আদিপর্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| অনুক্রমণিকাধ্যায় | |
| পর্ব্ব-সংগ্রহাধ্যায় | |
| পৌষ্য পর্ব্বাধ্যায় | |
| পৌলোম পর্ব্বাধ্যায় |
অনুক্রমণিকাধ্যায়
কোন সময়ে নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনক দ্বাদশবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। একদা মহর্ষিগণ দৈনন্দিন কৰ্ম্ম সমাধান করত, সকলে সমবেত হইয়া কথাপ্রসঙ্গে সুখে অধ্যাসীন হইয়া আছেন, ইত্যবসরে লোমহর্ষণপুত্র পৌরাণিক পুরাণশাস্ত্রজ্ঞ সৌতি অতি বিনীতভাবে তথায় সমুপস্থিত হইলেন। নৈমিষা-রণ্যবাসী ঋষিগণ তাঁহাকে অভ্যাগত দেখিয়া অত্যাশ্চর্য্য কথা শ্রবণ করিবার নিমিত্ত চতুৰ্দ্দিক বেষ্টন করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। উগ্রশ্রবাঃ সৌতি কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাদিগকে অভিবাদন করিয়া তপস্যার কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহারাও অতিথির যথোচিত পূজা করিয়া বসিবার নিমিত্ত আসন প্রদান করত আপনারাও যথাস্থানে উপবেশন করিলেন। অনন্তর সৌতি নিৰ্দ্দিষ্ট স্থানে উপবিষ্ট হইলে ঋষিরা তাঁহাকে বিশ্রান্ত দেখিয়া কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন-হে কমললোচন সূতনন্দন! এখন কোথা হইতে আসিতেছ এবং এতকাল কোন্ কোন্ স্থানেই বা পর্যটন করিলে তাহা আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বল। সৌতি এরূপ জিজ্ঞাসিত হইলে অতি শান্তপ্রকৃতি ঋষিদিগের সমক্ষে কহিতে লাগিলেন, হে মহর্ষিগণ! আমি মহাত্মা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে গমন করিয়াছিলাম। তথায় বৈশম্পায়নমুখে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন প্রোক্ত মহাভারতীয় কথা শ্রবণ করিলাম। অনন্তর তথা হইতে প্রস্থান করিয়া বহুবিধ তীর্থ দর্শন ও অনেক আশ্রমে ভ্রমণ করত পরিশেষে সমন্তপঞ্চক তীর্থে উপস্থিত হইলাম-পূর্ব্বে যথায় কুরু ও পাণ্ডব এবং উভয় পক্ষীয় ভূপালদিগের তুমুল সংগ্রাম হইয়াছিল। তথা হইতে আপনাদিগের দর্শনার্থে এই পবিত্র আশ্রমে আসিয়াছি, যেহেতু আপনারা আমার পক্ষে সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ। হে তেজস্বিন্ ঋষিগণ! আপনারা যজ্ঞে আহুতি প্রদান করিয়া অতি পূতমনে আসনে উপবেশন করিয়া আছেন, অনুমতি করুন, ধর্মসম্বন্ধীয় পৌরাণিকী কথা কি ভূপতিদিগের ইতিবৃত্ত বা ঋষিদিগের ইতিহাস ইহার মধ্যে কি বর্ণন করিব? ঋষিগণ কহিলেন, ভগবান্ বেদব্যাস যে ইতিহাস কহিয়াছেন, সুরগণ ও ব্রহ্মহ্মর্ষিগণ যাহা শ্রবণ করিয়া অশেষ প্রশংসা করেন, এবং বৈশম্পায়ন সর্পযজ্ঞে জনমেজয়ের নিকট যাহা কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, আমরা সেই ইতিহাস শ্রবণ করিতে সাতিশয় অভিলাষ করি, কারণ যাহা সকল উপাখ্যান হইতে শ্রেষ্ঠ ও নানাশাস্ত্রের সার সঙ্কলন করিয়া রচিত ও বেদচতুষ্টয়ের অনুগত হইয়াছে এবং যাহাতে আত্মতত্ত্ববিষয়ক সম্যক্ মীমাংসা আছে, তাহা শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে শ্রবণ করিলে পাপভয়ের নিবারণ হয়। ঋষিগণের প্রার্থনাবাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, যিনি এই অখণ্ড প্রকাণ্ড ব্রহ্মাণ্ডের আদিপুরুষ ও অদ্বিতীয় অধীশ্বর, যিনি স্থাবর জঙ্গম সকলের স্রষ্টা ও পাতা' [পালনকর্তা], শাস্ত্রে যাহাকে একমাত্র পরব্রহ্ম বলিয়া নির্দেশ করে, যাঁহার প্রীতির নিমিত্ত কেহ প্রজ্বলিত হুতাশনে মন্ত্রোচ্চারণ পূর্ব্বক বারংবার আহুতি প্রদান করিতেছেন, যাঁহার সাক্ষাৎকার লাভ প্রত্যাশায় কেহ বা শত শত বৎসর নির্জনে একান্তমনে ধ্যান, মনন ও অতি কঠোর ব্রতাদির অনুষ্ঠান করিতেছেন, কেহ বা মায়াপ্রপঞ্চ স্বরূপ সংসারে বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া যাঁহার উপাসনার নিমিত্ত আত্মীয়-স্বজন সকলকেই বিসর্জন করিয়া অরণ্যে অরণ্যে ভ্রমণ করিতেছেন, এইরূপে যাঁহাকে লাভ করিবার নিমিত্ত এই পৃথিবীস্থ সমস্ত লোকেই অতি দুষ্কর কর্ম্মে হস্তক্ষেপণ করিতেছে, সেই অনাদি, অনন্ত, অভিলষিত-ফলদাতা, বিশ্বপাতা', চরাচরগুরু হরির চরণে প্রণিপাত করিয়া বেদব্যাস-প্রণীত অতি পবিত্র বিচিত্র ইতিহাস বর্ণন করিব। এই বিশাল মহীতলে কত শত মহাত্মা ঐ ইতিহাস কহিয়া গিয়াছেন, অনেকেই কহিতেছেন এবং ভবিষ্যৎ কালেও কহিবেন। ব্রাহ্মণেরা বহুকষ্টে ও অভিনিবিষ্টচিত্তে সংক্ষেপে বা সবিস্তার যে বেদ অধ্যয়ন করিয়া থাকেন, যাহা জ্ঞানের একমাত্র সীমা, সেই বেদশাস্ত্রের অনুগত করিয়া এই ইতিহাস, মহাত্মা বেদব্যাস-কর্তৃক বিরচিত হইয়াছে। ইহাতে শাস্ত্রের মত ও লৌকিক আচার-ব্যবহারের রীতি-নীতি স্পষ্টরূপে নির্দিষ্ট আছে। ইহা নানা সুচারু শব্দ ও রমণীয়ভাবে পরিপূর্ণ এবং নানাপ্রকার ছন্দোবদ্ধে নিবদ্ধ ও অলঙ্কৃত হইয়াছে। এই নিমিত্ত পণ্ডিতমণ্ডলী মহাভারতের সবিশেষ সমাদর করিয়া থাকেন।
প্রথমতঃ এই বিশ্বসংসার কেবল ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত ছিল। অনন্তর সমস্ত বস্তুর বীজভূত এক অণ্ড প্রসূত হইল। ঐ অণ্ডে অনাদি অনন্ত অচিন্তনীয় অনির্বচনীয় সত্য-স্বরূপ নিরাকার নির্বিকার জ্যোতির্ময় ব্রহ্মা প্রবিষ্ট হইলেন। অনন্তর ঐ অণ্ডে ভগবান্ প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং জন্মপরিগ্রহ করিলেন। তৎপরে স্থাণু, স্বায়ভুব মনু, দশ প্রচেতাঃ, দক্ষ, দক্ষের সপ্ত পুত্র, সপ্তর্ষি, চতুৰ্দ্দশ মনু জন্ম লাভ করেন। মহর্ষিগণ একতানমনে যাঁহার গুণকীর্ত্তন করিয়া থাকেন, সেই অপ্রমেয়' পুরুষ, দশ বিশ্বদেব, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, যক্ষ, সাধুগণ, পিশাচ, গুহ্যক এবং পিতৃগণ উৎপন্ন হইলেন। অনন্তর অনেকানেক বিদ্বান্ মহর্ষি ও রাজর্ষিগণ উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে জল, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, দশদিক্, সংবৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, রাত্রি ও অন্যান্য সমস্ত বস্তু ক্রমশঃ সঞ্জাত হইল। কিন্তু প্রলয়কাল উপস্থিত হইলে এই বিশাল বিশ্বসংসার সমুদায়ই সেই একমাত্র পরব্রহ্মে লীন হইবে, আর কোন চিহ্নই থাকিবে না। যাদৃশ, কোন ঋতুর পর্যায়কালে সমুদায় ঋতুলক্ষণ একৈকশঃ পরিদৃশ্যমান হয়, তাদৃশ, যুগ-প্রারম্ভে জীব, জন্তু ও অন্যান্য সমস্ত পদার্থই স্ব স্ব আকার ও স্বভাব পরিগ্রহ করে। একবার প্রলয়, পুনর্ব্বার উৎপত্তি ও স্থিতি এইরূপে সংসারচক্র নিরবচ্ছিন্ন ঘূর্ণ্যমান হইতেছে।
ত্রয়স্ত্রিংশৎ সহস্র, ত্রয়স্ত্রিংশৎ শত ও ত্রয়স্ত্রিংশৎ সংখ্যক দেবতাগণ সংক্ষেপে সৃষ্ট হইলেন। বৃহদ্ভানু, চক্ষু, আত্মা, বিভাবসু, সবিতা, ঝচীক, অর্ক, ভানু, আশাবহ, রবি, মহ্য, এই কয়েকটি দিবের পুত্র। মহ্যের পুত্র দেবভ্রাট ও সুভ্রাট। সুভ্রাটের তিন পুত্র, দশজ্যোতি, শতজ্যোতি ও সহস্রজ্যোতি। মহাত্মা দশজ্যোতির দশ সহস্র পুত্র জন্মে। শতজ্যোতির তাহা অপেক্ষা দশগুণ এবং সহস্রজ্যোতির শতজ্যোতি অপেক্ষা দশগুণ পুত্র হয়। এই সকল হইতে কুরুবংশ, যদুবংশ, ভরতবংশ, যযাতিবংশ ও ইক্ষবাকুবংশ এবং অন্যান্য প্রভূত রাজর্ষিবংশ সম্ভূত হয়।
যে সকল জীব সৃষ্ট হইল, তাহাদিগের অবস্থিতি স্থান, ত্রিবিধ রহস্য, চারি বেদ, যোগশাস্ত্র, বিজ্ঞান শাস্ত্র, ধর্মার্থ-কামপ্রতিপাদক বিবিধ শাস্ত্র, লোকযাত্রাবিধান এই সমস্ত মহাত্মা বেদব্যাস যোগবলে অবগত ছিলেন। এই মহাভারতে অশেষ ইতিহাস ও বেদপ্রতিপাদ্য সনাতন ধর্ম এবং তত্ত্বজ্ঞান বিস্তরতঃ | ও সংক্ষেপতঃ কথিত আছে। কোন কোন কৃতবিদ্য ব্রাহ্মণ মহাভারতের প্রথমাবধি, কেহ বা আস্তীক পর্ব্বাবধি, কেহ বা উপরিচর রাজার উপাখ্যানাবধি আরম্ভ বিবেচনা করিয়া পাঠ করিয়া থাকেন; কেহ কেহ ইহার নিগূঢ় মর্ম্ম বিশেষ অনুধাবন করিয়া সুপ্রচার করেন। কেহ মহাভারতের ব্যাখ্যা করিতে সক্ষম, কেহ বা ইহার ধারণায় [কণ্ঠস্থকরণে] সুনিপুণ। সত্যবতীসুত ব্যাসদেব তপোবলে সনাতন বেদশাস্ত্রের সারোদ্ধার করিয়া এই পবিত্র ইতিহাস রচনা করেন। রচনা করিয়া কি প্রকারে শিষ্যদিগকে অধ্যয়ন করাইবেন এরূপ মনে মনে চিন্তা করিতেছেন, ইত্যবসরে সর্ব্বজ্ঞ সর্ব্বশক্তিমান্ ভগবান্ প্রজাপতি ব্রহ্মা সত্যবতীতনয়ের চিন্তার বিষয় জানিতে পারিয়া তাঁহার প্রীতিবন্ধন ও লোকের হিতসাধনের নিমিত্ত তথায় আবির্ভূত হইলেন। ব্যাসদেব তাঁহার দর্শনমাত্র অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করত তাঁহাকে বসিবার নিমিত্ত এক আসন প্রদান করিয়া অতি বিনীতভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন। হিরণ্যগর্ন্ত আসন পরিগ্রহ করিয়া তাঁহাকে বসিতে অনুমতি করিলে, বেদব্যাস তাঁহার আসনের সন্নিধানে অতি প্রীতমনে ও প্রফুল্লনয়নে উপবেশন করত সবিনয়ে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমি এক অদ্ভুত কাব্য রচনা করিয়াছি, তাহাতে বেদ, বেদাঙ্গ, উনসিৎ এই সকলের সারসঙ্কলন, ইতিহাস ও পুরাণের অনুসরণ ও ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান কালত্রয়ের সম্যক্ নিরূপণ করিয়াছি এবং জরা, মৃত্যু, ভয়, ব্যাধি, ভাব, অভাব, ইহার নির্ণয়, বিবিধ ধর্ম ও আশ্রম লক্ষণের নিদর্শন, চাতুর্ব্বণ্যবিধান, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র, তারা ইহাদিগের বিবরণ করিয়াছি। ভূতভাবন ভগবান্ যে নিমিত্ত দিব্য ও মনুষ্যাকারে জন্ম স্বীকার করেন, তাহার তত্ত্বানুসন্ধান, অতি পবিত্র পুণ্যক্ষেত্র ও তীর্থস্থান ইহারও কীর্ত্তন করিয়াছি। নদ, নদী, সমুদ্র, পর্ব্বত, গ্রাম, নগর, বন, উপবন, ইহাদের যথাস্থানে সংস্থান এবং যুদ্ধকৌশল, জাতিবিশেষ, লোকযাত্রাবিধান এই সকলেরও সুস্পষ্ট নিরূপণ করিয়াছি। কিন্তু এই বিশাল বিশ্ব-ক্ষেত্রে এক জনকেও ইহার উপযুক্ত লেখক দেখিতেছি না।
