে এক শান্ত-রসাস্পদ আশ্রমপদ দেখিতে পাইলেন। আশ্রমটি নানাবিধ বৃক্ষে সমাকীর্ণ ও তাহার মধ্যস্থলে আহবনীয় অগ্নি প্রজ্বলিত রহিয়াছে; বালখিল্য প্রভৃতি মুনিগণ চারিদিকে উপবিষ্ট রহিয়াছে; এবং পুষ্পসংস্তরণ-যুক্ত অগ্নিগৃহসকল শোভা পাইতেছে। ঐ আশ্রমের সমীপে হংস, বক, চক্রবাক্ প্রভৃতি বহুবিধ জলচর-পক্ষিগণে সংকীর্ণা, পুণ্যোদকী' সুখস্পর্শা, মালিনী নদী প্রবাহিত হইতেছে। তথায় সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদগণও শান্ত গুণাবলম্বী। তদ্দর্শনে রাজা সাতিশয় আহ্লাদিত ও চমৎকৃত হইলেন। মহারাজ দুষ্মন্ত অমরলোকসদৃশ সেই মনোহর আশ্রমের সমীপবর্তিনী সর্ব্বজীবজননী তুল্যা, পুণ্যতোয়া সেই মালিনী নদীর শোভা অবলোকন করিতে করিতে ভ্রমণ করিতে লাগিল। তাহার পুলিনে চক্রবাক্সকল সতত ক্রীড়া করিতেছে; কিন্নরগণ সর্ব্বদা বাস করিতেছে; বানর ও ভল্লুকাদি জন্তুগণ অবিরত বিচরণ করিতেছে; তপোধনগণ নিরন্তর বেদধ্বনি করিতেছেন; এবং মত্ত হস্তিযূথ শাৰ্দ্দুলযূথ ও ভুজগেন্দ্রগণ অনবরত ক্রীড়া করিতেছে।
ঐ আশ্রম ভগবান্ কাশ্যপের পুণ্যাশ্রম। মালিনী নদী এবং মহর্ষিগণসেবিত সেই পরম রমণীয় আশ্রম দর্শনে রাজা দুষ্মন্ত অত্যন্ত কৌতুকাক্রান্ত হইয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে বাসনা করিলেন। রাজা মালিনীনদী দ্বারা বেষ্টিত বৈকুণ্ঠ ধামবৎ সুশোভিত, মত্তময়ূরনাদে নিনাদিত, সেই চৈত্ররথসদৃশ মহা-রণ্যের সম্মুখে সমুপস্থিত হইয়া অশেষ গুণালঙ্কৃত কশ্যপাত্মজ মহর্ষি কথকে দর্শন করিবার অভিলাষে সেই স্থানে চতুরঙ্গিনী সেনা সংস্থাপন করিলেন এবং কহিলেন, আমি ভগবান্ কণ্ঠ তপোধনকে দর্শন করিতে চলিলাম; যতক্ষণ না প্রত্যাগমন করিব, তোমরা এই স্থানেই অবস্থান কর। তাহাদিগকে এই কথা বলিয়া সমস্ত রাজচিহ্ন পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল অমাত্য ও পুরোহিত সমভিব্যাহারে তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া নানাপ্রকার আশ্চর্য্য শোভা সন্দর্শনে রাজা ক্ষুৎপিপাসা বিস্মৃত ও সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন। আরও দেখিলেন, কোন স্থানে কুসুমিত তরুকলাপে অলিগণ ঝঙ্কার করিতেছে; কোন স্থানে বিহগকূল বৃক্ষশাখায় বসিয়া কলরব করিতেছে; কোন স্থানে ঋগ্বেদী বিপ্রগণ যজ্ঞকার্য্যে উদাত্তাদিস্বরে' বেদধ্বনি করিতেছেন; কোন স্থানে চতুর্ব্বেদবেত্তা নিয়তব্রত মহর্ষিগণ উপবিষ্ট রহিয়াছেন; স্থানান্তরে যতাত্মা জিতেন্দ্রিয়, অথর্ব্ববেদবেত্তা ও সামগাতা সকল পদক্রমাদি সহিত সংহিতা উচ্চারণ করিতেছেন; কোথাও বা শব্দসংস্কারসম্পন্ন দ্বিজগণ বেদগানদ্বারা সেই ব্রহ্মলোকসদৃশ আশ্রমকে নিনাদিত করিতেছেন; কোন স্থলে যজ্ঞানুষ্ঠানক্রম পুরাণ, ন্যায়, তত্ত্ব, আত্মবিবেক, শব্দশাস্ত্র, ছন্দঃ, নিরুক্ত ও বেদবেদাঙ্গ প্রভৃতি নানাশাস্ত্রে পারদর্শী, বিশেষ কার্য্যজ্ঞ, মোক্ষধর্মপরায়ণ, উহাপোহ'-সিদ্ধান্ত-কুশল, দ্রব্যকর্ম্মের গুণজ্ঞ, কার্য্যকারণবেত্তা, পক্ষী ও বানর প্রভৃতি জীবগণের বাক্যার্থ-বোদ্ধা মহর্ষিগণ নানাশাস্ত্রের বিচার করিতেছেন; এবং বৌদ্ধ-মতাবলম্বী লোকেরা নিজ ধর্মের আলোচনা করিতেছেন। শত্রুহন্তা রাজা দুষ্মন্ত জপহোমপরায়ণ সেই সকল একনিষ্ঠ বিপ্রগণকে সন্দর্শন করিতে করিতে আশ্রমসমীপে উত্তীর্ণ হইলেন। মুনিগণ অতি প্রযত্নপূর্ব্বক রাজাকে যে সকল বিচিত্র আসন প্রদান করিলেন, তদ্দর্শনে তিনি বিস্ময়াপন্ন হইলেন। রাজর্ষি, মহর্ষি কণ্ঠের সুরক্ষিত ও বিবিধ গুণযুত সেই আশ্রমপদ যত অবলোকন করিতে লাগিলেন, ততই তাঁহার দর্শনৌৎসুক্য বাড়িতে লাগিল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর রাজা, মন্ত্রী ও পুরোহিতকে আশ্রমের বাহিরে রাখিয়া একাকী তন্মধ্যে প্রবেশিয়া দেখিলেন, আশ্রম শূন্য রহিয়াছে; মহর্ষি কথ তথায় নাই। তখন তিনি উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, কুটীরের অভ্যন্তরে কে আছ বহির্গত হও। তাঁহারা সেই বাক্য শ্রবণমাত্র তাপসীবেশধারিণী লক্ষ্মীর ন্যায় এক কন্যা কুটীর হইতে বহির্গত হইলেন। তিনি রাজাকে সমাগত দেখিয়া পাদ্য, অর্ঘ্য, আসন দ্বারা তাঁহার যথোচিত আতিথ্য বিধান পূর্ব্বক স্বাগত প্রশ্ন ও কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। অনন্তর ঐ কন্যা বিনীতভাবে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, মহারাজ! এস্থানে কি উদ্দেশে আপনার আগমন হইয়াছে? আজ্ঞা করুন আপনার কোন্ কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে? রাজা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী মধুরভাষিণী কন্যার বাক্য শ্রবণা-নন্তর তাঁহাকে কহিলেন, ভদ্রে! আমি মহর্ষি কণ্ঠের উপাসনা করিতে এস্থানে আসিয়াছি; মহর্ষি কোথায়? কন্যা কহিলেন, পিতা ফল আহরণার্থ বনান্তরে গমন করিয়াছেন, তিনি শীঘ্রই প্রত্যাগমন করিবেন; আপনি ক্ষণকাল অপেক্ষা করিলেই তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিবেন।
রাজা ঋষিকে আশ্রমে অনুপস্থিত দেখিয়া এবং সেই মধুরহাসিনী, রূপযৌবনবতী, লোক-ললামভূতা ললনার অলোক-সামান্য রূপলাবণ্য সন্দর্শন করিয়া মুগ্ধপ্রায় হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, সুন্দরি। তুমি কে? কাহার রমণী? কি নিমিত্তই বা এই মহারণ্যে আসিয়াছ? আর তুমি কি প্রকারেই বা এরূপ রূপবতী হইয়াছ? তুমি দর্শনমাত্রই আমার মনোহরণ করিয়াছ। রাজার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কন্যা মধুর স্বরে কহিলেন, মহারাজ! আমি ধৃতিমান্ ধৰ্ম্মজ্ঞ মহাত্মা কণ্ঠ তপোধনের কন্যা; আমার নাম শকুন্তলা। রাজা কহিলেন, হে বরবর্ণিনি! সর্ব্বলোেকপূজিত ভগবান্ কম্ব উর্দ্ধরেতাঃ; ধর্মও কদাচিৎ বিচলিত হইতে পারেন, কিন্তু উর্দ্ধরেতাঃ তপস্বীরা কখনই বিচলিত হয়েন না, তবে তুমি কিরূপে তাঁহার দুহিতা হইলে? আমার এ বিষয়ে অত্যন্ত সন্দেহ হইতেছে। তুমি অনুগ্রহ করিয়া সন্দেহ ভঞ্জন করিয়া দাও। শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! একদা এক ঋষি পিতাকে আমার জন্মবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করাতে পিতা তাঁহার সমীপে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করেন। আমি সেই সময়ে তাঁহার নিকট-বর্তিনী ছিলাম, সমস্তই শ্রবণ করিয়াছি; বলিতেছি, শ্রবণ করুন।
মহর্ষি কহিয়াছিলেন, পূর্ব্বকালে মহাতপাঃ বিশ্বামিত্র ঘোরতর কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। তাঁহার তপঃপ্রভাবে ত্রিলোকী তাপিতা হইল। দেবরাজ ইন্দ্র, তপোবীর্য্যসম্পন্ন বিশ্বামিত্র এই কঠোর তপস্যাদ্বারা পাছে আমার ইন্দ্রত্ব পদ গ্রহণ করেন, এই ভয়ে ভীত হইয়া অপ্সরা মেনকাকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, মেনকে। অপ্সরাদিগের মধ্যে তুমিই সর্ব্বপ্রধানা; অতএব তুমি আমার কিঞ্চিৎ উপকার কর। সূর্য্যসদৃশ তেজস্বী জিতেন্দ্রিয়, মহাত পাঃ বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যা আরম্ভকরিয়াছেন তাঁহার তপোনুষ্ঠান দর্শনে আমার হৃৎকম্প হইতেছে; অতএব তোমাকে আমি এই ভার অর্পণ করিতেছি, যাহাতে সেই দুর্দ্ধর্ষ বিশ্বামিত্র তপস্যাদ্বারা আমাকে পদচ্যুত করিতে না পারেন, এমন কোন উপায় উদ্ভাবন কর। হে বরারোহে। রূপ, যৌবন, মধুর বাক্য, অঙ্গভঙ্গি, কটাক্ষ, হাব, ভাব, হাস্য প্রভৃতি প্রলোভনদ্বারা তোমাকে ঐ মহর্ষির তপোবিঘ্ন করিতে হইবে।
মেনকা ইন্দ্রের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে দেবরাজ! আপনি ত জানেন ভগবান্ বিশ্বামিত্র অতিশয় তেজস্বী, তপস্বী ও ক্রুদ্ধ স্বভাব। দেখুন আপনি ত্রৈলোক্যের অধিপতি হইয়াও যাঁহার তপস্যা, তেজঃ, ও কোপে ভীত হইতেছেন, আমি অবলা জাতি, কি প্রকারে তাঁহার অনিষ্টসাধন করিতে সাহস করিব? যে মহর্ষি মহাভাগ বশিষ্ঠের প্রাণসম শত পুত্রের প্রাণ-সংহার করিয়াছেন, যিনি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াও বলপূর্ব্বক ব্রাহ্মণ হইয়াছেন, যিনি অভিষেক ক্রিয়া সম্পাদনার্থে পরম পবিত্রা অগাধসলিলা এক মহানদীকে স্বীয় আশ্রমসমীপে আনয়ন করিয়াছেন, যাঁহার মহিমায় ঐ নদী অদ্যাপি কৌশিকী নামে বিখ্যাত আছে, যিনি ক্রুদ্ধ হইয়া প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক অন্য এক নক্ষত্রলোক ও নক্ষত্রসমুদায় সৃষ্টি করিয়াছেন, যিনি গুরুশাপগ্রস্ত ত্রিশঙ্কুকে অভয়দান করিয়াছেন, হে বিভো। যিনি এই সমস্ত অলৌকিক কার্য্য করিয়াছেন, আমি কোন্ সাহসে তাঁহার তপস্যা ভঙ্গ করিতে যাইব? আপনি যদি আমাকে এরূপ বর প্রদান করেন যে, তিনি ক্রোধাগ্নিদ্বারা আমাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না, তবে আমি যাইতে সাহস করিতে পারি। হে সুরেশ্বর। যিনি তেজঃদ্বারা ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে পারেন, যিনি পদাঘাতে মেদিনী প্রকম্পিত করিতে পারেন, যিনি সুমেরু উৎক্ষেপণ ও দশদিক্ আবর্তন' করিতে পারেন, আমি কিরূপে এই তপঃ প্রভাবসম্পন্ন প্রজ্বলিত হুতাশনাকার তপোধনকে স্পর্শ করিব? যাঁহার মুখ সাক্ষাৎ প্রদীপ্ত হুতাশন, যাঁহার অক্ষি-তারা' মূর্ত্তিমান্ চন্দ্র ও সূর্য্য, যাঁহার জিহ্বা স্বয়ং কৃতান্ত, মাদৃশলোক কিরূপে সেই মহাত্মাকে স্পর্শ করিবে? যম, সোম, মহর্ষিগণ, সিদ্ধ, সাধ্য, বিশ্বদেব ও বালখিল্য প্রভৃতি ঋষিগণ যাঁহাকে ভয় করেন, আমি অবলা হইয়া কিরূপে তাঁহার সমীপে গিয়া ক্রীড়া ও অঙ্গভঙ্গ্যাদি করিব? হে দেবরাজ! আপনি আজ্ঞা করিতেছেন, অতএব আমাকে অবশ্যই সেই ঋষির নিকটে যাইতে হইবে; কিন্তু আপনি এমত কোন উপায় নির্দেশ করিয়া দিন, যাহাতে আমি তৎসমীপে নির্বিঘ্নে বিচরণ করিতে পারি এবং তাহা হইতে পরিত্রাণ পাই। হে দেবরাজ। আমি যে সময় সেই উগ্রতপাঃ মুনির সমীপে গিয়া ক্রীড়া কৌতুক করিব, তৎকালে বায়ু যেন আমার বসন উড্ডীন করেন, ভগবান্ মন্মথ যেন আমার সহায়তা করেন এবং বন হইতে যেন সুগন্ধ গন্ধবহ মন্দ মন্দ ভাবে বহিতে থাকে। ইন্দ্র "তথাস্তু” বলিয়া মেনকাবাক্য স্বীকার করিলেন। মেনকাও তৎক্ষণাৎ বিশ্বামিত্রের আশ্রমে যাত্রা করিলেন।
অনন্তর পিতা সেই ঋষিকে কহিলেন, ইন্দ্র মেনকার প্রার্থনানুসারে বায়ুকে আদেশ করাতে বায়ু মেনকার সহিত মহর্ষি বিশ্বামিত্রের আশ্রমে গমন করিলেন। বরবর্ণিনী মেনকা তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল, মহর্ষি তপস্যাদ্বারা সমস্ত পাপ ধ্বংস করিয়াও ক্ষান্ত হয়েন নাই, ঘোরতর তপোনুষ্ঠান করিতেছেন। পরে সে সভয় অন্তঃকরণে ঋষিকে প্রণাম করিয়া তাঁহার সম্মুখে ক্রীড়া করিতে আরম্ভ করিল। বায়ু অবসর বুঝিয়া তাহার পরিধেয় বস্ত্র হরণ করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিল। মেনকা সাতিশয় লজ্জিতা হইয়া বসন আনয়নার্থে দ্রুতপদে গমন করিতেছে, এমত সময়ে অগ্নিসম তেজস্বী মহর্ষি বিশ্বামিত্র তাহাকে তদবস্থান্বিত দেখিলেন; এবং তাহার রূপলাবণ্য দর্শনে কন্দর্পশরে জর্জরিতহৃদয় হইয়া নিকটে আহ্বান করিলেন। মেনকার তাহাই অভিসন্ধি ছিল, সুতরাং সে তাহাতে সম্মতা হইয়া মুনিসন্নিধানে গমন করিল। মহর্ষি তাহাকে পাইয়া তপজপ প্রভৃতি সমস্ত ধৰ্ম্মকর্মে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক দিনযামিনী কেবল সেই কামিনীর সহিত ক্রীড়া করত পরম সুখে কালাতি-পাত করিতে লাগিলেন।
এইরূপে কিয়দ্দিন অতীত হইলে মেনকা মুনির সহযোগে গর্ভবতী হইল। অনন্তর মেনকা যথাকালে হিমালয়ের প্রস্থে এক কন্যা প্রসব করিল এবং সেই সদ্যোজাতা কন্যাকে মালিনী নদীর তীরে নিক্ষেপ করিয়া দেবরাজসভায় প্রস্থান করিল। পক্ষিগণ হিংস্রজন্তু সমাকীর্ণ নির্জন বনে সেই সদ্যোজাতা অসহায়া কন্যাকে পতিত দেখিয়া সদয়হৃদয়ে তাহার চতুৰ্দ্দিক বেষ্টন করিয়া রক্ষা করিতে লাগিল। হে তপোধন! আমি সেই সময়ে মালিনীতে স্নান করিতে গমন করিয়াছিলাম। সেই সদ্যোজাতা কন্যাকে নির্জন কাননে পক্ষিগণমধ্যে অধিশয়ানা দেখিয়া আমার হৃদয়ে কারুণ্যরসের উদয় হইল। পরে তথা হইতে আশ্রমে আনয়ন করিয়া স্বীয় কন্যার ন্যায় লালন পালন করিতে লাগিলাম। কন্যাটি শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষিকর্তৃক রক্ষিত হইয়াছিল বলিয়া তাহার নাম শকুন্তলা রাখিলাম। ধর্মশাস্ত্রে কথিত আছে, শরীরদাতার ন্যায় প্রাণদাতা ও অন্নদাতাকেও পিতা বলা যায়, এই নিমিত্ত শকুন্তলা আমার কন্যা হইয়াছেন! অগর্হিতা শকুন্তলাও আমাকে যথার্থই পিতা বলিয়া জানেন।
শকুন্তলা রাজাকে সম্বোধিয়া কহিলেন, হে নরনাথ। মহর্ষি কথ সেই মুনিকর্তৃক পৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে আমার জন্মবৃত্তান্ত এইরূপ কহিয়াছিলেন, অতএব আপনিও আমাকে এইরূপে কম্বের দুহিতা বলিয়া জানুন। আমি স্বীয় পিতাকে জানি না, ভগবান্ কথকেই পিতা বলিয়া জানি। হে রাজন! আমি পূর্ব্বে পিতার মুখে যাহা শ্রবণ করিয়াছিলাম, তাহা অবিকল বর্ণনা করিলাম।
দুষ্মন্ত কহিলেন, হে কল্যাণি! তোমার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া বুঝিলাম, তুমি রাজপুত্রী; অতএব তুমি আমার ভার্য্যা হইতে পার; এক্ষণে বল তোমার কি প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিব। হে সুন্দরি। আমি তোমার নিমিত্ত স্বর্ণমালা, বস্ত্র, সুবর্ণকুণ্ডল ও নানাদেশোদ্ভব বিচিত্র মণিরত্নাদি আহরণ করিব এবং অদ্যাবধি আমার এই সাম্রাজ্য তোমার হস্তগত হইবে; তুমি আমাকে গন্ধর্ব্ববিধানানুসারে বিবাহ কর। গান্ধর্ব্ববিবাহ সকল বিবাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। শকুন্তলা কহিলেন, রাজন! আমার পিতা ফল আহরণ করিতে গিয়াছেন। আপনি ক্ষণকাল বিলম্ব করুন। তিনি আসিয়া আমাকে আপনার হস্তে সম্প্রদান করিবেন। দুষ্মন্ত কহিলেন, সুন্দরি। তোমার রূপলাবণ্য দেখিয়া আমি নিতান্ত মুগ্ধ হইয়াছি; আমার মন অন্যান্য বিষয় পরিত্যাগ করিয়া কেবল তোমারই লাবণ্যসলিলে মগ্ন হইয়াছে; আর তুমি ভাবিয়া দেখ, তোমার আপন শরীরের প্রতি তোমার সম্পূর্ণ হিতৈষিত্ব ও কর্তৃত্ব আছে; অতএব তুমি স্বয়ংই আমার হস্তে আত্মসমর্পণ কর। ধর্মশাস্ত্রে অষ্টবিধ বিবাহ নিদ্দিষ্ট আছে। ব্রাহ্মা, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ। ভগবান্ স্বায়ম্ভব মনু এই সর্ব্ববিধ বিবাহের যথাসম্ভব ব্যবস্থা সংস্থাপন করিয়া গিয়াছেন। ব্রাহ্ম, দৈব, আর্ষ ও প্রাজাপত্য, এই চারি প্রকার বিবাহ ব্রাহ্মণের পক্ষে প্রশস্ত। ব্রাহ্মাদি গান্ধর্ব্বান্ত ষষ্প্রকার বিবাহ ক্ষত্রিয়ের পক্ষে প্রশস্ত। রাজাদিগের উক্ত ষষ্প্রকার বিবাহে এবং রাক্ষস বিবাহেও অধিকার আছে। বৈশ্য ও শূদ্রের পক্ষে কেবল আসুর বিবাহই বিহিত। অতএব ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পৈশাচ ও আসুর বিবাহ কদাপি কর্তব্য নহে। দেখ যদি গান্ধর্ব্ব ও রাক্ষস বিবাহ ক্ষত্রিয়দিগের ধর্মসংযুক্ত হইল, তবে আর শঙ্কার বিষয় কি? এক্ষণে গান্ধর্ব্ব বিধানেই হউক কিংবা গান্ধর্ব্ব ও রাক্ষস উভয়ের বিমিশ্র বিধানেই হউক, আমাকে বিবাহ করিয়া আমার মনোরথ পরিপূর্ণ কর।
শকুন্তলা কহিলেন, হে পৌরবশ্রেষ্ঠ! আপনি যাহা কহিলেন, ইহা যদি শাস্ত্রসম্মত হয় এবং আমার যদি আত্মসমর্পণে প্রভৃতা থাকে, তবে আমি যাহা প্রার্থনা করিতেছি, এই বিষয়ে আপনাকে অঙ্গীকার করিতে হইবে। আপনার ঔরসে আমার গর্তে যে পুত্র জন্মিবে, সে আপনি বিদ্যমানে যুবরাজ ও অবিদ্যমানে অধিরাজ হইবে। যদ্যপি আপনি এই বিষয়ে প্রতিশ্রুত হন, তবে আমি আপনার হস্তে আত্মসমর্পণ করিতে পারি।
রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার সেই বাক্য শ্রবণে কিঞ্চিন্মাত্রও বিবেচনা না করিয়া "তথাস্তু” বলিয়া স্বীকার করিলেন এবং কহিলেন, হে নিতম্বিনি! আমি যথার্থ কহিতেছি, তোমাকে স্বীয় নগরে লইয়া যাইব। এই বলিয়া গান্ধর্ব্ববিধানে সেই মরাল-গামিনী' শকুন্তলার পাণিগ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার সহিত ক্রীড়া কৌতুক করিলেন। রাজাধিরাজ দুষ্মন্ত এইরূপে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়া এবং "তোমাকে অচিরাৎ লইয়া যাইবার নিমিত্ত চতুরঙ্গিণী সেনা প্রেরণ করিব” এই কথা বারংবার কহিয়া তাঁহার বিশ্বাসোৎপাদন পূর্ব্বক তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
রাজা গমনমার্গে চিন্তা করিতে লাগিলেন, মহাতপাঃ ভগবান্ কণ্ঠ এই ব্যাপার জানিতে পারিলে না জানি ক্রোধভরে আমার কি সর্ব্বনাশ করিবেন। তিনি এইরূপ নানাপ্রকার কল্পনা করিতে করিতে আপন নগরে প্রবেশ করিলেন। এদিকে ক্ষণমাত্র পরে মহর্ষি কথ স্বীয় আশ্রমে আগমন করিলেন। শকুন্তলা লজ্জায় অধোমুখী হইয়া তাঁহার নিকট গমন করিতে পারিলেন না; তখন মহর্ষি দিব্যজ্ঞানপ্রভাবে সমস্ত ব্যাপার অবগত হইয়া কহিলেন, বৎসে। তুমি আমার অনুপস্থিতি সময়ে যে পুরুষসংসর্গ করিয়াছ, তাহাতে তোমার ধর্মনষ্ট হয় নাই। ক্ষত্রিয়দিগের গান্ধর্ব্ব বিবাহই প্রশস্ত। সকামা স্ত্রীর সহিত সকাম পুরুষের নির্জনে যে বিবাহ হয়, তাহাকেই গান্ধর্ব্ব বিবাহ কহে। হে বৎসে! রাজা দুষ্মন্ত অতি মহাত্মা ও ধর্মাত্মা। তুমি সেই মহাত্মাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছ। তোমার গর্তে এক মহাবল পরাক্রান্ত পুত্র জন্মিবে। সেই পুত্র সসাগরা ধরার একাধিপতি হইয়া অপ্রতিহতরূপে সর্ব্বত্র গমনাগমন করিতে পারিবে। মুনিবর এইরূপে শকুন্তলার লজ্জা-পনোদনপূর্ব্বক স্কন্ধ হইতে ফলভার নামাইয়া পাদপ্রক্ষালন করিলেন এবং বিশ্রামার্থ সুখাসনে উপবেশন করিলেন। তখন শকুন্তলা কহিলেন, তাত। আমি মহারাজ দুষ্মন্তকে বরণ করিয়াছি। আপনি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হউন। কম্ব কহিলেন, বৎসে! আমি তোমার নিমিত্ত রাজার প্রতি প্রসন্নই আছি। এক্ষণে তুমি স্বাভিলষিত বর প্রার্থনা কর। শকুন্তলা মহর্ষির বাক্য শ্রবণ করিয়া রাজা দুষ্মন্তের হিতাকাঙ্ক্ষায় কহিলেন, হে পিতঃ! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন তবে এই বর প্রদান করুন যে, পুরুবংশীয়েরা যেন কখন রাজ্যচ্যুত বা অধর্মপরায়ণ না হন। মহর্ষি কথ "তথাস্তু” বলিয়া বর প্রদান করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। তদনন্তর বরবর্ণিনী শকুন্তলা যথাকালে মহাবলপরাক্রান্ত দীপ্তাগ্নিসমতেজস্বী অলৌকিক রূপগুণসম্পন্ন এক সুকুমার কুমার প্রসব করিলেন। ঐ কুমারের বয়ঃক্রম তিন বৎসর পরিপূর্ণ হইলে মহাত্মা কথ বেদবিধানানুসারে তাঁহার জাতকৰ্ম্মাদি সংস্কার সম্পাদন করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত শকুন্তলাপুত্র মুনির আশ্রমে দিন দিন দেবকুমারের ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। পরে ছয় বৎসর বয়ঃক্রমকালে সিংহ, ব্যাঘ্র, বরাহ, মহিষ, হস্তী প্রভৃতি বন্য শ্বাপদগণকে আশ্রম সমীপস্থ বৃক্ষে বন্ধন করিয়া দমন করিতেন। তদ্দর্শনে কথাশ্রমনিবাসী তাপসগণ তাঁহাকে সর্ব্বদমন বলিয়া ডাকিতেন। তদবধি তাঁহার এক নাম সর্ব্বদমন হইল। মহর্ষি কথ বালকের অসাধারণ বল ও অলৌকিক কৰ্ম্ম দর্শনে শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে! তোমার পুত্রের যৌবরাজ্য প্রাপ্তির সময় উপস্থিত হইয়াছে। অতঃপর, তোমার এস্থানে থাকা কর্তব্য নহে। পরে মুনিবর স্বীয় শিষ্যগণকে আদেশ করিলেন, তোমরা পুত্রবতী শকুন্তলাকে ভর্তৃভবনে লইয়া যাও; যে হেতু নারীগণের চিরকাল পিতৃগৃহে বাস করা অবিধেয় এবং তাহাতে কীর্ত্তি, চরিত্র ও ধৰ্ম্ম নষ্ট হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা। শিষ্যগণ "যে আজ্ঞা” বলিয়া ঋষিবাক্য স্বীকারপূর্ব্বক সপুত্রা শকুন্তলাকে সমভিব্যাহারে লইয়া হস্তিনানগরে গমন করিলেন। শকুন্তলা দেবকুমার তুল্য আপন কুমারকে ক্রোড়ে লইয়া ক্রমে ক্রমে দুষ্মন্তের ভবনে উপস্থিত হইলেন। কণ্ঠশিষ্যগণ রাজসমীপে সমুপস্থিত হইয়া যথাবিধি আশীর্ব্বাদ বিধানপূর্ব্বক সপুত্রা শকুন্তলাকে অর্পণ করিয়া আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন; তাঁহারা আশ্রমে প্রস্থান করিলে শকুন্তলা কৃতাঞ্জলিপুটে রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! এই পুত্র আপনার ঔরসে আমার গর্তে জন্মিয়াছে; আপনি কথ মুনির আশ্রমে আমাকে বিবাহ করেন। পরিণয়কালে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, মদগর্ভজাত পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন। এক্ষণে এই পুত্রের যৌবরাজ্য প্রাপ্তির সময় উপস্থিত, অতএব আপনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞা স্মরণপূর্ব্বক ইহাকে যুবরাজ করুন।
রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার বাক্য শ্রবণানন্তর অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন, তাপসি! তুমি যাহা কহিলে, তাহা আমার কিছুই স্মরণ হইতেছে না। তোমার সহিত যে কখন সন্দর্শন হইয়াছিল, তাহাও স্মরণ হয় না। কিংবা তোমার সহিত আমার কোন সম্বন্ধ আছে, ইহাও বোধ হইতেছে না; অতএব হে দুষ্টা তাপসি! তুমি এই স্থানেই থাক বা স্থানান্তরে যাও, যাহা ইচ্ছা হয় কর। শকুন্তলা পতির মুখে এই অশনিপাত-সদৃশ বিষম বাক্য শ্রবণ করিয়া ঈষৎ লজ্জিত ও দুঃখে স্তম্ভিতপ্রায় দণ্ডায়মান রহিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সংজ্ঞালাভ হইলে ক্রোধভরে তাঁহার দুই চক্ষু রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল এবং ওষ্ঠাধর কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি এক এক বার বক্রনয়নে রাজার প্রতি এরূপ কটাক্ষপাত করিতে লাগিলেন, বোধ হয় যেন নয়নবিনির্গত ক্রোধাগ্নিদ্বারা রাজাকে একেবারেই দগ্ধ করিতে উদ্যতা হইয়াছেন। পরে ক্রোধ সংবরণ করিবার যথেষ্ট চেষ্টা করিলেও তাঁহার সে ভাব অপ্রকাশিত রহিল না। ক্ষণকাল এই অবস্থায় অবস্থান করিয়া রোষকষায়িতনয়নে রাজার প্রতি দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! তুমি জানিয়া শুনিয়াও কেন ইতর লোকের ন্যায় অসঙ্কুচিতচিত্তে কহিতেছ "আমি কিছুই জানি না”। আমি যাহা কহিলাম, তাহা সত্য কি মিথ্যা তদ্বিষয়ে তোমার অন্তঃকরণই সাক্ষী। তুমি স্বয়ংই সত্য মিথ্যা ব্যক্ত কর। আত্মাকে অবজ্ঞা করিও না। যে ব্যক্তি মনে এক প্রকার জানিয়া মুখে অন্য প্রকার বলে, সেই আত্মাপহারী চৌরের কোন্ দুষ্কর্ম না করা হয়? তুমি মনে করিতেছ, একাকী এই কৰ্ম্ম করিয়াছি, অন্য কেহই জানিতে পারে নাই, কিন্তু তুমি কি জান না যে, মহর্ষি কণ্ঠ অন্তর্যামী? তিনি স্বীয় যোগবলে পাপ পুণ্য সমুদায় জানিতে পারেন। তুমি তাঁহার কাছে গোপন করিতে পারিবে না। লোকে পাপকর্ম করিয়া মনে করে আমার দুষ্কর্ম কেহই জানিতে পারে নাই, কিন্তু দেবগণ ও অন্তর্যামী পুরুষেরা সকলই জানিতে পারেন। আর সূর্য্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, স্বর্গ, পৃথিবী, জল, মনঃ, যম, দিবা, রাত্রি, প্রাতঃকাল, সায়ংকাল এবং ধর্ম, ইঁহারা মনুষ্যের সমস্ত বৃত্তান্ত জানিতে পারেন। পাপপুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ হৃদয়স্থিত আত্মা সন্তুষ্ট থাকিলে বৈবস্বত যম স্বয়ং মনুষ্যের পাপ নাশ করেন। আর যে দুরাত্মার আত্মা সন্তুষ্ট নহে, যম সেই দুরাচারের পাপ বৃদ্ধি করেন। যে পাপাত্মা আত্মাকে অপমান করিয়া সত্য বিষয় মিথ্যারূপে প্রতিপাদন করে, দেবতারা তাহার মঙ্গল বিধান করেন না। আমি পতিব্রতা। আমি স্বয়ং উপস্থিত হইয়াছি বলিয়া আমাকে অপমান করিও না। আমি তোমার সমাদরণীয়া ভার্য্যা। তুমি কি নিমিত্ত এই সভামধ্যে আমাকে সামান্যার ন্যায় উপেক্ষা করিতেছ? তুমি আমার এই সকল সকরুণ বাক্য কি কিছুই শুনিতেছ না। আমি কি অরণ্যে রোদন করিতেছি? হে দুষ্মন্ত! তুমি যদি আমার কথায় অবজ্ঞা প্রদর্শনপূর্ব্বক উত্তর প্রদান না কর, তাহা হইলে অদ্য তোমার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হইবে। পৌরাণিকেরা কহেন, "পতি স্বয়ং ভার্য্যার গর্তে প্রবেশিয়া পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন, এই নিমিত্তই জায়ার জায়াত্ব হইয়াছে!” পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়া পূর্ব্ববৎ পিতামহদিগের উদ্ধার করে এবং পিতাকে পুন্নামক নরক হইতে পরিত্রাণ করে, এই বলিয়া স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা উহাকে পুত্র বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। গৃহকর্মদক্ষা পুত্রবতী পতি-পরায়ণা ভাৰ্য্যাই যথার্থ ভাৰ্য্যা। ভার্য্যা ভর্তার অর্দ্ধাঙ্গ-স্বরূপ, পরম বন্ধু ত্রিবর্গ'লাভের মূল কারণ। ভার্য্যাবান্ লোকেরাই ক্রিয়াশালী হয়; ভার্য্যাবান্ লোকেরাই গৃহী বলিয়া পরিগণিত হয়; ভার্য্যাবান্ লোকেরাই সর্ব্বদা সুখী হয় এবং ভার্য্যাবান্ লোকেরাই সৌভাগ্যসম্পন্ন হন। প্রিয়ংবদা ভার্য্যা অসহায়ের সহায়-স্বরূপ, ধৰ্ম্মকার্য্যে পিতাস্বরূপ, আর্ত ব্যক্তির জননী-স্বরূপ এবং পথিকের বিশ্রাম-স্থানস্বরূপ। ভার্য্যাবান্ ব্যক্তি সকলেরই বিশ্বাসভাজন। মরণানন্তর আর কিছুই অনুগামী হয় না, কেবল পতিব্রতা পত্নীই সহগামিনী হইয়া থাকে। পতিব্রতা ভার্য্যা যদি পূর্ব্বে পরলোক-প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে সে তথায় গিয়া পতির অপেক্ষা করে। আর যদি পূর্ব্বে পতির পরলোক হয়, তবে তাঁহার সহমৃতা হয়। হে মহারাজ! যেহেতু পতি, ভার্য্যাকে ইহলোকে ও পরলোকে সহায়-স্বরূপ প্রাপ্ত হন, এই নিমিত্তই লোকে পাণিগ্রহণ অভিলাষ করেন। পতি স্বয়ং ভাৰ্য্যার গর্তে প্রবেশ করিয়া পুত্রনামধারী হইয়া জন্মগ্রহণ করেন; অতএব পুত্রপ্রসবিনী ভার্য্যাকে সাক্ষাৎ মাতা বলিয়া মনে করা কর্তব্য। যেমন আদর্শতলে মুখ প্রতিবিম্ব, পুত্রও তদ্রূপ পিতার প্রতিবিম্ব-স্বরূপ। এই নিমিত্তই লোকে পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়া স্বর্গভোগের সুখানুভব করে। মনুষ্য শারীরিক বা মানসিক পীড়াদ্বারা যতই কেন কাতর হউক না, প্রিয়তমা ভার্য্যাকে অবলোকন করিলে সুশীতল জলে প্রগাঢ় আতপতাপিত ব্যক্তির ন্যায় সর্ব্ব দুঃখ বিস্মৃত হইয়া পরম পরিতোেষ লাভ করে। ভার্য্যাকর্তৃক সাতিশয় ভর্ৎসিত হইলেও তাহার অপ্রিয় কার্য্য করা কদাপি বিধেয় নহে; কারণ রতি, প্রীতি ও ধর্ম, এই তিন সুখসাধনই ভার্য্যার আয়ত্ত। স্ত্রীলোক আত্মার পবিত্র জন্মক্ষেত্র; এবং স্ত্রীলোক ব্যতীত পুত্রোৎপাদন হয় না। পুত্র পিতৃপদে প্রণাম করিয়া ধূলিধূসরিত-কলেবর হয় এবং পিতাকে আলিঙ্গন করে; এই অসার সংসারে ইহা অপেক্ষা সুখ আর কি আছে? অতএব হে মহারাজ! স্বয়ং আগত এই প্রাণসম পুত্রকে কেন অবমানিত করিতেছ? দেখ ক্ষুদ্র জীব পিপীলিকারাও স্বীয় অণ্ডসমুদায় সাতিশয় যত্নসহকারে রক্ষা করে, তুমি ধর্মজ্ঞ হইয়াও কি নিমিত্ত আপন পুত্রকে পালন করিতে পরাম্মুখ হইতেছ? শিশু পুত্রের আলিঙ্গনে লোক যাদৃশ সুখানুভব করে, বসন, স্ত্রীগাত্র বা সুশীতল জল স্পর্শ করিয়া কি তাদৃশ সুখাস্বাদন করিতে পারে? যেমন দ্বিপদের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, চতুষ্পদের মধ্যে গো শ্রেষ্ঠ, গুরুজনের মধ্যে পিতা শ্রেষ্ঠ, সেইরূপ স্পর্শবান্ পদার্থের মধ্যে পুত্র সর্ব্বশ্রেষ্ঠ; অতএব এই প্রিয়দর্শন পুত্র তোমাকে আলিঙ্গন করিয়া তোমার সুখস্পর্শ উৎপাদন করুক। হে অরিকুল-কালান্তক। তিন বৎসর পরিপূর্ণ হইলে, মহর্ষি কণ্ঠ ইহার ক্ষত্রিয়োচিত সমুদায় সংস্কার সম্পাদন করিয়াছেন, অতএব এই পুত্র সর্ব্বাংশে তোমার মনস্তাপ নাশ করিবে। হে পুরুবংশাবতংস! যখন এই পুত্র ভূমিষ্ঠ হয়, সেই সময়ে আমার প্রতি দৈববাণী হইয়াছিল "এই কুমার যথাকালে শতসংখ্যক অশ্বমেধ যজ্ঞ করিবেন।” আরও দেখ, পিতা বহুদিনের পর স্থানান্তর হইতে আগমন করিয়া পুত্রকে ক্রোড়ে গ্রহণপূর্ব্বক তাহার মস্তক আঘ্রাণ ও বদন চুম্বন করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করেন। কুমারের জাতকর্মকালে ব্রাহ্মণেরা এই সকল মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া থাকেন, বোধ হয় তুমিও কোন্ তাহা না জান। “হে পুত্র! তুমি আমার প্রত্যঙ্গ হইতে সম্ভূত হইয়াছ, তুমি আমার হৃদয় হইতে জন্মিয়াছ এবং তুমি আমার পুত্রনামধারী আত্মা, অতএব তুমি শতবৎসর জীবিত থাক; আমার জীবন তোমার অধীন; আমার অক্ষয় বংশ তোমার অধীন; অতএব তুমি সুখী হইয়া শতবৎসর জীবিত থাক।” হে রাজন! এই পুত্র তোমার শরীর হইতে সমুৎপন্ন, অতএব নিৰ্ম্মল সলিলে আত্মপ্রতিবিম্ব দর্শনের ন্যায় পুত্রমুখ নিরীক্ষণ কর। যেমন গার্হপত্য অগ্নি হইতে আহবনীয় অগ্নি প্রণীত হয়, সেইরূপ তোমা হইতে এই পুত্র সমুৎপন্ন হওয়াতে একমাত্র তুমিই দ্বিধাকৃত হইয়াছ। হে রাজন! একদা তুমি মৃগয়ায় গমন করিয়া এক মৃগের অনুসরণক্রমে তাত কম্বের আশ্রমে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলে। আমি সে সময়ে কুমারী ছিলাম। হে মহারাজ। উর্ব্বশী, পূর্ব্বচিত্তি, সহজন্যা, মেনকা, বিশ্বাচী ও ঘৃতাচীতা এই ছয়জন অপ্সরা সর্ব্বপ্রধান। তন্মধ্যে ব্রহ্মলোক-নিবাসিনী মেনকা স্বর্গ হইতে মর্ত্যলোকে আগমন করিয়া বিশ্বামিত্রের ঔরসে আমাকে উৎপাদন করিয়াছিলেন। অভদ্রা মেনকা হিমালয়ের প্রস্থদেশে আমাকে প্রসব করিয়া শত্রুকন্যার ন্যায় তথায় পরিত্যাগপূর্ব্বক চলিয়া যান। হায়! না জানি আমি জন্মান্তরে কি মহাপাতক করিয়াছিলাম, যেহেতু বাল্যকালে বন্ধুবান্ধবেরা আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছিল, এক্ষণে আবার তুমি পতি হইয়াও পরিত্যাগ করিলে! যাহা হউক, তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিলেও আমার তত ক্ষতি বোধ হইবে না, কারণ আমি এক্ষণে পিতার আশ্রমে গমন করিব। তুমি তোমার স্বীয় ঔরসপুত্র এই সুকুমার নবকুমারকে পরিত্যাগ করা নিতান্ত অবিধেয়।
দুষ্মন্ত কহিলেন, শকুন্তলে। আমি তোমার গর্ভে যে এই পুত্র উৎপাদন করিয়াছি, ইহা আমার কোন প্রকারেই স্মরণ হইতেছে না; স্ত্রীলোকেরা প্রায়ই মিথ্যা কহিয়া থাকে; বোধ হয় তুমিও মিথ্যা কথা কহিতেছ; কে তোমার কথায় বিশ্বাস করিবে? কুলটা মেনকা তোমার জননী; তাহার মত নিৰ্দ্দয় লোক জগতে নাই। সে তোমাকে প্রসব করিয়া নির্মাল্যের' ন্যায় হিমালয়ের প্রস্থে পরিত্যাগ করিয়াছিল। আর তোমার জন্মদাতা বিশ্বামিত্রও অতি নীচাশয়; কারণ তিনি ক্ষত্রিয় কুলোদ্ভব হইয়া পরম পবিত্র সর্ব্বজন মাননীয় ব্রাহ্মণত্ব পাইয়াছেন, তথাচ কামপরবশ হইয়াছিলেন। ভাল, তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, যদি মেনকা অপ্সরার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র মহর্ষিবর্গের অগ্রগণ্য, তবে তুমি তাঁহাদিগের কন্যা হইয়া কি নিমিত্ত পুংশ্চলীর ন্যায় মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করিতেছ? এই সভাসদ্গণের সমক্ষে বিশেষতঃ আমার সমক্ষে এই সকল অশ্রদ্ধেয় কথা কহিতে তোমার কি লজ্জা হইতেছে না? অতএব রে দুষ্টা তাপসি! তুমি এস্থান হইতে প্রস্থান কর। মহর্ষিশ্রেষ্ঠ বিশ্বামিত্র ও অপ্সরাপ্রধানা মেনকাই বা কোথায়? আর তাপসী-বেশধারিণী তুমিই বা কোথায়? তোমার এই পুত্রকে বাল্যকালেই মহাবল-পরাক্রান্ত ও মহাকায় দেখিয়া কোনরূপেই তোমাকে বিশ্বাস হইতেছে না। তুমি আপনিই কহিতেছ, সুনিকৃষ্টা স্বৈরিণী' মেনকা তোমার জননী। সে কামরাগে অন্ধ হইয়া তোমাকে উৎপাদন করিয়াছে। আর তুমিও পুংশ্চলীর ন্যায় কথাবার্তা কহিতেছ। তুমি যে সকল কথা কহিলে, আমি তাহার বিন্দুবিসর্গও জানি না এবং তোমাকেও চিনি না; অতএব তুমি যথায় ইচ্ছা, চলিয়া যাও।
শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! সর্ষপপ্রমাণ পরদোষ নিরীক্ষণ কর, কিন্তু বিল্ব পরিমিত আত্মদোষ দেখিতে পাও না! মেনকা দেবগণের মধ্যে গণনীয়া ও আদরণীয়া, অতএব তোমার জন্ম হইতে আমার জন্ম উৎকৃষ্ট তাহাতে সন্দেহ নাই। আরও দেখ, তুমি কেবল পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, আমি পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ উভয়স্থলেই গতায়াত করিতে পারি; অতএব আমার ও তোমার প্রভেদ সুমেরু ও সর্যপের প্রভেদের ন্যায়। আমার এরূপ প্রভাব আছে, আমি ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ প্রভৃতি দেবগণের ভবনেও অনায়াসে যাতায়াত করিতে পারি। হে মহারাজ! আমি এ স্থলে এক লৌকিক সত্য দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি শ্রবণ কর; রুষ্ট হইও না। দেখ, কুররূপ ব্যক্তি যে পর্যন্ত আদর্শমণ্ডলে আপন মুখমণ্ডল না দেখে; ততক্ষণ আপনাকে সর্ব্বাপেক্ষা রূপবান্ বোধ করে। কিন্তু যখন আপনার বিকৃত মুখশ্রী নিরীক্ষণ করে, তখন আপনার ও অন্যের রূপপ্রভেদ জানিতে পারে। যে ব্যক্তি অত্যন্ত সুশ্রী সে কখন অন্যকে অবজ্ঞা করে না। যে অধিক বাক্যব্যয় করে লোকে তাহাকে মিথ্যাবাদী ও বাচাল কহে। যেমন শূকর নানাবিধ সুখাদ্য মিষ্টান্ন পরিত্যাগ করিয়া পুরীষ মাত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ মূর্খ লোকেরা শুভাশুভ বাক্য শ্রবণ করিলে শুভ কথা পরিত্যাগ পূর্ব্বক অশুভই গ্রহণ করিয়া থাকে। আর হংস যেমন সজল দুগ্ধ হইতে অসার জলীয়াংশ পরিত্যাগপূর্ব্বক দুগ্ধরূপ সারাংশই গ্রহণ করে, সেইরূপ পণ্ডিত ব্যক্তিরা লোকের শুভাশুভ বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহা হইতে শুভই গ্রহণ করেন। সজ্জনেরা পরের অপবাদ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিষণ্ণ হয়েন, কিন্তু দুর্জনেরা পরের নিন্দা করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হয়। সাধু ব্যক্তিরা মান্য লোকদিগকে সংবর্দ্ধনা করিয়া যাদৃশ সুখী হন, অসাধুগণ সজ্জনগণের অপমান করিয়া ততোধিক সন্তোষ লাভ করেন। অদোষদর্শী সাধু ও দোষৈকদর্শী অসাধু উভয়েই সুখে কালাতিপাত করে; কারণ অসাধু সাধু ব্যক্তির নিন্দা করে, কিন্তু সাধু ব্যক্তি অসাধুকর্তৃক অপমানিত হইয়াও তাহার নিন্দা করেন না। যে ব্যক্তি স্বয়ং দুর্জন সে সজ্জনকে দুর্জন বলে, ইহা হইতে হাস্যকর আর কি আছে? ক্রুদ্ধকাল-সর্পরূপী সত্যধৰ্ম্মচ্যুত পুরুষ হইতে যখন নাস্তিকেরাও বিরক্ত হয়, তখন মাদৃশ আস্তিকেরা কোথায় আছেন? যে ব্যক্তি স্বয়ং স্ব-সদৃশ পুত্র উৎপাদন করিয়া তাহার সমাদর না করে, দেবতারা তাহাকে শ্রীভ্রষ্ট করেন এবং সে অভীষ্টলোক প্রাপ্ত হইতে পারে না। পিতৃগণ পুত্রকে কুল ও বংশের প্রতিষ্ঠা এবং সর্ব্বধর্মোত্তম বলিয়া নির্দেশ করেন, অতএব পুত্রকে পরিত্যাগ করা অত্যন্ত অবিধেয়। ভগবান্ মনু কহিয়াছেন, ঔরস, লব্ধ, ক্রীত, পালিত এবং ক্ষেত্রজ এই পঞ্চবিধ পুত্র, মনুষ্যের ইহকালে ধৰ্ম্ম, কীর্তি ও মনঃপ্রীতি বর্দ্ধন করে এবং পরকালে নরক হইতে পরিত্রাণ করে। অতএব হে নরনাথ! তুমি পুত্রকে পরিত্যাগ করিও না। হে ধরাপতে! আত্মাকৃত সত্য ও ধৰ্ম্ম প্রতিপালন কর। হে নরেন্দ্র! কপটতা পরিত্যাগ কর। দেখ শত শত কূপ খনন অপেক্ষা এক পুষ্করিণী প্রস্তুত করা শ্রেষ্ঠ; শত শত পুষ্করিণী খনন করা অপেক্ষা এক যজ্ঞানুষ্ঠান করা শ্রেষ্ঠ; শত শত যজ্ঞানুষ্ঠান অপেক্ষা এক পুত্রোৎপাদন করা শ্রেষ্ঠ এবং শত শত পুত্র উৎপাদন অপেক্ষা এক সত্য প্রতিপালন করা শ্রেষ্ঠ; এক দিকে সহস্র অশ্বমেধ ও অন্যদিকে এক সত্য রাখিয়া তুলা করিলে সহস্র অশ্বমেধ অপেক্ষাও এক সত্যের গুরুত্ব অধিক হয়। হে মহারাজ! সমুদায় বেদ অধ্যয়ন ও সর্ব্বতীর্থে অবগাহন করিলে সত্যের সমান হয় কি না সন্দেহ! যেমন সত্যের সমান ধর্ম নাই এবং সত্যের সমান উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই, তদ্রুপ মিথ্যার তুল্য অপকৃষ্টও আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। হে রাজন! সত্যই পরব্রহ্মা, সত্য প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করাই পরমোৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম; অতএব তুমি সত্য পরিত্যাগ করিও না। আর যদি তুমি মিথ্যানুগামী হইয়া আমাকে অশ্রদ্ধা কর, তবে আমি আপনিই এস্থান হইতে প্রস্থান করিব, তোমার সহিত আর কদাচ আলাপ করিব না; কিন্তু হে দুষ্মন্ত! তোমার অবিদ্যমানে এই পুত্র সসাগরা বসুন্ধরা অবশ্যই প্রতিপালন করিবে, সন্দেহ নাই।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, শকুন্তলা রাজাকে এই কথা কহিয়া নিরস্ত হইবামাত্র ঋত্বিক্, পুরোহিত, আচার্য্য ও মন্ত্রিগণে পরিবেষ্টিত রাজার প্রতি এই আকাশবাণী হইল। "মাতা ভস্ত্রাস্বরূপ, পিতারই পুত্র; পুত্র জনয়িতা হইতে কিছুমাত্র বিভিন্ন নহে, অতএব হে দুষ্মন্ত! তুমি আপনার পুত্রকে প্রতিপালন কর, শকুন্তলাকে অপমান করিও না। হে নরদেব। ঔরসপুত্র পিতাকে যমালয় হইতে উদ্ধার করে। শকুন্তলা সত্যই কহিতেছেন, তুমি এই পুত্রের উৎপাদক। জনয়িত্রী স্বকীয় অঙ্গকে দ্বিখণ্ড করিয়া অর্দ্ধভাগ পুত্ররূপে প্রসব করেন, অতএব হে দুষ্মন্ত। এই শকুন্তলাগর্ভ-সমুদ্ভূত পুত্রকে প্রতিপালন কর। জীবৎপুত্রকে পরিত্যাগ করা শ্রেয়স্কর নহে, অতএব হে রাজন। শকুন্তলাগর্ভজাত এই স্বীয় পুত্রকে লালন পালন কর। যেহেতু আমাদিগের উপরোধে তোমার এই পুত্রকে ভরণ করা আবশ্যক হইল, এই নিমিত্ত ইনি ভরত নামে বিখ্যাত হইবেন।”
রাজা দুষ্মন্ত দৈববাণী শ্রবণে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া পুরোহিত ও অমাত্যবর্গকে কহিলেন, আপনারা দেবদূতের বাক্য শুনিলেন? আমিও এই কুমারকে আমারই আত্মজ বলিয়া জানি; কিন্তু যদি সহসা ইহাকে গ্রহণ করি, তাহা হইলে লোকে আমাকে দোষী করিবে এবং পুত্রটিও কলঙ্কী হইবে, এই ভয়ে শকুন্তলার সহিত বিতণ্ডা করিতেছিলাম। তাঁহাদিগকে এই কথা বলিয়া রাজা হৃষ্টচিত্তে পুত্রকে গ্রহণ করিলেন।
অনন্তর রাজা পিতৃকর্ত্তব্য সমুদায় কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া পুত্রের মস্তকাঘ্রাণপূর্ব্বক আলিঙ্গন করিলেন। তৎকালে ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে ধন্যবাদ করিতে লাগিলেন এবং বন্দিগণ স্তুতিপাঠ করিতে লাগিল। অনন্তর রাজা ধৰ্ম্মপত্নী শকুন্তলাকে যথোচিত সমাদর পূর্ব্বক সান্ত্বনাবাক্যে কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে। নির্জন কাননে তোমার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলাম, কেহই জানিত না; দোষৈকদর্শী লোক পাছে তোমাকে কুলটা, আমাকে কামপরবশ এবং রাজ্যে অভিষিক্ত পুত্রকে জারজ মনে করে, এই ভয়ে আমি এতক্ষণ এতদ্রূপ বিচার করিতেছিলাম। তুমি ক্রুদ্ধা হইয়া আমার প্রতি যে সকল কটুবাক্য প্রয়োগ করিয়াছ, হে প্রিয়তমে। আমি তাহা ক্ষমা করিয়াছি।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরত! রাজা দুষ্মন্ত মহিষীকে এইরূপ কহিয়া বস্ত্রান্নপানাদি দ্বারা পরিতুষ্টা করিলেন এবং শকুন্তলার পুত্রের নাম ভরত রাখিলেন। পরে রাজাধিরাজ দুষ্মন্ত পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। ভরত যুবরাজ হইয়া কতিপয় দিবসের মধ্যে সমস্ত মহীপালগণকে পরাজয় করিয়া ধর্মানুষ্ঠানদ্বারা পরম যশস্বী হইলেন। অনন্তর রাজচক্রবর্তী হইয়া অনল্প অশ্বমেধযজ্ঞের অনুষ্ঠানদ্বারা সুরগণের নিকট ইন্দ্রের ন্যায় আদরণীয় হইয়া উঠিলেন। হে মহারাজ! সেই ভরত হইতে ভারতী কীর্তি ও তোমাদিগের ভারত নামক সুবিখ্যাত কুল সমুৎপন্ন হইয়াছে।
আদিপর্ব্বান্তর্গত সম্ভবপর্ব্বাধ্যায়ে শকুন্তলোপাখ্যান সম্পূর্ণ।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে পুণ্যাত্মন্! মহারাজ দুষ্মন্ত ও পতিপরায়ণা শকুন্তলার উপাখ্যান কীর্ত্তন করিলাম; এক্ষণে দক্ষ প্রজাপতি, বৈবস্বত মনু, ভরত, কুরু, পুরু, আজমীঢ়, যদু, কৌরব ও ভারত ইঁহাদিগের বংশ কীর্ত্তন করি, শ্রবণ করুন। ইঁহারা সকলেই মহর্ষির ন্যায় তেজস্বী এবং ইঁহাদিগের বংশকীর্ত্তন অতি পবিত্র, আয়ুষ্কর ও যশস্কর। প্রচেতার প্রথমতঃ দশ পুত্র জন্মে। তাঁহারা সকলেই রাক্ষস হইয়াছিলেন। ভগবান্ প্রচেতাঃ মুখনির্গত অগ্নিদ্বারা সেই মহাতেজস্বী রাক্ষসরূপী পুত্রগণকে দগ্ধ করেন। পরে প্রচেতার দক্ষ নামে অপর এক পুত্র জন্মেন। দক্ষ হইতে এই সমস্ত প্রজা সৃষ্টি হইয়াছে। হে পুরুষসিংহ। এই কারণবশতঃ লোকে তাঁহাকে পিতামহ বলিয়া নির্দেশ করে। দক্ষ বীরিণীর গর্তে আত্মসদৃশ সহস্রসংখ্যক পুত্র উৎপাদন করেন। মহর্ষি নারদ সেই সহস্রসংখ্যক দক্ষসন্তানগণকে অত্যুৎকৃষ্ট সাস্থ্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করাইয়া মোক্ষোপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। হে জনমেজয়। অনন্তর প্রজাসিসৃক্ষু' প্রজাপতি দক্ষ পঞ্চাশৎ কন্যা উৎপাদন করিলেন। তিনি তাঁহাদিগের সকলকেই পুত্রিকা' করিয়া তন্মধ্যে দশটি ধৰ্ম্মকে, ত্রয়োদশটি কশ্যপকে ও সাতাইশটি চন্দ্রকে সম্প্রদান করেন। কশ্যপের ত্রয়োদশ পত্নীর মধ্যে দাক্ষায়ণী প্রধানা ছিলেন। তাঁহার গর্বে দ্বাদশ আদিত্য উৎপন্ন হয়েন। তৎপরে কশ্যপ হইতে ইন্দ্রাদি দেবতা ও বিবস্বান্ জন্মগ্রহণ করিলেন। বিবস্বানের দুই পুত্র; বৈবস্বত মনু ও যম। ধীমান্ মনু হইতে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় প্রভৃতি মানবজাতি উৎপন্ন হয়, এই নিমিত্ত তাঁহারা মানব বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছেন। তন্মধ্যে ব্রাহ্মণেরা সাঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করিলেন। বেণ, ধৃষ্ট, নরিষ্যন্ত, নাভাগ, ইক্ষাকু, কারুষ, শর্যাতি, ইলা, পৃষ এবং নাভাগারিষ্ট, মনুর এই দশ সন্তান ক্ষত্রিয়ধর্ম-পরায়ণ হইলেন। মনুর আরও পঞ্চাশটি পুত্র জন্মে, কিন্তু আমরা শুনিয়াছি, তাঁহারা পরস্পর বৈরভাব অবলম্বন করিয়া বিনষ্ট হয়েন। ইলা হইতে পুরূরবাঃ উৎপন্ন হইয়াছিলেন। ইলা, তাঁহার পিতা ও মাতা উভয়ই ছিলেন। পুরূরবাঃ মনুষ্যকলেবর ধারণ করিয়াও সর্ব্বদা দেবগণে বেষ্টিত থাকিতেন এবং সমুদ্র পরিবেষ্টিত ত্রয়োদশ দ্বীপের অধীশ্বর হইয়াছিলেন। তিনি বীর্য্যমদে মত্ত হইয়া বিপ্রবর্গের সহিত যুদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগের চিরসঞ্চিত বহুমূল্য রত্নসকল অপহরণ করিতেন। ব্রাহ্মণেরা তাঁহার উপর সমুচিত আক্রোশ প্রকাশ করিয়াও কিছুমাত্র প্রতীকার করিতে পারেন নাই। অনন্তর সনৎকুমার ব্রহ্মলোক হইতে উপস্থিত হইয়া পুরূরবাকে অনুদর্শ যজ্ঞে দীক্ষিত করিলেন। কিন্তু তিনি তাহা স্বীকার করিলেন না। তৎপরে ক্রোধাবিষ্ট মহর্ষিগণের অভিশাপে সেই লোভ-পরতন্ত্র বলদৃপ্ত নরাধিপ সদ্যই বিনষ্টপ্রায় হইলেন। তিনি যজ্ঞাদিক্রিয়া নির্ব্বাহার্থ গন্ধর্ব্বলোক হইতে ত্রেতাগ্নি' ও উর্ব্বশীকে আনয়ন করেন। ইলাপুত্র পুরূরবার উর্ব্বশীর গর্তে আয়ু, ধীমান, অমাবসু, দৃঢ়ায়ু, বনায়ু এবং শতায়ু, এই ছয় পুত্র জন্মে। নহুষ, বৃদ্ধশর্মা, রাজিঙ্গয় এবং অনেবস্, এই চারিটি আয়ুর ঔরসে ও স্বর্ভানবীর গর্বে উৎপন্ন হয়েন। হে পৃথিবীপাল। ধীমান্ সত্যপরাক্রম নহুষ রাজা ধর্মানুসারে এই পৃথিবী পালন করিয়াছিলেন। নহ্য পিতৃলোক, দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব্ব, উরগ, রাক্ষস, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই সকলকে সমভাবে প্রতিপালন করিতেন। তিনি দস্যুদল এরূপ দমন করিয়াছিলেন যে, তাহারা ঋষিদিগকে করপ্রদান ও পৃষ্ঠে বহন করিত। তিনি স্বকীয় তেজঃপ্রভাবে ও তপোবলে দেবতা-দিগকে পরাভব করিয়া ঋষিগণকে ইন্দ্রত্ব ভোগ করাইতেন। তিনি যতি, যযাতি, সংযাতি, আয়তি, অয়তি ও ধ্রুব নামে ছয়টি পুত্র উৎপাদন করেন। তন্মধ্যে যতি যোগবলে মুনি হইয়া চরমকালে পরব্রহ্মে লীন হন। যযাতি স্বীয় বিক্রমপ্রভাবে সম্রাট্ হইয়া এই সসাগরা পৃথিবী শাসন, বহুবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান ও একান্ত ভক্তির সহিত পিতৃ ও দেবগণকে অর্চ্চনা করিয়া সুতনির্বিশেষে প্রজাপালন করিতেন।
হে মহারাজ! সত্যপরাক্রম যযাতি সম্রাট্ ছিলেন। তিনি ধৰ্ম্মতঃ রাজ্যশাসন এবং প্রজাবর্গের প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ প্রদর্শন করিতেন। মহারাজ যযাতি, সর্ব্বদা যাগ-যজ্ঞ এবং ভক্তিপূর্ব্বক পিতৃ ও দেবগণের শুশ্রুষা করিতেন। দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা নামে যযাতির দুই মহিষী ছিলেন। তন্মধ্যে দেবযানীর গর্তে যদু ও তুৰ্ব্বসু নামে দুই পুত্র জন্মেন। শর্মিষ্ঠার গর্তে দ্রস্থ, অনু ও পুরু নামে তিন পুত্র জন্মেন। তাঁহারা সকলেই মহাধনুর্দ্ধর ও সর্ব্বগুণ-সম্পন্ন ছিলেন। মহারাজ যযাতি বহুকাল ধৰ্ম্মতঃ প্রজাপালন করিয়া অবশেষে শুক্রাচার্য্যের শাপে জরাগ্রস্ত হইলেন। তখন তিনি সেই রূপনাশিনী জরার প্রভাবে ভোগসুখে বঞ্চিত হইয়া পুত্রদিগকে সম্বোধন পূর্বক কহিলেন, হে পুত্রগণ। আমি তোমাদিগের যৌবন দ্বারা যুবতীগণের সহিত বিহার করিতে বাসনা করি, তোমরা তদ্বিষয়ে আমাকে সাহায্য কর। ইহা শুনিয়া দেবযানীর জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু কহিলেন, মহারাজ! আমাদিগের যৌবনদ্বারা আপনার কিরূপ সহায়তা সম্পাদন করিব, আজ্ঞা করুন। যযাতি কহিলেন, তুমি আমার জরা গ্রহণ কর। আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপ বিষয় সম্ভোগ করিব। দীর্ঘ সত্রানুষ্ঠানকালে মহর্ষি উশনার সাপে কামার্থ-বিনাশিনী জরা আমাকে আক্রমণ করিয়াছে, আমি তজ্জন্য সাতিশয় সন্তপ্ত হইতেছি; অতএব হে পুত্রগণ! তোমাদিগের মধ্যে এক জন আমার জীর্ণ কলেবর লইয়া রাজ্য-শাসন কর।। যিনি জরা গ্রহণ করিবেন, আমি তাঁহার নবীন তনু আশ্রয় করিয়া বিষয় সম্ভোগ করিব। তাহা শুনিয়া যদু প্রভৃতি চারিজন তাঁহার জরা গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন না। পরিশেষে সর্ব্বকনিষ্ঠ পুরু কহিলেন, মহারাজ! আপনি আমার নবযৌবন-সম্পন্ন সুকুমার কলেবর আশ্রয় করিয়া অভিলাষানুরূপ বিষয় সম্ভোগ করুন, আমি আপনার জরা গ্রহণ করিয়া রাজ্য শাসন করিব। পরে রাজর্ষি যযাতি তপোবলে পুত্রশরীরে স্বকীয় জরা সঞ্চারিত করিলেন। অনন্তর সেই নৃপতি পুরুর বয়োলাভ করিয়া যৌবনশালী হইলেন এবং পুরু ত্বদীয় বয়ঃপ্রভাবে জরাগ্রস্ত হইয়া রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। শাদুলসম বিক্রান্ত রাজা যযাতি, সহস্র বৎসর উভয় পত্নীর সহিত পরম সুখে বিহার করিয়াও পরিতৃপ্ত হইলেন না। পরে চৈত্ররথ নামক কুবেরোদ্যানে' বিশ্বাচী নাম্নী এক অপ্সরার সহিত কিছুকাল বিহার করিয়াও পরিতৃপ্ত হইলেন না। পরিশেষে মনোমধ্যে এই পৌরাণিকী গাথা অনুধ্যান করিলেন। কাম্য বস্তুর উপভোগে কামের উপশম হওয়া দূরে থাকুক প্রত্যুত ঘৃতসংযুক্ত বহ্নির ন্যায় উহা ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে থাকে। যদি এক জনে এই রত্নগর্ভা পৃথিবীর সমুদায় হিরণ্য', সকল পশু এবং সমস্ত মহিলা উপভোগ করে, তথাপি তাহার তৃপ্তিলাভ হওয়া দুর্ঘট; অতএব শান্তিপথ অবলম্বন করাই শ্রেয়ঃকল্প। লোক যখন কায়মনোবাক্যে কাহারও অনিষ্টচেষ্টা না করে, তখন ব্রহ্মতুল্য হয়। মহারাজ যযাতি বৈরাগ্যের সারত্ব ও কামের অসারত্ব আলোচনা করিয়া পুত্র হইতে আপন জরা গ্রহণ করিলেন ও ত্বদীয় যৌবন তাঁহাকে সম্প্রদান করিলেন। পরিশেষে পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া কহিলেন, বৎস। তুমিই যথার্থ পুত্রকাৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছ, তোমার দ্বারাই আমার বংশরক্ষা হইবে, অতএব তোমার বংশ পৌরববংশ বলিয়া লোকে বিখ্যাত হইবে। মহারাজ যযাতি এই বলিয়া তপশ্চরণে মনোনিবেশ করিলেন। পরে অনশনব্রত অবলম্বনপূর্ব্বক দেহত্যাগ করিয়া সস্ত্রীক স্বর্গারোহণ করিলেন।
ষট্সপ্ততিতম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে তপোধন। দশম প্রজাপতি যযাতি রাজা আমাদিগের পূর্ব্ব পুরুষ। তিনি দুর্লভা শুক্রতনয়া দেবযানীকে কিরূপে লাভ করিলেন? আমি তাহা সবিশেষ শ্রবণ করিতে বাসনা করি। আপনি এই বৃত্তান্ত এবং তাঁহার বংশপরম্পরা কীর্ত্তন করিয়া আমার একান্ত কৌতুকাক্রান্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবরাজসম-প্রভাবসম্পন্ন নহুষ-পুত্র যযাতিরাজকে শুক্র ও বৃষপর্ব্বা যেরূপে বরণ করেন এবং তিনি যে প্রকারে দেবযানীকে লাভ করেন, হে মহারাজ। আমি সেই সমস্ত বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। পূর্ব্বে এই চরাচর বিশ্বরাজ্য লাভার্থে দেবতা ও অসুরদিগের পরস্পর তুমুল সংগ্রাম হইয়াছিল। তৎকালে দেবতারা জিগীষাপরবশ হইয়া বৃহস্পতিকে যজ্ঞানুষ্ঠানে পুরোহিতরূপে বরণ করিয়া-ছিলেন। অসুরগণ শুক্রাচার্য্যকে তৎকর্ম্মে ব্রতী করিয়াছিলেন। একরূপ কর্মে দীক্ষিত হইয়াছেন বলিয়া বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য্য ইঁহারা প্রতিনিয়ত পরস্পরের প্রতি স্পর্দ্ধা করিতে লাগিলেন। ঐ যুদ্ধে দেবগণ যে সকল অসুর সংহার করিতেন, শুক্র মৃতসঞ্জীবনীবিদ্যাবলে তাঁহাদিগকে পুনরুজ্জীবিত করিতেন; সেই সকল পুনর্জীবিত অসুরেরা উত্থিত হইয়া দেবতাদিগের সহিত সংগ্রাম করিত। কিন্তু অসুরেরা যুদ্ধে যে সকল দেবতার প্রাণ নাশ করিত, সুরাচার্য্য বৃহস্পতি আর তাঁহাদিগকে পুনর্জীবিত করিতে পারিতেন না; কারণ মহর্ষি শুক্রাচার্য্য যে বিদ্যাপ্রভাবে দানবগণকে পুনরুজ্জীবিত করিতেন, বৃহস্পতি তদ্বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিলেন। পরে দেবতারা বিষাদাপন্ন ও শুক্রাচার্য্যের ভয়ে উদ্বিগ্ন হইয়া বৃহস্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র কচের নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, হে কচ। আমরা তোমার শরণাপন্ন হইলাম তোমারে আমাদিগের এক মহৎ কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে। অমিততেজাঃ শুক্রাচার্য্য যে মৃত-সঞ্জীবনী বিদ্যা জানেন, তুমি সত্বর অপহরণ কর। এই কর্ম করিলে তুমি সর্ব্ব বিষয়ে আমাদিগের অংশভাগী হইবে। সম্প্রতি বৃষপর্ব্বার নিকটে তুমি শুক্রাচার্য্যকে দেখিতে পাইবে। তিনি তথায় দানবগণকে সর্ব্বদা রক্ষা করিতেছেন, কিন্তু দেবতাদিগের প্রতি কটাক্ষপাতও করেন না। তুমি অল্পবয়স্ক বালক। তুমিই তাঁহার আরাধনায় সক্ষম হইবে। সেই মহাত্মার দেবযানীনাম্নী এক কন্যা আছেন, তাঁহাকেও আরাধনা করিতে তোমাভিন্ন অন্য কেহই সমর্থ হইবে না। দয়া দাক্ষিণ্য সুশীলতাদি গুণে দেবযানীকে সন্তুষ্টা করিতে পরিলে তুমি নিশ্চয়ই সেই সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করিবে।
অনন্তর বৃহস্পতিতনয় কচ "তথাস্তু” বলিয়া বৃষপর্ব্বা সমীপে গমন করিলেন। দেবগণ প্রেরিত কচ দ্রুতগমনে তথায় উপনীত হইয়া অসুরেন্দ্র বৃষপর্ব্বার সমীপে শুক্রকে দেখিয়া কহিলেন, মহাশয়! আমি মহর্ষি অঙ্গিরার পৌত্র, সাক্ষাৎ বৃহস্পতির পুত্র, আমার নাম কচ, আপনাকে গুরু স্বীকার করিলাম। আপনি আমার গুরুত্বে বৃত হইলে আমি সহস্র বৎসর ব্রহ্মচর্য্য অনুষ্ঠান করিব, আপনি আমাকে অনুমতি করুন। শুক্র কহিলেন, হে কচ! তোমার পিতা বৃহস্পতি পূজনীয়, অতএব আমি তোমার বাক্য অঙ্গীকার করিলাম। এক্ষণে তোমাকে ব্রহ্মচর্য্য ব্রতে অধিকারী করি।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! কচ ভৃগুপুত্র শুক্রাচার্য. কর্তৃক আদিষ্ট ব্রহ্মচর্য্য ব্রত গ্রহণ করিলেন এবং ব্রতকালের অব্যাঘাতে উপাধ্যায়ের ও তৎপুত্রী দেবযানীর আরাধনা করিতে লাগিলেন। তিনি প্রতিদিন নৃত্য, গীত, বাদ্য এবং ফলপুষ্পাদি আহরণদ্বারা অত্যল্প দিবসের মধ্যেই প্রাপ্তযৌবনা দেবযানীর পরিতোষ জন্মাইলেন। দেবযানীও গীত বাদ্যদ্বারা ব্রতধারী কচের পরিচর্যা করিতে লাগিলেন। এইরূপ ব্রতাচরণ করিতে করিতে কচের পঞ্চশত বর্ষ অতীত হইল। অনন্তর দানবেরা কচের অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া উপাধ্যায়ের গোরক্ষণে নিযুক্ত নির্জন কাননস্থ কচকে বিনাশ করিল এবং ত্বদীয় দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া শৃগাল কুকুরগণকে ভক্ষণ করিতে দিল। তখন গো সকল গোপশূন্য হইয়া স্ব স্ব নিবেশনে প্রত্যাগত হইল। পরে দেবযানী কচকে না দেখিয়া পিতার নিকট নিবেদন করিলেন, হে পিতঃ! আপনার অগ্নিহোত্রে আহুতি প্রদান করা হইল, সূর্যদেব অস্তে গমন করিলেন এবং গো সকল গোপশূন্য হইয়া গৃহে আগমন করিল, কিন্তু কচকে প্রত্যাগত দেখিতেছি না; অতএব নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, কচ আহত বা কালগ্রস্ত হইয়াছে। আমি সত্য কহিতেছি, কচ ব্যতিরেকে জীবন ধারণ করিতে পারিব না। শুক্র কহিলেন, বৎসে! চিন্তা কি? কচ এই মুহূর্তেই আসিবে, আমি মৃত কচকে পুনর্জীবিত করিব, এই বলিয়া সঞ্জীবনীবিদ্যা প্রয়োগপূর্ব্বক কচকে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করিতে লাগিলেন। আহুত কচ সঞ্জীবনীবিদ্যাপ্রভাবে পুনর্ব্বার জীবন প্রাপ্ত হইয়া শৃগাল কুকুরগণের দেহ বিদীর্ণ করিয়া হৃষ্টমনে উপাধ্যায় সমীপে উপস্থিত হইলে দেবযানী কহিলেন, কচ। তোমার আসিতে এত বিলম্ব হইল কেন? কচ উত্তর করিলেন, হে ভাবিনি। আমি সমিৎকুশ এবং কাষ্ঠভার দ্বারা আক্রান্ত ও একান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া গোগণের সহিত বিশ্রামার্থ এক বটবৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় লইয়াছিলাম। ইত্যবসরে অসুরগণ তথায় আসিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে? আমি কহিলাম, আমি বৃহস্পতির পুত্র, আমার নাম কচ। এই কথা কহিবামাত্র তাহারা আমাকে বধ করিয়া তদ্দণ্ডে আমার শরীর খণ্ড খণ্ড করত শৃগাল কুকুরগণকে ভক্ষণার্থ প্রদানপূর্ব্বক পরমসুখে স্ব স্ব গৃহে প্রতি-নিবৃত্ত হইল। এক্ষণে মহাত্মা ভার্গবের বিদ্যাবলে পুনর্ব্বার জীবন পাইয়া তোমার নিকট উপস্থিত হইলাম।
অনন্তর একদা দেবযানী পুষ্পচয়নার্থ কচকে অরণ্যে প্রেরণ করিলেন। দানবেরা কাননস্থ কচের শরীর চূর্ণ করিয়া সমুদ্রজলে মিশ্রিত করিয়া দিল। এ দিকে দেবযানী কচের বিলম্ব দেখিয়া পিতার নিকট নিবেদন করিলেন। তখন শুক্র বিদ্যা-প্রভাবে কচকে আহ্বান করিলে কচ পুনর্ব্বার আসিয়া গুরু সন্নিধানে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তৃতীয়বার অসুরেরা কচকে বিনষ্ট ও ভস্মাবশিষ্ট করিয়া শুক্রাচার্য্যের সুরার সহিত মিশ্রিত করিয়া দিল। তখন দেবযানী পুনর্ব্বার পিতাকে নিবেদন করিলেন, হে পিতঃ। আমি পুষ্পাহরণার্থ কচকে প্রেরণ করিয়াছিলাম কিন্তু এখনও তাহাকে প্রত্যাগত দেখিতেছি না। বোধ হয়, সে আহত বা মৃত হইয়া থাকিবে। হে পিতঃ। আমি নিশ্চয় কহিতেছি, কচ ব্যতীত জীবন ধারণ করিতে পারিব না। শুক্রাচার্য্য কহিলেন, হে পুত্রী। বৃহস্পতির পুত্র কচ নিশ্চয়ই মৃত হইয়াছে। আমি সঞ্জীবনী বিদ্যাপ্রভাবে বারংবার তাহার জীবন রক্ষা করিতেছি; কি করি, অসুরেরা তথাপি তদ্বিনাশে বিরত হইতেছে না; অতএব হে দেবযানি! তুমি শোক বা রোদন করিও না। তোমার সদৃশী মহিলারা সামান্য মর্ত্যলোকের নিমিত্ত শোক মোহে অভিভূত হন না। দেখ ব্রহ্মা, ব্রাহ্মণগণ, ইন্দ্রাদি দেবগণ, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, অসুরগণ এবং সমস্ত জগৎ তোমাকে মহাপ্রভাব-শালিনী জানিয়া নমস্কার করেন। কচের জীবন রক্ষা করা বৃথা বোধ হইতেছে, যেহেতু অসুরেরা সুযোগ পাইলেই পুনর্ব্বার তাহার প্রাণ সংহার করিবে। দেবযানী কহিলেন, বৃদ্ধতম মহর্ষি অঙ্গিরাঃ যাঁহার পিতামহ, তপোনিধি বৃহস্পতি যাঁহার পিতা, তাঁহার নিমিত্ত কেনই বা রোদন ও শোক করিব না? কচ নিজেও সামান্য লোক নহেন। তিনি ব্রহ্মচারী, তপোধন ও সর্ব্ব কার্য্যে সুনিপুণ। হে তাত! আমি নিরাহারে প্রাণ ত্যাগ করিয়া কচের অনুগামিনী হইব। কচ আমার নিতান্ত প্রিয়পাত্র, আমি তাঁহাকে না দেখিয়া ক্ষণমাত্রও জীবন ধারণ করিতে পারিব না।
মহর্ষি শুক্র দেবযানীকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া কচকে আহ্বান করিয়া ক্রোধভরে কহিলেন, নিশ্চয়ই অসুরেরা আমার প্রতি বিদ্বেষাপন্ন হইয়াছে এবং এই নিমিত্তই বারংবার আমার শিষ্যের প্রাণনাশ করিতেছে। দুর্দান্ত দানবেরা এই পৃথিবীকে ব্রাহ্মণশূন্য করিবার অভিলাষে আমার প্রতি এইরূপ অত্যাচার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে। ভাল, আমি এক্ষণেই তাহাদিগের পাপের দণ্ডবিধান করিতেছি। ব্রহ্মহত্যাকৃত পাপ ইন্দ্রকেও দগ্ধ করিতে পারে; এই বলিয়া কচকে বিদ্যাবলে আহ্বান করিতে লাগিলেন। সমাহৃত কচ গুরুর ভয়ে ভীত হইয়া জঠর হইতে অল্পে অল্পে উত্তর দিলেন। শুক্রাচার্য্য নিজ জঠর হইতে তাঁহার কথা শুনিতে পাইয়া কহিলেন, কচ! তুমি কি প্রকারে আমার উদরে প্রবিষ্ট হইয়াছ? কচ কহিলেন, আপনার প্রসাদে বলবতী স্মরণ-শক্তি আমাকে পরিত্যাগ করে নাই, এই নিমিত্ত আমার যথাবৎ বৃত্তান্ত স্মরণ হইতেছে। আর আমার তপস্যা কিছুমাত্র ক্ষয় হয় নাই, এই নিমিত্ত এই দারুণ ক্লেশ সহ্য করিতে সমর্থ হইয়াছি। অসুরেরা আমাকে দগ্ধ ও চূর্ণ করিয়া আপনার সুরার সহিত মিশ্রিত করিয়া দিয়াছিল। আপনি বিদ্যমান থাকিতে আসুরী মায়া কখনই ব্রাহ্মী মায়াকে অতিক্রম করিতে পারিবে না। শুক্র কহিলেন, বৎসে দেবযানি! অদ্য কিরূপে তোমার প্রিয় কাৰ্য্য সম্পাদন করিব? আমি প্রাণ পরিত্যাগ না করিলে কচের প্রাণ রক্ষা হয় না। কচ আমার উদরের অভ্যন্তরে অবস্থিতি করিতেছে; সুতরাং কুক্ষিবিদারণ ব্যতিরেকে কচ কিরূপে নির্গত হইবে। দেবযানী কহিলেন, তাত! কচের বিনাশ ও আপনার উপঘাত, এক্ষণে এই উভয়ই আমার পক্ষে সাক্ষাৎ অগ্নিকল্প বোধ হইতেছে। কচের বিনাশ হইলে আমার জীবন নষ্ট হইবে এবং আপনার বিয়োগে কিরূপেই বা প্রাণ ধারণ করিব? তখন শুক্র উদরস্থ কচকে কহিলেন, হে বৃহস্পতিপুত্র কচ! যেহেতু দেবযানী তোমাকে ভক্ত বলিয়া আদর করেন, অতএব বোধ হয়, তুমি কোন সিদ্ধ পুরুষ অথবা কচরূপী ইন্দ্র হইবে। যাহা হউক, অদ্য তোমাকে এই সঞ্জীবনীবিদ্যা প্রদান করিব। ব্রাহ্মহ্মণ ব্যতীত অন্য কেহ পুনর্জীবিত হইয়া আমার উদর হইতে বহির্গত হইতে পারে না, অতএব অঙ্গীকার করিতেছি, তোমাকে বিদ্যা দান করিব, কিন্তু বৎস। তুমি পুত্ররূপে আমার দেহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া পুনর্ব্বার বিদ্যাবলে আমাকে জীবিত করিবে। দেখিও এই ধৰ্ম্ম প্রতিপালনে যেন পরাম্মুখ হইও না।