ব্রহ্মা তাঁহার অভিমত বিষয় অবগত হইয়া কহিলেন, বৎস! এই ভূমণ্ডলে অনেকানেক মহানুভব মুনি আছেন, কিন্তু তুমি তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন বলিয়া ঐ সকল অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। তুমি জন্মাবধি সত্য বৈ কখন মিথ্যা ব্যবহার কর নাই এবং সর্ব্বদা ব্রহ্মবাদিনী বাণী মুখে উচ্চারণ করিয়া থাক; এক্ষণে যখন স্বপ্রণীত মহাভারতকে কাব্য বলিয়া নির্দেশ করিলে, সুতরাং এই গ্রন্থ কাব্য বলিয়া পরিগণিত ও প্রখ্যাত হইবে। যাদৃশ অপরাপর আশ্রম হইতে গৃহস্থাশ্রম শ্রেষ্ঠ, তাদৃশ তোমার এই কাব্য অন্যান্য কবির কাব্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট হইবে সন্দেহ নাই। অতএব এক্ষণে গণেশকে স্মরণ কর, তিনি তোমার লেখক হইবেন। এই কথা বলিয়া ব্রহ্মা অন্তর্হিত হইলে ভগবান্ সত্যবতীসুত গণেশকে স্মরণ করিলেন। গণপতি স্মৃতিমাত্রেই তথায় উপস্থিত হইলে ব্যাসদেব ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে তাঁহার যথোচিত সৎকার ও আসন প্রদান করিয়া কহিলেন, হে গণনায়ক! মনঃসংকল্পিত মহাভারতাখ্য গ্রন্থ আমি অবিকল বলিতেছি আপনি তাহার লেখক হউন। বিঘ্ননাশক গণেশ বেদব্যাসের এই কথা শুনিয়া কহিলেন, মুনে! যদি লিখিতে লেখনী ক্ষণমাত্র বিশ্রাম লাভ না করে, তাহা হইলে আমি আপনার লেখক হইতে পারি। ব্যাসদেব কহিলেন, হে বিঘ্ননাশক! কিন্তু আমি যাহা বলিব তাহার যথার্থ অর্থবোধ না করিয়া আপনিও লিখিতে পারিবেন না। গণাধিপতি তাহাতেই সম্মতি প্রদান করিলেন। এই কারণে ব্যাস স্থানে স্থানে গ্রন্থগ্রন্থি স্বরূপ কূটশ্লোক রচনা করিয়াছেন এবং তদ্বিষয়ে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া কহেন যে, এই ভারত গ্রন্থে অষ্টসহস্র ও অষ্টশত এরূপ শ্লোক আছে যে, তাহার ভাবার্থ সঙ্কলন করিতে কেবল আমি ও শুক পারি। সঞ্জয় পারেন কি না সন্দেহস্থল। অস্পষ্ট বলিয়া ঐ ব্যাসকূটের অদ্যাপি কেহ অর্থ করিতে পারেন না।
অধিক কি, গণেশ সর্ব্বজ্ঞ হইলেও লিখিবার সময় সেই সকল শ্লোকের অর্থ বোধ করিবার নিমিত্ত ক্ষণকাল চিন্তিত হইতেন। ইত্যবসরে ব্যাসদেব বহুতর শ্লোক রচনা করিতেন।
প্রথমতঃ লোকসকল অজ্ঞানতিমিরে সমাচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু এই মহাভারত জ্ঞানাঞ্জনশলাকা-দ্বারা সেই মোহাবরণ উন্মোচন করিয়া তাহাদিগের নেত্রোন্মীলন করিয়া দিয়াছে এবং ভারতরূপ দিবাকর ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, সংক্ষেপে ও সবিস্তরে কীর্ত্তন করিয়া জীবলোকের মোহান্ধকার নিরাকরণ করিয়াছে। পুরাণরূপ পূর্ণচন্দ্র উদয় হইয়া শ্রুতিস্বরূপ জ্যোৎস্না প্রকাশ করিয়াছে। তদ্দ্বারা লোকের বুদ্ধিরূপ কুমুদ বিকাশ হইয়াছে। মোহতিমির নিরাশ করিয়া এই ইতিহাসস্বরূপ উজ্জ্বল প্রদীপ এই বিশাল বিশ্বরূপ বাসগৃহকে সুপ্রকাশ করিয়াছে।
এই মহাভারত একটি বৃক্ষস্বরূপ। সংগ্রহাধ্যায় ইহার বীজভূত, পৌলোম ও আস্তীক পর্ব্ব ইহার মূল, সম্ভবপর্ব্ব স্কন্ধ, সভা ও আরণ্য ইহার বিটঙ্ক' [পায়রার খোপ] আরণীপর্ব্ব পর্ব্বস্বরূপ, বিরাট্ ও উদ্যোগপর্ব্ব ইহার সার, ভীষ্মপর্ব্ব শাখা, দ্রোণপর্ব্ব পত্র, কর্ণপর্ব্ব পুষ্পস্বরূপ, শল্যপর্ব্ব সুগন্ধ, স্ত্রী ও ঐষীকপর্ব্ব ইহার সুশীতলছায়া, শান্তিপর্ব্ব ইহার মহাফল, অশ্বমেধ অমৃতরস, আশ্রমবাসিকপর্ব্ব ইহার আশ্রয়স্থান, শল্যপর্ব্ব এই বৃক্ষের অগ্রভাগ। যেমন মেঘ সকলের উপজীব্য, তাদৃশ এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ উত্তরকালে সকল কবিকুলের উপজীব্য হইবে। এক্ষণে ঐ ভারত মহাদ্রুমের সুস্বাদু ফল ও সুগন্ধি পুষ্পসমুদায় বলিব।
অতি পূর্ব্বকালে ভগবান্ বাদরায়ণি' জননী সত্যবতীর অনুমতিক্রমে এবং ধৰ্ম্মাত্মা ভীষ্মদেবের নিয়োগানুসারে বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে অগ্নিত্রয়প্রতিম অতি বীৰ্য্যবান্ তিন সন্তান উৎপাদন করেন। ঐ পুত্রত্রয়ের নাম, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর। মহর্ষি ইঁহাদিগকে উৎপাদন করিয়া পুনর্ব্বার তপস্যার নিমিত্ত আশ্রমে প্রস্থান করিয়াছিলেন। অনন্তর ঐ তিন পুত্র জরাগ্রস্ত হইয়া লোকান্তরে গমন করিলে, মহর্ষি নরলোকে এই পবিত্র ভারত সুপ্রচার করেন। পরে ব্যাসদেব সর্পসত্রকালে রাজা জনমেজয় ও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক প্রার্থিত হইয়া, স্বশিষ্য বৈশম্পায়নকে ভারত কহিতে অনুমতি করেন। বৈশম্পায়ন আহ্নিককৰ্ম্ম সমাধানান্তে সেই মহতী সভায় উপবেশন করিয়া ভারত কীর্ত্তন করিতে লাগিলেন।
কুরু বংশীয়দিগের ইতিবৃত্ত, গান্ধারীর ধর্ম্মশীলতা, বিদুরের বুদ্ধি, কুন্তীর ধৈর্য্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবদিগের সরলতা, ধার্তরাষ্ট্রদিগের দুর্বৃত্ততা, স্বগ্রন্থে দ্বৈপায়ন এই সকল অবিকল বর্ণন করিয়া গিয়াছেন। ভারতসংহিতা প্রথমতঃ চতুর্বিংশতি সহস্র শ্লোকে বিরচিত হয়। তাহাতে উপাখ্যান ভাগ এককালে পরিত্যক্ত হইয়াছিল। পরিশেষে মহর্ষি সার্দ্ধশত-শ্লোকময়ী অনুক্রমণিকায় ভারতীয় নিখিল বৃত্তান্তের সারসঙ্কলন করিলেন।
বেদব্যাস এই মহাভারত প্রস্তুত করিয়াই সর্ব্বাগ্রে স্বীয় পুত্র শুকদেবকে অধ্যয়ন করান। পরে অনুরূপ শিষ্যমণ্ডলীতে তাহা বিতরণ করেন। অনন্তর ষষ্টিলক্ষ শ্লোকাত্মক অন্য এক ভারতসংহিতা রচনা করিয়াছিলেন। ঐ যষ্টিলক্ষের মধ্যে ত্রিংশৎ লক্ষ দেবলোকে, পিতৃলোকে পঞ্চদশ, গন্ধর্ব্বলোকে চতুর্দশ এবং নরলোকে একশত সহস্র শ্লোক অদ্যাপি বর্তমান আছে। নারদ দেবলোকে মহাভারত সুপ্রচার করেন। অসিত ও দেবল পিতৃলোকে ও শুকদেব গন্ধর্ব্ব, যক্ষ ও রাক্ষসদিগকে শ্রবণ করান, এবং ব্যাসদেবের শিষ্য বৈশম্পায়ন মনুষ্যলোকে ভারত কীর্তন করেন। হে ঋষিগণ। এক্ষণে আমি আপনাদিগের সমক্ষে তাহাই কহিব।
বক্ষ্যমাণ মহাভারতের দুর্য্যোধন ক্রোধময় মহাবৃক্ষ, কর্ণ তাহার স্কন্ধ, শকুনি শাখাস্বরূপ, দুঃশাসন ফল ও পুষ্প, মনস্বী' রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাহার মূল। যুধিষ্ঠির ধর্ম্মময় মহাবৃক্ষ, অর্জুন স্কন্ধ, ভীমসেন তাহার শাখা, মাদ্রীসুত নকুল-সহদেব তাহার পুষ্প ও ফল এবং কৃষ্ণ, ব্রহ্ম ও ব্রাহ্মণগণ তাহার মূল।
রাজা পাণ্ডু বুদ্ধি ও বিক্রমপ্রভাবে নানাদেশ অধিকার করিয়া অবশেষে বনবাসী ঋষিদিগের সহিত অরণ্যে মৃগয়ারস পরবশ হইয়া কালযাপন করিতে লাগিলেন। একদা মৃগয়াকালে সম্ভোগাসক্ত একটি মৃগকে লক্ষ্য করিয়া শরক্ষেপ করিলে ঐ মৃগ মৃত্যুকালে তাঁহাকে এইরূপে অভিশাপ দিল, মহারাজ। আপনি সম্ভোগসময়ে যেমন আমার প্রাণসংহার করিলেন, তাদৃশ আপনিও অতঃপর সম্ভোগসুখ অনুভব করিতে পারিবেন না। তাহা হইলে নিশ্চয়ই মৃত্যুমুখে নিপতিত হইবেন। সুতরাং তদ-বধি অনপত্যতা নিবন্ধন তিনি অত্যন্ত বিপদে অক্রান্ত হইলেন। অগত্যা ধৰ্ম্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারের ঔরসে পাণ্ডবদিগের জন্মলাভ হইল। কুন্তী ও মাদ্রী ঋষিদিগের সেই পরম পবিত্র আশ্রমে পাণ্ডবগণকে লালন-পালন করিতে লাগিলেন। অনন্তর ঋষিরা জটাবল্কলধারী পাণ্ডবদিগকে রাজধানীতে ধৃতরাষ্ট্রাদির নিকটে উপনীত করিয়া কহিলেন, ইহারা পাণ্ডুপুত্র, অরণ্যে আমাদিগের প্রযত্নে রক্ষিত ও পরিবর্দ্ধিত হইয়াছে, ইহারা আপনাদিগের পুত্র, মিত্র, শিষ্য, সুহৃৎ ও ভ্রাতা স্বরূপ, এই বলিয়া ঋষিরা সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। তাঁহারা পঞ্চপাণ্ডবকে এইরূপে সকলের পরিচিত করিয়া অন্তর্হিত হইলে কৌরব ও পুরবাসিগণ সহর্ষে সকলেই মহাকোলাহল করিতে লাগিল। তন্মধ্যে কেহ কহিল, ইহারা তাঁহার সন্তান নহে, কেহ কেহ কহিল, তাঁহারই বটে, কেহ কেহ বলিল, বহুকাল হইল পাণ্ডুরাজা লোকান্তরিত হইয়াছেন, সুতরাং ইহারা তাঁহার পুত্র, ইহাই বা কিপ্রকারে সম্ভবপর হইতে পারে। যাহা হউক, ভাগ্যক্রমে আমরা অদ্য পাণ্ডুরাজার সন্ততি দেখিলাম। এইরূপ কথাই সকল স্থানে লোকের মুখ হইতে নির্গত হইতে লাগিল। ঐ কোলাহল নিবৃত্ত হইলে আকাশবাণী হইল। পুষ্প-বর্ষণ-সহকারে সুগন্ধ সমীরণ সঞ্চরণ করিতে লাগিল। ফলতঃ পাণ্ডুপুত্রদিগের নগরপ্রবেশকালে এই সকল শুভলক্ষণ স্পষ্টই লক্ষিত হয়। পুরবাসিগণ এই সকল অদ্ভুত ব্যাপার দেখিয়া অতিশয় হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিল।
অনন্তর পাণ্ডবেরা নিখিল বেদ ও বিবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করত পূজিত ও প্রশংসিত হইয়া অকুতোভয়ে তথায় বাস করিতে লাগিলেন। যুধিষ্ঠিরের বিশুদ্ধ আচার ও ব্যবহারে, ভীমসেনের ধৈর্য্যে, অর্জুনের বিক্রমে, কুন্তীর গুরুশুশ্রূষায়, নকুল ও সহদেবের বিনয় ও শৌর্য্যগুণে প্রকৃতিরা' অতি প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছিলেন। অনন্তর অর্জুন সমাগত সমস্ত ভূপালসম্মুখে অতি অদ্ভুত ব্যাপার সমাধান করিয়া স্বয়ংবরা কন্যা দ্রৌপদীকে আনয়ন করিলেন। তদবধি অর্জুন সকল ধনুর্দ্ধারীদিগের মধ্যে পূজ্য হইলেন এবং সমরাঙ্গণে অবতীর্ণ হইলে প্রচণ্ড দিবাকরের ন্যায় নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য হইতেন। কেহই তাঁহার দুর্বিষহ বীর্য্য সহ্য করিতে পারিত না। মহাবীর অর্জুন নিজভুজবলে সমস্ত ভূপতিদিগকে পরাজয় করিয়া যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন।
অনন্তর যুধিষ্ঠির বাসুদেবের সৎপরামর্শে, ভীমসেন ও অর্জুনের বাহুবলে দুর্দান্ত জরাসন্ধ ও পরাক্রান্ত শিশুপালের বধ সাধন করিয়া দীনদুঃখীদিগকে অন্নদান ও যজ্ঞান্তে ব্রাহ্মণগণকে দক্ষিণাদান করিয়া নিরাপদে রাজসূয় মহাযজ্ঞ সমাপন করিলেন। দেশ দেশান্তর হইতে পাণ্ডবদিগের নিকট মণি, কাঞ্চন, গো, হস্তী, অশ্ব, বিচিত্র বসন, কম্বল, প্রাবার' আবরণ ও আস্তরণ, রাশি রাশি এই সকল উপঢৌকন আসিতে লাগিল। তখন পাণ্ডবদিগের অপেক্ষাকৃত উন্নতি ও সম্পত্তি দেখিয়া দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধনের মনোমধ্যে অত্যন্ত ঈর্ষা জন্মিল। বিশেষতঃ ময়দানব-নির্মিত পরমাশ্চর্য্য সভা দেখিয়া তিনি যথোচিত পরিতাপ পাইলেন। সভাপ্রবেশকালে জলে স্থল ও স্থলে জল ভ্রম হইলে, বাসুদেবের সমক্ষে, দুর্য্যোধন নিতান্ত নীচের ন্যায় ভীমকর্তৃক উপহসিত ও অপমানিত হওয়াতে অশেষ ভোগসুখসম্পন্ন হইলেও দিন দিন বিবর্ণ, কৃশ ও শ্রীভ্রষ্ট হইতে লাগিলেন। পুত্রবৎসল ধৃতরাষ্ট্র দুর্য্যোধনের অভিমত অবগত হইয়া তাঁহার মনোদুঃখ দূর করিবার নিমিত্ত দ্যূতক্রীড়ার অনুজ্ঞা দিলেন। ইহা শুনিয়া শ্রীকৃষ্ণের অন্তঃকরণে ক্রোধের সঞ্চার হইল। তাহাতে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেও বিবাদের অনুমোদন করিয়া দ্যুত প্রভৃতি দুর্নীতির উপেক্ষা করিলেন, তাহা নিবারণ করিবার কোন উপায় অবধারণ করিলেন না। সুতরাং বিদুর, ভীষ্ম, দ্রোণ ও কৃপাচার্য্যের অনভিমতে ক্ষত্রিয়বংশ ধ্বংস হইল।
মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদিগের বিজয়বার্তা শ্রবণ ও দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনির অভিমত বিষয় স্মরণ করিয়া সঞ্জয়কে কহিলেন, হে সঞ্জয়। আমি তোমাকে সমুদায় কহিতেছি, শ্রবণ কর। কিন্তু আমার কথা শুনিয়া সহসা অসূয়াপরবশ হইও না। দেখ, আমার জ্ঞাতিবিবাদে সম্মতি নাই এবং সমক্ষে কুলক্ষয় হয়, আমি তাহাতেও প্রীত নহি। আমার পুত্র ও পাণ্ডুর পুত্র বলিয়া অদ্যাবধি উভয় পক্ষে কোনরূপ বিভিন্নভাব প্রদর্শন করি নাই! তথাপি পুত্রেরা ক্রোধপরায়ণ হইয়া বৃদ্ধ বলিয়া আমাকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করে। আমি অন্ধ, সুতরাং পুত্রবৎসলতা-বশতঃ সকলই সহ্য করিয়া থাকি। দুর্য্যোধন বিমোহিত হইলে আমিও মোহে অভিভূত হই। দুর্য্যোধন মহানুভব পাণ্ডবদিগের রাজসূয় যজ্ঞে তাদৃশ সমৃদ্ধি দেখিয়া এবং সভাপ্রবেশকালে সেইরূপ উপহসিত হইয়া রুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হইল। ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া রণস্থলে পাণ্ডবদিগকে জয় করিতে অক্ষম ও সমস্ত রাজ্যসম্পত্তি আত্মসাৎ করিতে পরাম্মুখ হইয়া পরিশেষে গান্ধাররাজের পরামর্শ গ্রহণপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের সহিত কপট দ্যূতক্রীড়া করিয়া সাম্রাজ্য অধিকার কল্পনা করিল। হে সঞ্জয়। আমি সে বিষয়ের যাহা কিছু জানি, তাহা অবিকল কহিতেছি, শ্রবণ কর। তুমি গুণজ্ঞ, মেধাবী ও বুদ্ধিমান, সুতরাং যুক্তিসঙ্গত কথা শুনিয়া অবশ্যই আমার বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাইবে।
যখন শুনিলাম, অর্জুন ধনুর্গুণ আকর্ষণ করিয়া অসংখ্য রাজগণসমক্ষে লক্ষ্যভেদ করত তাহা ভূতলে পতিত ও দ্রৌপদীকে হরণ করিয়াছে, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, অর্জুন দ্বারকায় স্ববিক্রম-প্রভাবে সুভদ্রার পাণিগ্রহণ করিয়াছে, তথাপি বৃষ্ণিবংশাবতংস কৃষ্ণ এবং বলরাম তাদৃশ ঘৃণিত ও নিন্দিত কর্মে উপেক্ষা করিয়া পরমসখ্য-ভাবে ইন্দ্রপ্রস্থে আগমন করিয়াছেন, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, দেবরাজ ইন্দ্র, নিরবচ্ছিন্ন মুষলধারে বৃষ্টি করিতে লাগিলেন, কিন্তু অর্জুন তাহাতে কিছুমাত্র শঙ্কিত না হইয়া দিব্য শরজাল বিস্তার করত সেই বৃষ্টি নিবারণ করিয়া খাণ্ডবদাহে অগ্নিকে পরিতৃপ্ত করিয়াছে, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, কুন্তীর সহিত পঞ্চ-পাণ্ডব জতুগৃহের প্রজ্বলিত হুতাশন হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছে এবং অসামান্য ধী-শক্তিসম্পন্ন বিদুর তাহাদিগের অভীষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত যত্নবান্ আছে, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, ভীমসেন বাহুবলে বলদৃপ্ত মগধাধিপতি জরাসন্ধকে বধ করিয়াছে এবং দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে অনেকানেক ভূপতিদিগকে বশীভূত করিয়া রাজসূয় মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছে, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, একবস্ত্রা অশ্রুমুখী দুঃখিতা রজস্বলা দ্রৌপদীকে সনাথা হইলেও অনাথার ন্যায় সভায় আনয়ন করা হইয়াছে ও নিতান্ত নির্বোধ দুঃশাসন তাঁহার পরিধেয় বস্ত্র আকর্ষণ করিয়াছে, তথাপি ঐ দুষ্ট বিনষ্ট হয় নাই, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, শকুনি পাশক্রীড়া করিয়া যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত করিয়াছে, তথাপি শান্ত ও সুশীল ভ্রাতৃগণ তাঁহার অনুগতই আছে, তখন আর জয়ের আশা করি নাই। যখন বন-প্রস্থানকালে জ্যেষ্ঠভক্তিপরায়ণতা প্রযুক্ত পাণ্ডবদিগকে অশেষ ক্লেশ স্বীকারসহকারে বিবিধ হিতচেষ্টা করিতে শ্রবণ করিলাম এবং ভিক্ষোপজীবী মহাত্মা স্নাতক ব্রাহ্মণগণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অনুগত আছেন, তখন আর জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন কিরাতরূপী ভগবান্ মহাদেবকে যুদ্ধে প্রীত ও প্রসন্ন করিয়া পাশুপত মহাস্ত্র প্রাপ্ত হইয়াছে এবং স্বর্গে দেবরাজ ইন্দ্রের নিকট যথাবিধানে অস্ত্রশিক্ষা করিয়াছে, তখন আমি আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বরদান দৃপ্ত ও দেবতাদিগের অজেয় পুলোমাপুত্র কালকেয়দিগকে অর্জুন পরাজয় করিয়াছে এবং দুর্দান্ত দানবদল দমন করিবার নিমিত্ত ইন্দ্রলোকে গমন করিয়া কৃতকার্য্য হইয়া প্রত্যাগমন করিয়াছে, তদবধি আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীম ও অন্যান্য পাণ্ডবগণ, যথায় নরলোকের সঞ্চারমাত্র নাই, এইরূপ দুর্গমস্থানে গমন করিয়া কুবেরের সহিত সমাগত হইয়াছে, তখন আর আমার জয়াশা নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণের পরামর্শক্রমে ঘোষযাত্রাগত মৎপুত্রেরা গন্ধর্ব্বদ্বারা সংযত' ও অর্জুনকর্তৃক বিমোচিত হইয়াছে, তদবধি আমার আর জয়াশা নাই। যখন শুনিলাম, ধৰ্ম্ম স্বয়ং যক্ষের আকার স্বীকার করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, তদবধি আমি জয়াশায় নিরাশ হইয়াছি। যখন শুনিলাম, বিরাটনগরীতে দ্রৌপদীর সহিত পঞ্চপাণ্ডব প্রচ্ছন্ন-বেশে অজ্ঞাতবাস অবলম্বন করিয়াছে, কিন্তু আমার পুত্রেরা কিছুতেই তাহার অনুসন্ধান করিতে পারিল না, তদবধি আর আমি জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বিরাটরাজ স্বীয় কন্যা উত্তরাকে অলঙ্কৃতা করিয়া অর্জুনকে সম্প্রদান করিয়াছেন এবং অর্জুনও আপনার পুত্রের নিমিত্ত তাহাকে প্রতিগ্রহ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, নির্জিত, নির্ধন, নিষ্কাসিত ও স্বজনবহিষ্কৃত যুধিষ্ঠির সপ্ত অক্ষৌহিণী সেনা সংগ্রহ করিয়াছে, এবং বলিকে ছলিবার নিমিত্ত যিনি একপদে এই সম্পূর্ণ পৃথিবী অধিকার করিয়াছেন সেই ত্রিবিক্রম নারায়ণ তাহার বহুবিধ উদ্দেশ্য সংসাধন করিতেছেন, তদবধি আমি আর জয়াশা করি নাই। যখন নারদমুখে শুনিলাম, কৃষ্ণার্জুন সাক্ষাৎ নর-নারায়ণাবতার, তিনি ব্রহ্মলোকে তাঁহা-দিগকে নিরীক্ষণ করেন, তদবধি আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাসুদেব লোকের হিতসাধনের নিমিত্ত কুরুদিগের বিবাদভঞ্জন করিতে গমন করিয়া পরিশেষে চরিতার্থ না হইয়া প্রত্যাগত হইয়াছেন, তদবধি আর আমি জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ ও দুর্য্যোধন কৃষ্ণকে নিগ্রহ করিতে সচেষ্টিত আছে, কিন্তু তিনি আপনার বহুবিধ রূপ প্রদর্শন করিয়া তাহাদিগকে নিশ্চেষ্ট করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কৃষ্ণ প্রস্থানকালে নিতান্ত দীনা কুন্তীকে একাকিনী রথের সম্মুখে দণ্ডায়মানা দেখিয়া অশেষ সান্ত্বনাবাক্যে তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাসুদেব ও ভীষ্ম উভয়ে পাণ্ডবদিগের মন্ত্রী হইয়াছেন এবং দ্রোণাচার্য্য কায়মনোবাক্যে নিরবচ্ছিন্ন তাহাদিগের শুভানুধ্যান করিতেছেন তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাসুদেব ও ভীষ্ম উভয়ে পাণ্ডবদিগের মন্ত্রী হইয়াছেন এবং দ্রোণাচার্য্য কায়মনোবাক্যে নিরবচ্ছিন্ন তাহাদিগের - শুভানুধ্যান করিতেছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, "আপনি যুদ্ধ করিলে আমি যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব না" কর্ণ ভীষ্মদেবকে এই কথা কহিয়া সেনাধিকার পরিত্যাগ করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন বিষণ্ণ ও মোহাচ্ছন্ন হইলে কৃষ্ণ স্বশরীরে চতুৰ্দ্দশ ভুবন দর্শন করাইয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীষ্ম প্রতিদিন রণক্ষেত্রে দশ সহস্র লোকের প্রাণ সংহার করিলেও পাণ্ডবপক্ষীয় বিখ্যাত কোন এক ব্যক্তিকে বিনষ্ট করিতে পারেন নাই, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধৰ্ম্মপরায়ণ ভীষ্ম পাণ্ডবদিগের নিকট আপনার বধোপায় অবধারণ করিয়া দিয়াছেন এবং তাহারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া সেই বিষয় সংসাধন করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়া মহাবল-পরাক্রান্ত ভীষ্মকে নিতান্ত নিস্তেজ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীষ্মদেব মৎপক্ষীয় অসংখ্য লোককে বিনষ্ট ও অল্পাবশিষ্ট করত শত্রুদিগের সুতীক্ষ্ণ শরজালে বিদ্ধকলেবর হইয়া শরশয্যায় শায়িত হইয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ান হইয়া পিপাসাশান্তির নিমিত্ত পানীয় আনয়নার্থ অনুজ্ঞা করিলে অর্জুন ভূমিভেদ করিয়া তাঁহাকে পরিতৃপ্ত করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বায়ু, ইন্দ্র ও সূর্য্য ইঁহারা পাণ্ডবদিগের অনুকূল আছেন এবং দুরন্ত হিংস্রজন্তুগণ যাত্রাকালে আমাদিগকে নানাপ্রকারে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়া থাকে, তখন আর আমি জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বিচিত্রযোদ্ধা দ্রোণাচার্য্য যুদ্ধে নানাবিধ অস্ত্রপ্রয়োগনৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়া পাণ্ডবদিগের মধ্যে প্রধান এক ব্যক্তিকেও বিনষ্ট করিতে পারেন নাই, তখন আমি আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, মহারথ সংশপ্তকগণ, যাহারা অর্জুন বিনাশের নিমিত্ত ব্যবস্থিত হইয়াছিল, তাহারা তৎকর্তৃক নিহত হইয়াছে, তখন আর আমি জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণাচার্য্য অস্ত্রগ্রহণ করিয়া সতত সাবধানে সংরক্ষণ করিতেছেন, সেই দুর্ভেদ্য ব্যূহ ভেদ করত তন্মধ্যে অভিমন্যু অসহায় হইয়া সহসা প্রবেশ করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সপ্তরথী অর্জুন বিনাশে অসমর্থ হইয়া অল্পবয়স্ক বালক অভিমন্যুকে বধ করত পরম সন্তোষলাভ করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অভিমন্যুকে বিনষ্ট করিয়া ধার্তরাষ্ট্রেরা অতিশয় হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইলে অর্জুন রোষভরে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকে বিনাশ করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন শত্রুসমক্ষে জয়দ্রথকে বধ করিয়া অনায়াসে প্রতিজ্ঞাপাশ হইতে বিমুক্ত হইয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুনের অশ্বচতুষ্টয় একান্ত ক্লান্ত হইলে বাসুদেব বন্ধন উন্মোচন করত তাহাদিগকে জলপান করাইয়া পুনর্ব্বার রথে যোজনা করেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ ধনুর অগ্রদ্বারা ভীমসেনকে আকর্ষণ করিয়া যথোচিত তিরস্কার করিয়াছেন ও সে অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়া ভাগ্যবলে আপনার প্রাণরক্ষা করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণ, কৃতবর্মা, কূপ, কর্ণ, অশ্বথামা ও শল্য ইঁহারা প্রতীকারে পরাম্মুখ হইয়া সমক্ষে জয়দ্রথবধে উপেক্ষা করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দেবরাজদত্ত দিব্য-শক্তি কৃষ্ণের কৌশলে ঘোররূপী রাক্ষস ঘটোৎকচের বধনিমিত্ত প্রযুক্ত হইয়াছে [অর্থাৎ উহার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়াছে] তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ অর্জুনের বধসাধন করিবার নিমিত্ত যে একপুরুষঘাতিনী শক্তি রাখিয়াছিলেন, তাহা রাক্ষস ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধৃষ্টদ্যুম্ন যুদ্ধধর্ম্মের বিরুদ্ধ আচরণ করিয়া মরণে স্থিরনিশ্চয়, বিশস্ত্র ও রথস্থিত দ্রোণাচার্য্যের শিরচ্ছেদন করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্বত্থামার সম্মুখীন হইয়া মাদ্রীসুত নকুল অসংখ্যলোকসমক্ষে ঘোরতর দ্বৈরথ সংগ্রাম করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণবধে ক্রোধে অধীর হইয়া অশ্বত্থামা নারায়ণাস্ত্র পরিত্যাগ করিয়াও পাণ্ডবদিগের প্রধান এক ব্যক্তির প্রাণসংহার করিতে পারিলেন না, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীমসেন যুদ্ধে দুঃশাসনের রুধির পান করিয়াছে এবং দুর্য্যোধন প্রভৃতি অনেকেই তথায় সমুপস্থিত থাকিয়াও তাহা নিবারণ করিতে অক্ষম হইয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন অতি পরাক্রান্ত কর্ণকে সমরশায়ী করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অতি দুর্দ্ধর্ষ দুঃশাসন, মহাবীৰ্য্য কৃতবর্মী ও অশ্বত্থামাকে পরাজয় করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, যে শল্য বাসুদেবকে পরাজয় করিব বলিয়া সর্ব্বদা স্পর্দ্ধা করিত, যুদ্ধস্থলে যুধিষ্ঠির তাহার প্রাণনাশ করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সহদেব কলহ, দ্যূতক্রীড়া প্রভৃতি কতিপয় দুর্নীতির নিদান ও অতিমায়াবী প্রবল সৌবলকে (শকুনিকে) মৃত্যুমুখে প্রত্যর্পণ করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দুর্য্যোধন হতসৈন্য ও সহায়শূন্য হইয়া একাকী হ্রদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করত উহার জলস্তম্ভ করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দুর্য্যোধন গদাযুদ্ধে সবিশেষ নৈপুণ্য প্রদর্শন করিতেছিল, ইত্যবসরে ভীমসেন আপনার অনুরূপ বিক্রম প্রকাশ করিয়া তাহাকে সমরশায়ী করিয়াছে, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্বত্থামা প্রভৃতি কতিপয় বীরপুরুষেরা সমবেত হইয়া দ্রৌপদীর প্রসুপ্ত পুত্রপঞ্চক বিনাশ করত অতি ঘৃণিত ও নিন্দিত কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন "স্বস্তি” বলিয়া অস্ত্রদ্বারা অশ্বত্থামার অমোঘ ব্রহ্মশির অস্ত্র নিবারণ করিয়াছে এবং তাহার তুষ্টি সাধন করিবার নিমিত্ত অশ্বত্থামা ও মণিরত্ন পরিত্যাগ করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্বত্থামা মন্ত্রপূত অস্ত্র প্রয়োগ করিয়া উত্তরার গর্ত নাশ করেন, তদুপলক্ষ্যে দ্বৈপায়ন ও বাসুদেব উভয়ে তাহাকে অভিশাপ প্রদান করিয়াছেন, তখন আর জয়াশা করি নাই। এক্ষণে গান্ধারী পুত্র, পৌত্র, পিতা, ভ্রাতা প্রভৃতি সমুদায় আত্মীয় স্বজনের নিধনদশায় এতাদৃশ দুরবস্থায় পড়িয়াছেন এবং পাণ্ডবেরা অনায়াসে অতি দুষ্কর কার্য্যের সংসাধন করিয়া পরিশেষে রাজসিংহাসন অধিকার করিয়াছে, এক্ষণে আমাদিগের পক্ষীয় তিনটি ও পাণ্ডবদিগের সাতটি, সমুদায়ে দশজন অবশিষ্ট আছে। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা বিনষ্ট হইয়াছে, হে সঞ্জয়! সেই সমুদায় স্মরণ করিয়া আমি বারংবার মোহে অভিভূত হইতেছি, চারিদিক্ শূন্যময় ও জীবলোক শোকময় বলিয়া এক্ষণে প্রতীয়মান হইতেছে। আমার আর চেতনা নাই। মন বিহ্বল হইতেছে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্র এইরূপ বহুবিধ বিলাপ করিয়া সহসা মূর্ছিত হইলেন। অনন্তর চেতনা প্রাপ্ত হইয়া সঞ্জয়কে কহিলেন, হে সঞ্জয়। এক্ষণে এইরূপ দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া প্রাণধারণ করা অতি কাপুরুষের কর্ম্ম; বিশেষতঃ আমার জীবনের আর কোন প্রয়োজন দেখিতেছি না, সুতরাং এই অবস্থায় অবিলম্বে দেহ বিসর্জন করাই আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর। রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে নিতান্ত কাতর দেখিয়া সঞ্জয় কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! দ্বৈপায়ন ও নারদমুখে আপনি শুনিয়াছেন, শৈব্য, সৃঞ্জয়, সুহোত্র, রন্তিদেব, কাক্ষীবান্, ঔশিজ, বাহীক, দমন, শৰ্য্যাতি, অজিত, নল, বিশ্বামিত্র, অম্বরীষ, মরুত্ত, মনু, ইক্ষবাকু, গয়, ভরত, দাশরথি রাম, শশবিন্দু, ভগীরথ, কৃতবীর্য্য, শুভকৰ্ম্মা, যযাতি, ইঁহারা প্রখ্যাত রাজর্ষিবংশে প্রসূত হইয়া অলৌকিক যশঃ, অসামান্য কীর্ত্তি ও ধর্মযুদ্ধে জয়লাভ করিয়া পরিশেষে কালবশে এই সুখময় পৃথিবী হইতে অন্তর্হিত হইয়াছেন। পূর্ব্বকালে শৈব্য রাজা পুত্রশোকে কাতর হইলে মহর্ষি নারদ এই চতুর্বিংশতি উপাখ্যান তাঁহার সম্মুখে কীর্তন করেন। তদ্ভিন্ন পুরু, কুরু, যদু, শূর, বিশ্বগশ্ব, অণুহ, যুবনাশ্ব, ককুৎস্থ, রঘু, বিজয়, বীতিহোত্র, অঙ্গ, ভব, শ্বেত, বৃহদ্গুরু, উশীনর, শতরথ, কঙ্ক, দুলিদুহ, দ্রুম, দম্ভোদ্ভব, বেণ, সগর, সস্কৃতি, নিমি, অজেয়, পরশু, পুণ্ড্র, শম্ভু, দেবাব্ধ, দেবাহুয়, সুপ্রতিম, সুপ্রতীক, বৃহদ্রথ, সুক্রতু, নিষধাধিপতি নল, সত্যব্রত, শান্তভয়, সুমিত্র, সুবল, জানুজঙ্ঘ, অনরণ্য, অর্ক, বলবন্ধু, নিরামৰ্দ্দ প্রিয়ব্রত শুচিব্রত, কেতুশৃঙ্গ, বৃহদ্বল, ধৃষ্টকেতু, বৃহৎকেতু, দীপ্তকেতু, নিরাময়, কৃতবন্ধু, চপল, ধূর্ত্ত, দৃঢ়েষুধি, অবিক্ষিৎ, মহাপুরাণসম্ভাব্য, প্রত্যঙ্গ, পরহা; এই সকল ও অন্যান্য শত সহস্র সুপ্রসিদ্ধ মহীপাল ছিলেন। ইঁহারা অশেষ-ভোগ-সুখ বিসর্জন করিয়া নিধন দশায় নিপতিত হন। অনেকানেক সদ্বিদ্বান্ প্রধান