অনন্তর কচ শুক্রসন্নিধানে সঞ্জীবনীবিদ্যা প্রাপ্তপূর্ব্বক কুক্ষি ভেদ করিয়া পূর্ণিমার শশাঙ্কের ন্যায় তৎক্ষণাৎ নিষ্ক্রান্ত হইলেন। নিষ্ক্রান্ত হইয়া দেখিলেন, মৃত শুক্রাচার্য্য ভূতলে পতিত আছেন। কচ অবিলম্বে সিদ্ধবিদ্যাদ্বারা তাঁহাকে জীবিত করিয়া অভিবাদন পূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্। যিনি কর্ণে অমৃত নিষেক স্বরূপ মন্ত্র প্রদান করেন, আমি তাঁহাকে পিতামাতাস্বরূপ স্বীকার করি। কোন্ ব্যক্তি এমত মূঢ় যে তাদৃশ হিতৈষী লোকের অনিষ্ট চেষ্টা করিবে? সত্যফলপ্রদ নিধির নিধিস্বরূপ ও পরম পূজনীয় গুরুদেবকে যে ব্যক্তি আদর না করে, সেই পাপিষ্ঠ ইহলোকে অপ্রতিষ্ঠিত হইয়া পরলোকে নিরয়গামী হয়। মহানুভব শুক্র সুরাপানজনিত অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত অভিরূপ' কচকে সুরাসহকারে উদরস্থ করিয়াছিলেন, এই বলিয়া সুরার প্রতি জাতক্রোধ হইলেন। তিনি বিপ্রগণের প্রিয় সম্পাদনার্থ কহিলেন, অদ্যাবধি যে মূঢ়মতি ব্রাহ্মণ ভ্রান্তিক্রমেও মদ্যপান করিবে, সে অধার্মিক ও ব্রহ্মহা' হইয়া ইহকালে ও পরকালে ঘৃণিত ও নিন্দিত হইবে। আমি বিপ্রধর্ম্মের এই সীমা' সংস্থাপন করিলাম। গুরুশুশ্রূষা-পরায়ণ ব্রাহ্মণগণ ও অন্যান্য লোক ইহা শ্রবণ করুন। তপোনিধি এই বলিয়া মূঢ়বুদ্ধি দানবদিগকে আহ্বান করিয়া এই কথা কহিলেন, "অরে নির্বোধ দানবগণ। আমার তুল্য প্রভাব-শালী মহাত্মা কচ সঞ্জীবনীবিদ্যা-প্রভাবে ব্রহ্মভূত হইয়া আমার নিকট বাস করিবেন" এই কথা কহিয়া বিরত হইলেন। তৎপরে দানবেরা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া স্ব স্ব নিকেতনে গমন করিল। কচ সহস্র বৎসর গুরুগৃহে বাস করিয়া পরিশেষে তাঁহার অনুমতি লইয়া দেবলোকে প্রস্থান করিলেন।
সপ্তসপ্ততিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ব্রতপরায়ণ কচ গুরুকর্তৃক আদিষ্ট হইয়া ত্রিদশালয়ে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলে, দেবযানী কহিলেন, হে মহর্ষি। অঙ্গিরার পৌত্র কচ। তুমি কুল, শীল, বিদ্যা, তপস্যা ও শম দমাদি দ্বারা অলঙ্কৃত হইয়াছ। মহাযশাঃ অঙ্গিরা যেমন আমার পিতার মান্য, তোমার পিতা বৃহস্পতিও আমার সেইরূপ মান্য ও পূজনীয়। এই সকল আলোচনা করিয়া আমি যাহা কহিতেছি, শ্রবণ কর। হে তপোধন। তুমি নিয়মস্থ বা ব্রতনিষ্ঠ হইলে আমি তোমার সবিশেষ শুশ্রূষা করিতাম; এক্ষণে তুমি কৃতবিদ্য হইয়াছ, আমি তোমার প্রতি নিতান্ত অনুরক্তা; অতএব মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক আমার পাণিগ্রহণ কর। কচ কহিলেন, হে শুভে। তোমার পিতা শুক্রাচার্য্য আমার যেরূপ মান্য ও পূজনীয়, তুমিও তদ্রূপ পূজনীয়া। হে ভদ্রে! তুমি ভগবান্ ভার্গবের প্রাণ হইতেও প্রিয়তরা কন্যা। তুমি ধৰ্ম্মতঃ আমার গুরুপুত্রী; সুতরাং আমাকে এরূপ কথা বলা তোমার উচিত হইতেছে না। দেবযানী কহিলেন, তুমি আমার পুত্র নহ। তুমি পিতার একপুত্রের পুত্র। কেবল এই নিমিত্ত তুমি আমার মান্য ও পূজনীয়। কিন্তু অসুরেরা তোমাকে বারংবার নষ্ট করিয়াছিল। সেই অবধি আমি তোমাতে একান্ত অনুরক্তা হইয়াছি। তোমার প্রতি আমি যেরূপ ভক্তি, সৌহার্দ্দ্য ও অনুরাগ করিয়া থাকি, তাহার কিছুই তোমার অবিদিত নহে; অতএব হে ধর্মজ্ঞ। এখন তুমি এই নিরপরাধাকে পরিত্যাগ করিও না। কচ কহিলেন, হে শুভব্রতে। অনিযোজ্য বিষয়ে আমাকে নিয়োগ করা উচিত হইতেছে না। হে বালে। তুমি আমার শুরু হইতেও গুরুতরা। এক্ষণে তুমি আমার প্রতি প্রসন্না হও। হে বিশালাক্ষি! তুমি যে শুক্রের ঔরসে উৎপন্ন হইয়াছ, আমি তাঁহারই উদরে বাস করিয়াছিলাম; সুতরাং তুমি ধৰ্ম্মতঃ আমার ভগিনী হইলে, অতএব এরূপ কথা আর কহিও না। হে ভদ্রে! এতদিন এই স্থলে সুখে বাস করিলাম, এক্ষণে অনুমতি কর, গৃহে গমন করি এবং আশীর্ব্বাদ কর, যেন পথিমধ্যে আমার কোন বিঘ্ন ঘটনা না হয়। কথাপ্রসঙ্গে আমাকে এক এক বার স্মরণ করিও এবং সতত সাবধানে আমার গুরু শুক্রাচার্য্যের পরিচর্যা করিও। দেবযানী কহিলেন, হে কচ! তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করিলে তোমার সঞ্জীবনীবিদ্যা ফলবতী হইবে না। কচ কহিলেন, আমি কোন দোষ শঙ্কায় তোমাকে প্রত্যাখ্যান করিতেছি এমন নহে, গুরুপুত্রী বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতেছি এবং এবিষয়ে গুরুরও অনুমতি নাই, সুতরাং তুমি অকারণে আমাকে অভিসম্পাত করিলে। হে দেবযানি! আমি তোমাকে আর্য্যধর্মের' উপদেশ প্রদান করিতেছিলাম; তথাপি তুমি আমাকে অভিশাপ দিলে, ফলতঃ আমি শাপের উপযুক্ত নহি এবং তোমার এই শাপও ধৰ্ম্মতঃ নহে, কামতঃ; অতএব আমি তোমাকে প্রতিশাপ প্রদান করিতেছি, তুমি যাহা অভিলাষ করিতেছ তাহা নিষ্ফল হইবে এবং অন্য কোন ঋষিকুমারও তোমার পাণিগ্রহণ করিবেন না। আর তুমি আমাকে অভিসম্পাত করিলে যে তোমার অধীত বিদ্যা সিদ্ধ হইবে না। ভাল, তাহা আমি স্বীকার করিলাম কিন্তু আমি যাহাকে ঐ বিদ্যা অধ্যয়ন করাইব সে তদ্বিষয়ে কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিবে। কচ দেবযানীকে এইরূপ প্রতিশাপ প্রদান করিয়া সত্বর দেবলোকে উপনীত হইলেন। ইন্দ্রাদি দেবগণ কচকে অভ্যাগত দেখিয়া বৃহস্পতির সমক্ষে তাঁহাকে এই কথা কহিলেন, হে কচ! তুমি আমাদিগের যে পরমাদ্ভূত হিতকার্য্য সম্পাদন করিলে তাহাতে তোমার যশঃ চিরস্থায়ী হইবে এবং তুমি আমাদিগের অংশভাগী হইবে।
অষ্টসপ্ততিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কচ কৃতবিদ্য হইয়া দেবলোকে প্রত্যাগমন করিলে দেবগণ অতীব হৃষ্টচিত্তে তাঁহার নিকট সেই সঞ্জীবনীবিদ্যা অধ্যয়ন করিয়া চরিতার্থ হইলেন। অনন্তর তাঁহারা সকলে ইন্দ্রসন্নিধানে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, হে পুরন্দর। তোমার বিক্রমপ্রকাশের উপযুক্ত অবসর উপস্থিত হইয়াছে, এক্ষণে শত্রুকুল সংহারের নিমিত্ত প্রস্তুত হও। ইন্দ্র, দেবগণকর্তৃক এইরূপ অভিহিত ও উত্তেজিত হইয়া তৎক্ষণাৎ যাত্রা করিলেন। কিয়দ্দূর গমন করিয়া চৈত্ররথোপম পরম রমণীয় এক কাননে কতকগুলি স্ত্রীলোক দেখিতে পাইলেন। তাহারা স্ব স্ব পরিধেয় বস্ত্র সরোবরতীরে রাখিয়া জলবিহার করিতেছিল। দেবরাজ এই অবসরে বায়ুরূপ ধারণ করিয়া কন্যাদিগের বস্তুসকল একত্র মিশ্রিত করিয়া দিলেন; তৎপরে কন্যাগণ সকলে জল হইতে উত্থিত হইয়া যিনি যে বস্ত্র সম্মুখে পাইলেন, তাহাই পরিধান করিলেন। তন্মধ্যে বৃষপর্ব্বাদুহিতা শর্মিষ্ঠা না জানিতে পারিয়া দেবযানীর বস্ত্র গ্রহণ করিলেন। তদুপলক্ষ্যে তাঁহাদের উভয়ের বিরোধ উপস্থিত হইল। দেবযানী কহিলেন, রে অসুরকন্যা! তুই আমার শিষ্যা হইয়া কোন্ সাহসে আমার বস্ত্র পরিধান করিতেছিস্? এই অত্যাচারে তোর শ্রেয়োলাভ হইবে না। শর্মিষ্ঠা কহিলেন, দেখ দেবযানি। আমার পিতা যখন শয়ান বা উপবিষ্ট থাকেন, তোমার পিতা নিরাসনে উপবেশন করিয়া অতি বিনীতভাবে স্তুতিপাঠকের ন্যায় তাঁহাকে নিয়ত স্তব করিয়া থাকেন। যে ব্যক্তি স্তব, প্রতিগ্রহ ও যাজ্ঞা দ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করে, তুমি তাঁহারই কন্যা। আর সকলে যাঁহার আরাধনা করিয়া থাকে, যিনি প্রার্থনাধিক অর্থ দান করিয়া যাচকের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন, আমি তাঁহার কন্যা। তুমি যত পার ক্ষোভ কর, হিংসা কর, দ্বেষ কর বা শাপ দেও, আমি তোমাকে কখনই সমকক্ষ বলিয়া গণনা করিব না।
শর্মিষ্ঠার এইরূপ অতি কঠোর বাক্য শ্রবণ করিয়া দেবযানী ক্রোধে অধীরা হইয়া বলপূর্ব্বক আপনার পরিধেয় বসন আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে শর্মিষ্ঠা কোপাক্রান্তা ও কম্পিত কলেবরা হইয়া দেবযানীকে সন্নিহিত এক কূপে নিক্ষেপ করিলেন। দেবযানী কূপে পতিত হইয়া নিশ্চয়ই প্রাণ পরিত্যাগ করিয়াছে, এই স্থির করিয়া শর্মিষ্ঠা স্বভবনে গমন করিলেন। মৃগয়াবিহারী নহুযাত্মজ যযাতি রাজা অশ্বারোহণে অরণ্যে ভ্রমণ করিতেছিলেন। তিনি মৃগের অনুসরণক্রমে পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইয়া জল অন্বেষণ করিতে করিতে সেই কূপের সন্নিহিত হইলেন। রাজা জল প্রার্থনায় কূপমধ্যে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র অগ্নিশিখার ন্যায় এক কামিনীকে নয়নগোচর করিয়া অতীব বিস্ময়রসে নিমগ্ন হইলেন। তিনি সেই রমণীকে অতি করুণ-স্বরে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে দেখিয়া মধুর সান্ত্বনা-বাক্যে জিজ্ঞাসিলেন, ভদ্রে! তুমি কে? কাহার কন্যা? কেনই বা এত শোকাকুলা হইয়াছ? আর কিরূপেই বা এই অন্ধকূপে পতিতা হইয়াছ? দেবযানী কহিলেন, দানবেরা দেবগণ কর্তৃক যুদ্ধে নিহত হইলে যিনি সঞ্জীবনীবিদ্যাবলে পুনর্জীবিত করেন, আমি সেই শুক্রাচার্য্যের কন্যা। আমি যে এই বনমধ্যে একাকিনী অন্ধকূপে পতিতা আছি, তাহা তিনি জানিতে পারেন নাই। হে মহারাজ! আপনি মহাবংশপ্রসূত, অসামান্য যশস্বী ও শান্ত প্রকৃতি; অতএব আপনি আমার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া আমাকে এই কূপ হইতে উদ্ধার করুন। রাজা যযাতি তাঁহার পরিচয় পাইয়া ব্রাহ্মণী বোধে দক্ষিণ হস্ত ধারণপূর্ব্বক কূপ হইতে উদ্ধৃত করিলেন এবং সাদর সম্ভাষণপূর্ব্বক তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করিলেন।
নহুষতনয় রাজা যযাতি নিজ রাজধানী প্রস্থান করিলে ঘূর্ণিকা নাম্নী এক দাসী সহসা দেবযানী সমীপে উপস্থিত হইল। দেবযানী বাষ্পাকুললোচনে তাহাকে কহিলেন, ঘূর্ণিকে। তুমি সত্বর আমার পিতার নিকট যাইয়া বল, শর্মিষ্ঠা আমার এই দুর্দশা করিয়াছে, আর আমি বৃষপর্ব্বা রাজার নগরে প্রবেশ করিব না। তাঁহার আদেশ প্রাপ্তিমাত্রে ঘূর্ণিকা দ্রুতপদসঞ্চারে অসুরমন্দিরে প্রবিষ্ট হইয়া সম্ভ্রমাবিষ্টচিত্তে শুক্রসন্নিধানে উপস্থিত হইয়া দেবযানী বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত নিবেদন করিল। মহর্ষি শুক্র শ্রুতিমাত্রেই উত্থিত হইয়া বনমধ্যে কন্যার অন্বেষণে গমন করিলেন এবং অবিলম্বেই তথায় উপনীত হইয়া দেবযানীকে দৃষ্টগোচর করিয়া বাৎসল্যভাবে আলিঙ্গনপূর্ব্বক গদবচনে কহিলেন, বৎসে দেবযানি! আপনার সুকৃতি ও দুষ্কৃতি অনুসারে সকলে সুখ দুঃখ ভোগ করিয়া থাকে; বোধ হয় তুমি কোন পাপকর্ম করিয়া থাকিবে তাহারই ফল ভোগ করিতে হইয়াছে। দেবযানী কহিলেন, তাত! পাপের ভোগ হউক বা না হউক, এক্ষণে বৃষপর্ব্বাতনয়া শর্মিষ্ঠা আমাকে যেরূপ করিয়াছে, তাহা শ্রবণ করুন। এই বলিয়া পিতার নিকট সমস্ত পরিচয় দিলেন। পরিশেষে কহিলেন, শর্মিষ্ঠা যে প্রকার কহিয়াছে, আমি যদি যথার্থই সেইরূপ হই, তবে তাহার নিকট আপনার দোষ স্বীকার করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা কর্ত্তব্য, নতুবা তাহার অহঙ্কারের প্রতীকার করিতে হইবে। শুক্র কহিলেন, বৎসে। তুমি ত স্তাবক বা প্রতিগ্রহোপজীবীর' কন্যা নহ। তোমার পিতা কাহারও চাটুকার নহেন, বরং অন্যে তাঁহার স্তব করিয়া থাকে। বৃষপর্ব্বা, ইন্দ্র এবং নহুষতনয় রাজা যযাতি, ইঁহারা সকলেই জানেন যে, অচিন্ত্য নির্দ্বন্দ্ব পরব্রহ্মই আমার বল। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা তুষ্ট হইয়া আপনি কহিয়াছেন, পৃথিবীতে বা স্বর্গে যে কিছু বস্তু আছে, আমি তাহার ঈশ্বর। আমি তোমাকে সত্য কহিতেছি, প্রজাদিগের প্রিয় কার্য্য সম্পাদনের নিমিত্ত আমিই বারিবর্ষণ ও ওষধিসকল পুষ্ট করিয়া থাকি। মহানুভব শুক্র, বিষাদমগ্না ক্রোধাকুলা দেবযানীকে এইরূপ মধুরবাক্যে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন।
একোনাশীতিতম অধ্যায়।
শুক্র কহিলেন, হে দেবযানি! যে ব্যক্তি ক্ষমাগুণে পরের তিরস্কারবাক্যে উপেক্ষা প্রদর্শন করেন, এই সচরাচর বিশ্ব তাঁহারই আয়ত্ত। সাধু লোকেরা অশ্বরশ্মি'গ্রাহীকে সারথি না বলিয়া যিনি উত্তেজিত ক্রোধকে অশ্বের ন্যায় নিগ্রহ করিতে পারেন, তাঁহাকেই যথার্থ সারথি বলিয়া থাকেন। যিনি উদ্রিক্ত ক্রোধানলে ক্ষমাবারি সেচন করিতে পারেন, এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক জগৎ তাঁহারই জয় করা হয়। যেমন সর্প নির্মোক' পরিত্যাগ করে, তদ্রুপ যিনি ক্রোধ পরিত্যাগ করিতে পারেন, পণ্ডিতেরা তাঁহাকেই সৎপুরুষ কহেন। যিনি ক্রোধাবেগ সংবরণপূর্ব্বক তিরস্কারে উপেক্ষা প্রদর্শন করেন এবং সন্তপ্ত হইয়াও অন্যকে তাপিত করেন না, তাঁহারই সর্ব্বার্থসিদ্ধি হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি শত বৎসর ব্যাপিয়া প্রতিমা-সেবা বা যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, আর যিনি কাহারও উপর কখনই ক্রুদ্ধ হয়েন না, এই উভয়ের মধ্যে অক্রোধন ব্যক্তিই অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট। বালক বালিকারা বিবেকাভাবপ্রযুক্ত ক্রোধান্ধ হইয়া পরস্পর বিরোধ করিয়া থাকে, কিন্তু প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সেরূপ করেন না। দেবযানী কহিলেন, তাত! আমি অল্পবয়স্কা বালিকা বটে, কিন্তু ধর্মের মর্ম্ম বিবেচনা করিতে নিতান্ত অসমর্থ নহি এবং ক্রোধ ও ক্ষমা এই উভয়ের বলাবল পরিজ্ঞানেও অক্ষম নহি। কিন্তু যে ব্যক্তি শিষ্য হইয়া অশিষ্যের ন্যায় আচরণ করে, মঙ্গলার্থী ব্যক্তি তাহাকে কিছুতেই ক্ষমা প্রদর্শন করিবে না। অতএব এই ভ্রষ্টাচার দেশে বাস করিতে আমার অভিলাষ নাই। যে সকল লোকেরা আচার ব্যবহার ও কৌলীন্যাদি লইয়া সর্ব্বদা পরনিন্দা করে, মঙ্গলার্থী ব্যক্তি সেই সকল পাপিষ্ঠ লোকের সংসর্গ করিবেন না। আর যে স্থানে বাস করিলে আচার ব্যবহার ও কৌলীন্যাদির গৌরব থাকে, সেই স্থানে বাস করাই শ্রেয়োকল্প। হে তাত! বৃষপর্ব্বাতনয়া শর্মিষ্ঠার সেই সকল দুর্ব্বাক্য আমার হৃদয় দগ্ধ করিতেছে। অধিক কি বলিব, যে হতভাগ্য ব্যক্তি যৎকিঞ্চিৎ লাভ প্রত্যাশায় ধনিগণের উপাসনা করে, বোধ হয় তদপেক্ষা তাহার মৃত্যু হওয়া উত্তম।
অশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর শুক্র ক্রোধভরে সিংহা-সনোপবিষ্ট রাজা বৃষপর্ব্বার নিকট উপস্থিত হইয়া অসঙ্কুচিত চিত্তে কহিলেন, হে দানবরাজ! অধর্ম আচরণ করিলে সদ্যই তাহার ফল দর্শে না বটে, কিন্তু পরিণামে সেই পাপপরায়ণ ব্যক্তিকে সমূলে উচ্ছেদ করিয়া থাকে। যদিও অনুষ্ঠানকর্তার তাহার ফলভোগ না হয়, তথাপি তাহার পুত্র বা পৌত্রদিগকেও তাহার ফলভোগ করিতে হয়। বৃহস্পতিতনয় কচ বিদ্যালাভকরিবার নিমিত্ত আমার নিকট আসিয়াছিল। সে ধর্মপরায়ণ, সুশীল ও শুশ্রূষাপর। তুমি অন্য দ্বারা নিরপরাধে বারংবার তাহার প্রাণহিংসা করিয়াছিলে। আজ আবার তোমার কন্যা শর্মিষ্ঠা আমার দেবযানীর প্রাণ নষ্ট করিবার আশয়ে তাহাকে এক গভীর কূপে নিক্ষেপ করিয়াছিল। এই সকল অত্যাচারে আমি অদ্যই তোমাদিগকে পরিত্যাগ করিলাম। আমি আর তোমার অধিকারে বাস করিব না। তোমরা আমার কথা প্রলাপ বলিয়া বিবেচনা কর, নতুবা আপন দোষ সংশোধনে প্রতীক্ষা করিতে না। বৃষপর্ব্বা কহিলেন, হে ভার্গব! আমি আপনাকে অধার্মিক বা মিথ্যাবাদী বলিয়া বোধ করি না, প্রত্যুত পরম-ধার্মিক ও সত্যপরায়ণ বলিয়া জ্ঞান করিয়া থাকি। আপনার প্রতি আমি কখনই ঘৃণা বা অশ্রদ্ধা করি না, অতএব ক্রোধ সংবরণ করুন এবং আমার প্রতি প্রসন্ন হউন। যদি আপনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন করেন, তাহা হইলে আমরা সমুদ্র-গর্তে প্রবেশ করিব, সংশয় নাই। শুক্র কহিলেন, তোমরা সাগরেই প্রবেশ কর বা দেশান্তরেই যাও, তোমার কন্যা আমার দেবযানীকে যেরূপ অপমান করিয়াছে তাহা আমি কখনই সহ্য করিব না। আমি দেবযানীকে অতিশয় স্নেহ করিয়া থাকি, যেমন বৃহস্পতি ইন্দ্রের যোগক্ষেমকর', আমিও সেইরূপ তোমার যোগক্ষেম সম্পাদন করিয়া থাকি। অতএব যদি আমাকে রাজ্যে রাখিতে বাসনা থাকে, তবে দেবযানীকে প্রসন্না কর। দেবযানী আমার জীবনস্বরূপা। বৃষপর্ব্বা কহিলেন, ভগবন্! অসুরেরা যে কিছু ধনসম্পত্তি বা গো, হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি অধিকার করে, আপনি তৎসমুদায়ের ও আমার অধীশ্বর, অতএব আপনি প্রসন্ন হউন। শুক্র কহিলেন, আমি যদি দানবদিগের সমুদায় সম্পত্তিরও ঈশ্বর হই, তাহা হইলেও তুমি দেবযানীকে প্রসন্না কর। দানবরাজ বৃষপর্ব্বা তৎক্ষণাৎ তাঁহার বাক্যে সম্মতি প্রদান করিলেন।
পরে ভৃগুনন্দন শুক্র দেবযানীর নিকট গমন করিয়া এই কথা আদ্যোপান্ত অবগত করাইলেন। তখন দেবযানী কহিলেন, হে পিতঃ! তুমি যে অসুরদিগের সকল সম্পত্তির ঈশ্বর, তাহা বৃষপর্ব্বা স্বয়ং আমার নিকট অঙ্গীকার করুক, নতুবা আমার বিশ্বাস হয় না। তাহা শুনিয়া দানবরাজ বৃষপর্ব্বা কহিলেন, হে চারুহাসিনি দেবযানি! তোমার যাহা অভিলাষ হয় বল, সাতিশয় দুর্লভ বস্তু হইলেও আমি তোমাকে প্রদান করিব। তখন দেবযানী কহিলেন, শর্মিষ্ঠা দুই সহস্র অসুরকন্যার সহিত আমার দাসীভাব অবলম্বন করুক, এই আমার অভিলাষ এবং আমি বিবাহিতা হইয়া যৎকালে ভর্তৃগৃহে গমন করিব, তখনও তাহাকে আমার অনুসরণ করিতে হইবে। তাহা শুনিয়া বৃষপর্ব্বা সমীপবর্তিনী এক পরিচারিকাকে আদেশ করিলেন, তুমি যাও শীঘ্র শর্মিষ্ঠাকে আমার নিকট ডাকিয়া আন। দেবযানীর যেরূপ অভিলাষ শর্মিষ্ঠা আসিয়া তাহা অবিলম্বে সম্পাদন করুক। পরিচারিকা রাজার আদেশক্রমে শর্মিষ্ঠার নিকট উপনীতা হইয়া নিবেদন করিল, রাজনন্দিনি! মহারাজ তোমাকে আহ্বান করিতেছেন, এক্ষণে চল এবং জ্ঞাতিকূলের শুভ সম্পাদন কর। শুক্রাচার্য্য দেবযানীকর্তৃক উত্তেজিত হইয়া অসুরকুল পরিত্যাগের উপক্রম করিয়াছেন, এক্ষণে দেবযানীকে প্রসন্না করিবার নিমিত্ত তোমাকে তাহার নির্দেশানুসারে সমস্ত কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিতে হইবে। তাহা শুনিয়া শর্মিষ্ঠা কহিলেন, তিনি যখন যাহা আদেশ করিবেন, আমি বিচার না করিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিব। আর দেবযানীকে সান্ত্বনা করিবার নিমিত্ত মহর্ষি শুক্রও যাহা আদেশ করিবেন, তাহাতেও আমার অসম্মতি নাই। আমার দোষে শুক্র ও দেবযানী নগর পরিত্যাগ করিবেন, তাহা কখনই হইবে না। এই বলিয়া শর্মিষ্ঠা শিবিকায় আরোহণপূর্ব্বক দুই সহস্র দাসী পরিবৃতা হইয়া সত্বর অন্তঃপুর হইতে নির্গতা হইলেন এবং দেবযানী সন্নিধানে উপনীতা হইয়া কহিলেন, হে গুরুকন্যে! আমি দুই সহস্র অসুরকন্যার সহিত তোমার দাস্যকর্ম করিব এবং তুমি পরিণীতা হইয়া যখন পতিগৃহে গমন করিবে, তৎকালেও আমি দাসীভাবে তোমার সমভিব্যাহারে যাইব। দেবযানী কহিলেন, দেখিও, তুমি রাজনন্দিনী হইয়া কিরূপে চাটুকার ও ভিক্ষুকের ন্যায় দাসীভাব অবলম্বন করিবে? শর্মিষ্ঠা কহিলেন, জ্ঞাতিকুলের বিপদ ঘটিলে যে কোন উপায়দ্বারা হউক, তাহার প্রতীকার চেষ্টা করা কর্ত্তব্য, এজন্য আমি তোমার দাসীবৃত্তি স্বীকার করিলাম। এইরূপে শর্ম্মিষ্ঠা দাসীভাব অঙ্গীকার করিলে দেবযানী নিজ পিতা শুক্রকে কহিলেন, হে তাত। আমি ক্রোধ সংবরণ করিয়াছি, চল এক্ষণে নগরে প্রবেশ করি। জানিলাম তোমার বিজ্ঞান ও বিদ্যাবল অমোঘ। মহাযশাঃ শুক্র, কন্যা-কর্তৃক এইরূপ অভিহিত এবং দানবরাজকর্তৃক সমাদৃত ও সৎকৃত হইয়া হৃষ্টচিত্তে পুনর্ব্বার দেবযানীর সহিত পুর প্রবেশ করিলেন।
একাশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কিয়ৎকাল অতীত হইলে বরবর্ণিনী দেবযানী ক্রীড়াভিলাষে পুনর্ব্বার সেই বনে প্রবেশ করিলেন। তিনি হৃষ্টচিত্তে শর্মিষ্ঠা ও সেই সমস্ত সখিগণ সমভিব্যাহারে যথেচ্ছ বনবিহার করিতেছেন। কেহ প্রফুল্ল মনে মধুপান করিতেছে, কেহ সুস্বাদ ফল দংশন করিতেছে, কেহ বা অন্যান্য ভক্ষ্য দ্রব্য উপযোগ করিতেছে, ইত্যবসরে মৃগয়াবিহারী নহুষতনয় যযাতি মৃগের অনুসরণক্রমে একান্ত ক্লান্ত ও পিপাসার্ত্ত হইয়া জলান্বেষণ করিতে করিতে পুনর্ব্বার সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। তিনি দেখিলেন, সর্ব্বালঙ্কার ভূষিতা কন্যকা-গণবেষ্টিতা মধুরহাসিনী এক পরমাসুন্দরী কামিনী তথায় উপবেশন করিয়া আছেন এবং পরমসুকুমারী এক রাজকুমারী তাঁহার পদসেবা করিতেছেন।
রাজা ক্রমশঃ তাঁহাদিগের সন্নিহিত হইয়া সমুচিত সমাদর প্রদর্শনপূর্ব্বক দেবযানীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভদ্রে! তোমরা জন্মগ্রহণ করিয়া কোন্ বংশ অলঙ্কৃত করিয়াছ? তোমার ও তোমার এই পরিচারিকার নাম কি এবং এই সকল সখিগণই বা কে? দেবযানী কহিলেন, আমি সবিশেষ নিবেদন করিতেছি, অবহিত হইয়া শ্রবণ করুন। মহারাজ! আমি দৈত্যগুরু শুক্রের কন্যা। আর আমার এই পরিচারিকা দানবরাজ বৃষপর্ব্বার দুহিতা। ইনি দাসীভাবে সততই আমার অনুগামিনী থাকেন। তাহা শুনিয়া রাজা কৌতূহলপরতন্ত্র হইয়া পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন, সুন্দরি। ইনি দানবরাজ বৃষপর্ব্বার কন্যা হইয়া কি কারণে তোমার দাসী হইলেন, জানিতে নিতান্ত ঔৎসুক্য হইতেছে। দেবযানী কহিলেন, দৈবনির্ব্বন্ধ কেহই অতিক্রম করিতে পারে না, সুতরাং রাজকন্যা আমার পরিচারিকা হইবে ইহা বড় আশ্চর্য্য নহে, অতএব সে বিষয়ের আর অনুসন্ধান করিবার আবশ্যকতা নাই। মহাশয়! আপনার আকার ও বেশ দেখিয়া রাজা ও বান্বিন্যাসপটুতা দেখিয়া পণ্ডিত বলিয়া বোধ হইতেছে, অতএব বলুন আপনি কে? কাহার পুত্র? এবং কোথা হইতে আগমন করিতেছেন? যযাতি কহিলেন, আমি শৈশবকালে ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়া সমস্ত বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিয়াছি। আমি রাজা ও রাজকুলে উৎপন্ন বটে; আমার নাম যযাতি। দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! আপনি কি উদ্দেশে এই অরণ্যে আসিয়াছেন, শুনিতে অভিলাষ করি। রাজা কহিলেন, সুন্দরি! আমি মৃগয়ার্থ নগরী হইতে নির্গত হইয়া মৃগের অনুসরণক্রমে বনে বনে ভ্রমণ করিয়া একান্ত পরিশ্রান্ত ও বলবতী পিপাসায় নিতান্ত অভিভূত হইয়া জলপানাভিলাষে এই প্রদেশে উপস্থিত হইয়াছি, কিন্তু এক্ষণে আমার শ্রান্তি দূর ও পিপাসা নিবৃত্তি হইয়াছে, কথাপ্রসঙ্গে গমনকাল অতিক্রান্ত হইতেছে, অতএব অনুমতি কর প্রস্থান করি। তখন দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! এই দুই সহস্র কন্যা ও পরিচারিকা শর্মিষ্ঠার সহিত আমি তোমার অধীন হইলাম, অদ্যাবধি তুমি আমার সখা ও ভর্তা হইলে।
রাজা সহসা এই অসম্ভাবিত আত্মসমর্পণ ব্যাপার অবলোকন করিয়া বিস্ময়োৎফুল্ল লোচনে ও বিনয় বচনে দেবযানীকে কহিলেন, হে শুক্রতনয়ে। ইহা তোমার শ্রেয়ঃকল্প নহে, দেখ তুমি ব্রাহ্মণকন্যা, আমি ক্ষত্রিয়জাতি, আমি কোন-রূপেই তোমার উপযুক্ত পাত্র নহি; আর তোমার পিতা শুক্রাচার্য্য কদাচ এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করিবেন না। দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! ব্রাহ্মণেরা সর্ব্বদাই ক্ষত্রিয়ের সহিত সংসৃষ্ট হইয়া থাকেন এবং ক্ষত্রিয়েরাও কোন কোন সময়ে ব্রাহ্মণের সহিত সংসৃষ্ট হইয়া থাকেন, সুতরাং এই উভয়ের যেরূপ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ তাহাতে আমাকে ভার্য্যাত্বরূপে অঙ্গীকার করা আপনার পক্ষে নিতান্ত দোষাবহ নহে; বিশেষতঃ আপনি স্বয়ং ঋষি ও ঋষিপুত্র; অতএব এ বিষয়ে কোন সংশয় না করিয়া আমার পাণিগ্রহণ করুন। যযাতি কহিলেন, হে সুন্দরি। চারি বর্ণই একের অঙ্গ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে সত্য বটে, কিন্তু সকল বর্ণের ধর্ম ও আচার ব্যবহার বিষয়ে বিস্তর বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইয়া থাকে।
তন্মধ্যে ব্রাহ্মণের ধর্মপ্রণালী ও আচারপরম্পরা সর্ব্বপেক্ষা উৎকৃষ্ট; সুতরাং ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠবর্ণ বলিয়া নিৰ্দ্দিষ্ট, অতএব আমি হীনবর্ণ হইয়া কিরূপে শ্রেষ্ঠবর্ণের কন্যা গ্রহণ করিব? তখন দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! পাণিগ্রহণ করিলেই বিবাহক্রিয়া নির্ব্বাহ হইয়া থাকে, এ প্রথা পূর্ব্বাপর প্রচলিত আছে, অতএব বিবেচনা করিয়া দেখুন যৎকালে আমি অন্ধকূপে পতিতা হইয়াছিলাম, তখন আপনিই আমার পাণিগ্রহণ করিয়া উদ্ধার করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত আপনাকে পতিত্বে বরণ করিতে এত আগ্রহাতিশয় প্রকাশ করিতেছি। সূক্ষ্ম বিবেচনা করিয়া দেখিলে তদবধি আপনিই আমার পতি হইয়াছেন, অতঃপর আর কেহই আমার পাণিস্পর্শ করিবেন না। তখন যযাতি কহিলেন, হে দেবযানি! মহাবিষ আশীবিষ ও সুতীক্ষ্ণ শর অপেক্ষাও কোপাক্রান্ত ব্রাহ্মণ সাতিশয় দুর্দ্ধর্ষ, এই কথা সকলেই স্বীকার করিয়া থাকেন। দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! কি কারণে এরূপ কহিতেছেন স্থির করিতে পারিতেছি না। রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, দেখ সর্পাঘাতে ও শস্ত্রপাতে একের প্রাণ বিনষ্ট হইতে পারে, কিন্তু ব্রাহ্মণ কুপিত হইলে গ্রাম, নগর, বন ও উপবন প্রভৃতি সকলই ভস্মসাৎ করেন। সুতরাং আমার মতে ব্রাহ্মণ নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ। অতএব হে দেবযানি! তোমার পিতা সম্প্রদান না করিলে আমি তোমার পাণিগ্রহণ করিতে পারি না। তখন দেবযানী কহিলেন, মহারাজ! আমি আপনাকে স্বয়ং বরণ করিয়াছি, এ কথা শুনিলে পিতা আসিয়া অবশ্যই আপনার হস্তে আমাকে সম্প্রদান করিবেন। অযাচিতা বা পিতৃদত্তা কন্যা গ্রহণ করিলে পাণিগ্রহীতার কোন বিপদের সম্ভাবনা নাই। এই বলিয়া দেবযানী স্বীয় পরিচারিকা ঘূর্ণিকা দ্বারা পিতৃ-সন্নিধানে আপন অভিপ্রায় নিবেদন করিয়া পাঠাইলেন। মহর্ষি শুক্র ধাত্রীমুখে আদ্যোপান্ত সমস্ত অবগত হইয়া রাজদর্শনার্থ সেই কাননে উপনীত হইলেন। রাজা যযাতি শুক্রাচার্য্যকে তথায় আগত দেখিয়া অভিবাদনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান রহিলেন। এই অবসরে দেবযানী পিতাকে কহিলেন, হে তাত! ইনি নহুষতনয় রাজা যযাতি। আমি অন্ধকূপে পতিত হইলে এই মহাত্মা আমার পাণিগ্রহণ করিয়া উদ্ধার করিয়াছিলেন। সুতরাং ইনি তাহাতেই আমার পাণিগ্রহীতা হইয়াছেন, অতএব আপনি এই সৎপাত্রে আমাকে সম্প্রদান করুন, আমি আর অন্য ব্যক্তিকে পতিত্বে বরণ করিব না। তখন শুক্রাচার্য্য রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে নহুষনন্দন। আমার কন্যা তোমাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছে, অতএব আমি প্রসন্নমনে সম্প্রদান করিতেছি, তুমি ইহাকে মহিষীরূপে গ্রহণ কর। যযাতি কহিলেন ভগবন্! ক্ষত্রিয় হইয়া ব্রাহ্মণনন্দিনীর পরিগ্রহণ করিলে বর্ণসঙ্করজনিত দোষে পরিলিপ্ত হইতে হয়, এই ভয়ে আমি আপনার কন্যাকে বিবাহ করিতে সম্মত নহি। শুক্র কহিলেন, মহারাজ! তুমি অভিলাষানুরূপ বর প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অধৰ্ম্ম হইতে মোচন করিব, এ বিষয়ে তোমার কোন আশঙ্কা নাই, সত্যই আমি তোমার পাপাপনোদন করিব, তুমি বিধানা-নুসারে দেবযানীর পাণিগ্রহণ কর, প্রার্থনা করি তোমাদের উভয়ের অতিমাত্র সদ্ভাব হউক। কিন্তু এই অসুররাজকুমারী শর্মিষ্ঠা তোমার পূজনীয়া হইবেন; তুমি কদাচ ইঁহাকে পরিণয় করিও না।
রাজা যযাতি এইরূপ আদিষ্ট হইয়া হৃষ্টমনে শুক্রকে প্রদক্ষিণপূর্ব্বক বিধানানুসারে দেবযানীর পাণিগ্রহণ করিলেন। অনন্তর তিনি মহর্ষি শুক্র ও দানবগণকর্তৃক সমাদৃত ও সৎকৃত হইয়া সেই দুই সহস্র কন্যার সহিত শর্ম্মিষ্ঠা ও দেবযানীকে সমভিব্যাহারে লইয়া নিজ রাজধানীতে প্রত্যাগমন করিলেন।
দ্ব্যশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! রাজা যযাতি স্বনগরে প্রত্যাগত হইয়া পরম সমাদরে দেবযানীকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করাইলেন এবং তাঁহার নির্দেশক্রমে অশোকবনসন্নিধানে এক গৃহ নির্মাণ করাইয়া বৃষপর্ব্বাতনয়া শর্মিষ্ঠাকে তথায় বাস করিতে আদেশ দিলেন। রাজা গ্রাসাচ্ছাদন প্রদানপূর্ব্বক শর্মিষ্ঠাকে প্রতিপালন ও দেবযানীর সহিত পরমসুখে যৌবনসুখ চরিতার্থ করিতে লাগিলেন। কালক্রমে দেবযানীর ঋতুকাল উপস্থিত হইলে, তিনি রাজসহযোগে গর্ভবতী ও যথাকালে পুত্রবতী হইলেন। এইরূপে সহস্র বৎসর অতিবাহিত হইলে, একদা শর্মিষ্ঠা আপন নব যৌবন ও গর্ভাধানকাল আবির্ভূত দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, আমার ত ঋতুকাল উপস্থিত, কিন্তু অদ্যাপি বিবাহ হইল না, এক্ষণে কি করি, কি উপায়েই বা স্বীয় মনোরথ সম্পাদন করি। দেবযানী একটি পুত্র প্রসব করিয়া স্বকীয় বাসনা চরিতার্থ করিয়াছে, কিন্তু আমার যৌবনকাল বুঝি নিষ্ফল হইল। দেবযানী যেরূপ কৃতকার্য্য হইয়াছে, আমিও সেই রূপে মহারাজকে পতিত্বে বরণ করিয়া চরিতার্থ হইব। আমি সন্তান কামনায় নির্জনে তাঁহার সহযোগ প্রার্থনা করিলে বোধ করি তিনি কখনই পরাজুখ হইবেন না। এই অবসরে রাজা যযাতি অন্তঃপুর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া যদৃচ্ছাক্রমে অশোকবনসন্নিধানে আগমন করিলেন। সুচারুহাসিনী শর্মিষ্ঠা রাজাকে নির্জনে পাইয়া প্রত্যুদ্গমনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, মহারাজ! ইন্দ্র, চন্দ্র, বিষ্ণু, যম ও বরুণের অন্তঃপুরে কিংবা আপনার অন্তঃপুরে যে সকল স্ত্রীলোক বাস করে তাঁহাদিগকে কেহই নয়নগোচর করিতে পান না। হে রাজন! আমার কুল, শীল, রূপ, যৌবন প্রভৃতি কিছুই আপনার অবিদিত নহে। সম্প্রতি আমি বিনয়পূর্ব্বক প্রার্থনা করি, আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার ঋতুরক্ষা করুন। যযাতি কহিলেন, হে সুন্দরি! তুমি অতি সুশীলা, সৎকুলোদ্ভবা এবং তোমার রূপ কোন অংশেই নিন্দনীয় নহে, কিন্তু দেবযানীর পাণিগ্রহণকালে শুক্র আমাকে কহিয়াছেন, এই বৃষপর্ব্বাতনয়া শর্মিষ্ঠাকে কদাচ শয্যায় আহ্বান করিও না। শর্মিষ্ঠা কহিলেন, মহারাজ! পরিহাস-প্রসঙ্গে, স্ত্রীর মনোরঞ্জনের নিমিত্ত, বিবাহকালে, প্রাণসঙ্কটে ও সর্ব্বস্বনাশকালে মিথ্যাব্যবহার কদাচ পাপাবহ নহে। সাক্ষ্য-প্রদানে বা বিচারস্থলে মিথ্যা কহিলেই মহাপাপে পরিলিপ্ত হইতে হয়।
যযাতি কহিলেন, রাজাই প্রজাদিগের দৃষ্টান্তস্থল, মিথ্যা কহিলে রাজা অবশ্যই বিনষ্ট হন, অতএব আমি অর্থকষ্টেও মিথ্যা কহিতে সম্মত নহি। তখন শর্মিষ্ঠা পুনরায় কহিলেন, মহারাজ! সখীর পতি ও আপন পতি উভয়ই তুল্য এবং একের বিবাহে অন্যের বিবাহ হইয়া থাকে; অতএব যখন আমার সখী তোমাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছেন, তখন আমারও বরণ করা হইয়াছে। যযাতি কহিলেন, সুন্দরি! অর্থীদিগের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করা আমার একপ্রধান ধৰ্ম্ম ও অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। তুমিও আমার নিকট প্রার্থনা করিতেছ, অতএব বল তোমার কি প্রিয় কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে? শর্মিষ্ঠা কহিলেন, মহারাজ! আমাকে অধৰ্ম্ম হইতে পরিত্রাণ করিয়া আমার ধর্মস্থাপন করুন, অতঃপর আমি আপনার প্রসাদে পুত্রবতী হইয়া পৃথিবীতে ধর্মানুষ্ঠান করিতে পারিব। আরও দেখুন ভার্য্যা, দাস ও পুত্র, ইহারা যে কিছু ধন উপার্জন করে, সে ধনে তাহাদিগের অধিকার নাই, তাহাদিগের প্রভুরই সম্পূর্ণ অধিকার; আমি দেবযানীর দাসী এবং তিনি আপনার বশ্যা, অতএব আমাদের উভয়েরই মনোরথ সফল করিবেন, এই অঙ্গীকার করিয়া আমার পাণিগ্রহণ করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধর্মপরায়ণ রাজা যযাতি শর্মিষ্ঠার প্রার্থনায় সম্মত হইয়া তাঁহার ঋতুরক্ষা করত পরস্পর প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। বৃষপর্ব্বাতনয়া শর্মিষ্ঠা রাজার সহযোগে গর্ভবতী হইয়া যথাকালে এক পরম সুন্দর পুত্র প্রসব করিলেন।
এ্যশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবযানী শর্মিষ্ঠার পুত্রোৎপত্তির সংবাদ শ্রবণ করিবামাত্র সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইয়া নানা প্রকার বিতর্ক করিতে লাগিলেন। অনন্তর শর্মিষ্ঠার সন্নিহিতা হইয়া কহিলেন, হে সুলু! তুমি কামান্ধ হইয়া একি পাপানুষ্ঠান করিলে? শর্মিষ্ঠা কহিলেন, হে চারুহাসিনী! একদা কোন ধর্মপরায়ণ ও বেদবেদাঙ্গ-পারগ ঋষি আমার কুটীরে আগমন করিয়াছিলেন। আমি ঋতুরক্ষার্থ প্রার্থনা করাতে, তিনি আমার মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করেন। আমি অন্যায়তঃ কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি নাই। আমি সত্য কহিতেছি, আমার এই সন্তানটি সেই ঋষির ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে। তখন দেবযানী কহিলেন, শর্ম্মিষ্ঠে। যদি ধৰ্ম্ম প্রতিপালনার্থে এই কৰ্ম্ম করিয়া থাক, সে উত্তমই হইয়াছে, কিন্তু যদি সেই ঋষির গোত্র, নাম ও আভিজাত্য জানিতে পারিয়া থাক তবে বল, শুনিতে আমার নিতান্ত ঔৎসুক্য হইতেছে। শর্মিষ্ঠা কহিলেন, সেই ঋষি সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী ও তপঃপ্রভাব-সম্পন্ন; তাঁহাকে দেখিয়া সে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতে আমার সাহস হয় নাই। দেবযানী কহিলেন, যাহা হউক, যদি তুমি শ্রেষ্ঠজাতির ঔরসে সন্তান লাভ করিয়া থাক, তাহাতে আমার ক্ষোভ বা পরিতাপ নাই। তাঁহারা এইরূপ হাস্য পরিহাসপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ কথোপকথন করিলেন। পরিশেষে দেবযানী এই বৃত্তান্তের প্রতি বিশ্বাস করিয়া স্বীয় আবাসে প্রবিষ্ট হইলেন।
অনন্তর যযাতি দেবযানীর গর্তে যদু ও তুর্ব্বসু নামে দুই পুত্র এবং শর্মিষ্ঠার গর্ভে দ্রুহু, অনু ও পুরু নামে তিন পুত্র উৎপাদন করিলেন। কিয়ৎকাল অতীত হইলে একদা দেবযানী প্রিয়তম সমভিব্যাহারে এক নির্জন বনে গমন করিয়া দেবরূপী তিনটি বালক দেখিতে পাইলেন। তাহারা অসঙ্কুচিতচিত্তে ক্রীড়া করিতেছিল। দেবযানী তাহাদিগের অসামান্য রূপলাবণ্য দর্শনে বিস্মিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ। এই সর্ব্বাঙ্গসুন্দর বালকগুলি কোন্ ভাগ্যবানের পুত্র বলা যায় না। ইহারা দেবকুমারতুল্য সুকুমার। ইহাদিগের আকার প্রকারে তোমারই ঔরসজাত বলিয়া বোধ হইতেছে। দেবযানী রাজাকে এইরূপ কহিয়া বালকদিগকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, বৎস! তোমারা কোন্ বংশে উৎপন্ন হইয়াছ কাহার পুত্র এবং তোমাদিগের পিতার নাম কি? শুনিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। দেবযানীকর্তৃক এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইলে বালকেরা তর্জনীসঙ্কেতদ্বারা মহারাজ যযাতিকে পিতা নিৰ্দ্দেশ করিয়া কহিল, আমাদিগের মাতার নাম শর্মিষ্ঠা। এই বলিয়া তাহারা হর্ষোৎফুল্ললোচনে নিজপিতা, যযাতির সন্নিহিত হইল। কিন্তু দেবযানীর সমীপে বলিয়া তিনি তাহাদিগকে সমাদর করিতে পারিলেন না। বালকেরা পিতার অনাদরে অভিমান করিয়া রোদন করিতে করিতে জননীসন্নিধানে গমন করিল। রাজা বালকদিগের কথায় ঈষৎ লজ্জিত হইলেন। দেবযানী রাজার প্রতি বালকদিগের সদ্ভাব সন্দর্শনে সে বিষয়ের মর্মোদঘাটনপূর্ব্বক অনতিবিলম্বে শর্মিষ্ঠার নিকট উপস্থিত হইয়া রোষভরে কহিলেন, দেখ শর্ম্মিষ্ঠে। তুমি আমার অধীন হইয়া আমারই অপ্রিয় কার্য্য করিয়াছ, ইহাতে তোমার মনে শঙ্কার উদয় হয় নাই? শর্ম্মিষ্ঠা কহিলেন, আমি ঋষির কথা উল্লেখ করিয়াছিলাম, সে ত মিথ্যা নহে। আমি ন্যায়তঃ ও ধৰ্ম্মতঃ বলিয়াছি, তোমার নিকট আমার ভয়ের বিষয় কি? আরও তুমি মহারাজকে পতিত্বে বরণ করিয়াছ, তাহাতে আমারও বরণ করা হইয়াছে, কারণ সখীর পতি ধৰ্ম্মতঃ পতি হইতে পারেন। তুমি ব্রাহ্মণকন্যা, তুমি আমার পূজ্যা ও মান্যা। আর আমি এই রাজর্ষিকে তোমা হইতেও সম্মান ও পূজা করিয়া থাকি তাহা কি তুমি জান না? দেবযানী শর্মিষ্ঠামুখে এই সমস্ত বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মহারাজ! তুমি আমার অতিশয় অপ্রিয় কার্য্য করিয়াছ, অতএব অদ্যাবধি তোমার আলয়ে আর অবস্থান করিব না, চলিলাম। এই বলিয়া পিতৃগৃহে প্রস্থান করিতে উদ্যতা হইলেন। রাজা দেবযানীকে বাষ্পাকুললোচনে সহসা শুক্র-সন্নিধানে গমন করিতে উদ্যতা দেখিয়া ব্যথিতমনে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন এবং নানাবিধ প্রবোধবাক্যে তাঁহাকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন। রোযারক্তলোচনে দেবযানী কিছুতেই ক্ষান্ত হইলেন না। তিনি রাজাকে ভালমন্দ কিছুই না বলিয়া রোদন করিতে করিতে পিতৃসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন এবং অভিবাদনপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। রাজাও দেবযানীর অনুসরণক্রমে তথায় উপস্থিত হইয়া বিধানা-নুসারে শুক্রাচার্য্যের পূজাদি করিয়া অতি বিনীতভাবে একান্তে সমাসীন হইলেন। তদনন্তর দেবযানী শুক্রকে কহিলেন, তাত! অধর্ম ধর্মকে পরাজয় করিয়াছে। নিকৃষ্টেরা মহতের সহিত নীচব্যবহারে প্রবৃত্ত হইয়াছে। দেখুন বৃষপর্ব্বাদুহিতা শর্মিষ্ঠা আমাকে অতিক্রম করিয়া উঠিয়াছে। রাজা যযাতি তাহার গর্তে তিনটি পুত্র উৎপাদন করিয়াছে। আমি দুর্ভাগা, আমার দুইটি ব্যতীত পুত্র নহে। হে ভৃগুকুলতিলক! এই রাজা পরম ধার্মিক বলিয়া বিখ্যাত আছেন। কিন্তু এক্ষণে এইরূপ গর্হিতাচরণে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। হে তাত! আমি সত্য বলিতেছি, সম্প্রতি ইনি শাস্ত্রমর্য্যাদা অতিক্রম করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। শুক্র এই সমস্ত বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া ক্রোধভরে রাজা যযাতিকে অভিসম্পাত করিলেন, মহারাজ! তুমি ধাৰ্ম্মিক হইয়া প্রিয়বোধে অধর্মাচরণ করিয়াছ, অতএব দুর্জয় জরা অচিরাৎ তোমাকে আক্রমণ করিবে। রাজা সহসা এইরূপ শাপগ্রস্ত হইয়া শুক্রকে কহিলেন, ভগবন্! শর্মিষ্ঠা ঋতুরক্ষার্থে প্রার্থনা করিয়াছিল, আমি ধৰ্ম্মসংস্থাপনের নিমিত্ত সেই কৰ্ম্ম অনুষ্ঠান করিয়াছিলাম, নিকৃষ্টবৃত্তি চরিতার্থ করিবার উদ্দেশে করি নাই। ধর্মশাস্ত্রে কথিত আছে, যে পুরুষ ঋতুরক্ষার্থিনী স্ত্রীলোককর্তৃক প্রার্থিত হইয়া তদীয় ঋতুরক্ষা না করে, সে ভূণহত্যা পাতকে লিপ্ত হইয়া নিরয়গামী হয়। এই সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া ধৰ্ম্মলোপের আশঙ্কায় আমি শর্মিষ্ঠার বাসনা সফল করিয়াছিলাম। শুক্র কহিলেন, মহারাজ। আমি তোমাকে যে কৰ্ম্ম করিতে প্রতিষেধ করিয়াছিলাম, তাহা কেন করিলে? তুমি জান মিথ্যাবাদী ব্যক্তির ধর্মাচরণকেও এক প্রকার চৌর্য্য বলিলে বলা যাইতে পারে।
যযাতি শুক্রকর্তৃক এইরূপে অভিশপ্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ জরাক্রান্ত হইলেন। পরে তিনি শুক্রকে কহিলেন, ভগবন্! আমি অদ্যাপি যৌবনসুখ অনুভব করিয়া পরিতৃপ্ত হই নাই, অতএব প্রসন্ন হইয়া যাহাতে জরা হইতে মুক্ত হইতে পারি, এরূপ কোন উপায় অবধারণ করিয়া দিন। শুক্র কহিলেন, মহারাজ! আমার শাপ অন্যথা হইবার নহে। তবে এইমাত্র হইতে পারে, তুমি ইচ্ছা করিলে অন্যের শরীরে স্বকীয় জরা সঞ্চারিত করিতে পারিবে। তখন রাজা কহিলেন, হে ব্রহ্মান্। এক্ষণে এই অনুমতি করুন যে, আমার পঞ্চ পুত্রের মধ্যে যে পুত্র মদীয় জরা গ্রহণ করিয়া আমাকে যৌবন প্রদান করিবে, সে রাজ্যাধিকার, পুণ্যা-ধিকার ও কীর্ত্তিলাভ করিবে। শুক্র কহিলেন, হে নহুষতনয়। তুমি আমাকে স্মরণ করিয়া অন্যের শরীরে জরা সঞ্চারিত করিতে পারিবে, তাহাতে তুমি পাপভাগী হইবে না। আর তোমার যে পুত্র জরা গ্রহণ করিয়া তোমাকে যৌবন প্রদান করিবে, সে ত্বদীয় সাম্রাজ্য অধিকারপূর্ব্বক আয়ুষ্মান্ ও পুত্র-পৌত্রাদি মান্ হইবে।
চতুরশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! তৎপরে রাজা যযাতি জরাগ্রস্ত হইয়া নিজ রাজধানী প্রত্যাগমনপূর্ব্বক স্বীয় জ্যেষ্ঠপুত্র যদুকে কহিলেন, বৎস! শুক্রের শাপপ্রভাবে এই মহাঘোর জরা আমাকে আক্রমণ করিয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি আমি বিষয়ভোগ করিয়া পরিতৃপ্ত হই নাই; অতএব তুমি মদীয় পাপ ও জরা গ্রহণ কর। আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপ বিষয়ভোগ করি। সহস্র বৎসর পূর্ণ হইলে পুনর্ব্বার তোমার যৌবন তোমাকে সমর্পণ করিয়া আমি পাপের সহিত আপন জরা গ্রহণ করিব। যদু কহিলেন, মহারাজ। জরার অনেক দোষ, তাহাতে পান ভোজনে যথেষ্ট ব্যাঘাত জন্মে, শ্মশ্রুজাল শুক্ল' এবং মাংস শিথিল ও সঙ্কুচিত হওয়াতে জীর্ণ ব্যক্তি শ্রীভ্রষ্ট, নিরানন্দ ও সর্ব্বকার্য্যে নিরুৎসাহ হয়। আত্মীয় ব্যক্তিরা জরাজীর্ণকে পদে পদে পরাভব করে, অতএব আমি সেই জরা গ্রহণে সম্মত নহি। আপনার আমা হইতেও প্রিয়তর অনেক পুত্র আছে, তাহাদিগকেই জরা প্রদান করুন। যযাতি কহিলেন, তুমি যেহেতু আমার ঔরস পুত্র হইয়া স্বকীয় যৌবন প্রদানে সম্মত হইলে না; অতএব তোমার বংশপরম্পরা কেহই রাজ্যাধিকারী হইবে না। তৎপরে রাজা যযাতি তুর্ব্বসুর নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, বৎস! আমার পাপ ও জরা গ্রহণ কর, আমি তোমার যৌবন লইয়া বিষয়োপভোগ করিব। সহস্র বৎসর অতীত হইলে পুনর্ব্বার তোমার যৌবন তোমাকে সমর্পণ করিয়া পাপের সহিত আপন জরা গ্রহণ করিব। তুর্ব্বসু কহিলেন, মহারাজ। রূপনাশিনী জরা মনুষ্যকে ইচ্ছানুরূপ ভোগসুখে বঞ্চিত করে। জরার প্রভাবে বুদ্ধিভ্রংশ ও পদে পদে প্রাণনাশের আশঙ্কা উপস্থিত হয়; অতএব আমি আপনার জরা গ্রহণে সম্মত নহি। যযাতি কহিলেন, বৎস! তুমি আমার আত্মজ হইয়া আমার প্রার্থনা পূরণে সম্মত হইলে না; অতএব আমি শাপ দিতেছি, তুমি নির্বংশ হইবে এবং সঙ্কীর্ণাচার' ধৰ্ম্মসম্পন্ন, প্রতিলোমজ, রাক্ষস, চণ্ডাল, গুরুদারনিরত তির্য্যগ্যানিজাত, পশুধর্মা ও পাপিষ্ঠদিগের রাজা হইবে।
এইরূপে তুর্ব্বসুকে অভিশাপ দিয়া রাজা যযাতি শর্মিষ্ঠাপুত্র দ্রস্থ্যকে কহিলেন, বৎস! সহস্র বৎসরের নিমিত্ত আমার এই রূপনাশিনী জরা গ্রহণ কর; আমি তোমার যৌবন লইয়া ভোগ-বাসনা চরিতার্থ করিব। নির্দিষ্টকাল অতিক্রান্ত হইলেই পুনর্ব্বার পাপের সহিত জরা গ্রহণ করিয়া তোমার যৌবন তোমাকে প্রদান করিব। দ্রুহ্য কহিলেন, মহারাজ। মনুষ্য জীর্ণ হইলে হস্তী, অশ্ব ও রথে আরোহণ করিতে বা কামিনীসম্ভোগ করিতে অসমর্থ হয় এবং জীর্ণ ব্যক্তির বাক্য স্খলিত হয়, অতএব আমি জরা গ্রহণে সম্মত নহি। তাহা শুনিয়া রাজা রোষাবিষ্টচিত্তে কহিলেন, দ্রুহ্যো। তুমি আমার আত্মজ হইয়া যৌবন প্রদানে পরাখ হইলে; অতএব অতঃপর তোমার কোন বাসনা ফলবতী হইবে না। আর যে স্থানে গজ, বাজী, রথ ও শিবিকাদি যানের সমাগম নাই, কেবল উদ্ভুপ' বা সন্তরণদ্বারা গমনাগমন করিতে হয়, তোমাকে সেই স্থানে যাইয়া বাস করিতে হইবে। তোমার বংশে কেহই রাজা হইবে না। রাজা দ্রুহ্যকে এইরূপ অভিশাপ দিয়া অনুকে কহিলেন, বৎস! তুমি আমার পাপ ও জরা গ্রহণ কর; আমি তোমার যৌবন লইয়া এক সহস্র বৎসর বিষয়ভোগ করিব। অনু কহিলেন, মহারাজ! জীর্ণ ব্যক্তি অশুচি ও বালকের ন্যায় অনিয়ত-কালে ভোজন করিতে প্রবৃত্ত হয় এবং যথাকালে অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়া সম্পাদন করিতে পারে না; অতএব আমি জরা গ্রহণ করিব না। তখন রাজা কহিলেন, তুমি আমার ঔরস পুত্র হইয়া জরার দোষোল্লেখপূর্ব্বক যৌবন প্রদানে পরাজুখ হইলে; অতএব আমি তোমাকে অভিশাপ দিতেছি, তুমি অচিরাৎ সেই জরাদোষে লিপ্ত হইবে এবং তোমার সন্তান সন্ততি যৌবন প্রাপ্তিমাত্রেই কালগ্রাসে পতিত হইবে। সর্ব্বশেষে পুরুর নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, বৎস পুরো। আমি শুক্রের শাপে জরাগ্রস্ত হইয়াছি, আমার কেশ পলিত ও মাংস লোলিত হইয়াছে; কিন্তু আমি যৌবন-সুখ-সম্ভোগ করিয়া পরিতৃপ্ত হই নাই; অতএব তুমি আমার পাপের সহিত জরা গ্রহণ কর; আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপ বিষয়ভোগ করি। আমি অঙ্গীকার করিতেছি, সহস্র বৎসর অতিক্রান্ত হইলে তোমার যৌবন তোমাকে পুনর্ব্বার প্রদান করিয়া পাপের সহিত আপন জরা গ্রহণ করিব। হে পুরো! তুমি আমার প্রিয়তম পুত্র, এইরূপ করিলে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইতে পারিবে। পুরু এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, যে আজ্ঞা, মহারাজ! আপনি যেরূপ অনুমতি করিতেছেন, আমি তাহা পালন করিব। আমি পাপের মহিত আপনার জরা গ্রহণ করিব। আপনি আমার যৌবন লইয়া বাসনানুরূপ বিষয়সম্ভোগ করুন। তখন যযাতি কহিলেন, বৎস! তোমার এইরূপ অচলা ভক্তি ও প্রগাঢ় অনুরাগ সন্দর্শনে আমি যৎপরোনাস্তি প্রীত ও প্রসন্ন হইলাম; এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করি, তোমার রাজ্যে প্রজারা সর্ব্বসমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া সর্ব্বকাল পরমসুখে বাস করিবে। এই বলিয়া রাজা শুক্রকে স্মরণপূর্ব্বক স্বীয় পুত্র পুরুর শরীরে স্বকীয় জরা সঞ্চারিত করিলেন।
পঞ্চাশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে নহুষতনয় রাজা যযাতি যৌবনসম্পন্ন হইয়া প্রসন্নমনে অভিলাষানুরূপ বিষয়ভোগে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি ধর্ম্মের অব্যাঘাতে বাসনা ও উৎসাহের অনুরূপ বিষয়ভোগ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহারাজ যযাতি যজ্ঞদ্বারা দেবগণকে, শ্রাদ্ধদ্বারা পিতৃগণকে, অনুগ্রহদ্বারা দীন ব্যক্তিকে, অভিলাষ সম্পাদনদ্বারা দ্বিজগণকে, অন্নপানদ্বারা অতিথিগণকে এবং ধৰ্ম্মতঃ পরিপালনদ্বারা প্রজাগণকে অনুরঞ্জন করিয়া এবং নিগ্রহদ্বারা দস্যুদিগকে শাসন করিয়া সাক্ষাৎ সুরেন্দ্রের ন্যায় রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। সেই সিংহবিক্রান্ত ভূপতি ধর্ম্মের অবিরোধে বিষয়বাসনা চরিতার্থ করিতেন। তিনি স্বর্গবিদ্যাধরী বিশ্বাচীর সহিত কখন নন্দন বনে, কখন অলকায় কখন বা উত্তর মেরুশৃঙ্গে বিহার করিয়া পরিতৃপ্ত ও নিস্পৃহ হইলেন। পরে প্রতিজ্ঞাত সহস্র বৎসর স্মরণ করিলেন। যখন দেখিলেন, যৌবনসুখে সহস্র বৎসর অতিবাহিত হইয়াছে, তখন আপন পুত্র পুরুকে কহিলেন, বৎস পুরো। আমি তোমার যৌবন লইয়া ইচ্ছানুরূপ ও উৎসাহানুরূপ বিষয়ভোগ করিয়া দেখিলাম, কাম্যবস্তুর উপভোগে কামের উপশম না হইয়া প্রত্যুত ঘৃত দানে বহ্নির ন্যায় ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে থাকে; এই পৃথিবীতে যে কিছু ধন, ধান্য, হিরণ্য, পশু ও রমণী প্রভৃতি উপভোগের দ্রব্য আছে, এক ব্যক্তি তৎসমুদায় পাইলেও তাহার পরিতৃপ্তি হয় না, অতএব ভোগতৃষ্ণা পরিত্যাগ করাই কর্তব্য। দুৰ্ম্মতি ব্যক্তিরা যে আশাপাশ হইতে মুক্ত হইতে পারে না এবং শরীর জীর্ণ হইলেও যে আশা জীর্ণ হয় না, সেই প্রাণান্তিক রোগস্বরূপ আশাকে পরিত্যাগ করাই সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। আমি ইচ্ছানুরূপ বিষয়-সম্ভোগ করিয়া সহস্র বৎসর অতিবাহিত করিলাম, তথাপি আমার ভোগতৃষ্ণা উত্তরোত্তর উত্তেজিত হইতেছে। এক্ষণে আমি আশাপিশাচীকে পরিত্যাগ করিয়া তপোবনে প্রবেশপূর্ব্বক পরব্রহ্মে মনোনিবেশ করিব। বৎস! তোমার সুশীলতা দর্শনে আমি সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছি, আশীর্ব্বাদ করি, তোমার মঙ্গল হউক। এক্ষণে আপন যৌবন ও মদীয় রাজ্যভার গ্রহণ কর। তুমিই আমার প্রিয়কারী পুত্র। আমি তোমা হইতে যথেষ্ট সুখ ভোগ করিলাম।
অনন্তর নহুষতনয় যযাতি পুনর্ব্বার আপন জরা গ্রহণ করিলেন এবং তৎপুত্র পুরু যৌবনসম্পন্ন হইলেন। মহারাজ যযাতি কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে রাজ্যে অভিষেক করিবেন, এই কথা প্রচার করিয়া দিলেন। ব্রাহ্মহ্মণ প্রভৃতি চারি বর্ণ তথায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিবেদন করিলেন, মহারাজ। দেবযানী গর্ভসম্ভূত, শুক্রের দৌহিত্র যদু বিদ্যমান থাকিতে পুরু কি প্রকারে রাজ্য পাইতে পারেন? যদু আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তৎপরে তুর্ব্বসু জন্মেন। শর্মিষ্ঠার দ্রুহু, অনু ও পুরু নামে তিন পুত্র যথাক্রমে উৎপন্ন হয়েন; অতএব হে মহারাজ! আমরা জিজ্ঞাসা করি, জ্যেষ্ঠকে অতিক্রম করিয়া কনীয়ান' কিরূপে, রাজ্যভাগী হইতে পারেন? এক্ষণে যাহা উচিত হয়, আপনি করুন। রাজা কহিলেন, হে বর্ণচতুষ্টয়'! আমি যে কারণে জ্যেষ্ঠকে রাজ্যে অভিষেক করিব না, তাহা সবিশেষ কহিতেছি, শ্রবণ কর। জ্যেষ্ঠ পুত্র যদু আমার নির্দেশ পালন করে নাই, সুতরাং যে পুত্র পিতার প্রতিকূল, সে সাধুসমাজে পুত্র বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে না। যে পুত্র পিতা মাতার আজ্ঞাবহ এবং কায়মনোবাক্যে তাঁহাদিগের হিতসাধন করে, তাহাকেই যথার্থ পুত্র বলা যায়। যদু, তুৰ্ব্বসু, দ্রুহু ও অনু ইহারা আমার আজ্ঞা পালন না করিয়া অতিশয় অপ্রিয় কার্য্য করিয়াছে, কিন্তু পুরু আমার বাক্যরক্ষা ও সম্মানরক্ষা করিয়াছে। পুরু আমার জরা গ্রহণ করিয়া স্বকীয় যৌবন আমাকে সম্প্রদান করিয়াছিল এবং পুরুই আমার মিত্ররূপে সমুদায় অভিলাষ সম্পাদন করিয়াছিল, এই কারণে সে কনিষ্ঠ হইয়াও রাজ্যের অধিকারী হইয়াছে। আর শুক্র আমাকে এই বর প্রদান করেন "যে পুত্র তোমার আজ্ঞাবহ হইবে সে রাজ্যভাগী হইবে” অতএব তোমাদিগকে অনুনয় করিতেছি, তোমরা পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত কর। রাজার এই কথা শুনিয়া প্রজারা কহিল, মহারাজ! যে পুত্র সর্ব্বগুণসম্পন্ন এবং পিতা মাতার হিতকারী সে সর্ব্বকনিষ্ঠ হইলেও সমস্ত কল্যাণের পাত্র হইতে পারে। পুরু আপনার প্রিয় কার্য্য সম্পাদন করিয়াছেন, বিশেষতঃ শুক্রের ঐরূপ বর আছে, অতএব এ বিষয়ে আমাদিগের কোন বক্তব্য নাই, সুতরাং পুরুই রাজা হইবেন। পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকেরা সন্তুষ্ট মনে এই কথা কহিলে রাজা কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। তিনি পুরুকে রাজ্যভার অর্পণ করিয়া বিষয় বাসনায় জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক বনবাসের মানসে তপস্বী ব্রাহ্মণগণের সহিত রাজধানী হইতে নির্গত হইলেন। তৎপরে যদু হইতে যাদব, তুৰ্ব্বসু হইতে যবন, দ্রুহু হইতে বৈভোজ', অনু হইতে ম্লেচ্ছজাতি এবং পুরু হইতে পৌরববংশ উৎপন্ন হইল। হে মহারাজ! আপনি সেই বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।
ষড়শীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে রাজা যযাতি পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া হৃষ্টচিত্তে বানপ্রস্থাশ্রম অবলম্বন করিলেন। অনন্তর তিনি অযত্নসুলভ ফলমূলমাত্র ভোজনপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণের সহিত কিছুকাল বাস করিয়া সুরলোকে গমন করিলেন; তথায় কিয়দ্দিন পরমসুখে অবস্থান করিয়া দেবরাজ ইন্দ্রকর্তৃক পুনর্ব্বার ভূতলে পতিত হইলেন। এইরূপ জনশ্রুতি আছে, স্বর্গভ্রষ্ট যযাতি ভূমণ্ডলে পতিত না হইয়া কিছুকাল অন্তরীক্ষে অবস্থান করেন। পরে সেই অন্তরীক্ষ হইতে বসুমান, অষ্টক, প্রতদ্দন ও শিবি রাজার সহিত সমবেত হইয়া পুনর্ব্বার দেবলোকে গমন করেন।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। কুরুবংশাবতংস মহা-তেজাঃ যযাতি মর্ত্যলোকে ও স্বর্গলোকে যে সকল কার্য্য করিয়া-ছিলেন আপনি সভ্যগণসন্নিধানে তাহা কীর্ত্তন করুন এবং তিনি কি কারণে পুনর্ব্বার স্বর্গে গমন করেন, তাহা আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বলুন, শুনিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! সর্ব্বপাপ প্রণাশিনী ভূর্লোক ও দ্যুলোক' বিশ্রুতা তদীয় পরম পবিত্র কথা কীর্ত্তন করিতেছি, অবধান' করুন। নহুষতনয় যযাতি হৃষ্টচিত্তে কনিষ্ঠ পুত্রকে রাজ্যে অভিষেক করিয়া এবং যদু প্রভৃতি পুত্রদিগকে অন্ত্যজ জাতিমধ্যে সন্নিবেশিত করিয়া বানপ্রস্থাশ্রম অবলম্বন পূর্ব্বক অরণ্যে প্রবেশ করিলেন। জিতেন্দ্রিয় জিতক্রোধ রাজা তথায় শ্রাদ্ধ ও যজ্ঞাদি ক্রিয়াকলাপদ্বারা পিতৃগণ ও দেবগণকে পরিতৃপ্ত করিলেন। তিনি বানপ্রস্থাশ্রমসমুচিত বিধানানুসারে জ্বলন্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান করিতেন; বন্য ফলমূল ও ঘৃতদ্বারা অতিথিসৎকার করিতেন এবং উচ্ছৃবৃত্তি দ্বারা উদরপূর্ত্তি করিতেন। সহস্র বৎসর অতিবাহিত হইলে, তিনি মৌনাবলম্বন-পূর্ব্বক ত্রিংশৎ বৎসর কেবল জলাহারী হইলেন। পরে এক বৎসর বায়ুমাত্র ভক্ষণ এবং অপর এক বৎসর পঞ্চাগ্নির মধ্যবর্তী হইয়া অতি কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। অনন্তর ছয় মাস বায়ুমাত্র ভক্ষণ ও একপদে ভূমিস্পর্শ করিয়া নিরবচ্ছিন্ন দণ্ডায়মান থাকিতেন। এইরূপে তপোনুষ্ঠানপরায়ণ রাজা প্রভূত পুণ্যসঞ্চয় করিয়া স্বর্গে আরোহণ করেন।
সপ্তাশীতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপ শ্রুত আছে, রাজা যযাতি স্বর্গারোহণপূর্ব্বক দেবতা, সিদ্ধ, সাধ্য, মরুৎ ও বসুগণ কর্তৃক সমাদৃত ও সৎকৃত হইয়া সুদীর্ঘকাল তথায় বাস করেন। তিনি কদাচিৎ ব্রহ্মলোকে, কদাচিৎ দেবলোকে গমনাগমন করিতেন। মহারাজ যযাতি ইন্দ্রসন্নিধানে উপস্থিত হইলে দেবরাজ রাজার কথাবসানে জিজ্ঞাসা করিলেন, রাজন! পুরু তোমার জরা গ্রহণ করেন, তুমি তাঁহাকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া কি উপদেশ দিয়াছিলে, সত্য করিয়া বল, আমার শুনিতে নিতান্ত বাসনা হইতেছে। যযাতি কহিলেন, হে দেবরাজ! আমি পুরুকে সমস্ত রাজ্যভার অর্পণ করিয়া কহিলাম, বৎস! গঙ্গা যমুনা এই উভয় নদীর অন্তর্গত সমস্ত রাজ্য তোমারই অধিকারভুক্ত হইল, তুমি এই ধরিত্রীর একমাত্র অধীশ্বর হইলে, তোমার ভ্রাতৃগণ তোমারই অধীনে থাকিয়া অন্ত্যজ জাতিমাত্র শাসন করিবে। অক্রোধন ক্রোধপরায়ণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; ক্ষমাবান্ অক্ষমী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, অতএব হে বৎস! তোমাকে এই উপদেশ প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। মানুষ অমানুষ হইতে প্রধান, বিদ্বান্ মূর্খ হইতে প্রধান, যে ব্যক্তি আক্রোশ করিবে, তাহার উপর আক্রোশ না করিয়া ক্রোধ সংবরণ করাই কর্তব্য, যেহেতু আক্রোষ্টা কোপানলে মনে মনে দগ্ধ হইতে থাকে, কিন্তু অনাক্রোষ্টা তাহার পুণ্যভাগী হয়। লোকের মর্মপীড়কও নৃশংসবাদী' হওয়া নিতান্ত অবিধেয়। যে কথায় অন্যে উদ্বিগ্ন হয়, এমত কথা উচ্চারণ করা অনুচিত। অর্থহীন ব্যক্তির নিকট প্রচুর অর্থ লওয়া অন্যায্য। যে ব্যক্তি লোকের মর্মপীড়ক পরুষভাষী ও বাক্যরূপ কণ্টকদ্বারা অন্যের হৃদয় বিদ্ধ করে, তাহাকে অলক্ষ্মীক বলে। তাহার মুখে অলক্ষ্মীর চিহ্ন সকল সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। সচ্চরিত্র ব্যক্তি অগ্রপশ্চাৎ ভাবিয়া সাধুদিগের প্রশংসাযোগ্য কৰ্ম্ম করেন, সর্ব্বদা অসাধুজনে অতিবাদ সহ্য করেন এবং সম্মার্গে চলিয়া থাকেন। অসতেরা আপন মুখ হইতে নির্গতবাক্যরূপ সায়কদ্বারা অন্যকে আহত করে। আহত ব্যক্তি ঐ সুতীক্ষ্ণ শরাঘাতে জর্জরিত হইয়া অহর্নিশ যন্ত্রণাভোগ করে, অতএব পণ্ডিতেরা তাহা কস্মিকালেও অন্যের প্রতি নিক্ষেপ করেন না। জীবের প্রতি দয়া, মৈত্রী, দান ও মধুরবাক্য প্রয়োগ, ইহা অপেক্ষা ধৰ্ম্ম আর লক্ষ্য হয় না; অতএব সর্ব্বদা সান্ত্বনা-বাক্য প্রয়োগ করা কর্তব্য, কদাচ কঠোর বাক্য উচ্চারণ করিও না। পূজ্যব্যক্তির পূজা ও দান করা কর্তব্য কিন্তু যাচ্ঞা অতিশয় নিষিদ্ধ।
অষ্টাশীতিতম অধ্যায়।
ইন্দ্র কহিলেন, হে নহুষনন্দন! তুমি সর্ব্ব কৰ্ম্ম সম্পাদন পূর্ব্বক গৃহ পরিত্যাগ করিয়া বন প্রবেশ করিয়াছিলে, অতএব জিজ্ঞাসা করি, তুমি কাহার তুল্য তপোনুষ্ঠান করিয়াছ? যযাতি কহিলেন, হে দেবরাজ! দেবতা, মনুষ্য, গন্ধর্ব্ব ও মহর্ষি, ইঁহাদিগের মধ্যে কেহই অদ্যাবধি আমার তুল্য তপোনুষ্ঠান করিতে সক্ষম হয় নাই। তখন ইন্দ্র কহিলেন, মহারাজ! যেহেতু অন্যের তপঃপ্রভাব না জানিয়া শুনিয়া উৎকৃষ্ট, নিকৃষ্ট ও সমকক্ষ লোকের অবমাননা করিলে তন্নিমিত্ত তুমি অদ্যই ক্ষীণপুণ্য হইয়া দেবলোক হইতে পরিভ্রষ্ট হইবে। যযাতি কহিলেন, হে দেবরাজ! দেবর্ষি গন্ধর্ব্ব ও নরলোকের অবমাননা করিয়া যদি দেবলোক-ভ্রষ্ট হইতে হইল, তবে যাহাতে সাধুসন্নিধানে পতিত হই, এইরূপ অনুকম্পা করুন। ইন্দ্র কহিলেন, মহারাজ! তুমি সাধুসন্নিধানেই পতিত হইয়া যথেষ্ট খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিবে, কিন্তু সাবধান যেন এইরূপে আর কাহারও অবমাননা করিও না।
রাজা যযাতি দেবরাজকর্তৃক এইরূপ আদিষ্ট ও স্বর্গভ্রষ্ট হইয়া ভূমণ্ডলে পতিত হইতেছেন, ইত্যবসরে ধর্মপরায়ণ রাজর্ষি অষ্টক তাঁহাকে অন্তরীক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন, হে যুবক! তুমি কে? তোমার রূপ ইন্দ্রের ন্যায় ও তেজঃ অগ্নির ন্যায় দেখিতেছি। তোমাকে প্রচণ্ড মার্তণ্ডের ন্যায় অকস্মাৎ গগনমণ্ডল হইতে পরিভ্রষ্ট দেখিয়া আমরা বিস্ময়াবিষ্টচিত্তে নানাপ্রকার বিতর্ক করিতেছিলাম। এক্ষণে তোমাকে সন্নিবিষ্ট' দেখিয়া পতন-কারণ জিজ্ঞাসার্থ প্রত্যুদ্গমন করিলাম। অগ্রে তোমার পরিচয় লইতে আমাদিগের সাহস হইতেছে না এবং তুমিও আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করিতেছ না; অতএব জিজ্ঞাসা করি, তুমি কে? এবং কি নিমিত্তই বা দেবলোকে আগমন করিয়াছিলে? হে মহানুভব! তোমার ভয় নাই, শীঘ্রই বিষাদ ও মোহ পরিত্যাগ কর। এই সাধুসমাজে বল নামক অসুরের হন্তা ইন্দ্রও তোমাকে পরাভব করিতে সমর্থ নহেন। হে দেবরাজকল্প! সাধুলোকেরা সন্তপ্ত সাধুলোকদিগের আশ্রয়, সম্প্রতি তুমি সাধুসন্নিধানে আসিয়াছ, আর ভয় কি? যেমন তাপদানে অগ্নির, বীজাধানে পৃথিবীর, আলোকদানে সূর্য্যের প্রভুত্ব আছে, সাধুদিগের নিকট অভ্যাগত ব্যক্তিরও তাদৃশ প্রভুত্ব।
যযাতি কহিলেন, আমি নহুষের পুত্র এবং পুরুর পিতা, আমার নাম যযাতি। আমি ইন্দ্রসন্নিধানে আত্মপ্রশংসা করিয়াছিলাম বলিয়া ক্ষীণপুণ্য ও দেবলোক হইতে ভ্রষ্ট হইয়া পৃথিবীতে পতিত হইতেছি। আমি অপেক্ষাকৃত অধিকবয়স্ক, এই নিমিত্ত তোমাদিগকে অভিবাদন করি নাই; কারণ যিনি বিদ্যা, তপস্যা ও জন্মদ্বারা প্রধান হয়েন, তিনি পূজনীয়। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! তুমি কহিতেছ যে যিনি বয়োবৃদ্ধ, তিনি সকলের প্রধান ও পূজ্য, কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে, যিনি বিদ্যা ও তপস্যাদ্বারা সকলের প্রধান হয়েন, তিনি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ও পূজনীয়। যযাতি কহিলেন, সকর্ম্মের প্রতিকূলতাই পাপ; পাপাসক্ত হইলেই নিরয়গামী হইতে হয়; সাধুপুরুষেরা কদাচ পাপকর্ম্মের অনুষ্ঠান বা আনুকূল্য করেন না। আমার বিস্তর অর্থ ছিল, এক্ষণে তাহা বিনষ্ট হইয়াছে, আমি এক্ষণে অনুসন্ধান করিলেও তাহা আর পাইব না, এইরূপ অবধারণ করিয়া যিনি আপনার হিতসাধনে প্রবৃত্ত হন, তিনিই যথার্থ সাধু। যিনি বহুবিধ যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, যিনি সর্ব্ববিদ্যায় পারদর্শী, যিনি বেদাধ্যয়নসম্পন্ন ও তপঃপরায়ণ হইয়া পরিণামে সুরলোকে গমন করেন; তাঁহাকেই মহাধন বলা যায়। বহুধনের অধিপতি হইয়াও অতিমাত্র প্রফুল্ল হওয়া বিধেয় নহে। নিরহঙ্কারচিত্ত হইয়া সর্ব্বদা বেদাধ্যয়ন করা কর্ত্তব্য, কারণ এই জীবলোকে এবং বহুবিধ পদার্থ বিদ্যমান আছে, যাহা চেষ্টার বহির্ভূত, কেবল দৈবপরতন্ত্র'; অতএব বীর ব্যক্তি দৈবকে বলবান্ জানিয়া লব্ধ সেই সেই বস্তু কদাচ নষ্ট করিবেন না। সুখ ও দুঃখ সকলই দৈবাধীন, স্বেচ্ছাক্রমে কেহ কখন সুখী বা দুঃখী হইতে পারে না, অতএব দৈবই বলবান্ এই বিবেচনা করিয়া কদাচ দুঃখে বিষণ্ণ বা সুখে উল্লসিত হইবে না। ধীমান্ ব্যক্তি দুঃখে সন্তপ্ত বা হর্ষে উন্মত্ত হয়েন না। তাঁহারা সুখ দুঃখ সমজ্ঞান করেন, যেহেতু সুখ দুঃখ দৈবায়ত্ত, উহাতে কখন প্রসন্ন বা বিষণ্ণ হইবে না। হে অষ্টক। বিধাতা যেরূপ বিধান করিয়াছেন, তাহা কদাচ অন্যথা হইবার নহে, এই ভাবিয়া আমি কখন ভয়ে মুগ্ধ হই না এবং আমার মনে কদাচ সন্তাপের সঞ্চার হয় না। কি স্বেদজ, কি অণ্ডজ, কি উদ্ভিদ, কি সরীসৃপ, কি কৃমি, কি মৎস্য, কি প্রস্তর, কি তৃণ, কি কাষ্ঠ, প্রারম্ভ' ক্ষয় হইলে সকলেই নষ্ট' হয়। হে অষ্টক। সুখ দুঃখের অনিত্যতা বুঝিয়াছি, অতএব আর কি বলিয়া সন্তপ্ত হইব? কি করিব, কি করিলেই সন্তপ্ত না হই, এইরূপ নানাপ্রকার বিতর্ক করিয়া আমি অপ্রমত্তচিত্তে সন্তাপ বিসর্জন করিয়াছি।
একোননবতিতম অধ্যায়।
অনন্তর অষ্টক, সর্ব্বগুণসম্পন্ন মাতামহ যযাতির এইরূপ ধৰ্ম্মসঙ্গত কথা শ্রবণ করিয়া পুনর্ব্বার কহিলেন, মহারাজ! আত্মবেদী' পুরুষের ন্যায় বহুবিধ ধৰ্ম্মসংক্রান্ত কথার উল্লেখ করিতেছ, তাহা শ্রবণ করিয়া আমাদিগের কর্ণযুগল চরিতার্থ হইতেছে; অতএব তুমি যতকাল যেরূপে যে সকল লোকে অবস্থিতি করিয়াছিলে, তাহা আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বল। যযাতি কহিলেন, আমি নিজ বাহুবলে সমস্ত দিগ্বিজয় করিয়া এই সসাগরা পৃথিবীর সম্রাট্ হইয়াছিলাম। সহস্র বৎসর পরমসুখে সাম্রাজ্য ভোগ করিয়া পরলোকে গমন করি। পরে শতযোজন বিস্তীর্ণ সহস্র দ্বার সংযুক্ত পরম রমণীয় অমরাবতী নগরীতে সহস্র বৎসর অতিবাহিত করি। অনন্তর পরম দুর্লভ ব্রহ্মলোক লাভ করিয়া তথায় বর্ষসহস্র বাস করি। তৎপরে দেবদেব মহাদেবের বাসভূমি কৈলাসভূমিতে বিহার করিয়া দেবগণ ও ঈশ্বরগণকর্তৃক সৎকৃত হইয়া কিয়ৎকাল যাপন করি। তদনন্তর নন্দনবনে কুসুমগন্ধামোদিত চারুরূপ পর্ব্বতসকল নিরীক্ষণ ও সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী বিদ্যা-ধরিগণের সহিত পরমসুখে বিহার করিয়া অযুত শতাব্দী বাস করি। দেবলোক-সুলভ সুখে আসক্ত হইয়া তথায় এই সুদীর্ঘকাল বাস করিলে একদা এক ঘোররূপী দেবদূত আসিয়া প্লুতস্বরে তিনবার কহিল, 'তুমি সুখভ্রষ্ট হও'। সম্প্রতি আমি ক্ষীণপুণ্য হইয়া নন্দনবন হইতে ভ্রষ্ট হইয়াছি এবং দেবগণ অন্তরীক্ষে আমার নিমিত্ত করুণস্বরে রোদন করিতেছেন, ইহাও শুনিতেছি। হে নরেন্দ্র! আমি ইহা ব্যতীত আর কিছুই জানি না। আমি তাঁহাদের "হা পুণ্যকীর্ত্তি যযাতি! তুমি ক্ষীণপুণ্য হইয়া স্বর্গ হইতে ভ্রষ্ট হইতেছ" এইরূপ বিলাপ শুনিয়া কহিলাম, হে দেবগণ! আমি যাহাতে সাধুসন্নিধানে পতিত হই, এমত কোন উপায় বিধান করুন। তাঁহারা আপনাদিগের যজ্ঞভূমিতে যাইতে কহিলেন। আমি হবিগন্ধের অনুসরণ ক্রমে যজ্ঞভূমির অনুমান করিয়া সত্বর আসিতেছি।
নবতিতম অধ্যায়।
অষ্টক কহিলেন, মহারাজ। ইন্দ্রকাননে অযুত শতাব্দী বাস করিয়া কি কারণে তাহা পরিত্যাগপূর্ব্বক পৃথিবীতে পুনরাগমন করিলেন? রাজা কহিলেন, হে অষ্টক। যেমন জ্ঞাতি বা সুহৃজ্জন নির্ধন মনুষ্যকে পরিত্যাগ করে, সেইরূপ ইন্দ্রাদি দেবতারা ক্ষীণপুণ্য ব্যক্তিকে দেবলোক হইতে নিক্ষেপ করিয়া থাকেন। তখন অষ্টক কহিলেন, মহারাজ। আপনি তত্ত্বজ্ঞানী, অতএব বলুন দেখি, স্বর্গে কি কারণে ক্ষীণপুণ্য হয় এবং কি পুণ্য করিলে কোন্ ধামে গমন করিতে পারে, এ বিষয়ে আমার অতীব সন্দেহ আছে। যযাতি প্রত্যুত্তর করিলেন, পুণ্য ক্ষয় হইলে মনুষ্যেরা বিলাপ ও পরিতাপ করিতে করিতে দেবলোক হইতে এই মর্ত্যলোক রূপ ঘোর নরকে পুনরায় পতিত হয় এবং ভৌম-কলেবর' পরিগ্রহপূর্ব্বক বিবিধ উপভোগে আসক্ত হইয়া শৃগাল কুকুরের তৃপ্তিসাধনের নিমিত্ত পুত্র পৌত্রাদিক্রমে বংশ পরিবর্দ্ধিত করিতে থাকে। অতএব যে কৰ্ম্ম করিলে এই পৃথিবীতে অতিশয় কষ্ট ভোগ করিতে হয়, এমত গর্হিত কার্য্যে নিতান্ত অবজ্ঞা ও একান্ত অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা কর্তব্য। হে অষ্টক! যাহা কর্ত্তব্য তৎসমুদায়ই বলিলাম, এক্ষণে আর কি শুনিতে বাসনা কর, বল। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! স্বর্গচ্যুত হইয়া নরলোকে আগমনকালে পথিমধ্যে পতঙ্গেরা নরকলেবর ভক্ষণ করিয়া থাকে, তবে কিরূপে তাহারা এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়? আর কেনই বা এই নরলোককে নরক বলিয়া নির্দেশ করিলেন? রাজা কহিলেন, মনুষ্যেরা জননীজঠর হইতে কর্মারব্ধ' দেহ লাভানন্তর এই পৃথিবীতে সঞ্চারণ করে এবং ইহাতেই পতিত হইয়া লক্ষ লক্ষ বৎসর অতিবাহিত করে, এই নিমিত্ত পৃথিবীকে নরক বলিয়া উল্লেখ করিলাম। পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়? আর কেনই বা এই নরলোককে নরক বলিয়া নির্দেশ করিলেন? রাজা কহিলেন, মনুষ্যেরা জননীজঠর হইতে কর্মারব্ধ দেহ লাভানন্তর এই পৃথিবীতে সঞ্চারণ করে এবং ইহাতেই পতিত হইয়া লক্ষ লক্ষ বৎসর অতিবাহিত করে, এই নিমিত্ত পৃথিবীকে নরক বলিয়া উল্লেখ করিলাম। পৃথিবীতে পতিত হইবার সময়ে তীক্ষ্ণদংষ্ট্র, ভয়ঙ্কর, ভৌম' রাক্ষস-গণ পতনোন্মুখ ব্যক্তিকে কষ্ট দান করিয়া থাকে। অষ্টক জিজ্ঞাসিলেন, মহারাজ! পাপপ্রভাবে দেবলোকচ্যুত মনুষ্যগণকে যদি ভীমরূপী রাক্ষসগণ পথিমধ্যে গ্রাস করে, তবে তাহারা কিরূপে পুনরায় এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়? কিরূপে ইন্দ্রিয়সম্পন্ন হয়? আর কি প্রকারেই বা তাহারা গর্তে আবিষ্ট হয়? রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, অশ্রুপ্রবাহে জলভাবাপন্ন মনুষ্য-কলেবর রেতোরূপে পরিণত হইয়া পৃথিবীস্থ বনস্পতি, ওষধি, ফল, পুষ্প ও পঞ্চভূতে অনুপ্রবিষ্ট হয়। সেই ফলাদি ভক্ষণ | করিলে রেতঃ জন্মে। সেই রেতঃ স্ত্রীগর্ন্তে সিক্ত হইলে গর্ভের সঞ্চার হয়, তাহাতে চতুষ্পদ, দ্বিপদ প্রভৃতি জন্তুগণ গর্তে আবির্ভূত হইয়া থাকে। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ। গর্ন্তভূত জন্তু কি শরীরান্তর দ্বারা কিংবা স্বশরীরদ্বারা গর্ভে অনুপ্রবিষ্ট হয়? আর কিরূপেই বা দেহের ঔন্নত্য, চক্ষুঃশ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়বর্গ এবং চৈতন্য লাভ করে? এই বিষয়ে আমাদের মহান্ সংশয় আছে; আপনি তত্ত্বজ্ঞ, অতএব এই সমুদায় বিশেষরূপে বর্ণনা করিয়া আমাদিগের সন্দেহভঞ্জন করুন। রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, ঋতুকালে বায়ু, পুষ্পরসানুপৃক্ত রেতঃ গর্ন্তযোনিতে আকর্ষণ করে; সেই রেতঃ প্রথমতঃ তন্মাত্ররূপী' হইয়া ক্রমশঃ গর্ভকে পরিবর্দ্ধিত করিতে থাকে। তদনন্তর সেই গর্ন্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন হইয়া পূর্ব্বতন বাসনা অবলম্বনপূর্ব্বক মনুষ্যরূপে আবির্ভূত হয়। মনুষ্য জাতমাত্রে চৈতন্য লাভ করিয়া শ্রবণেন্দ্রিয়-দ্বারা শব্দ, চক্ষু দ্বারা রূপ, ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা গন্ধ, জিহ্বাদ্বারা রস, ত্বগিন্দ্রিয়দ্বারা শীত, উষ্ণ প্রভৃতি স্পর্শ অনুভব করিতে এবং মনোদ্বারা সমুদায় ভাব অবগত হইতে পারে। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! মৃত ব্যক্তির কলেবর দগ্ধ নিখাত' বা নিক্ষিপ্ত হইয়া থাকে, তবে মরণান্তর অভাবভূত পুরুষ কিরূপে পুনর্ব্বার চৈতন্য লাভ করে? যযাতি বলিলেন, পুরুষ প্রাণত্যাগ করিয়া স্বকীয় পুণ্য পাপের অনুসারে অচিরাৎ অন্য যোনি আশ্রয় করে। পুণ্যবান্ ব্যক্তিরা পুণ্যযোনি ও পাপকারী ব্যক্তিরা পাপযোনি প্রাপ্ত হয়। কীট ও পতঙ্গাদি পাপকারী জন্তু; এই নিমিত্ত উহারা পাপযোনির অন্তর্গত। চতুষ্পদ, দ্বিপদ, ষত্পদ ইহারাও পাপ-স্বভাব; এই নিমিত্ত ইহারাও পাপযোনির অন্তর্গত। হে রাজসিংহ! যাহা বক্তব্য তাহা সবিস্তারে বলিলাম, এক্ষণে আর কি জিজ্ঞাস্য আছে, বল। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! মনুষ্য তপস্যা, বিদ্যা বা যেরূপ কর্মানুষ্ঠানদ্বারা শ্রেষ্ঠলোক প্রাপ্ত হয়, আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, তৎসমুদায় আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করুন। যযাতি কহিলেন, হে অষ্টক! তপস্যা, দান, শম, দম, লজ্জা, সরলতা এবং দয়া, এই সাতটি স্বর্গের দ্বার স্বরূপ। সাধুলোকেরা কহিয়া থাকেন, মনুষ্যেরা অজ্ঞান কূপে মগ্ন হইয়া অহঙ্কারদোষে সর্ব্বদা বিনষ্ট হয়। অধ্যয়নশীল বা পণ্ডিতাভিমানী যে ব্যক্তি বিদ্যাবলে অন্যের যশোলোপ করে, সে পুণ্যলোক হইতে অচিরাৎ ভ্রষ্ট হয় এবং তাহার সেই অধ্যয়নাদি ব্রহ্মফলপ্রদ হয় না। মানাগ্নিহোত্র, মানমৌন, মানাধ্যয়ন ও মানযজ্ঞ, এই চারিটি কৰ্ম্ম ভয়ঙ্কর নহে; কিন্তু অনুষ্ঠানের ত্রুটি হইলে ইহা নিতান্ত ভীষণ হইয়া উঠে। মানে হর্ষ প্রকাশ ও অপমানে সন্তাপ করিও না। সাধুব্যক্তিরা সাধুদিগকে সর্ব্বদা সৎকার করিয়া থাকেন। অসাধুরা কদাচ সাধুবুদ্ধি লাভ করিতে পারে না। "এত দান করিলাম” “এত যজ্ঞ করিলাম” “এত অধ্যয়ন করিলাম" এবং "এত ব্রতানুষ্ঠান করিলাম” এইরূপ অহঙ্কার অতি ভয়ঙ্কর, অতএব ইহা যত্নপূর্ব্বক পরিত্যাগ করা কর্তব্য। যে সকল মনীষী; সকলের আশ্রয়ভূত তাঁহাদিগের সহিত সঙ্গত হইলে ইহলোকে কীর্ত্তি ও পরলোকে সদ্গতি লাভ হয়।
একনবতিতম অধ্যায়।
অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থ ও ভিক্ষু, ইঁহারা কিরূপ আচরণ করিলে সৎপথে থাকিয়া ধর্মোপার্জন করিতে পারেন, এই বিষয়ে নানা প্রকার প্রবাদ আছে, আপনার মত কি? যযাতি কহিলেন, ব্রহ্মচারীর ধর্ম এই যে, অধ্যাপনাদি গুরুকার্য্যের নিমিত্ত কদাচ গুরুকে প্রেরণা। করিবেন না; গুরু যখন তাঁহাকে আহ্বান করিবেন, তখন অধ্যয়ন করিবেন; গুরুর শয়নের পর শয়ন ও গাত্রোত্থানের পূর্ব্বে গাত্রোত্থান করিবেন; এবং মৃদু, দান্ত, সন্তুষ্ট স্বভাব, অপ্রমত্ত ও বেদাধ্যয়নে নিরত থাকিবেন। গৃহস্থের ধর্ম্ম এই যে, ধৰ্ম্মতঃ ধনোপার্জন করিয়া তদ্দ্বারা যাগদানাদি ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন করিবেন, অতিথি ভোজন করাইবেন এবং অদত্ত বস্তু প্রতিগ্রহ করিবেন না। বানপ্রস্থের কর্তব্য এই যে, স্বকীয় বীর্য্য উপজীব্য করিয়া জীবন ধারণ করিবেন; কোনরূপ পাপকর্মে আসক্ত হইবেন না; পরকে দান করিবেন; কাহাকেও কষ্টদান করিবেন না। ভিক্ষুর কর্তব্য এই যে, শিল্পকর্মদ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ কবিবেন না; গুণবান, জিতেন্দ্রিয় বিষয়বাসনা হইতে বিরক্ত ও বৃক্ষমূলশায়ী হইবেন এবং অধিকদেশ পর্যটন করিবেন না। লোকে নিদ্রায় অভিভূত ও কামপরতন্ত্র হইয়া যে রজনী সুখে অতিবাহিত করে, জ্ঞানীব্যক্তি সংযতচিত্তে অরণ্যে বাস করিয়া সেই রজনী যাপন করিবেন। যিনি এইরূপে অরণ্যবাস আশ্রয় করিয়া তথায় কলেবর পরিত্যাগ করেন, তিনি পূর্ব্ব দশ পুরুষ, পশ্চাৎ দশ পুরুষ এবং আপনাকে এই একবিংশতি পুরুষকে পরিত্রাণ করেন। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ। মুনি ও মৌনব্রতী কয় প্রকার বলুন, শুনিতে আমাদিগের সাতিশয় বাসনা হইতেছে। রাজা কহিলেন, হে অষ্টক। যিনি পৃষ্ঠভাগে গ্রাম রাখিয়া কিংবা পৃষ্ঠভাগে অরণ্য রাখিয়া গ্রামে বাস করেন, তাঁহাকেই মুনি বলা যায়। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ। যিনি অরণ্যে বাস করেন, তাঁহার পশ্চাদ্ভাগে অরণ্য থাকে, সে কি প্রকার? রাজা কহিলেন, যিনি অরণ্যে বাস করিয়া গ্রাম্য ফল মূলাদি ভক্ষণ করেন না, তাঁহার পশ্চাদ্ভাগে গ্রাম; আর যিনি গ্রামে বাস করিয়া অগ্নিহোত্রী নহেন, বাসস্থান নির্দিষ্ট নাই, অগোত্রচারী' ও কৌপীনধারী এবং যতদিন প্রাণসংযোগ, ততদিন অন্ন পানেচ্ছা, তাঁহারই পশ্চদ্ভাগে অরণ্য। আর যিনি সর্ব্ববাসনা-পরিশূন্য হইয়া সর্ব্ব কৰ্ম্ম বিসর্জন ও ইন্দ্রিয় দমনপূর্ব্বক মৌনাবলম্বন করিয়া থাকেন, তাঁহাকে মৌনব্রতী কহে; মৌনব্রতী সর্ব্বসিদ্ধি লাভকরিতে পারেন। ধৌতদন্ত, ছিন্ননখ, স্নাত, অলঙ্কৃত, অসিত-কলেবর' ও শুভকর্মা মুনি সকলের অর্চ্চনীয়। যিনি তপস্যা দ্বারা কর্ষিত, ক্ষীণ, শীর্ণ কলেবর, জীর্ণমাংস ও শুষ্কাস্থি হয়েন, সেই মুনি ইহলোক জয় করিয়া পরলোকও জয় করেন। আর যিনি নির্দ্বন্দ্ব হইয়া মৌনব্রতাবলম্বনপূর্বক তপশ্চরণ করেন, তিনিও ইহলোক জয় করিয়া পরলোক জয় করেন। যে মুনি মুখদ্বারা গোবৎ আহার অন্বেষণ করেন, ইহলোক ও পরলোক উভয়ই তাঁহার প্রীতিকর হইয়া উঠে।
দ্বিনবতিতম অধ্যায়।
অষ্টক, যযাতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, উক্ত উভয়বিধ ভিক্ষুর মধ্যে অগ্রে কাহার মুক্তিলাভ হইয়া থাকে? যযাতি কহিলেন, যিনি গৃহস্থাশ্রমে বাস করিয়াও আশ্রমবিবর্জিত এবং কামাচার-পরাজুখ, তিনিই অগ্রে মুক্তিলাভ করেন এবং যথার্থ জ্ঞানী হইয়া পাপাচরণ করিলেও ধারাবাহিক সুখভোগ করিতে পারেন। যে ব্যক্তি পণ্ডশ্রম মনে করিয়া ধর্মোপাসনা করে, তাহার সেই ধর্মাচরণ বিফল; কেবল ক্রুরতামাত্র!
মহারাজ! রাজা যযাতির এবম্প্রকার ধর্ম্মসঙ্গীত শ্রবণ করিয়া অষ্টক জিজ্ঞাসা করিলেন, মহারাজ! আপনি যুবা, মাল্য-ধারী, তেজস্বী এবং দর্শনীয়; কোন্ ব্যক্তি আপনাকে দূতরূপে প্রেরণ করিয়াছেন? এবং আপনি কোথা হইতে আগমন করিলেন ও কোন্ দিকে গমন করিবেন? আপনার কি পার্থিব স্থানে গমন করিতে হইবে? যযাতি কহিলেন, আমার পুণ্যক্ষয় হওয়াতে স্বর্গ হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীরূপ ভৌম নরকে পতিত হইতেছি; আপনাদিগের সহিত কথোপকথন করিয়া অচিরে ভূতলে পতিত হইব; যেহেতু ব্রহ্মলোক-রক্ষকেরা আমার ভূর্লোকপতনের নিমিত্ত ত্বরা করিতেছেন। আর পতনকালে ইন্দ্র আমাকে এই বর দিয়াছিলেন "হে নরেন্দ্র! তুমি সাধুসমাজে পতিত হইবে” তাহাও হইল। অষ্টক কহিলেন, তুমি পতিত হইও না, হে রাজন! যদি আমার অন্তরীক্ষ বা দিব্য কোন লোক থাকে, আমি তোমাকে তাহার অধিকারী করিলাম। যযাতি কহিলেন, মহারাজ! যতদিন পৃথিবীতে গবাশ্ব প্রভৃতি জীবজন্তু আছে, ততদিন আপনার ভূর্লোকে অধিকার আছে। অষ্টক কহিলেন, আমার দিব্য বা অন্তরীক্ষ যে কোন স্থান থাকে, তাহা তোমাকে প্রদান করিলাম, তুমি অচিরাৎ সেই স্থানে গমন কর। যযাতি প্রত্যুত্তর করিলেন, হে রাজশ্রেষ্ঠ! বেদবিৎ ব্রাহ্মণেরাই প্রতিগ্রহ করিয়া থাকেন, মাদৃশ ক্ষত্রিয়েরা কদাচ যাজ্ঞা-দৈন্য স্বীকার করেন না। বরং ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য জাতির অভাবে প্রাণত্যাগ করা কর্তব্য, তথাপি যাজ্ঞাজনিত লঘুতা স্বীকার করা অনুচিত।
পরে অষ্টকের সমভিব্যাহারী প্রতৰ্দ্দন কহিলেন, হে দর্শনীয়! আমি প্রতৰ্দ্দন, তুমি তত্ত্বজ্ঞানী, অতএব যদি অন্তরীক্ষে বা স্বর্গে আমার কোন স্থান থাকে, আমি তোমাকে তাহার অধিকারী করিলাম। যযাতি কহিলেন, হে নরেন্দ্র। আপনার অতি উৎকৃষ্ট বহুসংখ্যক লোক আছে। সেই সকল লোক আপনাকে প্রতীক্ষা করিতেছে; উহা এত অধিকসংখ্যক যে, প্রতি সপ্তাহে এক এক লোক ভোগ করিলেও নিঃশেষিত হয় না। প্রতদ্দন কহিলেন, আমি তোমাকে সেই সকল লোক প্রদান করিলাম। তুমি মোহ পরিত্যাগপূর্ব্বক শীঘ্র তথায় গমন কর। রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, সমতেজস্ক শ্রেষ্ঠ রাজারা অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন না। ধর্মপরায়ণ রাজা ধর্ম্য, মান্য ও যশস্কর কর্ম যত্নপূর্ব্বক সম্পাদন করিয়া থাকেন, কিন্তু আপনি যেরূপ বলিতেছেন, মাদৃশ লোক এরূপ কৃপণ কৰ্ম্ম করিতে সম্মত নহেন। মদ্বিধ লোকের কর্তব্য যে, যাহা অন্যে না করিয়াছে, তদ্রূপ অপূর্ব্ব কৰ্ম্ম সম্পাদন করা। রাজা যযাতি এইরূপ কহিতেছেন, ইত্যবসরে মহারাজ বসুমান্ তাঁহাকে বলিতে আরম্ভ করিলেন।
ত্রিনবতিতম অধ্যায়।
বসুমান্ কহিলেন, মহারাজ! আমি উষদশ্বের পুত্র, আমার নাম বসুমান্। যদি স্বর্গে বা অন্তরীক্ষে আমার ভোগ্য কোন স্থান থাকে, তাহা আমি তোমাকে প্রদান করিলাম। রাজা কহিলেন, অন্তরীক্ষ, পৃথিবী, দিক্ এবং যে সকল লোক সূর্য্যদেবের তাপে উত্তপ্ত হয়, তাদৃশ বহুসংখ্যক লোক আপনার গমন প্রতীক্ষা করিতেছে। বসুমান্ প্রত্যুত্তর করিলেন, মহারাজ! আর ভূমণ্ডলে নিপতিত হইতে হইবে না, আমি সেই লোক আপনাকে প্রদান করিতেছি, উহা আপনারই ভোগ্য হউক; যদি প্রতিগ্রহ করা আপনার পক্ষে নিতান্ত দূষণীয় হয়, তবে তৃণদ্বারা উহা ক্রয় করুন। রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, হে নরেন্দ্র! তুমি সাধুব্যক্তিদিগকে কদাচ অবমাননা কর নাই, অতএব তোমার বিদ্যুৎপ্রায় অনন্ত লোক বিদ্যমান আছে। শিবি কহিলেন, মহারাজ! যদি এই সকল লোক ক্রয় করা আপনার অভিমত হয়, তবে ৩।বা আপনাকে সম্প্রদান করিতেছি, আপনি তাহা গ্রহণ করুন। আমি দান করিয়া পুনরায় তাহা গ্রহণ করিব না, যেহেতু বিদ্বান্ ব্যক্তিরা দান করিয়া কদাচ অনুতাপ করেন না। যযাতি কহিলেন, হে নরদেব! আপনি দেবরাজতুল্য প্রভাব-সম্পন্ন এবং আপনার ভোগ্য লোকও অনন্ত বটে, কিন্তু আর অদ্যাপি অন্যদত্ত লোকে স্পৃহা হয় নাই; অতএব আপনার দান আমার অভিমত নহে। তখন অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! যদি অস্মদ্দত্ত এক একটি লোক স্বীকার না করেন, তবে আমরা আপনাকে সমুদায় প্রদান করিয়া বরং নরকে গমন করিব। রাজা প্রত্যুত্তর করিলেন, আমার পক্ষে যাহা উপযুক্ত বোধ হয়, তাহা সম্পাদন করিতে যত্নবান হউন; কারণ সাধু ব্যক্তিরা স্বভাবতঃ সত্যপরায়ণ হইয়া থাকেন, কিন্তু যাহা আমার অদৃষ্টলভ্য নহে, তদ্বিষয় ভোগ করিতে আমি কখনই সম্মত হইতে পারি না। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! যে সকল সুবর্ণময় রথে আরোহণ করিয়া লোকে শাশ্বতলোকে গমন করিতে অভিলাষ করে, তদ্রুপ পাঁচখানি রথ দেখা যাইতেছে, উহা কাহার? রাজা কহিলেন, ঐ সকল সুবর্ণময় রথ তোমাদের বহন করিবে। উহা জ্বলন্ত অগ্নিশিখার ন্যায় পরিদৃশ্যমান হইতেছে। অষ্টক কহিলেন, মহারাজ! তুমি ঐ রথে আরোহণ করিয়া অন্তরীক্ষে গমন কর এবং নির্দিষ্টকাল উপস্থিত হইলে আমরাও তোমার অনুসরণ করিব। রাজা কহিলেন, আমরা কর্মফলে সকলেই স্বর্গলোক জয় করিয়াছি, অতএব চল, সকলে সমবেত হইয়া তথায় গমন করিব। এই আমাদিগের দেবলোকে প্রস্থান করিবার নিষ্কণ্টক পথ দেখাইতেছে।
অনন্তর ধর্মশীল ভূপালগণ রথারোহণপূর্ব্বক স্বীয় স্বীয় প্রভাপুঞ্জদ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। এই অবসরে অষ্টক কহিলেন, আমি মনে করিয়া-ছিলাম, মহাত্মা ইন্দ্র আমার সখা, আমিই অগ্রে তাঁহার নিকট গমন করিব, কিন্তু উশীনরতনয় শিবি মহাবেগে অশ্বগণকে অতিক্রম করিয়া গমন করিতেছেন, ইহার অভিপ্রায় কি? যযাতি প্রত্যুত্তর করিলেন, উশীনরপুত্র যত ধন উপার্জন করিয়াছিলেন, সমুদায়ই দেবলোকে সমর্পণ করিয়াছেন; অতএব শিবিরাজ আমাদিগের সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অসামান্য বুদ্ধিসম্পন্ন শিবিরাজ দান, তপস্যা, সত্য ধৰ্ম্ম, লজ্জা, ক্ষমা ও বিধিৎসা' প্রভৃতি প্রভৃত গুণে অলঙ্কৃত; বিশেষতঃ শিবিরাজ অতিশয় সুশীল ও সৌম্য, এই কারণে শিবি সর্ব্বাগ্রে গমন করিতেছেন। অনন্তর অষ্টক সকৌতুকচিত্তে পুনর্ব্বার মাতামহকে জিজ্ঞাসিলেন, মহারাজ! জিজ্ঞাসা করি, আপনি কোথা হইতে আগমন করিতেছেন এবং কাহার পুত্র? আর আপনি যে সকল কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, অন্য কোন ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণ তদ্রুপ কর্ম করিতে পারেন না কেন? এই সমুদায় যথার্থরূপে বর্ণনা করুন। রাজা প্রতাত্তর করিলেন, আমি নহুষতনয়, আমার নাম যযাতি। আমি পৃথিবীরাজ্যের সম্রাট্ ছিলাম, আমি তোমাদিগের সমক্ষে সমুদায় রহস্য প্রকাশ করিতেছি। আমি তোমাদিগের মাতামহ। আমি সমস্ত অবনীমণ্ডল জয় করিয়াছি, ব্রাহ্মণদিগকে একশত সুরূপ পবিত্র অশ্ব ও বস্ত্র দান করিয়াছি এবং শত অর্বুদ গো, বাহন, সুবর্ণ ও ধনের সহিত এই সসাগরা ধরিত্রী বিপ্রসাৎ করিয়াছি। পৃথিবী ও স্বর্গে আমার সত্যের প্রভাব দেদীপ্যমান আছে। সত্যপ্রভাবেই মনুষ্যলোকে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। আমি যাহা কহিয়া থাকি সকলই সত্য। আমার বাক্য কদাচ বিফল হয় না; যেহেতু সাধুলোকেরা সত্যের সম্মান করিয়া থাকেন। হে অষ্টক! আমি সত্যই কহিতেছি, উষদশ্বের পুত্র প্রতৰ্দ্দন, এই সমস্ত নরলোক, মুনি ও দেবগণ ইঁহারা সত্য-প্রভাবেই সকলের পূজনীয় ও মান্য হইয়াছেন। আমরা স্বীয় পুণ্যবলে সুরলোক জয় করিয়াছি; অতএব যে ব্যক্তি আমাদিগের নিকট অকপটে স্বকীয় রহস্য ভেদ করিবেন এবং বিপ্রগণের প্রতি অসূয়াশূন্য হইবেন, তিনি উত্তরকালে আমাদিগের সালোক্য' লাভ করিতে পারিবেন। এইরূপে রাজা যযাতি স্বীয় দৌহিত্রগণ দ্বারা তারিত' হইয়া মহীয়সী কীর্ত্তি সংস্থাপনপূর্ব্বক পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া ত্রিদশালয়ে গমন করিলেন।
চতুর্নবতিতম অধ্যায়।
জনমেজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্! পুরুবংশাবতংশ ভূপতিগণ কিরূপ শৌর্য্য, বীর্য্য, পরাক্রম সদাচার ও সদ্ব্য-বহারাদি-সম্পন্ন ছিলেন, তৎসমুদায় বিস্তর বর্ণন করুন। সেই সুশীল সুবিখ্যাত মহাবল পরাক্রান্ত বিজ্ঞানশালী মহীপালগণের জীবন-চরিত সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইতে আমার সাতিশয় অভিলাষ হইতেছে। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পুরুবংশ-সমুদ্ভূত মহাবল, মহাতেজাঃ, সর্ব্বলক্ষণাক্রান্ত ভূপালগণের বৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। পৌষ্টীর গর্তে পুরুরাজের তিন পুত্র জন্মে; প্রবীর, ঈশ্বর এবং রৌদ্রাশ্ব। রাজকুমারেরা সকলেই মহারথ ছিলেন। সর্ব্বজ্যেষ্ঠ প্রবীরের ভার্য্যা শূরসেনী; তাঁহার গর্তে মনস্যু নামে এক পুত্র জন্মে। মহাবল মনস্যু স্বীয় বাহুবলে অরাতিকুল নির্মূল করিয়া অতি বিস্তীর্ণ সাগরাম্বরা ধরিত্রীর একাধিপতি হইয়াছিলেন। সৌবীরীর গর্তে মনস্যুর অন্বয়ানু প্রভৃতি তিন পুত্র জন্মে। অপ্সরা মিশ্রকেশীর গর্ভে রৌদ্রাশ্বের দশ পুত্র জন্মে। ঋচেয়ু, ঋক্ষেয়ু, কৃকণেয়ু, স্থণ্ডিলেয়ু, বনেয়ু, জলেয়ু তেজেয়ু, সত্যেয়ু, ধর্ম্মেয়ু ও সন্নতেয়ু। তাঁহারা সকলেই সুপণ্ডিত, ধর্মপরায়ণ, যাগশীল ও অস্ত্রবিদ্যা-বিশারদ ছিলেন। তন্মধ্যে অনাবৃষ্টি অসাধারণ বিদ্যোপার্জন করিয়া পৈত্রিক সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন। মহীপাল অনাবৃষ্টির মতিনার নামে এক পুত্র জন্মে। পরম ধার্মিক মতিনার রাজসূয় ও অশ্বমেধ প্রভৃতি যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। কালক্রমে তাঁহার চারি পুত্র হইল। তৎসু, মহান, অতিরথ এবং দ্রুহ্য। মহাবল পরাক্রান্ত তৎসু সমস্ত বসুন্ধরা জয় করিয়া ভূমণ্ডলে নিৰ্ম্মল যশোরাশি বিস্তার করিয়াছিলেন। তৎসুর ঈলিন নামে এক মহাবল পুত্র জন্মে। তিনিও সমুদায় পৃথিবী জয় করিয়াছিলেন। মহারাজ ঈলিন স্বীয় পত্নী রথন্তরীর গর্বে দুষ্মন্ত, শূর, ভীম, প্রবসু, এবং বসু, এই পাঁচ পুত্র উৎপাদন করেন। তন্মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ দুষ্মন্ত সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন। তিনি শকুন্তলার গর্তে ভরত নামে এক পুত্র উৎপাদন করিলেন। সেই শকুন্তলা-তনয় ভরতদ্বারাই ভরতবংশের এতদূর গৌরব বৃদ্ধি হইয়াছে। মহারাজ ভরতের তিন মহিষী। তাঁহাদিগের গর্তে রাজার নয় পুত্র জন্মে। কিন্তু পুত্রেরা কেহই তাঁহার অনুরূপ হন নাই, এই নিমিত্ত স্বীয় সন্তানগণকে যথাযোগ্য সমাদর করিতেন না। মহিষিগণ রাজার অসন্তোষের কারণ জানিতে পারিয়া ক্রোধ-পরবশ হইয়া তৎক্ষণাৎ পুত্রদিগকে বিনষ্ট করিলেন। এইরূপে ভরতের অপত্যোৎপাদন বৃথা হইয়া গেল। অনন্তর তিনি পুত্রার্থী হইয়া বহুবিধ যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করাতে মহর্ষি ভরদ্বাজের অনুগ্রহে ভূমন্যু নামে এক পুত্র লাভ করিলেন। ভূমন্যু প্রাপ্তবয়স্ক হইলে রাজা তাঁহাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহিষী পুষ্করিণীর গর্তে ভূমন্যুর ছয় পুত্র জন্মে; সুহোত্র, দিবিরথ, সুহোতা, সুহবিঃ, সুজয়ু এবং ঋচীক। সর্ব্বজ্যেষ্ঠ সুহোত্র গজবাজি-সমাকীর্ণ ও বহুরত্নসমাকুল রাজ্যলাভ করিলেন এবং রাজসূয় অশ্বমেধ প্রভৃতি বহুবিধ যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। ন্যায়পরায়ণ সুহোত্র ধৰ্ম্মতঃ প্রজাপালন করিতে আরম্ভ করিলে, হস্ত্যশ্বরথ-সম্পূর্ণা ও জনতা-সমাকুলা বসুন্ধরা ভারাক্রান্তা হইয়া যেন রসাতলে নিমগ্না হইতে লাগিলেন। তিনি রাজা হইলে শস্যবৃদ্ধি, প্রজাবৃদ্ধি ও পৃথিবী স্থানে স্থানে চৈত্য ও যূপস্তম্ভে' উদ্ভাসিত হইতে লাগিল। ঐক্ষাকীর গর্ভে সুহোত্রের তিন পুত্র জন্মে; অজমীঢ়, সুমীঢ় এবং পুরুমীঢ়। তন্মধ্যে অজমীঢ় সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাঁহার তিন পত্নী; ধূমিনী, নীলী এবং কেশিনী। ইঁহাদিগের গর্ভে অজমীঢ়ের ছয় পুত্র হয়; ঋক্ষ, দুষ্মন্ত, পরমেষ্ঠী, জহ্ন, ব্রজন ও রূপিণ! ধূমিনীর গর্তে ঋক্ষ, নীলীর গর্ভে দুষ্মন্ত ও পরমেষ্ঠী, কেশিনীর গর্ত্তে জহ্নু, ব্রজন ও রূপিণ জন্মগ্রহণ করেন। দুষ্মন্ত ও পরমেষ্ঠী হইতে পাঞ্চালবংশ সমুদ্ভুত হইয়াছে এবং অমিততেজাঃ জহ্নু হইতে কুশিকান্বয় বিস্তৃত হইয়াছে। সর্ব্বজ্যেষ্ঠ ঋক্ষ, রাজা ছিলেন। ঋক্ষের পুত্র সম্বরণ। তিনি রাজ্যশাসন করিতে আরম্ভ করিলে প্রজামণ্ডলীর ক্ষয় হইতে লাগিল এবং অন্যান্য বিষয়েরও বিনাশ হওয়াতে ক্রমশঃ জনপদ উৎসন্নপ্রায় হইয়া উঠিল। শত শত লোক ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হইয়া অকালে কালকবলে পতিত হইতে লাগিল এবং অনাবৃষ্টি ও ব্যাধিতে লোকসকল পঞ্চত্ব পাইতে লাগিল। এই সময়ে পাঞ্চালরাজ চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে রাজা সম্বরণকে আক্রমণ করিয়া পরাজয় করিলেন। অনন্তর রাজা সম্বরণ ভীত হইয়া পুত্র, কলত্র, অমাত্য ও বন্ধুবর্গের সহিত পলায়ন করিয়া সিন্ধুনদীর তীরবর্তী এক নিবিড় নিকুঞ্জমধ্যে বাস করিলেন। সেই নিকুঞ্জ নদীতট অবধি পৰ্ব্বতসমীপ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দুর্গমধ্যে তাঁহারা বহুকাল অতিবাহিত করিলেন। প্রায় সহস্র বৎসর অতীত হইলে এক দিবস ভগবান্ বশিষ্ঠ তথায় আগমন করিলেন। ভারতেরা মহর্ষিকে সমাগত দেখিয়া, পরম যত্নে প্রত্যুদ্গমন ও অভিবাদনপূর্ব্বক তাঁহাকে অর্ঘ্যদান করিলেন এবং অনাময় প্রশ্নপূর্ব্বক তাঁহার যথাবিধি সৎকার করিলেন। মুনিবর আসনে উপবিষ্ট হইলে রাজা প্রার্থনা করিলেন; ভগবন্! আপনাকে আমাদিগের পৌরোহিত্য গ্রহণ করিতে হইবে। আপনি পুরোহিত হইলে আমরা রাজ্যের নিমিত্ত যত্ন করিতে পারি। মহর্ষি বশিষ্ঠ "তথাস্তু” বলিয়া রাজার প্রার্থনায় সম্মতি প্রকাশ করিলেন। অনন্তর অচিরকাল মধ্যে তাঁহাকে সাম্রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহারাজ সম্বরণ রাজ্যলাভান্তর যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠানে তৎপর হইলেন। অনন্তর সম্বরণের মহিষী তপতী এক পুত্র প্রসব করিলেন। ঐ পুত্রের নাম কুরু। তিনি অত্যন্ত ধৰ্ম্মপরায়ণ হওয়াতে প্রজাদিগের সাতিশয় প্রীতিভাজন হইয়াছিলেন। মহাতপাঃ কুরু কুরুজাঙ্গলে তপস্যা করিয়াছিলেন বলিয়া ঐ প্রদেশ পবিত্র ও কুরুক্ষেত্র নামে বিখ্যাত হইল। কুরুর পাঁচ পুত্র; অবিক্ষিত, অভিষ্যন্ত, চৈত্ররথ, মুনি এবং জনমেজয়। অবিক্ষিতের আট সন্তান; পরীক্ষিৎ, শবলাশ, আদিরাজ, বিরাজ, শাল্মলি, উচ্চৈঃশ্রবা, ভঙ্গকার ও জিতারি। পরীক্ষিতের সাত পুত্র; জনমেজয়, কক্ষসেন, উগ্রসেন, চিত্রসেন, ইন্দ্রসেন, সুষেণ ও ভীমসেন। জনমেজয়ের আট পুত্র ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, বাহ্লীক, নিষধ, জাম্বুনদ, কুণ্ডোদর, পদাতি ও বসতি। রাজকুমারেরা সকলেই বুদ্ধিমান, সুশীল, ধর্মপরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন। সর্ব্বজ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যে অভিষিক্ত হইলেন। তাঁহার দ্বাদশ পুত্র; কুন্তিক, হস্তী, বিতর্ক, ক্রাথ, কুণ্ডিল, হবিঃশ্রবা, ইন্দ্রাভ, ভূমন্যু, অপরাজিত, প্রতীপ, ধৰ্ম্মনেত্র এবং সুনেত্র। ইঁহারা ধৃতরাষ্ট্রের পৌত্র বলিয়া পৃথিবীতে বিখ্যাত ছিলেন। তন্মধ্যে প্রতীপ ভূয়সী প্রতিষ্ঠা লাভকরেন। তাঁহার তিন পুত্র; দেবাপি, শান্তনু এবং বাহ্লীক। তন্মধ্যে দেবাপি ধর্মোপার্জন বাসনায় প্রব্রজ্যাশ্রম' গ্রহণ করিলেন। শান্তনু ও বাহীক রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। হে নরেন্দ্র। এতদ্ভিন্ন অন্যান্য বহুসংখ্যক রাজা পবিত্র মনুবংশে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
পঞ্চনবতিতম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! উদারচরিত পূর্ব্ব পুরুষদিগের সংক্ষেপ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া শ্রবণেন্দ্রিয় পরিতৃপ্ত হইল না; অতএব অনুগ্রহ করিয়া পুনর্ব্বার মনু অবধি রাজর্ষিগণের বিশুদ্ধ বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত সবিস্তার বর্ণন করুন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বে দ্বৈপায়নের নিকট যেরূপ শ্রবণ করিয়াছিলাম অবিকল বর্ণন করিতেছি, মনোনিবেশপূর্ব্বক শ্রবণ করুন। দক্ষের পুত্র অদিতি; অদিতির পুত্র বিবস্বান্, বিবস্বানের পুত্র মনু, মনুর পুত্র ইলা, ইলার পুত্র পুরূরবাঃ, পুরূরবার পুত্র আয়ুঃ, আয়ুর পুত্র নহুষ, নহুষের পুত্র যযাতি। যযাতির দুই ভার্য্যা, শুক্রের কন্যা দেবযানী ও বৃষপর্ব্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা। দেবযানীর গর্তে দুই পুত্র হয়, যদু এবং তুর্ব্বসু। শর্মিষ্ঠার তিন সন্তান; দ্রুহ্য, অনু এবং পুরু। যদু হইতে যদুবংশ এবং পুরু হইতে পুরুবংশ বিস্তৃত হইয়াছে। যে পুরু তিন বার অশ্বমেধযজ্ঞ করিয়াছিলেন এবং পরিশেষে বিশ্বজিত্যজ্ঞ করিয়া অরণ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। পুরুর মহিষী কৌশল্যা; তাঁহার গর্তে জনমেজয়ের জন্ম হয়। জনমেজয় মাধবী নামে এক কামিনীর পাণিগ্রহণ করেন। মাধবীর গর্তে জনমেজয়ের প্রাচিস্বান্ নামে এক পুত্র জন্মে। তিনি সূর্যোদয়ের মধ্যে পূর্ব্ব দিক জয় করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম প্রাচিস্বান্ হইল। তিনি যদুকুলসম্ভূতা অশ্মকীর পাণিগ্রহণ করেন। অশ্মকীর গর্ভে প্রাচিস্বানের সংযাতি নামে এক পুত্র হয়। দূষদ্বতের দুহিতা বরাঙ্গী সংযাতির সহধর্মিণী। তিনি এক সন্তান প্রসব করেন। তাঁহার নাম অহংযাতি। তিনি কৃতবীর্য্যনন্দিনী ভানুমতীকে বিবাহ করেন। ভানুমতীর গর্তে তাঁহার এক পুত্র হয়, তাঁহার নাম সার্বভৌম। সার্ব্বভৌম জয়লব্ধা কেকয়রাজ-দুহিতা সুনন্দাকে বিবাহ করিয়া এক পুত্র উৎপাদন করেন, তাঁহার নাম জয়ৎসেন। জয়ৎসেন বিদর্ভরাজ-দুহিতা সুশ্রবার পাণিপীড়ন করেন! সুশ্রবার গর্ভে অবাচীনের জন্ম হয়। তিনিও বিদর্ভদেশীয় মর্য্যাদা নাম্নী এক কামিনীর পাণিগ্রহণ করিয়া অরিহ নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। অরিহ অঙ্গরাজ-কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়া তাঁহার গর্তে মহাভৌম নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। মহাভৌমের ধর্মপত্নী সুযজ্ঞা। তিনি অযুতনায়ী নামে এক পুত্র প্রসব করেন। যিনি অযুতসংখ্যক পুরুষমেধ যজ্ঞ করিয়া অযুতনায়ী এই নাম লাভ করিয়াছিলেন। অযুতনায়ী, পৃথুশ্রবার দুহিতা কামার পাণিগ্রহণ করিয়া অক্রোধন নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। অক্রোধন কলিঙ্গদেশসম্ভূতা করম্ভাকে বিবাহ করেন। করম্ভার গর্তে দেবাতিথির জন্ম হয়। দেবাতিথি বিদেহদেশোদ্ভবা মর্য্যাদা নাম্নী কন্যার পাণিপীড়ন করিয়া অরিহ নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। অরিহ সুদেবাকে বিবাহ করেন। ঋক্ষ নামে তাহার এক পুত্র হয়। ঋক্ষ তক্ষকদুহিতা জ্বালার পাণিগ্রহণ করিয়া মতিনার নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। মতিনার সরস্বতীকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত দ্বাদশবার্ষিক এক যজ্ঞ আরম্ভ করেন। সেই যজ্ঞ সমাপন হইলে সরস্বতী অভিগমনপূর্ব্বক' তাঁহাকে পতিত্বে বরণ করেন। অনন্তর সরস্বতীর গর্তে মতিনারের এক পুত্র হইল, তাঁহার নাম তংসু। তংসু কালিঙ্গীর গর্তে ঈলিন নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। ঈলিনের দুষ্মন্ত প্রভৃতি পাঁচ পুত্র হয়। দুষ্মন্ত বিশ্বামিত্র-দুহিতা শকুন্তলাকে বিবাহ করেন। তাঁহার গর্তে সুবিখ্যাত ভরতের জন্ম হয়।
শকুন্তলার প্রত্যাখ্যানকালে রাজা দুষ্মন্তের প্রতি এই দৈববাণী হইয়াছিল "মহারাজ। শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যান করিবেন না। ইনি যাহা কহিতেছেন, সমুদায়ই সত্য; বালকটি আপনার ঔরসজাত; ইহার দ্বারা আপনার চরমে পরম ফল স্বর্গফল লাভ হইবে; অতএব যত্নপূর্ব্বক আত্মজের ভরণপোষণ করুন!" "ভরণ করুন” এই দৈববাণী হইয়াছিল বলিয়া কুমারের নাম ভরত রহিল। ভরতভার্য্যা সুনন্দা ভূমন্যু নামে এক পুত্র প্রসব করেন। ভূমন্যুর জায়া বিজয়া সুহোত্রের প্রসুতি। সুহোত্র ইক্ষাকু-বংশীয় সুবর্ণার পাণিগ্রহণ করেন। সুবর্ণার গর্ভে সুহোত্রের এক পুত্র হয়। তাঁহার নাম হস্তী। তিনি এক নগর স্থাপন করেন। সেই নগর প্রতিষ্ঠাতার নামানুসাবে হস্তিনাপুর নামে বিখ্যাত হইল। হস্তী যশোধরার পাণিগ্রহণ করিয়া তাঁহার গর্তে বিকুণ্ঠন নামক এক পুত্র উৎপাদন করেন। বিকুণ্ঠনের পত্নীর নাম সুদেবা এবং পুত্রের নাম অজমীঢ়। অজমীঢ়ের চারি মহিষী; কৈকেয়ী, গান্ধারী, বিশালা ও ঋক্ষা। তাঁহাদিগের গর্তে রাজার চতুর্বিংশতিতম পুত্র হয়, তাঁহাদিগের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন বংশের উৎপত্তি হইল। কেবল সম্বরণ হইতে পিতৃকুলের শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। তিনি তপতীর পাণিগ্রহণ করিয়া কুরু নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। যদুবংশোদ্ভবা শুভাঙ্গী কুরুর মহিষী। তিনি বিদুরথ নামে পুত্র প্রসব করেন। বিদুরথের পত্নী সুপ্রিয়ার গর্তে অনশ্বার জন্ম হয়। অনশ্বা অমৃতার গর্তে পরীক্ষিৎকে উৎপাদন করেন। পরীক্ষিতের পত্নী সুযশা। তাঁহার গর্বে ভীমসেনের জন্ম হয়। ভীমসেনের পত্নী কুমারী। তৎপুত্র প্রতিশ্রবা। প্রতিশ্রবার পুত্র প্রতীপ। প্রতীপের তিন পুত্র; দেবাপি, শান্তনু এবং বাহীক। তন্মধ্যে দেবাপি শৈশবাবস্থাতেই বনপ্রয়াণ করেন। শান্তনু প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। তিনি জরাজীর্ণ ব্যক্তিকে স্পর্শ করিবামাত্র সে তৎক্ষণাৎ যুবার ন্যায় সবল হইয়া উঠিত; এই নিমিত্ত তাঁহার নাম শান্তনু হইল। শান্তনু গঙ্গাকে বিবাহ করেন। জাহ্নবীর গর্ভে দেবব্রত নামে এক পুত্র হয়। যাঁহাকে লোকে ভীষ্ম বলিয়া সম্বোধন করিত। ভীষ্ম পিতার প্রিয়চিকীর্ষু হইয়া সত্যবতীর সহিত বিবাহ দিলেন। পূর্ব্বে অনূঢ়াবস্থায় পরাশর-সহযোগে সত্যবতী গর্ভবতী হয়েন। তাহাতেই দ্বৈপায়নের জন্ম হয়। অধুনা সেই সত্যবতীর গর্ভে রাজা শান্তনুর দুই পুত্র হইল; একের নাম বিচিত্রবীর্য্য অপরের নাম চিত্রাঙ্গদ। তন্মধ্যে চিত্রাঙ্গদ যৌবনসীমায় উত্তীর্ণ না হইতেই গন্ধর্ব্ব-হস্তে নিহত হইলেন। বিচিত্রবীর্য্য, রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। তাঁহার অম্বিকা ও অম্বালিকা নাম্নী দুই মহিষী ছিলেন; কিয়ৎকাল পরে রাজা আত্মজের বদননিরীক্ষণসুখে বঞ্চিত হইয়া লোকান্তর গমন করিলেন। অনন্তর সত্যবতী বংশরক্ষার নিমিত্ত চিন্তাকুল হইয়া ব্যাসদেবকে স্মরণ করিবামাত্র তিনি তৎক্ষণাৎ জননীর সম্মুখীন হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, মাতঃ! কি নিমিত্ত স্মরণ করিয়াছেন, আজ্ঞা করুন। সত্যবতী কহিলেন, বৎস! তোমার ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্য পুত্রবিহীন হইয়া সুরলোকে গমন করিয়াছেন; এক্ষণে তুমি তাঁহার উত্তম পুত্র উৎপাদন করিয়া বংশ রক্ষা কর। দ্বৈপায়ন মাতার আজ্ঞায় বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর এই তিন পুত্র উৎপাদন করিলেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের এক শত পুত্র হইবে বলিয়া বরদান করিলেন।
অনন্তর দ্বৈপায়নের বরপ্রভাবে গান্ধারীর গর্তে ধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্র হইল। তন্মধ্যে দুর্য্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণ এবং চিত্রসেন এই চারিজন সর্ব্বপ্রধান। পাণ্ডুর দুই ভার্য্যা; কুন্তী ও মাদ্রী। কুম্ভীর আর একটি নাম পৃথা। এক দিবস পাণ্ডুরাজ মৃগয়ার্থে ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিলেন, এক মহর্ষি কন্দর্পশরে বিদ্ধ হইয়া এক মৃগীতে আসক্ত হইয়াছেন। রাজা সেই অদৃষ্টপূর্ব্ব অদ্ভুত ব্যাপার নয়নগোচর করিয়া বিস্মিত ও চমৎকৃত হইলেন এবং ঋষির কামক্রীড়ার সমাপ্তি ও পরিতৃপ্তি না হইতেই তাঁহাকে শরাঘাত করিলেন। ঋষি বাণাহত হইয়া পাণ্ডুকে অভিসম্পাত করিলেন "তুমি অভিজ্ঞ হইয়াও আমাকে কামরসাস্বাদে বঞ্চিত ও বিনষ্ট করিলে, এই অপরাধে অচিরকালমধ্যে তোমাকেও এই অবস্থায় পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইতে হইবে।” রাজা শাপভয়ে ভীত ও বিবর্ণ হইয়া ভবনে প্রত্যাগমন করিলেন এবং তদবধি মহিষীদিগের সহবাস পরিত্যাগ করিলেন। অনন্তর এক দিবস কুন্তীর নিকট সমস্ত মৃগয়াবৃত্তান্ত ও আপনার অবিমৃষ্যকারিত্ব' সবিস্তর বর্ণনা করিয়া কহিলেন, রাক্তি! আমি শুনিয়াছি অপুত্র ব্যক্তি নিরয়গামী হয়; অতএব তুমি অপত্যোৎপাদন করিয়া আমার আয়তি'র শুভবিধান কর।
কুন্তী স্বামীর আজ্ঞা পাইয়া ধৰ্ম্ম, মারুত এবং ইন্দ্র, এই তিন জনের দ্বারা যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, ভীমসেন এবং অর্জুন এই তিন পুত্র উৎপাদন করিলেন। রাজা পুত্রদর্শনে পরম প্রীত হইয়া কুন্তীকে কহিলেন, তোমার সপত্নীও অপত্যবিহীনা, অতএব যাহাতে তাঁহার সন্তান হয়, তদ্বিষয়েও যত্ন করা কর্তব্য। কুন্তী "যে আজ্ঞা” বলিয়া তৎক্ষণাৎ মাদ্রীকে আকর্ষণী বিদ্যা প্রদান করিলেন। মাদ্রী সপত্নীদত্ত বিদ্যাবলে অশ্বিনীকুমার নামক দুই দেবতাকে স্মরণ করিবামাত্র তাঁহারা উপনীত হইয়া তাঁহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অনন্তর মাদ্রী,
নকুল ও সহদেব এই দুই পুত্র লাভ করিলেন। একদা পাণ্ডু স্বীয় মহিষী মাদ্রীর রূপলাবণ্যে মোহিত এবং শাপবাক্যবিস্মৃত হইয়া মদনানল নির্ব্বাণ করিবার নিমিত্ত যেমন তাঁহাকে স্পর্শ করিলেন, অমনি পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইলেন। তদ্দর্শনে মাদ্রী অত্যন্ত শোকার্তা ও দুঃখিতা হইয়া স্বামীর সহগমনে সঙ্কল্প করিলেন। তিনি চিতাগ্নিতে আরোহণ করিবার সময় নকুল ও সহদেবকে কুন্তীর হস্তে সমর্পণ করিয়া কহিলেন, ইঁহাদিগের প্রতি অযত্ন না করিয়া যত্নপূর্ব্বক প্রতিপালন করিবেন; আমি এ জন্মের মত বিদায় হইলাম। তদনন্তর কতিপয় তাপস পাণ্ডবদিগকে কুত্তীসমভিব্যাহারে হস্তিনাপুরে লইয়া গিয়া ভীষ্ম ও বিদুরের সমীপে তাঁহাদিগের পরিচয় প্রদানপূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলেন। এই বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া দেবতারা দুন্দুভিধ্বনি ও পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন।
পাণ্ডবেরা সাদরে পরিগৃহীত হইয়া ভীষ্মাদির নিকট পিতার নিধনবৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন এবং তাঁহার ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া যথাবিধি সমাপন করিয়া তথায় স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন। তৎকালে দুর্য্যোধন তাঁহাদিগের কোন প্রকার অনিষ্ট চেষ্টা করিত না। এইরূপে পাণ্ডবগণের শৈশবাবস্থা অতীত হইল। পরে দুরাত্মা দুর্য্যোধন দুর্বুদ্ধিপরতন্ত্র হইয়া তাঁহাদিগের অনিষ্ট করিবার নিমিত্ত নানাপ্রকার কৌশল করিতে লাগিল, কিন্তু নিরপরাধ পাণ্ডবদিগের সৌভাগ্যক্রমে সেই দুর্বৃত্তের সমুদায় আয়াস নিষ্ফল হইল। অনন্তর ধৃতরাষ্ট্র ছলনা করিয়া তাঁহাদিগকে বারণাবত নগরে প্রেরণ করিলেন। পাপিষ্ঠ দুর্য্যোধন তথাপি ক্ষান্ত হইল না। সে পাণ্ডবগণকে জতুগৃহে দগ্ধ করিবার নিমিত্ত অশেষ বিধ চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু বিদুরের মন্ত্রণাবলে নৃশংসের অসদভিসন্ধি সমুদায় বিফল হইল। পাণ্ডবগণ নিরন্তর অনিষ্টাশঙ্কায় ভীত হইয়া বারণাবত নগর পরিত্যাগপূর্ব্বক একচক্রাভিমুখে প্রয়াণ করিলেন। পথিমধ্যে হিড়িম্বের প্রাণসংহার করিয়া একচক্রায় উত্তীর্ণ হইলেন। তথায় বক নামক এক দুৰ্দ্দান্ত নিশাচরের প্রাণ-সংহার করিয়া পাঞ্চাল নগরে গমন করিলেন এবং দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক প্রত্যেকে এক একটি সর্ব্বলক্ষণাক্রান্ত পুত্র উৎপাদন করিলেন। যুধিষ্ঠিরের পুত্র প্রতিবিন্ধ্য, বৃকোদরের পুত্র সুতসোম, অর্জুনের পুত্র শ্রুতকীর্ত্তি, নকুলের পুত্র শতানীক, সহদেবের পুত্র শ্রুতকর্মা। পরে যুধিষ্ঠির গোবাসনের দুহিতা দেবিকাকে স্বয়ংবরে লাভ করিয়া তাঁহার গর্ভে বৌধেয় নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। ভীমসেন কাশীশ্বরকুমারী বলন্ধরার পাণিপীড়ন করিয়া তদ্গর্ন্তে সর্ব্বগ নামে পুত্র উৎপাদন করেন। অর্জুন দ্বারাবতীতে গমন করিয়া প্রিয়বাদিনী বাসুদেব-ভগিনী সুভদ্রার পাণিগ্রহণ করিয়া নির্বিঘ্নে স্বদেশে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক অভিমন্যু নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। অভিমন্যু কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। নকুল করেণুমতীর পাণিগ্রহণ করিয়া নিরমিত্র নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। সহদেব মদ্রাধিপতির কন্যা বিজয়াকে স্বয়ংবরে লাভ করিয়া তাঁহার গর্ভে এক পুত্র উৎপাদন করেন, তাঁহার নাম সুহোত্র। ভীমসেন পূর্ব্বে হিড়িম্বার গর্তে ঘটোৎকচ নামে অপর এক পুত্র উৎপাদন করিয়াছিলেন। এইরূপে পাণ্ডবগণের একাদশ পুত্র হইল, তন্মধ্যে অভিমন্যু বংশধর হইয়াছিলেন। তিনি বিরাটের দুহিতা উত্তরার পাণিগ্রহণ | করেন। কিছুদিন পরে অভিমন্যুর সহযোগে উত্তরার গর্ভসঞ্চার হইল, কিন্তু তিনি দুর্ভাগ্যক্রমে যন্মাসেই এক মৃত সন্তান প্রসব করিলেন। ভগবান্ বাসুদেব পৃথাকে আদেশ করিলেন, তুমি এই পুত্রকে ক্রোড়ে ধারণ কর, আমি উহাকে জীবিত করিতেছি। বাসুদেবের তেজঃপ্রভাবে সেই মৃত পুত্র পুনর্জীবিত ও তৎপ্রদত্ত বল, বীর্য্য ও পরাক্রমে প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠিলেন। ফলতঃ বাসুদেবের অনুগ্রহে তাঁহার অকাল জন্ম-নিবন্ধন বলবীর্য্য প্রভৃতি কোন বিষয়েই ন্যূনতা রহিল না। সেই পুত্র কুলের ক্ষীণাবস্থায় জন্মিয়াছিলেন বলিয়া বাসুদেব তাঁহার নাম পরীক্ষিৎ রাখিলেন। পরীক্ষিৎ মাদ্রীকে বিবাহ করেন। মহারাজ! আপনি সেই পরীক্ষিতের ঔরসে মাদ্রীগর্ন্তে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। আপনার ভার্য্যা বসুষ্টমা, শতানীক ও শঙ্কুবর্ণ নামে দুইটি পুত্র প্রসব করিয়াছেন। বৈদেহীর গর্ভে শতানীকের এক পুত্র জন্মে; তাঁহার নাম অশ্বমেধদত্ত। মহারাজ! পরমধন্য ও পরম পবিত্র পুরু ও পাণ্ডবদিগের ইতিবৃত্ত আপনার নিকট কীর্ত্তন করিলাম। ব্রাহ্মণদিগের নিয়মবিশিষ্ট হইয়া ইহা শ্রবণ করা কর্তব্য, স্বধর্মনিরত প্রজাপালনতৎপর রাজাদিগের শ্রোতব্য, বৈশ্যদিগের শ্রোতব্য ও বোদ্ধব্য এবং ত্রিবর্ণশুশ্রূযু' শূদ্রদিগেরও শ্রদ্ধাপূর্ব্বক শ্রবণ করা কর্তব্য। যাঁহারা পরস্পর নিৰ্ম্মৎসর' ও মিত্রভাবাপন্ন হইয়া এই পরম পবিত্র ইতিহাস সমস্ত শ্রবণ করান কিংবা করেন, তাঁহারা স্বর্গধামে গমন করেন এবং দেবতা, ব্রাহ্মণ ও মনুষ্যগণের পরম পূজনীয় ও মাননীয় হন, সন্দেহ নাই। ভগবান্ ব্যাসদেব কহিয়াছেন, ব্রাহ্মণাদি বর্ণসকল পরস্পর নিৰ্ম্মৎসর ও শুশ্রূষান্বিত হইয়া এই পরম পবিত্র ভারত শ্রবণ করিলে সুকৃতিলাভপূর্ব্বক সুরলোকে গমন করিতে পারিবেন। এই মহাভারত পরম পবিত্র, পরমোৎকৃষ্ট, পরম রমণীয় ও বেদস্বরূপ; ইহা আয়ুষ্কর ও যশস্কর; অতএব ইহা অবশ্যই শ্রোতব্য।
ষণ্ণবতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ইক্ষাকুবংশজাত রাজা মহাভিষ সত্যবাদী ও সত্যপরাক্রম ছিলেন। তিনি সহস্র অশ্বমেধ ও শতসংখ্যক রাজসূয় যজ্ঞ সম্পাদনপূর্ব্বক দেবরাজকে প্রসন্ন করিয়া চরমে পরমফল স্বর্গফল লাভ করিয়াছিলেন। অনন্তর একদিবস দেবগণ ভগবান্ কমলযোনির আরাধনা করিতেছেন, বহুসংখ্যক রাজর্ষি ও মহারাজ মহাভিষ তথায় উপবিষ্ট আছেন, এমন সময়ে সরিদ্বরা গঙ্গা ব্রহ্মার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তথায় উপস্থিত হইলেন। বায়ুবেগে সহসা তাঁহার অঙ্গবস্ত্র উড্ডীন হইল; তৰ্দ্দশনে দেবতারা লজ্জায় অধোমুখ হইয়া রহিলেন; কিন্তু রাজা মহাভিষ অসঙ্কুচিতচিত্তে, তাঁহার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে ব্রহ্মা সন্দিহান হইয়া কিয়ৎক্ষণ তাঁহার বিষয় চিন্তা করিয়া কহিলেন, তুমি দেবলোকের উপযুক্ত পাত্র নহ; অতএব মর্ত্যলোকে গিয়া জন্মগ্রহণ কর। কিন্তু পুনর্ব্বার তোমার স্বর্গলাভ হইবে। রাজা এই প্রকার দণ্ডিত হইয়া কাহার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিবেন তদ্বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিনি অনেক রাজর্ষি এবং মহর্ষিকে চিন্তা করিয়া রাজা প্রতীপের পুত্র হইতে মানস করিলেন। সরিদ্বরা মহাভিষকে অত্যন্ত অধৈর্য্য দেখিয়া তাঁহাকে মনে মনে চিন্তা করিতে করিতে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। পথিমধ্যে দেখিলেন, বসু নামক দেবগণ মূর্ছিত ও বিকলেন্দ্রিয় হইয়া পতিত রহিয়াছেন।
অনন্তর তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি নিমিত্ত এরূপ দুরাবস্থাগ্রস্ত হইয়াছ? তোমাদিগের কি কোন অনিষ্ট ঘটনা হইয়াছে? তাঁহারা কহিলেন, সরিদ্বরে। অতি সামান্য অপরাধে মহর্ষি বশিষ্ঠ ক্রুদ্ধ হইয়া আমাদিগকে অভিসম্পাত করিয়াছেন, তন্নিমিত্ত আমরা এইরূপ হইয়াছি। একদিবস সায়ংকালে ভগবান্ বশিষ্ঠ প্রচ্ছন্নবেশে উপবিষ্ট ছিলেন, আমরা অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত মহর্ষির যথাবিধি সম্মান না করিয়া প্রস্থান করিয়াছিলাম, এই অপরাধে তিনি ক্রোধান্বিত হইয়া আমাদিগকে "মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হও” বলিয়া অভিসম্পাত করিয়াছেন। তিনি সামান্য ব্যক্তি নহেন, সেই ব্রহ্মবাদীর বাক্য কদাপি অন্যথা হইবার নহে; অতএব আপনি নরকলেবর ধারণপূর্ব্বক ভূমণ্ডলে অবতীর্ণা হইয়া আমাদিগের সৃষ্টি বিধান করুন, নতুবা সামান্য মানুষীর গর্ভে আমরা জন্মগ্রহণ করিতে পারিব না। গঙ্গা বসুগণের প্রার্থনায় সম্মতা হইয়া তাহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন, মর্ত্যলোকে কোন্ মহাপুরুষ তোমাদিগের জনক হইতে পারেন? তাঁহারা কহিলেন, প্রতীপ রাজার ঔরসে শান্তনু নামে এক সুবিখ্যাত ভূপাল ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিবেন, তিনিই আমা-দিগের জনক হইবেন। গঙ্গা কহিলেন, তোমরা যাহা বলিলে উহা আমারও অভিমত বটে; অতএব তোমাদিগের অভিলষিত এবং সেই রাজার প্রিয়কার্য্য আমি অবশ্যই সম্পাদন করিব। বসুগণ পুনর্ব্বার কহিলেন, হে ত্রিপথগে! আপনার পুত্র জন্মিবা-মাত্র সলিলে নিক্ষেপ করিবেন, অধিককাল যেন তাহাদিগকে ভূর্লোকযন্ত্রণা সহ্য করিতে না হয়। গঙ্গা কহিলেন, তোমরা যাহা বলিলে আমি তাহাই করিব; কিন্তু যাহাতে রাজার একটি পুত্র জীবিত থাকে তাহার কোন উপায় স্থির কর। কারণ সেই পুত্রার্থী ভূপতির মৎসহবাস নিতান্ত নিষ্ফল হওয়া কোনক্রমেই বিধেয় নহে। তখন বসুগণ কহিলেন, আমরা স্ব স্ব বীর্য্যের চতুর্থ ভাগের অর্দ্ধাংশ প্রদান করিব, তাহাতেই তাঁহার পুত্রলাভহইবে। কিন্তু সেই পুত্রের মর্ত্যলোকে সন্তানসন্ততি হইবে না; অতএব হে ত্রিপথগামিনি। আপনার সেই মহাবল পরাক্রান্ত পুত্র অপুত্র হইবেন। বসুদেবতারা, সরিদ্বরা গঙ্গার নিকট এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া নিজ নিজ অভীষ্ট প্রদেশে গমন করিলেন।
সপ্তনবতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর সর্ব্বভূতহিতৈষী প্রতীপ পৃথিবীর অধিরাজ হইলেন। তিনি যে স্থান হইতে ভাগীরথী প্রবাহিতা হইতেছেন, তথায় গমন করিয়া তপোনুষ্ঠানদ্বারা অনল্পকাল অতিবাহিত করিলেন। একদা সুরধুনী রাজার রূপ ও গুণে মোহিত হইয়া স্ত্রীরূপ ধারণপূর্ব্বক জলমধ্য হইতে গাত্রোত্থান করিয়া ধ্যানপর রাজর্ষির দক্ষিণ উরুদেশে উপবেশন করিলেন। মহীপাল প্রতীপ সেই বরবর্ণিনীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কল্যাণি! তুমি কি নিমিত্ত এখানে আগমন করিয়াছ? তোমার কি প্রিয় কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে? তিনি কহিলেন, মহারাজ! আমি অন্য কোন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা করি না, কেবল আমার অভিলাষ পূর্ণ করুন; প্রণয়াকাঙ্ক্ষিণী রমণীকে প্রত্যাখ্যান করা অতি গর্হিত কৰ্ম্ম। প্রতীপ কহিলেন, হে বরবর্ণিনি। আমি ব্রতে দীক্ষিত হইয়াছি, অতএব পরপরিগ্রহে' অথবা সবর্ণা স্ত্রীতে গমন করিতে পারিব না; তাহা করিলে আমাকে অধৰ্ম্মস্পৃষ্ট হইতে হইবে। দেবী কহিলেন, মহারাজ। আমি অগম্যা অথবা নিন্দনীয়া নহি, আমা হইতে কোন প্রকার অনিষ্টাশঙ্কা করিবেন না, আমি দিব্যাঙ্গনা, আপনার প্রণয় পাশে আকৃষ্টা হইয়া অভি-গমন করিয়াছি, অতএব আমাকে ভজনা করুন; পরকলত্র'বোধে প্রত্যাখ্যান করিবেন না। প্রতীপ কহিলেন, তুমি প্রিয়বোধে যে বিষয়ে আমাকে উৎসাহ দিতেছ, আমি তাহাতে নিবৃত্ত হইয়াছি। এক্ষণে যদি তোমার প্রবর্ত্তনাপরতন্ত্র হইয়া সেই অসাধুকার্য্যে প্রবৃত্ত হই, তাহা হইলে ধৰ্ম্মবিপ্লব আমাকে উৎসন্ন করিবে সন্দেহ নাই। বিশেষতঃ তুমি কামিনীভোগ্য বামোরু পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পুত্র ও পুত্রবধূসেব্য দক্ষিণ উরুদেশে উপবেশন করিয়া আমার পুত্রবধূস্থানীয়া হইয়াছ, অতএব কিরূপে তোমাকে পত্নী বলিয়া স্বীকার করিতে পারি। তুমি মুষা'ভোগ্য দক্ষিণোরু আশ্রয় করিয়াছ, এই নিমিত্ত আমার পুত্রবধূ হইলে। আমি অঙ্গীকার করিতেছি, আমার পুত্রের সহিত তোমার বিবাহ দিব। এক্ষণে পরিণয়ার্থে বরণ করিয়া রাখিলাম। স্ত্রী কহিলেন, মহারাজ! আপনি সসাগরা বসুন্ধরার অধীশ্বর। পৃথিবীস্থ সমস্ত রাজমণ্ডল আপনার অধীন। ত্বদীয় সদ্গুণাবলী শত শত বৎসর নিরন্তর কীর্ত্তন করিলে তাহার অবধি লাভ হয় না; অতএব আপনার আজ্ঞা সর্ব্বতোভাবে অলঙ্ঘনীয়। কেবল আপনার প্রতি অবিচলিত ভক্তি ও প্রীতিনিবন্ধন আমি ভরতকূলের কামিনী হইতে বাসনা করিয়াছি। কিন্তু মহারাজ। আমি যে সকল কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব, তদ্বিষয়ে আপনার পুত্র বানিষ্পত্তি' করিতে পারিবেন না। যদ্যপি তিনি আমার সহিত এইরূপ ব্যবহার করেন, তাহা হইলে আমি তাঁহার প্রীতিবন্ধনপূর্ব্বক কালযাপন করিব এবং তিনিও আমার গর্ভে পুত্র উৎপাদন করিয়া পরিশেষে স্বর্গপ্রাপ্ত হইবেন। এই কথা বলিয়া স্ত্রীরূপধারিণী গঙ্গা অন্তর্হিতা হইলেন।
মহারাজ প্রতীপ পুত্রজন্ম প্রতীক্ষায় কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে ক্ষত্রিয়াগ্রণী প্রতীপ সস্ত্রীক হইয়া অনুরূপ পুত্রলাভার্থ তপস্যা করিতে আরম্ভ করিলেন। উল্লিখিত মহাভিয সেই বৃদ্ধ দম্পতির পুত্র হইলেন। শান্তিপর রাজার সন্তান হইল বলিয়া তাঁহার নাম শান্তনু হইল। শান্তনু জন্মান্তরীণ অক্ষয় - স্বর্গ স্মরণ করিয়া নিরন্তর কেবল সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠানেই তৎপর হইলেন। তিনি তরুণাবস্থা প্রাপ্ত হইলে প্রতীপ তাঁহাকে আদেশ করিলেন, পূর্ব্বে এক দিব্যাঙ্গনা তোমার উৎপাদনার্থে মৎসকাশে আগমন করিয়াছিলেন; যদি সেই রূপলাবণ্যবতী বরবর্ণিনী পুত্রার্থিনী হইয়া তোমার নিকট আগমন করেন, তাহা হইলে তুমি কোন বিচার না করিয়া তাঁহার পাণিগ্রহণ করিও, আমি অনুমতি করিতেছি। আর তোমাকে তাঁহার চিত্তানুবর্তন করিতে হইবে। তিনি যখন যে কার্য্য করিবেন, তাহা বাস্তবিক গর্হিত হইলেও তুমি কিঞ্চিন্মাত্র রোষ বা অসন্তোষ প্রকাশ করিও না।
প্রতীপ স্বীয় পুত্র শান্তনুকে এইরূপ উপেদশ প্রদানান্তর তাঁহাকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া অরণ্যে গমন করিলেন, অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন রাজা শান্তনু অত্যন্ত মৃগয়াশীল হইয়া উঠিলেন এবং মৃগয়াসক্ত হইয়া নানা বন ও উপবন পর্য্যটন করিতে লাগিলেন। তিনি প্রতিদিন অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক মৃগ মহিষ প্রভৃতি নানা জাতীয় বন্যপশুর প্রাণসংহার করিয়া পরিশেষে একাকী সিদ্ধচারণগণ পরিবেষিত ভাগীরথীতীরে উপনীত হইতেন। একদিবস মৃগয়া হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর ন্যায় উজ্জ্বলতনু পরমসুন্দরী এক রমণীকে তরঙ্গিণীতীরে নিরীক্ষণ করিলেন। সেই কামিনীর সুললিত নবযৌবন, রমণীয় দশনচ্ছদ', মনোহর বেশভূষা, সূক্ষ্ম পরিধেয় বস্ত্র ও পদ্মোদরসদৃশ রুচির বর্ণ নয়নগোচর করিয়া রাজা বিস্মিত ও চমৎকৃত হইলেন। কণ্টকিত-কলেবর হইয়া সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে বারংবার তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহার নয়নযুগল পরিতৃপ্ত হইল না। তিনি ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই বিলাসিনীও তদীয় প্রণয়াসক্ত হইয়া অবিতৃপ্ত নয়নে রাজার প্রতি পুনঃ পুনঃ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন।
অনন্তর রাজা তাঁহাকে মধুরবাক্যে প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে কৃশাঙ্গি। দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরাঃ, যক্ষ, পন্নগ ও মনুষ্য, ইহার মধ্যে তুমি কোন্ জাতিকে অলঙ্কৃত করিয়াছ? আমার বাসনা হয়, তোমার পাণিগ্রহণপূর্ব্বক তোমার সহবাসে যৌবনকাল চরিতার্থ করি।
অষ্টনবতিতম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, সেই হৃদয়ানন্দদায়িনী প্রমদা রাজার এই সস্মিত মৃদুমধুর বাক্য শ্রবণ করিয়া এবং বসুগণের নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তাহা স্মরণ করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি আপনার মহিষী হইয়া চিত্তানুবর্তন করিব; কিন্তু যে সমস্ত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিব, তাহা ভালই হউক, বা মন্দই হউক, তদ্বিষয়ে আমাকে নিবারণ করিতে পারিবেন না এবং তন্নিমিত্ত আমার প্রতি কোন অপ্রিয়বাক্য প্রয়োগ করিতে পারিবেন না। যদি এইরূপ ব্যবহারে কালযাপন করিতে সম্মত হয়েন, তবে আপনার সহবাস করিব; মৎকৃত কার্য্যের ব্যাঘাত জন্মাইলে অথবা আপনি তন্নিমিত্ত বিরক্ত হইয়া অপ্রিয় কথা বলিলে তৎক্ষণাৎ আপনাকে পরিত্যাগ করিব, সন্দেহ নাই। রাজা এই নিয়মে সম্মত ও অঙ্গীকৃত হইলেন। গঙ্গা শান্তনুকে এইরূপে বচনবদ্ধ করিয়া পরম পরিতুষ্টা হইলেন। মহীপতিও সেই অলোকসামান্য সৌন্দর্য্যসম্পন্ন স্ত্রীরত্বলাভে যৎপরোনাস্তি প্রীত হইয়া পূর্ব্বকৃত নিয়মানুসারে কালযাপন করিতে লাগিলেন এবং নানাবিধ উপচার দ্বারা নিরন্তর তাঁহার সন্তোষোৎপাদনে যত্নবান্ হইলেন। ত্রিপথ-গামিনী গঙ্গা রমণীয় কলেবর ধারণপূর্ব্বক পরম ভাগ্যবান্ শান্তনু রাজার মহিষী হইয়া মনোহর হাব, ভাব, বিলাস ও সম্ভোগাদি দ্বারা নরেন্দ্রের মন মোহিত করিলেন। ফলতঃ রাজা মহিষীর সদ্গুণে এমন আকৃষ্ট হইয়াছিলেন যে, ক্ষণকালও তাঁহার অদর্শনক্লেশ সহ্য করিতে পারিতেন না। রাজ্ঞীর সম্ভোগ-সুখে কত কত সংবৎসর ঋতু ও মাসাদি মুহূৰ্ত্তবৎ অতীত হইত, তিনি কিছুমাত্র জানিতে পারিতেন না।
এইরূপে কিয়ৎকাল অতীত হইলে রাজমহিষী ক্রমে ক্রমে অমরসদৃশ আটটি পুত্র প্রসব করিয়াছিলেন। পুত্রেরা ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র তিনি তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে স্রোতে নিক্ষিপ্ত করিতেন, তৎকালে রাজাকে এই বলিয়া আশ্বাস প্রদান করিতেন যে, "আমি আপনাকে প্রসন্ন করিব।" রাজা তদ্দর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু কি জানি, পাছে গঙ্গা তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া যান এই ভয়ে ভীত হইয়া বাংনিষ্পত্তি করিতে পারিতেন না।
অনন্তর অষ্টম পুত্র ভূমিষ্ঠ হইলে মহিযী হাসিতে লাগিলেন। রাজা পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর হইয়াছিলেন, অতএব এবার পুত্রটি জীবিত থাকে, এই আশয়ে পত্নীকে কহিলেন, পুত্র বিনষ্ট করিও না; তুমি কে? কি নিমিত্ত আত্মজদিগের প্রাণবধ করিতেছ? হে পুত্রঘাতিনি। পুত্রহিংসা অপেক্ষা আর গুরুতর পাপ কিছুতেই নাই; শাস্ত্রে কথিত আছে, উহা মহাপাতক; অতএব এই গর্হিত নিষ্ঠুরাচরণে ক্ষান্ত হও।
তখন সেই স্ত্রী কহিলেন, হে পুত্রকাম। আমি তোমার পুত্র বিনষ্ট করিব না; এক্ষণে পূর্ব্বকৃত নিয়ম স্মরণ কর, আমি অদ্যাবধি তোমার সহবাস পরিত্যাগ করিলাম। আমি মহর্ষি জহ্নুর কন্যা, আমার নাম গঙ্গা। ঋষিগণ সর্ব্বদাই আমার সেবা করিয়া থাকেন। কেবল দেবকার্য্য সাধনার্থ তোমার ভার্য্যা হইয়াছিলাম। আর এই সমস্ত সন্তানগুলিকে সামান্য মনুষ্য জ্ঞান করিও না; ইঁহারা মহাতেজা বসুগণ, মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপে মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তোমা ভিন্ন পৃথিবীতে আর কোন পুরুষ ইঁহাদিগের পিতা হইবার যোগ্য হইতে পারেন না এবং আমা ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীও ইঁহাদিগের জননী হইবার যোগ্য নহে; এই নিমিত্ত আমি মানুষী হইয়া ইঁহাদিগকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলাম। আর তুমিও ইঁহাদিগের জনক হইয়া অক্ষয় লোক সকল জয় করিয়াছ। আমি ইঁহাদিগের নিকট অঙ্গীকার করিয়াছিলাম যে, আমার গর্তে পুত্র জন্মিবামাত্র আমি সেই পুত্রকে মনুষ্যলোক হইতে মুক্ত করিব। ইঁহারা মহাত্মা বশিষ্ঠের অভিসম্পাত হইতে মুক্ত হইলেন এবং আমিও প্রতিজ্ঞাসাগর হইতে উত্তীর্ণ হইলাম; অতএব এক্ষণে স্বস্থানে প্রস্থান করি, আপনার মঙ্গল হউক। মদগর্ভজাত এই পুত্রটিকে গঙ্গাদত্ত বলিয়া গ্রহণ ও পালন করুন। আমি এইরূপে বসুগণের সন্নিধানে বাস করিয়াছিলাম।
নবনবতিতম অধ্যায়।
শান্তনু জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সুরনদি! বশিষ্ঠ কে?