কবিগণ, প্রাচীন ইতিহাস কহিবার সময় প্রসঙ্গক্রমে এই সকল বলবান্ রাজাদিগের অতুল বিক্রম, সমধিক যশঃ, মহাত্মতা, সরলতা, আস্তিক্য, সত্য, শৌচ ও দয়া এই সকল বিষয়ের ভূরি ভূরি নিদর্শন দিয়া থাকেন। তাঁহারা সর্ব্বগুণসম্পন্ন হইলেও পরিশেষে মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়াছেন, কিন্তু আপনার পুত্রেরা অতিশয় দুর্বৃত্ত, লুব্ধপ্রকৃতি ও রোষপরায়ণ ছিলেন, সুতরাং তাঁহাদিগের সংহারদশায় এইরূপ কাতর হওয়া সমুচিত নহে। বিশেষতঃ আপনি মেধাবী এবং আপনার বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ত শাস্ত্রানুগামিনী আছে, অতএব এইরূপ বিজ্ঞ ও গুণজ্ঞ হইয়া বারংবার শোকে আক্রান্ত ও অভিভূত হওয়া আপনার পক্ষে নিতান্ত নিষিদ্ধ ও অনুপযুক্ত। আপনি দৈবনিগ্রহ ও অনুগ্রহ উভয়ই বিদিত আছেন। যাহা ভবিতব্য, অতি সাবধানে থাকিলেও তাহা ঘটিয়া থাকে, সুতরাং তাহার অনুশোচনা করা অবিধেয়। এই জগতীতলে অদ্যাপি বুদ্ধিবলে কেহই দৈবের প্রতিকূলতাচরণ করিতে পারেন নাই। কারণ দৈবের অপরিবর্তনীয় নিয়ম অতিক্রম করা কাহারই সাধ্য নহে। ভাব ও অভাব, সুখ ও অসুখ সকলই কালবশে নিয়ত পরিভ্রমণ করিতেছে। কাল, সর্ব্বজীবের সৃষ্টি ও কালই তাহার সংহার করিয়া থাকেন, কাল সর্ব্বজীবের দাহ ও কালই তাহার শান্তি করেন। ইহকালে যে সকল শুভাশুভ উপস্থিত হয়, সে সমুদায় কাল-মূলক। প্রজার সৃষ্টি ও সংহার সকলই কালসহকারে ঘটিয়া থাকে, জীবলোক সকলই নিদ্রিত, এক-মাত্র কাল জাগরিত আছেন। কাল সর্ব্বত্র সর্ব্বভূতে সমভাবে অবস্থান করিতেছেন। যাহা অতিক্রান্ত বা অনাগত ও যে অবস্থা বর্তমান আছে, সকলই কালকৃত বিবেচনা করিয়া আপনার বিচেতন হওয়া সমুচিত নহে।
এইরূপ প্রবোধবাক্যে সঞ্জয় পুত্রশোক-সন্তপ্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত ও সুস্থচিত্ত করিলেন। ভগবান্ বেদব্যাস এই বিষয়ের এক পবিত্র উপনিষৎ কহিয়াছেন এবং অতি বিচক্ষণ কবিগণ ঐ উপনিষৎ পুরাণে কীর্তন করেন।
এই মহাভারত অধ্যয়ন করিলে পাপের নাশ ও পুণ্যের সঞ্চার হইয়া থাকে। অধিক কি, শ্লোকের এক চরণ উচ্চারণ করিলেও পাপভয়ের নিবারণ হয়। এই গ্রন্থে দেব, দেবর্ষি, ব্রহ্মর্ষি, যক্ষ ও রাক্ষস, ইহাদিগের বিচিত্র ইতিহাস বর্ণিত আছে। যিনি একমাত্র পবিত্র ও সত্যস্বরূপ নিত্যপরব্রহ্ম, পণ্ডিতেরা যাঁহার অদ্ভুত রচনার ঘোষণা করিয়া থাকেন, যিনি কার্য্য কারণ রূপ বিশ্বের নিয়ন্তা, যে অপ্রমেয় পুরুষের সুশাসন অস্খলিত ও অপ্রতিহত প্রভাবে বিদ্যমান থাকিয়া এই বিশাল বিশ্বের নিরবচ্ছিন্ন শুভসংসাধন করিতেছে, যিনি জন্মমৃত্যুরূপ দুর্ভেদ্য শৃঙ্খলে সংযত করিয়া সর্ব্বজীবের সৃষ্টি করিয়াছেন, ঋষিগণ যোগবলে আদর্শ'তলগত প্রতিবিম্বের ন্যায় অন্তরে যাঁহার বিশ্বরূপ সন্দর্শন করিয়া ভূমানন্দ' উপভোগ করেন, যাঁহার তুষ্টির নিমিত্ত নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ সকলই অনুষ্ঠিত হয়, সেই অনাদি, অনন্ত, ভূতভাবন, ভগবান্ বাসুদেবের সুচরিত এই গ্রন্থে সম্যরূপে কীর্ত্তিত আছে। ধৰ্ম্মপরায়ণ ও পরমশ্রদ্ধাবান্ নর, নিয়মপূর্ব্বক এই অধ্যায় পাঠ করিলে পাপ হইতে বিমুক্ত হয়েন। দুই সন্ধ্যা এই অনুক্রমণিকাধ্যায় পাঠ করিলে মনুষ্যেরা অহোরাত্র-সঞ্চিত পাপ হইতে অবশ্যই বিমুক্ত হয়। এই অধ্যায় ভারতের কলেবর, সত্য ও অমৃত উভয়ই ইহাতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। দধির মধ্যে নবনীত, দ্বিপদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বেদচতুষ্টয়ের মধ্যে আরণ্যক, ওষধির মধ্যে অমৃত, হ্রদের মধ্যে সমুদ্র, চতুষ্পদের মধ্যে ধেনু যাদৃশ শ্রেষ্ঠ, তাদৃশ ইতিহাসের মধ্যে বেদব্যাস-প্রণীত মহাভারত উৎকৃষ্ট। আস্তিক ব্যক্তিরা শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণগণকে ভারতসংহিতার অন্ততঃ এক চরণ শ্রবণ করাইলেও তাহার পিতৃলোক তদ্দত্ত অন্নপানে পরিতৃপ্ত হন। বিদ্বান্ ব্যক্তি কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত এই মহাভারত কহিয়া প্রচুর অর্থ লাভ করেন ও ভূণহত্যা প্রভৃতি অতি দুষ্কৃতি হইতে আশু বিমুক্ত হয়েন। যিনি প্রতি পর্ব্বাহে অতি পূতমনে ইহার কতিপয় অধ্যায় আবৃত্তি করেন, তিনি সমুদায় অধ্যয়ন না করিলেও তাহার সম্যক্ ফল লাভ করেন। যিনি শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে এই মহাভারতীয় শ্লোক শ্রবণ করেন, তিনি দীর্ঘ জীবন, মহীয়সী কীর্ত্তি ও অন্তে স্বর্গবাস লাভ করেন।
পূর্ব্বে দেবতারা একত্র সমবেত হইয়া তুলাযন্ত্রের এক-দিকে চারি বেদ ও অন্য দিকে এই ভারতসংহিতা রাখিলেন, কিন্তু পরিমাণকালে ভারতসংহিতা সরহস্য বেদচতুষ্টয় অপেক্ষা মহত্ত্ব ও ভারবত্ত্ব গুণে অধিক হইল, তদবধি দেবতারা ইহাকে মহাভারত বলিয়া নির্দেশ করিলেন। তপস্যার অনুষ্ঠান পাপ-জনক নহে, অধ্যয়নে পাপ নাই, জীবিকার নিমিত্ত ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করাও পাপাচার নহে। কিন্তু এ সকল ভাব দূষিত হইলেই পাপের সঞ্চার হয়।
পর্ব্ব-সংগ্রহাধ্যায়
ঋষিগণ কহিলেন, হে সূতনন্দন। আমরা ভারতের অনুক্রমণিকা শুনিলাম, এক্ষণে সমস্তপঞ্চক নামক যে তীর্থের উল্লেখ করিয়াছ, তাহার যাহা কিছু বর্ণনীয় আছে সমুদায় শ্রবণ করাইয়া আমাদিগকে চরিতার্থ কর। ঋষিদিগের এইরূপ প্রার্থনা-বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া অতি শিষ্টপ্রকৃতি সৌতি কহিতে লাগিলেন, হে ব্রাহ্মণগণ! আমি আপনাদিগের সম্মুখে সমস্তপঞ্চক তীর্থের বৃত্তান্ত ও অন্যান্য কথা প্রসঙ্গ-ক্রমে সমুদায় কীর্ত্তন করিতেছি, অবধান করুন। অদ্বিতীয় বীর পরশুরাম ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিতে পিতৃবধ-বার্তা শ্রবণ করত ক্রোধপরায়ণ হইয়া এই পৃথিবীকে একবিংশতিবার নিঃক্ষত্রিয়া করেন। তিনি স্ববিক্রম-প্রভাবে নিঃশেষে ক্ষত্রিয়কুল উৎসন্ন করিয়া সেই সমন্তপঞ্চকে শোণিতময় পঞ্চহ্রদ প্রস্তুত করেন। শুনিয়াছি, তিনি রোষপরবশ হইয়া সেই হ্রদের রুধিরদ্বারা পিতৃলোকের তর্পণ করিয়াছিলেন।
অনন্তর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ তথায় আগমন করিয়া পরশুরামকে কহিলেন, হে মহাভাগ রাম! তোমার এইরূপ অবিচলিত পিতৃভক্তি ও অসাধারণ বিক্রম দর্শনে আমরা অত্যন্ত প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে তুমি আপনার অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। রাম কহিলেন, হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষত্রিয় বংশ ধ্বংস করত যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং সেই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন। পিতৃগণ "তথাস্তু” বলিয়া পরশুরামের অভিমত বর প্রদান পূর্ব্বক সেইরূপ অধ্যবসায় হইতে তাঁহাকে ক্ষান্ত হইতে আদেশ করিলেন। তিনিও তদবধি ক্ষত্রিয়দিগের উপর আর কোনরূপ অত্যাচার করিলেন না।
সেই শোণিতময় পঞ্চ হ্রদের সন্নিধানে যে সকল প্রদেশ আছে, তাহাকেই পরমপবিত্র সমন্তপঞ্চক তীর্থ বলিয়া নির্দেশ করে। কারণ পণ্ডিতেরা কহেন, যে দেশ যে কোন বিশেষ চিহ্নে চিহ্নিত তাহা তন্নামেই প্রখ্যাত হইয়া থাকে। ঐ সমন্ত পঞ্চক তীর্থে কলি ও দ্বাপরের অন্তরে কুরু ও পাণ্ডবসৈন্যের ঘোরতর সংগ্রাম হইয়াছিল। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা যুদ্ধার্থে ভূদোষ-বর্জিত সেই পুণ্যক্ষেত্রে সমবেত ও নিহত হয়। হে ব্রাহ্মণগণ! ইহাই তাহার যথার্থ ব্যুৎপত্তিলভ্য অর্থ। সেই তীর্থ অতি পবিত্র ও রমণীয়। হে ধর্মপরায়ণ মহর্ষিগণ! ত্রিলোকে ঐ দেশ যেরূপ বিখ্যাত, তাহা আপনাদের সমক্ষে কহিলাম।
ঋষিগণ কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলে, আমরা তাহার অর্থ শুনিতে ইচ্ছা করি। কারণ তুমি সকলই জান; অতএব কত নর, কত হস্তী, কত অশ্ব ও কত রথে এক অক্ষৌহিণী হয়, তাহা সপ্রমাণ করিয়া বল। সৌতি কহিলেন, এক রথ, এক হস্তী, পঞ্চ পদাতি ও তিন অশ্ব, ইহাতে একটা পত্তি হয়। তিন পত্তিতে এক সেনামুখ; তিন সেনামুখে এক গুল্ম; তিন গুল্মে এক গণ; তিন গণে এক বাহিনী; তিন বাহিনীতে এক পৃতনা; তিন পৃতনায় এক চম্; তিন চমূতে এক অনীকিনী; দশ অনীকিনীতে এক অক্ষৌহিণী হয়। এক অক্ষৌহিণীতে এক বিংশতিসহস্র অষ্টশত ও সপ্ততিসংখ্যক রথ ও তৎসংখ্যক গজ, এক লক্ষ নয় সহস্র তিন শত পঞ্চাশ জন পদাতি এবং পঞ্চষষ্টিসহস্র, ছয় শত দশ অশ্ব থাকে। আমি যে অক্ষৌহিণী শব্দের উল্লেখ করিলাম সংখ্যাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তাহার এইরূপ নিরূপণ করিয়াছেন'। সমস্তপঞ্চক তীর্থে কুরু ও পাণ্ডবদিগের এইরূপ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা একত্র সমাগত হইয়াছিল। সেই সেনা কৌরব-দিগকে উপলক্ষ্য করিয়া কালের অদ্ভুত ও অচিন্তনীয় শক্তি-সহকারে তথায় মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়। তন্মধ্যে পরমাস্ত্রবেত্তা ভীষ্ম দশ দিবস যুদ্ধ করেন, দ্রোণ পাঁচ দিন কৌরবসেনা রক্ষা করিয়াছিলেন। পরবল-পীড়ক কর্ণ দুই দিবস ও শল্য অর্দ্ধদিবস মাত্র যুদ্ধ করেন। তৎপরে ভীমসেন ও দুর্য্যোধনের গদাযুদ্ধ আরম্ভ হয়; তাহাও দিবসার্দ্ধমাত্র। অনন্তর দিবসের অবসানে ও নিশার আগমন হইলে অশ্বত্থামা, কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্য সকলে একমত অবলম্বন করিয়া অসঙ্কুচিতচিত্তে সুখপ্রসুপ্ত যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণকে সংহার করিলেন।