বসুদেবতারা কি দুষ্কর্ম করিয়াছিলেন যে, তাঁহারা মহর্ষি বশিষ্ঠের শাপে মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হইলেন এবং আপনাকর্তৃক প্রদত্ত এই পুত্র কি অপরাধ করিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে যাবজ্জীবন মনুষ্য-লোকে বাস করিতে হইবে? আর বসুগণই বা সর্ব্বলোকের অধীশ্বর হইয়া কি নিমিত্ত মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হইলেন? তাহা সবিশেষ বর্ণন কর। জাহ্নবী কহিলেন, মহারাজ। শ্রবণ করুন। মহর্ষি বশিষ্ঠ বরুণদেবের পুত্র। তাঁহার আর একটি নাম আপব। তিনি গিরিবর সুমেরুর সন্নিহিত এক পরম রমণীয় অরণ্যে তপস্যা করিতেন। সেই তপোবন সকল ঋতুতেই নানা জাতীয় কুসুম-সমূহে বিকসিত হইয়া থাকে এবং পশুপক্ষিগণ অসঙ্কুচিতচিত্তে সর্ব্বদাই ইতস্ততঃ বিচরণ করে। সেই আশ্রমপদ স্বচ্ছজল জলাশয়ে অলঙ্কৃত এবং অশেষ প্রকার সুস্বাদ ফল মূলে পরিপূর্ণ।
দক্ষপ্রজাপতির নন্দিনীনাম্নী এক সুরভী ছিলেন। সেই সর্ব্বকামপ্রদা সুরভী জগতের হিতার্থে গোরূপ ধারণ করিয়া কশ্যপের ঔরসে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া মহাতপা বশিষ্ঠের হোমধেনু হয়েন। তিনি মুনিজনসেবিত সেই পরম রমণীয় তপোবনে নির্ভয়ে বিচরণ করিতেন। একদা পৃথু প্রভৃতি বসু দেবতারা বনবিহারার্থে সস্ত্রীক হইয়া তথায় আগমন করিলেন। তাঁহারা স্ব স্ব পত্নী সমভিব্যাহারে তত্রত্য সুরম্য পর্ব্বতে ও বনে বনে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তন্মধ্যে কোন বসুপত্নী তথায় ভ্রমণ করিতে করিতে সেই নন্দিনীনাম্নী ধেনুকে নয়নগোচর করিয়া বিস্মিত ও চমৎকৃত হইলেন। পরে দ্যুনামক বসুকে সর্ব্বলক্ষণা-ক্রান্তা, পীনোপ্পী', সুদোগ্ধী', সুন্দরবালধিত ও বিচিত্র-খুরবিশিষ্টা সেই ধেনু দর্শন করাইলেন। দ্যু, নন্দিনীকে নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার অশেষপ্রকার গুণকীর্ত্তনপূর্ব্বক দেবীকে কহিলেন, দেবি! যে মহর্ষির এই তপোবন, নন্দিনী সেই বারুণির হোমধেনু। মর্ত্যলোকনিবাসী যে ব্যক্তি এই ধেনুর সুস্বাদ দুগ্ধ পান করেন, তিনি দশ সহস্র বৎসর স্থিরযৌবন হইয়া জীবিত থাকেন। এই কথা শ্রবণ করিয়া বসুপত্নী আপন স্বামীকে কহিলেন, মহাভাগ! মর্ত্যলোকে জিতবতী নাম্নী আমার এক প্রিয়সখী আছেন। সেই রূপবতী যুবতী রাজা উশীনরের দুহিতা। তাঁহার অসামান্য রূপলাবণ্য পৃথিবীমধ্যে সর্ব্বত্র সুবিখ্যাত আছে। আমি অভিলাষ করি, আপনি সত্বর হইয়া তাঁহার নিমিত্ত বৎসের সহিত ঐ ধেনুকে আনয়ন করুন। তিনি উহার দুগ্ধপান করিয়া যাবজ্জীবন অজরা ও অরোগিণী হইয়া থাকিবেন, ইহার পর আহ্লাদের বিষয় আর কি আছে? হে নাথ! আমার অভিলষিত সম্পাদনে তৎপর হওয়া আপনার সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। দ্যু, পত্নীবাক্য শ্রবণ করিয়া পৃথু প্রভৃতি ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে সেই ধেনু ও তাহার বৎস অপহরণ করিলেন।
ভার্য্যার প্রবর্তনাপরতন্ত্র হইয়া মহর্ষির অসামান্য-তপঃপ্রভাব সবিশেষ পর্যালোচনা না করিয়া ধেনু অপহরণ করিলেন বটে, কিন্তু তন্নিমিত্ত যে ঘোরতর অনিষ্টপাত হইবে, তাহা কিঞ্চিন্মাত্র বিবেচনা করিলেন না।
অনন্তর তপোধন বারুণি ফলমূল আহরণ করিয়া আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। তিনি তথায় ধেনু ও তাহার বৎসকে না দেখিয়া ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন; কিন্তু কুত্রাপি দেখিতে পাইলেন না। পরিশেষে জ্ঞানচক্ষুঃ উন্মীলন করিয়া দেখিলেন, অদ্য বসুদেবতারা এই বনে বিহার করিতে আসিয়া তাঁহার ধেনু অপহরণপূর্ব্বক প্রস্থান করিয়াছেন। তখন ঋষি ক্রোধপরবশ হইয়া বসুগণকে অভিসম্পাত করিলেন "যেহেতু তোমরা আমার সর্ব্বলক্ষণাক্রান্ত ধেনু অপহরণ করিয়াছ, অতএব মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হইবে।" মহাপ্রভাব ব্রহ্মর্ষি সাতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বসুগণকে এই প্রকার শাপ প্রদান করিয়া পুনর্ব্বার তপঃসাধনে মনোনিবেশ করিলেন। এদিকে বসুদেবতারা আপন আপন আশ্রমে উপস্থিত হইয়া মহর্ষি বশিষ্ঠ তাঁহাদিগকে অভিসম্পাত করিয়াছেন, ইহা জানিতে পারিলেন। পরে তাঁহাকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত তৎক্ষণাৎ তাঁহার সন্নিধানে গমন করিলেন। ঋষির ক্রোধানল নির্ব্বাণ করিবার নিমিত্ত নানাপ্রকার স্তব স্তুতি করিতে লাগিলেন, কিন্তু কোনক্রমেই তাঁহার অনুগ্রহ লাভ করিতে পারিলেন না। মহর্ষি কহিলেন, আমি ক্রোধপরতন্ত্র হইয়া যাহা কহিয়াছি তাহার অন্যথা করিতে পারিব না, তবে এইমাত্র বলিতে পারি যে, তোমরা সকলেই প্রতি সংবৎসর শাপমুক্ত হইবে; কিন্তু যাঁহার নিমিত্ত অভিশপ্ত হইয়াছ, তাঁহাকে স্বকৃত দুষ্কর্মের ফলভোগ করিবার নিমিত্ত যাবজ্জীবন মনুষ্যলোকে কালযাপন করিতে হইবে। তাঁহাকে সামান্য মনুষ্যের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে না। তিনি পরম ধার্মিক, সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ ও পিতৃহিতৈষী হইয়া অকিঞ্চিৎকর দারপরিগ্রহ প্রভৃতি পার্থিব সুখসম্ভোগে পরাজুখ হইবেন। ঋষি এই কথা বলিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলে বসুগণ আমার নিকট আসিয়া প্রার্থনা করিলেন; "গঙ্গে! আপনি আমাদিগকে গর্ভে ধারণ করুন, আর আমরা ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র আপনি আমাদিগকে সলিলে নিক্ষেপ করিবেন।” অতএব হে মহারাজ! অভিশপ্ত বসুদেবতাদিগকে মনুষ্যলোক হইতে ঝটিতি মুক্ত করিবার নিমিত্ত আমি পুত্রহত্যারূপ অকার্য্য সম্পাদন করিয়াছি। কেবল একমাত্র দ্যু, সেই মহর্ষির শাপে যাবজ্জীবন মনুষ্যলোকে বাস করিবেন। দেবী এই কথা বলিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। রাজা তৎপ্রদত্ত পুত্র লইয়া শোকার্ত ও বিষগ্রমনে ভবনে প্রত্যাগমন করিলেন।
সেই পুত্রের নাম দেবব্রত ও গাঙ্গেয় হইল। দেবব্রত, পিতা অপেক্ষা অধিকতর গুণসম্পন্ন হইলেন। আমি সেই মহাপুরুষের গুণরাশি কীর্ত্তন করিব এবং মহাত্মা ভারত ভূপতির সৌভাগ্য বর্ণন করিব, যাঁহার ইতিহাস পবিত্র মহাভারত নামে বিখ্যাত হইয়াছে।
শততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, রাজা শান্তনু পরম প্রাজ্ঞ, পরম ধার্মিক ও পরম ধীমান ছিলেন। জিতেন্দ্রিয়তা দয়ালুতা প্রভৃতি সদ্গুণসকল তাঁহাকে অলঙ্কৃত করিয়াছিল। মহারাজ শান্তনু দেবর্ষি ও রাজর্ষিগণের সম্মানভাজন, ধীরপ্রকৃতি, ক্ষমাবান্, দানশীল ও সত্যবাদী বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন এবং সেই সর্ব্ব-গুণাস্পদ, ধর্মার্থকুশলী, রাজা ভরতবংশের ও অন্যান্য জন-গণের পরিরক্ষক ছিলেন। চক্রবর্তীর' সমুদায় লক্ষণ তাঁহার অঙ্গে লক্ষিত হইত। তিনি অদ্বিতীয় ধৰ্ম্মপরায়ণ ছিলেন। তাঁহার ন্যায় ধার্মিক রাজা কখন কাহারও দৃষ্টিগোচর হয় নাই। তদানীন্তন লোকেরা সেই কীর্তিমানের সদাচার ও সদ্ব্যবহার দর্শন করিয়া অর্থ ও কাম পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল একমাত্র ধর্মোপাসনাব্রতে ব্রতী হইয়াছিলেন। নৃপগণ শান্তনুর লোকাতি-শায়িনী ধার্মিকতা দেখিয়া তাঁহাকে সম্রাপদে অভিষিক্ত করিলেন তাঁহা-দিগের শোক, ভয় ও গ্রহপীড়া প্রভৃতির আশঙ্কা ছিল না। তাঁহারা সুস্বপ্নে' নিশাবসান করিয়া শয্যা হইতে পরমসুখে গাত্রোত্থান করিতেন। সেই দেবেন্দ্র-প্রতিম রাজেন্দ্রের দৃষ্টান্তে নৃপতিগণ, সকলের প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন করিতে লাগিলেন এবং বদান্য ও যাগশীল হইয়া উঠিলেন। শান্তনুপ্রমুখ রাজগণ নিয়মতন্ত্র হইয়া সুশৃঙ্খলপূর্ব্বক রাজ্যশাসন করিতে আরম্ভ করিলেন। লোকের ধর্মপ্রবৃত্তির ক্রমশঃ উন্নতি হইতে লাগিল; ক্ষত্রিয়েরা বিপ্রসেবায় তৎপর হইলেন; বৈশ্যেরা ক্ষত্রিয়সেবায় দীক্ষিত হইলেন এবং শূদ্রেরা ব্রাহ্মাণ, বৈশ্য ও ক্ষত্রিয় তিন বর্ণের সেবায় নিযুক্ত হইলেন। রাজা শান্তনু কৌরবদিগের সুরম্য রাজধানী হস্তিনাপুরে অবস্থানপূর্ব্বক রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। তিনি ধৰ্ম্মজ্ঞ, সত্যবাদী, ঋজুস্বভাব, বদান্য, তপোনিরত, রাগদ্বেষশূন্য, পরম সুন্দর ও প্রিয়দর্শন ছিলেন। তিনি প্রতাপে তপনের ন্যায়, বেগে বায়ুর ন্যায়, কোপে যমের ন্যায় এবং সহিষ্ণুতায় পৃথিবীর ন্যায় ছিলেন। সেই সর্ব্বগুণাকর ভূপাল সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলে লোকের জিঘাংসাপ্রবৃত্তি' সম্যরূপে নিবৃত্তি পাইয়াছিল এবং বৃথাহিংসা এককালে রহিত হইয়াছিল। তিনি পক্ষপাত-পরিশূন্য ও কামরাগপরিবর্জিত হইয়া অতি বিনীতভাবে সেই ধর্মোত্তর' রাজ্যে সকল প্রাণীকে নির্বিশেষে শাসন করিতে লাগিলেন; দেবর্ষি ও পিতৃলোকের তৃপ্ত্যর্থে যাগাদি ক্রিয়াকলাপ করিতে আরম্ভ করিলেন; দীন, দরিদ্র, অনাথ প্রভৃতির ও নিকৃষ্ট প্রাণিগণের পিতাস্বরূপ ছিলেন। সেই কুরুপতি রাজ্যেশ্বর হইলে লোকের মন দানধৰ্ম্মে প্রবল হইল এবং বাক্য একমাত্র সত্যকে আশ্রয় করিল। তিনি পত্নীসহবাস পরিত্যাগপূর্ব্বক চত্বারিংশৎ বৎসর বনবাস করিয়া-ছিলেন। গঙ্গাগর্ন্তসম্ভূত তৎপুত্র দেবব্রত রূপ, গুণ, আচার, ব্যবহার, বিদ্যা, বুদ্ধি প্রভৃতি কোন বিষয়েই পিতা অপেক্ষা ন্যূন ছিলেন না। তিনি সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ, মহাবল-পরাক্রান্ত, মহাসত্ত্ব ও মহারথ ছিলেন। একদিবস দেবব্রত একটি মৃগকে বাণবিদ্ধ করিয়া তাহার অনুসরণক্রমে ভাগীরথীতীরে উপনীত হইয়া শরজালে নদীর জল শুষ্কপ্রায় করিয়া ফেলিলেন। রাজা শান্তনু সরিদ্বরার এইরূপ অদৃষ্টপূর্ব্ব গতিরোধদর্শনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, "অদ্য গঙ্গা পূর্ব্বের ন্যায় প্রবাহিত হইতেছেন না কেন?” অনন্তর কারণ-জিজ্ঞাসু হইয়া অনুসন্ধান করিতে করিতে দেখিলেন দেবরাজসদশ এক পরম রূপবান্ কুমার তীক্ষ্ণধার অসংখ্য দিব্যাস্ত্রদ্বারা গঙ্গাকে আচ্ছন্ন করিয়া দণ্ডায়মান আছেন। এই অলৌকিক ব্যাপার নয়নগোচর করিয়া রাজা বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাঁহাকে অতীব শৈশবাবস্থায় দেখিয়াছিলেন, সুতরাং এক্ষণে আত্মজ বলিয়া চিনিতে পারিলেন না। দেবব্রত পিতাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন, কিন্তু কি জানি পাছে রাজা তাঁহাকে স্বীয় পুত্র বলিয়া জানিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইলেন।
রাজা শান্তনু এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহাকে আপন পুত্র বিবেচনায় গঙ্গাকে দেখাইতে কহিলেন। গঙ্গা মনোহর রূপ ধারণ করিয়া কুমারের দক্ষিণ হস্ত গ্রহণপূর্ব্বক রাজাকে দর্শন করাইলেন। পরম রমণীয় বেশভূষায় ভূষিতা ও পরিষ্কৃত বস্ত্রে সংবৃতাঙ্গী গঙ্গা দৃষ্টপূর্ব্বা হইলেও রাজা তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন না।
গঙ্গা কহিলেন, মহারাজ! আপনি পূর্ব্বে আমার নিকট যে অষ্টম পুত্র প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, ইনিই সেই মহাপুরুষ। অধুনা ইনি সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ও সর্ব্বোৎকৃষ্ট হইয়াছেন। আমি ইঁহাকে পরিবর্দ্ধিত করিয়াছি। এক্ষণে পুত্রকে গৃহে লইয়া যাউন। ইনি বশিষ্ঠের নিকট বেদ বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিয়াছেন। এই মহাবল পরাক্রান্ত কুমার কৃতাস্ত্র, অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর ও ইন্দ্রের ন্যায় যোদ্ধা হইয়াছেন। ইনি সুরাসুরগণের পরম প্রণয়াস্পদ। দৈত্যকুলগুরু শুক্রাচার্য্য যে সকল শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছেন, তৎসমুদায়ই ইঁহার কণ্ঠস্থ। সুরাসুরনমস্কৃত বৃহস্পতি যে সকল শাস্ত্র পরিজ্ঞাত আছেন, ইনিও তৎসমুদায় অধ্যয়ন করিয়াছেন। শত্রুবর্গের দুরাক্রম্য, মহাবল, প্রবলপ্রতাপ মহর্ষি জামদগ্ন্য যে সকল অস্ত্র শিক্ষা করিয়াছিলেন, এই পুত্র তৎসমুদায়ে সুশিক্ষিত হইয়াছেন এবং রাজধর্মে ও অর্থচিন্তায় সুনিপুণ হইয়াছেন; অতএব মৎপ্রদত্ত এই অশেষগুণসম্পন্ন পুত্র সমভিব্যাহারে গৃহে গমন করুন।
রাজা গঙ্গাকর্তৃক এইরূপ অদিষ্ট হইয়া সূর্য্যের ন্যায় দীপ্তিমান্ পুত্রকে লইয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করিলেন। রাজা শান্তনু পুত্রসমভিব্যাহারে অমরাবতীসদৃশ নিজ রাজধানীতে উপনীত হইয়া চরিতার্থ ও কৃতাৰ্থৰ্ম্মন্য হইলেন। অনন্তর বন্ধু-বান্ধবগণকে আহ্বান করিয়া রাজ্যের কুশলের নিমিত্ত সেই সর্ব্বগুণান্বিত পুত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুবরাজ সদ্ব্যবহার প্রদর্শন দ্বারা পিতাকে, কৌরবদিগকে এবং জনপদস্থ সমস্ত ব্যক্তিকে যৎপরোনাস্তি প্রীত করিলেন। রাজা প্রীতমনে পুত্রের সহিত চারি বৎসর পরমসুখে কালযাপন করিয়া পরিশেষে একদিবস যমুনানদীর উভয়পার্শ্বস্থিত এক অরণ্যে গমন করিলেন। তথায় অকস্মাৎ সৌরভের আঘ্রাণ পাইলেন; কিন্তু কোথা হইতে সেই সুরভি গন্ধ সঞ্চারিত হইতেছে, সবিশেষ না জানিতে পারিয়া ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। অনন্তর অসিতলোচনা দেবরূপধারিণী এক ধীবরকন্যাকে নিরীক্ষণ করিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভীরু! তুমি কে? কাহার পত্নী? এবং কি নিমিত্তই বা এখানে আসিয়াছ? সে কহিল, মহাশয়! আমি ধীবর-কন্যা, পিতার আদেশে তরণী বাহন করিয়া থাকি। রাজা শান্তনু ধীবরকন্যার অনুপম রূপমাধুরী | সন্দর্শনে ও অঙ্গসৌরভ আঘ্রাণে মোহিত হইয়া তাহাকে বিবাহ করিবার মানসে তাহার পিতার নিকট গমনপূর্ব্বক আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন।
দাশরাজ কহিলেন, হে প্রজানাথ। যখন কন্যা জন্মিয়াছে, অবশ্যই তাহাকে পাত্রসাৎ করিতে হইবে; আপনি সত্যবাদী, যদ্যপি এই কন্যাটি ধর্মপত্নীরূপে প্রার্থনা করেন, তবে আমি আপনাকে সম্প্রদান করিব; কিন্তু আমার একটি অভিলাষ আছে, তাহা পূর্ণ করিব বলিয়া অগ্রে স্বীকার করিতে হইবে।
শান্তনু কহিলেন, হে ধীবর। তোমার অভিলাষ শ্রবণ না করিয়া কিরূপে তাহাতে সম্মত হইতে পারি? যদি অভিলষিত বিষয় দানযোগ্য হয়, নিশ্চয়ই প্রদান করিব; কিন্তু অদেয় হইলে কোনক্রমেই দিতে পারিব না। ধীবর কহিলেন, মহারাজ! এই কন্যার গর্তে যে পুত্র জন্মিবে, আপনার অবর্তমানে সেই পুত্র রাজ্যে অভিষিক্ত হইবে; অন্য কেহ সিংহাসনে অধিরূঢ় হইতে পারিবে না, এই আমার অভিলাষ। রাজা প্রদীপ্ত মদনানলে দগ্ধ হইয়াও ধীবরকে বরদান করিতে সম্মত হইলেন না। তিনি অনঙ্গশরে বিচেতনপ্রায় হইয়া ধীবরকুমারীর অনুপম রূপলাবণ্য চিন্তা করিতে করিতে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর একদিবস দেবব্রত পিতার নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে শোকার্ত ও চিন্তাকুল দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তাত! আপনার সর্ব্বত্র কুশল ও সমুদায় রাজমণ্ডল আপনার অধীন, তথাপি কি নিমিত্ত নিরন্তর আপনাকে এরূপ শোকার্ত ও দুঃখিত দেখিতেছি? সর্ব্বদাই যে শূন্যহৃদয়ে রহিয়াছেন, আমাকে পুত্র বলিয়া সম্ভাষণ করিতেছেন না, অশ্বারোহণপূর্ব্বক ভ্রমণ করেন না, কেবল দিন দিন মলিন, পাণ্ডুবর্ণ ও কৃশ হইতেছেন; অতএব আপনার কি রোগ হইয়াছে, আজ্ঞা করুন, আমি তাহার প্রতীকার করিব।
পুত্রের কথা শ্রবণ করিয়া শান্তনু কহিলেন, বৎস! আমি যে নিমিত্ত এত উৎকণ্ঠিত হইয়াছি, তাহা শ্রবণ কর। আমাদিগের বংশে তুমিই একমাত্র পুত্র, তুমি অস্ত্রশস্ত্রে সুশিক্ষিত ও পুরুষকার-বিশিষ্ট হইয়াছ। কিন্তু হে পুত্র! মনুষ্যের কিছুই চিরস্থায়ী নহে। ইহা বড় আক্ষেপের বিষয়। কারণ যদি তোমার কোন অনিষ্ট ঘটনা হয়, তাহা হইলে আমাদিগের কুল নির্মূল হইবে, সন্দেহ নাই। তুমি একশত পুত্র অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, অতএব আর বৃথা দারপরিগ্রহ করিতে আমার অভিলাষ নাই; কিন্তু ধর্মবাদীরা কহিয়া থাকেন, যাহার এক পুত্র তিনি অপুত্রমধ্যেই পরিগণিত। তদীয় অনিষ্টশান্তির নিমিত্ত নিরন্তর পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, তিনি তোমার মঙ্গলবিধান করুন; অগ্নিহোত্র, ত্রয়ী' এবং নিখিল শাস্ত্র, কিছুই সন্তানের ষোড়শাংশেরও তুল্য নহে। তুমি মহাবলপরাক্রান্ত, সর্ব্বদা সশস্ত্র ও অমর্ষপরিপূরিত'; অতএব রণক্ষেত্র ব্যতিরেকে কুত্রাপি তোমার নিধন হইবে না; কিন্তু বৎস। অধিক কি বলিব, আমি তোমার যৎপরোনাস্তি সংশয়ারূঢ় হইয়াছি, অন্তঃকরণ কিছুতেই সুস্থির হয় না, তন্নিমিত্ত আমি এই অপার দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইয়াছি। মহানুভব দেবব্রত, রাজার বিষাদকারণ সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া ক্ষণকাল বিবেচনা করিলেন। অনন্তর পিতার পরমহিতৈষী বৃদ্ধ সচিবের সন্নিধানে সত্বর গমনপূর্ব্বক রাজার শোকবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। মন্ত্রিবর কৌরবশ্রেষ্ঠ দেবব্রতকে ধীবরকুমারী-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন। দেবব্রত মন্ত্রি-প্রমুখাৎ সমুদায় শ্রবণ করিয়া ক্ষত্রিয়গণ সমভিব্যাহারে ধীবর-সমীপে গমনপূর্ব্বক পিতার নিমিত্ত স্বয়ং ত্বদীয় কন্যারত্ন প্রার্থনা করিলেন। দাশরাজ রাজকুমারকে যথোচিত সমাদর ও অভ্যর্থনা করিয়া বসিতে আসন প্রদান করিলেন। রাজপুত্র আসনে উপবেশন করিলে ধীবর সমাগত রাজগণ সমক্ষে কহিলেন, হে ভরতর্ষভ! আপনি মহারাজ শান্তনুর কুলপ্রদীপ, আপনার ন্যায় পুত্র আর দৃষ্টিগোচর হয় না। আপনি বিবেচনা করিয়া দেখুন, ঈদৃশ শ্লাঘ্যসম্বন্ধ পরিত্যাগ করিলে কোন্ ব্যক্তি না দুঃখিত হয়; সাক্ষাৎ ইন্দ্রও এ সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিতে পারেন না। যিনি আপনার সমান গুণবান্, যাঁহার ঔরসে বরবর্ণিনী সত্যবতীর জন্ম হয়, তিনি বারংবার আমার নিকট ত্বদীয় পিতার গুণকীর্ত্তনপূর্ব্বক কহিয়াছেন যে, সেই ধর্মজ্ঞ রাজাই সত্যবতীর পাণিগ্রহণ করিবার উপযুক্ত পাত্র। মহর্ষি পরাশর সত্যবতীর নিমিত্ত অত্যন্ত উৎসুক হইয়া-ছিলেন, কিন্তু আমি তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত না হইয়া সেই অসিতাঙ্গ' মুনীন্দ্রকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছি। আমি কন্যার পিতা, অতএর একটি কথা বলিব। হে পরন্তপ! বোধ হইতেছে, এই পরিণয় সম্পন্ন হইলে অতি ভয়ঙ্কর বৈরানল প্রজ্বলিত হইবে; কিন্তু আপনি ক্রুদ্ধ হইলে কি সুর, কি অসুর, কি গন্ধর্ব্ব, যে কুলসম্ভূত হউক না কেন, সমস্ত শত্রুগণ অচিরকালমধ্যে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইবে, সন্দেহ নাই। হে রাজকুমার! কেবল এইমাত্র দোষ দৃষ্ট হইতেছে, নতুবা এ বিষয়ে আর কোন সংশয় নাই।
পিতৃভক্ত গাঙ্গেয় ধীবরবাক্য শ্রবণ করিয়া সমাগত রাজ-গণ সমক্ষে যথাযুক্ত প্রত্যুত্তর করিলেন; হে সত্যবাদিন। আমার সত্যব্রত শ্রবণ কর। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তুমি যাহা কহিবে, অবিকল সেইরূপ কার্য্য করিব। যিনি ইঁহার গর্তে জন্মগ্রহণ করিবেন, তিনি আমাদিগের রাজা হইবেন। অনন্তর জালজীবী কহিলেন, হে ভরতর্ষভ। আপনি রাজ্যের হিতার্থে অতিশয় দুষ্কর কৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, অতএব আপনি কন্যার প্রভু হইলেন, সুতরাং ইহার দানেও আপনারই সম্পূর্ণ অধিকার হইল, কিন্তু আমার আর একটি কথা শ্রবণ এবং তদনুরূপ কার্য্য করিতে হইবে। আপনার নিকট ঈদৃশ প্রস্তাব করাতে আমার নিতান্ত বালকত্ব প্রকাশ পাইবে বটে, তথাপি সন্দিহান হইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি। তুমি সত্যবতীর নিমিত্ত ভূপতিগণ-সমক্ষে যেরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছ, তাহা তোমার অননুরূপ নহে; অতএব আমি তদ্বিষয়ে অণুমাত্রও সন্দেহ করি না, কিন্তু যিনি তোমার সন্তান হইবেন, তাঁহার প্রতি আমার অত্যন্ত সন্দেহ হইতেছে। পিতার প্রিয়চিকীর্ষু দেবব্রত ধীবরের অভিসন্ধি জানিয়া তত্রত্য ভূপতিগণ ও ধীবরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আমি ইতিপূর্ব্বেই সাম্রাজ্য পরিত্যাগ করিয়াছি এবং অধুনা প্রতিজ্ঞা করিতেছি, অদ্যাবধি ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিব। আমি অপুত্র হইলেও আমার অক্ষয় স্বর্গলাভ হইবে, সন্দেহ নাই। দাশরাজ দেবব্রতের প্রতিজ্ঞাবাক্য শ্রবণ করিয়া হর্ষে পুলকিত হইয়া কহিলেন, "তোমার পিতাকেই কন্যাদান করা কর্তব্য।” অনন্তর দেবতা ও অপ্সরোগণ অন্তরীক্ষ হইতে রাজকুমারের মস্তকে পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে "ভীষ্ম” বলিয়া সম্বোধন করিলেন। পিতৃভক্ত ভীষ্ম সেই যশস্বিনীকে কহিলেন, মাতঃ। রথোপরি আরোহণ করুন, আমরা গৃহে গমন করি। অনন্তর রথারোহণ পূর্ব্বক হস্তিনাপুরে আগমন করিয়া রাজা শান্তনুকে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। রাজগণ সমবেত ও পৃথক্ পৃথক্ হইয়া মুক্তকণ্ঠে তাঁহার এই দুরূহ কার্য্যের ভূরি ভূরি প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে ভীষ্ম বলিয়া আহ্বান করিতে লাগিলেন। রাজা শান্তনু ভীষ্মের অসাধারণ ক্ষমতা ও কৃষ্ণসাধ্য ব্যাপারে দৃঢ়তর অধ্যবসায় দর্শনে সাতিশয় আনন্দিত হইয়া তাঁহাকে এই বর প্রদান করিলেন, হে মহাত্মন্! স্বেচ্ছা ব্যতিরেকে তোমার মৃত্যু হইবে না।
একাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর রাজা শান্তনু সেই পরম-সুন্দরী কামিনীর পাণিগ্রহণ করিয়া তাঁহাকে আপন আলয়ে রাখিলেন। কিয়দ্দিন পরে মহিষী গর্ভবতী হইলেন। সেই গর্বে রাজার এক পুত্র জন্মে, তাঁহার নাম চিত্রাঙ্গদ। তিনি অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন, মহাবল পরাক্রান্ত ও সর্ব্ববিষয়ে সর্ব্বোৎকৃষ্ট ছিলেন। অনন্তর বিচিত্রবীর্য্য নামে তাঁহার অপর একটি পুত্র জন্মিল। মহাবীর্য্য বিচিত্রবীর্য্য তরুণবয়স্ক না হইতেই রাজা মানবলীলা সংবরণ করিলেন। শান্তনু স্বর্গারোহণ করিলে ভীষ্ম সত্যবতীর মতানুসারে চিত্রাঙ্গদকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। অমিতবিক্রম চিত্রাঙ্গদ স্বীয় বাহুবলে সমুদায় রাজমণ্ডলকে পরাজয় করিয়াছিলেন। তিনি শৌর্যবীর্য্যে কাহাকেও আপনসদৃশ জ্ঞান করিতেন না। চিত্রাঙ্গদ নামে এক প্রবলপরাক্রান্ত গন্ধর্ব্ব-রাজ ছিলেন। তিনি সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে সুরাসুরবিজয়ী চিত্রাঙ্গদকে আক্রমণ করিলেন। কুরুক্ষেত্রে সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। সরস্বতী স্রোতস্বতীর তীরে ক্রমাগত তিন বৎসর তাহাদের উভয় পক্ষের ঘোরতর সংগ্রাম হইয়াছিল। অবিশ্রান্ত অস্ত্রবর্ষণে রণক্ষেত্র সমাকুল ও পরস্পর গাত্রবিমদ্দে তুমুল হইয়া উঠিল। মায়াবী গন্ধর্ব্ব মায়াবলে চিত্রাঙ্গদের প্রাণসংহার-পূর্ব্বক স্বর্গমার্গে প্রস্থান করিলেন। সেই অমিততেজাঃ নরেন্দ্র যুদ্ধে নিহত হইলে ভীষ্ম তাঁহার সমুদায় প্রেতকার্য্য সম্পাদন করাইলেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্য্যকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। বিচিত্রবীর্য্য পৈত্রিক সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়া ধর্মশাস্ত্রকুশল ভীষ্মের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহার আদেশানুসারে রাজকার্য্য পর্যালোচনা করিতে লাগিলেন। মহামতি ভীষ্মও তাঁহাকে পরমযত্নে প্রতিপালন করিতে ত্রুটি করিতেন না।
দ্ব্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে কৌরবনন্দন। চিত্রাঙ্গদ নিহত হইলে বিচিত্রবীর্য্যের বাল্যাবস্থায় ভীষ্ম সত্যবতীর নির্দেশানুর্তী হইয়া রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। অনন্তর বিচিত্রবীর্য্যকে তরুণবয়স্ক দেখিয়া মহামতী ভীষ্ম তাঁহার বিবাহ দিবার মানস করিলেন। এই সময়ে কাশীপতির তিন কন্যা স্বয়ংবরা হইবেন, এই কথা ভীষ্মের কর্ণগোচর হইল। মহারথ ভীষ্ম মাতার অনুমতি লইয়া রথারোহণপূর্ব্বক বারাণসী নগরীতে গমন করিলেন। তথায় দেখিলেন, ভূপতিগণ বিবাহার্থী হইয়া নানা দিদেশ হইতে সেই স্বয়ংবর সভায় সমাগত হইয়াছেন এবং সেই কন্যারাও উপবিষ্ট আছেন। অনন্তর রাজাদিগের নাম কীর্ত্তিত হইলে ভীষ্ম, ভ্রাতার নিমিত্ত স্বয়ং সেই কন্যাদিগকে প্রার্থনা করিলেন এবং তাঁহাদিগকে রথে আরোহণ করাইয়া অতি গম্ভীরস্বরে মহীপাল-দিগকে কহিতে লাগিলেন, কেহ কন্যাকে বিচিত্র বস্ত্রালঙ্কারে আচ্ছাদিত করিয়া ধনদানপূর্ব্বক গুণবান্ পাত্রে সমর্পণ করেন, কেহ বা গোমিথুন' প্রদানপূর্ব্বক কন্যাকে পাত্রসাৎ করেন, কেহ বা প্রতিজ্ঞাত ধনদান পুরঃসর কন্যা সম্প্রদান করেন, কেহ বলপূর্ব্বক বিবাহ করিয়া থাকেন। কেহ বা প্রণয়সম্ভাষণে রমণীর মনোরঞ্জনপূর্ব্বক তদীয় পাণিপীড়ন করেন, কেহ প্রমত্তা নারীর পাণিগ্রহণ করেন, কেহ বা আর্য্যবিধি অনুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া থাকেন, কেহ কেহ কন্যার পিতামাতাদিগকে বিপুল অর্থ দানপূর্ব্বক বিবাহ করেন। ধৰ্ম্মশাস্ত্রবিদ পণ্ডিতেরা এই অষ্টবিধ বিবাহবিধি নিৰ্দ্দিষ্ট করিয়াছেন। স্বয়ংবরও উত্তম বিবাহমধ্যে পরিগণিত। রাজারা স্বয়ংবর বিবাহেরই অধিক প্রশংসা করেন। পরাক্রম প্রদর্শন-পূর্ব্বক অপহৃত কন্যার পাণিগ্রহীতাকে ধৰ্ম্মবাদীরা ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। অতএব হে মহীপালগণ! আমি বলপূর্ব্বক ইহাদিগকে অপহরণ করি; তোমরা যুদ্ধ অথবা অন্য যে কোন উপায় দ্বারা পার, ইহাদিগের উদ্ধার সাধনে যথাসাধ্য যত্ন কর। আমি যুদ্ধার্থে প্রস্তুত আছি। বারাণসীশ্বর ও অন্যান্য রাজাদিগকে এই কথা বলিয়া, মহাবল ভীষ্ম সেই কন্যাদিগকে গ্রহণপূর্ব্বক আপন রথে আরোহণ ও সকলকে আমন্ত্রণ করিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিলেন। তৰ্দ্দশনে ভূপালগণ কোপে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া দশনে দশনে দৃঢ়তর নিষ্পীড়নপূর্ব্বক বাহাস্ফোটন করিতে লাগিলেন। সকলে ব্যস্ত হইয়া সত্বর অলঙ্কার উন্মোচন ও কবচ ধারণ করাতে রাজসভা ঘোরতর সমাকুল হইয়া উঠিল। বৰ্ম্ম ও আভরণসকল ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হওয়াতে বোধ হইল যেন অন্তরীক্ষ হইতে তারকাসকল ভূতলে পতিত হইতেছে। প্রবলপরাক্রান্ত বীরপুরুষেরা নানাপ্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জীভূত হইয়া রোষ-কষায়িত ও ভ্রুকুটী-কুটিল নয়নে ক্ষিপ্রজব' ঘোটক সংযুত ও সূত-সুরক্ষিত রথে আরোহণপূর্ব্বক আয়ুধসকল উত্তোলন করিয়া শান্তনবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন।
অনন্তর একাকী ভীষ্মের সহিত সেই বহুসংখ্যক বীর-পুরুষের ঘোরতর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। সেই সমর-সাগরের ভীষণতা দর্শনে গাত্র রোমাঞ্চিত হইতে লাগিল। বিপক্ষেরা যুগপৎ দশ সহস্র বাণ তাঁহার প্রতি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। কিন্তু ভীষ্ম অবলীলাক্রমে সেই সমস্ত শরজাল প্রচণ্ড শরবর্ষণ-দ্বারা মধ্যস্থলেই শতধা খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। যেমন বর্ষাকালের জলদমালা পর্ব্বতোপরি মুষলধারে জলবর্ষণ করে, তদ্রুপ বিপক্ষেরা চতুৰ্দ্দিক্ বেষ্টন করিয়া ভীষ্মের উপর অনবরত বাণবর্ষণ করিতে লাগিল। তিনি শরজালদ্বারা শত্রুবর্গের বাণবর্ষণ অপবারিত করিয়া পরিশেষে তিন তিনটি বাণদ্বারা সকলকে বিদ্ধ করিলেন। তাঁহারাও ভীষ্মের প্রতি পাঁচ পাঁচটি শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল ভীষ্ম পরাক্রম প্রদর্শনপূর্ব্বক পুনর্ব্বার তাহাদিগকে দুই দুই বাণ দ্বারা বিদ্ধ করিলেন। দেবাসুর সংগ্রামের ন্যায় সেই যুদ্ধ অতি ভয়ঙ্কর ও অস্ত্রশস্ত্রে সমাকুল হইল। মহারথ ভীষ্ম শত শত ও সহস্র ব্যক্তির ধনু, ধ্বজাগ্র বৰ্ম্ম ও মস্তকচ্ছেদন করিলেন। তাঁহার অসাধারণ রণনৈপুণ্য ও যুদ্ধস্থলে আত্মরক্ষা দর্শনে শত্রুপক্ষীয়েরাও ভূরি ভূরি ধন্যবাদ করিতে লাগিল।
অস্ত্রবিদ্যাবিশারদ ভীষ্ম ক্রমে ক্রমে সকলকে পরাজয় করিয়া কন্যাদিগের সমভিব্যাহারে নগরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। পথিমধ্যে মহারথ শাল্ব রাজা, বিজিগীষু হইয়া তাঁহার সম্মুখীন হইলেন। যেমন কোন যূথাধিপ মাতঙ্গ দন্তাঘাতদ্বারা বারণান্তরের জঘনদেশ বিদীর্ণ করিয়া মাতঙ্গীর প্রতি ধাবমান - হয়, তদ্রুপ কামিনীকাম মহাবল পরাক্রান্ত মহাবাহু শাল্ব মহীপতি - ঈর্ষা ও ক্রোধপরবশ হইয়া ভীষ্মকে "তিষ্ঠ তিষ্ঠ” এই কথা - বলিলেন। অরাতিকুলনিহন্তা পুরুষব্যাঘ্র ভীষ্ম তাঁহার গর্বিত - বাক্য শ্রবণগোচর করিয়া ক্রোধে ব্যাকুলিত ও বিধূম অগ্নির ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। তিনি অশঙ্কিত ও অসঙ্কুচিত চিত্তে ক্ষত্রধৰ্ম্ম অবলম্বনপূর্ব্বক ধনুর্ব্বাণ ধারণ ও ভূকুটী-নিবন্ধন করিয়া তৎক্ষণাৎ রথবেগ সংবরণ করিতে আজ্ঞা দিলেন। তদ্দর্শনে অন্যান্য রাজগণ সমুৎসুক হইয়া ভীষ্ম ও শাল্বের সমরসমারোহ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। যেমন কোন গাভীকে লক্ষ্য করিয়া মহাবল বৃষভদ্বয় গভীর নিনাদ করত পরস্পরের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ মহাবল-পরাক্রান্ত সেই বীরযুগল ক্রোধভরে মহা আড়ম্বরপূর্ব্বক তর্জন গর্জন করিতে লাগিলেন। শাল্বরাজ ভীষ্মের প্রতি উপর্যুপরি সহস্র সহস্র বাণ বর্ষণ করাতে, শান্তনব প্রথমতঃ সাতিশয় পীড়িত হইলেন; তদ্দর্শনে তত্রত্য ভূপতিগণ বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া শাল্বরাজের ভূরি ভূরি প্রশংসা ও বারংবার সাধুবাদ করিতে লাগিলেন।
শান্তনব শাল্বরাজের প্রতি ক্ষত্রিয়গণের সাধুবাদ শ্রবণান্তর ক্রোধভরে "তিষ্ঠ তিষ্ঠ” এই কথা বলিয়া সারথিকে আজ্ঞা করিলেন, "যেখানে শাল্বরাজ আছে, শীঘ্র তথায় রথ চালনা কর; আমি অদ্যই তাহাকে শমনভবনে প্রেরণ করিব।” অনন্তর মহাবীর ভীষ্ম বরুণাস্ত্রদ্বারা শাল্বের রথসংযুক্ত ঘোটকচতুষ্টয় বিনষ্ট করিলেন এবং স্বীয় অস্ত্রদ্বারা সপত্নের' অস্ত্রশস্ত্রসকল নিবারণপূর্ব্বক তদীয় সারথির মস্তকচ্ছেদন করিলেন। পরে ইন্দ্রাস্ত্র দ্বারা অপরাপর উত্তমোত্তম অশ্বসকলও বিনষ্ট করিলেন। এইরূপে নৃপবরকে পরাজয় করিয়া জীবিতা-বস্থায় তাঁহাকে পরিত্যাগ করিলেন। রাজা শাল্বও প্রাণ পাইয়া স্বীয় রাজধানী প্রত্যাগমনপূর্ব্বক ধর্মপ্রমাণ' রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। যে সমস্ত রাজগণ স্বয়ংবর দর্শন করিতে আসিয়া-
ছিলেন, তাঁহারা স্ব স্ব রাজ্যে গমন করিলেন। অনন্তর মহাবীর ভীষ্ম জয়লব্ধ সেই সকল কন্যারত্ন লইয়া হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন। তথায় ধর্মাত্মা বিচিত্রবীর্য্য রাজা ছিলেন। তিনি স্বীয় পিতা নৃপোত্তম শান্তনুর ন্যায় ধর্মানুসারে রাজ্যশাসন করিতেন। অমিতবিক্রম গঙ্গাসুত অরাতিকুল সমূলে উন্মুলনপূর্ব্বক অচিরে নদ, নদী, বন, উপবন ও ভূধর প্রভৃতি নানাস্থান অতিক্রম করিয়া ভ্রাতার নিমিত্ত কাশীশ্বর-দুহিতাদিগকে আনয়ন করিলেন। তিনি সেই কামিনীদিগকে সুষার ন্যায়, অনুজার ন্যায় এবং দুহিতার ন্যায় পরমযত্নে আনয়ন করিয়া কৌরবগণ সমীপে গমন করিলেন এবং ভ্রাতাকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত বিক্রমাহৃত সর্ব্বগুণযুতা সেই কন্যাদিগকে যবিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্যের হস্তে সমর্পণ করিলেন।
ভীষ্ম এই সমস্ত দুররূহকার্য্য সম্পাদনান্তে গোপনে সত্যবতীর সহিত পরামর্শ স্থির করিয়া ভ্রাতার বিবাহের উদ্যোগ করিতেছেন, এই অবসরে কাশীপতির জ্যেষ্ঠা কন্যা হাসিতে হাসিতে কহিলেন, আমি ইতিপূর্ব্বে মনে মনে শাল্বরাজকে পতিত্বে বরণ করিয়াছি এবং তিনিও আমাকে প্রার্থনা করিয়াছেন, আর এ বিষয়ে আমার পিতারও সম্পূর্ণ অভিলাষ আছে; অধিক কি বলিব, আমি স্বয়ংবর সভায় মনে মনে মহীপতি শাল্বের করে করার্পণ করিয়াছি; ইহা বিবেচনা করিয়া আপনার ধর্ম্মতঃ যেরূপ অভিরুচি হয়, তাহা সম্পাদন করুন। ভীষ্ম ব্রাহ্মণসমাজে সেই কন্যার এবম্প্রকার উক্তি শ্রবণে সাতিশয় চিন্তাকুল হইলেন। অনন্তর বেদপারগ ব্রাহ্মণগণের সহিত পরামর্শ স্থির করিয়া সর্ব্বজ্যেষ্ঠা অম্বাকে স্বেচ্ছানুরূপ কার্য্য করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন এবং অম্বিকা ও অম্বালিকাকে স্বীয় যবিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্যের সহিত বিবাহ দিলেন। তরুণবয়স্ক পরমসুন্দর বিচিত্রবীর্য্য সেই কামিনীযুগলের পাণিগ্রহণ করিয়া এককালে কুসুমায়ুধের অধীন হইলেন। সেই নিবিড়নিতম্বিনীদ্বয়ের পয়োধরযুগল পীন, কটিদেশ ক্ষীণ ও নখ, সকল রক্তবর্ণ ছিল। তাঁহাদিগের ঘনাবকুঞ্চিত শ্যামল কেশপাশে কি অনির্বচনীয় শোভা হইয়াছিল, তাহা বর্ণনাতীত। তাঁহারা আপনাদিগকে অনুরূপভর্ভূভাগিনী জানিয়া প্রীতি-প্রফুল্লচিত্তে পতি সেবা করিতে লাগিলেন। অশ্বিনীকুমারসদৃশ রূপবান, দেবতুল্য পরাক্রমশালী ও প্রমদাজনমনোহারী ভূপতি বিচিত্রবীর্য্য মহিষী-দিগের সহিত ক্রমাগত সাত বৎসর নিরন্তর বিহার করিয়া যৌবনকালেই যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হইলেন। তাঁহার বন্ধুবান্ধবগণ সুবিচক্ষণ চিকিৎসকদ্বারা তদীয় পীড়ার নানাপ্রকার প্রতীকার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সকলই বিফল হইল। যেমন দিননাথ নিয়তিক্রমে অস্তাচলে গমন করেন, তদ্রুপ সেই তরুণবয়স্ক প্রজানাথ শমনসদনে গমন করিলেন। ভীষ্ম ভ্রাতৃশোকে নিতান্ত কাতর ও একান্ত বিষণ্ণ হইয়া জ্ঞাতিবর্গ ও ঋত্বিক্সণ সমভিব্যাহারে তাঁহার প্রেতকার্য্য সমুদায় সম্পাদন করিলেন।
এ্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, সত্যবতী পুত্রশোকে কাতরা হইয়া পুত্রবধূদিগের সহিত সন্তানের প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিলেন। পরে মুষাদিগকে ও ভ্রাতৃ বৎসল ভীষ্মকে নানাপ্রকার প্রবোধবাক্যে সান্ত্বনা করিয়া ধর্মরক্ষা ও বংশরক্ষার নিমিত্ত সবিশেষ পর্যালোচনাপূর্ব্বক ভীষ্মকে কহিলেন, হে মহাভাগ। মহাযশাঃ ধৰ্ম্মপরায়ণ শান্তনুকে জলপিণ্ড প্রদান করে এমন লোক তোমা ব্যতীত আর লক্ষ্য হয় না; কেবল তুমিই তাঁহার অদ্বিতীয় আশাভাজন। তোমাতে ধৰ্ম্ম অবিচলিতরূপে নিত্য বিরাজমান রহিয়াছেন। তুমি ধর্ম্মের যথার্থতত্ত্বজ্ঞ ও নিখিল বেদবেদাঙ্গ পারদর্শী। মহর্ষি শুক্র ও অঙ্গিরার ন্যায় তোমার ধৰ্ম্মনিষ্ঠতা, কুলাচারের অভিজ্ঞতা এবং দুরূহ কার্য্যে মহীয়সী সহিষ্ণুতা আছে; অতএব হে ধৰ্ম্মাত্মন্! আমি ফলসিদ্ধির আশায় তোমাকে কোন কার্য্যে নিয়োগ করিতে ইচ্ছা করি, অগ্রে শ্রবণ করিয়া তৎসম্পাদনে যত্নবান্ হও; হে পুরুষর্ষভ! তোমার প্রিয়-তম ভ্রাতা পুত্রবিহীন হইয়া অকালে পরলোক যাত্রা করিয়াছেন। তাঁহার পরমরূপবতী ও সম্পূর্ণ যৌবনবতী মহিষীদ্বয় অতিমাত্র পুত্রার্থিনী হইয়াছেন; অতএব আমি অনুমতি করিতেছি; তুমি বংশরক্ষার নিমিত্ত তাঁহাদিগের গর্ভে অপত্যোৎপাদন কর; তাহাতে তোমার পরমধৰ্ম্ম লাভ হইবে সন্দেহ নাই; এক্ষণে রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া প্রজাপালন-তৎপর হও এবং দারপরিগ্রহ করিয়া পিতার বংশরক্ষা কর।
ধর্মাত্মা ভীষ্ম মাতার ও সুহৃদ্বর্গের এবম্প্রকার অনুরোধ-বাক্য শ্রবণ করিয়া উত্তর প্রদান করিলেন, মাতঃ। আপনি ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়াছেন যথার্থ বটে, কিন্তু অপত্যোৎপাদন বিষয়ে আমি যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহা কি বিস্মৃত হইয়াছেন। আমি দারপরিগ্রহ বিষয়ে পূর্ব্বে আপনার নিকট যে সঙ্কল্প করিয়াছি, তাহা আপনি পরিজ্ঞাত আছেন, তথাপি আবার এক্ষণেও পুনর্ব্বার সত্যপ্রমাণ দৃঢ়তর প্রতিজ্ঞা করিতেছি, শ্রবণ করুন। আমি ত্রৈলোক্য পরিত্যাগ করিতে পারি, ইন্দ্রত্ব পরিত্যাগ করিতে পারি এবং ইহা অপেক্ষাও যদি কিছু অভীষ্টতম বস্তু থাকে তাহাও পরিত্যাগ করিতে সম্মত আছি, কিন্তু কদাচ সত্য পরিত্যাগ করিতে পারিব না। যদি পৃথিবী গন্ধ পরিত্যাগ করে, জল যদি মধুর রস পরিত্যাগ করে, জ্যোতিঃ যদি রূপ পরিত্যাগ করেন, বায়ু যদি স্পর্শগুণ পরিত্যাগ করে, সূর্য্য যদি প্রভা পরিত্যাগ করেন, অগ্নি যদি উষ্ণতা পরিত্যাগ করেন, আকাশ যদি শব্দগুণ পরিত্যাগ করেন, শীতরশ্মি যদি শীতাংশুতা পরিত্যাগ করেন, ইন্দ্র যদি পরাক্রম পরিত্যাগ করেন এবং ধর্মরাজ যদি ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করেন, তথাপি আমি সত্য পরিত্যাগ করিতে পারিব না।
সত্যবতী, মহাতেজাঃ ভীষ্মের এইরূপ কঠোর প্রতিজ্ঞা শুনিয়া কহিলেন, হে সত্যপরাক্রম! সত্যের প্রতি তোমার যে অবিচলিত ভক্তি ও যথার্থ প্রীতি আছে, তাহা আমার অবিদিত নহে এবং তুমি ইচ্ছা করিলে যে স্বীয় তেজঃপ্রভাবে নূতন ত্রিলোকের সৃষ্টি করিতে পার, তাহাও আমি বিলক্ষণ পরিজ্ঞাত আছি, আর তুমি আমার নিমিত্ত পূর্ব্বে যে সত্য করিয়াছ তাহাও বিস্মৃত হই নাই, কিন্তু বৎস! তোমাকে আপদ্ধৰ্ম্ম পর্যবেক্ষণ করিয়া পৈত্রিক ভার বহন করিতে হইবে। হে পরন্তপ! যাহাতে তোমার বংশপরম্পরা রক্ষা পায়, ধর্মের উচ্ছেদ না হয় এবং বন্ধুবান্ধবগণের সন্তোষ জন্মে তাহার অনুষ্ঠান কর। সত্যবতী পুত্রশোকে নিতান্ত কাতরা হইয়া এইরূপে নিরন্তর বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন এবং পুত্রের আকাঙ্ক্ষায় সাধুবিগর্হিত অধ্য কার্য্যের অনুষ্ঠানে পুনঃ পুনঃ প্রবর্ত্তনা করিতেছেন দেখিয়া ধর্মপরায়ণ ভীষ্ম কহিলেন, মাতঃ! ধর্ম্মের প্রতি দৃষ্টিপাত কর; আমাদিগকে বিনষ্ট করিও না; ক্ষত্রিয়ের সত্যভঙ্গ অতীব নিন্দনীয়, অসত্যসন্ধ ক্ষত্রিয়ের অধর্ম্মের অবধি থাকে না; অতএব যাহাতে রাজা শান্তনুর বংশপরম্পরা ধরামণ্ডলে অক্ষয়রূপে দেদীপ্যমান থাকিবে, তাহার উপায়স্বরূপ সনাতন ক্ষত্রিয়ধর্ম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন, আপদ্ধৰ্ম্ম-কুশল প্রাজ্ঞ পুরোহিতগণ সমভিব্যাহারে উক্ত ধর্মানুসারে কার্য্যারম্ভ করিবেন।
চতুরধিকশততম অধ্যায়।
ভীষ্ম কহিলেন, যিনি পিতৃবধামর্ষে প্রদীপ্ত হইয়া তীক্ষ্ণধার কুঠারদ্বারা হৈহয়াধিপতির প্রাণসংহার করিয়াছিলেন, যিনি মহাবীর্য্য কার্ত্তবীর্য্যের ভুজবনচ্ছেদন করিয়াছিলেন, যিনি শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক অনবরত মহাস্ত্র বর্ষণ করিয়া একবিংশতি বার পৃথ্বীকে নিঃক্ষত্রিয়া করিয়াছিলেন এবং অরাতিশোণিত-জলে। পিতৃলোকদিগের তর্পণ করিয়াছিলেন, সেই মহর্ষি জামদগ্ন্য পরিশেষে বেদপারগ ব্রাহ্মহ্মণগণদ্বারা অপত্যোৎপাদন করাইয়া বিনাশোম্মুখ ক্ষত্রিয়কুল পুনর্ব্বার রক্ষা করিয়াছেন।
বেদে এরূপ প্রমাণ আছে যে, ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপন্ন হইলে সেই পুত্র পাণিগ্রহীতারই হইয়া থাকে; এই সনাতন ধর্ম স্মরণ করিয়া ক্ষত্রিয়পত্নীরা ব্রাহ্মণগণ সমীপে অভিগমন করিতেন এবং ক্ষত্রিয়দিগের পুনর্ভববিধি' লোকে দৃষ্ট হইতেছে। ক্ষত্রিয়কুল এইরূপে পুনর্ব্বার বদ্ধমূল হইয়াছে। হে রাজ্ঞি। এই বিষয়ে আর একটি অতি প্রাচীন ইতিহাস আছে, বলিতেছি শ্রবণ করুন। পূর্ব্বে উতথ্য নামে এক সুবিখ্যাত মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার মমতানাম্নী এক সহধর্মিণী ছিলেন। একদা মহর্ষি উতথ্যের যবিষ্ঠ ভ্রাতা দেবপুরোহিত মহাতেজাঃ বৃহস্পতি মদনাতুর হইয়া মমতার নিকট উপস্থিত হইলেন। মমতা দেবরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে মহাভাগ! আমি তোমার জ্যেষ্ঠের সহযোগে অন্তৰ্ব্বত্নী' হইয়াছি, অতএব রমণেচ্ছা সংবরণ কর। আমার গর্ন্তস্থ উতথ্যকুমার কুক্ষিমধ্যেই ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করিয়াছেন। তুমিও অমোঘরেতাঃ, এক গর্বে দুই জনের সম্ভব নিতান্ত অসম্ভব; অতএব অদ্য এই দুর্ব্যবসায়' হইতে নিবৃত্ত হও। বৃহস্পতি মদনবাণে নিতান্ত আহত ও সাতিশয় অধীর হইয়া-ছিলেন, সুতরাং স্বীয় চঞ্চল চিত্তকে কোনক্রমেই স্থির করিতে না পারিয়া মমতার অসম্মতি থাকিলেও তিনি বলপূর্ব্বক তাঁহাতে আসক্ত হইলেন।
অনন্তর গর্ভস্থ ঋষিকুমার বৃহস্পতিকে কামক্রীড়ায় আসক্ত দেখিয়া কহিলেন, ভগবন্। মদনবেগ সংবরণ করুন। স্বল্পপরিসর কুক্ষিতে উভয়ের সম্ভব অত্যন্ত অসম্ভব। আমি পূর্ব্বে এই গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, অতএব অমোঘরেতঃপাত-দ্বারা আমাকে পীড়িত করা আপনার নিতান্ত অযোগ্য কৰ্ম্ম হইতেছে, সন্দেহ নাই। বৃহস্পতি বালকবাক্যে কর্ণপাত না করিয়া স্বীয় নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিতে লাগিলেন! গর্ন্তস্থ মুনিকুমার বৃহস্পতির এইরূপ অসাধু ব্যবহার দর্শনে অসহিষ্ণু হইয়া পাদদ্বারা তদীয় শুক্রের পথ রোধ করিলেন। রেতঃ প্রবেশমার্গ না পাইয়া প্রতিহত হইয়া সহসা ভূতলে পতিত হইল। তন্নিরীক্ষণে ভগবান্ বৃহস্পতি রোষপরবশ হইয়া গর্ভস্থ উতথ্যনন্দনকে ভর্ৎসনাপূর্ব্বক অভি-সম্পাত করিলেন যে, সর্ব্বভূতের অভিলষিত ঈদৃশ সময়ে আমাকে এমন কথা বলিলে এই অপরাধে তুমি "যাবজ্জীবন অন্ধত্ব প্রাপ্ত হইবে।" বৃহস্পতির শাপ প্রভাবে উতথ্যতনয় অন্ধ হইয়া জন্মগ্রহণ করিলেন, তাহাতেই তাঁহার নাম দীর্ঘতমাঃ হইল। সেই জন্মান্ধ বেদবিৎ প্রাজ্ঞ ঋষি, স্বীয় বিদ্যাবলে প্রদ্বেষীনাম্নী এক পরমরূপ-লাবণ্যবতী যুবতী ব্রাহ্মণতনয়ার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। পরে তিনি গৌতম প্রভৃতি কতিপয় সুবিখ্যাত পুত্র উৎপাদন করিয়া মহর্ষি উতথ্যের বংশরক্ষা করিলেন। অনন্তর বেদবেদাঙ্গপারগ ধৰ্ম্মাত্মা দীর্ঘতমাঃ সৌরভেয়ের নিকট নিখিল গোধৰ্ম্ম অধ্যয়ন করিয়া নিঃশঙ্কচিত্তে তদাচরণে প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর তাঁহাকে স্বধৰ্ম্মভ্রষ্ট দেখিয়া তত্রত্য সমস্ত মহর্ষিগণ ক্রোধান্ধ হইয়া কহিলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করে, সে আমাদিগের আশ্রমের নিতান্ত অযোগ্য অতএব এই পাপিষ্ঠের সহবাস পরিত্যাগ করাই উচিত। তাঁহারা পরস্পর এইরূপ মন্ত্রণা করিয়া মহর্ষি দীর্ঘতমাকে আর সাদর সম্ভাষণ বা তাঁহার সন্তোষজনক কার্য্য করিতেন না এবং তাঁহার পত্নীও এক্ষণে পূর্ব্বের ন্যায় সমাদর ও শুশ্রূষাদি দ্বারা তদীয় সন্তোষবর্দ্ধন করিতেন না। দীর্ঘতমাঃ পত্নীর এইরূপ অদৃষ্টপূর্ব্ব অভক্তি দর্শনে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি নিমিত্ত আমার প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন করিতেছ? প্রদ্বেষী কহিলেন, স্বামী ভার্য্যার ভরণপোষণ ও প্রতিপালন করেন বলিয়া তাঁহাকে ভর্তা এবং পতি বলিয়া থাকে; কিন্তু তুমি জন্মান্ধ, তাহার কিছুই করিতে পার না, প্রত্যুত আমি তোমার ও ত্বদীয় পুত্রগণের ভরণপোষণ করিয়া নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত পীড়িত হইয়াছি; অতএব অতঃপর আমি তোমাদিগের আর ভারবহন করিতে পারিব না।
মহর্ষি পত্নীবাক্য শ্রবণান্তর ক্রোধান্বিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, এই অর্থ গ্রহণ কর; বলবতী অর্থস্পৃহা-নিবন্ধন তোমাকে ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে। প্রদ্বেষী কহিলেন, হে বিপ্রেন্দ্র! দুঃখের নিদানভূত তৎপ্রদত্তধনে আমার অভিলাষ নাই; তোমার যেমন অভিরুচি হয়, কর। আমি পূর্ব্বের ন্যায় তোমার ও সন্তানবর্গের ভরণপোষণ করিতে পারিব না। দীর্ঘতমাঃ পত্নীর সগর্ব্ববচন শ্রবণ করিয়া কহিলেন, আমি অদ্যাবধি পৃথিবীতে এই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত করিলাম যে, স্ত্রীজাতিকে যাবজ্জীবন একমাত্র পতির অধীন হইয়া কাল যাপন করিতে হইবে। পতি জীবিত থাকিলে অথবা পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলে, নারী যদি পুরুষান্তর ভজনা করেন, তাহা হইলে তিনি অবশ্যই পতিত হইবেন সন্দেহ নাই। আর পতিবিহীনা নারীগণের সর্ব্বপ্রকার সমৃদ্ধি থাকিলেও তাহা ভোগ করিতে পারিবেন না। বিষয়ভোগ করিলে অকীর্ত্তি ও পরিবাদের পরিসীমা থাকিবে না। ব্রাহ্মণী স্বামীর এই সমুদায় বাক্য শ্রবণে অত্যন্ত কুপিত হইয়া গৌতম প্রভৃতি পুত্রগণকে আদেশ করিলেন, ইঁহাকে গঙ্গায় নিক্ষেপ কর। লোভ ও মোহাভিভূত পাষাণহৃদয় পুত্রেরা তাঁহাকে উডুপে বন্ধনপূর্ব্বক গঙ্গায় নিক্ষেপ করিয়া স্বচ্ছন্দে গৃহে প্রত্যাগমন করিল। অন্ধ সেই উড়ুপমাত্র অবলম্বন করিয়া স্রোতে ভাসিতে ভাসিতে নানাদেশ অতিক্রম করিয়া চলিলেন। পরম ধাৰ্ম্মিক বলিরাজ গঙ্গাস্নানে গমন করিয়াছিলেন। তিনি তরঙ্গোপরি ভাসমান দীর্ঘতমাকে দেখিবামাত্র গ্রহণ করিলেন এবং আদ্যো-পান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত পরিজ্ঞাত হইয়া তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিলেন, মহাভাগ! কৃপা করিয়া আপনাকে মদীয় পত্নীর গর্বে ধর্মার্থকুশল পুত্র উৎপাদন করিতে হইবে। মহাতেজাঃ ঋষি এই প্রার্থনায় সম্মত হইলে পর, রাজা স্বীয় মহিষী সুদেষ্ণাকে তাঁহার নিকট প্রেরণ করিলেন। রাজমহিষী ঋষিকে অন্ধ ও বৃদ্ধতম দেখিয়া তাঁহার নিকট গমন করিলেন না। তিনি আপন ধাত্রেয়িকাকে' বৃদ্ধের নিকট প্রেরণ করিলেন। ঋষি সেই শূদ্রযোনিতে কাক্ষীবৎ প্রভৃতি একাদশ পুত্র উৎপাদন করিলেন। অনন্তর রাজা সেই সকল পুত্রদিগকে অধ্যয়নানুরক্ত অবলোকন করিয়া ঋষিকে কহিলেন, ইহারা আমার পুত্র। ঋষি কহিলেন, মহারাজ! ইহারা আপনার পুত্র নহে; রাজমহিষী আমাকে অন্ধ ও বৃদ্ধতম দেখিয়া অবজ্ঞা করিয়া তাঁহার ধাত্রেয়িকাকে আমার নিকট প্রেরণ করেন, আমি সেই শূদ্রযোনিতে কাক্ষীবৎ প্রভৃতি এই একাদশ পুত্র উৎপাদন করিয়াছি, অতএব ইহারা আমার পুত্র। তখন রাজা মুনিকে প্রসন্ন করিয়া পুনর্ব্বার মহিষী সুদেষ্ণাকে তাঁহার নিকট প্রেরণ করিলেন। দীর্ঘতমাঃ রাজ-মহিষীর অঙ্গস্পর্শ করিয়া কহিলেন, তোমার গর্তে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুম্মা, এই পাঁচটি পুত্র হইবে। তাহারা সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী হইবে এবং তাহাদিগের অধিকৃত দেশসকল অধিকারীর নামানুসারে কথিত হইবে। অঙ্গের অধিকৃত দেশের নাম অঙ্গ, বঙ্গের বঙ্গ, কলিঙ্গের কলিঙ্গ, পুণ্ড্রের পুণ্ড্র এবং সুক্ষের অধিকৃত দেশের নাম সুক্ষ হইবে। এইরূপে মহর্ষি দীর্ঘতমাঃ দ্বারা বলিরাজের বংশ বিস্তৃত হইল এবং ব্রাহ্মণগণ-দ্বারা পৃথিবীতে ক্ষত্রিয়কুল পুনর্ব্বার বদ্ধমূল হইল। হে মাতঃ! এই সমস্ত শ্রবণ করিলেন, এক্ষণে আপনার যাহা অভিরুচি হয়, অনুষ্ঠান করুন।
পঞ্চাধিকশততম অধ্যায়।
ভীষ্ম কহিলেন, মাতঃ। ভরতবংশ রক্ষার উপায়ান্তর নিবেদন করি, শ্রবণ করুন। কোন গুণবান্ ব্রাহ্মহ্মণকে ধনদান দ্বারা পরিতুষ্ট করিয়া গৃহে আহ্বান করুন। তিনি বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে প্রজা উৎপন্ন করিবেন। সত্যবতী লজ্জাবতী হইয়া সহাস্য আস্যে গদ্গদস্বরে ভীষ্মকে কহিলেন, মহাবাহো। তুমি যাহা কহিতেছ তাহা যথার্থ বটে, কিন্তু বৎস! তোমার বিশ্বাসের নিমিত্ত আমি কোন কথা কহিতেছি, সবিশেষ অবগত হইয়া কার্য্য করিলে, তাহাতে বংশ রক্ষা পাইতে পারে। তুমি ধর্মজ্ঞ, তোমার নিকটে তাদৃশ আপর্দ্ধৰ্ম্ম কদাচ প্রত্যাখ্যেয় হইবে না। তুমি আমাদের কুলধৰ্ম্ম, তোমাকে সত্যস্বরূপ জ্ঞান করি, তোমা ব্যতীত আমাদের আর কোন গত্যন্তর নাই। অতএব আমার বক্তব্য সত্যবৃত্তান্ত অগ্রে শ্রবণ কর, অনন্তর যেরূপ বিবেচনা হয়, করিও। আমার পিতার একখানি তরণী ছিল। তিনি ধর্মার্থী হইয়া বিনা শুল্কে' সকলকে সেই নৌকা দ্বারা নদী উত্তীর্ণ করিয়া দিতেন। একদা পিতার আদেশক্রমে লোকদিগকে নদীপার করিবার নিমিত্ত আমি তথায় গমন করিয়াছিলাম। তৎকালে আমার যৌবনোদ্ভেদ হইয়াছিল। অনন্তর মহর্ষি পরাশর যমুনানদী উত্তীর্ণ হইবার নিমিত্ত সেই তরীর নিকট আগমন করিলেন। মুনীন্দ্র, নৌকারোহণপূর্ব্বক নদী উত্তীর্ণ হইবার সময়ে আমার রূপলাবণ্যে মোহিত ও কামার্ত হইয়া সান্ত্বনাপূর্ব্বক মধুরবাক্যে আমাকে কত কথাই বলিলেন এবং অতি দুর্লভ বর দান করিবেন বলিয়া আমার নিকট অঙ্গীকার করিলেন; আমি পিতার তিরস্কার ও মহর্ষির শাপভয়ে ভীত হইয়া তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিতে অসমর্থা হইলাম। তিনি তপঃপ্রভাবে আমায় বশীভূত এবং চতুৰ্দ্দিক কুষ্মটিকায় আবৃত করিয়া নৌকামধ্যেই আপন অভীষ্টসিদ্ধিতৎপর হইলেন। পূর্ব্বে আমার সর্ব্বাঙ্গ হইতে দুর্গন্ধ মৎস্যগন্ধ নির্গত হইত, তৎকালে মহর্ষি পরাশর সেই জুগুঙ্গিত' গন্ধের নিরাকরণপূর্ব্বক আমার শরীরে পরম রমণীয় সৌগন্ধ সঞ্চারিত করিয়াছিলেন। অনন্তর সেই মুনি আমাকে আদেশ করিলেন, তুমি এই যমুনাদ্বীপে গর্ভ মোচন করিয়া পুনর্ব্বার আপন কন্যকাবস্থা প্রাপ্ত হইবে। আমি মুনির আজ্ঞাক্রমে যমুনাদ্বীপে এক পুত্র প্রসব করিলাম। সেই মহাযোগী পরাশরাত্মজ, দ্বীপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম দ্বৈপায়ন হইল; চতুর্ব্বেদের বিভাগকর্তা বলিয়া তাঁহার নাম বেদব্যাস হইল এবং অসিতবর্ণ' বলিয়া তাঁহার নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন হইল। তিনি ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র পিতার সহিত গমন করিলেন। সেই সত্যবাদী শমপর মহাতাপসকে অনুরোধ করিলে, তিনি অবশ্যই ভ্রাতার ক্ষেত্রে পুত্র উৎপাদন করিবেন। তিনি গমনকালে আমাকে কহিয়াছিলেন "মাতঃ! সঙ্কটে পড়িলে আমাকে স্মরণ করিও” অতএব যদি তোমার মত হয়, তাহা হইলে আমি এক্ষণে সেই মহাতপাকে স্মরণ করি। তুমি অনুমতি করিলে তিনি বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে অপত্যোৎপাদন করিবেন, সন্দেহ নাই। ভীষ্ম মহর্ষি ব্যাসদেবের নাম শ্রবণ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, যে ব্যক্তি ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া এবং বুদ্ধিদ্বারা ধৰ্ম্ম ও ধর্মানুবন্ধ, অর্থ ও অর্থানুবন্ধ এবং কাম ও কামানুবন্ধ পর্যালোচনা করিয়া কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়েন, তিনিই যথার্থ বুদ্ধিমান; আপনি যেরূপ অনুমতি করিতেছেন, ইহা ধৰ্ম্মযুক্ত, মঙ্গলাস্পদ এবং আমাদিগের কুলের পরম হিতকর বটে; অতএব এ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ মত আছে।
তদনন্তর সত্যবতী দ্বৈপায়নকে স্মরণ করিলেন। বেদ-প্রণেতা ভগবান্ ব্যাস জননী স্মরণ করিয়াছেন জানিয়া, তৎক্ষণাৎ অবিদিতরূপে আবির্ভূত হইলেন। সত্যবতী বহু দিবসের পর, পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়া যথাবিধি সম্মান ও বাহুযুগলদ্বারা আলিঙ্গনপূর্ব্বক স্নেহনিঃসৃত স্তন্যদুগ্ধদ্বারা তাঁহাকে অভিষিক্ত করিলেন এবং অবিরল বিগলিত আনন্দসলিলে তদীয় হৃদয় প্লাবিত হইতে লাগিল। মহর্ষি ব্যাসও দুঃখিত জননীকে নয়নজলে অভিষিক্ত করিয়া প্রণিপাত পুরঃসর নিবেদন করিলেন, ভগবতি! আপনার অভিপ্রেত কার্য্য সাধনের নিমিত্ত আসিয়াছি, এক্ষণে অনুমতি করুন, কি প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিতে হইবে? তদনন্তর পুরোহিত আসিয়া মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক মহর্ষির যথাবিধি সপৰ্য্যা সমাধান করিলেন। ঋষিবর পূজা গ্রহণ করিলেন। ব্যাসদেব পূজিত হইয়া প্রীতমনে আসনে উপবেশন করিলে, সত্যবতী তদীয় কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, বৎস! পুত্র পিতামাতা উভয়েরই সাধারণ ধন, পুত্রের প্রতি পিতার যেরূপ প্রভুত্ব, মাতারও তদপেক্ষা ন্যূন নহে। তুমি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র, বিচিত্রবীর্য্য কনিষ্ঠ। ভীষ্ম যেন পিতৃসম্বন্ধে বিচিত্রবীর্য্যের ভ্রাতা, তুমিও তদ্রূপ মাতৃসম্বন্ধে তাঁহার ভ্রাতা। সত্যসন্ধ ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তিনি দারপরিগ্রহ ও রাজ্য শাসন করিবেন না। অতএব হে অনঘ! ভীষ্ম এবং আমি তোমাকে কোন বিষয়ে নিয়োগ করিতেছি, যদি তুমি ভ্রাতার প্রতি অনুকূল ও পৃথিবীস্থ সমস্ত প্রাণিগণের প্রতি দয়াবান্ হইয়া আমাদিগের বংশরক্ষার্থ সেই নিয়োগবাক্য রক্ষা কর, তাহা হইলে অতীব প্রীত হই, রূপযৌবনসম্পন্না তোমার ভ্রাতৃজায়ারা সাতিশয় পুত্রার্থিনী হইয়াছেন, তুমি তাঁহা-দিগের গর্তে অনুরূপ পুত্র উৎপাদন করিয়া তাঁহাদিগের মনোরথ সিদ্ধ কর। ব্যাসদেব কহিলেন, হে প্রাজ্ঞে। তুমি বিশেষরূপে সর্ব্বপ্রকার ধর্ম পরিজ্ঞাত আছ এবং ধর্ম্মের প্রতি তোমার প্রগাঢ় ভক্তি ও একান্ত অনুরাগ আছে, এই নিমিত্ত তোমার অভিলষিত কার্য্য ধৰ্ম্মমূলক বিবেচনা করিয়া আমি তদনুষ্ঠানে সম্মত হইলাম। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, ভ্রাতার ক্ষেত্রে মিত্রাবরুণ সদৃশ পুত্র উৎপাদন করিব। সম্প্রতি দেবীরা সংবৎসর কাল নিয়মবতী হইয়া আমার নির্দিষ্ট ব্রতোপাসনা করুন। তাহা হইলে তাঁহারা পবিত্র হইতে পারিবেন। ব্রতবর্জিতা অপবিত্র রমণী কদাপি আমাকে স্পর্শ করিতে পারিবে না।
সত্যবতী কহিলেন, বৎস! যাহাতে দেবীরা অচিরকাল-মধ্যে গর্ভবতী হয়েন, এরূপ অনুষ্ঠান কর; কারণ জনপদ অরাজক হইলে প্রজামণ্ডলী অনাথা ও উৎসন্না হইবে, সুতরাং তাহার সঙ্গে সঙ্গেই ধৰ্ম্ম ক্রিয়াকলাপ বিনষ্ট হইবে। তাহা হইলে যজ্ঞাংশভাগী দেবগণের পরিতৃপ্তি ও পৃথিবীতে পর্যাপ্ত বারিবর্ষণ কিরূপে সম্ভাবিত হইবে? ফলতঃ অরাজক রাজ্যের ভার গ্রহণ করা কাহারও সাধ্য নহে। অতএব হে পুত্র। তুমি অবিলম্বে ইঁহাদের গর্ভাধান কর। অনন্তর ভীষ্ম তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। ব্যাসদেব কহিলেন, যদি আপনার পুত্রবধূ, পরমব্রত-স্বরূপ আমার বিরূপতা সহ্য করিতে পারেন, তাহা হইলে আমি অকালিক পুত্র প্রদান করিব। যদি কৌশল্যা' আমার বিকটমূর্তি, ভয়ানক বেশ ও অসহ্যগন্ধ সহ্য করিতে পারেন, তাহা হইলে তিনি অদ্যই গর্ভবতী হইবেন। ভগবান্ ব্যাস সত্যবতীকে এই প্রকার আদেশ দিয়া এবং "কৌশল্যা শুচি বস্ত্র পরিধান ও রমণীয় বেশভূষা সমাধান-পূর্ব্বক শয়নাগারে আমার প্রতীক্ষা করুন” এই আজ্ঞা করিয়া অন্তর্হিত হইলেন।
অনন্তর সত্যবতী নির্জননিবাসিনী পুত্রবধূর নিকট গমন করিয়া কহিলেন, বৎসে কৌশল্যে। পরম হিতকর ধর্মোপদেশ প্রদান করি; শ্রবণ কর, আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ ভরতকূল উৎসন্নপ্রায় হইল, এজন্য যে আমি কি পর্য্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি, তাহা বলিতে পারি না এবং তোমার পিতৃবংশও সাতিশয় বিষণ্ণ হইয়াছেন, সন্দেহ নাই। মহামতি ভীষ্ম আমাদিগকে দুঃখিত ও বিষাদসাগরে নিমগ্ন দেখিয়া, সেই দুঃসহ দুঃখ নিবারণার্থ বংশ রক্ষার যে উপায় স্থির করিয়া দিয়াছেন, তাহা তোমারই অধীন; অতএব এক্ষণে সেই ভীষ্মনিৰ্দ্দিষ্ট যুক্তির অনুবর্তিনী হইয়া বিনাশোন্মুখ ভরতবংশের পুনরুদ্ধার কর। বৎসে। তুমি দেবরাজসদৃশ পুত্র প্রসব করিবে, তিনিই আমাদিগের রাজ্যভার গ্রহণ করিবেন। সত্যবতী এবংবিধ নানাপ্রকার অনুনয়বাক্যে বহু প্রযত্নে সেই ধর্মপরায়ণা ভামিনীর মন প্রবণ' করিয়া, ব্রাহ্মণ, অতিথি ও দেবর্ষি প্রভৃতিকে ভোজন করাইতে লাগিলেন।
ষড়ধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর সত্যবতী ঋতুস্নাতা পুত্র-বধূকে যথাকালে শয্যায় শয়ান করাইয়া মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, বৎসে। তোমার এক দেবর' আছেন, অদ্য নিশীথ-সময়ে তিনি তোমার নিকট আগমন করিবেন; অতএব তুমি অপ্রমত্তা হইয়া দেবরের আগমনকাল প্রতীক্ষা কর। অম্বিকা শ্বশ্রুর নির্দেশবর্তিনী হইয়া পরম রমণীয় শয্যায় শয়ন করিয়া ভীষ্ম ও অন্যান্য কৌরবদিগকে চিন্তা করিতে লাগিলেন। এই সময়ে ভগবান্ ব্যাস পূর্ব্বকৃত সত্য প্রতিপালনার্থ প্রথমতঃ অম্বিকার শয়নাগারে প্রবেশ করিলেন। তদীয় বাসভবন প্রদীপ্ত দীপশাখায় আলোকময় ছিল। অম্বিকা সেই কৃষ্ণবর্ণ মহর্ষির উজ্জল নয়নযুগল, পিঙ্গলবর্ণ জটাভার, বিশাল শ্মশ্রু প্রভৃতি অতি ভয়ঙ্কর আকার নিরীক্ষণে ভীত ও বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া নেত্রদ্বয় নিমীলিত করিলেন। ব্যাসদেব মাতার সন্তোষার্থে তাঁহার সহবাস করিলেন। অম্বিকা ভয়ক্রমে দেবরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে পারিলেন না। অনন্তর দ্বৈপায়নের বহির্গমন সময়ে তাঁহার মাতা জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন ইনি গুণবান পুত্র প্রসব করিবেন? অতীন্দ্রিয় জ্ঞানসম্পন্ন ভগবান্ ব্যাস মাতৃবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ইনি অলৌকিক ধীশক্তি-সম্পন্ন অযুতনাগের সদৃশ বলবান, সুবিদ্বান, মহাবীর্য্য, মহাভাগ, পুত্র প্রসব করিবেন এবং সেই মহাত্মার একশত পুত্র হইবে; কিন্তু তিনি স্বয়ং মাতৃদোষে জন্মান্ধ হইবেন। সত্যবতী পুত্রের কথা শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে তপোধন! অন্ধ নৃপতি কুরুবংশের অননুরূপ; অতএব এমন আর একটি পুত্র প্রদান কর, যাঁহা দ্বারা বংশরক্ষা ও রাজ্যের মঙ্গল হইতে পারে। ব্যাসদেব "তথাস্তু” বলিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অনন্তর অম্বিকা যথাকালে এক অন্ধ পুত্র প্রসব করিলেন। সত্যবতী পুত্রবধূর নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া পুনর্ব্বার ব্যাসদেবকে আহ্বান করিলেন! তিনি পূর্ব্বের ন্যায় অতি ভয়ঙ্কর মূর্ত্তি ধারণপূর্বক আবির্ভূত হইয়া জননীর নিয়োগক্রমে অম্বালিকার নিকট আগমন করিলেন। রাজমহিষী দ্বৈপায়নের সেই অদৃষ্টপূর্ব্ব ভীষণ মূর্ত্তি সন্দর্শনে ভীতা ও পাণ্ডুবর্ণা হইলেন। সত্যবতীপুত্র অম্বালিকাকে বিষণ্ণা ও বিবর্ণা দেখিয়া কহিলেন, "ভদ্রে! আমার বিরূপত্ব সন্দর্শনে পাণ্ডুবর্ণা হইয়াছ, অতএব তোমার পুত্রও পাণ্ডুবর্ণ হইবে এবং তাহার নামও পাণ্ডু হইবে।" মহর্ষি এই কথা বলিয়া বহির্গমন করেন, ইত্যবসরে সত্যবতী আসিয়া পুত্রবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলে ব্যাসদেব কহিলেন, পুত্রটি পাণ্ডুবর্ণ হইবে এবং তাহার নাম পাণ্ডু হইবে। ইহা শ্রবণ করিয়া সত্যবতী পুনর্ব্বার অপর সর্ব্বাঙ্গসুন্দর পুত্র প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি “তথাস্তু” বলিয়া মাতাকে আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অম্বালিকা যথাকালে পরমসুন্দর পাণ্ডুবর্ণ এক পুত্র প্রসব করিলেন। সেই পাণ্ডুর যুধিষ্ঠিরাদি পাঁচ পুত্র জন্মে। অনন্তর জ্যেষ্ঠা বধূর পুনর্ব্বার ঋতুকাল উপস্থিত হইলে দ্বৈপায়নের সহযোগ করিবার নিমিত্ত সত্যবতী তাঁহাকে আদেশ করিলেন। কিন্তু অম্বিকা ঋষির মূর্তি ও উগ্রগন্ধ চিন্তা করিয়া অত্যন্ত ভীত হইয়া শ্বশুর আজ্ঞায় সম্মত হইলেন না। অনন্তর তিনি অপ্সরোপমা এক দাসীকে স্বীয় অলঙ্কারদ্বারা বিভূষিতা করিয়া ঋষির নিকট প্রেরণ করিলেন। দাসী ঋষির নিকট গমন ও তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক ত্বদীয় আজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া পরমভক্তি সহকারে তাঁহার শুশ্রূষা করিতে লাগিলেন। মহর্ষি তাঁহার সহযোগে পরমপ্রীত হইয়া গাত্রোত্থানপূর্ব্বক কহিলেন, “হে শুভে! তুমি দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইবে এবং তোমার গর্ভজাত পুত্র অসাধারণ বুদ্ধিমান্ ও পরম ধার্মিক হইবে।”
সেই দাসীগর্ভসম্ভূত দ্বৈপায়নাত্মজ বিদুর নামে বিখ্যাত হইলেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্র ও মহাত্মা পাণ্ডুর ভ্রাতা। মহাতপাঃ মাণ্ডব্য মুনির শাপে ধর্মরাজ বিদুররূপী শূদ্রার গর্ভে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। মহর্ষি দ্বৈপায়ন স্বীয় প্রলম্ভ' ও শূদ্রার পুত্রজন্মবৃত্তান্ত সত্যবতীকে নিবেদন করিয়া ধর্ম্মের নিকট অঋণী হইয়া তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইলেন। এইরূপে দ্বৈপায়নের ঔরসে ও বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুরের জন্ম হয়।
সপ্তাধিকশততম অধ্যায়।
জনমেজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্ ধৰ্ম্মরাজ কি দুষ্কর্ম করিয়াছিলেন যে তিনি শাপগ্রস্ত হইলেন এবং কোন ব্রহ্মহ্মর্ষির শাপেই বা তিনি শূদ্রযোনি প্রাপ্ত হইলেন। বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! শ্রবণ করুন। মাণ্ডব্য নামে সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, তপোনিরত, পরমধার্মিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। সেই মৌনব্রতাবলম্বী, মহাতপাঃ আশ্রমের দ্বারদেশস্থ বৃক্ষমূলে উপবেশনপূর্ব্বক ঊর্দ্ধবাহু হইয়া যোগাভ্যাস করিতেন। এইরূপে বহুকাল অতীত হইলে এক দিবস লোপ্তাহারী' কতিপয় দস্যু মাণ্ডব্যের আশ্রমে প্রবিষ্ট হইল। তস্করেরা নগরপালদিগের ভয়ে ভীত হইয়া তথায় স্তেয় ধন লুক্কায়িত করিয়া প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিতি করিতে লাগিল। অনন্তর অনুগামী নগরপালসকল তথায় উপস্থিত হইয়া ঋষিকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, হে দ্বিজোত্তম। তস্করেরা কোন্ পথ দিয়া পলায়ন করিয়াছে, শীঘ্র আজ্ঞা করুন, আমরা সেই দিকে তাহাদিগকে অন্বেষণ করি।
ঋষি মৌনব্রতাবলম্বী ছিলেন, সুতরাং ভালমন্দ কিছুই বলিলেন না। অনন্তর রাজপুরুষেরা ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিতে করিতে লুক্কায়িত স্তেয় ধন আশ্রমে দেখিতে পাইল। তখন ঋষির প্রতি তাহাদিগের বিলক্ষণ সন্দেহ হওয়াতে তাহারা সেই ঋষিকে ও দস্যুদলকে রুদ্ধ করিয়া রাজ গোচরে আনয়ন করিল। রাজা ও নগরপালদিগের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া ঋষি ও তস্করগণের প্রাণবধস্বরূপ দণ্ডবিধান করিলেন। রাজপুরুষেরা আজ্ঞা পাইবামাত্র তপোধনকে শূলে আরোপিত করিয়া হৃতধন গ্রহণপূর্ব্বক রাজসমীপে প্রত্যাগমন করিল। তপোনিষ্ঠ মুনিবর আপন দুরবস্থার বিষয় কিছুই জানিতে পারিলেন না এবং তাঁহার তপস্যারও ভঙ্গ হইল না। তিনি শূলবিদ্ধ আহারবিহীন হইয়াও বহুকাল পর্যন্ত জীবন ধারণ করিয়াছিলেন। একদা রজনীযোগে কতিপয় মহর্ষি পক্ষীরূপ ধারণ করিয়া তথায় আগমনপূর্ব্বক মাণ্ডব্যের তাদৃশী দুরবস্থা দর্শনে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আপনি এমন কি পাপ করিয়াছেন যে শূলবিদ্ধ হইলেন? বলুন, শুনিতে আমা-দিগের নিতান্ত বাসনা হইতেছে।
অষ্টাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর মুনিবর সমাগত তপোধনদিগকে কহিলেন, আমি কাহার উপর দোষারোপ করিব? কেহই আমার অপরাধ করে নাই। ইহা শুনিয়া মুনিগণ প্রস্থান করিলেন। মহামুনি মাণ্ডব্য তদবস্থায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। এইরূপে বহুকাল অতীত হইলে, একদিবস নগর-পালেরা মহর্ষিকে তদবস্থায় নিরীক্ষণ করিয়া রাজসমীপে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিল। রাজা নগরপালের মুখে সমুদায় শ্রবণ করিয়া মন্ত্রিগণের সহিত পরামর্শ স্থির করিয়া শূলস্থ ঋষিকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত অশেষ প্রকার যত্ন করিতে লাগিলেন। তিনি অতি বিনীতভাবে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আমি মোহান্ধতা-প্রযুক্ত যে গুরুতর দুষ্কর্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি, তন্নিমিত্ত এক্ষণে ক্ষমা প্রার্থনা করি, আপনি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হইবেন না, প্রসন্ন হউন। ভূপতির বিনয়ে মুনীন্দ্র প্রসন্ন হইলেন। পরে রাজা তাঁহাকে শূল হইতে অবতরণ করাইয়া শূল বহির্গত করিবার নিমিত্ত অনেক যত্ন করিলেন, কিছুতেই কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। পরিশেষে শূলের মূলচ্ছেদ করিয়া দিলেন। ঋষি সেই অন্তর্গত শূল বহন করত সর্ব্বত্র পর্য্যটন করিতে লাগিলেন। তদবধি তিনি ভূমণ্ডলে অণীমাণ্ডব্য বলিয়া কথিত হইলেন। একদা তিনি যমসদনে গমনপূর্ব্বক সিংহাসনোপবিষ্ট ধর্মরাজকে তিরস্কার করিয়া কহিলেন, হে ধৰ্ম্ম! আমি যে পাতকের ফলভোগ করিতেছি, ইহা কোন্ দুষ্কর্ম্মের পরিণাম, শীঘ্র বল, আমি এই মুহূর্তেই আমার তপোবল প্রকাশ করিতেছি।
ধৰ্ম্ম কহিলেন, তপোধন! আপনি পতঙ্গের পুচ্ছদেশে তৃণ প্রবিষ্ট করিয়াছিলেন, সেই দুষ্কর্ম্মের প্রতিফল প্রাপ্ত হইয়াছেন। অণীমাণ্ডব্য কহিলেন, ধৰ্ম্ম! তুমি আমার লঘু পাপে গুরুদণ্ড বিধান করিয়াছ, এই নিমিত্ত তোমাকে মনুষ্য হইয়া শূদ্রযোনি প্রাপ্ত হইতে হইবে। আর আমি অদ্যাবধি পাপপুণ্যের সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিতেছি। চতুৰ্দ্দশ বর্ষের অনধিক বয়ঃক্রমে কেহ পাপ-পুণ্যের ফলভাগী হইবে না, পঞ্চদশ বর্ষ অবধি কার্য্যানুসারে ফললাভ হইবে। ধৰ্ম্মরাজ স্বীয় অপরাধে মহাত্মা অণীমাণ্ডব্যকর্তৃক অভিশপ্ত হইয়া বিদুররূপে শূদ্রযোনিতে জন্ম-গ্রহণ করিলেন। তিনি ধর্মার্থচিন্তায় কুশল, লোভশূন্য, জিতক্রোধ, বহুদর্শী, শমপর ও কৌরবগণের পরম হিতৈষী ছিলেন।
নবাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর এই তিন কুমার জন্মগ্রহণ করিলে, কুরুজাঙ্গল, কুরব এবং কুরুক্ষেত্র এই তিনটি জনপদ অতীব সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া উঠিল; পৃথিবী সরস ও সুস্বাদু শস্যে পরিপূর্ণা হইল; পর্জন্য' যথাকালে জলবর্ষণ করিতে লাগিল; পাদপসকল সুরস ফলকুসুমে সুশোভিত হইল। গবাশ্বাদি-বাহনসকল প্রহৃষ্ট, মৃগযূথ ও পক্ষিগণ সানন্দ, কুসুমমালা সুগন্ধি এবং ফলরাশি রসপূর্ণ হইল; নগর, ব্যবসায়ী ও শিল্পিগণে পরিব্যাপ্ত হইল এবং জনপদস্থ সমস্ত লোক মহাবলপরাক্রান্ত, কৃতবিদ্য, সচ্চরিত্র ও পরম সুখী হইল। তৎকালে দস্যুতস্করের কিছুমাত্র প্রাদুর্ভাব রহিল না; অধর্মাচার, লোকের অন্তর হইতে এককালে অন্তর্হিত হইল। প্রজাগণের রীতি, নীতি, সদাচার ও সদ্ব্যবহার সন্দর্শনে সে সময়কে সত্যযুগ বলিয়া প্রতীয়মান হইত। প্রজামণ্ডলী ধৰ্ম্মনিরত, যজ্ঞশীল, সত্যপরায়ণ, ব্রতনিষ্ঠ ও পরস্পর প্রণয়পর হইয়া স্বচ্ছন্দে কালাতিপাত করিত। সকল লোকই অভিমানশূন্য, জিতক্রোধ ও লোভবিহীন হইল। দিন দিন তাহাদিগের ধর্মপ্রবৃত্তির শ্রীবৃদ্ধি হইয়া উঠিল। জলপূরিত জলনিধির ন্যায় সেই জনাকীর্ণ নগর মেঘাকার তোরণকলাপ' দ্বারা অনির্বচনীয় শোভমান হইল। শত শত সুরম্য হ্যদ্বারা মহেন্দ্রনগরী অমরাবতীর ন্যায় প্রতীয়মান হইতে লাগিল। বিলাসী নগরবাসী সকল তত্রত্য নদ, নদী, সরোবর প্রভৃতি জলাশয়ে এবং পরম রমণীয় বন, উপবন ও ক্রীড়াশৈলে মনের সুখে বিহার করিয়া বিপুল আনন্দ অনুভব করিতে আরম্ভ করিল। দাক্ষিণাত্য' কুরুগণ উদীচ্য কুরুদিগের সর্ব্বদাই স্পর্দ্ধা করিতেন। সেই সুরম্য জনপদে কেহই কৃপণভাবে ছিলেন না; পতিবিহীনা কামিনী নেত্রগোচর হইত না, লোকহিতার্থে স্থানে স্থানে কূপ, বাপী' আরাম ও সভাসকল প্রতিষ্ঠিত ছিল, সুসমৃদ্ধ বিপ্রভবন সকল অবিরত উৎসবময় পরিলক্ষিত হইত; ধর্মাত্মা ভীষ্মের পরিরক্ষিত সেই জনপদের ঐশ্বর্য্য ও রমণীয়তার আর পরিসীমা রহিল না। চৈত্য ও যূপকাষ্ঠ তত্রস্থ জনগণের যাগশীলতার প্রমাণস্বরূপ লক্ষিত হইত। সেই সকল দেশ অন্যান্য রাজ্যের সাহায্য ব্যতিরেকেও পরিবর্দ্ধিত হইত; ধৰ্ম্মাত্মা ভীষ্ম তথায় ধর্মচক্র প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন; রাজকুমারেরা নিরন্তর সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিতেন; পৌর ও জনপদসকল তাঁহাদিগের আচরিত প্রণালী অবলম্বন করিবার নিমিত্ত সাতিশয় উৎসুক হইয়াছিলেন। তত্রত্য কুরুপ্রধানদিগের ও নগরবাসিগণের ভবনে 'দীয়তাং ভুজ্যতাং” এই বাক্যই সর্ব্বদা শ্রুতিগোচর হইত; মহাত্মা ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডু এবং মহামতি বিদুর ইঁহাদিগকে জন্মাবধি পুত্রনির্বিশেষে প্রতিপালন করিতেন; তিনি তাঁহাদিগকে জাত-ক্রিয়া প্রভৃতি সমস্ত সংস্কারে সংস্কৃত করিয়াছিলেন; উপযুক্ত শিক্ষকের সন্নিধানে নিযুক্ত করিয়া অধ্যয়ন করাইয়াছিলেন এবং পরিশ্রমে ও ব্যায়ামে সুনিপুণ করিয়াছিলেন। রাজতনয়েরা তরুণাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া ধনুর্ব্বেদ, গদাযুদ্ধ, অসিচৰ্ম্মপ্রয়োগ, গজশিক্ষা, নীতিশাস্ত্র, ইতিহাস, পুরাণ, বেদাঙ্গ প্রভৃতি সমস্ত অধ্যেতব্য বিষয়ে পারদর্শী হইয়া উঠিলেন। তন্মধ্যে পাণ্ডু অদ্বিতীয় ধানুষ্ক ও ধৃতরাষ্ট্র অসাধারণ বলবান্ ছিলেন। বিদুরের ন্যায় ধার্মিক ত্রিভুবনমধ্যে দৃষ্টিগোচর হইত না। প্রনষ্টপ্রায় শান্তনুবংশ পুনরুদ্ধৃত হইলে সর্ব্বত্র সত্যের সমাদর ও গৌরব বৃদ্ধি হইল। মহারাজ! তৎকালে সমস্ত বীর-প্রসবিনী রমণীগণের মধ্যে কাশীশ্বরনন্দিনী, দেশের মধ্যে কুরুজাঙ্গল, ধার্মিকের মধ্যে বিদুর এবং নগরের মধ্যে হস্তিনাপুর শ্রেষ্ঠ হইয়া উঠিল। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ ছিলেন, বিদুর পারশব', সুতরাং পাণ্ডুই সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন।
দশাধিকশততম অধ্যায়।
একদা ভীষ্ম বিদুরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস। ভূমণ্ডলস্থ সমস্ত নরেন্দ্রকুল অপেক্ষা অস্মৎকুল সমধিক গুণভূয়িষ্ঠ' ও সুপ্রসিদ্ধ। ইহা পূর্ব্বতন সুধাৰ্ম্মিক নরেন্দ্রগণকর্তৃক পরিরক্ষিত হইয়া আসিতেছে। অধুনা ইহার উচ্ছেদ নিতান্ত দুর্ব্বিষহ বিবেচনা করিয়া ভগবতী সত্যবতী, মহাত্মা দ্বৈপায়ন এবং আমি এই তিন জনে মিলিত হইয়া যুক্তিযুক্ত ও শাস্ত্রসিদ্ধ উপায়োদ্ভাবনপূর্ব্বক তোমাদিগকে উৎপাদন করাইয়া পুনর্ব্বার ইহাকে প্রতিষ্ঠিত করিলাম। অতএব এক্ষণে যাহাতে আমাদিগের বংশের ক্রমশঃ উন্নতি হয়, তাহার উপায় বিধান করা আমা-দিগের সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য সন্দেহ নাই। শুনিয়াছি মদ্রেশ্বর ও সুবলের পরমসুন্দরী এক এক কুমারী আছে, তাহারা আমা-দিগের কুলের অনুরূপা; অতএব সেই কুলীনা কামিনীদ্বয়ের সহিত ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর সম্বন্ধ স্থির করা উচিত। এই কুলের স্থায়িতার নিমিত্ত আমি তাহাদিগকে বরণ করিতে অভিলাষ করি, তোমার অভিপ্রায় কি? বিদুর কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাদিগের পিতৃতুল্য ও পরম গুরু, অতএব যাহা উচিত হয় স্বয়ং বিচারপূর্ব্বক অনুষ্ঠান করুন। অনন্তর কুরুপিতামহ ভীষ্ম বিপ্রগণ প্রমুখাৎ শ্রবণ করিলেন সুবলাত্মজা গান্ধারী, ভগবান, ভবানীপতিকে আরাধনা করিয়া বরলাভ করিয়াছেন যে, তিনি এক শত পুত্রের জননী হইবেন; সেই কন্যার প্রার্থনায় গান্ধার-রাজের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন; গান্ধাররাজ সুবল প্রথমতঃ ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ বলিয়া কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিলেন, পরিশেষে সবিশেষ পর্যালোচনা করিয়া সুবিখ্যাত কুল, মহতী খ্যাতি ও সবৃত্ত জামাতার অভিলাষে তাঁহাকেই কন্যাদান করিতে কৃতনিশ্চয় হইলেন। যখন গান্ধারী শ্রবণ করিলেন যে, পিতা মাতা তাঁহাকে নয়নবিহীন পাত্রে সম্পাদন করিতে অভিলাষী হইয়াছেন, তখনই সেই পতিপরায়ণা সান্দ্র' বস্ত্রদ্বারা স্বীয় নেত্রযুগল বন্ধন করিলেন এবং মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন যে, পতি অন্ধ বলিয়া তাঁহাকে কদাপি অশ্রদ্ধা বা অসূয়া করিব না। অনন্তর গান্ধাররাজতনয় পিতৃ-আজ্ঞায় অভিনব যৌবনবতী ও লক্ষ্মীযুক্তা ভগিনী লইয়া কৌরবসমীপে উপনীত হইলেন। তদনন্তর ভীষ্মের অনুমতিক্রমে তাঁহাকে ধৃতরাষ্ট্র হস্তে সম্প্রদান করিলেন এবং তিনি ভীষ্মকর্তৃক যথোচিত পূজিত হইয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করিলেন। বরারোহা' গান্ধারী সদাচার, সদ্ব্যবহার ও সুশীলতা প্রদর্শনদ্বারা সমস্ত কৌরবগণের পরম সন্তোষ জন্মাইতে লাগিলেন। তিনি গুরুশুশ্রূষা ও সকলকে প্রিয় সম্ভাষণ করিতেন এবং কদাপি কাহারও অকীর্ত্তি বা নিন্দা করিতেন না।
একাদশাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, যদুবংশাবতংস শূরনামা নৃপতি বসুদেবের জনয়িতা ছিলেন। প্রথমে তাঁহার পৃথানাম্নী পরম রূপবতী তনয়া জন্মিয়াছিল। শূর, অনপত্য পিতৃস্বস্পুত্র কুন্তি-ভোজের নিকট পূর্ব্বাবধি প্রতিজ্ঞারূঢ় ছিলেন যে, আমার প্রথম সন্ততি তোমাকে প্রদান করিব; এক্ষণে তদনুসারে নির্মম হইয়া পরমমিত্র কুন্তিভোজকে সেই কন্যা প্রদান করিলেন। কুন্তিভোজ কন্যারত্ন লইয়া ঔরসবৎ পরমযত্নে লালন-পালন করিতে লাগিলেন। পৃথা পিতাগৃহে দিনে দিনে দ্বিতীয় চন্দ্রকলার ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। কুন্তিভোজের পালিতা বলিয়া সকলে তাঁহাকে কুন্তী নামে আহ্বান করিত।
কুন্তী কন্যাবস্থায় ব্রাহ্মণসেবায় ও অতিথি-পরিচর্যায় নিযুক্ত ছিলেন এবং সর্ব্বপ্রযত্নসহকারে পরিচর্য্যাদ্বারা অভ্যা-গতদিগকে পরিতুষ্ট করিতেন। একদা ধার্মিকাগ্রগণ্য তেজস্বী, জিতেন্দ্রিয়, মহর্ষি দুর্ব্বাসাঃ কুন্তীভোজের গৃহে আতিথ্য স্বীকার করিলেন। আতিথেয়ী' কুন্তী ভক্তিযোগসহকারে ও পরম সমাদরে তাঁহার সেবাবিধি নির্ব্বাহ করিলে, মহর্ষি পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে এক মহামন্ত্র প্রদান করিলেন এবং কহিয়া দিলেন, বৎসে! আমি তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া তোমাকে এই মহামন্ত্র প্রদান করিলাম, তুমি ইহা পাঠ করিয়া যে যে দেবতাকে আহ্বান করিবে, তাঁহাদের প্রভাববলে তোমার গর্ভে এক এক পুত্র উৎপন্ন হইবে। মুনিবর এই বলিয়া প্রস্থান করিলে পর কুন্তী বালস্বভাব-সুলভ কৌতূহলা-ক্রান্ত হইয়া মহর্ষিদত্ত মন্ত্রদ্বারা সূর্যদেবকে আহ্বান করিলেন। মন্ত্রবলে অশেষ ভুবনদ্বীপ-দীপক' ভগবান্ তৎক্ষণাৎ আসিয়া সম্মুখে উপস্থিত হইলেন এবং কহিলেন, সুন্দরি! তোমার অভিপ্রায়ানুসারে উপস্থিত হইয়াছি, বল, কি করিতে হইবে? কুন্তী এই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, ভগবন্। এক ব্রাহ্মণ | আমাকে বিদ্যা ও বর প্রদান করিয়া যান, আমি তৎপরীক্ষা-বাসনায় আপনাকে আহ্বান করিয়া অতি মূঢ়ের কার্য্য করিয়াছি, আমার অপরাধ হইয়াছে, ভগবন্! এক্ষণে চরণে ধরিয়া বিনয়পূর্ব্বক প্রার্থনা করিতেছি, কৃপাময়। কৃপা প্রকাশ করিয়া অপরাধ মার্জনা করুন। স্ত্রীলোক সহস্র অপরাধে অপরাধিনী হইলেও তাহাকে ক্ষমা করা মহতের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। সূর্য্যদেব কুন্তীর কাতরোক্তি শুনিয়া মধুর বচনে কহিলেন, সুন্দরি। মহর্ষি দুর্ব্বাসাঃ তোমাকে যে বর প্রদান করিয়া গিয়াছেন, আমি তৎসমস্ত অবগত আছি, তুমি ভীত হইও না। অসন্দিগ্ধচিত্তে আমার ভোগাভিলাস পূর্ণ কর; দেখ, শুভে! তুমি আমাকে আহ্বান করিয়াছ, আমি তাহাতেই আসিয়াছি, এক্ষণে আমার মনোরথ ব্যর্থ করা কোনক্রমেই উচিত নহে; আর যদি তুমি একান্তই অসম্মত হও, তাহা হইলে অবশ্যই দোষভাগিনী হইবে, সন্দেহ নাই। সূর্যদেব এইরূপ নানাপ্রকার বুঝাইলেও কুন্তী কন্যাবস্থা ও লজ্জাভয়ের অনুরোধে স্বীকার পাইলেন না। তখন সূর্য্যদেব পুনর্ব্বার কহিলেন, হে বরবর্ণিনি! তোমার কিছুমাত্র শঙ্কা নাই, আমি কহিতেছি, আমার প্রসাদবলে ইহাতে কোন দোষই হইবে না; এই বলিয়া কুন্তীকে সম্মত করিয়া তাঁহার সহিত সহবাসে প্রবৃত্ত হইলেন। সূর্য্যদেবের সহযোগে কুন্তী গর্ভবতী হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ সর্ব্বশাস্ত্রবেত্তা কবচ কুণ্ডলধারী, পরম রূপবান্ এক পুত্র সন্তান প্রসব করিলেন। ঐ পুত্র ভুবনতলে কর্ণ নামে বিশ্রুত হইয়াছিল। ভগবান্ সূর্য্যদেব তুষ্ট হইয়া কুন্তীকে কন্যাত্ব প্রদান করিয়া অম্বরতলে' আরোহণ করিলেন। কুন্তী সদ্যোজাত নবকুমার দর্শনে বিষণ্ণমনে ভাবিতে লাগিলেন, এখন কি করি? এবিষয় কি গোপনে রাখিব? না প্রকাশ করিব? পরিশেষে বন্ধুজনভয়ে আত্মদোষ গোপন করাই শ্রেয়ঃকল্প স্থির করিয়া সেই মহাবল পরাক্রান্ত সদ্যঃপ্রসূত কুমারকে লইয়া সলিলে নিক্ষেপ করিলেন। যশস্বী রাধাভর্তা সেই নবকুমারকে জলে ভাসমান দেখিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে গৃহানয়নপূর্ব্বক পুত্রত্বে পরিগ্রহ করিলেন এবং-ঐ কুমার, বসু অর্থাৎ কবচকুণ্ডলরূপ ধনের সহিত জন্মিয়াছে বলিয়া, ইহার নাম বসুষেণ রাখিলেন। বসুষেণ ক্রমে ক্রমে প্রাপ্ত বয়স্ক ও সর্ব্বাস্ত্রবিশারদ হইয়া উঠিলেন। তিনি প্রত্যহ প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরাধনা করিতেন; সেই সময়ে ব্রাহ্মণেরা তাঁহার নিকট যাহা প্রার্থনা করিতেন, অতি দুষ্প্রাপ্য হইলেও তিনি তৎপ্রদানে পরাজুখ হইতেন না।
একদা দেবরাজ ইন্দ্র অর্জুনের হিত সাধনার্থে ব্রাহ্মণ বেশ ধারণপূর্ব্বক তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার অঙ্গস্থ কবচ ভিক্ষা চাহিলে তিনি তৎক্ষণাৎ শরীর হইতে নৈসর্গিক কবচ মোচন করিয়া বিপ্ররূপধারী ইন্দ্রের হস্তে প্রদান করিলেন। সুরপতি কবচ গ্রহণ করিলেন বটে, কিন্তু অলৌকিক ব্যাপার দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইলেন এবং তাঁহাকে প্রীতিদায়স্বরূপ একশক্তি অস্ত্র প্রদান করিয়া কহিলেন, বৎস! আমি তোমার অসাধারণ কার্য্য দর্শনে সন্তুষ্ট হইয়াছি, এই একপুরুষ-ঘাতিনী শক্তি দিতেছি গ্রহণ কর, ইহাতে তোমার বিশেষ উপকার দর্শিবে; কি সুর, কি অসুর, কি বানর, কি গন্ধর্ব্ব, কি ভুজঙ্গ, কি রক্ষঃ, কি যক্ষ, যাহার প্রতি এই অস্ত্র নিক্ষেপ করিবে, তাহার আর নিস্তার নাই, সে অবশ্যই ইহাতে নিপাতিত হইবে; এই বলিয়া কবচ লইয়া অমররাজ অমরাবতীতে প্রস্থান করিলেন। বসুষেণ স্বীয় শরীর ভেদ করিয়া ইন্দ্রকে কবচ প্রদান করিলেন বলিয়া তদবধি ক্ষিতিতলে কর্ণ ও বৈকর্ত্তন নামে বিখ্যাত হইলেন।
দ্বাদশাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এদিকে কুন্তী কুন্তিভোজালয়ে থাকিয়া ক্রমে ক্রমে নবযৌবনাবস্থায় আরূঢ় হইলেন। লোকমুখে তাঁহার অসামান্য রূপলাবণ্যের বিষয় অবগত হইয়া নানা-দিগদেশস্থ ভূপতিগণ পাণিগ্রহণাভিলাষে কুন্তিভোেজসকাশে দূত প্রেরণ করিতে লাগিলেন। কুন্তিভোেজ অনেককেই কন্যার পরিণয়াকাঙ্ক্ষী দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, কি করি, কাহাকে কন্যা প্রদান করা উচিত? পরিশেষে স্বয়ংবরানুষ্ঠানই কর্তব্য স্থির করিয়া সকল রাজগণকে স্বভবনে আসিতে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন। তাঁহারা সকলে মনোহর বেশভূষা ধারণ করিয়া নিরূপিত দিবসে স্বয়ংবরস্থলে উপস্থিত হইলেন; মনস্বিনী কুন্তী পিতার আদেশক্রমে পতি মনোনীত করিতে হস্তে পুষ্পমাল্য লইয়া রঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, তথায় ভরতবংশাবতংস মহাবল পরাক্রান্ত ভূপতি শ্রেষ্ঠ পাণ্ডু সূর্য্যসদৃশ অনুপম স্বীয় শরীরপ্রভা দ্বারা সমস্ত ভূপতিগণের প্রভা আচ্ছাদন করিয়া রহিয়াছেন। তাঁহার প্রতাপ সিংহসম, বক্ষদেশ কপাটোপম এবং নয়নযুগল বিকচকমল সদৃশ; দেখিলে স্পষ্ট বোধ হয়, যেন পুরন্দর স্বপুর পরিত্যাগ করিয়া কুস্তী-কামনায় সভায় উপস্থিত হইয়াছেন। বরবর্ণিনী কুস্তিভোজদুহিতা নরপতির সেই মোহনমূর্তি নিরীক্ষণে স্মরশরে জর্জরিত কলেবর হইয়া লজ্জানস্র মুখে তাঁহার কণ্ঠদেশে বরমাল্য প্রদান করিলেন। কুস্তী পাণ্ডু নরবরে বরত্বে বরণ করিলেন দেখিয়া অন্যান্য ভূপতিগণ নিজ নিজ বাহনে আরোহণপূর্ব্বক স্ব স্ব দেশে প্রস্থান করিলেন। কুন্তিভোজ শুভলগ্নে পাণ্ডু নৃপতির সহিত কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। বর কন্যা একত্র সঙ্গত হইয়া শচীসখ সহস্রাক্ষের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন।
বেদবিধানানুসারে উদ্বাহক্রিয়া সমাধা হইল। কুন্তিভোজ নানা ধনসম্পত্তি যৌতুক দিয়া পাণ্ডুকে কন্যার সহিত স্বনগরে পাঠাইয়া দিলেন। কুরুকুলপ্রদীপ মহীপতি পাণ্ডু ধ্বজপতাকা-শালিনী মহতী পতাকিনী' সমভিব্যাহারে মহর্ষিগণ ও দ্বিজগণের আশীর্ব্বচন শ্রবণ করিতে করিতে স্বপুরে প্রবেশ করিলেন এবং রাজভবনে প্রণয়িনী সহধর্মিণী কুন্তীকে রাখিয়া পরমসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।
ত্রয়োদশাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, নরপতি পাণ্ডুর আর এক বিবাহ দিতে মনস্থ করিয়া প্রধান অমাত্য, ব্রাহ্মণ ও মহর্ষিগণ সঙ্গে লইয়া চতুরঙ্গিনী সেনা সমভিব্যাহারে মদ্রাধিপতির নগরে গমন করিলেন। মদ্ররাজ শল্য ভীষ্মের আগমনবার্তা শ্রবণমাত্র সত্বর হইয়া স্বয়ং প্রত্যুদ্গমনপুরঃসর সাদর সম্ভাষণে ও পরম সমাদরসহকারে তাঁহাকে পুরপ্রবেশ করাইলেন এবং বসিবার আসন, পাদ্য, অর্ঘ্য, মধুপর্কাদি প্রদান করিয়া যথোচিত সম্মান করিলেন। পরে আগমনকারণ জিজ্ঞাসিলে কুরুকুলতিলক ভীষ্ম কহিলেন, মদ্রপতে! শুনিলাম পরমরূপবতী মাদ্রীনাম্নী তোমার ভগিনী আছে, তুমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র পাণ্ডুর সহিত তাহার বিবাহ দাও, এই মানসে তোমার দেশে আসিয়াছি; দেখ, তোমাদের ও আমাদের যে বংশ উভয়ই পবিত্রাদিগুণে সমান, কোন অংশে বৈলক্ষণ্য নাই, অতএব পাণ্ডুকে ভগিনী দান করিয়া আমাদিগের সহিত কুটুম্বিতা কর। ভীষ্মবাক্য শ্রবণ করিয়া মদ্ররাজ বিনয় গর্ভবচনে কহিলেন, মহাশয়। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহাতে আমার কদাচ অসম্মতি নাই, শুনিয়া আমার পরম পরিতোষ জন্মিল; কুরুবংশ পরিত্যাগ করিয়া আর কোথায় ভগিনী দান করিব? আপনাদের কুলগতা ভগিনীর অনেক সৌভাগ্য মানিতে হইবে, কিন্তু মহাশয়। আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা যে এক বিষম নিয়ম স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, আপনি তাহা সবিশেষ জ্ঞাত আছেন, ভালই হউক বা মন্দই হউক, আমি তাহা লঙ্ঘন করিতে পারিব না; আপনাকেও সেই নিয়ম প্রতিপালন করিতে হইবে, কারণ উহা আমাদিগের কুলধর্ম। ভীষ্ম কহিলেন, মদ্ররাজ! তুমি চিন্তিত হইও না, স্বয়ং প্রজাপতি শুল্কগ্রহণ পূর্ব্বক কন্যাদানের নিয়ম নির্দ্ধারিত করিয়াছেন, তোমার কুলধৰ্ম্মনির্দোষ ও সাধুসম্মত, অবশ্যই প্রতিপালিত হইবে। এই বলিয়া ভীষ্ম শল্যকে রথ, গজ, তুরগ, বসন, ভূষণ ও মণি মুক্তা প্রবাল প্রভৃতি দ্রব্যজাত শুল্কস্বরূপ প্রদান করিলেন। শল্য তৎসমুদায় গ্রহণপূর্ব্বক পরম প্রীত হইয়া অলঙ্কৃতা স্বীয় ভগিনী মাদ্রীকে লইয়া ভীষ্ম হস্তে সমর্পণ করিলেন।
ভীষ্ম মাদ্রীকে লইয়া হস্তিনানগরে গমনপূর্ব্বক রাজ-বাটীতে রাখিয়া দিলেন এবং কিয়দ্দিনপরে শুভলগ্ন দেখিয়া পাণ্ডুর সহিত তাঁহার পরিণয়ক্রিয়া সম্পন্ন করিলেন। উদ্বাহ সমাপ্তি হইলে পর, মহারাজ পাণ্ডু পরম রমণীয় হ্যমধ্যে নবপ্রণয়িনীর বাসস্থান নিরূপিত করিলেন। কুন্তী ও মাদ্রীর পরস্পর বিলক্ষণ সৌহার্দ্দদ জন্মিয়াছিল। পাণ্ডু তাঁহাদিগের উভয়কে লইয়া স্বেচ্ছাবিহারে পরমসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।
এইরূপে ত্রয়োদশ নিশা অন্তঃপুরে বিহার করিয়া দিগ্বিজয়-বাসনায় বাটী হইতে বহির্গত হইলেন এবং ভীষ্ম প্রভৃতি বৃদ্ধগণ ও জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রকে অভিবাদন করিয়া ও অন্যান্য কুরুপ্রধান ব্যক্তিদিগকে আমন্ত্রণপূর্ব্বক সকলের অনুমতি লইয়া চতুরঙ্গ সৈন্য সমভিব্যাহারে দিগ্বিজয়ার্থ যাত্রা করিলেন। যাত্রা-কালে নগরাঙ্গনারা নানাবিধ মঙ্গলাচরণ ও ব্রাহ্মণগণ আশীর্ব্বচন করিতে লাগিলেন। কুরুকুলের কীর্ত্তিকর পাণ্ডুনরবর প্রথমতঃ দশার্ণদেশে প্রয়াণপূর্ব্বক পূর্ব্বাপরাধী দশার্ণপতিকে সমরে পরাজয় করিলেন। অনন্তর হস্ত্যশ্ব-রথ-পদাতি-সস্কুল বিপুল বলবৃন্দ সঙ্গে লইয়া মগধদেশে উপস্থিত হইলেন। তথায় অনেকানেক ভূপতিদিগের অপকারী বলদর্প সমন্বিত মগধ-রাজকে সংহার করিয়া তাঁহার কোষস্থ ধনসমুদায় ও বাহনচয় আত্মসাৎ করিলেন। পরে মিথিলায় যাইয়া বিদেহদিগকে সংগ্রামে পরাভব করিলেন। তাহারা তাঁহার একান্ত বশংবদ হইল। পরিশেষে কাশী, সুম্মা, পুণ্ড্র প্রভৃতি অপরাপর দেশে প্রয়াণপূর্ব্বক তত্রস্থ ভূপতিবর্গকে পরাজয় করিয়া কুরুকুলের অক্ষয় কীর্তি সংস্থাপিত করিলেন। এইরূপে শত্রুকুলান্তক পাণ্ডু অনলবৎ অস্ত্রশিখায় নরপতিদিগকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডুর তেজঃপ্রভাবে বলরাজি' বিধ্বংসিত হইলে ভূপালেরা বশীভূত হইয়া কুরুকুলের মঙ্গলকর ব্যাপারে ব্যাপৃত হইল; আর মহাবীর পাণ্ডুকে আপনাদিগের একাধিপতি জ্ঞান করিয়া বিনীতভাবে কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার সমীপে আগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে মণি, মুক্তা, প্রবাল, সুবর্ণ, রজত, গো, অশ্ব, রথ, হস্তী, গৰ্দ্দভ, উষ্ট্র, মহিষ, কম্বল, অজিন, রাঙ্কব', আস্তরণ প্রভৃতি নানাবিধ দ্রব্যজাত উপহার প্রদান করিলেন। মহারাজ পাণ্ডু সেই সমস্ত রাজদত্ত বস্তুজাত লইয়া পরমাহ্লাদে হস্তিনানগরাভিমুখে গমন করিলেন। রাজসিংহ শান্তনু ও ধীমান্ ভরতের যশোজনিত শব্দ বিলুপ্তপ্রায় হইয়াছিল, এক্ষণে পাণ্ডুর প্রভাবে তাহা পুনরুদ্ধৃত হইল। যাহারা পূর্ব্বে কুরুদিগের রাজ্য এবং ধন হরণ করিয়াছিল, হস্তিনাধিপতি পাণ্ডু তাহাদিগের নিকট হইতে কর গ্রহণ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডুর বীর্য্যবলাকৃষ্ট হইয়া ধন্যবাদ প্রদান করিতে করিতে মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে অন্যান্য রাজগণ পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতে লাগিলেন। পাণ্ডু শ্রবণসুখাবহ তৎসমস্ত শ্রবণ করিয়া প্রফুল্লমনে হস্তিনানগরে সমীপবর্তী হইলেন। ভীষ্ম লোকমুখে পাণ্ডুর আগমনবার্তা শ্রবণে সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া পৌর, জানপদ ও অমাত্যগণ সমভিব্যাহারে প্রত্যুদ্গমন করিলেন। কৌরবেরা ভীষ্মের সহিত হস্তিনানগর হইতে কিয়দ্দুর গমন করিয়া, পাণ্ডুর সেনারা বিচিত্ররত্ন পরিপূর্ণ অসংখ্য যান, হস্তী, অশ্ব, রথ, গো, উষ্ট্র, মেষ প্রভৃতি জয়লব্ধ বস্তুজাত লইয়া আসিতেছে, দর্শন করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলেন। তাহারা ক্রমে সন্নিহিত হইলে কৌশল্যা-নন্দবর্দ্ধন পাণ্ডু ভীষ্মের পাদবন্দন করিয়া অন্যান্য পৌর ও জনপদদিগের সমুচিত সম্মান করিলেন। ভীষ্ম অশেষরাষ্ট্র-বিজয়ী প্রত্যাগত পাণ্ডুকে আলিঙ্গন করিয়া আনন্দাশ্রু মোচন করিতে লাগিলেন। তূর্য্য, শঙ্খ, দুন্দুভি প্রভৃতি নানাবিধ বাদ্যযন্ত্র বাদিত হইতে লাগিল। পৌরগণের আনন্দের সীমা রহিল না। ভীষ্ম পাণ্ডুকে লইয়া হস্তিনানগরে প্রবেশ করিলেন।
চতুৰ্দ্দশাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডু হস্তিনাপুরে গমন করিয়া স্ববাহুবলবিজিত ধনদ্বারা ভীষ্ম, সত্যবতী, মাতা কৌশল্যা ও বিদুরকে সন্তুষ্ট করিলেন। ইন্দ্রাণী যেমন জয়ন্তকে আলিঙ্গন করিয়া আহ্লাদিত হন, কৌশল্যা অপ্রতিমতেজাঃপুত্র পাণ্ডুকে আলিঙ্গন করিয়া ততোধিক আনন্দিত হইলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র মহাবীর পাণ্ডুর প্রভাবে বহুদক্ষিণ শত শত অশ্বমেধ যজ্ঞ নির্ব্বাহ করিলেন।
কিয়দ্দিন অতীত হইলে মহারাজ পাণ্ডু সুরম্য হর্ম্ম ও বিচিত্র শয়নীয় সমুদায় ত্যাগ করিয়া পত্নীদ্বয় সঙ্গে বনবিহার বাসনায় বনপ্রস্থান করিলেন, তথায় সর্ব্বদা মৃগয়ানুষ্ঠান করিয়া প্রিয়তমাদের সহিত পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। কখন হিমালয়ের দক্ষিণপার্শ্ববর্তী উপত্যকায় ভ্রমণ করিতেন, কখন গিরিপৃষ্ঠে সুখসঞ্চার করিয়া পরিতৃপ্ত হইতেন, কখন কখন বা মহাশালবনে অবস্থিতি করিতেন। করেণু'দ্বয়ের মধ্যবর্তী হইলে গজরাজ ঐরাবত যেরূপ শোভিত হয়, পত্নীদ্বয় সঙ্গে থাকায় বনচর নৃপবর পাণ্ডুও সেইরূপ শোভিত হইয়াছিলেন! বন-বাসিগণ, ভার্য্যাদ্বয়সমবেত খড়গহস্ত ধনুর্ব্বাণধারী বিচিত্র কবচযুক্ত অস্ত্রকোবিদ পাণ্ডুকে দেবতা বলিয়া জ্ঞান করিত। তাঁহার যখন যাহা আবশ্যক হইত, ধৃতরাষ্ট্রপ্রেরিত ভৃত্যগণ তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিত। এইরূপে পাণ্ডু মহীপাল প্রণয়িনীদ্বয় সমভিব্যাহারে পরমসুখে কাননমধ্যে বাস করিতে লাগিলেন।
এদিকে শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, মহীপতি দেবকের পরম সুন্দরী যুবতী পারশবী তনয়াকে আনয়নপূর্ব্বক বিদুরের সহিত বিবাহ দিলেন। বিদুর তাঁহার গর্ভে স্বসদৃশ বিনয়সম্পন্ন পুত্রগণ উৎপাদন করিলেন।
পঞ্চদশাধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধৃতরাষ্ট্রের গান্ধারীগর্ভে শত পুত্র ও বৈশ্যাপত্নীর গর্তে এক পুত্র জন্মে এবং ধৰ্ম্ম প্রভৃতি পঞ্চ দেব হইতে কুন্তী ও মাদ্রীর গর্তে পান্ডুর মহারথ পঞ্চপুত্র জন্মগ্রহণ করেন, তাঁহাদের হইতে এই কুরুবংশ রক্ষা পাইয়াছে।
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! গান্ধারীর গর্তে ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্র কিরূপে জন্মিল ও কত দিন পরেই বা তাহাদের আয়ুশেষ হইল? আর বৈশ্যার গর্তেই বা ধৃতরাষ্ট্র কিরূপে পুত্রোৎপাদন করিলেন? তিনি অনুকূলকারিণী ধর্মচারিণী প্রণয়িনী গান্ধারীর সহিত কিরূপ ব্যবহার করিতেন? এবং দেব হইতে কিরূপে শাপগ্রস্ত মহাত্মা পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র উৎপন্ন হইল, এই সমস্ত আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করিয়া আমার অপরিতৃপ্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, একদা মহর্ষি দ্বৈপায়ন সাতিশয় ক্ষুৎপিপাসায় শ্রমান্বিত হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের ভবনে সমুপস্থিত হইলে, গান্ধারী পরম সমাদরে তাঁহার শুশ্রূষা করিলেন। মহর্ষি সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া বরপ্রদান করিতে চাহিলে, গান্ধারী কহিলেন, যদি অনুকূল হইয়া থাকেন, তবে এই বরপ্রদান করুন যে, যেন আমার গর্তে আমার ভর্তার সমান গুণশালী শত পুত্র জন্মে। ব্যাস “তথাস্তু” বলিয়া প্রস্থান করিলেন। কিয়দ্দিনানন্তর ধৃতরাষ্ট্রের সহযোগে গান্ধারী গর্ববতী হইলেন। তাঁহার গর্ব-ধারণের পর দুই বৎসর অতীত হইল, তথাপি তিনি সন্তান প্রসব করিলেন না। একদিন গান্ধারী শুনিলেন যে, কুস্তীর বালসূর্য্য সমপদ এক পত্র জন্মিয়াছে। তৎশ্রবণে তিনি সাতিশয় ঈর্ষান্বিত হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের অজ্ঞাতসারে আপনার গর্ভপাত করিলেন। ঐ গর্ভে সংহতা' লোহষ্ঠিলার' ন্যায় এক দ্বিবর্ষ-সম্ভূতা' মাংসপেশী জন্মিল। গান্ধারী তদ্দর্শনে সাতিশয় দুঃখিতা হইয়া সেই মাংসপেশী পরিত্যাগ করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমত সময়ে ভগবান্ ব্যাস তথায় উপস্থিত হইয়া মাংসপেশী দর্শনপূর্ব্বক গান্ধারীকে কহিলেন, সৌবলেয়ি! এ কি করিয়াছ? গান্ধারী মহর্ষির সমীপে আপনার অভিপ্রায় গোপন না করিয়া কহিলেন, মহাত্মন্! অগ্রে কুন্তীর পুত্র জন্মিয়াছে শুনিয়া আমি দুঃখিত হইয়া এই গর্ভপাত করিয়াছি! আপনি আমাকে পূর্ব্বে বর প্রদান করিয়াছেন, আমার গর্ভে শত পুত্র জন্মিবে; এক্ষণে এই মাংসপেশী হইতে শত পুত্র উৎপন্ন করুন। ব্যাস কহিলেন, সৌবলেয়ি। আমার বাক্য কখন মিথ্যা হইবার নহে। মাংসপেশী নষ্ট করিও না। ইহা হইতে অবশ্যই তোমার শত পুত্র উৎপন্ন হইবে। তুমি গুপ্ত প্রদেশে ঘৃতপূর্ণ শতসংখ্যক কুম্ভ প্রস্তুত করিয়া এই মাংসপেশীর উপর জলসেচন কর। গান্ধারী ব্যাসের বচনা-নুসারে কুম্ভ প্রস্তুত করিয়া মাংসপেশীর উপর জলসেচন করিতে লাগিলেন। জলসেচের পর কিয়ৎক্ষণ মধ্যে মাংসপেশী একাধিক শত খণ্ডে বিভক্ত হইয়া গেল। উহার এক এক খণ্ড অঙ্গুষ্ঠ-পর্ব্বপরিমিত হইল। অনন্তর গান্ধারী সেই সকল খণ্ড পূর্ব্বপ্রস্তুত কুম্ভসকলের মধ্যে গূঢ়রূপে স্থাপিত করিয়া সাবধানে রক্ষা করিতে লাগিলেন। ভগবান্ ব্যাস, গান্ধারীকে কহিলেন, হে সৌবলেয়ি! আর দুই বৎসরের পর এই সকল কুম্ভ উদ্ঘাটন করিও। ইহা বলিয়া মহর্ষি তপস্যা করিবার নিমিত্ত হিমাচলে প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর দুই বৎসর অতীত হইলে, প্রথমতঃ দুর্য্যোধন জন্মিল, ঐ দিবসেই মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের জন্ম হয়। যুধিষ্ঠির জন্মানুসারে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ হইলেন। দুরাত্মা দুর্য্যোধন জাতমাত্র গর্দভের ন্যায় কর্কশ ধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল; গর্দভ, গৃধ, গোমায়ু, বায়স প্রভৃতি অমঙ্গলসূচক জন্তুগণ এই ধ্বনি শ্রবণ করিয়া ভয়ানকস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। সেই সময়ে বায়ু প্রবলবেগে বহিতে লাগিল; দিগ্দাহ আরম্ভ হইল; ফলত তৎকালে অশেষবিধ অমঙ্গলসূচক ঘটনা উপস্থিত হইল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র তদ্দর্শনে সাতিশয় ভীত ও ব্যাকুল হইয়া বিজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ, ভীষ্ম, বিদুর, অন্যান্য সুহৃদ্গণ ও কুরুগণকে ডাকাইয়া কহিলেন, মহাশয়েরা সকলে উপস্থিত আছেন, রাজপুত্র যুধিষ্ঠির সর্ব্বজ্যেষ্ঠ ও গুণবান্, অতএব এ রাজ্য তিনিই পাইবেন, তদ্বিষয়ে আমার কিছুই বক্তব্য নাই; এক্ষণে এই জিজ্ঞাস্য যে, আমার এই জ্যেষ্ঠপুত্র যুধিষ্ঠিরের পর রাজ্যভাক্ হইবে কি না? আপনারা কি বিবেচনা করেন বলুন। ধৃতরাষ্ট্রের বাক্যা-বসান হইলে ভয়ঙ্কর ক্রব্যাদ্গণ' ডাকিতে লাগিল, অমঙ্গলসূচক শিবাগণ ধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। ব্রাহ্মণগণ ও ধীমান্ বিদুর সেই সমস্ত দুর্নিমিত্ত লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, রাজন। | আপনার জ্যেষ্ঠপুত্র জন্মিবামাত্র এই সকল দুর্নিমিত্ত উপস্থিত হইল, অতএব স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, এই দুরাত্মা হইতেই। কুরুকুল ধ্বংস হইবে। আমাদের মতে ইহাকে পরিত্যাগ করাই কর্তব্য; রাখিলে মহান্ অনর্থ ঘটিবে। মহীপাল। যদি বংশ রক্ষা করিবার বাসনা থাকে, তবে এই দুরাত্মাকে পরিত্যাগ করিয়া অপর একোনশত পুত্রের সহিত সুখে কালযাপন করুন। ইহাকে পরিত্যাগ করিলেই তোমার বংশের ও জগতের মঙ্গল করা হয়। শাস্ত্রকারেরা কহিয়া গিয়াছেন, যদি এক জনকে পরিত্যাগ করিলে কুল রক্ষা হয়, তাহা অবশ্যই করিবে; যদি কুল পরিত্যাগ করিলে গ্রাম রক্ষা হয়, তাহা করা কর্তব্য; গ্রাম পরিত্যাগদ্বারা যদি জনপদ রক্ষা হয়, তাহা করা উচিত; এবং সমস্ত পৃথিবী পরিত্যাগ করিলেও যদি আত্মরক্ষা হয়; তাহাও বিধেয়। তাঁহারা সেই সদুপদেশ প্রদান করিলেও রাজা ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহবশতঃ তাঁহাদের বাক্যানুসারে কার্য্য করিলেন না। দুর্য্যোধনের জন্মের কিয়দ্দিন পরে ধৃতরাষ্ট্র অপর উনশত পুত্র ও এক কন্যা জন্মিল। ফলতঃ একমাসের মধ্যেই ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্র ও এক কন্যা সমুৎপন্ন হইল।
যৎকালে গান্ধারী গর্ন্তবর্তী ছিলেন, তখন তিনি গর্ব-ভারাক্রান্ত হইয়া নিতান্ত ক্লিশ্যমান হন। সেই সময় একজন বৈশ্যা ধৃতরাষ্ট্রের পরিচর্যায় নিযুক্ত ছিল। ঐ বৈশ্যা ধৃতরাষ্ট্রের সহযোগে গর্ভবতী এবং যথাকালে এক পুত্র সন্তান প্রসব করে; ঐ পুত্রের যুযুৎসু নাম হইয়াছিল।
হে রাজন! এইরূপে ধীমান্ ধৃতরাষ্ট্রের গান্ধারীর গর্ভে শত পুত্র ও এক কন্যা এবং বৈশ্যার গর্ভে যুযুৎসুনামা এক পুত্র জন্মিল।
ষোড়শাধিকশততম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষে! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের জন্মবৃত্তান্ত সবিশেষ শ্রবণ করিলাম, কিন্তু আপনি কহিলেন, গান্ধারীর গর্ভে শত পুত্র ও এক কন্যা জন্মে, তন্মধ্যে শত পুত্র মহর্ষি বেদব্যাসের বরে জন্মিল। কিন্তু কন্যাটি কিরূপে জন্মিল, বিশেষ কহিলেন না। অমিততেজাঃ মহর্ষি গান্ধারী প্রসূত মাংসপেশী শত খণ্ডে বিভক্ত করিয়াছিলেন এবং গান্ধারীও আর কখন গর্ভধারণ করেন নাই, তবে কি প্রকারে দুঃশলানাম্নী শতাধিকা কন্যার জন্ম হইল? শ্রবণার্থ সাতিশয় কৌতুক জন্মিয়াছে, মহাশয়। বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! উত্তম প্রশ্ন করিয়াছেন, শ্রবণ করুন। মহাতপাঃ ভগবান্ ব্যাস শীতল জল সেচন দ্বারা সেই মাংসপেশী এক এক ভাগ করিলেন। ধাত্রী সেই সকল ভাগ লইয়া একে একে এক এক ঘৃতকুম্ভমধ্যে রাখিতে লাগিল। সেই সময় গান্ধারী মনে মনে চিন্তা করিলেন, মহর্ষি বাক্য কখনই মিথ্যা হইবার নহে অবশ্যই আমার একশত পুত্র হইবে। কিন্তু যদি আমার এক কন্যা জন্মিত, তাহা হইলে আমার পরম পরিতোষের বিষয় হইত, আমার পতি দৌহিত্রজনিত লোক প্রাপ্ত হইতেন, আমিও পুত্র দৌহিত্র লইয়া সুখস্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিয়া কৃতকৃত্যা হইতাম। আমি যদি কখন তপস্যা, দান, হোম বা গুরুজনসেবা করিয়া থাকি, তাহা হইলে সেই পুণ্যবলে যেন আমার এক কন্যা হয়। গান্ধারী এইরূপ চিন্তা করিতেছেন, এমত সময়ে মহর্ষি ব্যাস তাঁহার আন্তরিক ভাব বুঝিয়া সেই সকল ভাগ গণনা করিয়া দেখিলেন, শতাপেক্ষায় এক ভাগ অধিক হইয়াছে। তখন তিনি গান্ধারীকে কহিলেন, বৎসে! এই শতভাগ তোমার শতপুত্ররূপে পরিণত হইবে; আর এই যে এক ভাগ অবশিষ্ট রহিল, ইহাতে তুমি এক কন্যাও উৎপন্ন দেখিবে এবং তাহার গর্ভে যে পুত্র জন্মিবে তদ্দ্বারা তোমার দৌহিত্রজনিত লোক প্রাপ্তি হইবে। এই বলিয়া মহর্ষি আর এক ঘৃতপূর্ণ কুম্ভ আনাইয়া তন্মধ্যে সেই কন্যাভাগ রক্ষা করিলেন। হে মহারাজ! এই দুঃশলার জন্মবৃত্তান্ত কথিত হইল, অতপর কি বর্ণন করিতে হইবে বলুন।
সপ্তদশাধিকশততম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে বিপ্রর্ষে! জ্যেষ্ঠানুজ্যেষ্ঠতাক্রমে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের নাম আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! শ্রবণ করুন; দুর্য্যোধন, যুযুৎসুরাজ, দুঃশাসন, দুঃসহ, দুঃশল, জলসন্ধ, সম, সহ, বিন্দ, অনুবিন্ধ, দুর্দ্ধর্ষ, সুবাহু, দুষ্পধর্ষণ, দুৰ্ম্মর্ষণ, দুর্মুখ, দুষ্কর্ণ, কর্ণ, বিবিংশতি বিকর্ণ, শল, সত্ত্ব, সুলোচন, চিত্র, উপচিত্র, চিত্রাক্ষ, চারুচিত্র, শরাসন, দুৰ্ম্মদ, দুর্ব্বিগাহ, বিবিৎসু, বিকটানন, ঊর্ণনাভ, সুনাভ, নন্দ, উপনন্দক, চিত্রবাণ, চিত্রবর্মা, সুবৰ্ম্মা, দুর্ব্বিমোচন, অয়োবাহু, মহাবাহু, চিত্রাঙ্গ, চিত্রকুণ্ডল, ভীমবেগ, ভীমবল, বলাকী, বলবর্দ্ধন, উগ্রায়ুধ, সুষেণ, কুণ্ডধার, মহোদর, চিত্রায়ুধ, নিষঙ্গী, পাশী, বৃন্দারক, দৃঢ়বৰ্ম্মা, দৃঢ়ক্ষত্র, সোমকীর্তি, অনুদর, দৃঢ়সন্ধ, জরাসন্ধ, সত্যসন্ধ, সদ, সুবাক্, উগ্রশ্রবাঃ, উগ্রসেন, দুষ্পরাজয়, অপরাজিত, কুণ্ডশায়ী, বিশালাক্ষ, দুরাধর, দৃঢ়হস্ত, সুহস্ত, বাতবেগ, সুবর্চ্চাঃ, আদিত্যকেতু, বহাশী, নাগদত্ত, অগ্রযায়ী, কবচী, ক্রথন, কুণ্ডী, ধনুর্দ্ধর, উগ্র, ভীমরথ, বীরবাহু, অলোলুপ, অভয়, অনাদৃষ্য, কুণ্ডভেদী, বিরাবী, চিত্রকুণ্ডল, প্রমথ, প্রমাথী, দীর্ঘরোম, দীর্ঘবাহু, ব্যুঢ়োরু, কনকধ্বজ, কুণ্ডাশী, বিরজাঃ এই একশত পুত্র ও দুঃশলানাম্নী কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে গান্ধারীর গর্তে জন্মে। ইহাদের নামধেয় আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তিত হইল। পুত্রগণ সকলেই অতিরথ, শূর, যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ, বেদবেত্তা ও সর্ব্বাস্ত্রনিপুণ হইয়া-ছিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র যথাকালে নানাদেশ হইতে পরীক্ষিত পরম-সুন্দরী কামিনীগণ আনাইয়া তাহাদের সহিত নিজপুত্রগণের বিবাহ দিলেন এবং দুঃশলাকন্যা সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথকে সম্প্রদান করিলেন।
অষ্টাদশাধিকশততম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে তপোধন। ব্যাসবরজনিত ধৃতরাষ্ট্র-সন্তানগণের জন্ম ও তাহাদের প্রত্যেকের নাম আনুপূর্ব্বিক আপনার নিকট শ্রবণ করিলাম; এক্ষণে পাণ্ডব-দিগের জলারবার কীর্তন করুন। আপনি দেবগণের অংশা-বতরণ বর্ণন-সময়ে কহিয়াছেন যে, ইন্দ্রসম পরাক্রান্ত মহাত্মা পাণ্ডবগণ দেব-অংশে জন্মগ্রহণ করেন, এক্ষণে সেই মহাত্মা-দিগের জন্মবৃত্তান্ত সবিশেষ কীর্ত্তন করিয়া আমার অভিলাষ পূর্ণ করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! শ্রবণ করুন। একদা মৃগয়া বিহারী মহীপাল পাণ্ডু মৃগব্যালসেবিত মহারণ্যমধ্যে ভ্রমণ করিতেছিলেন এমত সময়ে দেখিতে পাইলেন, এক মৃগযূথপতি তথায় মৃগীর সহিত ক্রীড়ারসে ব্যাপৃত রহিয়াছে। তিনি মৃগ ও মৃগীকে একবারে প্রমত্ত দেখিয়া তাহাদের উপর উপর্যুপরি পাঁচ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহারাজ! ঐ মৃগ প্রকৃত মৃগ নহে, মহা-তেজাঃ এক ঋষিপুত্র; ঋষিতনয় ভার্য্যার সহিত মৃগরূপ পরিগ্রহণ করিয়া পরমসুখে ক্রীড়া করিতেছিলেন, পাণ্ডুর বজ্রসম শরাঘাতে ব্যাকুলেন্দ্রিয় হইয়া তৎক্ষণাৎ ধরাতলে পতিত হইলেন এবং আর্তনাদসহকারে নানা বিলাপ করিয়া পাণ্ডুকে কহিলেন, মহারাজ। যাহারা নিতান্ত কামক্রোধপরতন্ত্র, অত্যন্ত নির্বোধ ও একান্ত পাপাসক্ত, তাহারাও ঈদৃশ বিষম নৃশংসাচরণে পরাজুখ হয়, তুমি পরম ধর্মাত্মাদিগের অকলঙ্ককুলে জন্মগ্রহণ করিয়া এই দুষ্কর্ম করিলে। রাজন। তর্কবাদদ্বারা বিধির নাশ হয় না, কিন্তু বিধির দ্বারা তর্কবাদ নষ্ট হইয়া থাকে, অতএব বিধিবিরুদ্ধ কার্য্যে হস্তক্ষেপ করা ভবাদৃশ প্রাজ্ঞলোকের কর্তব্য নহে। পাণ্ডু কহিলেন, রাজাদিগের শত্রুবধ যেমন কর্তব্য, মৃগবধও সেইরূপ কর্তব্য; প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্যই হউক, মৃগ পাইলেই বধ করিবে। দেখ, মহর্ষি অগস্ত্য যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য মৃগয়া করিয়াছিলেন। মৃগবসাদ্বারা তাঁহার হোমকার্য্য নির্বাহ হইয়াছিল; অতএব আমাকে আর বৃথা তিরস্কার করিও না। মৃগ কহিল, রাজন। যাহা কহিলেন, যথার্থ বটে, কিন্তু ব্যসনসময়ে শত্রুর উপর শর নিক্ষেপ করা প্রাজ্ঞলোকের কর্তব্য নহে; ন্যায়যুদ্ধেই শত্রু বধ করিবার বিধি প্রদান করিয়াছেন। পাণ্ডু কহিলেন, মত্ত, ভীত বা পলায়িত শত্রুকে বধ করাই অবিধেয় কিন্তু ভবাদৃশ মৃগ বধ করা কোনক্রমেই অবিধেয় নহে। মৃগ কহিল, মহারাজ! তুমি আমাকে যে মৃগভ্রমে বধ করিয়াছ, তাহাতে দোষ দিতে কদাচ পারি না, কিন্তু আমার বিহার-বিরতিকাল প্রতীক্ষা করা তোমার অবশ্যই উচিত ছিল। কোন্ ভদ্র লোক অসময়ে ইন্দ্রিয়াসক্ত মৃগকে বধ করিয়াছে? হে রাজেন্দ্র। আমি পুরুষার্থফললিঙ্গু' হইয়া এই মৃগীতে আসক্ত হইয়াছিলাম, তুমি আমাকে তদ্বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ ও একান্ত বঞ্চিত করিলে। মহারাজ। তুমি অনিন্দ্যকর্মা পৌরবদিগের নিৰ্ম্মলকুলে জন্মিয়াছ, তোমার এতাদৃশ নৃশংস লোকবিগর্হিত, অস্বাৎ, অযশস্কর অধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম করা কোন ক্রমেই সঙ্গত ও উচিত হয় নাই। তুমি শাস্ত্রজ্ঞ, ধর্মার্থতত্ত্বজ্ঞ ও রতিকোবিদ'; তোমার ঈদৃশ দুষ্কর্ম করা অত্যন্ত অবিধেয় হইয়াছে! হে পার্থিবেন্দ্র! নৃশংসাচারী পাপপরায়ণ ধর্মার্থকামবিহীন দুরাচারগণের দণ্ডবিধান করা তোমার কর্তব্য, তাহা না করিয়া এই অসদনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়া স্বয়ংই দণ্ডাৰ্হ হইলে। হে নরনাথ! আমি ফলমূলাহারী অরণ্যবাসী নিরপরাধ মুনি, মৃগবেশ ধারণ করিয়া বিহার করিতেছিলাম, আমাকে মারিয়া তুমি কি দুষ্কর্ম করিলে। হে রাজন। তুমি যেমন আমাকে ভার্য্যার সহিত অপবিত্র সময়ে বধ করিলে, আমিও শাপ দিতেছি, তোমারও ঈদৃশ অপবিত্র সময়ে মৃত্যু হইবে। আমি তপোনিরত মুনি; আমার নাম কিন্দম, আমি লোকলজ্জাভয়ে মৃগরূপ ধারণপূর্ব্বক গহনবনে আসিয়া এই মৃগীতে আসক্ত হইয়াছিলাম, তুমি আমাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া জানিতে পার নাই। মৃগভ্রমেই আমার উপর শর নিক্ষেপ করিয়াছ, এ নিমিত্ত তোমার ব্রহ্মহত্যার পাপ হইবে না, কিন্তু সঙ্গমসময়ে আমাকে বধ করাতে তোমার যে পাপ হইয়াছে, তাহার ফল অবশ্যই তোমাকে ভোগ করিতে হইবে। তুমি যে সময়ে স্ত্রীসংসর্গ করিবে, সেই সময়েই তোমার মৃত্যু হইবে। তুমি যে পত্নীর সহিত সংসর্গ করিয়া কালগ্রাসে পতিত হইবে, তিনি ভক্তিভাবে তোমার সহগামিনী হইবেন। হে রাজন! তুমি যেমন সুখের সময় আমাকে দুঃখ দিলে, সেইরূপ তোমাকেও সুখকালে দুঃখ পাইতে হইবে।
হে কুরুবংশাবতংস জনমেজয়! মৃগরূপধারী মুনি পাণ্ডুকে এই প্রকার শাপ প্রদান করিয়া প্রাণত্যাগ করিলেন। নরপতি পাণ্ডু তদ্দর্শনে সাতিশয় দুঃখিত হইলেন।
ঊনবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ পাণ্ডু স্বীয় বান্ধবের ন্যায় সেই মৃগীরূপী তপোধনকে পরিত্যাগ করিয়া দুঃখিতচিত্তে ভার্য্যার সহিত নানাপ্রকার বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তাঁহার মনোমধ্যে উদয় হইল যে, যথেচ্ছাচারী দুরাত্মা সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করিলেও আপন কৰ্ম্মদোষে অশেষবিধ দুর্গতি ভোগ করে। শুনিয়াছি, আমার পিতা পরম ধর্মাত্মার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি নিতান্ত কামপরায়ণতা প্রযুক্ত বাল্যকালেই কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন। বাচংযম' ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সেই কামাত্মা নরপতির ক্ষেত্রে আমাকেই উৎপাদন করিয়াছেন। হায়! সেই মহাত্মার পুত্র হইয়াও দুর্বৃদ্ধিক্রমে অতি গর্হিত মৃগয়া ব্যসনের নিমিত্ত বনে বনে ভ্রমণ করিতেছি। সম্প্রতি ব্যাসপ্রণীত সুবৃত্তির অনুবর্তী হইয়া মোক্ষধর্ম আচরণ করিব, যেহেতু সংসারবন্ধন অপেক্ষা ক্লেশকর আর কিছু নাই। আমি অদ্যাবধি কঠোর তপস্যায় মনোনিবেশ করিব। ভার্য্যা ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধব-গণ পরিত্যাগ করিয়া একাকী আশ্রমে আশ্রমে পরিভ্রমণ করিব। ইষ্টানিষ্ট পরিত্যাগপূর্ব্বক ধূলিধূসরিত কলেবর হইয়া শূন্যগৃহে বা বৃক্ষমূলে শয়ন করিয়া থাকিব। কি শোক, কি হর্ষ, কিছুরই বশংবদ' হইব না। নিন্দা ও প্রশংসা উভয়কেই সমান জ্ঞান করিব। কাহারও আশীর্ব্বাদ বা নমস্কার গ্রহণেচ্ছু হইব না। সুখদুঃখের বশীভূত হইব না, কাহাকেও উপহাস বা ভ্রুকুটি প্রদর্শন করিব না। সর্ব্বদা প্রসন্নবদনে ও সর্ব্বভূতের হিতকার্য্যে তৎপর থাকিব। কি স্থাবর, কি জঙ্গম, কাহারও হিংসা করিব না। সকল প্রাণিগণকে আপনার সন্তানের ন্যায় দেখিব। জীবন ধারণের নিমিত্ত বৃক্ষ সকলের নিকট ভিক্ষা চাহিব। যদি তাহারা ভিক্ষা না দেয় তবে এককালে পাঁচ জন গৃহস্থের বাটিতে ঊর্দ্ধ সংখ্যা দশজনের গৃহে ভিক্ষা করিব। তাহাতে যাহা প্রাপ্ত হইব, অতি অল্প হইলেও তদ্দ্বারাই জীবন ধারণ করিব! অধিক লাভের আশায় দশ গৃহের অধিক স্থলে ভিক্ষা করিব না। যে দিবস দশ গৃহে ভিক্ষা করিয়াও কিছুই পাইব না, সে দিন উপবাস করিয়া থাকিব। ক্ষতি ও লাভ সমান জ্ঞান করিব। বাষ্প-বারিদ্বারা এক বাহু সিক্ত করিব, অন্য বাহুতে চন্দন লেপন করিব। কি মঙ্গল, কি অমঙ্গল কিছুই চিন্তা করিব না। কোন মাঙ্গলিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিব না। ধর্মার্থলিপ্সা পরিত্যাগ করিব। সকল পাপ হইতে বিমুক্ত হইব। সমুদায় বন্ধন অতিক্রম করিব। কাহারও বশীভূত হইব না। স্বীয় অভিলাষ পূর্ণ করিবার নিমিত্ত নিস্তেজঃ লোকের মত কাহারও সেবা করিব না; কারণ উপাসনাদ্বারা বশীভূত লোকের নিকট হইতে অতি সম্মানপূর্ব্বক স্বাভিলষিত দ্রব্য লাভ করিলেও শ্ববৃত্তি' অবলম্বন করা হয়। ফলতঃ এক্ষণে আমার এই স্থির নিশ্চয় যে, অতি অকিঞ্চিৎকর অচিরস্থায়ী বিষয়াভোগমুখে এককালে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক মুক্তিপথ অবলম্বন ও মানসিক ভূমানন্দ অনুভব করিয়া চরমে মুক্তিপদ লাভ করিব।
পাণ্ডু সাতিশয় দুঃখিতচিত্তে এই প্রকার বিলাপ করত কুন্তী ও মাদ্রীর দিকে চাহিয়া কহিলেন, তোমরা হস্তিনানগরে গমনপূর্ব্বক কৌশল্যা, বিদুর, সবান্ধব রাজা ধৃতরাষ্ট্র, আর্য্যা সত্যবতী, ভীষ্ম, রাজপুরোহিতগণ, সোমপায়ী শংসিতব্রত, মহাত্মা ব্রাহ্মণগণ ও অস্মদাশ্রিত পৌরবদিগকে অনুনয় করিয়া এই কথা কহিবে যে, পাণ্ডু রাজ্যাশ্রম পরিত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করিয়াছেন, আর গৃহে আসিবেন না। স্বামীর বনবাসে একান্ত অভিলাষ জানিয়া কুন্তী ও মাদ্রী তৎকালোচিত বিনয়বচনে কহিলেন, মহারাজ। সন্ন্যাসাশ্রম ব্যতীত অন্যান্য অনেক আশ্রম আছে, যাহাতে সস্ত্রীক হইয়াও ধর্মাচরণ করিতে পারা যায়; আপনি তাহার মধ্যে কোন আশ্রম আশ্রয় করিয়া আমাদিগের সহিত তপস্যা করুন, পরিশেষে কলেবর পরিত্যাগ করত স্বর্গে গমন করিয়া তথায় আধিপত্য করিতে পারিবেন। আমরাও আপনার সহিত ইন্দ্রিয়গ্রাম সংযমনপূর্ব্বক ভোগাভিলাষে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক ভর্তৃলোক প্রাপ্ত্যাশয়ে কঠোর তপস্যা করিব। আর যদি আপনি তাহা না করিয়া নিতান্তই আমাদিগকে পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে অদ্যই আমরা প্রাণ পরিত্যাগ করিব, সন্দেহ নাই।
পাণ্ডু কহিলেন, যদি তোমাদের আমার সঙ্গে বাস করিয়া তপস্যা করিতে নিতান্তই বাসনা হইয়া থাকে, তবে অদ্যাবধি গ্রাম্যসুখ পরিত্যাগ, বল্কলধারণ, ফলমূল ভক্ষণ, উভয় সন্ধ্যায় হোম ও স্নান, পরিমিতাহার, চীর', চৰ্ম্ম ও জটাধারণ, শীতবাতা-তপক্লেশ সহ্য, ক্ষুৎপিপাসায় অনবধান, ইন্দ্রিয়সংযমন এবং বন্য ফল, জল ও মন্ত্রদ্বারা দেবগণ ও পিতৃগণের তর্পণ করত দুশ্চর তপোনুষ্ঠানদ্বারা শরীর শুষ্ক করিতে থাক। কি বানপ্রস্থগণ, কি আত্মীয় বান্ধবগণ, কি অন্যান্য গ্রামবাসিগণ, কাহারও সহিত সাক্ষাৎকার বা কাহারও কোন অপ্রিয়াচরণ করিবে না; এইরূপে কঠোর আরণ্যশাস্ত্রবিধান অবলম্বনপূর্ব্বক যাবজ্জীবন কালযাপন করিবে।
মহারাজ পাণ্ডু ভার্য্যাদ্বয়কে এই কথা বলিয়া চূড়ামণি, নিষ্ক, অঙ্গদ, কুণ্ডল, মহামূল্যবসন ও স্ত্রীদিগের আভরণ প্রভৃতি সমুদায় দ্রব্য, বিপ্রগণকে প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, আপনারা হস্তিনাপুরে গমন করিয়া কহিবেন যে, পাণ্ডু বনে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়াছেন, আর তথা হইতে প্রত্যাগমন করিবেন না। তাঁহা-দিগকে এই প্রকার আদেশ করিয়া নরপতি পাণ্ডু অর্থ, কাম, রতি, সুখ প্রভৃতি সমুদায় পরিত্যাগপূর্ব্বক পত্নীদ্বয় সমভি-ব্যাহারে লইয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। অনুচর ও পরিচারকগণ তাঁহার বিবিধ করুণবাক্য শ্রবণে সাতিশয় বিষণ্ণ হইয়া উচ্চৈঃস্বরে হাহাকার করিতে লাগিল। পরে তৎপ্রদত্ত সমুদায় ধন গ্রহণপূর্ব্বক অশ্রুনয়নে হস্তিনানগরে গমন করিয়া মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সমীপে সমুদায় বৃত্তান্ত আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করিল এবং তদ্দত্ত সমুদায় সম্পত্তি সমর্পণ করিল। ভূপতি ধৃতরাষ্ট্র, তাহাদের মুখে পাণ্ডুর বনবাসবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া একান্তে বিষণ্ণমনাঃ হইয়া আহার, বিহার, শয়ন প্রভৃতি সমুদায় সুখ পরিত্যাগপূর্ব্বক দিনযামিনী কেবল চিন্তাসাগরে নিমগ্ন রহিলেন।
এদিকে মহীপতি পাণ্ডু কেবল বন্য ফল-মূলমাত্র আহার দ্বারা কথঞ্চিৎ জীবন ধারণ করিয়া পত্নীদ্বয় সমভিব্যাহারে নাগশত নামা পৰ্ব্বতে উপস্থিত হইলেন। তৎপরে নাগশত হইতে চৈত্ররথ, তথা হইতে কালকূট, তথা হইতে হিমালয় ও হিমালয় হইতে গন্ধমাদন পর্ব্বতে গমন করিলেন। পাণ্ডু নৃপতি মহাভূত, সিদ্ধ ও পরমৃষিগণকর্তৃক রক্ষিত হইয়া সমবিষমস্থলে বাস করত এক স্থান হইতে স্থানান্তরে গমন করিতে লাগিলেন। তদনন্তর তিনি গন্ধমাদন হইতে ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবরে ও তথা হইতে হংসকূটে গমন করিলেন। পরে, হংসকূট অতিক্রম করিয়া শত শৃঙ্গে গমন করত তথায় অনন্যমনাঃ হইয়া তপস্যা করিতে লাগিলেন।
বিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা পাণ্ডু শুশ্রূযু, অনহষ্কৃত, সংযতাত্মা ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া সেই শতশৃঙ্গপর্ব্বতে কঠোর তপস্যা করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি সিদ্ধচারণগণের প্রিয়-পাত্র ও তপোবলে সশরীরে স্বর্গে গমন করিতে সমর্থ হইলেন। শতশৃঙ্গবাসী সিদ্ধচারণগণ, কেহ তাঁহাকে পরম সুহৃৎ, কেহ বা সোদর ভ্রাতা, কেহ বা পুত্র বলিয়া জ্ঞান করিতেন। পাণ্ডু এইরূপে তথায় বহুকাল তপোনুষ্ঠান করিলেন, তপস্যাদ্বারা তাঁহার সমস্ত পাপ বিনষ্ট হইল এবং তিনি মহাপ্রভাবশালী ব্রহ্মর্ষির তুল্য হইয়া উঠিলেন।
একদা শতশৃঙ্গবাসী শংসিতব্রত মহর্ষিগণ একত্র হইয়া ভগবান্ ব্রহ্মাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত ব্রহ্মলোক গমন করিতে ছিলেন, এমত সময়ে পাণ্ডু তাঁহাদিগের নিকট কহিলেন, মহাশয়েরা কোথা গমন করিতেছেন? মহর্ষিগণ কহিলেন, অদ্য অমাবস্যা ব্রহ্মলোকে দেবগণ, ঋষিগণ ও পিতৃগণের মহান্ সমবায় হইবে; আমরা সর্ব্বলোেকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মাকে দর্শন করিতে তথায় যাইতেছি। পাণ্ডু মহর্ষিগণের বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র তাঁহাদের সহিত স্বর্গোপরি গমন করিবার নিমিত্ত সাতিশয় কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া সহসা গাত্রোত্থান পূর্ব্বক পত্নীদ্বয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া তাঁহাদের সহিত উত্তরমুখে গমন করিতে লাগিলেন।
মহর্ষিগণ পাণ্ডুকে সুরলোকে গমনোন্মুখ দেখিয়া কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমরা এই পর্ব্বতের উপর্যুপরি ক্রমিক উত্তরমুখে গমন করিয়া দেখিয়াছি ইহার কোন কোন স্থানে অনেকানেক দুর্গ ও দেশসকল শোভা পাইতেছে। কোন কোন স্থলে দেবতা, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাদিগের বিহারভূমি আছে, কোথাও বা শত শত বিমান সংস্থাপিত রহিয়াছে; কোন কোন স্থলেও সংগীতশাস্ত্রবিশারদ গায়কগণ নিরন্তর বীণা, সপ্তস্বরা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি মধুর যন্ত্রসকল সংবাদনপূর্ব্বক গান করিতেছেন; কোথাও কুবেরোদ্যান, কোথাও মহানদী, কোথাও বা গিরিগহ্বর সকল বিরাজমান রহিয়াছে! এই পর্ব্বতে স্থানে স্থানে দুর্গম গিরি-গহ্বর, স্থানে স্থানে বহুসংখ্যক দুর্গ আছে। মধ্যে মধ্যে এমন অনেকানেক প্রদেশ আছে, যাহাতে পশু, পক্ষী, বৃক্ষ, লতা প্রভৃতি কিছুই নাই! হে ভরতকুলপ্রদীপ! এই সকল ভয়ানক প্রদেশে অন্যান্য জন্তুর কথা দূরে থাকুক, পক্ষীও যাইতে পারে না। কেবল বায়ু ও সিদ্ধ মহর্ষিগণই গমনাগমন করেন। এই সুকুমারাঙ্গী অদুঃখোচিতা রাজপুত্রীরা কি প্রকারে এই দুর্গম পর্ব্বত অতিক্রম করিবেন? হে মহাত্মন্! নিবৃত্ত হও, আমাদিগের সহিত গমন করিও না।
পাণ্ডু মহর্ষিগণের বাক্য শ্রবণে তাঁহাদের অভিপ্রায় -বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, হে মহাভাগগণ। অপত্যবিহীন লোকের স্বর্গে অধিকার নাই; আমি অনপত্য, পিতৃলোকের ঋণ হইতে মুক্ত হইতে পারি নাই, এ নিমিত্ত আমার মন সর্ব্বদা দুঃখানলে দগ্ধ হইতেছে; আমার জীবন বিড়ম্বনামাত্র। মনুষ্য জন্মিবামাত্র দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ ও মনুজঋণ, এই চতুর্ব্বিধ ঋণে ঋণবান্ হয়। এই সমস্ত ঋণ যথাকালে পরিশোধ করা কর্তব্য। যজ্ঞদ্বারা দেবঋণ হইতে, বেদধ্যয়ন ও তপস্যাদ্বারা ঋষিঋণ হইতে, পুত্রোৎপাদন ও শ্রাদ্ধ তর্পণাদির দ্বারা পিতৃঋণ হইতে এবং অনৃশংসাচরণদ্বারা মনুজঋণ হইতে বিনির্মুক্ত হয়। যে ব্যক্তি এই সকল ঋণ পরিশোধ করিতে অসম্মত হয়, তাহার সদ্গতি লাভ হয় না। হে তাপসগণ! আমি দেবঋণ, ঋষিঋণ ও মনুজঋণ পরিশোধ করিয়াছি, কিন্তু পিতৃঋণ হইতে অদ্যাপি মুক্ত হইতে পারি নাই। অতএব জিজ্ঞাসা করি, মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যেরূপে আমার পিতার ক্ষেত্রে আমাকে উৎপাদন করিয়াছেন, সেইরূপে আমার ক্ষেত্রে কি অপত্য উৎপাদনের কোন উপায় আছে? তাপসগণ কহিলেন, হে ধর্মাত্মন্। আমরা দিব্যচক্ষু দ্বারা দেখিতেছি, তোমার দেবতুল্য পরম সুন্দর পুত্র হইবে। তুমি পুত্রলাভার্থ প্রযত্ন কর, অবশ্যই তোমার ক্ষেত্রে অশেষ গুণসম্পন্ন অপত্য জন্মিবে।