হে শৌনক! আপনার যজ্ঞে যে ভারতাখ্য ইতিহাস কহিব, বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন, জনমেজয়ের সর্প-সত্রকালে তাহা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থের আরম্ভে পৌষ্য, পৌলোম ও আস্তীক পর্ব্বে মহানুভব ভূপালদিগের বিচিত্র চরিত্র সম্যক্ রূপে বর্ণিত আছে। ইহা বহুবিধ উপাখ্যান ও অনেকানেক লৌকিক আচার-ব্যবহারে পরিপূর্ণ। যাদৃশ, মোক্ষার্থীরা একমাত্র পারত্রিক শুভসঙ্কল্পে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন, তাদৃশ বিজ্ঞেরা মঙ্গল-লাভ-প্রত্যাশায় এই পবিত্র ইতিহাসের আশ্রয় লইয়া থাকেন। যেমন সমস্ত জ্ঞাতব্য বস্তুমধ্যে আত্মা ও সকল প্রিয়বস্তুমধ্যে প্রাণ শ্রেষ্ঠ পদার্থ, সেইরূপ এই গ্রন্থ সর্ব্বশাস্ত্র অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। যেমন অন্নপান ব্যতীত জীবন ধারণের আর উপায় নাই সেইরূপ এই ইতিহাস যে সকল সুললিত কথা প্রতিপন্ন করিতেছে, তদ্ব্যতিরিক্ত ভূমণ্ডলে আর কথা নাই। যেমন সৎকুলোদ্ভব প্রভুকে প্রভু-পরায়ণ ভৃত্যগণ অভ্যুদয় বাসনায় উপাসনা করে, সেইরূপ বুধগণ বিবিধ জ্ঞানলাভের অভিলাষে এই ভারত-সংহিতার সেবা করিয়া থাকেন। যেমন স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ, কি লৌকিক, কি বৈদিক সকল বাক্যকেই অধিকার করিয়া আছে, সেইরূপ এই অদ্ভুত ইতিহাসে বহু বিষয়ে শুভকরী বুদ্ধিবৃত্তি সমর্পিত হইয়াছে।
হে ঋষিগণ! এইক্ষণে বেদপ্রতিপাদ্য, সনাতন ধর্মে | অলঙ্কৃত অননুভূতপূর্ব্ব বিষয়ের মীমাংসাসহকৃত সুচারুরূপে বিরচিত ভারতের পর্ব্বসংগ্রহ বলিতেছি, আপনারা অবধান করুন। প্রথম, অনুক্রমণিকা পর্ব্ব, দ্বিতীয় সংগ্রহ পর্ব্ব, পরে পৌষ্য ও পৌলোম পর্ব্ব; তৎপরে আস্তীক ও বংশাবতরণ পর্ব্ব; তৎপরে পরমাশ্চর্য্য সম্ভব পর্ব্ব; তাহা শ্রবণ করিলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তৎপরে জতুগৃহদাহ; তৎপরে হিড়িম্ববধ; তৎপরে বক বধ; তৎপরে চৈত্ররথ পর্ব্ব; তৎপরে দেবী পাঞ্চালীর স্বয়ংবর-বৃত্তান্ত; তৎপরে বিবাহ; তৎপরে বিদুরাগমন ও রাজ্যলাভ পর্ব্ব, তৎপরে অর্জুনের অরণ্যবাস; তৎপরে সুভদ্রাহরণ; তৎপরে যৌতুকাহরণ পর্ব্ব; তৎপরে খাণ্ডবদাহ ও ময়দানবদর্শন; তৎপরে সভাপর্ব্ব; তৎপরে মন্ত্রপর্ব্ব, তৎপরে জরাসন্ধবধ; তৎপরে দিগ্বিজয় পর্ব্ব, দিগ্বিজয়ের পর যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞ, তৎপরে অ্যাভিহরণ; তৎপরে শিশুপালবধ; তৎপরে দ্যূত ও অনুদ্যুত পর্ব্ব; তৎপরে অরণ্য; তৎপরে কির্মীরবধ, তৎপরে অর্জুনের অভিগমন ও তৎপরে মহাদেব ও অর্জুনের যুদ্ধ; ইহাকে কিরাত পর্ব্ব বলিয়া নির্দেশ করে। তৎপরে ইন্দ্রলোেকাভিগমন; তৎপরে নলোপাখ্যান, ইহা শ্রবণ করিলে অশ্রুপাত হয়। তৎপরে যুধিষ্ঠিরের তীর্থযাত্রা পর্ব্ব; তৎপরে জটাসুরবধ পর্ব্ব, তৎপরে যক্ষযুদ্ধ; তৎপরে নিবাত কবচযুদ্ধ পর্ব্ব; তৎপরে অজগর পর্ব্ব; তৎপরে মার্কণ্ডেয় সমস্যা; তৎপরে দ্রৌপদী ও সত্যভামা সংবাদ; তৎপরে ঘোষযাত্রা; তৎপরে মৃগস্বপ্নোস্তব পর্ব্ব; তৎপরে ব্রীহিদ্রৌণিক উপাখ্যান পর্ব্ব; তৎপরে ঐন্দ্রদ্যুম্ন; তৎপরে দ্রৌপদীহরণ; তৎপরে জয়দ্রথ বিমোক্ষণ; তৎপরে রামচন্দ্রো-পাখ্যান; তৎপরে পতিব্রতা সাবিত্রীর অদ্ভুত মাহাত্ম্য বর্ণন; তৎপরে কুণ্ডলাহরণ; তৎপরে আরণেয়; তৎপরে বিরাটপর্ব্ব; তৎপরে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ ও সময় প্রতিপালন; তৎপরে কীচকবধ; তৎপরে গোগ্রহণ; তৎপরে অভিমন্যুর সহিত উত্তরার বিবাহ; তৎপরে উদ্যোগ; তৎপরে সঞ্জয়াগমন পর্ব্ব; অনন্তর ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তামূলক প্রজাগর পর্ব্ব; তৎপরে সনৎসুজাত পর্ব্ব; তৎপরে যানসন্ধি পর্ব্ব; তৎপরে কৃষ্ণের গমন; তৎপরে মালতীয় উপাখ্যান ও গালবচরিত; তৎপরে সাবিত্রীর উপাখ্যান, বামদেবোপাখ্যান, বৈণ্যোপাখ্যান ও জামদগ্ন্যোপাখ্যান; তৎপরে ষোড়শরাজিক পর্ব্ব; তৎপরে কৃষ্ণের সভাপ্রবেশ; তৎপরে বিদুলাপুত্রশাসন; তৎপরে সৈন্যোদ্যোগ ও শ্বেতাপাখ্যান পর্ব্ব; তৎপরে মন্ত্রনিশ্চয় করিয়া কার্য্য-চিন্তন; তৎপরে সেনাপতি নিয়োগোপাখ্যান; তৎপরে শ্বেত ও বাসুদেব সংবাদ; তৎপরে মহাত্মা কর্ণের বিবাদ; তৎপরে কুরুপাণ্ডবসেনা নির্যাণ; তৎপরে রথী ও অতিরণ সন্ধ্যা পর্ব্ব; অনন্তর অমর্যবিবর্দ্ধন উলুকদূতের আগমন; তৎপরে অম্বোপাখ্যান; তৎপরে অদ্ভুত ভীষ্মাভিষেক পর্ব্ব; তৎপরে জম্বুদ্বীপ-নির্মাণ পর্ব্ব; তৎপরে ভূমিপর্ব্ব; তৎপরে দ্বীপবিস্তার কথন পর্ব্ব; তৎপরে ভগবদ্গীতা পর্ব্ব; অনন্তর ভীষ্মবধ; তৎপরে দ্রোণাভিষেক; তৎপরে সংশপ্তক সৈন্যবধ; তৎপরে অভিমন্যুবধ পর্ব্ব; তৎপরে প্রতিজ্ঞা; তৎপরে জয়দ্রথবধ পর্ব্ব; তৎপরে ঘটোৎকচবধ; তৎপরে পরমাশ্চর্য্য দ্রোণবধ পর্ব্ব; তৎপরে নারায়ণাস্ত্র-প্রয়োগ পর্ব্ব।
অনন্তর কর্ণপর্ব্ব; তৎপরে শল্যপর্ব্ব; তৎপরে হ্রদপ্রবেশ ও গদাযুদ্ধ পর্ব্ব। অনন্তর সারস্বত ও তীর্থবংশানুকীৰ্ত্তন পর্ব্ব; তদনন্তর অতি বীভৎস সৌপ্তিকপর্ব্ব; অনন্তর দারণ ঐষীকপর্ব্ব; তৎপরে জলপ্রদানিক পর্ব্ব; তৎপরে স্ত্রীবিলাপ পর্ব্ব; তৎপরে ঔ দেহিক পর্ব্ব; তৎপরে ব্রাহ্মণরূপী চার্ব্বাক রাক্ষসের বধ পর্ব্ব; তৎপরে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অভিষেক পর্ব্ব; তৎপরে গৃহ-প্রবিভাগ পর্ব্ব। অনন্তর শান্তিপর্ব্ব; এই পর্ব্বে রাজধৰ্ম্ম, আপদ্ধৰ্ম্ম ও মোক্ষধর্ম কথিত আছে। তৎপরে শুক প্রশ্না-ভিগমন, তৎপরে ব্রহ্মহ্মপ্রশ্নানুশাসন, তৎপরে দুর্ব্বাসার প্রাদুর্ভাব ও মায়াসংবাদ পর্ব্ব; অনন্তর অনুশাসনপর্ব্ব; অনন্তর ভীষ্মের স্বর্গারোহণ পর্ব্ব; তৎপরে সর্ব্বপাপ-প্রণাশক আশ্বমেধপর্ব্ব; তৎপরে অধ্যাত্মবিদ্যাবিষয়ক অনুগীতা পর্ব্ব; তৎপরে আশ্রম-বাসিকপর্ব্ব; তৎপরে পুত্রদর্শন পর্ব্ব; তৎপরে নারদাগমন পর্ব্ব; তৎপরে অতিভীষণ মৌষলপর্ব্ব; তৎপরে মহাপ্রস্থানিক-পর্ব্ব; তৎপরে স্বর্গারোহণপর্ব্ব; অনন্তর খিলনামক হরিবংশ পর্ব্ব। এই পর্ব্বে বিষ্ণু পর্ব্ব, শিশুচর্য্যা, কংসবধ ও অতি অদ্ভুত ভবিষ্যপর্ব্ব কথিত আছে। এই শত পর্ব্ব মহাত্মা ব্যাসদেব কহিয়াছিলেন এবং নৈমিষারণ্যে যথাক্রমে লোমহর্ষণপুত্র সৌতি অষ্টাদশ পৰ্ব্ব কীর্ত্তন করেন। সংক্ষেপে এই মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ কহিলাম।
তন্মধ্যে পৌষ্য, পৌলোম, আস্তীক, আদিবংশাবতরণ, সম্ভব, জতুগৃহ, হিড়িম্ব ও বকবধ, চৈত্ররথ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর, বৈবাহিক, বিদুরাগমন, রাজ্যলাভ, অর্জুনের বনবাস, সুভদ্রা-হরণ, যৌতুকানয়ন, খাণ্ডবদাহ, ময়দানবদর্শন, এই সকল আদি পর্ব্বের অন্তর্গত। পৌষ্য পর্ব্বে উতঙ্কের মাহাত্ম্য ও পৌলোম পর্ব্বে ভৃগুবংশবিস্তার কথিত আছে। আস্তীকপর্ব্বে সর্পকুল ও গরুড়ের সম্ভব, 'ক্ষীর-সমুদ্র-মন্থন, উচ্চৈঃশ্রবার জন্ম, রাজা জনমেজয়ের সর্প-যজ্ঞানুষ্ঠান ও মহাত্মা ভরতবংশীয়দিগের চরিত্র কীর্ত্তিত আছে। সম্ভবপর্ব্বে অনেকানেক ভূপতিদিগের উৎপত্তি, অনেকানেক বীরপুরুষ ও মহর্ষি দ্বৈপায়নের জন্মবৃত্তান্ত এবং দেবতাদিগের অংশাবতারণ বর্ণিত আছে। দৈত্য, দানব, যক্ষ, সর্প, গন্ধর্ব্ব, পক্ষী ও অন্যান্য প্রাণীদিগের সমুদ্ভব। যাঁহার নামের অনুরূপে লোকে ভারতকুল বলিয়া প্রখ্যাত হইয়াছে, মহর্ষি কণ্ঠের আশ্রমে দুষ্মন্তের ঔরসে শকুন্তলার গর্বে সেই ভরতের জন্মলাভ। শান্তনুর আবাসে গঙ্গার গর্তে বসুদিগের পুনর্জন্ম ও তাহাদিগের স্বর্গে আরোহণ এবং তেজোংশের সম্পাত; ভীষ্মের সম্ভব এবং তাঁহার রাজ্য-পরিত্যাগ ও ব্রহ্মচর্য্য-ব্রতধারণ, প্রতিজ্ঞাপালন এবং ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদের রক্ষা, চিত্রাঙ্গদের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য্যের রক্ষাবিধান ও তাঁহার রাজ্যাধিকার; অণীমাণ্ডব্যের অভিশাপে, ধর্মের নরলোকের অংশে সম্ভব ও বরদানপ্রভাবে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে উৎপত্তি; ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও পাণ্ডবদিগের সম্ভব, বারণাবত প্রস্থানে দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা, পাণ্ডবদিগের প্রতি ধার্তরাষ্ট্রদিগের কূটপ্রেরণ, ধীমান্ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের হিতসাধন করিবার নিমিত্ত পথিমধ্যে তাঁহাকে ম্লেচ্ছ ভাষায় বিদুরের অশেষ উপদেশ, বিদুরের পরামর্শক্রমে অতিগোপনে সুরঙ্গনির্মাণ; রাত্রিকালে পঞ্চপুত্রের সহিত নিদ্রিতা নিষাদীকে জতুগৃহে পুরোচননামক স্নেচ্ছের সহিত দাহ, নিবিড় অরণ্যে পাণ্ডবদিগের হিড়িম্ব-দর্শন, মহাবল ভীমসেন হইতে হিড়িম্বের বধসাধন ও ঘটোৎকচের উৎপত্তি, মহাপ্রভাব মহর্ষি ব্যাসদেবের সন্দর্শন ও তাঁহার অনুমতিক্রমে একচক্রা নগরীতে এক ব্রাহ্মণের আবাসে ছদ্মবেশে অজ্ঞাতবাস অবলম্বন; বকবধে পুরবাসীদিগের বিস্ময়, দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্ম, ব্রাহ্মণ-সন্নিধানে দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করত স্বয়ংবর সভা-দিদৃক্ষা'ক্রান্ত চিত্ত হইয়া ব্যাসের আদেশে ও রমণীরত্বলাভের অভিলাষে পাঞ্চালদেশে পঞ্চপাণ্ডবদিগের গমন, গঙ্গাতীরে গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজয় করিয়া অর্জুনের তাহার সহিত পরমসখ্যভাব-সংস্থাপন ও তৎসমীপে তপস্বী, বশিষ্ঠ ও ঔর্ব্বের