পাণ্ডু তাপসগণের বাক্য শ্রবণানন্তর অপত্যোৎপাদন-শক্তির বিনাশকর মৃগশাপ স্মরণ করিয়া সাতিশয় ব্যাকুল হইলেন। অনন্তর যশস্বিনী ধৰ্ম্মপন্থী কুন্তীকে নির্জনে ডাকিয়া কহিলেন, হে কুন্তি! তুমি এই আপৎকালে অপত্যোৎপাদনে যত্নবতী হও। ধৰ্ম্মবাদী পণ্ডিতগণ কহিয়াছেন, অপত্য বংশের প্রতিষ্ঠা, কি দান, কি তপঃ, কি বিনয়, অনপত্য ব্যক্তির কিছুই সফল হয় না, আমি সন্তানবিহীন, আমার শুভ লোক প্রাপ্তি হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। হে চারুহাসিনি! তুমি জ্ঞাত আছ যে, মৃগশাপে আমার পুত্রোৎপাদনশক্তি প্রনষ্ট হইয়াছে, সুতরাং অন্য উপায়দ্বারা অপত্যোৎপাদনে যত্ন করিতে হইবে! হে পৃথে! ধর্মশাস্ত্রমতে ছয় প্রকার বন্ধুদায়াদ' ও ছয় প্রকার অবন্ধুদায়াদ পুত্র আছে; স্বয়ংজাত, প্রণীত', পরিক্রীত পৌনর্ভব', কানীন', স্বৈরিণীজ, দত্ত, ক্রীত, কৃত্রিম বা স্বয়মুপাগত, সহোঢ়', জ্ঞাতিরেতাঃ এবং হীনযোনি-ধৃত, এই দ্বাদশ প্রকার পুত্র। ইহার মধ্যে স্বয়ংজাতাভাবে প্রণীত, তদভাবে পরিক্রীত, তদভাবে পৌনর্ভব ইত্যাদিক্রমে পূর্ব্ব পূর্ব্ব প্রকারের অভাবে পর পর প্রকার স্বীকার করা শাস্ত্রসম্মত। এতদ্ভিন্ন আপৎকাল উপস্থিত হইলে দেবরদ্বারাও পুত্র উৎপাদন করিয়া লইতে পারা যায়। আর স্বায়ভুব মনু কহিয়াছেন, ঔরস পুত্র অপেক্ষা প্রণীত পুত্র শ্রেষ্ঠ ও ধৰ্ম্মফলদ। হে কুন্তি! আমি স্বয়ং পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ; অতএব তোমাকে তুল্যজাতি বা অপেক্ষাকৃত শ্রেষ্ঠজাতি দ্বারা পুত্রোৎপাদন করিতে অনুজ্ঞা করিতেছি। দেখ পূর্ব্বে শরদণ্ডায়ন স্বীয় পত্নীকে পুত্রোৎপাদনে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার পত্নী শারদণ্ডায়নী স্নান সমাপন করিয়া বিচিত্র পুষ্পমাল্য ধারণপূর্ব্বক রজনীযোগে চতুষ্পথে উপস্থিত হইলেন। তথায় এক সিদ্ধ দ্বিজবরকে বরণ পুরঃসর অনলে পুংসবন হোম সম্পাদন করিলেন। হোমক্রিয়া সমাপ্ত হইলে ঐ বৃত ব্রাহ্মণদ্বারা দুর্জয়াদি মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ পুত্রদ্বয় উৎপাদন করিয়া লইলেন। ।
হে কল্যাণি। তুমিও আমার নিয়োেগানুসারে তপঃস্বাধ্যায়-সম্পন্ন ব্রাহ্মাণ হইতে শীঘ্র অপত্যোৎপাদন করিতে যত্নবর্তী হও।
একবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ। কুরুকুলতিলক পাণ্ডু মহীপতির এই উপদেশবাক্যে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া পতিপ্রাণা কুন্তী কহিলেন, হে ধৰ্ম্মাত্মন্! আমি তোমার ধর্মপত্নী, বিশেষতঃ তোমাতেই অনুরক্ত, অতএব তোমার আমাকে এরূপ অনুমতি করা অতীব অসঙ্গত ও অনুচিত হইতেছে। হে মহাবাহো! তুমি স্বয়ং আমার গর্ভে অপত্যোৎপাদন করিতে পার, ধর্ম্মেরও অণুমাত্র হানি হয় না; অতএব হে কুরুবংশাবতংস। তুমি অপত্যোৎপাদনের নিমিত্ত আমার সহিত সহবাস কর, তাহা হইলে আমি তোমার সহিত স্বর্গে যাইতে পারিব। হে মহাত্মন্! আমি তোমা ভিন্ন অন্য পুরুষকে কদাচ মনেও করি না, তোমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নর জগতীতলে আর কে আছে? হে মহাত্মন্! আমি এ বিষয়ে একটি পৌরাণিকী কথা উল্লেখ করিতেছি, অনুগ্রহ করিয়া তাহা শ্রবণ করুন।
পূর্ব্বকালে পুরুবংশীয় ধার্মিক ব্যুষিতাশ্ব নামে এক নরপতি ছিলেন। মহাত্মা ব্যুষিতাশ্ব যজ্ঞানুষ্ঠান করিলে ইন্দ্রাদি সমস্ত দেবগণ ও দেবর্ষিগণ আগমন করিয়াছিলেন। ইন্দ্র সোম-রসপানে মত্ত ও ব্রাহ্মণগণ দক্ষিণালোভে পরিতৃপ্ত হন। দেবগণ ও ব্রহ্মর্ষিগণ স্বয়ং যজ্ঞকৰ্ম্ম করেন। ঐ যজ্ঞ অবসান হইলে মহারাজ ব্যুষিতাশ্ব গ্রীষ্মকালের দিবাকরের ন্যায় প্রখর প্রতাপ-শালী হইয়া উঠিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে প্রাচ্য, উদীচ্য, পাশ্চাত্য ও দাক্ষিণাত্য সমস্ত দেশ জয় করিয়া তত্রত্য ভূপতিদিগকে আপনার বশীভূত করিলেন এবং তত্তদ্দেশাহৃত নানাপ্রকার ধনসম্পত্তি দ্বারা পুনর্ব্বার এক যজ্ঞের আয়োজন করিলেন। যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হইল। তৎকালে ব্যুষিতাশ্ব দশ হস্তীর বল প্রাপ্ত হইলেন। এইরূপে রাজা মহাবল পরাক্রান্ত হইয়া নিজ-ভুজবলে সসাগরা ধরা জয় করিয়া ঔরসবৎ প্রজাপালন, মহাযজ্ঞানুষ্ঠান, দ্বিজাতিদিগকে প্রার্থনাধিক দান ও যজ্ঞে সোমরসপান ইত্যাদি নানাবিধ ধৰ্ম্মকৰ্ম্মানুষ্ঠান করিতে লাগিলেন।
পরম রূপবতী ভদ্রানাম্নী কাক্ষীবানের তনয়া ব্যুষিতাশ্বের মহিষী হইয়াছিলেন। তাঁহার অলৌকিক রূপলাবণ্য গুণে পরম বিজ্ঞ মহীপতি অল্প দিনেই একান্ত বশীভূত হইলেন। এমন কি, রাজকার্য্য পর্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া দিনযামিনী সেই কামিনীর সহিত অন্তঃপুরে বিহার করিতে লাগিলেন। অপরিমিত ইন্দ্রিয়াসক্তিবশতঃ অল্পকাল মধ্যেই যক্ষ্মারোগাক্রান্ত হইয়া কৃতান্তের করাল-কবলে নিপতিত হইলেন। রাজাকে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত দেখিয়া অপুত্রা ভদ্রা সাতিশয় দুঃখিতা হইয়া করুণস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন এবং নানাপ্রকার বিলাপসহকারে মৃতপতিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ধর্মজ্ঞ। পতি বিনা নারীর আর গত্যন্তর নাই; বিধবার জীবন ধারণ কেবল বিড়ম্বনামাত্র; মৃত্যু হইলেই মুক্তিপদ প্রাপ্ত হয়। হে নাথ! আমি তোমার সহগমন বাসনা করি; আমি তোমা বিনা একক্ষণও বাঁচিতে পারিব না; তুমি প্রসন্ন হইয়া আমাকে সমভিব্যাহারিণী কর। হে ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ! কি সমস্থলে কি বিষমস্থলে তুমি যেখানে গমন করিবে, আমি তোমার প্রিয়কারিণী ও বশবর্তিনী হইয়া ছায়ার ন্যায় অনুগমন করিব। হে রাজন! অদ্যাবধি হৃদয়শোষক মনোদুঃখ সাতিশয় প্রবল হইয়া আমাকে যৎপরোনাস্তি কষ্ট প্রদান করিবে। হে নরনাথ! বোধ হয়, আমি পূর্ব্ব জন্মে অনেকানেক প্রণয়িনীর প্রিয়বিচ্ছেদ করিয়াছিলাম, তন্নিমিত্তই এক্ষণে তোমার সহিত আমার বিচ্ছেদ হইল। হে রাজন! পতিবিহীনা হইয়া নারীর মুহূর্ত্তমাত্র মর্ত্যলোকে বাস নিতান্ত ক্লেশকর। না জানি পূর্ব্বজন্মে আমি কতই দুষ্কর্ম করিয়াছিলাম, তন্নিমিত্তই এক্ষণে আমাকে তোমার অনিবার্য্য বিয়োগানলে দগ্ধ হইতে হইল। আমি অদ্যাবধি কুশসংস্তর'শায়িনী হইয়া ভবদীয় মোহনমূর্ত্তি দর্শনমানসে অতি কষ্টেই কালাতিপাত করিব। হে নরশ্রেষ্ঠ। একবার অনুগ্রহ করিয়া এই অনাথা অশরণা' বিলাপকারিণী দীনাকে দর্শন প্রদান কর।
ভদ্রা মৃত পতিকে আলিঙ্গন করিয়া পুনঃ পুনঃ এইরূপ বিলাপ করিতেছিলেন, এমত সময়ে আকাশবাণী শুনিতে পাইলেন, "হে বরারোহে। বিলাপ করিও না, গাত্রোত্থান করিয়া গমন কর; হে চারুহাসিনি। আমি তোমাকে বর প্রদান করিতেছি, তুমি চতুৰ্দ্দশী বা অষ্টমীতে ঋতুস্নান করিয়া আমার সঙ্গে নিজ শয্যায় শয়ান থাকিবে, তাহা হইলে আমি স্বীয় শবে আবির্ভূত হইয়া তোমার গর্ত্তে সন্তান উৎপাদন করিব।" এই অমৃতময় বচন পরম্পরা শ্রবণে পতিব্রতা ভদ্রা কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া পুত্র-কামনায় যথোক্ত কার্য্যের অনুষ্ঠানে তৎপর হইলেন এবং সেই শবসংসর্গে তিনজন শাল্ব ও চারিজন মদ্র প্রসব করিলেন। হে ভরতশ্রেষ্ঠ। যেমন পরলোকগত ব্যুষিতাশ্ব স্বীয় সহধর্মিণীর করুণবাক্য শ্রবণে দয়ার্দ্রচিত্ত হইয়া আপনার বংশ রক্ষার্থ তাঁহার গর্তে সন্তানোৎপাদন করিয়াছিলেন, সেইরূপ তুমিও আমার গর্তে আপনার মানসপুত্র সমুৎপন্ন করিয়া নিজ বংশ ও আমার সতীত্ব রক্ষা করিতে পার।
দ্বাবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, কুন্তী ধৰ্ম্মজ্ঞ পাণ্ডুকে ব্যুষিতাশ্ববৃত্তান্ত শ্রবণ করাইলে তিনি ধৰ্ম্মযুক্ত বাক্যে তাঁহাকে সান্ত্বনা করিয়া কহিলেন, হে কুন্তি! তুমি যাহা কহিলে তাহা যথার্থ বটে। রাজা ব্যুষিতাশ্ব দেবতুল্য মনুষ্য ছিলেন, তাঁহাতে সকলই সম্ভবে। তাদৃশ অসম্ভব কার্য্য মাদৃশ লোক হইতে হওয়া অতীব দুর্ঘট। ধৰ্ম্মবিৎ মহাত্মা মহর্ষিগণ যাহা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন, এক্ষণে আমি সেই পুরাণ ধৰ্ম্মতত্ত্ব তোমাকে কহিতেছি, শ্রবণ কর। হে বরাননে! হে চারুহাসিনি! পূর্ব্বকালে মহিলাগণ অনাবৃত ছিল। তাহারা ইচ্ছামত গমন ও বিহার করিতে পারিত। তাহাদিগকে কাহারও অধীনতার কালক্ষেপ করিতে হইত না। কৌমারাবধি' একপুরুষ হইতে পুরুষান্তরে আসক্ত হইলেও তাহাদের অধৰ্ম্ম হইত না। ফলতঃ তৎকালে ঈদৃশ ব্যবহার ধৰ্ম্ম বলিয়া প্রচলিত হইয়াছিল। তির্য্যগ্যানিগত কামদ্বেষ-বিবর্জিত প্রজাগণ অদ্যাপি ঐ ধর্মানুসারে কার্য্য করিয়া থাকে। তপঃস্বাধ্যায়সম্পন্ন মহর্ষিগণ এই প্রামাণিক ধর্ম্মের প্রশংসা করিয়া থাকেন। উত্তরকুরুতে অদ্যাপি এই ধৰ্ম্ম প্রচলিত রহিয়াছে। হে চারুহাসিনি! এই অঙ্গনানুকূল নিত্য ধৰ্ম্ম যে নিমিত্ত এই প্রদেশে রহিত হইয়াছে, তদ্বিষয় সবিশেষ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।
পূর্ব্বকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার পুত্রের নাম শ্বেতকেতু। একদা তিনি পিতামাতার নিকট বসিয়া আছেন, এমন সময়ে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাঁহার জননীর হস্ত ধারণপূর্ব্বক কহিলেন, আইস আমরা যাই! ঋষিপুত্র পিতার সমক্ষেই মাতাকে বলপূর্ব্বক লইয়া যাইতে দেখিয়া সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্থ দেখিয়া কহিলেন, এ বৎস। ক্রোধ করিও না; ইহা নিত্য ধৰ্ম্ম, গাবিগণের ন্যায় স্ত্রীগণ সজাতীয় শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধৰ্ম্মলিপ্ত হয় না। ঋষিপুত্র পিতার বাক্য শ্রবণ করিয়াও ক্ষান্ত হইলেন না, প্রত্যুত পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া মনুষ্যমধ্যে বলপূর্ব্বক এই নিয়ম স্থাপন করিয়া দিলেন যে, অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতিভিন্ন পুরুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং যে পুরুষ কৌমার-ব্রহ্মচারিণী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের উভয়কেই ভ্রূণহত্যাসদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইবে! আর স্বামী পুত্রোৎপাদনার্থে নিয়োগ করিলে যে স্ত্রী, তাঁহার আজ্ঞালঙ্ঘন করিবে তাহারও ঐ পাপ হইবে। হে ভীরু! পূর্ব্বকালে উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু -এই প্রকার ধর্মানুপেত নিয়ম সংস্থাপন করিয়া গিয়াছেন। আরও দেখ; কন্মাষপাদ রাজার পত্নী দময়ন্তী, ভর্তৃনিয়োগ প্রাপ্ত - হইয়া মহর্ষি বশিষ্ঠদেবের নিকট গমনপূর্ব্বক পতির প্রিয়কামনায় - তাঁহার ঔরসে অশ্মকনামা পুত্র উৎপাদন করিয়াছিলেন। হে - কমললোচনে! মহর্ষি বেদব্যাস কুরুবংশ রক্ষার্থ আমার পিতার ক্ষেত্রে যে আমাদিগকে উৎপাদন করিয়াছেন, তুমি তাহাও অবগত আছ। অতএব হে অনিন্দিতে! তুমি এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া আমার বাক্য প্রতিপালন কর। হে রাজপুত্রি! বেদবিৎ মহাত্মারা কহিয়া গিয়াছেন যে, ঋতুকালে পতি পরিত্যাগপূর্ব্বক পুরুষান্তর-সংসর্গ করিলেই স্ত্রীদিগের অধৰ্ম্ম হয়, কিন্তু অন্য সময়ে তাহারা যথেচ্ছ ব্যবহার করিতে পারে, তাহাতে তাহাদের কোন পাপ নাই। তাঁহারা আরও কহিয়া গিয়াছেন যে, ভর্তা স্ত্রীকে যাহা আজ্ঞা করিবেন, ধর্মাই হউক বা অধ্যই হউক, নারীকে তাহা অবশ্যই প্রতিপালন করিতে হইবে। অতএব আমার আজ্ঞা লঙ্ঘন করা তোমার কদাচ কর্তব্য নহে। বিশেষতঃ আমি পুত্রমুখ দর্শনে নিতান্ত উৎসুক হইয়াছি, কিন্তু স্বয়ং সন্তানোৎপাদনে অসমর্থ; হে সুন্দরি। এজন্য আমি কৃতাঞ্জলিপুটে তোমাকে কহিতেছি, তুমি প্রসন্ন হইয়া তপঃস্বা-ধ্যায়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ হইতে অশেষ গুণসম্পন্ন পুত্রগণ উৎপাদন করিয়া লও, তাহা হইলে আমি পুত্রবান্দিগের উৎকৃষ্ট গতিলাভকরিতে পারিব।
পাণ্ডু আগ্রহসহকারে এইরূপে বুঝাইলে পতিহিতৈষিণী কুন্তী তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে মহারাজ! আমি বাল্যাবস্থায় পিতৃগৃহে অতিথি-সৎকারে নিযুক্ত ছিলাম এবং শংসিতব্রত ব্রাহ্মণের সতত পরিচর্যা করিতাম। দৈবযোগে একদিন পরম ধার্মিক জিতেন্দ্রিয় মহর্ষি দুর্ব্বাসাঃ তথায় আগমন করিয়া আতিথ্য স্বীকার করেন। আমি সাতিশয় যত্নসহকারে পরম সমাদরপূর্ব্বক তাঁহার পরিচর্যা করিলাম। মহর্ষি আমার ভক্তি দেখিয়া কহিলেন, বৎসে! আমি তোমার পরিচর্যায় পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে তোমাকে এক মহামন্ত্র প্রদান করিতেছি, গ্রহণ কর। তুমি এই মন্ত্র উচ্চারণপূর্ব্বক যে যে দেবকে আহ্বান করিবে, তিনি অকামই হউন বা সকামই হউন, তৎক্ষণাৎ আসিয়া তোমার বশবর্তী হইবেন। তুমিও সেই সেই অমর প্রসাদে পুত্রবতী হইবে। মহর্ষি এই বলিয়া আমাকে বর ও মন্ত্র প্রদানপূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলেন। হে নাথ! ব্রাহ্মণের বাক্য অব্যর্থ; দেখুন, উক্ত মন্ত্র-প্রয়োগের সময় উপস্থিত হইয়াছে; এক্ষণে আজ্ঞা করুন, মন্ত্র পাঠ করিয়া কোন্ দেবের আহ্বান করিব। হে রাজর্ষে! আমি তোমার আদেশ-প্রতীক্ষা করিতেছি, অনুমতি পাইলেই তোমার অভিলষিত সন্তান উৎপাদন করি।
রাজর্ষি পাণ্ডু কুন্তীবাক্য শ্রবণে সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া কহিলেন, সুন্দরি! দেবতাদিগের মধ্যে ধৰ্ম্ম সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, লোকমধ্যে তিনিই প্রকৃত পুণ্যভাজন; তাঁহাকেই আহ্বান কর, আমাদের ধর্ম কোনরূপে অধর্ম্মের সহিতু সংযুক্ত না হয়, লোকে ইহাই ধৰ্ম্ম বলিয়া স্বীকার করে। ধৰ্ম্মদত্ত পুত্র অবশ্যই ধার্মিক হইবে সন্দেহ নাই, তাহার মন কদাচ অধর্মে প্রবৃত্ত হইবে না, অতএব ধর্মপুরস্কারেই কর্ম করা আমাদের কর্তব্য; তুমি পরম সমাদরপূর্ব্বক সর্ব্বদেবাগ্রগণ্য ধর্মকে আহ্বান করিয়া তাঁহার দ্বারা পত্রোৎপাদন কর, পতিপরায়ণা কুন্তী, "যে আজ্ঞা” বলিয়া স্বামীর অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ তাঁহার অভিলষিত কার্য্য সাধনে যত্নবতী হইলেন।
ত্রয়োবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে কুরুবংশাবতংস জনমেজয়! কুন্তী স্বামীর আদেশানুসারে মন্ত্রপাঠ করিয়া ধৰ্ম্মকে আহ্বান করিলেন। হে কুরুনন্দন! ধৃতরাষ্ট্রপত্নী গান্ধারী সেই সময়ে গর্ববতী ছিলেন! যে দিবস কুন্তী ধৰ্ম্মকে আহ্বান করেন, ঐ দিন তাঁহার সংবৎসর পূর্ণ হয়। কুন্তী বিবিধোপচারে ধর্মের উদ্দেশে পূজাসাঙ্গ করিয়া মহর্ষিকর্তৃক প্রদত্ত মহামন্ত্র জপ করিতে লাগিলেন। সুরশ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম সূর্য্যোপম, জ্বলদনলসন্নিভ' বিমানে আরোহণ করিয়া তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইলেন এবং হাসিতে হাসিতে কুন্তীকে কহিলেন, সুন্দরি! কি নিমিত্ত আমাকে আহ্বান করিলে? বল, তোমাকে অভীষ্ট প্রদান করিব। কুন্তী তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া হৃষ্টচিত্তে কহিলেন, মহাত্মন্! আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাকে এক সন্তান প্রদান করুন। ধৰ্ম্ম তৎক্ষণাৎ স্বীকার করিয়া তাঁহার গর্তে সর্ব্বপ্রাণিহিতকর পরম যশস্বী এক পুত্র উৎপাদন করিলেন। ঐ পুত্র ইন্দ্রদৈবত চন্দ্রসংযুক্ত অভিজিৎ-নামক অষ্টম মুহূর্তে মধ্যাহ্ন সময়ে জন্ম গ্রহণ করিলেন। সন্তান জন্মিবামাত্র দৈববাণী হইল, "এই যে পাণ্ডুর প্রথমজাত পুত্র, ইনি যুধিষ্ঠির নামে ত্রিভুবনবিশ্রুত নরপতি হইয়া ঔরসবৎ প্রজাবর্গের প্রতিপালন করিবেন।”
রাজর্ষি পাণ্ডু সেই পরম ধার্মিক পুত্র প্রাপ্ত হইয়া পুনর্ব্বার কুন্তীকে কহিলেন, প্রিয়ে! ক্ষত্রিয়কুলে বলবান্ ব্যক্তি অধিকতর প্রশংসনীয়; অতএব তুমি আর একটি অমিতবলশালী পুত্র উৎপাদন কর। কুন্তী স্বামীর আজ্ঞা প্রতিপালনার্থ মহর্ষিদত্ত মন্ত্র পাঠ পূর্ব্বক বায়ুকে আহ্বান করিলে। মহাবলপরাক্রান্ত বায়ু তৎক্ষণাৎ মৃগারোহণপূর্ব্বক তাঁহার সমীপে উপনীত হইলেন এবং কহিলেন, কুন্তি! কি নিমিত্ত আমাকে আহ্বান করিলে? তোমাকে কি অভীষ্ট প্রদান করিতে হইবে? লজ্জানম্রমুখী কুন্তী ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, হে সুরোত্তম! আপনি অনুকূল হইয়া আমাকে এক মহাবলপরাক্রান্ত মহাকায় দর্পবিনাশকারী পুত্র প্রদান করুন। বায়ু কুন্তীর প্রার্থনানুসারে তাঁহার গর্তে উক্ত প্রকার পুত্র উৎপাদন করিলেন। এই পুত্রের নাম ভীম; ভীম জন্মিবামাত্র "বলবীর্য্যসম্পন্নদিগের অগ্রগণ্য মহাবীর জন্মগ্রহণ করিলেন” এই দৈববাণী হইল। এই দৈববাণীর পর আর এক আশ্চর্য্য ব্যাপার ঘটিয়াছিল। সদ্যঃপ্রসূত ভীমসেন স্বীয় জননীর উৎসঙ্গে' নিদ্রিত ছিলেন, এমন সময়ে তাঁহার মাতা ব্যাঘ্রভয়ে এরূপ ভীত হইলেন যে, ক্রোড়স্থিত ভীমসেনকে বিস্মৃত হইয়া পলায়নচেষ্টায় সহসা গাত্রোত্থান করিলেন। জননী গাত্রোত্থান করিলে ভীম তাঁহার ক্রোড় হইতে পর্ব্বতের উপর নিপতিত হইলেন। ভীমের বজ্রসম শরীরাঘাতে গিরিবর একেবারে চূর্ণ হইয়া গেল। পাণ্ডু তদ্দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন। হে ভরতসত্তম! ভীমের জন্মদিবসেই দুর্য্যোধন জন্মগ্রহণ করেন।
মহাবীর বৃকোদরের জন্ম হইলে পর, পাণ্ডু পুনর্ব্বার চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, কি প্রকারে আমার এক সর্ব্বলোক-শ্রেষ্ঠ পুত্র জন্মিবে। সমস্ত লোকই দেব ও পুরুষকার অবলম্বন করিয়া চলে, তন্মধ্যে দৈবকে কালক্রমেই লাভ করিতে পারা যায়। শুনিয়াছি অমররাজ ইন্দ্র সর্ব্বদেবশ্রেষ্ঠ ও অপ্রমেয়-বলবীর্য্যসম্পন্ন, আমি কায়মনোবাক্যে তপোনুষ্ঠান করিয়া তাঁহাকে সন্তুষ্ট করি। পরিশেষে তাঁহার নিকট হইতে অমিত-বলশালী পুত্র প্রার্থনা করিয়া লইব। ইন্দ্রের বরে অবশ্যই আমার মহাবল পরাক্রান্ত পুত্র জন্মিবে এবং সেই পুত্র সংগ্রামে সুরাসুর, নাগ, নর, গন্ধর্ব্ব প্রভৃতি সমস্ত প্রাণীকেই জয় করিতে পারিবে। রাজর্ষি পাণ্ডু মনে মনে এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া মহর্ষিগণের সহিত মন্ত্রণাপূর্ব্বক কুন্তীকে সাংবৎসরিক ব্রতানুষ্ঠানের আদেশ প্রদান করিলেন এবং আপনিও একাগ্রচিত্তে প্রাতঃকালাবধি সায়ংকাল পর্যন্ত একপদে দণ্ডায়মান থাকিয়া কঠোর তপস্যাচরণ ও দেবরাজের আরাধনা করিতে লাগিলেন। এইরূপে পাণ্ডু পুত্র-কামনায় বহু কাল কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠান করিলেন। দেবরাজ তদীয় তপঃপ্রভাবে প্রসন্ন হইয়া তাঁহার সমীপে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে রাজর্ষে! আমি তোমার তপোনিষ্ঠা দর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি, তোমাকে তোমার মনোমত পুত্রবর প্রদান করিয়া যাইব, আমার অনুগ্রহে তোমার পুত্র জন্মিবে। ঐ পুত্র ত্রিলোক বিশ্রুত, গোব্রাহ্মণহিতকারী, সুহৃদ্গণের আনন্দবর্দ্ধন ও শত্রুদিগের হৃদয়বিদারক হইবে। দেবরাজ ইহা বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন; রাজর্ষি পাণ্ডুও অভীষ্ট সিদ্ধ হওয়ায় পরম পরিতুষ্ট হইয়া কুন্তীর নিকট গমনপূর্ব্বক কহিলেন, কল্যাণি! আমাদিগের মনোরথ পূর্ণ হইয়াছে, অমররাজ সুপ্রসন্ন হইয়া অভিলাষানুরূপ, অতিমানুষকৰ্ম্মা, যশস্বী, অরাতিনি-সুদন, নীতিশাস্ত্রবিশারদ, মহাত্মা, সূর্য্যসম তেজস্বী, দুরাধর্ষ, ক্রিয়াবান, অদ্ভুতদর্শন পুত্র প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছেন; এক্ষণে তুমি সেই ত্রিদশাধিপকে আহ্বান করিয়া তাঁহা হইতে পুত্র উৎপাদন করিয়া লও।
কুন্তী পতির আজ্ঞানুসারে মহর্ষিদত্ত মন্ত্র জপ করিয়া ইন্দ্রদেবের আবাহন করিলেন। কুন্তীর আবাহনে দেবরাজ তৎক্ষণাৎ আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার গর্তে পাণ্ডুর প্রার্থনারূপ পুত্র উৎপাদন করিলেন; ঐ পুত্রের নাম অর্জুন। অর্জুন জন্মিবামাত্র মহাগভীরনির্ঘোষে আকাশবাণী হইল, বনবাসিগণ শ্রবণ করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। নভোমণ্ডল শব্দায়মান হইল। কুন্তী একাগ্রচিত্তে ছিলেন, শুনিলেন, “হে পৃথে। তোমার এই পুত্র কার্ডবীর্য্যোপম, শিবসম পরাক্রমশালী ও ইন্দ্রবৎ অজয্য' হইয়া চতুৰ্দ্দিকে যশোরাশি বিস্তার করিবেন। যেমন বিষ্ণু হইতে অদিতির প্রীতিবর্দ্ধিত হইয়াছিল, অর্জুন হইতে তোমারও সেইরূপ প্রীতিলাভ হইবে। অর্জুন স্বীয় ভুজবলে কুরু, সোম, চেদি, কাশি, করূষ, প্রভৃতি নানা জনপদ বশীভূত করিয়া কুরুকুলের শ্রীবৃদ্ধি করিবেন। ইঁহার বাহুবলে ভগবান্ হুতাশন খাণ্ডববনে সর্ব্বভূতের মেদ' ভক্ষণ করিয়া পরম পরিতৃপ্ত হইবেন। এই মহাবলপরাক্রান্ত মহাবীর, গ্রাম্য মহীপালগণকে জয় করিয়া ভ্রাতৃগণের সহিত যজ্ঞত্রয় সম্পন্ন করিবেন। হে পৃথে! তোমার এই পুত্র পরশুরামসম তেজস্বী, বিষ্ণুতুল্য পরাক্রান্ত, বলবান্দিগের অগ্রগণ্য ও মহাযশস্বী হইবেন। ইনি সংগ্রামে দেবাদিদেব মহাদেবকে পরিতুষ্ট করিয়া তাঁহার নিকট হইতে পাশুপতনামে মহাস্ত্র প্রাপ্ত হইবেন। দেবরাজ ইন্দ্রের আজ্ঞানুসারে দেবগণের পরম শত্রু নিবাতকবচনামক দৈত্য সকলকে বিনাশ করিবেন। ইনি সমস্ত দিব্যাস্ত্র সংগ্রহ করিয়া বিনষ্ট রাজ্যের প্রত্যুদ্ধার করিবেন।”
হে ভরতবংশাবতংস! এই দৈববাণী শ্রবণে কুন্তী পরমা-হ্লাদিত ও সাতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইলেন। শতশৃঙ্গনিবাসী তপস্বি-গণের ও ইন্দ্রাদি অমরনিকরের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। পুষ্পবৃষ্টি পতিত হওয়ায় দিঘণ্ডল আচ্ছন্ন ও সুবাসিত হইল। আকাশে দুন্দুভিধ্বনি হইতে লাগিল। সমস্ত দেবগণ একত্র হইয়া অর্জুনকে স্তব করিতে লাগিলেন। সর্পসমুদায়, বিহঙ্গকুল, গন্ধর্ব্বগণ, অপ্সরাসকল, প্রজাপতিগণ, সপ্তর্ষিমণ্ডল, ভরদ্বাজ, কশ্যপ, গৌতম, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বশিষ্ঠ এবং ভগবান্ অত্রি তথায় আগমন করিলেন। মরিচী, অঙ্গিরাঃ, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, দক্ষ প্রজাপতি এবং দিব্যমাল্যাম্বরধারী গন্ধর্ব্বগণ ও অপ্সরোগণ অর্জুনসমীপে গান করিতে আরম্ভ করিলেন। অপ্সরোগণ নৃত্য করিতে লাগিল। মহর্ষিরা চতুর্দিকে তপস্যা করিতে লাগিলেন। ভীমসেন, উগ্রসেন, উর্ণায়ুঃ অনঘ, গোপতি, ধৃতরাষ্ট্র, সূর্য্যবচ্চাঃ যুগপ, তৃণপ, কার্ফিনন্দি, চিত্ররথ, শালিশিরাঃ, পর্জন্য, কলি, নারদ, সত্বাবৃহত্ত্বাবৃহক, করাল, বহুগুণশালী ব্রহ্মচারী, সুবর্ণ, বিশ্বাবসু, সুমন্যু, সুচন্দ্র, শরূ এবং গীতমাধুর্য্যসম্পন্ন, সুবিখ্যাত হাহা ও হুহু ইত্যাদি গন্ধর্ব্বগণ সমভিব্যাহারে শ্রীমান তুম্বুরু আসিয়া অর্জুনসমীপে মদুরস্বরে গান করিতে লাগিলেন। নানালঙ্কারভূষিতা, বিশালনয়না, অনুচানা, অনবদ্যা, গুণমুখ্যা, গুণাবরা, অদ্রিকা, সোমা, মিত্রকেশী, অলম্বুষা, মরীচি, শুচিকা, বিদ্যুৎপর্ণা, তিলোত্তমা, অম্বিকা, লক্ষণা, ক্ষেমা, রম্ভা, মনোরমা, অসিতা, সুবাহু, সুপ্রিয়া, সুবপুঃ, পুণ্ডরীকা, সুগন্ধা, সুরমা, প্রমাথিনী, কাম্যা, শারদ্বতী, মেনকা, সহজন্যা, কর্ণিকা, পুঞ্জিকস্থলা, ঋতুস্থলা, ঘৃতাচী, বিশ্বাচী, পূর্ব্বচিতি, উন্নোচা, প্রস্নোচা, উর্ব্বশী প্রভৃতি অপ্সরাসকল পরমানন্দে নৃত্য ও গান করিতে লাগিলেন। ধাতা, অ্যমা, মিত্র, বরুণ, ভগ, ইন্দ্র, বিবস্বান্, পৃষা, ত্বষ্টা, সবিতা, পর্জন্য ও বিষ্ণু, এই দ্বাদশ আদিত্য, ইঁহারা আকাশে থাকিয়া অর্জুনের মহিমাবর্দ্ধন করিতে লাগিলেন। মৃগব্যাধ, সর্প, নির্ঝতি, অজৈকপাদ, অহিব্রশ্ন, পিনাকী, দহন, ঈশ্বর, কপালী, স্থাণু ও ভগবান্ ভগ, এই একাদশ রুদ্র তথায় অবস্থান করিয়া-ছিলেন। অশ্বিনীকুমার, অষ্টবসু, মহাবল মরুদ্গণ, বিশ্বদেবগণ ও সাধ্যগণ অর্জুনের চতুৰ্দ্দিক বেষ্টন করিয়া রহিলেন। কর্কোটক, বাসুকি, কচ্ছপ এবং কুণ্ড ও তক্ষক ইত্যাদি মহাতপাঃ মহাবলপরাক্রান্ত মহাক্রোধশালী মহোরগগণ এবং তার্য্য, অরিষ্টনেমি, গরুড়, অসিতধ্বজ, অরুণ, আরুণি প্রভৃতি বৈনতেয়গণ তথায় আগমন করিলেন। বিমান ও গিরিশৃঙ্গের অগ্রগত ঐ সমস্ত সমভ্যাগত দেবগণকে কেবল তপোবলসম্পন্ন সিদ্ধ মহর্ষিগণই দেখিতে পাইলেন, অন্যান্য লোকে নেত্রগোচর করিতে পারিল না। মহর্ষিগণ সেই আশ্চর্য্য ব্যাপার অবলোকন করিয়া সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং তদবধি পাণ্ডবগণের প্রতি অধিকতর শ্রদ্ধা করিতে লাগিলেন।
অর্জুনের জন্ম হইলে রাজর্ষি পাণ্ডু অপর এক পুত্রের কামনায় কুন্তীর নিকট প্রার্থনা করিলেন। কুন্তী তাঁহার আশয় বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, মহাত্মন্! আর আমাকে পুরুষান্তর-সংসর্গের অনুরোধ করিবেন না। শাস্ত্রকারেরা কহিয়া গিয়াছেন যে, স্ত্রীলোক আপৎকাল উপস্থিত হইলে তিনবার পর্যন্ত পরপুরুষ দ্বারা সন্তানোৎপাদন করিতে পারে, তিন বারের অধিক কোন ক্রমেই পুরুষান্তর-সংসর্গ করিতে পারে না। যে নারী চারিবার পরপুরুষের সহিত সংসর্গ করে তাহকে স্বৈরিণী কহে; পাঁচবার উক্ত প্রকার কার্য্যে লিপ্ত হইলে বেশ্যা পদবাচ্য হইয়া থাকে, অতএব হে বিদ্বন্! তুমি ধৰ্ম্মজ্ঞ হইয়াও কি নিমিত্ত নিতান্ত উদ্ভ্রান্তচিত্তের ন্যায় আমাকে পুনর্ব্বার অপত্যোৎপাদনের অনুমতি করিতেছ?
চতুর্বিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, কুন্তীপুত্রগণের ও ধৃতরাষ্ট্রতনয়-দিগের জন্ম হইলে মদ্ররাজদুহিতা নির্জনে পাণ্ডুকে কহিলেন, মহারাজ! দুর্ভাগ্যক্রমে আপনি ঋষিশাপে সন্তানোৎপাদনে বঞ্চিত হইয়াছেন, তাহাতে আমার কোন সন্তাপ নাই, আমি বরাহা হইয়াও হীনাবস্থায় রহিয়াছি, তাহাতেও আমার পরিতাপ নাই, কিংবা গান্ধারী শত পুত্রের মাতা হইয়াছেন বলিয়া আমার এক মূহূর্তের নিমিত্ত ঈর্ষা হয় না; কিন্তু হে মহারাজ! আমার অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, কুন্তী ও আমি দুই জনই আপনার ভার্য্যা, উভয়েই সমান; কিন্তু কুন্তী পুত্রবতী হইলেন, আমি পুত্রমুখ নিরীক্ষণে বঞ্চিত রহিলাম। হে রাজন! যদি কুন্তী আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলেই আমার পুত্র হয়, আর আপনারও অধিক অপত্য লাভ দ্বারা মহৎ উপকার জন্মে। কিন্তু কুন্তী আমার সপত্নী, আমি কোন ক্রমেই তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিতে পারিব না। তবে যদি আপনি প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে অনুরোধ করেন, তাহা হইলেই আমি চরিতার্থ হইতে পারি। রাজর্ষি পাণ্ডু তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, প্রিয়ে! উত্তম বলিয়াছ, ইহা আমার নিতান্ত অভিলষিত, কেবল তোমার মত হয় কি না, এই সন্দেহপ্রযুক্ত তোমাকে বলি নাই; এক্ষণে ইহা তোমার অনুমোদিত জানিতে পারিয়াছি; অবশ্যই আমি তোমার মনোরথ সিদ্ধির নিমিত্ত কুন্তীকে এ বিষয়ে অনুরোধ করিব। কুন্তী কখনই আমার বাক্য উল্লঙ্ঘন করিবে না।
পাণ্ডু মাদ্রীকে এই কথা বলিয়া কুন্তীর নিকট গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে নির্জনে কহিতে লাগিলেন, হে পৃথে। দেখ ইন্দ্র ত্রিদশাধি-পত্য লাভ করিয়াও যশোলিপ্সার নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। তপঃস্বাধ্যায়সম্পন্ন মন্ত্রবিৎ ব্রাহ্মণগণ কেবল যশের নিমিত্তই গুরুকরণ করিয়া থাকেন এবং রাজর্ষিগণ ও তপোধন ব্রাহ্মণগণ যশোভিলাষে নানাবিধ সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠানে যত্নবান্ হয়েন; অতএব হে প্রিয়ে! তুমি আমার বংশবৃদ্ধির নিমিত্ত, আমার ও পূর্ব্বপুরুষগণের পিণ্ডরক্ষার নিমিত্ত, পতির প্রিয়া-নুষ্ঠানের নিমিত্ত এবং আপনার যশোবর্দ্ধনের নিমিত্ত, একবার মাদ্রীর প্রতি অনুকম্পা করিয়া উহাকে পুত্রবতী কর। হে পৃথে! পুত্রদানদ্বারা মাদ্রীকে পরিত্রাণ কর, ইহাতে তোমার যশোবৃদ্ধি হইবে। কুন্তী পাণ্ডু নৃপতির বাক্য শ্রবণান্তর মাদ্রীকে কহিলেন, তুমি কোন দেবতাকে আহ্বান কর, তাহা হইলে অচিরকালমধ্যে তোমার অনুরূপ পুত্রলাভ হইবে সন্দেহ নাই।
মাদ্রী কুন্তীর আদেশক্রমে কিয়ৎক্ষণ মনে মনে বিচার করিয়া অশ্বিনীকুমারকে স্মরণ করিলেন। অশ্বিনীকুমার তৎক্ষণাৎ তথায় সমুপস্থিত হইয়া তাহার গর্তে যমজ পুত্র উৎপাদন করিলেন। ঐ পুত্রদ্বয়ের নাম নকুল ও সহদেব। তাঁহারা ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র দৈববাণী হইল, "হে কুমারদ্বয়। তোমরা অশ্বিনীকুমার অপেক্ষা সমধিক সত্ত্বসম্পন্ন, রূপবান, গুণশালী ও তেজস্বী হইয়া পরমসুখে কালযাপন কর।" শতশৃঙ্গবাসী মহর্ষিগণ যথাবিধি আশীর্ব্বাদ বিধানপূর্ব্বক প্রীতমনে তাঁহাদের নামকরণ করিলেন। কুন্তীর পুত্রত্রয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠের নাম যুধিষ্ঠির, মধ্যমের নাম ভীম, কনিষ্ঠের নাম অর্জুন হইল। মাদ্রীর পুত্রদ্বয়ের মধ্যে পূর্ব্বজের নাম নকুল, দ্বিতীয়ের নাম সহদেব হইল। পাণ্ডুপুত্রগণ প্রত্যেকে এক এক সংবৎসর অন্তর জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তথাপি তাঁহাদিগকে সমবয়স্ক বোধ হইত। তাঁহারা সকলেই মহাসত্ত্ব, মহাবীর্য্য, মহাবল ও পরাক্রান্ত ছিলেন। রাজর্ষি পাণ্ডু সেই দেবতুল্য রূপবান্ মহাতেজস্বী পুত্রগণকে দেখিয়া আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন। পাণ্ডুপুত্রগণ ক্রমে ক্রমে শতশৃঙ্গবাসী মুনি ও মুনিপত্নিগণের সাতিশয় প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিলেন।
কিয়দ্দিনান্তর রাজর্ষি পাণ্ডু পুনর্ব্বার মাদ্রীর গর্তে সুতোৎপাদনের নিমিত্ত কুন্তীকে অনুরোধ করাতে তিনি কহিলেন, মহারাজ! মাদ্রী অতিশয় ধূর্ত্ত; সে এক বার দেবতাহ্বান করিয়া দুই পুত্র উৎপাদন করিয়াছে; আমি পূর্ব্বে জানিতাম না যে, দুই জনকে একেবারে আহ্বান করিলে দুই ফল লাভ হয়; তন্নিমিত্ত আমি ঐ ফলে বঞ্চিত হইলাম; অতএব হে মহারাজ! আমি কৃতাঞ্জলিপুটে কহিতেছি, আর আমাকে ও বিষয়ে অনুরোধ করিবেন না। কুন্তীবাক্য শ্রবণ করিয়া রাজর্ষি পাণ্ডু অগত্যা তাহাতে সম্মত হইয়া নিরস্ত রহিলেন। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়! এইরূপে দেবদত্ত পাণ্ডুপুত্রগণ হৈমবত পৰ্ব্বতে থাকিয়া কিয়দ্দিনের মধ্যে বীর্য্যবান, যশস্বী, শুভলক্ষণসম্পন্ন, চন্দ্রতুল্য প্রিয়দর্শন, সিংহের ন্যায় দর্পশালী, সর্ব্বধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য ও দেবতুল্য বিক্রমশালী হইয়া উঠিলেন। তত্রত্য মহর্ষিগণ তাঁহাদিগের লক্ষণ, পরাক্রম ও রূপলাবণ্য দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন। এ দিকে দুর্য্যোধন প্রভৃতি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ অতি অল্পদিনের মধ্যে জলাশয়স্থ কমলের ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল।
পঞ্চবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহীপতি পাণ্ডু এইরূপে দেবতুল্য প্রিয়দর্শন পঞ্চপুত্র লাভ করিয়া পরমসুখে কিয়ৎকাল অতিবাহিত করিলেন। ইতিমধ্যে সর্ব্বভূতের সম্মোহনকারী ঋতুরাজ বসন্ত আবির্ভূত হইল। রাজা বনবিহার করিতে গমন করিলেন, মদ্ররাজদুহিতা দিব্যাম্বর পরিধানপূর্ব্বক তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন! ঐ বন পলাশ, তিলক, আম্র, চম্পক, পারিভদ্রক প্রভৃতি ফলপুষ্পসুশোভিত নানাবিধ বৃক্ষজালে সমাকীর্ণ; পদ্ম, কুমুদ, কহ্লার প্রভৃতি জলজ পুষ্পদ্বারা সমাবৃত এবং বহুবিধ জলাশয়ে ব্যাপ্ত ছিল। একে বসন্তকাল ও বনের অলৌকিক সৌন্দর্য্য, তাহাতে আবার অসামান্য রূপলাবণ্যসম্পন্না রাজীবলোচনা, মদ্রাধিপতনয়া একাকিনী সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণ করিতেছেন; এই সমস্ত দর্শন করিয়া রাজার অন্তঃকরণ চাঞ্চল্য হইয়া উঠিল। তিনি ক্রমে ক্রমে অনঙ্গশরে অবশচিত্ত হইয়া বলপূর্ব্বক মাদ্রীকে আলিঙ্গন করিলেন। মাদ্রী বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন, কিন্তু রাজা কোনক্রমেই নিবৃত্ত হইলেন না। তিনি কামশরে বিমোহিত হইয়া মৃগরূপধারী ঋষিকুমারের শাপ একেবারে বিস্মৃত হইয়া গিয়া-ছিলেন। দৈবনির্ব্বন্ধ অখণ্ডনীয়; রাজা বারংবার মাদ্রীকর্তৃক নিবারিত হইয়াও কোনক্রমে নিরস্ত হইলেন না, সুতরাং অনুল্লঙ্ঘনীয় মৃগশাপবশতঃ পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইলেন। মাদ্রী তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া তাঁহার মৃতদেহ আলিঙ্গন-পূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। কুস্তী দূর হইতে সেই আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া অতীব আকুলচিত্তে স্বীয় পুত্রগণ ও মাদ্রীকুমারদ্বয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া শব্দানুসারে গমন করিতে লাগিলেন। মাদ্রী অনতিদূরে কুত্তীকে কুমারগণ সমভিব্যাহারে আসিতে দেখিয়া কাতরস্বরে কহিলেন, ভদ্রে! তুমি একাকিনী এই স্থানে আগমন কর। বালকগণ ঐ স্থানে থাকুক।
কুন্তী মাদ্রীর বচনানুসারে কুমারগণকে রাখিয়া একাকিনী 'হা হতাস্মি' বলিয়া রোদন করিতে করিতে তথায় গমনপূর্ব্বক দেখিলেন, মাদ্রী রাজার মৃতদেহ আলিঙ্গন করিয়া ভূমিতলে শয়ানা আছে। তখন তিনি শিরে করাঘাত করিয়া বিলাপ করিতে করিতে মাদ্রীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আমি রাজাকে সর্ব্বদা রক্ষা করিতাম; ইনি অতিশয় জিতেন্দ্রিয় ছিলেন; তবে ইনি | মৃগশাপ জানিয়াও কি নিমিত্ত তোমাকে বলাৎকার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন? দেখ, আমি যেরূপ ইহাকে রক্ষা করিতাম, তোমারও সেইরূপ রক্ষা করা কর্তব্য ছিল, তবে কেন ইঁহাকে নির্জনে আনিয়া প্রলোভিত করিলে? মৃগশাপবিষয়িণী চিন্তা ইঁহার হৃদয়ে সর্ব্বদা জাগরুক থাকিত, তন্নিমিত্ত নিয়তই যৎপরোনাস্তি দুঃখিত থাকিতেন। অদ্য তোমাকে নির্জনে পাইয়া কি নিমিত্ত ইঁহার মন চঞ্চল হইল? মদ্ররাজনন্দিনি। তুমি ধন্যা ও আমা হইতে অধিকতর সৌভাগ্যবতী, যেহেতু তুমি অদ্য মহারাজের প্রসন্ন বদন দেখিয়াছ। মাদ্রী কুন্তীর এইরূপ পরিবেদন'বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, দেবি! এবিষয়ে আমার কোন অপরাধ নাই। রাজর্ষি বলাৎকারে উদ্যত হইলে আমি অতি করুণস্বরে তাঁহাকে ভূয়োভূয়ঃ নিষেধ করিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের দুরদৃষ্ট-ক্রমেই হউক, বা ঋষিশাপের অনুল্লঙ্ঘনীয়তাপ্রযুক্তই হউক অথবা দুর্দান্ত মদনের অনিবার্য্যতাবশতই হউক, আমার বাক্যে একবার কর্ণপাতও করিলেন না।
পতিব্রতা কুন্তী মাদ্রীর বচনাবসানে কহিলেন, ভদ্রে! যাহা হইবার হইয়াছে। এক্ষণে তোমার নিকট এক প্রার্থনা করি, শ্রবণ কর। আমি রাজর্ষির জ্যেষ্ঠা ধৰ্ম্মপত্নী, সুতরাং শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্মফল আমারই প্রাপ্য; অতএব আমি পরলোকগত ভর্তার সহগমন করিব, তুমি এ বিষয়ে আমাকে নিবারণ করিও না, তুমি গাত্রোত্থান কর। অতি সাবধানে এই সন্তানগুলি প্রতিপালন করিও। আমি মহারাজের মৃতদেহ লইয়া চিতারোহণ করি। মাদ্রী কহিলেন, আর্য্যে! আমি স্বামিসহবাসে অদ্যাপি পরিতৃপ্ত হই নাই, অতএব আমিই ইঁহার সহগমন করিব। অনুগ্রহ করিয়া আমাকে এ বিষয়ে অনুমতি করিতে হইবে; আরও দেখ, মহারাজ আমাতেই আসক্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তন্নিমিত্ত যমভবনে গমন করিয়া তাঁহার অভিলাষ পরিপূর্ণ করা আমার প্রধান ধৰ্ম্ম ও অত্যন্ত অবশ্য কত্ত্য কৰ্ম্ম। বিশেষতঃ যদি আমি জীবিত থাকিয়া আপনার পুত্রদ্বয়ের ন্যায় তোমার পুত্রগণকে স্নেহ করিতে না পারি, তাহা হইলে অবশ্যই আমাকে ইহকালে লোকনিন্দায় ও পরকালে ঘোরতর নরকে নিপতিত হইতে হইবে। অতএব সহগমন করাই আমার পক্ষে শ্রেয়ঃকল্প। এক্ষণে তোমার নিকট আমার এই ভিক্ষা যে, মহারাজের মৃতদেহের সহিত আমার কলেবর দগ্ধ কর। আমার পুত্রদ্বয়কে আপনার পুত্রগণের ন্যায় স্নেহ ও অপ্রমত্তচিত্তে প্রতিপালন করিও, ইহা ব্যতীত আমার আর কিছুই বক্তব্য নাই। মদ্ররাজ-দুহিতা কুস্তীকে এই কথা বলিয়া রাজার মৃতদেহ আলিঙ্গনপূর্ব্বক কলেবর পরিত্যাগ করিলেন।
ষডুবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে রাজর্ষি পাণ্ডু কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক লোকান্তর গমন করিলে দেবতুল্য মহর্ষিগণ ও মন্ত্রবিৎ ব্রাহ্মণগণ একত্র হইয়া মন্ত্রণা করিলেন যে, "মহাযশাঃ মহাত্মা মহারাজ পাণ্ডু রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া এস্থানে আমাদের শরণাগত হইয়া বহুদিবস তপোনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, এক্ষণে তিনি শিশুপুত্রগণ ও ভার্য্যাকে আমাদিগের নিকটে রাখিয়া সুরলোকে গমন করিয়াছেন; অতএব তাঁহার পুত্র, কলত্র ও মৃতদেহ লইয়া ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্রের নিকটে সমর্পণ করা আমাদিগের অবশ্য কর্তব্য।” মহর্ষিগণ এইরূপ পরামর্শ করিয়া কুন্তী, যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ বালক এবং পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃতকলেবর লইয়া হস্তিনানগরে গমন করিলেন। পুত্রবৎসলা কুস্তী পতিবিহীনা হইয়াও পুত্রমুখ নিরীক্ষণে এবং স্বদেশগমনে নিতান্ত ঔৎসুক্যপ্রযুক্ত সাতিশয় আনন্দিতা হইয়া সর্ব্বাগ্রে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা অতি অল্পদিনের মধ্যেই কুরুজাঙ্গলে উপনীত হইয়া রজনী প্রভাত হইবামাত্র রাজদ্বারে সমুপস্থিত হইলেন। তখন তাপসগণের বাক্যানুসারে দ্বারবান্ তৎক্ষণাৎ রাজসভায় গিয়া তাঁহাদের আগমনবার্তা নিবেদন করিল। হস্তিনাপুরনিবাসী যাবতীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রগণ তাপসদিগের আগমনবার্তা শ্রবণে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং আপন আপন পুত্র ও কলত্রগণ সমভিব্যাহারে বিবিধ যানে আরোহণ করিয়া তাঁহাদিগকে দর্শন করিতে চলিলেন। তাপসদর্শনার্থিনী জনতা রাজমার্গ আচ্ছন্ন করিয়া চলিল। তৎকালে তাহাদের সকলেরই অন্তঃকরণ ঈর্ষাশূন্য ও ধৰ্ম্মপ্রবণ হইল। শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, সোমদত্ত, বাহীক, রাজর্ষি ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, দেবী সত্যবতী, যশস্বিনী কৌশল্যা ও অন্যান্য রাজপত্নিগণে পরিবৃতা গান্ধারী এবং বিচিত্রাভরণ-বিভূষিত দুর্য্যোধন প্রভৃতি ধৃতরাষ্ট্রের দায়াদগণ তাপসসন্দর্শনে ব্যগ্রচিত্ত হইয়া গমন করিতে লাগিলেন। তদনন্তর পুরোহিত সহিত কৌরবগণ এবং অন্যান্য পৌর জনপদগণ তপস্বীদিগকে দর্শন করিয়া দণ্ডবৎ প্রণিপাত করিলেন। পরে সেই সকল লোক ঋষিদিগের আদেশানুসারে উপবেশন করিলে মহাত্মা ভীষ্ম সমস্ত দর্শনার্থিগণকে নিস্তব্ধ দেখিয়া মহর্ষিদিগকে পাদ্য অর্ঘ্যদ্বারা যথাবিধি পূজা করত সমস্ত রাজ্য সমর্পণ করিলেন। তখন তাপসগণের মধ্যে পরিণতবয়াঃ এক মহর্ষি গাত্রোত্থান করিয়া অন্যান্য তপোধনের মত গ্রহণ-পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, "হে মান্যবরগণ! যে কৌরবদায়াদ পাণ্ডু নামক নরপতি সমস্ত ভোগসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক শতশৃঙ্গ পর্ব্বতে গমন করিয়া ব্রহ্মচর্য্যব্রত অবলম্বন করিয়া-ছিলেন, তাঁহার জ্যেষ্ঠা ধৰ্ম্মপত্নী কুন্তীর গর্তে সাক্ষাৎ ধর্মের ঔরসে এই যুধিষ্ঠিরনামা পুত্র জন্মিয়াছেন, ভগবান বায়ু হইতে এই মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন সমুৎপন্ন হইয়াছেন এবং দেবরাজ ইন্দ্রের ঔরসে এই ধনঞ্জয় নামে পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। অর্জুনের যশোরাশি সমস্ত মেদিনীমণ্ডলে বিস্তীর্ণ হইয়া অন্যান্য মহাধনুর্দ্ধর বীরপুরুষগণের কীর্তি বিলুপ্ত করিবে। আর এই যে দুই মহাধনুর্দ্ধর নরশ্রেষ্ঠকে দেখিতেছ, ইঁহারা সেই রাজর্ষির কনিষ্ঠা ধৰ্ম্মপত্নী মাদ্রীর গর্ভে অশ্বিনীকুমারের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। হে কুরুকুলাগ্রগণ্য! এইরূপে পরম ধর্মাত্মা মহাযশস্বী পাণ্ডু মহীপাল বনে বাস করিয়া নষ্টপ্রায় পিতামহ বংশের পুনরুদ্ধার করিয়াছেন। তোমরা এই পাণ্ডুপুত্রগণের বেদাধ্যয়নের বিষয় জ্ঞাত হইয়া পরম পরিতুষ্ট হইবে। সেই মনুজসত্তম রাজর্ষি পাণ্ডু অভিলষিত পুত্র লাভ করিয়া অদ্য সপ্তদশ দিবস হইল, পরলোকে গমন করিয়াছেন। পতিব্রতা মাদ্রীও পতির লোকান্তরপ্রাপ্তি দর্শনে সাতিশয় দুঃখিতা হইয়া তাঁহার মৃতদেহ আলিঙ্গনপূর্ব্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া পতিলোক প্রাপ্ত হইয়াছেন। তোমরা পাণ্ডু ও মাদ্রীর এই শবশরীরদ্বয় লইয়া কুন্তী ও যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতার সহিত তাঁহাদিগের অগ্নিকার্য্য, প্রেতক্রিয়া এবং শ্রাদ্ধাদি সম্পাদন কর।" কুরুগণকে এই কথা বলিয়া তাপসগণ দেখিতে দেখিতে গুহ্যকদিগের সহিত অন্তর্হিত হইলেন। তাঁহাদের সমাগমে হস্তিনাপুর গন্ধর্ব্বাধিষ্ঠিতের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিয়া-ছিল। এক্ষণে তাঁহারা অন্তর্দ্ধান করাতে পুরের আর সেরূপ শোভা রহিল না। সমাগত পৌরজনপদগণ, সিদ্ধ মহর্ষিগণ দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।
সপ্তবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
তদনন্তর ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, পাণ্ডুর ও মাদ্রীর সমুদায় প্রেতকার্য্য যাহাতে পরমসমারোহ-পূর্ব্বক সুচারু-রূপে সম্পন্ন হয়, তদ্বিষয়ে তুমি যত্নবান্ হও এবং তাঁহাদের দুইজনের যাবতীয় পশু, বস্ত্র, রত্ন ও ধন আছে, অর্থিগণের প্রার্থনানুসারে তৎসমুদায় প্রদান কর। কুন্তীদ্বারা মাদ্রীর সৎকার করাও। মাদ্রীকে এইরূপ সুসংবৃত করিবে যে, অন্যের কথা দূরে থাকুক, যেন বায়ু বা সূর্য্যও তাহাকে দেখিতে না পান। মহারাজ পাণ্ডুর নিমিত্ত আর শোক করিবার আবশ্যকতা নাই এবং তিনি অতিমাত্র প্রশংসনীয়, যেহেতু সেই মহাত্মা, মহাবল পরাক্রান্ত পঞ্চ পুত্র রাখিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতকুলতিলক জনমেজয়! বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের বাক্য শ্রবণানন্তর "যে আজ্ঞা” বলিয়া ভীষ্মকে সমভিব্যাহারে লইয়া অতি পবিত্র প্রদেশে পাণ্ডুর অগ্নিসংস্কার করিতে চলিলেন। কুরুপুরোহিতগণ পাণ্ডুরাজের আজ্য'গন্ধ-পরিপূত প্রদীপ্ত জাতাগ্নি' লইয়া সত্বর গমন করিতে লাগিলেন। অমাত্য জ্ঞাতি ও বান্ধবগণ একত্র হইয়া বিবিধ গন্ধদ্রব্য ও নানাজাতীয় পুষ্পদ্বারা পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃত কলেবর বিভূষিত করিলেন। পরে, মহার্ঘ্য বস্ত্রাচ্ছাদিত শিবিকার মধ্যে সেই দুই মৃত শরীর সংস্থাপন করিয়া সকলে স্কন্ধে লইয়া চলিলেন। তৎকালে কেহ বা শ্বেতচ্ছত্র ধারণ, কেহ বা চামর ব্যজন করিতে আরম্ভ করিল। চতুৰ্দ্দিকে নানাপ্রকার বাদ্যোদ্যম হইতে লাগিল। শত শত ব্যক্তি পাণ্ডুর পূর্ব্বসঞ্চিত বিবিধ ধন রত্ন লইয়া যাচকগণকে প্রদান করিতে লাগিল। শুক্লাম্বরধারী যাজকগণ প্রদীপ্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান করিতে করিতে তাঁহাদের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে লাগিলেন। সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র "হায়! কি হইল। মহারাজ! আমাদিগকে অপার দুঃখার্ণবে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় চলিলেন” এই বলিয়া করুণস্বরে রোদন করিতে করিতে পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। তদনন্তর পাণ্ডু ও মাদ্রীর শিবিকাবাহী পাণ্ডবগণ এবং ভীষ্ম ও বিদুর অশ্রুপূর্ণ নয়নে বনোদ্দেশে রমণীয় ভাগীরথীতীরে সমুপস্থিত হইয়া স্কন্ধস্থিত শিবিকা অবতারণ করিলেন এবং তন্মধ্য হইতে মহারাজের মৃত কলেবর বহিষ্কৃত করিয়া তাহাতে কালাগুরু ও চন্দন প্রভৃতি বিবিধ গন্ধদ্রব্য লেপনপূর্ব্বক সুবর্ণ কলসদ্বারা জল সেচন করিতে লাগিলেন। তৎপরে সেই মৃত দেহে পুনর্ব্বার নানাবিধ গন্ধদ্রব্য লেপন করিয়া স্বদেশীয় শুভ্র বস্ত্র পরিধান করাইলেন। মহারাজ পাণ্ডু শুভ্র বসনাচ্ছন্ন ও চন্দনাদি বিবিধ সুগন্ধ গন্ধদ্রব্যদ্বারা অনুলিপ্ত হওয়াতে জীবিতের ন্যায় পরম রমণীয় শোভা ধারণ করিলেন। তদনন্তর তাঁহারা যাজকদিগের আজ্ঞানুসারে সমস্ত প্রেতকার্য্য সুসম্পন্ন করণানন্তর মাদ্রীর সহিত রাজাকে ঘৃতাভিষিক্ত করিয়া চন্দন প্রভৃতি বহুবিধ সুগন্ধি কাষ্ঠদ্বারা দাহ করিতে লাগিলেন। কৌশল্যা' চিতাগ্নিস্থ পুত্র ও পুত্রবধূর মৃত কলেবর দর্শনে শোকে নিতান্ত অধীরা হইয়া "হা পুত্র! হা পুত্র!” বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে ধরাতলে পতিত ও মূর্ছিত হইলেন। তাঁহাকে ভূতলে পতিত দেখিয়া রাজভক্তিপরায়ণ প্রজাগণ "হায়! কি হইল। কি হইল!” বলিয়া করুণস্বরে রোদন করিতে লাগিল। কুন্তী ধূলি-ধূসরিত-কলেবর হইয়া কাতরস্বরে আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। তাঁহার ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণে মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক, তির্য্যগ্-যোনিগত পশুপক্ষীরাও রোদন করিতে লাগিল। শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, মহামতি বিদুর ও কৌরবগণ সাতিশয় দুঃখিত হইয়া অশ্রুমোচন করিতে লাগিলেন। তদনন্তর ভীষ্ম, বিদুর, রাজা ধৃতরাষ্ট্র, যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা ও অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গ এবং সমস্ত কৌরববনিতাগণ একত্র হইয়া ক্রন্দন করিতে করিতে মহারাজ পাণ্ডুর উদকক্রিয়া' সম্পাদন করিলেন। উদককার্য্য সমাপন হইলে রাজ্যস্থ প্রজাগণ পিতৃশোকবিমূঢ়চিত্ত পাণ্ডবগণকে অশেষ প্রকারে সান্ত্বনা করিতে লাগিল। পাণ্ডবগণ শোকে অধীর হইয়া সবান্ধবে ভূতলে শয়ন করিলেন, নগরবাসী ব্রাহ্মণাদি বর্ণেরাও ভূমিশয্যায় শয়ন করিলেন। নগরবাসী আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই সেই দিবসাবধি দশদিন নিতান্ত নিরানন্দ ও শোকসাগরে নিমগ্ন রহিল।
অষ্টাবিংশত্যধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর কুন্তী, রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্ম, বন্ধুগণ সমবেত হইয়া বেদবিধানানুসারে পাণ্ডুর ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ ও জ্ঞাতিবর্গকে ভোজন করাইলেন এবং প্রধান প্রধান বিপ্রগণকে প্রভূত রত্ন ও উত্তমোত্তম গ্রামসকল প্রদান করিলেন। পরে কৃতাশৌচ পাণ্ডবগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া হস্তিনা নগরে প্রবেশ করিলেন। পৌরবর্গ ও জনপদগণ পরলোকগত স্বকীয় বান্ধবের ন্যায় রাজর্ষি পাণ্ডুকে স্মরণ করিয়া অনুক্ষণ পরিতাপ করিতে লাগিল।
মহারাজ পাণ্ডুর শ্রাদ্ধকার্য্য সমাপনান্তর মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সেই সমস্ত লোকদিগকে দুঃখিত ও স্বীয় জননী সত্যবতীকে শোকসন্তপ্ত দেখিয়া তাঁহাকে কহিলেন, মাতঃ! সময় অতিশয় দারুণ হইয়া উঠিয়াছে, এক্ষণে সুখের লেশমাত্রও নাই; দিন দিন পাপবৃদ্ধি হইতেছে; পৃথিবী শস্যশূন্যা ও ফলবিহীনা হইতেছে। বোধ হয়, লোকসকল কালক্রমে নানাবিধ মায়াজালে জড়িত ও নানাদোষসংকীর্ণ হইয়া উঠিবে। প্রায় সকলেই কুকর্মা-নুষ্ঠানে নিরত হইবে। ধৰ্ম্মকৰ্ম্ম একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। কুরুদিগের দুর্নীতি প্রযুক্ত রাজশ্রী তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিবেন। তাহারা অতি অল্পদিনের মধ্যেই সবংশে কৃতান্তসদনে গমন করিবে, অতএব আপনি স্বচক্ষে স্বীয় বংশের বিনাশ দেখিবার পরিবর্তে বনে গমনপূর্ব্বক যোগানুষ্ঠানে যত্ন করুন।
সত্যবতী ব্যাসের বাক্যে অনুমোদন করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্ব্বক, স্বীয় পুত্রবধূ অম্বিকাকে কহিলেন, অম্বিকে! শুনিতে পাইলাম তোমার পৌত্রের অত্যাচারবশতঃ অল্পদিনের মধ্যেই আমাদিগের বংশ একবারে উচ্ছিন্ন হইবে, অতএব যদি তোমার মত হয় তবে চল, আমরা পুত্রশোকার্তা কৌশল্যাকে সমভিব্যাহারে লইয়া কাননে প্রস্থান করি। অম্বিকা শ্বশুর বাক্য শ্রবণ করিয়া "যে আজ্ঞা" বলিয়া স্বীকার করিলেন। তখন সত্যবতী ভীষ্মকে আমন্ত্রণপর্ব্বক স্নুষাদ্বয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া বনে গমন করিলেন। তথায় কঠোর তপস্যা করিতে করিতে কলেবর পরিত্যাগ করিয়া স্ব স্ব অভিলষিত মার্গে প্রস্থান করিলেন।
এ দিকে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ পাণ্ডব পৈত্রিক ভবনে থাকিয়া বিবিধ রাজভোগ উপভোগদ্বারা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে তাঁহাদের বেদোক্ত সংস্কারসকল সম্পাদিত হইল। তাঁহারা দুর্য্যোধনাদি শত ভ্রাতার সহিত সতত পরম সুখে ক্রীড়া করিতেন। সমস্ত বাল্যক্রীড়াতেই তাঁহাদের বিশেষ তেজস্বিতা প্রকাশ পাইত। স্পর্দ্ধাপূর্ব্বক সবেগ গমন, লক্ষ্যাভিহরণ' ও | অন্যান্য ক্রীড়ায় ভীমসেন যাবতীয় ধার্তরাষ্ট্রগণকে পরাভূত করিতেন। যখন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ পরমাহ্লাদে ক্রীড়া করিত, বৃকোদর তৎকালে তাহাদের পরস্পরের মস্তক সংঘট্টন' করিয়া দিতেন। ধার্তরাষ্ট্রেরা শত ভ্রাতা ও মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন একাকী, তথাপি তাঁহাদের সকলকে অনায়াসে নিগ্রহ করিতেন। তিনি কখন কখন তাঁহাদিগকে ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া কেশধারণপূর্ব্বক এমন বেগে আকর্ষণ করিতেন যে, তাহারা কেহ ক্ষতজানু, কেহ ক্ষত মস্তক, কেহ বা ক্ষতস্কন্ধ, হইয়া প্রাণনাশ ভয়ে পরিত্রাণার্থ আর্তস্বরে চীৎকার করিত। জলক্রীড়ার সময়ে তিনি এককালে তাঁহাদের দশজনকে ধরিয়া জলে মগ্ন হইয়া থাকিতেন, পরিশেষে, তাঁহারা মৃতকল্প হইলে ছাড়িয়া দিতেন। যৎকালে তাঁহারা ফলচয়নার্থ বৃক্ষে আরোহণ করিতেন, ভীমসেন সেই সময়ে পদাঘাতে সেই বৃক্ষ কম্পিত করিতেন; তাঁহারা প্রহারবেগ সহ্য করিতে না পারিয়া ফলের সহিত বৃক্ষ হইতে ভূতলে পতিত হইত। ফলতঃ ধার্তরাষ্ট্রেরা কি বাহুযুদ্ধ, কি বেগ, কি শস্ত্রাভ্যাস, কিছুতেই ভীমকে পরাস্ত করিতে পারিতেন না। এইরূপে বৃকোদর সর্ব্বদা সর্ব্ববিষয়ে জয়ী হওয়াতে বাল্যকালাবধি তাঁহাদের অত্যন্ত অপ্রিয় হইয়া উঠিলেন।
ধৃতরাষ্ট্রতনয়দিগের মধ্যে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ দুর্য্যোধন সর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুর, দুৰ্ম্মতি, পাপাচার ও ঐশ্বর্য্যলুব্ধ ছিল। ঐ দুরাত্মা ভীমসেনের অপরিমিত পরাক্রম দর্শনে সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া মনে মনে চিন্তা করিল, কুন্তীর মধ্যমপুত্র বৃকোদর বলবান, বিক্রমশালী ও শৌর্য্যযুক্ত; এই দুরাত্মা একাকী আমাদিগের শত ভ্রাতাকে অবলীলাক্রমে পরাজয় করে; অতএব যখন ভীম পুরোদ্যানে নিদ্রিত থাকিবে, তখন ইহাকে ধরিয়া গঙ্গায় নিক্ষেপ করিব, তাহা হইলেই ইহার কনিষ্ঠ অর্জুন ও জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে বদ্ধ রাখিয়া অনায়াসেই সসাগরা পৃথিবী শাসন করিতে পারিব। পাপাত্মা দুর্য্যোধন মনে মনে এইরূপ দুষ্ট অভিসন্ধি করিয়া মহাত্মা ভীমসেনের রন্ধ্রান্বেষণে সর্ব্বদা যত্ন করিতে লাগিল।
কিয়দ্দিন পরে দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন স্বীয় দুষ্টাভিসন্ধি সিদ্ধ করিবার আশয়ে জলবিহারার্থ গঙ্গাতীরে বসনবিরচিত ও কম্বলনিৰ্ম্মিত বিচিত্র গৃহসকল প্রস্তুত করাইল। ঐ সকল গৃহ অশেষবিধ ভোগ্যবস্তুদ্বারা পরিপূর্ণ ও অত্যুন্নত পতাকাসমূহে সুশোভিত করিল। তদনন্তর গঙ্গার পুলিনদেশে উদক-ক্রীড়নক নামে একটি স্থান নিদ্দিষ্ট করিয়া পাককার্য্যনিপুণ ব্যক্তিদিগকে নানাবিধ চ্য, চূষ্য, লেহ্য, পেয়দ্বারা ঐ স্থান পরিপূর্ণ করিতে আদেশ করিল। তাহারা তাঁহার আদেশানুসারে সমস্ত কার্য্য সুসম্পন্ন করিয়া সংবাদ প্রদান করিলে দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন পাণ্ডব-দিগের নিকটে গমনপূর্ব্বক কহিল, চল আমরা সকল ভ্রাতায় একত্র হইয়া উদ্যানবনশোভিত গঙ্গায় জলক্রীড়া করি। সরলা-ন্তঃকরণ যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ তাহার বাক্যে সম্মত হইলেন। তখন অপরিমিত শৌর্য্যশালী কৌরবগণ ও পাণ্ডবগণ কেহ নগরাকার রথে, কেহ বা দেশজ অ্যুৎকৃষ্ট গজে আরোহণপূর্ব্বক উদ্যান-সমীপে সমুপস্থিত হইয়া, সিংহসমূহ যেমন গিরিগুহায় প্রবেশ করে, তদ্রুপ সেই উদ্যানবনমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া উদ্যানশোভা নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। ঐ উদ্যান সুধাধবলিত রাজযোগ্য গৃহ, বলভী', গবাক্ষ ও জলযন্ত্রসমূহে ব্যাপ্ত; সৌধকারগণ গৃহ সকল সমার্জিত ও চিত্রকরেরা চিত্রিত করিয়াছে; সুশীতল জলপূর্ণ বৃহতী দীর্ঘিকা ও পুষ্করিণীসমূহ শোভা পাইতেছে। ঐ উদ্যানের সমুদায় জলভাগ সুকোমল কমলসমূহে ব্যাপ্ত এবং স্থলভাগ বিবিধ স্থলজ পুষ্পে সমাকীর্ণ ছিল।
কৌরব ও পাণ্ডবগণ কিয়ৎক্ষণ সেই উদ্যানের শোভা নিরীক্ষণ করিয়া তথায় উপবেশনপূর্ব্বক তত্রস্থ ভোগ্যবস্তুসকল ভক্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা সকৌতুকমনে আহার করিতে করিতে মিষ্টান্ন লইয়া পরস্পর পরস্পরের মুখে দিতে লাগিলেন। পাপাত্মা দুর্য্যোধন সেই অবসরে ভীমসেনকে বধ করিবার আশয়ে মিষ্টান্নে বিষ মিশ্রিত করিয়া স্বয়ং গাত্রোত্থান পূর্ব্বক ভ্রাতার ন্যায় ও পরম সুহৃদের ন্যায় মিষ্টবাক্য কহিতে কহিতে ভীমের বক্তে সেই বিষমিশ্রিত মিষ্টান্ন প্রদান করিল। সরলহৃদয় ভীমসেন, ঐ খাদ্য যে বিষমিশ্রিত, তাহা না জানিতে পারিয়া সাতিশয় প্রীতিপূর্ব্বক সেই মিষ্টান্ন ভক্ষণ করিলেন। দুরাত্মা দুর্য্যোধন তদ্দর্শনে আপনাকে কৃতকৃত্য জ্ঞান করিয়া মনে মনে হাসিতে লাগিল। তদনন্তর যাবতীয় ধার্তরাষ্ট্রগণ ও পাণ্ডবগণ মিলিত হইয়া পরমাহ্লাদে জলক্রীড়া করিতে লাগিলেন। ক্রমে ভগবান্ ভাস্কর অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলে তাঁহারা সকলে সাতিশয় পরিশ্রান্ত হইয়া জল হইতে গাত্রোত্থান করিলেন এবং বিহারগৃহে গমনপূর্ব্বক ধৌতবস্ত্র পরিধান ও বিচিত্র অলঙ্কার ধারণ করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। কেবল একাকী ভীমসেন বিষভক্ষণ ও ব্যায়ামাধিক্য প্রযুক্ত একান্ত ক্লান্ত হইয়া গঙ্গার কচ্ছদেশে' শয়ন করিবামাত্র নিদ্রায় অচেতন ও মৃতকল্প হইলেন। দুর্য্যোধন সেই অবসরে তাঁহাকে লতাপাশে বদ্ধ করিয়া স্থল হইতে জলে নিক্ষেপ করিল।
ভীমসেন কালকূটপ্রভাবে নিঃসংজ্ঞ হইয়াছিলেন। তিনি জলমগ্ন হইয়া ক্রমে ক্রমে নাগভবনে সমুপস্থিতও নাগকুমার-গণের উপর নিপতিত হইলেন। তদ্দর্শনে তত্রস্থ তীব্রবিষ বিষ-ধরগণ ক্রোধপরতন্ত্র হইয়া তাঁহাকে ভীষণদশনদ্বারা দংশন করিতে লাগিল। সর্পগণের জঙ্গমবিষদ্বারা ভীমশরীরস্থ স্থাবর কালকূট বিষের তেজ একবারে বিলুপ্ত হইয়া গেল। সর্পগণের দংশনে ভীমের দৃঢ় কলেবর ক্ষত বিক্ষত হইয়াছিল, কিন্তু তাঁহার হৃদয়ের ত্বক্ এমন কঠিন যে, উহাতে বিন্দুমাত্র দংশনচিহ্ন হইল না।
এইরূপে ভীমপরাক্রম ভীমসেন সর্পগণকর্তৃক দংষ্ট্র হওয়াতে কালকূট বিষ হইতে মুক্ত হইয়া সংজ্ঞা লাভপূর্ব্বক সর্পগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। উহাদের মধ্যে যাহারা ভীমের হস্ত হইতে পলাইয়া আত্মরক্ষা করিতে পারিয়াছিল, তাহারা বাসবতুল্য প্রভাবশালী নাগরাজ বাসুকির নিকটে সত্বর গমন করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল, "হে নাগেন্দ্র। এক মহাবল পরাক্রান্ত মানব আমাদিগের পাতালপুরে আসিয়া মহা উপদ্রব করিতে আরম্ভ করিয়াছে, যখন ঐ ব্যক্তি এখানে সমুপস্থিত হয়, তখন হস্তপদে বদ্ধ ও অচেতন, বোধহয় বিষ পান করিয়াছিল, এখানে আসিয়া আমাদিগের শিশু সন্তানগণের উপর নিপতিত হওয়াতে আমরা ক্রুদ্ধ হইয়া উহাকে দংশন করিলাম, পরে সে চৈতন্য লাভ করিয়া স্বীয় হস্ত পদের বন্ধন-চ্ছেদনপূর্ব্বক আমাদিগকে বিনাশ করিতে আরম্ভ করিল; ঐ নর প্রায় আমাদের সকলকেই বিনাশ করিয়াছে, কেবল আমরা কয়েকজন মাত্র কৌশলক্রমে পলাইয়া আসিয়াছি, এক্ষণে আপনি গিয়া তাহার পরিচয় গ্রহণ করুন।”
নাগরাজ বাসুকি সর্পগণের বচনানুসারে তাহাদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া তথায় গমনপূর্ব্বক মহাবাহু ভীমসেনকে দেখিতে পাইলেন। নাগরাজ দেখিবামাত্র তাঁহাকে স্বদৌহিত্র কুন্তিভোজের দৌহিত্র বলিয়া জানিতে পারিয়া প্রীতিপ্রসন্নচিত্তে সাদর সম্ভাষণপূর্ব্বক আলিঙ্গন করিলেন এবং তাঁহার উপর সাতিশয় প্রসন্ন হইয়া প্রচুর ধন ও রত্ন প্রদান করিলেন। তখন কোন সর্প কহিল, হে নাগেন্দ্র। যদি তীমের প্রতি অনুকূল হইয়া থাকেন, তবে যে কুণ্ড রক্ষার নিমিত্ত সহস্র নাগসৈন্য প্রতিষ্ঠিত আছে, সেই কুণ্ড হইতে তাঁহাকে উদরপূরণ করিয়া অমৃত পান করিতে অনুমতি করুন। নাগরাজ "তথাস্তু” বলিয়া সম্মতি প্রদান করিলেন। তখন ভীমসেন অন্যান্য নাগগণের আশীর্ব্বাদ-গ্রহণপুরঃসর শুচি হইয়া পূর্ব্বমুখে উপবেশনপূর্ব্বক অমৃত পান করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি এক এক নিশ্বাসে এক এক কুণ্ড অমৃত পান করিতে লাগিলেন। এইরূপে ক্রমে ক্রমে আট কুণ্ড পান করিয়া ফেলিলেন। অমৃতপান সমাপ্ত হইলে মহাভুজ বৃকোদর নাগদত্ত দিব্য শয্যায় শয়ন করিয়া পরমসুখে নিদ্রিত হইলেন।
ঊনত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এদিকে কৌরবগণ ও যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতৃচতুষ্টয় ক্রীড়া শেষ করিয়া যৎকালে গৃহে প্রত্যাগমন করেন, তখন ভীমসেনকে দেখিতে পাইলেন না, তাহাতে এই বিবেচনা করিলেন যে, তিনি আমাদিগের অগ্রেই গিয়াছেন; ইহা স্থির করিয়া কেহ রথে, কেহ গজে, কেহ অশ্বে, কেহ কেহ বা অন্যান্য যান-বিশেষে আরোহণপূর্ব্বক হস্তিনানগরে প্রস্থান করিলেন। পাপাত্মা দুর্য্যোধন বৃকোদরের অদর্শনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত পুর প্রবেশ করিলেন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির দুরাত্মা দুর্য্যোধনকৃত ব্যাপারের কিছুই জানিতেন না, সুতরাং ভীমের কোন অনিষ্টাশঙ্কা না করিয়াই পুরে প্রবেশ করিলেন। তিনি জননী-সদনে উপস্থিত হইয়া অভিবাদনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, মাতঃ! বৃকোদর যে গৃহে আসিয়াছে। তাহাকে দেখিতেছি না কেন? তবে সে কোথায় গেল? আমরা তাহার নিমিত্ত উদ্যান ও বন তন্ন তন্ন করিয়া অন্বেষণ করিয়াছি। যখন অনুসন্ধান করিয়া তাহাকে নিতান্ত পাইলাম না, তখন আমাদের বোধ হইল যে, অগ্রেই গৃহে আসিয়াছে। এক্ষণে তাহাকে না দেখিয়া অন্তঃকরণ নিতান্ত ব্যাকুল হইতেছে। সে এখানে আসিয়া আর কোথাও ত গমন করে নাই? আপনি ত তাহাকে কোথাও | পাঠান নাই?
কুন্তী যুধিষ্ঠিরের মুখে এই বাক্য শ্রবণ করিয়া "হায় কি হইল!” বলিয়া সসম্ভ্রমে যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, বৎস! আমি ভীমসেনকে দেখি নাই, সে এ পর্য্যন্ত গৃহে আগমন করে নাই, তুমি তোমার অনুজত্রয় সঙ্গে লইয়া শীঘ্র তাহার অন্বেষণ কর। চঞ্চলচিত্তা ভোজরাজ-দুহিতা জ্যেষ্ঠ পুত্রকে এইরূপ আদেশ দিয়া বিদুরকে সন্নিধানে আনয়নপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, ক্ষত্তঃ'! অদ্য কুমারগণ একত্র হইয়া উদ্যানে বিহার করিতে গিয়াছিল, সকলেই ফিরিয়া আসিয়াছে, কেবল একাকী ভীম এ পর্যন্ত প্রত্যাগমন করে নাই, সে যে কোথায় রহিয়াছে, কেহই তাহার অনুসন্ধান করিতে পারে নাই। দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন তাহাকে দেখিতে পারে না। ঐ দুরাত্মা নিতান্ত ক্রুর, একান্ত ক্ষুদ্র', বিষম রাজ্যলুব্ধ. ও সাতিশয় নির্লজ্জ; হয় ত ঐ পাপাত্মাই আমার ভীমকে বিনাশ করিয়াছে। এই ভাবিয়া আমার মন একান্ত ব্যাকুলিত হইতেছে।
মহামতি বিদুর কুন্তীর এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে কল্যাণি! যদি পরিণামে আপনার মঙ্গল চাও, তবে ও কথা আর মুখে আনিও না, দুরাত্মা দুর্য্যোধন তোমার এ কথার সূত্র শুনিতে পাইলে অতিশয় উপদ্রব করিবে। ভীমসেনের নিমিত্ত তোমার কিছুমাত্র চিন্তা নাই। মহামুনি বেদব্যাস কহিয়াছেন, তোমার পুত্রগণ দীর্ঘায়ুঃ হইবেন, তাঁহার কথা কখন মিথ্যা হইবার নহে। তুমি ভাবিত হইও না। ভীমসেন অবশ্যই প্রত্যাগমন করিয়া তোমার নয়নদ্বয়ের আনন্দ সম্পাদন করিবেন। বিদ্বান্ বিদুর এই কথা বলিয়া স্বকীয় নিকেতনে গমন করিলেন, কুন্তী পুত্রগণ সমভিব্যাহারে ভীমচিন্তায় একেবারে ম্রিয়মাণ হইয়া রহিলেন।
ও দিকে ভীমসেন অষ্টমদিবসে জাগরিত হইয়া শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিলেন। ভুজঙ্গমগণ তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সান্ত্বনাবাক্যে কহিতে লাগিলেন, হে মহাবাহো। তুমি যে বলোপধায়ক অমৃত পান করিয়াছ, তদ্দ্বারা অযুতগজো-পমবলশালী ও যুদ্ধে অধৃষ্য' হইবে; এক্ষণে এই দিব্য জলে স্নান করিয়া আপন ভবনে গমন কর; তোমার ভ্রাতৃগণ ও জননী তোমার অদর্শনে একান্ত ব্যগ্র হইয়া সাতিশয় ব্যাকুলিত-চিত্তে কালক্ষেপ করিতেছেন। নাগগণের বাক্যাবসানে মহাবল-পরাক্রান্ত বৃকোদর স্নান সমাপ্তি করিয়া শুক্লাম্বর পরিধান ও শুক্ল মাল্য ধারণ পূর্ব্বক বিবিধ সুরভি ঔষধদ্বারা কৃতকৌতুক-মঙ্গল হইয়া নাগদত্ত সুরস পরমান্ন ভোজন করিলেন। মহাবল-পরাক্রান্ত ভুজঙ্গমগণ তাঁহাকে কেহ পূজা, কেহ বা আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। দিব্যাভরণভূষিত ভীমসেন নাগগণকে আমন্ত্রণ করিয়া হৃষ্টচিত্তে নাগলোক হইতে স্বগৃহগমন মানসে গাত্রোত্থান করিলেন। নাগেরা তাঁহাকে জলমধ্য হইতে উত্তোলন করিয়া সেই পূর্বোক্ত বনোদ্দেশে স্থাপন করিয়া দেখিতে দেখিতেই অন্তর্হিত হইলেন।
তখন মহাবল পরাক্রান্ত মহাবাহু ভীমসেন আর বিলম্ব না করিয়া বনোদ্দেশ হইতে স্বভবনে গমনপুরঃসর সর্ব্বাগ্রেই জননীর সন্নিধানে সমুপস্থিত হইলেন এবং অগ্রে মাতাকে, তৎপরে জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন করিয়া, ভ্রাতাদিগের মস্তকাঘ্রাণ করিলেন। পুত্রবৎসলা কুন্তী ও যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতৃচতুষ্টয় পরম আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং "দৈব আমাদিগের প্রতি নিতান্ত অনুকূল, এই নিমিত্ত পুনর্ব্বার তোমার সন্দর্শন পাইলাম” এই বলিয়া আনন্দাশ্রু মোচন করিতে লাগিলেন। তৎপরে ভীমপরাক্রম ভীমসেন তাঁহাদের নিকটে দুর্য্যোধনের দুষ্টচেষ্টিত অবধি আপনার পাতালপুর হইতে প্রত্যাগমন পর্যন্ত যাবতীয় বৃত্তান্ত সবিশেষ কীর্ত্তন করিলেন। অসাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মহাত্মা যুধিষ্ঠির ভীমের নিকটে দুর্য্যোধন-কৃত দুষ্ট ব্যবহার শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ভ্রাতঃ! এ কথা আমাদিগের নিকট যাহা কহিলে, এই পর্যন্তই ভাল, আর কাহারও নিকটে মুখে আনিও না; আমরা অদ্যাবধি পরস্পর পরস্পরের রক্ষণ বিষয়ে সচেষ্ট থাকিব। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির ভীমসেনকে ইহা বলিয়া তদবধি ভ্রাতৃগণের সহিত সাবধান হইয়া চলিতে লাগিলেন। যে সময়ে পাণ্ডবগণ ক্রীড়াসক্ত থাকিতেন, তৎকালে রাজা ধৃতরাষ্ট্র, দুর্য্যোধন, কর্ণ এবং শকুনি নানাবিধ উপায়দ্বারা তাঁহাদিগের হিংসা করিতে চেষ্টা পাইতেন, কিন্তু তাঁহারা সে সকল জানিতে পারিয়াও বিদুরের পরামর্শা-নুসারে কিছুমাত্র প্রকাশ করিতেন না।
ত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আচার্য্য কৃপ কিরূপে শরস্তম্ব হইতে জন্মগ্রহণ করিলেন এবং কিরূপেই বা অস্ত্রসমুদায় প্রাপ্ত হইলেন, অনুগ্রহ করিয়া তৎসমুদায় বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহর্ষি গৌতমের গৌতম বলিয়া এক পুত্র জন্মেন। তিনি শরের সহিত জন্মিয়া-ছিলেন, এজন্য তাঁহার নাম শরদ্বান হইয়াছিল। ঐ পুত্র বেদাধ্যয়ন অপেক্ষা ধনুর্ব্বিদ্যাভ্যাসে অধিকতর অভিলাষী ও যত্নবান্ ছিলেন। যেমন ব্রহ্মচারিগণ তপোনুষ্ঠানদ্বারা বেদাধ্যয়ন করিতেন, তিনি সেইরূপ তপস্যাচরণ করিয়া সমস্ত অস্ত্র লাভকরিয়াছিলেন। তিনি ধনুর্ব্বেদানুশীলনে ও কঠোর তপোনুষ্ঠানে এরূপ যত্নশালী ছিলেন যে, দেবরাজ ইন্দ্র তদ্দর্শনে সাতিশয় ত্রাসিত হইয়া জানপদীনাম্নী দেবকন্যাকে আহ্বান করিয়া তাঁহার তপস্যার বিঘ্ন জন্মাইতে আদেশ প্রদান করিলেন। জানপদী দেবরাজের আদেশ অনুসারে ধনুর্ব্বাণধারী শরদ্বানের পরম রমণীয় আশ্রমে উপস্থিত হইয়া তাঁহার লোভ জন্মাইবার নিমিত্ত হাবভাব করিতে লাগিলেন। অলৌকিক রূপলাবণ্যসম্পন্না একমাত্রবসনা সেই ললনাকে নিরীক্ষণ করিবামাত্র মহাত্মা শরদ্বানের নয়নদ্বয় বিকসিত হইয়া উঠিল, হস্ত হইতে ধনুর্ব্বাণ ভূতলে পতিত হইল এবং বাতচালিত কদলীপত্রের ন্যায় সর্ব্বাঙ্গ কাঁপিতে লাগিল। এই অসাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন তপস্বী উক্ত প্রকারে কুসুমশরাহত হইয়াও স্বীয় তপঃপ্রভাবে ধৈর্য্যাবলম্বন করিয়া রহিলেন, কিন্তু দুঃসহ মদন-বিকার-প্রভাবে তাঁহার রেতঃস্খলন হইল, তিনি তাহা জানিতে পারিলেন না। তিনি সেই তপোন্তরায়ভূতা অপ্সরার সন্নিধান পরিত্যাগ করিবার মানসে যেমন আশ্রম হইতে প্রস্থান করিতে-ছিলেন, অমনি তাঁহার স্খলিত রেতঃ শরস্তম্বে নিপতিত হইল। বীর্য্য পতিত হইবামাত্র দুই খণ্ডে বিভক্ত হইল এবং তাহাতে এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মিল। এই সময়ে মহারাজ শান্তনু বনে মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহার এক সৈনিক পুরুষ যদৃচ্ছাক্রমে ঐ স্থানে উপস্থিত হইয়া সেই সদ্যোজাত বিপ্রমিথুনকে দেখিতে পাইল। তথায় ধনুঃশর ও কৃষ্ণাজিন পতিত দেখিয়া কোন ধনুর্ব্বেদপারগ ব্রাহ্মণের অপত্যযুগল বিবেচনায়, মহারাজকে আনিয়া দেখাইলে, অবশ্য ইহাদের গত্যন্তর হইতে পারে; স্থির করিয়া সে রাজাকে আনিয়া দেখাইল। রাজা সেই সদ্যোজাত মিথুন দর্শনে যৎপরোনাস্তি অনুকম্পাপরতন্ত্র হইয়া তাহাদিগকে গ্রহণ করিলেন এবং "ইহারা আমার সন্তান হইল” বলিয়া শরদ্বানের অপত্যদ্বয়কে আপন গৃহে আনয়নপূর্ব্বক অপত্য-নির্বিশেষে তাহাদিগকে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। মহারাজ শান্তনু কৃপা করিয়া তাহাদিগকে প্রতিপালন করিয়াছেন বলিয়া, পুত্রটির নাম কূপ ও কন্যাটির নাম কূপী রাখিলেন।
এদিকে মহাত্মা শরদ্বান্ আশ্রমান্তর নির্মাণ করিয়া তথায় ধনুর্ব্বেদানুশীলন ও কঠোর তপোনুষ্ঠানদ্বারা একজন অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর হইয়া উঠিলেন। তিনি একদা তপোবলে কূপ কৃপীর জন্মবৃত্তান্ত ও তাহারা যথায় যেরূপে বর্দ্ধিত হইতেছে, তৎসমস্ত জানিতে পারিলেন। তখন তিনি রাজভবনে আগমনপূর্ব্বক স্বীয় পুত্র কূপকে তাঁহার গোত্রাদি বলিয়া দিলেন এবং তাঁহাকে চতুর্ব্বিধ ধনুর্ব্বেদ ও বিবিধশাস্ত্র সম্পূর্ণরূপে অধ্যয়ন করাইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। এইরূপে কূপ অতি অল্পদিনের মধ্যেই একজন উৎকৃষ্ট ধনুর্ব্বেদাধ্যাপক হইয়া উঠিলেন। ধৃতরাষ্ট্রতনয়গণ, পাণ্ডবেরা, যাদব সকল, বৃষ্ণিবর্গ, নানা দিগ্দেশাগত অন্যান্য ভূপতি সমস্ত তাঁহার নিকটে আসিয়া ধনুর্ব্বেদ অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন।
মহাত্মা ভীষ্ম বিশেষরূপ বিনয়াধান ও শিক্ষা প্রদান করিবার নিমিত্ত একজন বুদ্ধিমান্ নানাশাস্ত্রসম্পন্ন দেবতুল্য সত্ত্বশালী অধ্যাপকের হস্তে পৌত্রদিগকে সমর্পণ করিবার মানস করিলেন। পরে বেদবেত্তা ধীমান্ ভরদ্বাজনন্দন দ্রোণাচার্য্যকে স্বভবনে আনয়নপূর্ব্বক পাদ্য অর্থ্যাদি দ্বারা তাঁহার যথোচিত সৎকার করিলেন এবং শিক্ষা প্রদানার্থ পৌত্রদিগকে তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিয়া দিলেন। অস্ত্রবিদ্যাবিশারদ মহাভাগ দ্রোণাচার্য্য ভীষ্মের সাতিশয় আস্থা দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়া কুমারগণকে শিষ্যরূপে পরিগ্রহ' করিলেন এবং সাতিশয় যত্ন ও দৃঢ়তর মনোযোগসহকারে তাহাদিগকে বিশেষরূপে ধনুর্ব্বেদ অধ্যয়ন করাইতে লাগিলেন। ছাত্রেরা সকলেই বুদ্ধিমান, অচিরকালমধ্যেই সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ও অপরিমিত তেজস্বী হইয়া উঠিলেন।
জনমেজয় কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। ধনুর্ব্বেদপারগ দ্রোণাচার্য্য কি প্রকারে জন্মগ্রহণ করিলেন, কি প্রকারে অস্ত্রবিদ্যায় সুনিপুণ হইলেন, কি নিমিত্ত কুরুদিগের নিকটে আগমন করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুত্র- এবং অশ্বত্থামা নামে তাঁহার সর্ব্বাস্ত্রবিৎ পুত্রই বা কি প্রকারে জন্মগ্রহণ করিলেন, এই সকল শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে, অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়া সবিশেষ কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ। ভারতবর্ষের উত্তর সীমায় পৃথিবীর মানদণ্ডস্বরূপ হিমালয় নামে পৰ্ব্বত আছে, তথা হইতে ভগবতী ভাগীরথী নির্গত হইতেছেন। পূর্ব্বকালে সেই স্থানে দৃঢ়ব্রত মহর্ষি ভরদ্বাজ তপস্যা করিতেন। তিনি যজ্ঞদীক্ষিত হইয়া একদা মহর্ষিগণ সমভিব্যাহারে গঙ্গায় প্রাতঃস্নান করিতে গিয়াছিলেন। সেই সময়ে অপ্সরোগ্রগণ্যা ঘৃতাচী স্নান করিয়া তীরে উঠিতেছিল। দৈবাৎ বায়ুবেগে তাহার গাত্রবসন উড্ডীন হইল। মহর্ষি সেই সুরূপা নবযৌবনা মদদৃপ্তা' অপ্সরাকে বিবসনা দেখিয়া কামশরে জর্জরিত-কলেবর হইলেন। দুর্জয় কুসুমায়ুধের' দুঃসহ প্রভাবে তপোধনের রেতঃ স্খলিত হইল। তিনি সেই রেতঃ এক দ্রোণ অর্থাৎ কলসের মধ্যে রাখিলেন। কিয়দ্দিন পরে সেই বীর্য্য এক পুত্ররূপে পরিণত হইল। মহর্ষি ভরদ্বাজ দ্রোণমধ্যে জাত বলিয়া, ঐ পুত্রের নাম দ্রোণ রাখিলেন। দ্রোণ ক্রমে ক্রমে সমস্ত বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বে প্রতাপশালী অস্ত্র-বিদের অগ্রগণ্য মহাত্মা ভরদ্বাজ অগ্নিসম্ভূত অগ্নিবেশনামা তপোধনকে এক আগ্নেয় অস্ত্র দিয়াছিলেন, এক্ষণে ঐ তপোধন সেই আগ্নেয় অস্ত্র গুরুপুত্র দ্রোণকে প্রদান করিলেন।
পৃষতনামা নরপতি মহর্ষি ভরদ্বাজের পরম সখা ছিলেন। তাঁহারও দ্রুপদ নামে এক সন্তান জন্মে। দ্রুপদ প্রতিদিন ভরদ্বাজের আশ্রমে গমন করিয়া দ্রোণের সহিত একত্র ক্রীড়া ও অধ্যয়ন করিতেন। কিয়দ্দিনান্তর নৃপতি পৃষত পরলোক প্রাপ্ত হইলে মহাবাহু দ্রুপদ সমুদায় উত্তর পাঞ্চালের অধিপতি হইয়া রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। মহর্ষি ভরদ্বাজও কলেবর পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গারোহণ করিলে মহাত্মা দ্রোণ সেই পৈত্রিক আশ্রমে থাকিয়া তপস্যা করিতে লাগিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে সমস্ত বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিলেন। তপোনুষ্ঠানদ্বারা তাঁহার সমস্ত পাপ ধ্বংস হইয়া গেল। কিয়দ্দিন পরে দ্রোণ মহাশয় পিতৃনিয়োগানুসারে পুত্রলাভাকাঙ্ক্ষায় শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করিলেন। এই কামিনী দমগুণযুক্তা অগ্নিহোত্রনিরতা ও ধৰ্ম্মপরায়ণা ছিলেন। ইঁহার গর্তে দ্রোণাচার্য্যের অশ্বত্থামা নামে পুত্র জন্মে। ঐ পুত্র জাতমাত্র উচ্চৈশ্রবাঃ অশ্বের ন্যায় ধ্বনি করিল। ঐ ধ্বনি শ্রবণানন্তর এই দৈববাণী হইল "এই পুত্র জন্মিবামাত্র অশ্বহ্রেষার ন্যায় গভীরধ্বনিদ্বারা দিগন্তসকল প্রতিধ্বনিত করিল, অতএব ইহার নাম অশ্বত্থামা হইবে।” মহাত্মা দ্রোণ পুত্রলাভে পরম পরিতুষ্ট হইলেন।
ঐ সময়ে অরাতি-তপন' সর্ব্বজ্ঞানসম্পন্ন সর্ব্বাস্ত্রবিৎ মহাত্মা জমদগ্নিনন্দন পরশুরাম ব্রাহ্মণদিগকে সর্ব্বস্ব প্রদান করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছিলেন। দ্রোণ উহা অবগত হইয়া রামের নিকট হইতে ধনুর্ব্বেদ, দিব্যাস্ত্র সমুদায় ও নীতিশাস্ত্র গ্রহণ করিতে সাতিশয় সমুৎসুক হইলেন। অনন্তর তিনি ব্রতচারী তপোনিষ্ঠ শিষ্যগণে পরিবৃত হইয়া মহেন্দ্র পর্ব্বতে গমনপূর্ব্বক দেখিলেন যে, শত্রুতাপী জমদগ্নিকুমার এককালে সংসার-সুখে জলাঞ্জলি দিয়া তত্রত্য বনে অবস্থিতিপূর্ব্বক কালযাপন করিতেছেন। তখন ভরদ্বাজনন্দন শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে তাঁহার সমীপে গমনপূর্ব্বক তাঁহার পাদবন্দন করিলেন এবং কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি মহর্ষি অঙ্গিরার কুলে সমুৎপন্ন, ভরদ্বাজের পুত্র, অযোনিসম্ভূত, আমার নাম দ্রোণ; আমি ধনাকাঙ্ক্ষায়-আপনার নিকট আসিয়াছি। দ্রোণের বাক্যাবসানে ক্ষত্রিয়কুল-কালান্তক ভগবান্ পরশুরাম তাঁহাকে সাদর সম্ভাষণে স্বাগত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! তোমাকে কি ধন প্রদান করিতে হইবে? দ্রোণ কহিলেন, ভগবন! আমাকে বিবিধ অনন্ত ধন প্রদান করুন। রাম কহিলেন, হে তপোধন! আমার যাবতীয় হিরণ্য ও অন্যান্য ধন ছিল, সমস্তই ব্রাহ্মণ-দিগকে প্রদান করিয়াছি, এই সসাগরা পৃথিবী স্ববাহুবলে জয় করিয়া মহর্ষি কশ্যপকে দিয়াছি; এক্ষণে কেবল আমার শরীর ও বিবিধ মহার্হ অস্ত্রশস্ত্রমাত্র অবশিষ্ট আছে, ইহার মধ্যে তোমার যাহা ইচ্ছা হয় শীঘ্র প্রার্থনা কর, তাহাই প্রদান করিব। তখন দ্রোণ কহিলেন, হে বিপুলব্রত ভৃগুনন্দন! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে প্রয়োগ সংহার সমবেত আপনার অস্ত্রসমুদায় আমাকে প্রদান করুন। পরশুরাম "তথাস্তু” বলিয়া দ্রোণকে সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র ও রহস্যসমবেত ধনুর্ব্বেদ প্রদান করিলেন।। দ্বিজসত্তম দ্রোণ এইরূপে পরশুরামের নিকট হইতে অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করিয়া পরম প্রীতমনে প্রিয়সস্থা দ্রুপদ সমীপে গমন করিলেন।
একত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর মহাপ্রতাপশালী ভরদ্বাজ-নন্দন দ্রোণ, মহারাজ দ্রুপদের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, রাজন! আমি তোমার সখা। ঐশ্বর্য্যমদমত্ত দ্রুপদরাজ দ্রোণের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কিছুমাত্র আস্থা প্রদর্শন করিলেন না; প্রত্যুত রোষকষায়িত লোচনে ভূকুটী প্রদর্শন করিয়া কহিতে লাগিলেন, ওহে ব্রাহ্মণ! তুমি হঠাৎ আমাকে সখা বলিয়া নিতান্ত নির্বোধের কার্য্য করিতেছ; ঐশ্বর্য্যশালী ভূপতিগণের সহিত ভবাদৃশ শ্রীহীন নির্দ্ধন লোকের বন্ধুতা নিতান্ত অসম্ভব; বাল্যা-বস্থায় তোমার সহিত আমার সখ্য ছিল যথার্থ বটে, কিন্তু এক্ষণে তোমার সহিত সেরূপ বন্ধুত্ব থাকা কোনক্রমেই উচিত নহে; কাহারও সহিত চিরকাল বন্ধুতা থাকে না; হয় সর্ব্বসংহর্তা কৃতান্ত উহা বিলুপ্ত করেন, নয় ক্রোধবশতঃ বিনষ্ট হইয়া যায়; অতএব তুমি সেই পূর্ব্বতন সৌহার্দ্দ এক্ষণে দূরে পরিত্যাগ কর। হে দ্বিজোত্তম! পূর্ব্বে তোমার সহিত আমার যে বন্ধুতা ছিল, তাহা কেবল অর্থনিবন্ধনমাত্র; যেমন পণ্ডিতের সহিত মূর্খের ও শূরের সহিত ক্লীবের বন্ধুতা কদাচ হইবার নয়; তদ্রূপ ধনবানের সহিত দরিদ্রের সখ্য হওয়া নিতান্ত অসম্ভব; অতএব তুমি কি নিমিত্ত পূর্ব্বতন বন্ধুত্ব প্রাপ্ত হইতে ইচ্ছুক হইতেছ? হে ব্রাহ্মণ! যাহারা ধনে ও জ্ঞানে আপনার সদৃশ তাহাদিগেরই সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ ও সখ্য সংস্থাপন করা কর্তব্য; তদ্ব্যতীত উৎকৃষ্টের সহিত নিকৃষ্টের বা নিকৃষ্টের সহিত উৎকৃষ্টের মৈত্রী বা বৈবাহিক সম্বন্ধ করা নিতান্ত অনুচিত। হে বিপ্র! যেমন অশ্রোত্রিয়ের সহিত শ্রোত্রিয়ের ও অরথীর সহিত রথীর বন্ধুতা হওয়া একান্ত অসম্ভব; সেইরূপ রাজার সহিত দরিদ্রের কখনই সখ্য হয় না; তবে তুমি কি নিমিত্ত অদ্য পূর্ব্বের ন্যায় আমার সহিত সখ্য করিতে অভিলাষী হইতেছ?
মহাতেজাঃ দ্রোণ দ্রুপদের এই কটূক্তি শ্রবণে মুহূৰ্ত্তমাত্র চিন্তা করিয়া ক্রোধে কম্পিতকলেবর হইলেন এবং সেই ক্ষণেই দ্রুপদ রাজার প্রতি তাঁহার নিতান্ত বৈরভাব জন্মিল। তিনি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে বহির্গত হইয়া হস্তিনানগরে আগমন-পূর্ব্বক নিজ শ্যালক কৃপাচার্য্যের আবাসে প্রচ্ছন্নরূপে বাস করিতে লাগিলেন। যখন কৃপাচার্য্য বালকগণকে শিক্ষা প্রদান করিয়া বিশ্রাম করিতেন, সেই সময়ে দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা কুন্তীনন্দনদিগকে পুনরায় শিক্ষা করাইতেন। কেহই তাঁহাকে দ্রোণপুত্র বলিয়া চিনিতে পারিত না। এইরূপে দ্রোণাচার্য্য পুত্রের সহিত হস্তিনানগরে গূঢ়রূপে বাস করিতে লাগিলেন।
একদা হস্তিনাপুরস্থ বালকগণ নগর হইতে বহির্গমন-পূর্ব্বক একত্র হইয়া লৌহগুলিকাদ্বারা ক্রীড়া করিতেছিল, দৈবাৎ ঐ গুলিকা এক জলশূন্য কূপমধ্যে নিপতিত হইল। কুমারগণ কূপ হইতে গুলিকা উদ্ধার করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য্য হইল না। তখন তাহারা সাতিশয় উৎকণ্ঠিত ও যৎপরোনাস্তি লজ্জিত হইয়া পরস্পর পরস্পরের মুখাবলোকন করিতে লাগিল। ঐ সময়ে দ্রোণাচার্য্য তাহাদিগের নিকট দিয়া গমন করিতেছিলেন। তাঁহার অঙ্গ কৃশ ও শ্যামবর্ণ, মস্তক পলিত' এবং সমভিব্যাহারে অগ্নিহোত্র রহিয়াছে। গুলিকোদ্ধরণে ভগ্নোৎসাহ কুমারগণ ঐ মহাত্মাকে দেখিয়া উঁহার চতুর্দিকে দণ্ডায়মান হইল। দ্রোণ তাহাদিগকে দেখিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, হে বালকবৃন্দ। তোমাদিগকে ধিক্, তোমাদিগের ক্ষাত্রবলে ধিক্ এবং তোমাদিগের অস্ত্রশিক্ষাও ধিক্, যেহেতু তোমরা ভরতবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াও এই সামান্য কূপ হইতে গুলিকা উদ্ধার করিতে পারিলে না। আমি লৌহ-গুলিকা এবং অঙ্গুরীয়ক উভয়ই ঈশিকা' দ্বারা উদ্ধার করিব, তোমরা আমাকে ভোজন করাও। এই বলিয়া আপনার অঙ্গুলিস্থ অঙ্গুরীয়ক ঐ নিরুদক কূপমধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। তখন যুধিষ্ঠির দ্রোণকে কহিলেন, মহাশয়! যদি আপনি কূপ হইতে গুলিকা উদ্ধার করিতে পারেন, তাহা হইলে কৃপাচার্য্যের অনুমতিক্রমে আপনি চিরকাল ভিক্ষা পাইবেন। দ্রোণ তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া হাসিতে হাসিতে একমুষ্টি ঈষীকা হস্তে লইয়া কহিলেন, এই যে ঈষীকামুষ্টি দেখিতেছ, ইহার প্রভাব দেখ, একটি ঈষীকাদ্বারা কূপমধ্যস্থিত সেই গুলিকা বিদ্ধ করিব, সেই ঈষীকা অপর একটির দ্বারা এবং তাহা অন্য একটির দ্বারা বিদ্ধ করিব; এইরূপে ক্রমে ক্রমে একটির দ্বারা অন্য ঈষীকা বিদ্ধ করিয়া ঐ গুলিকা উত্তোলন করিব।
দ্রোণাচার্য্য তাহাদিগকে এই কথা বলিয়া তৎক্ষণাৎ সেই ঈষীকামুষ্টিদ্বারা স্বীয় প্রতিজ্ঞানুরূপ কূপ হইতে গুলিকা উত্তোলন করিলেন। বালকেরা তদ্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া কহিল, বিপ্রর্ষে! আপনার অঙ্গুরীয়কটিও শীঘ্র উত্তোলন করুন। তখন মহাযশাঃ দ্রোণাচার্য্য হস্তে ধনুঃশর লইয়া কূপমধ্যে বাণ নিক্ষেপ করিলেন এবং তদ্দ্বারা সেই অঙ্গুরীয়ক বিদ্ধ করিয়া উর্দ্ধে উত্তোলন করিয়া কুমারগণের সম্মুখে আনিয়া দিলেন। তাহারা অঙ্গুরীয়ক দর্শনে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর বিস্ময়াপন্ন হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিতে লাগিল, হে ব্রহ্মন্! আপনাকে অভিবাদন করি; আপনি যেরূপ ক্ষমতা প্রকাশ করিলেন, ইহা অন্যের সাধ্য নহে; অতএব মহাশয় আপনার পরিচয় প্রদান ও কর্তব্য বিষয়ে আদেশ করিয়া আমাদিগকে চরিতার্থ করুন। দ্রোণাচার্য্য কুমারদিগের বচন শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে বালকগণ! তোমরা ভীষ্মের নিকটে যাইয়া আমার রূপ ও গুণ বিশেষরূপে বর্ণন করিয়া তাঁহাকে কহিবে যে, সেই মহাতেজাঃ এ স্থানে সমুপস্থিত হইয়াছেন। কুমারগণ দ্রোণের আদেশানুসারে ভীষ্মের নিকটে গমন করিয়া দ্রোণের রূপ ও আশ্চর্য্য কৰ্ম্ম সবিশেষ বর্ণন করিল। মহাত্মা ভীষ্ম কুমারগণের বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বুঝিতে পারিলেন যে, দ্রোণাচার্য্য আগমন করিয়াছেন। ইতিপূর্ব্বেই তিনি একজন সুশিক্ষকের হস্তে কুমারগণকে সমর্পণ করিবার মানস করিয়া-ছিলেন, এক্ষণে ধনুর্বিদ্যাবিশারদ দ্রোণাচার্য্য স্বেচ্ছাক্রমে তাঁহা-দিগের অধিকারে আগমন করিয়াছেন শুনিয়া, যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি স্বয়ং দ্রোণসমীপে গমন করিয়া তাঁহাকে স্বীয় ভবনে আনয়নপূর্ব্বক যথোচিত সৎকার করিয়া সাদর সম্ভাষণে কুশলপ্রশ্ন ও আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
দ্রোণ ভীষ্মের বচনাবসানে কহিতে লাগিলেন, হে মহাত্মন্! পূর্ব্বে আমি ধনুর্ব্বেদ শিক্ষার্থে মহর্ষি অগ্নিবেশের' নিকটে গমন করিয়াছিলাম। তথায় গিয়া ব্রহ্মচর্য্য গ্রহণ, আত্মসংযম ও জটা ধারণপূর্ব্বক গুরুসেবায় নিযুক্ত হইয়া বহু বৎসর বাস করিয়াছিলাম। হে ভীষ্ম! ঐ সময়ে পাঞ্চালদেশীয় রাজপুত্র মহাবল দ্রুপদ ঐ অগ্নিবেশের নিকটে অস্ত্রবিদ্যাভ্যাসার্থ তদীয় আশ্রমে বাস করিত। এইরূপে বাল্যকালাবধি একত্র বাস ও এক গুরুর নিকটে বিদ্যাভ্যাস করাতে দ্রুপদ ক্রমে ক্রমে আমার পরমোপকারী প্রিয়সখা হইয়া উঠিল। সে সর্ব্বদা আমাকে প্রিয়বাক্য বলিত ও আমার প্রিয়কার্য্য করিত। একদা আমাকে কহিল, হে দ্রোণ। আমি পিতার প্রিয়তম পুত্র। তিনি যখন আমাকে পাঞ্চালরাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন, আমি শপথ করিতেছি, তৎকালে আমার যাবতীয় ভোগ, সম্পত্তি ও সুখ, সমস্তই তোমার অধীন হইবে। দ্রুপদ আমাকে এই কথা কহিয়া কিয়দ্দিনমধ্যে কৃতবিদ্য হইয়া আপনার নিকেতনে গমন করিল। গমনকালে আমি তাঁহাকে সমুচিত সম্মান প্রদর্শন করিয়া বিদায় দিলাম। কিন্তু তদবধি তাঁহার ঐ বাক্য আমার হৃদয়মন্দিরে সর্ব্বদা জাগরূক রহিল।
হে শান্তনুতনয়। কিছুদিন পরে আমি পিতৃনিয়োগানুসারে পুত্রলাভাকাঙ্ক্ষায় গৌতমনন্দিনী কৃপীকে বিবাহ করিলাম। ঐ কামিনী অনতিদীর্ঘকেশা, পরমপ্রজ্ঞা, মহাব্রতা এবং অগ্নিহোত্র, যজ্ঞ ও দমগুণে সর্ব্বদা নিরতা। কিয়দ্দিনানন্তর কৃপীর গর্তে আমার অশ্বত্থামা নামে মহাবিক্রমশালী আদিত্যসমতেজাঃ এক পুত্র জন্মিল। পিতা যেমন আমাকে পাইয়া প্রীত হইয়াছিলেন, আমিও অশ্বত্থামাকে প্রাপ্ত হইয়া সেইরূপ অতীব আনন্দিত হইলাম। একদা অশ্বত্থামা ধনিকদিগের পুত্রগণকে দুগ্ধ পান করিতে দেখিয়া আমার নিকটে আসিয়া রোদন করিতে লাগিল; তদ্দর্শনে আমার মন নিতান্ত চঞ্চল হইল। তখন আমি ধৰ্ম্মা-নুপেত প্রতিগ্রহ করিবার বাসনায় বহুতর স্থলে ভ্রমণ করিলাম, কিন্তু কুত্রাপি দুগ্ধবতী গাভী দেখিতে পাইলাম না। পরিশেষে বিষন্নমনে নিজ নিকেতনে প্রত্যাবর্তন করিলাম। তথায় আসিয়া দেখিলাম, বালকগণ পিষ্টোদক আনয়ন করিয়া "এই দুগ্ধ, ইহা পান কর" বলিয়া অশ্বত্থামাকে লোভ দেখাইতেছে। বালস্বভাব অশ্বত্থামাও উহা পান করিয়া "দুগ্ধ পান করিলাম” বলিয়া হরিতেছে। বালকগুণ "ধনহীন দ্রোণকে ধিক্, যাহার সন্তান পিষ্টোদক পান করিয়া দুগ্ধ খাইলাম বলিয়া নৃত্য করিতেছে” এই বলিয়া তাহাকে বারংবার উপহাস করিতেছে। হে গাঙ্গেয়! স্বীয় সন্তানের সেই দুরবস্থা দর্শনে এবং অন্যান্য বালকগণের ঐ পরিহাসবাক্য শ্রবণে আমার মন দুঃখানলে একেবারে দগ্ধ হইয়া গেল। আমি মনে মনে আপনাকে তিরস্কার করিয়া চিন্তা করিলাম, আমি ইতিপূর্ব্বে নির্দ্ধনতাজন্য ব্রাহ্মণগণ-কর্তৃক নিন্দিত ও পরিত্যক্ত হইয়া উপবাসে কালক্ষেপ করিয়াছি, তথাপি ধনলিপ্সায় কখন পাপজনক পরসেবায় আসক্ত হই নাই। হে ভীষ্ম। মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া দ্রুপদের পূর্ব্ব স্নেহানুসারে পুত্রকলত্রসমভিব্যাহারে পাঞ্চালরাজ্যে গমন করিলাম। পথিমধ্যে শুনিলাম, দ্রুপদ পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়াছেন। তৎশ্রবণে প্রিয় বান্ধবের সহবাস ও প্রতিশ্রুত বাক্য স্মরণ করিয়া আমি কৃতার্থম্মন্য হইলাম। পরে অবিলম্বে তাঁহার সমীপে গমনপূর্ব্বক পূর্ব্বতন সখ্য স্মরণ করিয়া কহিলাম, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! আমি তোমার সখা, তুমি পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে যে, আমার সহিত একত্র রাজ্যভোগ করিবে, আমি তদনুসারে তোমার নিকটে আসিয়াছি। দ্রুপদ আমার সেই কথায় কিছুমাত্র আস্থা প্রদর্শন করিল না, প্রত্যুত, আমাকে হীনলোকের ন্যায় অবজ্ঞা করিয়া কহিল, হে ব্রহ্মন্! তুমি আসিয়া হঠাৎ আমাকে সখা বলিয়া সুবুদ্ধির কার্য্য কর নাই; পূর্ব্বে তোমার সহিত আমার সখ্য ছিল যথার্থ বটে, কিন্তু এক্ষণে আর তুমি আমার বন্ধুর উপযুক্ত নও; অশ্রোত্রিয় কখন শ্রোত্রিয়ের সখা হইতে পারে না; অরথীর সহিত রথীর সখ্য হওয়া নিতান্ত অসম্ভব; সমানে সমানে বন্ধুতা হওয়াই উচিত; অসমানের সহিত বন্ধুতা করা অবিধেয়। সখ্য চিরকাল সমভাবে থাকিবার নহে। হয় কাল, নতুবা পরস্পরের ক্রোধ উহাকে বিনাশ করে। তুমি সেই পুরাতন বন্ধুতা দূরে পরিত্যাগ কর। পূর্ব্বে তোমার সহিত আমার যে সখ্য ছিল, সে কেবল সামর্থ্যনিবন্ধনমাত্র। যেমন মূর্খের সহিত বিদ্বানের ও ক্লীবের সহিত শূরের সখ্য হয় না, তদ্রূপ নির্দ্ধনের সহিত ধনবানের বন্ধুতা হওয়া নিতান্ত দুর্ঘট; অতএব কেন আমার সহিত পূর্ব্বের ন্যায় বন্ধুতা করিতে আসিয়াছ? হা মন্দাত্মন্! ভবাদৃশ ধনবিহীন হীনলোকের সহিত অতুলধনসম্পত্তিসম্পন্ন মহারাজদিগের বন্ধুতা হওয়া যে নিতান্ত অসম্ভব, তাহা কি তুমি জান না? তবে তুমি কি নিমিত্ত পূর্ব্বের ন্যায় আমার সহিত বন্ধুত্ব করিতে বাসনা করিতেছ? তুমি কহিতেছ, আমি তোমার সহিত একত্র রাজ্যভোগ করিব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, কিন্তু তাহার বিন্দুমাত্রও আমার স্মরণ হইতেছে না, এক্ষণে কেবল এক রাত্রির নিমিত্ত তোমাকে ভোজন প্রদান করিতে পারি।
হে শান্তনুতনয়! দ্রুপদের মুখে এই প্রকার কটূক্তি শ্রবণে আমার মন ক্রোধানলে দগ্ধ হইতে লাগিল। আমি অবিলম্বে তথা হইতে প্রস্থান করিলাম। হে ভীষ্ম! আগমনকালে আমি যেরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহা অতি ত্বরায় সম্পন্ন করিব, এই মানসে গুণবান্ শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে কুরুদিগের অধিকারে আসিলাম। এক্ষণে তোমাকে সংবর্জন করিতে এই সুরম্য হস্তিনানগরে আসিয়াছি। বল, তোমার কি প্রিয় কার্য্য করিতে হইবে? মহাত্মা ভীষ্ম দ্রোণের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে মহাত্মন্। শরাসনের গুণ মোচন করুন; আপনি অনুগ্রহ করিয়া বালকগণকে সম্যক্ররূপে অস্ত্র শিক্ষা করান এবং সতত পুজিত হইয়া প্রীতিপ্রসন্নমনে পরম সুখ ভোগ করুন। কুরুদিগের যাবতীয় ধন ও রাজ্য, সমস্তই আপনার অধীন হইবে। আপনিই রাজা, কুরুগণ আপনারই আজ্ঞাবহ হইবেন। হে ব্রহ্মান্। আপনি যখন যাহা চাহিবেন তৎক্ষণাৎ তাহা প্রাপ্ত হইবেন। হে বিপ্রর্ষে। আপনি আমাদিগের সৌভাগ্যবশতঃ যদৃচ্ছাক্রমে এস্থানে আগমন করিয়া যৎপরোনাস্তি অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন।
দ্বাত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। অনন্তর দ্রোণাচার্য্য, মহানুভব ভীষ্মকর্তৃক সৎকৃত হইয়া পরম সমাদরে কুরুগৃহে বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। তিনি বিশ্রান্ত হইলে ভীষ্মদেব প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া প্রচুর অর্থের সহিত পৌত্রদিগকে শিষ্যরূপে তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিলেন এবং তাঁহার বাসের নিমিত্ত পরিচ্ছন্ন ও ধনধান্যসম্পন্ন এক গৃহ নির্দেশ করিয়া দিলেন। তৎপরে কৌরব পাণ্ডব ও ধার্তরাষ্ট্রেরা আচার্য্য দ্রোণকে অভিবাদন করিলে তিনি সন্তুষ্টচিত্তে তাঁহাদিগকে অন্তেবাসী' বলিয়া স্বীকার করিয়া নির্জনে কহিলেন, হে শিষ্যগণ। আমি উত্তমরূপে অস্ত্রশিক্ষা প্রদান করিব, কিন্তু পরিশেষে তোমাদিগকে আমার একটি অভিলষিত সম্পাদন করিতে হইবে, এক্ষণে তাহা অঙ্গীকার কর। তাহা শুনিয়া দুর্য্যোধন প্রভৃতি কুরুনন্দন সকলেই মৌনভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন, কেবল অর্জুন তাঁহার বাক্য স্বীকার করিয়া কহিলেন, আপনি যাহা আদেশ করিবেন, আমি তাহা পালন করিব, সন্দেহ নাই। আচার্য্য দ্রোণ, অর্জুনের অঙ্গীকারবাক্য শ্রবণ করিয়া প্রীতিপ্রফুল্ল-মনে তাঁহাকে আলিঙ্গন ও বারংবার তাঁহার মস্তক আঘ্রাণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তাঁহার নয়নযুগল হইতে অবিরল আনন্দাশ্রু নির্গত হইতে লাগিল।
অনন্তর মহাবীর্য্য আচার্য্য দ্রোণ, পাণ্ডুপুত্রদিগকে দিব্য ও মানুষ বিবিধ অস্ত্রশস্ত্র শিক্ষা দান করিতে লাগিলেন। এই সংবাদ শ্রবণে অন্ধকবংশীয় রাজা ও সূতপুত্র কর্ণ এবং অনেকানেক রাজকুমার অস্ত্রশিক্ষার্থে দেশ দেশান্তর হইতে দ্রোণের নিকট আগমন করিলেন। কর্ণ অর্জুনের সহিত স্পর্দ্ধা করিয়া দুর্য্যোধনের সাহায্যে পাণ্ডবদিগকে নানাপ্রকার অবমাননা করিতে লাগিলেন, কিন্তু সমাগত সমস্ত শিষ্যমণ্ডলীমধ্যে অর্জুন ভুজবলে, উদ্যোগে ও ধনুর্ব্বেদশিক্ষায় দ্রোণের সমকক্ষ হইয়া উঠিলেন। দ্রোণাচার্য্য ইন্দ্রপুত্র অর্জুনকে অস্ত্রবিদ্যায় অনুরাগ, প্রয়োগ, লাঘব' ও কৌশলে সর্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট জানিয়া সবিশেষ উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি রাজকুমারদিগের পরিতোষার্থ শাণিত বাণ ও বিলম্বে জলপূর্ণ হইবে এমত এক এক ক্ষুদ্রমুখ কমণ্ডলু প্রদান করিলেন; কিন্তু অবিলম্বে জলপূর্ণ হইবে এই মানসে নিজ পুত্র অশ্বত্থামাকে বিস্তীর্ণমুখ একটি কলস দিলেন। মহামতি দ্রোণ, রাজপুত্রগণ না আসিতে আসিতে অশ্বত্থামাকে বিশেষ বিশেষ অস্ত্র উপদেশ দিতেন। অর্জুন তাহা বুঝিতে পারিয়া বারুণাস্ত্র দ্বারা কমণ্ডলু পরিপূর্ণ করিয়া গুরুপুত্র অশ্বত্থামার সহিত সমকালে গুরুসন্নিধানে সমাগত হইতেন। সুমহান্ অস্ত্রজ্ঞ পার্থ অশ্বত্থামার সহিত সমকালে আগমন করিতেন বলিয়া তাঁহা অপেক্ষা কোন অংশেই ন্যূন হইলেন না। তিনি ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে গুরুর আরাধনা করিতে তৎপর ছিলেন এবং অস্ত্রশিক্ষায় সবিশেষ মনোনিবেশ করিতেন। এইরূপে অর্জুন ক্রমশঃ দ্রোণের অতিশয় প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিলেন।
অনন্তর আচার্য্য দ্রোণ অস্ত্রশিক্ষা বিষয়ে অর্জুনকে উৎসাহসম্পন্ন দেখিয়া সূপকারিণীকে আহ্বানপূর্ব্বক নির্জনে কহিলেন, হে বিজয়ে! তুমি অর্জুনকে অন্ধকারে অন্ন উপযোগ করিতে দিও না এবং আমি তোমাকে প্রতিষেধ করিলাম, ইহা কদাচ অর্জুনের নিকটে প্রকাশ করিও না! একদা অর্জুন ভোজন করিতেছেন, এই অবসরে প্রবলবেগে বাত্যা উত্থিত হইলে দীপ্যমান দীপশিখা সহসা নির্ব্বাপিত হইল। দীপনির্ব্বাণ হইলে তাঁহার হস্ত অভ্যাসবশতঃ আস্য দেশেই সংলগ্ন হইতে লাগিল। তখন তিনি মনে করিলেন, যাহা অভ্যাস করা যায়, তাহাই বলবৎ হইয়া উঠে। এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া রাত্রিকালে ধনুর্ব্বেদ অনুশীলন করিবার নিমিত্ত শরাসনে জ্যারোপণ করিয়া বারংবার টঙ্কার করিতে লাগিলেন। তাঁহার জ্যানির্ঘোষ শ্রবণে দ্রোণ বিস্মিত হইয়া সহসা তথায় আগমন ও তাঁহাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, বৎস! আমি সত্য কহিতেছি, এই ধরাধামে তোমার তুল্য দ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর যাহাতে প্রখ্যাত না হয়, এইরূপ বিধান করিব, এই দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে হস্তী, অশ্ব ও রথে আরূঢ় এবং ভূতলে অবতীর্ণ হইয়া কিরূপে সংগ্রাম করিতে হয়, তদ্বিষয়ে পুনর্ব্বার সবিশেষ শিক্ষা দান করিতে লাগিলেন এবং গদাযুদ্ধ, অসিচর্য্যা', তোমর, প্রাস ও শক্তি প্রয়োগ এবং সঙ্কীর্ণ যুদ্ধে কৌশলসম্পন্ন করিলেন।
দ্রোণের সংগ্রামনৈপুণ্য শ্রবণ করিয়া শত সহস্র রাজা ও রাজকুমার ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করিবার নিমিত্ত দিগদিগন্ত হইতে তথায় আগমন করিতে লাগিলেন। একদা নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য দ্রোণ-সন্নিধানে সমাগত হইল। কিন্তু সে অস্পৃশ্য ম্লেচ্ছজাতি, সাধারণের সতীর্থ ও সমতুল্য হয়, ইহা নিতান্ত অনভিপ্রেত, এই বিবেচনা করিয়া দ্রোণ তাহাকে ধনুর্ব্বেদে দীক্ষিত করিলেন না। তখন নিষাদরাজতনয় বিষাদমগ্ন হইয়া দ্রোণের পাদ গ্রহণপূর্ব্বক অরণ্যে প্রবেশ করিল এবং তথায় মৃন্ময় এক দ্রোণ নির্মাণ ও তাহাতে আচার্য্যভাব সংস্থাপন করিয়া ব্রত ধারণপূর্ব্বক অস্ত্র শিক্ষা আরম্ভ করিল। এইরূপে সে অচিরকাল-মধ্যে অস্ত্রের প্রয়োগ, সংহার ও সন্ধানবিষয়ে কৃতকার্য্য হইয়া উঠিল।
একদা কৌরব ও পাণ্ডবগণ দ্রোণকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া রথারোহণে রাজধানী হইতে মৃগয়ার্থ নির্গত হইলেন। একজন আপনার কুকুর ও বাগুরা' লইয়া যদৃচ্ছাক্রমে তাঁহাদিগের অনুগমন করিল। কৌরব ও পাণ্ডবগণ অরণ্যে প্রবেশ করিয়া ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছেন, এই অবসরে সেই কুকুর মৃগের অনুসরণক্রমে সহসা নিষাদরাজতনয়ের সন্নিধানে সমুপস্থিত হইল। সেই কুকুর মলিনকলেবর কৃষ্ণাজিন-জটাধারী নিষাদ-রাজকুমার একলব্যকে নিরীক্ষণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। একলব্য আপনার অস্ত্রপ্রয়োগের লঘুতার পরীক্ষার্থ তাহার মুখবিবরে এককালে সাতটি শর নিক্ষেপ করিল। কুকুর আস্যবিবরে শর-পূরিত হইয়া দ্রুতগমনে পাণ্ডব- সন্নিধানে আগমন করিল। পাণ্ডবেরা কুকুরের মুখমধ্যে প্রবিষ্ট সাতটি শর নিরীক্ষণ করিয়া অতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন এবং শরের লঘুত্ব ও শব্দভেদিত্ব দর্শনে সকলেই আপনাদিগকে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট বোধে লজ্জিত হইয়া প্রয়োগকর্তার প্রশংসা করিতে লাগিলেন। পরে পাণ্ডবেরা বনে বনে অনুসন্ধান করিয়া পরিশেষে বনবাসী এক মনুষ্যকে নিরবচ্ছিন্ন শর বর্ষণ করিতে দেখিলেন। পাণ্ডবেরা ঐ বিকৃতদর্শন পুরুষকে তৎকালে চিনিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসিলেন, হে বীরবর। তুমি কে? কাহার পুত্র? একলব্য প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি নিষাদপতি হিরণ্যধনুর পুত্র, দ্রোণের শিষ্য, এই আশ্রমে একাকী ধনুর্ব্বেদ অনুশীলন করিতেছি!
তখন পাণ্ডবেরা তাহার যথার্থ পরিচয় পাইয়া পুনর্ব্বার নিজ রাজধানীতে প্রত্যাগমন করিয়া দ্রোণসন্নিধানে এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত সমুদায় নিবেদন করিলেন। তৎপরে কুস্তীনন্দন অর্জুন বিনীতবচনে নির্জনে দ্রোণকে কহিলেন, গুরো! আপনি অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, তোমা অপেক্ষা আমার অন্য কোন শিষ্যই উৎকৃষ্ট হইবে না, কিন্তু এহেন তাহার অন্যথা দেখা যাইতেছে। নিষাদাধিপতির পুত্র মহাবল একলব্য আপনার এক শিষ্য, সে ধনুর্ব্বেদে আমা অপেক্ষাও সমধিক উৎকর্ষ লাভকরিয়াছে। তখন অর্জুনমুখে এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া দ্রোণ মুহূর্তকাল চিন্তা করিয়া ইহার কারণ কিছুই অনুধাবন করিতে পারিলেন না; পরিশেষে অর্জুন সমভিব্যাহারে অরণ্যপ্রদেশে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, জটাচীরধারী মলিনকলেবর, নিষাদ-রাজকুমার একলব্য শরাসন আকর্ষণ করিয়া বারংবার বাণ বর্ষণ করিতেছে। এই অবসরে দ্রোণ তাহার সম্মুখীন হইলেন। সে সহসা দ্রোণকে সমাগত দেখিয়া তাঁহার প্রত্যুদ্গমন ও পাদ বন্দনপূর্ব্বক আপনাকে তাঁহার শিষ্য বলিয়া পরিচয় দিল এবং বিধানানুসারে তাঁহার পূজা ও উপবেশনার্থ আসন প্রদান করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান রহিল। তখন দ্রোণ কহিলেন, হে বীর! যদি তুমি যথার্থই আমার শিষ্য হইয়া থাক, তবে এক্ষণে গুরুদক্ষিণা প্রদান কর। তাহা শুনিয়া একলব্য প্রীতবাক্যে কহিল, ভগবন্! গুরুকে অদেয় কিছুই নাই, এক্ষণে কিরূপে দক্ষিণা আহরণ করিব, আজ্ঞা করুন। তখন দ্রোণ কহিলেন, হে বীর!