রমণীয় উপাখ্যান শ্রবণ ও ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জুনের পাঞ্চালদেশে গমন; তথায় সমাগত অসংখ্য ভূপালসমক্ষে লক্ষ্যভেদপূর্ব্বক ধনঞ্জয়ের দ্রৌপদীলাভ, ভীম ও অর্জুনকর্তৃক যুদ্ধে ক্রুদ্ধ রাজগণের সহিত শল্য ও কর্ণের পরাজয়, মহামতি অতি শিষ্ট-প্রকৃতি কৃষ্ণ ও বলরামের ভীমার্জুনের সেইরূপ অপ্রমেয় ও অমানুষ-সাহস-সন্দর্শনে পাণ্ডববোধে তাঁহাদিগের সহিত সমাগত হইবার বাসনায় পরশুরামের গৃহপ্রবেশ; পঞ্চভ্রাতার এক ভার্য্যা হইবে বলিয়া দ্রুপদের বিমর্ষ, এই স্থলে পরমাশ্চর্য্য পঞ্চেন্দ্রের উপাখ্যানের উল্লেখ; পাঞ্চালীর দৈববিহিত অমানুষ বিবাহ; পাণ্ডবদিগের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক বিদুর প্রেরণ; বিদুরের গমন ও কৃষ্ণের সন্দর্শন; পাণ্ডবদিগের খাণ্ডবপ্রস্থে বাস ও রাজ্যার্দ্ধের অধিকার; নারদের আদেশে পঞ্চপাণ্ডবদিগের দ্রৌপদীবিষয়ক নিয়ম সংস্থাপন; সুন্দোপসুন্দের ইতিহাস; অনন্তর দ্রৌপদীর সহিত একান্তে উপবিষ্ট যুধিষ্ঠিরের সন্নিকৃষ্ট হইয়া অর্জুনের অস্ত্রগ্রহণ ও ব্রাহ্মণের গোধন আহরণপূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা-প্রতিপালন জন্য অরণ্য-বাস এবং তৎকালে উলুপীনাম্নী নাগকন্যার সহিত পথিমধ্যে অর্জুনের সমাগম; পুণ্যতীর্থে গমন ও বহুবাহনের জন্ম এবং তথায় তপস্বী ব্রাহ্মণের অভিসম্পাতে গ্রাহ' যোনি প্রাপ্ত পঞ্চ অপ্সরার শাপমোচন; প্রভাস-তীর্থে কৃষ্ণের সহিত অর্জুনের সাক্ষাৎকারলাভ; কৃষ্ণের অভিমতে দ্বারকায় অর্জুনের সুভদ্রাপ্রাপ্তি; যৌতুক প্রদানের নিমিত্ত খাণ্ডবপ্রস্থে কৃষ্ণ প্রস্থিত হইলে পর সুভদ্রার গর্ন্তে অভিমন্যুর জন্ম; দ্রৌপদী-পুত্রের উৎপত্তি কীর্ত্তন; যমুনার জল-বিহারার্থে গমন করিলে কৃষ্ণার্জুনের চক্র ও ধনুঃলাভ; খাণ্ডবদাহ, প্রদীপ্ত অনলমধ্য হইতে ময়দানব ও ভুজঙ্গের পরিত্রাণ; মন্দপাল নামা মহর্ষির ঔরসে শাঙ্গীর গর্তে সুতোৎপত্তি, আদিপর্ব্বে এই সকল বর্ণিত অছে। বেদব্যাস এই পর্ব্বে দুই শত সপ্তবিংশতি সংখ্যক অধ্যায় কহিয়াছেন, তাহাতে অষ্ট সহস্র অষ্ট শত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করেন।
অনন্তর বহুবৃত্তান্তযুক্ত দ্বিতীয় সভাপর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। পাণ্ডবদিগের সভা নির্মাণ; কিঙ্কর দর্শন; দেবর্ষি নারদকর্তৃক ইন্দ্র প্রভৃতি লোকপালগণের সভাবর্ণন; রাজসূয় মহাযজ্ঞের আরম্ভ; জরাসন্ধবধ; গিরিব্রজে বিরুদ্ধ রাজগণের কৃষ্ণকর্তৃক বিমোচন; পাণ্ডবদিগের দিগ্বিজয়; ভূপালদিগের রাজসূয় যজ্ঞে আগমন, যজ্ঞে অর্ঘ্যদান প্রসঙ্গে শিশুপালের সহিত বিবাদ ও তাহার বধ, পাণ্ডবদিগের রাজসূয় যজ্ঞে তাদৃশ সমৃদ্ধি সন্দর্শন করিয়া দুর্য্যোধনের বিষাদ ও ঈর্ষা; ভীমকর্তৃক সভামধ্যে দুর্য্যোধনের প্রতি উপহাস ও তাহার ক্রোধ; তন্নিবন্ধন দ্যূতক্রীড়া; ধূর্ত শকুনিকর্তৃক দ্যূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয়; দ্যূতার্ণবমগ্না দুঃখিতা দ্রৌপদীর ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক উদ্ধার, দ্রৌপদীকে বিপদুত্তীর্ণা দেখিয়া দুর্য্যোধনের পুনর্ব্বার পাণ্ডবদিগের সহিত দ্যূতারম্ভ; দ্যুতে পরাজয় করিয়া তৎকর্তৃক পাণ্ডবদিগের বনপ্রেরণ; মহর্ষি বেদব্যাস সভাপর্ব্বে এই সকল বর্ণন করিয়াছেন। এই পর্ব্বে অষ্টসপ্ততি অধ্যায় এবং দ্বিসহস্র পঞ্চশত একাদশ শ্লোক আছে।
অনন্তর অরণ্য নামক তৃতীয় পর্ব্ব। মহাত্মা পাণ্ডবগণ বনপ্রস্থান করিলে পৌরজনকর্তৃক ধীমান যুধিষ্ঠিরের অনুগমন; ওষধি ও ব্রাহ্মণগণের ভরণপোষণের নিমিত্ত ধৌম্য মুনির উপদেশক্রমে যুধিষ্ঠিরের সূর্য্যারাধনা; সূর্য্যের অনুগ্রহে অন্নলাভ; ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক হিতবাদী বিদুরের পরিত্যাগ; বিদুরের পাণ্ডব-সমীপে গমন ও ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে পুনর্ব্বার তাঁহার নিকটে আগমন; কর্ণের উত্তেজনায় বনবাসী পাণ্ডবদিগকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত দুর্য্যোধনের মন্ত্রণা; তাহার দুষ্ট অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া ব্যাসের আগমন; ব্যাসকর্তৃক দুর্য্যোধনের বনগমন প্রতিষেধ; সুরভির উপাখ্যান; মৈত্রেয়ের আগমন; ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি মৈত্রেয়ের উপদেশ; মৈত্রেয়কর্তৃক রাজা দুর্য্যোধনের প্রতি শাপপ্রদান; ভীমকর্তৃক যুদ্ধে কির্মীর রাক্ষস বধ; শকুনি ছল প্রকাশ করিয়া দ্যূতে পাণ্ডবদিগকে পরাজয় করিয়াছে শুনিয়া পাঞ্চাল ও বৃষ্ণিবংশীয়দিগের আগমন; কৃষ্ণ অতিশয় রোষাবেশ প্রকাশ করিলে অর্জুনের সান্ত্বনা বাক্য; কৃষ্ণের নিকট দ্রৌপদীর বিলাপ; দুঃখার্তা দ্রৌপদীকে বাসুদেবের আশ্বাস দান; শৌভপতি শাল্বের বধ; সপুত্রা সুভদ্রাকে কৃষ্ণ কর্তৃক দ্বারকায় আনয়ন; ধৃষ্টদ্যুম্নকর্তৃক দ্রৌপদীর সন্তানগণকে পাঞ্চালনগর প্রাপণ; রমণীয় দ্বৈতবনে পাণ্ডবদিগের প্রবেশ; দ্রৌপদী ও ভীমসেনের সহিত দ্বৈতবনে যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন; পাণ্ডবদিগের সমীপে ব্যাসের আগমন, যুধিষ্ঠিরের ব্যাসদেব হইতে প্রতিস্মৃতি নামক বিদ্যালাভ; ব্যাস প্রতিগত হইলে পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে গমন; অমিততেজাঃ অর্জুনের অস্ত্রলাভ প্রত্যাশায় প্রবাসে গমন ও কিরাতরূপী দেবদেব মহাদেবের সহিত যুদ্ধ; ইন্দ্রাদি লোকপালের দর্শন ও অস্ত্রলাভ; অস্ত্রশিক্ষার্থে অর্জুনের ইন্দ্রলোকে গমন; পাণ্ডব-বৃত্তান্ত শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের বলবতী চিন্তা; মহানুভব মহর্ষি বৃহদশ্বের সন্দর্শন; দুঃখার্ত যুধিষ্ঠিরের বিলাপ; ধৰ্ম্মসঙ্গত ও করুণ-রসাশ্রিত নলো-পাখ্যান; যুধিষ্ঠিরের বৃহদশ্ব হইতে অক্ষহৃদয় নামক বিদ্যালাভ, পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গ হইতে লোমশ ঋষির আগমন; লোমশ কর্তৃক বনবাসগত মহাত্মা পাণ্ডবদিগের নিকট স্বর্গবাসী অর্জুনের বৃত্তান্ত কথন; অর্জুনের আদেশক্রমে পাণ্ডবদিগের তীর্থা-ভিগমন; তীর্থের ফলপ্রাপ্তি ও পাবনত্ব কীর্ত্তন; মহর্ষি নারদের পুলস্ত্যতীর্থে যাত্রা; পাণ্ডবদিগের তীর্থযাত্রা; কুণ্ডলদ্বয় প্রদানদ্বারা কর্ণের ইন্দ্রহস্ত হইতে বিমোচন; গয়াসুরের যজ্ঞবর্ণন; অগস্ত্যের উপাখ্যান ও বাতাপি ভক্ষণ; অপত্যোৎপাদনের নিমিত্ত মহর্ষির লোপামুদ্রা-পরিগ্রহ; কৌমার ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গের চরিত কীর্তন; প্রভূতপরাক্রম পরশুরামের চরিত্রবর্ণন; কার্তবীর্য্য ও হৈহয়-দিগের বধ; প্রভাসতীর্থে পাণ্ডবদিগের সহিত বৃষ্ণিবংশীয়দিগের সমাগম; সুকন্যার উপাখ্যান; শর্য্যাতিরাজার যজ্ঞে চ্যবনমুনি-কর্তৃক অশ্বিনীকুমারের সোমপান, অশ্বিনীকুমারকর্তৃক চ্যবনের যৌবন প্রতিপাদন; মান্ধাতার উপাখ্যান; জন্তু নামক রাজপুত্রের উপাখ্যান; শত পুত্রের অভিলাষে সোমক রাজার জন্তু নামক পুত্রের শিরশ্ছেদন; যজ্ঞানুষ্ঠান ও অভীষ্ট ফললাভ; শ্যেন-কপোতীয় উপাখ্যান; শিবিরাজার প্রতি ইন্দ্র ও অগ্নির ধর্ম জিজ্ঞাসা; অষ্টাবক্রোপাখ্যান; জনক যজ্ঞে মহর্ষি অষ্টাবক্রের সহিত বরুণাত্মজ নৈয়ায়িক বন্দির বিবাদ; মহাত্মা অষ্টাবক্রকর্তৃক বিবাদে বন্দির পরাজয় ও সাগরের অভ্যন্তরগত পিতার উদ্ধার; মহাত্মা যবক্রীত ও রৈভ্যের উপাখ্যান, গন্ধমাদনযাত্রা ও নারায়ণাশ্রমে বাস, পুষ্পানয়নার্থ দ্রৌপদীকর্তৃক ভীমসেনের নিয়োগ, পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে ভীমসেনের কদলীবনে হনুমান্ সন্দর্শন; কুসুমাবচয়ন করিবার নিমিত্ত সরোবরে অবগাহন, তথায় অতি ভীষণ রাক্ষসগণ ও মণিমান্ প্রভৃতি মহাবীর্য্য যক্ষদিগের সহিত যুদ্ধ, জটাসুর নামক রাক্ষস বধ, তথায় রাজর্ষি বৃষপর্ব্বার আগমন, আষ্টিষেণের আশ্রমে পাণ্ডব-দিগের গমন ও অবস্থান, দ্রৌপদী কর্তৃক ভীমসেনের উৎসাহ দান; ভীমের কৈলাস পর্ব্বতে আরোহণ ও মণিমান্ প্রমুখ যক্ষদিগের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ, পাণ্ডবদিগের সহিত বৈশ্রবণের সমাগম ও দিব্যাস্ত্র প্রাপ্ত হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জুনের সমাগম, হিরণ্যপুরবাসী নিবাতকবচগণ ও পুলোমাপুত্র কালকেয়দিগের সহিত অর্জুনের যুদ্ধ বর্ণন; তৎকর্তৃক কালকেয়দিগের রাজার প্রাণসংহার; ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সন্নিধানে অর্জুনের অস্ত্র সন্দর্শনের উদ্যম; দেবর্ষি নারদের তদ্বিষয়ে প্রতিষেধ; গন্ধমাদন হইতে পাণ্ডবদিগের অবরোহণ; গহনবনে ভুজগেন্দ্রকর্তৃক মহাবল ভীম গ্রহণ; প্রশ্নোত্তর প্রদান পূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের ভীমমোক্ষণ; মহাত্মা পাণ্ডবদিগের কাম্যকবনে পুনরাগমন; তথায় পাণ্ডবদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রত্যাশায় পুনর্ব্বার বাসুদেবের আগমন; মার্কণ্ডেয়সমস্যা; পৃথুরাজার উপাখ্যান; সরস্বতী ও মহর্ষি তার্থ্যের সংবাদ; মৎস্যোপাখ্যান; ইন্দ্রদ্যুম্নোপাখ্যান; ধুন্ধুমারোপাখ্যান; পতিব্রতো-পাখ্যান; অঙ্গিরা ঋষির উপাখ্যান; দ্রৌপদী ও সত্যভামা সংবাদ; পাণ্ডবদিগের দ্বৈতবনে পুনরাগমন; ঘোষযাত্রা; গন্ধর্ব্বদ্বারা দুর্য্যোধনের বন্ধন ও অর্জুনকর্তৃক বিমোচন; ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মৃগ-স্বপ্ন সন্দর্শন; রমণীয় কাম্যকবনে পুনর্গমন; অতি বিস্তীর্ণ ব্রীহিদ্রৌণিকোপাখ্যান; মহর্ষি দুর্ব্বাসার উপাখ্যান; আশ্রমের অভ্যন্তর হইতে জয়দ্রথকর্তৃক দ্রৌপদীহরণ; মহাবল ভীমের বায়ুবেগে গমন ও জয়দ্রথের পঞ্চশিখীকরণ; বহুবিস্তর রামায়ণ উপাখ্যান; রামচন্দ্রকর্তৃক রাবণের বধ; সাবিত্রীর উপাখ্যান; কুণ্ডলদ্বয়-দানদ্বারা ইন্দ্রের হস্ত হইতে কর্ণের মুক্তি; পরিতুষ্ট ইন্দ্রকর্তৃক একপুরুষঘাতিনী শক্তি প্রদান, আরণেয়-উপাখ্যান ও ধর্মের সপুত্রানুশাসন; বরলাভ করিয়া পাণ্ডবদিগের পশ্চিমদিকে গমন; তৃতীয় আরণ্যক পর্ব্বে এই সকল কীর্ত্তিত আছে। ইহাতে দুই শত একোনসপ্ততি অধ্যায় ও একাদশ সহস্র ছয় শত ও চতুঃষষ্টি শ্লোক আছে।