যদি সম্মত হইয়া থাক, তবে দক্ষিণ হস্তের একটি অঙ্গুলি ছেদন করিয়া দক্ষিণাস্বরূপ আমাকে সম্প্রদান কর। সত্যবাক্ একলব্য দ্রোণের এইরূপ নিদারুণ বাক্য শ্রবণ করিয়া আপনার প্রতিজ্ঞা প্রতিপালনার্থে প্রফুল্লমনে ও হৃষ্টবদনে দক্ষিণ হস্তের একটি অঙ্গুলি ছেদন করিয়া তৎক্ষশাৎ গুরুদক্ষিণা প্রদান করিল; তৎপরে অপর অঙ্গুলিদ্বারা শরক্ষেপ করিয়া দেখিল, পূর্ব্বাপেক্ষা শরের লঘুতা হ্রাস হইয়াছে।
অর্জুন এইরূপ অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া অতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তখন তাঁহার অপকর্ষবিষয়ক আশঙ্কা তিরোহিত হইল। এই ধরাধামে অর্জুনকে কেহই পরাভব করিতে পারিবে না, দ্রোণাচার্য্যের এই অঙ্গীকার-বাক্যও রক্ষা হইল। ক্রোধপরায়ণ দুর্য্যোধন ও ভীম উভয়ে দ্রোণের নিকটে গদাযুদ্ধ অভ্যাস করিতেন। অশ্বত্থামা সর্ব্বরহস্যে পারদর্শী হইয়া অপেক্ষাকৃত উৎকর্ষ লাভ করিয়াছেন। নকুল ও সহদেব ইঁহারা অসিচর্য্যায় কুশলী হইলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এক উৎকৃষ্ট রথী হইলেন। অর্জুন বুদ্ধিযোগ, বল ও উৎসাহে এই সসাগরা পৃথিবীমধ্যে প্রখ্যাত হইলেন; অর্জুনই আচার্য্য দ্রোণের প্রতি অসাধারণ অনুরাগ প্রদর্শন করিতেন এবং অর্জুনই সমাগত রাজকুমারদিগের মধ্যে অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর হইয়া উঠিলেন। দুরাত্মা ধার্তরাষ্ট্রেরা বলাধিক ভীমসেন ও কৃতবিদ্য অর্জুনকে দেখিয়া নিতান্ত ঈর্ষাপরবশ হইল।
একদা দ্রোণাচার্য্য শিষ্যগণের অস্ত্রশিক্ষার পরীক্ষার্থ কুমারগণের অসমক্ষে শিল্পীদ্বারা একটি কৃত্রিম নীলপক্ষ পক্ষী নির্মাণ করাইয়া বৃক্ষের অগ্রশাখায় আরোপিত করিলেন। পরে সমবেত রাজকুমারদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে রাজপুত্রগণ। সকলে শীঘ্র শরাসনে শর সন্ধান করিয়া আমার আদেশবাক্য অপেক্ষা করিয়া থাক, আমি তোমাদিগকে একে একে নিয়োগ করিতেছি, মদীয় বাক্য অবসান না হইতে হইতেই ঐ লক্ষ্যের শিরশ্ছেদন করিয়া ভূতলে পাতিত কর, এই বলিয়া দ্রোণ প্রথমতঃ ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে আদেশ করিলেন, হে দুর্দ্ধর্ষ! তুমি শর সন্ধান করিয়া আমার বাক্যের সমকালে বাণ ত্যাগ কর। তখন যুধিষ্ঠির দ্রোণের নির্দেশানুসারে ধনুগ্রহণপূর্ব্বক লক্ষ্যকে উদ্দেশ করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। তৎপরে আচার্য্য দ্রোণ কুরুনন্দন যুধিষ্ঠিরকে মুহূর্তকালমধ্যে কহিলেন, তুমি বৃক্ষের শিখরদেশে ঐ শকুন্তকে নিরীক্ষণ কর। যুধিষ্ঠির প্রত্যুত্তর করিলেন, হাঁ, আমি দেখিতেছি। দ্রোণ পুনর্ব্বার কহিলেন, হে ধৰ্ম্মনন্দন! তুমি এই বৃক্ষকে, আমাকে বা আপন ভ্রাতৃগণকে দেখিতেছ? যুধিষ্ঠির উত্তর করিলেন, ভগবন্! আমি এই বৃক্ষকে, আপনাকে, ভ্রাতৃগণকে ও বৃক্ষস্থিত পক্ষীকে বারংবার নিরীক্ষণ করিতেছি; তখন দ্রোণ অপ্রসন্নমনে যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, তুমি এই লক্ষ্য বিদ্ধ করিতে পারিবে না, এস্থান হইতে অপসৃত হও। এইরূপে যুধিষ্ঠিরকে তিরস্কার করিয়া দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্রনন্দন দুর্য্যোধন প্রভৃতি সকলকেই পর্যায়ক্রমে পূর্ব্বোক্ত প্রকারে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহার মনোগত উত্তর প্রদান করিতে পারিলেন না বলিয়া সকলেই তিরস্কৃত হইলেন।
ত্রয়স্ত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর দ্রোণ হাস্যমুখে অর্জুনকে কহিলেন, বৎস! এইবারে তোমাকেই এই লক্ষ্য বিদ্ধ করিতে হইবে, অতএব ধনুকে গুণ রোপণপূর্ব্বক মুহূর্তকাল অপেক্ষা কর। আমার বাক্যাবসান না হইতে হইতেই তুমি এই লক্ষ্যে অস্ত্রক্ষেপ কর। অর্জুন গুরুবাক্যানুসারে শরাসনে শর-সন্ধানপূর্ব্বক অগ্রশাখাস্থ পক্ষীকে লক্ষ্য করিয়া রহিলেন। তখন দ্রোণ মুহূর্তকালমধ্যে পূর্ব্বোক্ত প্রকারে অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস! বৃক্ষকে, বৃক্ষস্থ পক্ষীকে, আমাকে বা ভ্রাতৃগণকে নিরীক্ষণ করিতেছ? তাহা শুনিয়া অর্জুন প্রত্যুত্তর করিলেন, ভগবন্! আমি বৃক্ষ বা আপনাকে নিরীক্ষণ করিতেছি না, কেবল শকুন্তকে অবলোকন করিতেছি। অনন্তর দ্রোণ প্রীতমনে পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসিলেন, বৎস! শকুন্তকে সম্যরূপে নিরীক্ষণ করিতেছ? অর্জুন প্রত্যুত্তর করিলেন, না, আমি শকুন্তের অবশিষ্ট কলেবর কিছুই অবলোকন করিতেছি না, কেবল উহার মস্তকটি দেখিতেছি। তখন দ্রোণাচার্য্য অর্জুনের এইরূপ বাক্-চাতুরী দর্শনে সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, বৎস। তবে লক্ষ্যভেদ কর, এই কথা বলিবামাত্র অর্জুন কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া লক্ষ্যে অস্ত্রক্ষেপ করিলেন এবং বৃক্ষশিখরস্থিত পক্ষী অর্জুনের খরধার অস্ত্রদ্বারা ছিন্নমস্তক হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। তাদৃশ অসাধারণ কর্ম সমাধানান্তে দ্রোণ অর্জুনকে আলিঙ্গন করিয়া "দ্রুপদ রাজাকে সংগ্রামে পরাজিত করিয়াছি” বলিয়া মানিলেন।
কিয়ৎকাল অতীত হইলে একদা শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে দ্রোণ স্নানার্থ ভাগীরথীর উপকূলে গমন করিলেন। তথায় সমুপস্থিত হইয়া অবগাহনপূর্ব্বক স্নান করিতেছেন, এই অবসরে এক ভয়ঙ্কর কুম্ভীর কালপ্রেরিত হইয়া দ্রোণের জঙ্ঘাদেশ গ্রহণ করিল। তিনি স্ববীর্য্যপ্রভাবে কুম্ভীর হস্ত হইতে জঙ্ঘা মোচন করিয়া আত্মরক্ষা করিতে পারিতেন, কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া পরীক্ষার্থে শিষ্যদিগকে সসম্ভ্রমে আদেশ করিলেন, হে শিষ্যগণ! তোমরা কুম্ভীর বিনাশ করিয়া আমাকে পরিত্রাণ কর; তাঁহার আদেশ প্রাপ্তিমাত্রেই অর্জুন দুর্নিবার ও খরধার পাঁচটি শরদ্বারা জলমগ্ন কুম্ভীরকে প্রহার করিলেন এবং অন্যান্য সমস্ত রাজকুমার ইতিকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া যথাস্থানে চিত্রার্পিতের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে কৃতকার্য্য দেখিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন এবং শিষ্যমণ্ডলীমধ্যে তাঁহাকেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট বিবেচনা করিলেন।
কুম্ভীর, অর্জুনের শরপ্রহারে খণ্ডকলেবর হইয়া দ্রোণের জঙ্ঘা পরিত্যাগপূর্ব্বক পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। অনন্তর ভারদ্বাজ দ্রোণ, মহারথ অর্জুনকে কহিলেন, হে মহাবাহো! আমি প্রয়োগ ও সংহার সহিত ব্রহ্মশিরাঃ নামে এই অনিবার্য্য অস্ত্র প্রদান করিতেছি, তুমি গ্রহণ কর, কিন্তু বৎস! মনুষ্যের প্রতি ইহা কদাচ প্রয়োগ করিও না, কারণ অল্পতেজস্ক মনুষ্যে নিক্ষিপ্ত হইলে ইহা নিশ্চয়ই এই চরাচর বিশ্বকে ভস্মসাৎ করিবে; এই অস্ত্র সামান্য অস্ত্র নহে, অতএব সাবধানে এই অস্ত্রধারণ কর। দেখিও আমি যাহা কহিলাম, যেন তাহার অন্যথা না হয়। হে বীর! যদি কোন অমানুষ শত্রু সংগ্রামে সহসা তোমাকে আক্রমণ করে, তাহার সংহারার্থ তৎকালে তুমি এই ব্রহ্মশিরাঃ অস্ত্র প্রয়োগ করিবে। অর্জুন "তাহাই হইবে” বলিয়া তাঁহার বাক্য স্বীকার করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে দিব্যাস্ত্র গ্রহণ করিলেন। তখন আচার্য্য দ্রোণ পুনর্ব্বার কহিলেন, বৎস! এই জীবলোকে তোমার তুল্য ধনুর্দ্ধর আর কেহই জন্মিবে না।
চতুস্ত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে ধৃতরাষ্ট্রা-ত্মজগণ ও পাণ্ডবেরা অস্ত্রশিক্ষা করিলে একদা দ্রোণ, কূপ, সোমদত্ত, বাহ্লীক, ভীষ্ম, ব্যাস ও বিদুরের সন্নিধানে ধৃতরাষ্ট্রকে কহিলেন, মহারাজ! কুমারেরা সকলেই ধনুর্ব্বেদে কৃতবিদ্য হইয়াছেন, অনুমতি হইলে আপন আপন অস্ত্রশিক্ষার পরিচয় দেয়। ধৃতরাষ্ট্র দ্রোণবাক্যে পরম পরিতুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ ভারদ্বাজ। আপনি আমাদিগের এক মহৎ কৰ্ম্ম সাধন করিলেন। মহাশয়। এ সময় অস্ত্রশিক্ষাদর্শনবিদায়িনী রঙ্গভূমি যে স্থানে যে প্রকারে নির্মাণ করা আবশ্যক বোধ করেন, তাহা আজ্ঞা করুন; কদাচ আপনার আদেশের অন্যথা হইবে না। আজ আমার অন্ধতা-নিবন্ধন নির্ব্বেদের' উদয় হইল। আমি অন্ধ, যাহা হউক, কুমারেরা যে সকল চক্ষুষ্মান্ ব্যক্তিদিগের সমক্ষে আপন আপন অস্ত্রশিক্ষার সবিশেষ পরিচয় প্রদান করিবে, আমি তাঁহাদের সান্নিধ্যলাভের একান্ত অভিলাষ করি, এই বলিয়া মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সম্মুখোপবিষ্ট বিদুরকে কহিলেন, হে ধৰ্ম্মবৎসল! আচার্য্য দ্রোণ আমাদিগের মহোপকার সাধন করিয়াছেন। এক্ষণে যাহা আদেশ করেন, তুমি সত্বর হইয়া অবিলম্বে তাহা সম্পাদন কর। বিদুর রাজাজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া কর্তব্যানুষ্ঠানে প্রস্থান করিলেন। এদিকে প্রাজ্ঞবর দ্রোণাচার্য্য সমতল ভূতলে রঙ্গভূমির সীমা পরিমাণ করিলেন; ঐ স্থান তরুগুল্মবিহীন, সুপরিচ্ছন্ন এবং স্থানে স্থানে প্রস্রবণ ও জলাশয়ে অতীব রমণীয় হইয়াছিল। আচার্য্য দ্রোণ শুভনক্ষত্রযোগসম্পন্ন তিথিবিশেষে বীরসমাজে ডিণ্ডিম' প্রচার করত ঐ স্থলে পূজোপহার প্রদান করিলেন। রাজশিল্পীরা সেই রঙ্গভূমির মধ্যে শাস্ত্রানুসারে অস্ত্রশস্ত্র পরিপূর্ণ অতিবিস্তীর্ণ এক এক দর্শনাগার এবং স্ত্রীলোকদিগের অবলোকনার্থ সুরম্য গৃহসকল নির্মাণ করিল। পুরবাসীরা তথায় অত্যুন্নত মঞ্চ ও মহামূল্য শিবিকা সকল প্রস্তুত ও সুসজ্জিত করিতে লাগিল।
অনন্তর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র নির্দিষ্ট দিন উপস্থিত হইলে মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে কৃপাচার্য্য ও ভীষ্মকে সম্মুখীন করিয়া মুক্তাজালে অলঙ্কৃত বৈদূর্য্যমণিশোভিত সুবর্ণময় রমণীয় দর্শনাগারে গমন করিলেন। মহাভাগা গান্ধারী, কুন্তী ও অন্যান্য রাজমহিষীরা সুপরিচ্ছন্ন পরিধান করিয়া দাসীগণসমভিব্যাহারে হর্ষোৎফুল্ল লোচনে তথায় গমন করিলেন; ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় প্রভৃতি চাতুর্ব্বণ্য লোক রাজকুমারদিগের অস্ত্রশিক্ষাদর্শনার্থী হইয়া রাজধানী হইতে দ্রুতগমনে তথায় আগমন করিতে লাগিলেন। ক্ষণকালমধ্যে রঙ্গভূমিতে প্রবেশার্থী বহুতর দর্শকবর্গের সমাগম হইল; তৎপরে বাদ্যকরেরা মৃদুমধুর রবে বাদ্য করিয়া দর্শক-মণ্ডলীর কৌতূহল উৎপাদন করিতে লাগিল। অভ্যাগত লোকের কোলাহলে সেই সমাজমন্দির' উচ্ছলিত মহাসমুদ্রের ন্যায় বারংবার প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। এই অবসরে শুক্লাম্বরধারী শুক্লকেশ শুক্লযজ্ঞো-পবীতসম্পন্ন শুক্লশ্মশ্রু শুক্ল চন্দনানুলিপ্ত-কলেবর মহানুভব দ্রোণাচার্য্য গলদেশে শুক্লমাল্য ধারণ করিয়া স্বপুত্র অশ্বত্থামার সহিত জল-ধরোপরোধশূন্য গগনে সভৌম শশধরের ন্যায় রঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং যথানিদ্দিষ্ট সময়ে বলি প্রদানপূর্ব্বক বিজ্ঞ ও মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকর্তৃক মাঙ্গলিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করাইলেন। পুণ্য কৰ্ম্ম সমাধানান্তে অনুচরেরা অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করিয়া রঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিল।
অনন্তর মহাবীর্য্য মহারথ রাজপুত্রগণ অঙ্গুলিতে অঙ্গুলিত্র বন্ধনপূর্ব্বক বদ্ধতৃণ ও বদ্ধপরিকর' হইয়া সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে অগ্রে করত হস্তে ধনুর্বাণ লইয়া জ্যেষ্ঠকনিষ্ঠক্রমে রঙ্গস্থলে প্রবেশ করিলেন। পরে অত্যাশ্চর্য্য অস্ত্রশস্ত্রসমুদায় নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। কেহ শরপতনভয়ে মস্তক অবনত করিতে লাগিল, কেহ বা অদ্ভুতবীর্য্য অর্জুনকে দেখিয়া অতিশয় বিস্মিত হইল। রাজকুমারেরা বেগবান্ তুরঙ্গযানে আরোহণ করিয়া স্বনামাঙ্কিত বাণদ্বারা লক্ষ্য ভেদ করিলেন। তখন দর্শকমণ্ডলী শরকার্মুকধারী অদ্ভুতরূপ কুমারসেনা সন্দর্শন করিয়া বিস্ময়োৎফুল্ললোচনে শত সহস্র সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। মহাবল কুমারবল তৎকাল কাৰ্ম্মকদ্বারা অস্থির-লক্ষ্যপাত প্রভৃতি অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার সকল সমাধানপূর্ব্বক রথে আরোহণ করিয়া রঙ্গমধ্যে বারংবার মণ্ডলাকারে ভ্রমণ ও প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন; খড়া, চৰ্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক কখন গজে, কখন বা অশ্বে অধিরূঢ় হইয়া বাহুযুদ্ধে সমাধানান্তে পরস্পর প্রহার করিতে লাগিলেন। তাঁহারা একমাত্র খড়্গদ্বারা কৌশলক্রমে অনেকাস্ত্র নিবারণ করিলেন। নিরবচ্ছিন্ন ভ্রাম্যমাণ খড়োর অংশুমণ্ডল ইতস্ততঃ বিস্তীর্ণ হইয়া এক অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিল। এইরূপ অসিচর্য্যায় বীরপুরুষদিগের নির্ভীকতা প্রকাশ পাইল। তাঁহাদিগের হস্ত খড়ামুষ্টি হইতে একবারও স্খলিত হইল না; তাঁহারা অসিপ্রয়োগে বিলক্ষণ কুশলী ছিলেন; এই সমস্ত দেখিয়া রঙ্গস্থ লোকসমুদায় বিস্ময় প্রকাশ করিতে লাগিল। অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত দুর্য্যোধন ও ভীম উভয়ে বদ্ধপরিকর হইয়া গদাহস্তে একশৃঙ্গ অত্যুত্তুঙ্গ' শৈলের ন্যায় রণস্থলে অবতীর্ণ হইলেন। মদমত্ত কুঞ্জর যেমন করিণীর নিমিত্ত চীৎকার করিতে থাকে এবং নভোমণ্ডলে জলধর যেমন গভীর গর্জন করে, সেই উভয় বীরপুরুষ পৌরুষ প্রকাশার্থ রঙ্গমধ্যে তাদৃশ সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তৎপরে তাঁহারা গদাহস্তে বামভাগ অবলম্বন করিয়া মণ্ডলাকারে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
বিদুরও কুস্তী, ধৃতরাষ্ট্র ও রাজমহিষী গান্ধারীর সন্নিধানে রাজ-কুমারদিগের এই সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন।
পঞ্চত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! দুর্য্যোধন ও ভীমসেন উভয়ে রণস্থলে প্রবেশ করিলে উভয় পক্ষীয় দর্শকমণ্ডলী দুইভাগে বিভক্ত হইয়া দণ্ডায়মান হইল। তৎপরে দর্শকেরা "হা বীর কুরুরাজ। হা ভীম”। এই বলিয়া মহান্ কোলাহল করিতে লাগিল। ধীমান্ দ্রোণ সেই রঙ্গস্থল তরঙ্গসঙ্কুল সাগরের ন্যায় অবলোকন করিয়া প্রিয়পুত্র অশ্বত্থামাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! মহাবীর্য্য ও সুশিক্ষিত বীরদ্বয়কে গদাযুদ্ধ হইতে নিবারণ কর; দেখিও যেন ভীম ও দুর্য্যোধনের ক্রোধ উদ্রেক না হয়। অশ্বত্থামা পিতার অনুমতি পাইবামাত্র মহাবেগে ও যুগান্তানিলসংক্ষুব্ধ অন্তোনিধির ন্যায় গদাযুদ্ধোদ্যত বীরদ্বয়কে তৎক্ষণাৎ নিরস্ত করিলেন। তৎপরে দ্রোণাচার্য্য রঙ্গপ্রাঙ্গণে দণ্ডায়মান হইয়া মহামেঘনির্ঘোষসদৃশ বাদ্যধ্বনি নিবারণপূর্ব্বক কহিলেন, মদীয় শিষ্য অর্জুন আমার পুত্র হইতেও প্রিয়তর, সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ও উপেন্দ্রতুল্য মহাবীর; হে দর্শকগণ! তোমরা ইঁহাকে দর্শন কর। তখন অর্জুন আচার্য্যের আদেশক্রমে গোধালতা'র অঙ্গুলিত্রাণ ও কাঞ্চনময় কবচ ধারণপূর্ব্বক ধনুর্ব্বাণ হস্তে করিয়া সূর্য্যসন্নিহিত ইন্দ্রায়ুধালঙ্কৃত সন্ধ্যাকালীন মেঘের ন্যায় রঙ্গমধ্যে পরিদৃশ্যমান হইলেন, তদ্দর্শনে রঙ্গস্থ লোকের চিত্ত প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। এই অবসরে চতুৰ্দ্দিকে শঙ্খধ্বনি ও বাদ্যোদ্যম হইতে লাগিল। অনন্তর "ইনি শ্রীমান্ কুন্তীনন্দন” “ইনি পাণ্ডবদিগের তৃতীয়" "ইনিই দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র” “ইনিই কৌরবগণের রক্ষক" "ইনি অস্ত্রবেত্তাদিগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ” "ইনি পরম ধার্মিক" "ইনি অতিশয় সুশীল” দর্শকগণকৃত এইরূপ প্রশংসাবাদ রঙ্গমধ্যে সর্ব্বত্রই শ্রুত হইতে লাগিল। পুত্রের প্রশংসা শুনিয়া অশ্রু ও স্তন্যদ্বারা পুত্রবৎসলা কুস্তীর উরঃস্থল' সিক্ত হইতে লাগিল।
রঙ্গভূমির সেই সকল শব্দ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের শ্রবণ-গোচর হইলে, তিনি হৃষ্টমনে বিদুরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে বিদুর। উচ্ছলিত মহাসাগরের ন্যায় এই তুমুল কোলাহল কি নিমিত্ত সহসা রঙ্গভূমি হইতে উত্থিত হইয়া নভোমণ্ডল বিদীর্ণ করিতেছে? বিদুর কহিলেন, মহারাজ। পাণ্ডুনন্দন অর্জুন সাংগ্রামিকবেশে রঙ্গস্থলে অবর্তীর্ণ হইলে লোকে তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতেছে, এই কারণে এতাদৃশ কোলাহল উত্থিত হইল। তখন ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে বিদুর! আমি কুন্তীগর্ভসম্ভূত পাণ্ডব-ত্রয়দ্বারা ধন্য, অনুগৃহীত ও রক্ষিত হইলাম।
-
-
অনন্তর সেই কোলাহল নিবৃত্ত ও রঙ্গস্থ লোকসকল সন্তুষ্ট হইলে মহাবীর অর্জুন, আচার্য্য দ্রোণ-সন্নিধানে আপনার অস্ত্রকৌশল প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। প্রথমতঃ আগ্নেয়াস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক অগ্নি সৃষ্টি করিয়া বারুণাস্ত্র প্রয়োগপূর্ব্বক জল - সৃষ্টি করিলেন। তৎপরে বায়ব্যাস্ত্র দ্বারা বাত্যা উত্থাপিত করিয়া পার্জ্জন্যাস্ত্র দ্বারা নভোমণ্ডলে মেঘ সৃষ্টি করিলেন। ভৌমাস্ত্র দ্বারা - ভূগর্ভে প্রবেশ করিয়া পার্ব্বতাস্ত্র দ্বারা পর্ব্বত সৃষ্টি করিলেন। অন্তর্দ্ধানাস্ত্র দ্বারা অন্তর্হিত হইলেন। তৎপরে শিক্ষাকৌশলে কখন দীর্ঘ, কখন হ্রস্ব, কখন রথসম্মুখে, কখন রথমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং অবিলম্বেই ভূতলে অবতীর্ণ হইলেন। অনন্তর গুরুপ্রিয় অর্জুন বিবিধ বাণদ্বারা সুকুমার, স্থূল ও সূক্ষ্ম লক্ষ্য সকল অনায়াসে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তিনি ভ্রমণশীল লৌহময় বরাহের মুখে এককালে অসঙ্কীর্ণরূপে পঞ্চ শর এক শরের ন্যায় নিক্ষেপ করিলেন। তৎপরে কেশময় রজ্জুদ্বারা লম্বিত গোবিষানকোষে" একবিংশতি বাণ বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে অসিচর্য্যা ধনু ও গদাশিক্ষায় আপনার বিবিধ কৌশল প্রকাশ করিতে লাগিলেন।
এই অদ্ভুত ব্যাপার সমাধানান্তে অধিকাংশ লোকসমাজ হইতে নির্গত ও বাদ্যকোলাহল নিস্তব্ধপ্রায় হইল। এই অবসরে বজ্রনির্ঘোষসদৃশ বাহ্বাস্ফোটন দ্বারদেশ হইতে উত্থিত ও শ্রুত হইতে লাগিল। ঐ শব্দ কর্ণগোচর করিয়া রঙ্গস্থ লোকেরা "ইহা কি বিদীর্ণ পর্ব্বতের? না দলিত ভূতলের? বা মেঘাচ্ছন্ন নভো-মণ্ডলের ঘোর রব শ্রুত হইতেছে," এইরূপ অনুমান করিয়া সত্বর সকলেই দ্বারদেশাভিমুখে গমন করিল। দুর্য্যোধন গদামাত্র-সহায় ও ভ্রাতৃশত দ্বারা পরিবৃত হইয়া, পূর্ব্বকালে অসুরসংগ্রামে /দেবগণকর্তৃক পরিবেষ্টিত দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় শোভমান হইলেন। সেই সময়ে পঞ্চতারাগ্রথিত হস্ত'সংযুক্ত চন্দ্রের ন্যায় পঞ্চপাণ্ডবপরিবৃত দ্রোণাচার্য্য দীপ্তি পাইতেছিলেন। তিনি অশ্বত্থামা ও ভ্রাতৃশত সমভিব্যাহারে উত্থিত দুর্য্যোধনকে নিবারণ করিলেন।
ষত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। তৎপরে লোকে অবকাশ প্রদান করিলে মহাবল পরাক্রান্ত অঙ্গরাজ কর্ণ বিস্ময়োৎফুল্ল-লোচনে বিস্তীর্ণ রঙ্গস্থলে প্রবেশ করিলেন। তদীয় মুখমণ্ডল কুণ্ডলদ্বয়ে অলঙ্কৃত। তিনি সহজাত কবচ ধারণ ও কটিদেশে খড়া বন্ধন করিয়া পাদচারী পর্ব্বতের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তিনি সূর্য্যের ঔরসে কুমারী কুন্তীর গর্তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার যশের পরিসীমা ছিল না। দীপ্তি, কান্তি ও দ্যুতি দ্বারা তিনি চন্দ্র, সূর্য্য ও অনলের তুল্য ছিলেন। তিনি মৃগরাজ সিংহ ও হস্তিসমূহের বল একাকী ধারণ করিতেন। তিনি উন্নতকায় ও সর্বাঙ্গসুন্দর ছিলেন। সেই মহাবল কর্ণ রঙ্গস্থলে ইতস্ততঃ অবলোকন করিয়া অনতিভক্তি সহকারে দ্রোণ ও কৃপাচার্য্যকে প্রণাম করিলেন। রঙ্গস্থ লোকেরা তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া নিশ্চল ও স্থিরলোচন হইল এবং "ইনি কে” ইহা সবিশেষ জানিবার নিমিত্ত একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইল। তখন সূর্যতনয় কর্ণ অজ্ঞাত ভ্রাতা অর্জুনকে জলধর-গভীরস্বরে কহিলেন, হে পার্থ! তুমি যেরূপ কৰ্ম্ম করিয়াছ, সর্ব্বসমক্ষে আমি বিশেষরূপে সেই কার্য্য সম্পাদন করিব, তুমি বিস্মিত হইও না।
তাঁহার বাক্যাবসান না হইতেই চতুৰ্দ্দিক্ হইতে দর্শকেরা যন্ত্রোৎক্ষিপ্তের ন্যায় সত্বর উত্থিত হইল। কর্ণের তাদৃশ উৎসাহ বাক্যে দুর্য্যোধনের প্রীতি ও অর্জুনের লজ্জা ও ক্রোধের উদ্রেক হইল। তৎপরে দ্রোণের নির্দেশানুসারে সংগ্রামপ্রিয় কর্ণ, অর্জুন যেরূপ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনিও তদনুরূপ কার্য্য করিলেন। তখন দুর্য্যোধন ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে মহাবীর কর্ণকে আলিঙ্গন করিয়া প্রফুল্লমনে সাদরবচনে কহিলেন, হে মহাবাহো। আমা-দিগের সৌভাগ্যক্রমে তুমি এস্থলে উপস্থিত হইয়াছ। এক্ষণে স্বেচ্ছানুসারে কুরুরাজ্য উপভোগ কর। তদীয় এতাদৃশ বাক্য শ্রবণগোচর করিয়া কর্ণ কহিলেন, প্রভো। বোধ হয়, আমি আমার কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম সমুদায়ই সমাধা করিয়াছি, এক্ষণে তোমার সহিত বন্ধুতা করিতে এবং অর্জুনের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধ করিতে বাসনা করি। তখন দুর্য্যোধন কহিলেন, ভাল, এক্ষণে আমার সহিত বন্ধুতা করিয়া বিষয়ভোগ বাসনা চরিতার্থ কর, পরে বিপক্ষ পক্ষের মস্তকে পদার্পণ করিয়া পরমসুখে কালাতিপাত করিও। দুর্য্যোধনের এইরূপ উদ্ধত বাক্যে উত্তেজিত ও ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া অর্জুন ভ্রাতৃমধ্যে উন্নত ভূধরের ন্যায় অবস্থিত কর্ণকে কহিলেন, রে কর্ণ! যাহারা অনাহৃত হইয়া উপদেশ প্রদান করে ও যাহারা অনাহৃত হইয়া কথা কহে, তাহারা যে লোকে গমন করে, অদ্য তোর প্রাণ সংহার করিয়া তথায় প্রেরণ করিব। তখন কর্ণ প্রত্যুত্তর করিলেন, হে অর্জুন! দেখ এই রঙ্গভূমি সাধারণের অধিকৃত; সুতরাং ইহার মধ্যে তোমার বিশেষ কোন প্রভুতা নাই। অভ্যাগত ভূপালগণ সকলেই পরাক্রান্ত এবং ধৰ্ম্ম ও পরাক্রমের অনুসরণ করিয়া থাকেন। অধিক কি বলিব, যাবৎ গুরুজনসমক্ষে শরদ্বারা তোমার শিরশ্ছেদন না করিতেছি, তাবৎ আর বিফল শরক্ষেপের আবশ্যকতা নাই।
অনন্তর অর্জুন আচার্য্য দ্রোণকর্তৃক আদিষ্ট ও ভ্রাতৃগণ-কর্তৃক আশ্লিষ্ট হইয়া সংগ্রামার্থ কর্ণের সম্মুখে গমন করিলেন। সমরপ্রিয় কর্ণ, দুর্য্যোধন ও তদীয় ভ্রাতৃগণকর্তৃক আলিঙ্গিত হইয়া ধনুর্ব্বাণ ধারণপূর্ব্বক সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হইলেন। তদনন্তর ইন্দ্রায়ুধালঙ্কৃত, সৌদামিনী-পরিবেষ্টিত, বলাকাশোভিনী মেঘমালা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া ঘোররবে গর্জন করিতে লাগিল। তাহার পর ভগবান্ ভাস্কর পুত্রবৎসল দেবরাজকে রঙ্গস্থলে অবলোকন করিতে দেখিয়া সন্নিহিত মেঘমণ্ডলী অপসারিত করিলেন। অর্জুন মেঘের সুশীতল ছায়ায় আচ্ছন্ন এবং কর্ণ আতপতাপে সন্তপ্ত হইতে লাগিলেন। যে দিকে কর্ণ, সেই দিকে ধার্তরাষ্ট্রেরা, যে দিকে অর্জুন তথায় দ্রোণ, কূপ ও ভীষ্ম প্রভৃতি অবস্থান করিতে লাগিলেন। এইরূপে রঙ্গস্থ সমস্ত লোক ও মহিলাগণ দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া এক এক পক্ষে পক্ষপাত করিতে লাগিল। এই সংবাদ শ্রবণ করিয়া ভোজরাজদুহিতা কুত্তী বিমুগ্ধা হইলেন। সর্ব্বধর্মবেত্তা বিদুর তাঁহাকে মূর্ছিতা দেখিয়া পরিচারিকাদিগকে সুশীতল জলসেচনদ্বারা পরিচর্যা করিতে আদেশ দিয়া কুন্তীকে আশ্বস্ত করিলেন। কুন্তী সংজ্ঞা লাভ করিয়া পুত্রদ্বয়কে দর্শন করত ইতিকর্তব্যতাবিমূঢ় ও অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত হইলেন। তখন দ্বন্দ্বযুদ্ধকুশলী কূপ উভয়কে ধনুর্দ্ধারণ করিতে দেখিয়া কর্ণকে কহিলেন, কুন্তীগৰ্ত্ত সম্ভূত মহারাজ পাণ্ডুর তৃতীয় পুত্র অর্জুন তোমার সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধ' করিবেন। হে মহাবাহো। এক্ষণে তুমি আপনার মাতা ও পিতার নামোল্লেখ কর এবং কোন্ কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছ ও কোন্ রাজবংশ অলঙ্কৃত করিয়াছ, তাহাও সবিশেষ বল। তোমার পরিচয় প্রাপ্ত হইলে অর্জুন প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে পারেন, নচেৎ তোমার সহিত যুদ্ধ করিবেন না, কারণ রাজকুমারেরা অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়েন না।
এইরূপ অভিহিত হইলে কর্ণ লজ্জায় অধোমুখ হইয়া রহিলেন। তৎকালে তাঁহার মুখমণ্ডল বর্ষানীর-পরিক্ষিত সুকোমল পদ্মের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। তাহা দেখিয়া দুর্য্যোধন দ্রোণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে আচার্য্য! শাস্ত্রে কথিত আছে, যিনি সৎকুলে সমুদ্ভূত, বীর ও সৈন্যচালনসমর্থ তাঁহার সহিত যুদ্ধ করা যায়। তথাচ যদি অর্জুন রাজা ব্যতিরেকে অন্যের সহিত যুদ্ধ না করেন, তবে আমি এই মুহূর্তেই কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করিতেছি।
অনন্তর দুর্য্যোধন মহারথ কর্ণকে কাঞ্চনময় পীঠোপরি সংস্থাপনপূর্ব্বক মন্ত্রবিদ ব্রাহ্মণগণকে আহ্বান করিয়া লাজ, কুসুম ও সুবর্ণ দ্বারা অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। মহাবল কর্ণ অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত হইলে তাঁহার মস্তকোপরি ছত্র ধারণ করিল, উভয় পার্শ্বে চামরব্যজন এবং বন্দিগণ জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। তখন অঙ্গরাজ কর্ণ সাদরসম্ভাষণপূর্ব্বক দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে মহারাজ। তোমাকে রাজ্যদানের সমুচিত কি প্রতিদান করিব? বল, এক্ষণে আমার প্রত্যুপকার করিবার ক্ষমতা আছে। দুর্য্যোধন কর্ণের এইরূপ মধুর বাক্য কর্ণগোচর করিয়া কহিলেন, হে কর্ণ! এক্ষণে তোমার সহিত সখ্য সংস্থাপন করিবার বাসনা করি। কর্ণ "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্য স্বীকার করিলেন এবং হর্ষোৎফুল্ললোচনে পরস্পর আলিঙ্গন করিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন।
সপ্তত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর কর্ণের জনক অধিরথসূত ঘর্মাক্তকলেবর ও স্খলিতোত্তরচ্ছদ' হইয়া কম্পিত কলেবরে সহসা রঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিলেন। মহাবীর কর্ণ পিতাকে নিরীক্ষণ করিয়া শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক তদীয় গৌরব রক্ষার্থে অভিষেকার্দ্র মস্তকদ্বারা তাঁহাকে প্রণাম করিলেন। পুত্রবৎসল সারথি সসম্ভ্রমে বস্ত্রদ্বারা চরণদ্বয় আচ্ছাদন করিয়া কর্ণকে পুত্র বলিয়া সম্বোধন ও আলিঙ্গন করিলেন এবং অভিষেক-জল-ক্ষালিত তদীয় মস্তক পুনর্ব্বার আনন্দাশ্রুদ্বারা অভিষিক্ত করিলেন। তাহা অবলোকন করিয়া ভীমসেন কর্ণকে সূতপুত্র বিবেচনা করিয়া হাস্যমুখে কহিতে লাগিলেন, রে সূতনন্দন! রণে অর্জুনহস্তে প্রাণ বিসর্জন করা তোর পক্ষে কোন রূপে শ্রেয়স্কর নহে। বরং শীঘ্রই কুলোচিত বল্লা গ্রহণ কর্। রে নরাধম! হুতাশন-সন্নিহিত যজ্ঞীয় হবিঃ যেমন কুকুরের অবলেহনযোগ্য নহে, তদ্রূপ তুইও অঙ্গরাজ্য উপভোগ করিবার উপযুক্ত নহিস্। তদীয় এতাদৃশ উদ্ধত বাক্যে কর্ণের অধর ক্রোধে কম্পিত হইতে লাগিল এবং বারংবার দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ-পূর্ব্বক তিনি নভোমণ্ডলস্থ সূর্য্যকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবল দুর্য্যোধন মদমত্ত কুঞ্জরের ন্যায় ক্রোধে অধীর হইয়া ভ্রাতৃমধ্য হইতে সহসা উত্থিত হইলেন এবং সম্মুখে আসীন ভীমকৰ্ম্মা ভীমসেনকে কহিতে লাগিলেন, হে ভীম! কর্ণের প্রতি এরূপ কটূক্তি প্রয়োগ করা তোমার সমুচিত নহে। ক্ষত্রিয়দিগের বলই শ্রেষ্ঠ এবং ক্ষত্রিয়েরই সহিত যুদ্ধ করিবে; শরদিগের ও নদীকলাপের' প্রভব নিতান্ত দুর্জেয়। দেখ, ভগবান্ জ্বলন'জল রাশি হইতে উত্থিত হইয়া এই চরাচর বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছেন। মহর্ষি দধীচির অস্থি হইতে অসুরকুলনাশক বজ্র উদ্ভূত হইয়াছে। অগ্নি, রুদ্র, গঙ্গা ও কৃত্তিকা, ইঁহাদিগের পুত্র কার্তিকেয় অসাধারণ পরাক্রমশালী। যাঁহারা ক্ষত্রিয়কুলোদ্ভব, কালক্রমে তাঁহারাও ব্রাহ্মণ হইয়াছেন; বিশ্বামিত্র প্রভৃতি ক্ষত্রিয় হইয়াও অক্ষয় ব্রহ্মত্ব লাভ করিয়াছিলেন। মহানুভব দ্রোণাচার্য্য কুম্ভসম্ভব হইয়াও অদ্বিতীয় শস্ত্রধারী হইয়াছেন। গৌতমবংশে শরস্তম্ব হইতে গৌতম উৎপন্ন হয়েন। আর তোমাদিগের যেরূপ জন্মলাভ হইয়াছে তাহা আমাদিগের অগোচর নাই; যেমন মৃগীগর্ভে ব্যাঘ্রের উদ্ভব হওয়া নিতান্ত অসম্ভব, কবচ কুণ্ডলধারী। সর্ব্বলক্ষণসংযুক্ত সূর্য্যসঙ্কাশ মহাবীর কর্ণও তদ্রূপ সামান্য ব্যক্তি হইতে উৎপন্ন নহেন। কর্ণ অঙ্গরাজ্যের অধীশ্বর হইয়াছেন, ইহা অতি সামান্য বিষয়: ইনি মনে করিলে নিজ ভুজবলে ও মদীয় সাহায্যে সমস্ত পৃথিবী অধিকার করিতে পারেন। কর্ণের রাজ্যলাভ বিষয়ে যাঁহার বিদ্বেষ থাকে, তিনি সংগ্রামে প্রবৃত্ত হউন।
অনন্তর রঙ্গমধ্যে সহসা সাধুবাদ-সহকৃত হাহাকার ধ্বনি উত্থিত হইল। এই অবসরে সূর্য্যও অস্তাচলে প্রস্থান করিলেন। তৎপরে মহারাজ দুর্য্যোধন কর্ণের করগ্রহণপূর্ব্বক রঙ্গ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। এদিকে পাণ্ডবেরা দ্রোণ, কূপ ও ভীষ্ম সমভি ব্যাহারে স্ব স্ব নিকেতনে প্রস্থান করিলেন। দর্শকমধ্যে কোন ব্যক্তি অর্জুনের, কোন ব্যক্তি কর্ণের, কোন ব্যক্তি দুর্য্যোধনের পরাক্রমের প্রশংসা করিতে করিতে আপনাপন আবাসে প্রস্থান করিল। এই অবসরে দিব্যলক্ষণলক্ষিত অঙ্গরাজ কর্ণকে গর্ন্তজাত পুত্র বোধে ভোজ-দুহিতা কুন্তীর অন্তঃকরণে স্নেহের সঞ্চার হইতে লাগিল। কর্ণের সহায়তা লাভ করিয়া দুর্য্যোধনের অর্জুনভয় তিরোহিত হইল। ধনুর্ব্বেদবেত্তা কর্ণও দুর্য্যোধনকে সান্ত্বনাবাক্যে আশ্বস্ত করিলেন। যুধিষ্ঠির কর্ণকে অদ্বিতীয়-ধনুর্দ্ধর বলিয়া স্থির করিলেন।
অষ্টত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রতনয়দিগকে ধনুর্ব্বেদে অদ্বিতীয় দেখিয়া গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করিবার বাসনা করিলেন। পরে শিষ্যগণকে সম্মুখে আনয়ন করিয়া কহিলেন, হে শিষ্যগণ! তোমরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে রণক্ষেত্র হইতে গ্রহণ করিয়া আনয়ন কর, উহাই তোমাদিগের গুরুদক্ষিণাস্বরূপ হইবে। শিষ্যগণ "তথাস্তু” বলিয়া গুরুবাক্যে অঙ্গীকার করত তৎক্ষণেই দক্ষিণা দানার্থ আচার্য্য দ্রোণ সমভি-ব্যাহারে অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করিয়া সত্বরে রাজধানী হইতে নির্গত হইলেন। অনতিবিলম্বে তথায় উপনীত হইয়া পাঞ্চালদেশ আক্রমণপূর্ব্বক সমরানল প্রজ্বলিত করিয়া বহুসংখ্যক সৈন্য সামন্ত নষ্ট করিলেন এবং মহাতেজাঃ দ্রুপদরাজের রাজধানী উৎপীড়িত করিতে লাগিলেন। দুর্য্যোধন, কর্ণ, মহাবল যুযুৎসু, দুঃশাসন, বিকর্ণ, জলসন্ধ, সুলোচন, ইঁহারা ও অন্যান্য অনেকানেক রাজকুমারেরা ব্যগ্রতাসহকারে "আমিই অগ্রে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব” বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। তৎপরে রাজকুমারেরা সারথি সমভিব্যাহারে নগরীমধ্যে প্রবেশ করিয়া রাজমার্গে প্রবিষ্ট হইলেন। তখন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ সেই অসংখ্য সৈন্য সন্দর্শন ও তাহাদিগের তুমুল কলরব শ্রবণ করিয়া ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে প্রাসাদ হইতে নির্গত হইলেন। তৎপরে মহারাজ যজ্ঞসেন বৰ্ম্ম পরিধান করিয়া যুদ্ধার্থে যাত্রা করিলেন। বীর পুরুষেরা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া অনবরত শরক্ষেপ ও সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। যজ্ঞসেন শুভ্রবর্ণ রথে আরোহণ-পূর্ব্বক যুদ্ধক্ষেত্রে কৌরবদিগকে লক্ষ্য করিয়া ঘোররূপে শর পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলেন।
অনন্তর মহাবীর অর্জুন রাজকুমারদিগের দর্পোদ্রেক দর্শনে পূর্ব্বেই বিবেচনা করিয়া দ্রোণকে কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! কুমারগণ আত্মানুরূপ পরাক্রম প্রদর্শন করুক, পশ্চাৎ আমরা সাহস প্রকাশ করিব; আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, ইহারা দ্রুপদরাজকে রণে পরাজয় করিতে পারিবে না। এই বলিয়া অর্জুন ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে নগরীর বহির্ভাগে অর্দ্ধক্রোশ অন্তরে অবস্থান করিতে লাগিলেন। এদিকে দ্রুপদরাজ কৌরব-দিগকে লক্ষ্য করিয়া চতুৰ্দ্দিকে আক্রমণ করিলেন এবং শরজাল বিস্তীর্ণ করিয়া কৌরবী সেনাকে মোহাবিষ্ট করিলেন। কৌরবগণ রথারোহণপূর্ব্বক যুদ্ধোদ্যত লঘুহস্ত' একমাত্র দ্রুপদরাজকে ভয়-প্রযুক্ত বহু বোধ করিলেন। দ্রুপদের সুতীক্ষ্ণ শর চতুর্দিকে প্রবলবেগে ভ্রমণ করিতে লাগিল। ইত্যবসরে স্কন্ধাবার' হইতে সিংহনাদসদৃশ শঙ্খধ্বনি এবং ভেরী, মৃদঙ্গ প্রভৃতি সুমধুর বাদ্য বারংবার ধ্বনিত হইতে লাগিল। তাঁহাদিগের শরাসনধ্বনি নভোমণ্ডল বিদীর্ণ করিয়া উত্থিত হইল। দুর্য্যোধন, বিকর্ণ, সুবাহু, দীর্ঘলোচন ও দুঃশাসন ইঁহারা, রোষপরবশ হইয়া শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দুর্জয় দ্রুপদরাজ পার্শ্বদেশে বাণবিদ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ প্রতিপক্ষ সেনাগণকে দগ্ধপ্রায় করিলেন এবং দুর্য্যোধন, বিকর্ণ, মহাবল কর্ণ ও অনেকানেক প্রথিত মহাবীর রাজকুমারদিগকে জর্জরিত করিলেন। তৎপরে পৌরগণ কৌরবদিগকে মুষল ও যষ্টিদ্বারা প্রহার করিতে আরম্ভ করিল।
তখন নগরবাসী আবালবৃদ্ধগণ সেই তুমুল যুদ্ধকোলাহল শ্রবণ করিয়া কৌরবদিগের প্রতি ধাবমান হইল এবং পাণ্ডবগণের প্রতি আক্রোশ প্রকাশপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিল।
অনন্তর পাণ্ডবেরা তাদৃশ ভীষণ ও লোমহর্ষণ কলরব শ্রবণ করিয়া আচার্য্য দ্রোণকে অভিবাদনপূর্ব্বক রথে আরোহণ করিলেন। অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধ করিতে নিষেধ করিয়া মাদ্রীসুত নকুল ও সহদেবকে চক্রব্যূহরক্ষায় নিয়োগ করিলেন। ভীমসেন গদা ধারণ করিয়া সর্ব্বদা সেনামুখে সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন। কুন্তীনন্দন অর্জুন ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে রথারোহণ-পূর্ব্বক তদীয় নির্ঘোষে দিঘণ্ডল ধ্বনিত করিয়া বায়ুবেগে রণস্থলে আগমন করিলেন। তৎপরে ভীমসেন পাঞ্চালরাজের উচ্ছলিত সাগরসম শব্দায়মান সেনাসাগরমধ্যে দণ্ডধারী অন্তকের ন্যায় প্রবিষ্ট হইয়া গদা গ্রহণপূর্ব্বক কুঞ্জরবল চূর্ণ করিতে ধাবমান হইলেন। অদ্ভুতবীর্য্য অর্জুনও সাক্ষাৎ কালান্তক যমের ন্যায় গদা হস্তে লইয়া হস্তিদল সংহার করিতে লাগিলেন। উত্তুঙ্গ-শৈলশৃঙ্গকল্প কুঞ্জরবল ভীমের গদাঘাতে ভগ্নমস্তক হইয়া রুধির বমন করিতে করিতে বজ্রাহত পর্ব্বতের ন্যায় ভূতলে পতিত হইতে লাগিল। এইরূপে ভীম হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতি সমুদায় ভূমিসাৎ করিলেন। যেমন বনমধ্যে গোপাল বালকেরা পশু-গণকে দণ্ডদ্বারা ইতস্ততঃ সঞ্চালন করে, বৃকোদর সেইরূপ রথ ও নাগবল চালনা করিতে লাগিলেন।
যুগান্তানলকল্প মহাবীর্য্য অর্জুন দ্রোণাচার্য্যের প্রিয়কার্য্য সম্পাদনার্থ শরজালদ্বারা দ্রুপদকলেবর ক্ষত বিক্ষত করিয়া লক্ষ লক্ষ হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতি চূর্ণ করিলেন। অনন্তর পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়দেশীয় বীরপুরুষেরা সাতিশয় আঘাত প্রাপ্ত হইয়া চতুর্দিক হইতে নানাবিধ বাণদ্বারা অর্জুনকে আচ্ছন্ন করিল এবং সিংহনাদ করত অর্জুনের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিল। ফলতঃ এই যুদ্ধ দেখিতে অতি অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর হইয়াছিল। বীরগণের সিংহনাদ দেবরাজ ইন্দ্রেরও নিতান্ত দুঃসহ হইয়া উঠিল। অর্জুন শরজালে সকলকে আচ্ছন্ন ও বিমুগ্ধ করিয়া পাঞ্চালদিগের প্রতি ধাবমান হইলেন। তিনি উপর্যুপরি শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন, সুতরাং বিপক্ষেরা তাঁহার গাত্রে আঘাত করিতে নিতান্ত অক্ষম হইল। এই অবসরে সিংহনাদ-সহকৃত সাধুবাদ উত্থিত হইল। তৎপরে শম্বরাসুর যেমন ইন্দ্রের প্রতি ধাবমান হইয়াছিল, সেই প্রকার পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ সত্যজিতের সহিত অতি সত্বরে অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। অর্জুন শরবর্ষণদ্বারা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে আচ্ছন্ন করিলেন। অনন্তর পাঞ্চালসৈন্যমধ্যে তুমুল কোলাহল উত্থিত হইল। মৃগরাজ সিংহ যেমন অরণ্যমধ্যে যূথপতি হস্তীকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হয়, সত্যবিক্রম সত্যজিৎ অর্জুনকে সম্মুখে আসিতে দেখিয়া সেইরূপ পরাক্রম প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। তৎপরে পাঞ্চালরাজ একশত শরদ্বারা অর্জুনকে আচ্ছন্ন করিলেন। মহারথ অর্জুন বাণদ্বারা ক্ষত বিক্ষত হইয়াও মহাবেগে শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক সত্যজিতের ধনুর্জা ছেদন করিয়া দ্রুপদের প্রতি অভিগমন করিলেন। অনন্তর সত্যজিৎ অপর এক ধনুগ্রহণ করিয়া অশ্ব, রথ ও সারথির সহিত অর্জুনকে বিদ্ধ করিলেন। তাঁহাকে এইরূপ পরাক্রম প্রকাশ করিতে দেখিয়া অর্জুনের অন্তঃকরণে ঈর্ষার সঞ্চার হইল। তৎপরে অর্জুন তাঁহার প্রাণসংহারার্থ সত্বর শর পরিত্যাগ করিলেন। অর্জুনের সুতীক্ষ্ণ শরদ্বারা তদীয় অশ্ব, ধ্বজ, ধনু, পার্কি ও সারথি ছিন্নভিন্ন হইয়া গেল। ধনু ছিন্ন হইলে সত্যজিৎ অপর এক ধনুগ্রহণ করিলেন এবং রথে পুনর্ব্বার অশ্ব যোজনা করিলেন, কিন্তু তিনি অর্জুনের সম্মুখে যাইতে সাহস করিতে পারিলেন না। দ্রুপদ তাঁহাকে যুদ্ধে পরাজুখ দেখিয়া প্রবলবেগে অর্জুনের উপর শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। অর্জুনও দ্রুপদের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভকরিলেন। পরে অর্জুন দ্রুপদের ধনু ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক ভূতলে পাতিত করিয়া পাঁচ বাণদ্বারা তদীয় অশ্ব ও সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে ধনুর্ব্বাণ পরিত্যাগ করিয়া করে কর-বাল ধারণপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন এবং অকুতোভয়ে স্বীয় রথ হইতে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রথে আরোহণ ও তাঁহাকে আক্রমণ করিলেন।
পাঞ্চালদেশীয় বীরপুরুষেরা দশদিকে পলায়ন করিতে লাগিল। অর্জুন সৈন্যমধ্যে আপনার বাহুবল প্রদর্শন করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক তথা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। রাজ-কুমারেরা অর্জুনকে সমাগত দেখিয়া সকলে সমবেত হইয়া দ্রুপদনগরী মর্দ্দন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন অর্জুন ভীমকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আর্য্য! রাজসত্তম দ্রুপদ কুরুবীরদিগের আত্মীয়, তাঁহার সৈন্য সংহার না করিয়া গুরুদক্ষিণা প্রদানের চেষ্টা করুন, মহাবল ভীমসেন এইরূপে | নিবারিত হইয়া সৈন্যাবমৰ্দ্দনে ক্ষান্ত হইলেন। কিন্তু উপস্থিত যুদ্ধে কিঞ্চিন্মাত্র তৃপ্তি লাভ করিতে পারিলেন না। পরিশেষে তাঁহারা রণস্থল হইতে দ্রুপদরাজ ও তাঁহার সচিব উভয়কে গ্রহণ করিয়া আচার্য্য দ্রোণের নিকট উপহার প্রদান করিলেন। দ্রোণাচার্য্য দ্রুপদরাজকে ভগ্নদর্প, হৃতসর্ব্বস্ব ও বশ্যতাপন্ন দেখিয়া পূর্ব্ববের স্মরণপূর্ব্বক কহিলেন, হে দ্রুপদরাজ! আমার আদেশানুসারে তোমার রাষ্ট্র ও নগরী বিমর্দিত হইয়াছে এবং তোমার জীবনও বিপক্ষপক্ষের হস্তগত; দেখ, এক্ষণে তুমি সখ্যতাসহকারে কি বাসনা কর? আমি তাহা সফল করিব। এই কথা কহিয়া দ্রোণ হাস্যমুখে পুনর্ব্বার কহিলেন, হে বীর! তুমি প্রাণনাশের আশঙ্কা করিও না, আমরা ক্ষমাশীল ব্রাহ্মহ্মণ, বিশেষতঃ শৈশবাবস্থায় তোমার সহিত এক আশ্রমে ক্রীড়া করিয়াছিলাম। সেই কারণে তোমার প্রতি আমার অন্তঃকরণে স্নেহ ও প্রীতি সঞ্চারিত হইয়া আছে। হে মহারাজ! তোমার সহিত পুনরায় সখ্যভাব সংস্থাপন করিবার বাসনা করি। এজন্য তোমাকে বর প্রদান করিতেছি, আমার বরপ্রভাবে পুনর্ব্বার রাজ্যার্দ্ধ লাভ করিবে। তুমি পূর্ব্বে কহিয়াছিলে যে, যে ব্যক্তি রাজা নহে, সে রাজার সখা হইতে পারে না। হে যজ্ঞসেন! এই কারণে তোমাকে পুনর্ব্বার রাজ্যার্দ্ধ প্রদান করিলাম। এক্ষণে তুমি ভাগীরথীর দক্ষিণকূলের অধিপতি হইলে এবং আমিও উত্তর কূল শাসনে প্রবৃত্ত হইলাম; যদি তোমার ইহাতে প্রবৃত্তি হয়, তবে আমার সহিত সখ্যতা কর। তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া দ্রুপদ কহিলেন, হে ব্রহ্মন! প্রবল পরাক্রান্ত মহাত্মা ব্যক্তি যে এরূপ আচরণ করেন, ইহা নিতান্ত বিস্ময়কর নহে। আমি মহাশয়ের বাক্যে পরমপ্রীত হইলাম, অদ্যাবধি আমি নিত্যকাল আপনার প্রসন্নতালাভের বাসনা করি।
অনন্তর দ্রোণাচার্য্য দ্রুপদবাক্যে তুষ্ট হইয়া তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে সৎকার করিয়া রাজ্যার্দ্ধ প্রদান করিলেন। দ্রুপদ বিষন্নমনে গঙ্গার উপকূলে জনপদসম্পন্ন মাকন্দীনগরী ও কাম্পিল্যপুরী শাসন করিতে লাগিলেন। দ্রোণাচার্য্য এইরূপে দ্রুপদকে পরাভব করিয়া চৰ্ম্মণ্বতী নদী পর্য্যন্ত দক্ষিণ পাঞ্চালদেশ আপন অধিকারে আনিলেন। দ্রুপদ পরাভূত হইয়া আপনাকে অপেক্ষাকৃত নিতান্ত হীনবল বলিয়া বিবেচনা করিলেন এবং স্বীয় বলবীর্য্যে আচার্য্য দ্রোণকে পরাজয় করা দুঃসাধ্য নিশ্চয় করিয়া অলৌকিক ব্রাহ্মবলে পুত্র লাভ করিবার বাসনায় পৃথিবী পর্য্যটন করিতে লাগিলেন। এদিকে দ্রোণাচার্য্য অহিচ্ছত্রানগরীর অধীশ্বর হইয়া রাজ্যশাসন ও প্রজাপালনে প্রবৃত্ত হইলেন। হে মহারাজ। এইরূপে অর্জুন জনপদসম্পন্ন অহিচ্ছত্রা পুরী জয় করিয়া দ্রোণাচার্য্যকে প্রদান করিয়াছিলেন।
একোনচত্বারিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর সংবৎসর অতীত হইলে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুনন্দন যুধিষ্ঠিরকে যৌব-রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুধিষ্ঠির রাজ্য লাভ করিয়া স্বীয় অসাধারণ ধৈর্য্য, স্থৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, ঋজুতা, অনৃশংসাচার, ভৃত্যানুকম্পা, স্থিরসৌহার্দ্দদ প্রভৃতি সদ্গুণদ্বারা অনতি-দীর্ঘকালমধ্যে নিজ পিতার মহীয়সী কীর্ত্তি এককালে তিরোহিত করিলেন। ভীমপরাক্রম ভীমসেন ভগবান্ বলদেব হইতে অসিচর্য্যা, গদাযুদ্ধ ও রথযুদ্ধ প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ের জ্ঞান লাভকরিয়া ভ্রাতৃগণের একান্ত বশংবদ হইয়া রহিলেন। অর্জুন প্রগাঢ় দৃঢ়মুষ্টি ছিলেন। লক্ষ্যভেদে তাঁহার বিলক্ষণ পটুতা ছিল; তিনি ক্ষুরপ্র, নারাচ, ভল্ল, বিপাটন প্রভৃতি বহুবিধ অস্ত্রশস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী হইয়াছিলেন। তাঁহার ঐ সকল অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ বিষয়ে সম্যক্ লাঘব ও সৌষ্ঠব জন্মিয়াছিল। জীবলোকে অর্জুনের তুল্য বলবান্ আর কেহই নাই, দ্রোণাচার্য্য এই নিমিত্ত সর্ব্বদাই তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতেন।
একদা দ্রোণ কৌরবী সভায় অর্জুনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! আমার গুরু অগ্নিবেশ, অগস্ত্যের নিকটে ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করিয়াছিলেন। এক সময়ে তিনি আমাকে আহ্বান করিয়া কহেন, বৎস! আমি তপোবলে ব্রহ্মশিরাঃ নামে এক অমোঘ অস্ত্র প্রাপ্ত হইয়াছি, এক্ষণে তাহা শিষ্যপরম্পরায় প্রদান করিতে ইচ্ছা করি, ইহার প্রভাবে পৃথিবী দগ্ধ হইতে পারে। গুরুদেব অস্ত্রগুণ এইরূপ কীর্ত্তন করিয়া প্রদানকালে আমাকে এই বলিয়া নিষেধ করেন, "বৎস! তুমি এই অস্ত্র কদাচ মনুষ্যের ও ক্ষীণবীর্য্য জীবের উপর প্রয়োগ করিও না।” এক্ষণে এই দিব্যাস্ত্র প্রদানের তুমিই উপযুক্ত পাত্র, আর কাহাকেও ইহার যোগ্য দেখিতেছি না; কিন্তু বৎস। মুনি যেরূপ নিয়ম নির্দ্ধারিত করিয়া দিয়াছেন, সাবধান, যেন তাহার অন্যথা না হয়। জ্ঞাতিসম্প্রদায় সমক্ষে তোমাকে আরও কিছু গুরুদক্ষিণা প্রদান করিতে হইবে। অর্জুন তৎক্ষণাৎ তাহা স্বীকার করিলেন। তৎপরে আচার্য্য পুনর্ব্বার কহিলেন, হে অর্জুন। রণস্থলে তুমি আমার প্রতিযোদ্ধা হইবে, ইহাও অঙ্গীকার কর। অর্জুন। "যে আজ্ঞা” বলিয়া তাঁহার চরণ গ্রহণপূর্ব্বক উত্তরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। জীবলোকে অর্জুনের তুল্য আর দ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর নাই, এই প্রশংসাবাদ সর্ব্বত্র উত্থিত হইল। ফলতঃ অর্জুন গদাযুদ্ধ, অসিচর্য্যা, রথ ও ধনুর্যুদ্ধে অদ্বিতীয় হইয়াছিলেন। ন্যায়পর সহদেব উশনা' প্রণীত নীতিশাস্ত্রে সম্যক্ ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়া ভ্রাতৃগণের একান্ত বশংবদ হইয়া রহিলেন। ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের প্রীতিভাজন নকুল দ্রোণাচার্য্যোপদেশে বিবিধ শিক্ষায় সুশিক্ষিত হইয়া বিচিত্র যোদ্ধা ও অতিরথ বলিয়া সর্ব্বত্র প্রসিদ্ধ হইয়াছিলেন। পাণ্ডবেরা গন্ধর্ব্বদিগের উপপ্লবকালে রণ-স্থলে যবনরাজ সৌবীরকে সংহার করিলেন। সৌবীর বৎসর-ত্রয়ব্যাপী এক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি সর্ব্বদা কুরুদিগের প্রতি দ্বেষভাব প্রকাশ করিতেন। বিচিত্রবীর্য্য এবং মহারাজ পাণ্ডু যাঁহাকে বশীভূত করিতে পারেন নাই, মহাবীর অর্জুন নিজ বাহুবলে সেই বিতুলনামা' সৌবীরকে শাসন করিলেন। তাঁহার শর প্রহারে সংগ্রামপ্রিয় দত্তামিত্র বলিয়া বিখ্যাত সুমিত্রনামা সৌবীরক শাসিত হইয়াছিল। অর্জুন ভীমসেনের সাহায্যে এক রথেই অযুতরথ ও পশ্চিমদেশবাসী-দিগকে পরাজয় করেন। তৎপরে সেই রথেই আরোহণ করিয়া দক্ষিণ দিক্ জয় করিলেন এবং পরাজিত রাজমণ্ডলীর নিকট হইতে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করিয়া কুরুরাজ্যে আনয়ন করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বকালে মহানুভব পাণ্ডবেরা এইরূপে অনেকানেক ভুপালগণকে রাজ্যচ্যুত করিয়া স্বীয় রাজ্যের সীমা বিস্তার করেন।
পাণ্ডবদিগের বাহুবল অলৌকিক বিবেচনা করিয়া মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের মনোগত সমুদায় সাধুবাদ নিতান্ত দূষিত হইল। তিনি তদ্বিষয়িণী বলবতী চিন্তায় একান্ত নিমগ্ন হইয়া রাত্রিকালে সুখে নিদ্রা যাইতে পারিতেন না।
চত্বারিংশদধিকশততম অধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। মহীপাল ধৃতরাষ্ট্র মহাবীর পাণ্ডুপুত্রদিগকে বলমদোম্মাদিত দেখিয়া অত্যন্ত কাতর ও একান্ত চিন্তান্বিত হইলেন। তৎপরে মন্ত্রজ্ঞ নীতিনিপুণ মন্ত্রিবর কণিককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম। পাণ্ডবেরা নিত্য উৎসিক্ত' এই নিমিত্ত আমি সাতিশয় অসূয়াপরবশ হইতেছি; অতএব তাহাদিগের সহিত সন্ধিবিগ্রহের অন্যতর কি ব্যবহার করিব, তুমি নিশ্চয় করিয়া বল, আমি তোমার কথার অন্যথা করিব না। প্রসন্নমনাঃ নীতিশাস্ত্রবিশারদ মন্ত্রিবর ভূপালের আদেশ পাইয়া নীতিশাস্ত্রানুসারে কহিলেন, মহারাজ! আমি যাহা কহি, তাহা অবহিত হইয়া শ্রবণ করুন, কিন্তু মহারাজ! আমার বাক্য নিতান্ত অপ্রিয় হইলেও রোষ বা অসন্তোষ প্রকাশ করিবেন না। রাজার নিরবচ্ছিন্ন দণ্ড বা নিয়ত পৌরুষ প্রকাশ করা উচিত নহে। যাহাতে প্রতিপক্ষেরা কোষ বলাদির কোন অনুসন্ধান লইতে না পারে, এমন বিষয়ে তাঁহার সতত সাবধান থাকা আবশ্যক। তিনি সাধ্যানুসারে বিপক্ষের রন্ধ্রান্বেষণে তৎপর হইবেন এবং জনগণের ভূণহত্যা প্রভৃতি পাপের নিয়ত অনুসন্ধান করিবেন। রাজা প্রতিনিয়ত উদ্যতদণ্ড হইলে লোকে ভীত হইয়া গর্হিত কর্ম্মের প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে, এই কারণে তিনি দণ্ডদ্বারা সর্ব্বকার্য্যের সমাধা করিবেন। রাজার আত্মছিদ্র গোপন ও পরচ্ছিদ্রের অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য এবং তাঁহার সহায়, সাধন ও উপায়' প্রভৃতি রাজ্যাঙ্গের গোপন করা ও আত্মকৃত নিন্দিত ব্যাপারের সংবরণ করা একান্ত বিধেয়। কোন কার্য্য আরম্ভ করিয়া নিঃশেষে তাহার সমাধা করা বাজার পক্ষে অতীব কর্ত্তব্য; কারণ অসম্যক্ উচ্ছিন্ন সামান্য কণ্টকও কালক্রমে ব্রণকারণ হইয়া উঠে। অপকারী শত্রুকে বধ করাই সর্ব্বতোভাবে প্রশংসনীয়। আপৎকাল উপস্থিত হইলে অসংশয়িতচিত্তে যুদ্ধবিক্রম প্রকাশ বা পলায়ন, যাহাতে আপনার সুবিধা হয়, তাহাই করিবেন। শত্রু দুর্ব্বল হইলেও কোনক্রমে অবজ্ঞেয় নহে। কারণ সামান্য অগ্নিকণাও সমুদায় বন ভস্মসাৎ করিতে পারে। সময়বিশেষে রাজা শত্রুর অত্যাচারে দৃষ্টিপাত ও কর্ণপাত না করিয়া অন্ধ ও বধির হইয়া থাকিবেন। শরাসন তৃণতুল্য অসার বিবেচনা করিয়া পরিত্যাগ করিবেন এবং মৃগের ন্যায় সাবধান হইয়া আত্মরক্ষা বিষয়ে যত্নশালী হইবেন। তৎপরে সামাদি উপায়দ্বারা শত্রুকে বশে আনিয়া তাহাকে বিনাশ। করিবেন। কিন্তু সে যদি শরণাপন্ন হয়, তথাচ তাহার প্রতি কদাচ অনুকম্পা প্রদর্শন করিবেন না। পরিচারকদিগকে প্রার্থনা-ধিক অর্থদানপূর্ব্বক পরিতুষ্ট করিয়া শত্রু ও পূর্ব্বাপকারীকে বিনষ্ট করিবেন। শত্রু সংহার করিতে পারিলে নির্ভীক ও নিরুদ্বিগ্ন হওয়া যায়। শত্রুপক্ষীয়দিগকে যত বিনষ্ট করিতে পারেন, তদ্বিষয়ে কদাচ ত্রুটি করিবেন না। প্রথমতঃ যাহাতে প্রতিপক্ষের মূলোচ্ছেদন হয়, এমন চেষ্টা পাইবেন। পরে তাহার সহায় ও তৎপক্ষদিগকে বিনাশ করিবেন। সমূলোচ্ছেদন হইলে তদু পজীবী সকলে অনায়াসে বিনষ্ট হয়। মহারাজ! বনস্পতি সমূলে উন্মুলিত হইলে তাহার শাখা, পল্লব বা পত্রসকল কি আর পূর্ব্বাবস্থায় অবস্থিত থাকিতে পারে? রাজা একাগ্রচিত্তে নিজাভিসন্ধি গোপন করিয়া সর্ব্বদা পরচ্ছিদ্র দর্শনে তৎপর হইবেন। নিত্যোদ্বিগ্ন হইয়া শত্রুর প্রতি সম্যক্ ব্যবহার করিবেন। অগ্ন্যাধান', যজ্ঞানুষ্ঠান, কাষায়বস্ত্র পরিধান ও জটাজিন' দ্বারা লোকদিগকে বিশ্বসিত করিয়া পরে বৃকের ন্যায় স্বার্থসাধনে প্রবৃত্ত হইবেন। অর্থসংগ্রহ বিষয়ে শৌচই অঙ্কুশস্বরূপ হয়, তদ্দ্বারা ফলবতী শাখা আনমিত করিয়া সুপক্ক ফল গ্রহণ করিবেন; কারণ পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন, যদবধি সময় আগত না হয়, তৎকাল পর্যন্ত শত্রুকে স্কন্ধে বহন করিবে। অনন্তর নিদ্দিষ্টকাল উপস্থিত হইলে, যাদৃশ মৃন্ময় ঘটকে প্রস্তরো-পরি নিক্ষেপ করিলে চূর্ণ করা যায়, তাদৃশ অপকারী শত্রুকে বিনাশ করিবে। বহুভাষী ও কৃপণ শত্রুকেও পরিত্যাগ করিবে না এবং তাহার প্রতি প্রসন্নভাব প্রদর্শন করাও নিতান্ত নিষিদ্ধ: প্রত্যুত যেরূপে হউক, তাহাকে বিনষ্ট করিবে; অধিক কি, সন্ধি, দান, ভেদ ও দণ্ড, এই সমস্ত উপায়দ্বারাও শত্রুসংহার করা বিধেয়, তাহা হইলে সকল বিষয়ে শান্তিলাভ হয়।
এই কথা শ্রবণ করিয়া ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে কণিক! সন্ধি, দান, ভেদ ও দণ্ডদ্বারা কি প্রকারে শত্রু সংহার করা যাইতে পারে, তুমি আমার নিকটে আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বল। কণিক কহিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বকালে নীতিশাস্ত্রবিশারদ অরণ্যবাসী জম্বুকের যেরূপ ঘটিয়াছিল, তাহা আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
কোন বনে এক শৃগাল, ব্যাঘ্র, ইন্দুর, বৃক ও নকুল, এই চারি বন্ধুর সহিত একত্র বাস করিত। জম্বুক অতিশয় ধূর্ত, বুদ্ধিমান্ ও স্বার্থপরায়ণ ছিল। তাহারা একদা বনমধ্যে যূথপতি এক মৃগকে লক্ষ্য করিয়া বলপূর্ব্বক আক্রমণ করিবার নিমিত্ত চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু মৃগ অতিশয় বলবান, এই নিমিত্ত তাহারা সহসা আপন অভীষ্টসাধনে নিতান্ত অশক্ত হইলে পরিশেষে জম্বুক কহিল, হে ব্যাঘ্র! এই মৃগ অতিশয় বুদ্ধিশালী, যুবা ও বেগবান; সুতরাং তুমি বারংবার যত্ন করিলেও ইহাকে সহসা আক্রমণ করিতে পারিবে না; অতএব যে সময়ে ঐ মৃগ শয়ন করিয়া থাকিবে, সেই অবসরে মূষিক গিয়া ঐ হরিণের পাদদ্বয় ভক্ষণ করুক, তাহা হইলে ব্যাঘ্র অনায়াসে উহাকে গ্রহণ করিতে পারিবে। তৎপরে আমরা সকলে সমবেত হইয়া প্রফুল্লমনে ভক্ষণ করিব। তাহারা সকলে একতান মনে জম্বুকের পরামর্শে সম্মত হইল। অনন্তর তাহাদিগের আদেশা-নুসারে মূষিক গিয়া মৃগের পাদদ্বয় ভক্ষণ করিলে ব্যাঘ্র তাহাকে বধ করিল। তখন জম্বুক মৃগকলেবর অবনীতলে বিচেষ্টমান' দেখিয়া কহিল অহে! তোমরা সকলে স্নান করিয়া আইস, আমিই ইহা রক্ষা করিতেছি। তাহারা শৃগালের বাক্যানুসারে স্নানার্থ নদীতীরে গমন করিল। শৃগালও চিন্তাকুল হইয়া তথায় অবস্থিতি করিতে লাগিল। অনন্তর মহাবল ব্যাঘ্র স্নান করিয়া আগমন করিল এবং শৃগালকে চিন্তাক্রান্ত দেখিয়া কহিল, হে জম্বুক। ভাই! আমাদিগের মধ্যে তুমিই একমাত্র বুদ্ধিজীবী, তুমি কি কারণে শোক করিতেছ? আইস আমরা মৃগমাংস ভক্ষণ করিয়া বিহার করি। তখন জম্বুক কহিল, হে মহাবাহো। মূষিক যাহা কহিয়াছে, বলিতেছি, শ্রবণ কর! তুমি স্নান করিতে গেলে সে অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া আমাকে কহিল, আমিই অদ্য এই মৃগকে বধ করিয়াছি, ব্যাঘ্রের বলবিক্রমে ধিক্, আজ আমারই ভুজবলে তোমাদিগের তৃপ্তিসাধন হইবে। বলিতে কি, সে গর্ব্বপূর্ব্বক এইরূপ তর্জন গর্জন করিতে ছিল; এই কারণে মৃগমাংস ভক্ষণে আমার আর তাদৃশ প্রীতি নাই। তখন ব্যাঘ্র ক্রোধভরে কহিল, হে জম্বুক! যদি সত্যিই সে এইরূপ কহিয়া থাকে, ভাল, তুমি যথাকালে আমাকে প্রবোধিত করিয়াছ। আমি অদ্য বাহুবলে বনচরদিগকে বিনাশ করিব। চলিলাম, তুমি তথায় পর্যাপ্ত মাংস ভক্ষণ করিবে; এই বলিয়া ব্যাঘ্র বনমধ্যে প্রস্থান করিল।
এই অবসরে মূষিক সহসা উপস্থিত হইল। শৃগাল তাহাকে আগত দেখিয়া কহিল, মূষিক! তোমার মঙ্গল ত? বৃক যাহা কহিয়াছে, শুন; তুমি স্নান করিতে গেলে সে কহিল এই মৃগমাংস ভক্ষণ করিতে আমার অভিরুচি নাই, এক্ষণে আমার এই মাংস বিষ বলিয়া বোধ হইতেছে, তোমার মত হইলে আমি এখনই মূষিককে গিয়া ভক্ষণ করি; এই কথা শুনিবামাত্র মুষিক অতিমাত্র ব্যস্ত সমস্ত হইয়া প্রাণভয়ে সত্বরে বিবরমধ্যে প্রবেশ করিল। কিছুকাল পরে বৃক স্নান করিয়া তথায় আগত হইল। জম্বুক তাহাকে দেখিয়া কহিল, ভাই। ব্যাঘ্র তোমার উপর অতিশয় রোষাবিষ্ট হইয়াছেন, সুতরাং তোমার অনিষ্ট ঘটিবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা; তিনি কলত্রসহকারে সত্বরে এখানে আসিতেছেন; এক্ষণে যাহা কর্তব্য হয় কর। তখন পিশিতাশন' বৃক শৃগালের এইরূপ কথা শুনিয়া ভীত ও সঙ্কুচিত হইয়া পলায়ন করিল। এই অবসরে নকুল কৃতস্নান হইয়া তথায় আগমন করিল। জম্বুক তাহাকে আগত দেখিয়া কহিল, অহে নকুল। আমি নিজ ভুজবলে সকলকে পরাজয় করিয়াছি। পরাজিত হইয়া তাহারা স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিল। এক্ষণে আমার সহিত যদি যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পার, তাহা হইলে তুমি ইচ্ছামত মৃগমাংস ভক্ষণ করিতে পাইবে। তখন নকুল কহিল, হে জম্বুক! ব্যাঘ্র, বৃক ও বুদ্ধিমান্ মূষিক যখন তোমার নিকটে পরাজিত হইয়াছে, সুতরাং তুমি সর্ব্বাপেক্ষা বলবান, সন্দেহ নাই; অতএব তোমার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইতে আমার আর উৎসাহ নাই; "চলিলাম” এই বলিয়া নকুলও পলায়ন করিল। এইরূপে জম্বুক অসাধারণ বুদ্ধিবলে সকলকে বিদায় করিয়া পরম সুখে মৃগমাংস ভক্ষণ করিয়াছিল।
যে রাজা এইপ্রকার আচরণ করেন, তিনি সুখ ভোগ করিয়া থাকেন। ভীত ব্যক্তিকে ভয় প্রদর্শন, বীরের নিকটে বিনয়ভাব; লুব্ধকে অর্থদান, সম বা ন্যূন ব্যক্তিকে বলপ্রকাশ করিয়া বশীভূত করিবে। মহারাজ। আরও শ্রবণ করুন; পুত্র, সখা, ভ্রাতা এবং গুরুও যদি শত্রুর ন্যায় বিদ্রোহাচরণে প্রবৃত্ত হয়েন, তাহা হইলে তৎক্ষণেই তাঁহাদিগকে বিনষ্ট করিবে। শত্রুকে শপথ, অর্থদান, বিষপ্রয়োগ বা মায়াপ্রকাশ করিয়া বিনাশ করা বিধেয়, কদাচ উপেক্ষা করিবে না। কিন্তু যদি জিগীষা-সম্পন্ন উভয় পক্ষই তুল্য বল ও তুল্য উপায়বশতঃ সন্দিহান হইয়া থাকেন, তাহা হইলে যিনি তন্মধ্যে গাঢ়তর অধ্যবসায়-সহকারে জয়শ্রীলাভের প্রত্যাশা করেন, তাঁহারই অভ্যুদয় জানিবেন। আর যদি গুরুও অবলিপ্ত' কাৰ্য্যাকার্য্যজ্ঞানশূন্য নিতান্ত নিন্দনীয় ও কুপথগামী হন, তাহা হইলে তাঁহারও শাসন করা ন্যায়বিরুদ্ধ নহে। ক্রোধোদ্রেক হইলেও কদাচ ক্রুদ্ধ হইবে না, সর্ব্বদা সহাস্য আস্যে সকলকে সাদর সম্ভাষণ করিবে। কোপাক্রান্ত হইয়া কখন অন্যের অপকারে প্রবৃত্ত হইবে না। প্রহারোদ্দেশে বা প্রহারকালে লোকের প্রতি প্রীতিবাক্য প্রয়োগ করিবে। প্রহার করিয়া কৃপা প্রদর্শন এবং প্রহারবেগে প্রহহৃত ব্যক্তি কাতরোক্তিদ্বারা শোক বা রোদন করিলে বিলাপ ও পরিতাপ করা বিধেয়। শান্তবাক্য, ধর্মোপদেশ ও সদ্ব্যবহারদ্বারা শত্রুকে আশ্বস্ত করিবে। এইরূপ অনুকম্পা প্রদর্শন করিলেও যদি পথিমধ্যে শত্রু সদাচারের অন্যথাচরণ করে, তাহা হইলে অবসর বুঝিয়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে প্রহার করিবে; ইহাতে অধর্ম স্পর্শ করিবে না। যেমন কৃষ্ণবর্ণ মেঘ উন্নত মহীধরকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখে, সেইরূপ নিরবচ্ছিন্ন ধর্মানুষ্ঠানকারী ব্যক্তি ধৰ্ম্মবলে পরিবৃত হইয়া থাকে; ঘোরতর অপরাধী হইলেও দোষী বলিয়া পরিগণিত ও পরিগৃহীত হইতে পারে না। যাহার পক্ষে বধ অবধারিত হইয়াছে, তাহার গৃহে অগ্নি প্রদান করিবে। আর নির্ধন, নাস্তিক ও চৌরগণকে দেশ হইতে নির্ব্বাসিত করিবে। অশঙ্কিত ও শঙ্কিত উভয় হইতেই সর্ব্বদা শঙ্কা করা উচিত কিন্তু অশঙ্কিত হইতে ভয় উৎপন্ন হইলে মূলপর্যন্ত উচ্ছিন্ন হইতে পারে। অবিশ্বস্ত ব্যক্তিকে কদাচ বিশ্বাস করিবে না এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিকেও অতি বিশ্বাস করিবে না, যেহেতু বিশ্বস্ত হইতে ভয় উৎপন্ন হইলে মূলপর্য্যন্ত উচ্ছিন্ন হইতে পারে।
আপনার ও অন্যের বিধানানুসারে চর নিযুক্ত করিবে। পাষণ্ড ও তাপস প্রভৃতিকে বিপক্ষের রাজধানীতে প্রেরণ করা বিধেয়। উদ্যান, বিহারস্থান, দেবতায়তন, পানাগার, পথ, সর্ব্ব-তীর্থ, চত্বর, কূপ, পর্ব্বত, বন, সর্ব্বসমবায় ও নদীতীরে মন্ত্রণা করিবে। হৃদয়ে ক্ষুরধার রাখিয়াও সর্ব্বদা সহাস্যমুখে মিষ্টবাক্যে, বিনীতভাবে সম্ভাষণ করিবে; কিন্তু কাদচ কোন ভয়াবহ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিবে না। যিনি ঐহিক সম্পত্তির প্রত্যাশা করেন, তিনি দানশীল ভূপতির নিকটে করপুটে প্রার্থনা, শপথ, সান্ত্ববাদ, পাদবন্দন ও আশা করিবেন। কেহ কোন বিষয় প্রার্থনা করিলে অগ্রে বাক্যেতে তাহাকে নিরাশ করিবে না; কিন্তু প্রদানকালে নানাপ্রকারে বিঘ্নানুষ্ঠান করিবে। প্রার্থীকে নানাপ্রকারে আশা প্রদান করিবে। কিন্তু কখন প্রার্থনা পরিপূর্ণ করিবে না। যদি কখন তাহার অভীষ্ট সিদ্ধ কর তাহাও সত্বরে করা অবিধেয়। ত্রিবিধ পীড়া ও ফলসিদ্ধি আছে, তন্মধ্যে ফল শুভ ও পীড়া অশুভ; অতএব পীড়া পরিত্যাগ করিবে। ধর্মপরায়ণ পুরুষের অর্থ ও কামদ্বারা চিত্তবৈকল্য জন্মে, অর্থলোভীর ধৰ্ম্ম ও কামদ্বারা এবং কামাসক্তের অর্থ ও ধৰ্ম্মদ্বারা পীড়া জন্মে। নিরহঙ্কার, অভিনিবিষ্ট, বিশুদ্ধস্বভাব ও অসূয়াশূন্য হইয়া সান্ত্ববাদ প্রয়োগ ও সর্ব্ববিষয়ের অনুসন্ধান-পূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণের সহিত মন্ত্রণা করিবে। যাহা করিলে আপনার দীনভাব মোচন হয়, মৃদুই হউক, আর দারুণই হউক, তাহা অবশ্য করিবে এবং সমর্থ হইয়া ধর্মাচরণ করিবে।
সংশয়ারূঢ় না হইলে শুভলাভের প্রত্যাশা নাই; সংশয়া-রূঢ় হইয়া যদি জীবিত থাকে, তাহা হইলে অবশ্যই শ্রেয়োলাভহয়। শোক ও সন্তাপদ্বারা যাহার বুদ্ধিবৃত্তি কলুষিত হইবে, নল ও রামাদির উপাখ্যান কথনদ্বারা তাহাকে সান্ত্বনা করিবে; নিতান্ত নির্বোধ ব্যক্তিকে ভাবী মঙ্গলের প্রত্যাশা প্রদর্শন ও পণ্ডিতকে ধন দানাদি দ্বারা সান্ত্বনা করিবে। যিনি শত্রুর সহিত সন্ধি স্থাপনপূর্ব্বক কৃতকার্য্যের ন্যায় নিতান্ত নিশ্চিন্ত হইয়া থাকেন, তিনি বৃক্ষাগ্রে প্রসুপ্ত ব্যক্তির ন্যায় পতিত ও প্রতিবুদ্ধ হয়েন। অসূয়াপরবশ না হইয়া যত্নপূর্ব্বক নিজ মন্ত্রণা গোপন করিয়া রাখিবে এবং রোষাবেশ সংবরণ করিয়া চরদ্বারা সর্ব্ব বিষয় অবধারণ করিবে। পরধর্ম-বিদারণ, দারুণ কৰ্ম্ম সম্পাদন ও শত শত শত্রু সংহার না করিয়া মনুষ্য কখনই মহতী শ্রীলাভকরিতে পারে না। শত্রু সৈন্য কর্ষিক, ব্যাধিত, ক্লিন্ন, অন্নপান-বিবর্জিত, বিশ্বস্ত ও মন্দ হইলেও প্রহার করিবে। অর্থী অর্থীর নিকটে উপস্থিত হয় না। যদিও তাহাদের অভিলাষ সফল হয়, তথাচ উভয়ের সখ্য সংস্থাপন হওয়া নিতান্ত সুকঠিন। সহায়সংগ্রহ ও শত্রুর সহিত বিগ্রহ করিতে যত্ন করিবে। সম্পদ লাভের ইচ্ছা ও তদ্বিষয়ে প্রভূত উৎসাহ প্রদর্শন করা বিধেয়। এইরূপ লোকের কার্য্য কি শত্রু, কি মিত্র, কেহই কিছুমাত্র অবধারণ করিতে পারে না, কেবল কার্য্যের উদ্যোগ ও পর্যবসানমাত্র প্রত্যক্ষ করে। যদবধি ভয় উপস্থিত না হয়, তদবধি ভয়কে ভয় করিবে; কিন্তু ভয় আগত হইলে স্থিরচিত্তে প্রতীকার করিতে চেষ্টা করিবে। দণ্ডায়ত্ত শত্রুকে যে রাজা ধনমানাদি প্রদানপূর্ব্বক অনুগ্রহ করেন, তিনি আপনার মৃত্যু সংগ্রহ করিয়া রাখেন।
অনাগত কার্য্যকেও অচিরাগত বিবেচনা করিয়া বুদ্ধি-পূর্ব্বক তাহার অনুসরণ করিবে, কিন্তু বুদ্ধিভ্রংবশতঃ আপনার উদ্দেশ্য সাধনে কদাচ উপেক্ষা বা অনাদর প্রদর্শন করা বিধেয় নহে। সম্পদ লাভার্থে যত্নপূর্ব্বক স্বীয় উৎসাহবন্ধন করিবে ও দেশ, কাল বিভাগ করিয়া পারলৌকিক কৰ্ম্ম এবং ধৰ্ম্ম, অর্থ, ও কাম, এই ত্রিবর্গ পর্যায়ক্রমে সেবা করিবে; কারণ দেশ কাল বিবেচনা না করিলে শ্রেয়োলাভ হওয়া দুষ্কর। শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অল্প হইলেও কদাচ উপেক্ষা করিবে না, কারণ তাহারাই আবার কালক্রমে শত্রুভাব বদ্ধমূল করিতে পারে। যেমন বনমধ্যে বহ্নি নিক্ষিপ্ত হইলে তাহা ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইয়া থাকে, সেইরূপ শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অল্প হইলেও কালসহকারে তাহাদিগের দলপুষ্টি হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা। যিনি অগ্নি-স্ফুলিঙ্গের ন্যায় আপনাকে সঙ্কুক্ষিত ও উত্তেজিত করেন, তিনি ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইয়া সমূহ শত্রুকে এককালে বিনাশ করিতে পারেন। প্রথমতঃ অর্থীকে বহু কালব্যাপিনী আশা প্রদান করিবে, কাল উপস্থিত হইলে বিঘ্নের কথা উত্থাপন করিবে; নিমিত্তদ্বারা বিঘ্ন ও হেতুদ্বারা নিমিত্ত প্রকাশ করিবে। শত্রু-সংহারকারী রন্ধ্রানুসারী অতি দারুণ সহায়-সংগ্রাহী ছদ্মবেশী রাজা ক্ষুরের ন্যায় শত্রুর প্রাণ সংহার করিয়া থাকেন, অতএব মহারাজ! পাণ্ডব বা অন্য যে কেহ হউক না কেন, তাঁহাদিগের সহিত ন্যায়ানুগত ব্যবহার করিলে আপনি কখনই বিপদে পড়িবেন না এবং নির্বিবাদে আপনার কার্য্য সাধন করিতে পারিবেন। বিশেষতঃ আপনি সর্ব্বকল্যাণসম্পন্ন ও কুলশীল-বিশিষ্ট, অতএব পাণ্ডুনন্দন হইতে আপনাকে রক্ষা করুন। এক্ষণে যাহা কর্তব্য তাহা কহিলাম, আপনি পুত্র সমভিব্যাহারে পরামর্শ করিয়া যাহা শ্রেয়ঃ কল্প হয়, করুন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে এইরূপ উপদেশ দিয়া কণিক স্বগৃহে প্রত্যাগমন করিলেন এবং ধৃতরাষ্ট্রও তদবধি নিতান্ত শোকাকুল হইলেন।