অতঃপর বহুবিস্তৃত বিরাটপর্ব্ব শুনুন। পাণ্ডবগণ বিরাট নগরে প্রবেশ করিয়া শ্মশানে অতি প্রকাণ্ড শমীবৃক্ষ নিরীক্ষণ করত স্বীয় সমুদায় অস্ত্র তাহাতে সংস্থাপন করিলেন ও অতি প্রচ্ছন্নভাবে নগরে প্রবেশ করিয়া তথায় বাস করিতে লাগিলেন। দুরাত্মা কীচক কামোন্মত্ত হইয়া দ্রৌপদী নিমিত্ত আপনার অভিমত অভিলাষ প্রকাশ করিলে ভীমসেন তাহার প্রাণসংহার করেন। রাজা দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের অন্বেষণার্থে চতুর্দিকে অতি সুচতুর চরসমূহ প্রেরণ করিলেন, কিন্তু তাহারা মহাত্মা পাণ্ডবদিগের অনুসন্ধান করিতে পারিল না। প্রথমতঃ ত্রিগর্ত্তেরা বিরাট রাজার গোধন অপহরণ করে, তদুপলক্ষ্যে তাহাদিগের সহিত বিরাটের যুদ্ধ হয়। শত্রুপক্ষ বিরাট রাজাকে পরাজিত ও বন্ধন করিয়া লইয়া যাইতেছিল, ইত্যবসরে ভীমসেন স্ববিক্রমপ্রভাবে তাঁহাকে মুক্ত করেন, পাণ্ডবেরা বিরাটের অপহৃত গোধন প্রত্যাহরণ করেন। অনন্তর কৌরবগণ তাঁহার গোধন হরণ করিলে অর্জুন বাহুবলে নিখিল কৌরবগণকে যুদ্ধে পরাভূত করিয়া বিরাটের গোধন উদ্ধার করেন। বিরাট সুভদ্রাগৰ্ত্তস্থসুত অভিমন্যুকে উদ্দেশ করিয়া দুহিতা উত্তরাকে সম্প্রদান করিলে, অর্জুন তাহাকে প্রতিগ্রহ করেন। বেদবেত্তা মহর্ষি বেদব্যাস বিরাট নামক চতুর্থপর্ব্বে এই সকল কীর্তন করিয়াছেন এবং ইহাতে সপ্তষষ্টি অধ্যায়, দুই সহস্র ও পঞ্চাশৎ শ্লোক আছে।
তৎপরে উদ্যোগ নামক পঞ্চমপর্ব্ব শ্রবণ করুন। পাণ্ডবেরা জিগীষাপরবশ হইয়া উপপ্লব্য নামক স্থানে অবস্থান করিলে দুর্য্যোধন ও অর্জুন কৃষ্ণের সন্নিকটে উপস্থিত হইলেন। "তুমি এই যুদ্ধে আমাদিগের সাহায্য কর" তৎসন্নিধানে উভয়ে এইরূপে প্রার্থনা করিলে মহামতি কৃষ্ণ কহিলেন, আমি এক পক্ষে এক অক্ষৌহিণী সেনা প্রদান করিব ও অন্য পক্ষে আমি একাকী থাকিব, কিন্তু কোনরূপ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব না ও অকপটে তাহাদিগের মন্ত্রী হইব। এক্ষণে তোমরা অন্যতরের কে কি ইচ্ছা কর বল। অনভিজ্ঞ দুর্য্যোধন সৈন্য প্রার্থনা করিলেন ও অর্জুন তাঁহাকে মন্ত্রীত্ব স্বীকার করিতে অনুরোধ করিলেন। পাণ্ডবদিগের সহায়তা করিবার নিমিত্ত সমাগত মদ্ররাজকে পথিমধ্যে দুর্য্যোধন বহুবিধ উপহার প্রদান করিয়া "তুমি আমায় সাহায্য কর” এইরূপ প্রার্থনা করিলেন। শল্য তাহাতে সম্মত হইয়া পাণ্ডবদিগের নিকট গমন করিলেন। তথায় যুধিষ্ঠিরের নিকট দেবরাজ ইন্দ্রের বৃত্রাসুর-বিজয়-বৃত্তান্ত বর্ণন করেন। পাণ্ডবেরা কৌরবসমীপে পুরোহিত প্রেরণ করিলেন। প্রবল প্রতাপ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুরোহিতের কথা শ্রবণ করিয়া শান্তিস্থাপন প্রত্যাশায় সঞ্জয়কে দূতস্বরূপে পাণ্ডবদিগের নিকটে পাঠাইলেন। কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদিগের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অতি বলবতী চিন্তায় ধৃতরাষ্ট্রের নিদ্রাচ্ছেদ হইল। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বিবিধ হিতবাক্য শ্রবণ করান। মহর্ষি সনৎসুজাত রাজাকে শোক-সন্তপ্ত দেখিয়া অতি উৎকৃষ্ট বেদশাস্ত্র শুনাইলেন। প্রভাতসময়ে সভামণ্ডপে উপস্থিত হইয়া সঞ্জয় বাসুদেব ও অর্জুনের অভিন্নত্ব কীর্তন করেন। মহামতি কৃষ্ণ কৃপাপরায়ণ হইয়া সন্ধি-বাসনায় হস্তিনাপুরে গমন করিয়াছিলেন, কিন্তু রাজা দুর্য্যোধন, উভয় পক্ষের হিতাকাঙ্ক্ষী তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলেন। অনন্তর দম্ভোদ্ভবের উপাখ্যান, মহাত্মা মাতলীর বরান্বেষণ, মহর্ষি গালবের চরিত, বিদুলার স্বপুত্রানুশাসন বর্ণিত আছে। কৃষ্ণ, কর্ণ ও দুর্য্যোধনের নিতান্ত মন্দ অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া সমস্ত রাজাদিগকে স্বীয় যোগেশ্বরত্ব দর্শন করাইলেন। কর্ণকে রথে আরোহণ করাইয়া তাঁহার সহিত কৃষ্ণ পরামর্শ করিয়াছিলেন, কিন্তু কর্ণ অহঙ্কার-পরতন্ত্র হইয়া তাঁহার মন্ত্রণা গ্রহণ করিল না। তিনি হস্তিনাপুর হইতে উপপ্লব্যে আগমন করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। তাঁহারা কৃষ্ণের কথা শুনিয়া হিতাহিত বিবেচনা পূর্ব্বক যুদ্ধ-সজ্জা করিতে লাগিলেন। অনন্তর হস্তিনাপুর হইতে সংগ্রাম-বাসনায় হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতি, এই সমুদায় ক্রমশঃ নির্গত হইতে লাগিল। রাজা দুর্য্যোধন যুদ্ধের পূর্ব্ব দিবস পাণ্ডবদিগের নিকট উলুক নামক দূত প্রেরণ করেন। রথ ও অতিরথ সংখ্যা, অন্বোপাখ্যান, বহু বৃত্তান্তসংযুক্ত সন্ধিবিগ্রহবিশিষ্ট উদ্যোগপর্ব্বে এই সকল কথিত হইল। ইহাতে শত ও ষড়শীতি অধ্যায় আছে। মহর্ষি এই পর্ব্বে ষট্ সহস্র শত ও অষ্টনবতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
অতঃপর পরমাশ্চর্য্য ভীষ্মপর্ব্ব। ইহাতে সঞ্জয় জম্বুদ্বীপ নির্মাণ বর্ণনা করেন। যুধিষ্ঠিরের সেনাগণ অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়। দশ দিবস অতি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইয়াছিল। মহামতি বাসুদেব মুক্তিপ্রতিপাদক বহুবিধ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া অর্জুনের মোহজনিত বিষাদ নিরাকরণ করেন। যুধিষ্ঠিরের হিতাভিলাষী মনস্বী কৃষ্ণ সত্বরে রথ হইতে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক প্রতোদ' [চাবুক] হস্তে লইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে ভীষ্মকে সংহার করিতে ধাবমান হইয়াছিলেন এবং সকল ধনুর্দ্ধারিশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে বাক্যরূপ অসিদ্বারা আঘাত করেন। অর্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়া শাণিত শরে ভীষ্মকে রথ হইতে ভূতলে পাতিত করিয়াছিলেন। ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ান হইলেন। অতি বিস্তৃত ভারতের ষষ্ঠ পর্ব্ব সমাখ্যাত হইল। ইহাতে শত ও সপ্তদশ অধ্যায় নিদ্দিষ্ট আছে। বেদবেত্তা ব্যাসদেব ভীষ্মপর্ব্বে পঞ্চ সহস্র, অষ্টশত ও চতুরশীতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
অনন্তর বহুবৃত্তান্তানুগত অতি বিচিত্র দ্রোণপর্ব্ব আরম্ভহইতেছে। প্রবলপ্রতাপ দ্রোণাচার্য্য সেনাপতিপদে অভিষিক্ত হইয়া দুর্য্যোধনের প্রীতিবর্দ্ধনের নিমিত্ত “ধীমান্ যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধে গ্রহণ করিব” এইরূপ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। সংশপ্তকগণ অর্জুনকে সমরাঙ্গণ হইতে অপসৃত করিয়াছিলেন। শত্রু-তুল্য পরাক্রমশালী মহারাজ ভগদত্ত সুপ্রতীক নামক হস্তীর সহিত অর্জুনকর্তৃক নিহত হন। জয়দ্রথ প্রভৃতি সপ্তরথী অপ্রাপ্তযৌবন একাকী বালক অভিমন্যুর প্রাণদণ্ড করিয়াছিলেন। অর্জুন অভিমন্যুবধে ক্রোধে অধীর হইয়া সপ্ত-অক্ষৌহিণী সৈন্যের সহিত জয়দ্রথকে বিনষ্ট করিলেন। মহাবাহু ভীম ও মহারথ সাত্যকি রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে অর্জুনের অন্বেষণের নিমিত্ত অতি দুর্দ্ধর্য কৌরবসেনা মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। হতাবশিষ্ট সংশপ্তকগণ যুদ্ধে নিঃশেষ হয়। অলম্বুষ, শ্রুতায়ুঃ, মহাবীর জলসন্ধ, সৌমদত্তি, বিরাট, মহারথ দ্রুপদ ও ঘটোৎকচাদি অন্যান্য বীরগণের নিধনের বিষয় দ্রোণপর্ব্বে কথিত আছে। সমরে দ্রোণাচার্য্য হত হইলে, অশ্বত্থামা ক্রোধান্ধ হইয়া যে ভীষণ নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করিয়াছিলেন, তাহাও এই পর্ব্বে বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে অত্যুৎকৃষ্ট রুদ্রমাহাত্ম্য, বেদব্যাসের আগমন এবং কৃষ্ণার্জুনের মাহাত্ম্য অভিহিত হইয়াছে। এই মহাভারতের সপ্তম পর্বের বিষয় কথিত হইল। এই দ্রোণপর্ব্বে যে যে বীরপুরুষদিগের কথা নির্দিষ্ট হইয়াছে, তাঁহারা প্রায় সকলেই নিধন প্রাপ্ত হয়েন। তত্ত্বদর্শী মহামুনি পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে একশত সপ্ততি অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র, নব শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
অতঃপর কর্ণপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধীমান্ শল্যের সারথ্যকার্য্যে নিয়োগ, ত্রিপুর-নিপাতন-বৃত্তান্ত, গমনকালে কর্ণ ও শল্যের পরস্পর বিবাদ, কর্ণ-তিরস্কারার্থ শল্য কর্তৃক হংসকাকীয়োপাখ্যান-কথন, মহাত্মা দ্রোণাত্মজকর্তৃক পাণ্ড্যের নিধন, দণ্ডসেন ও দণ্ডের বধ, সর্ব্বধনুর্দ্ধরগণ-সমক্ষে কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের প্রাণসংশয়, যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ক্রোধ, কৃষ্ণকর্তৃক অনুনয় বাক্যদ্বারা অর্জুনের ক্রোধ-শান্তিকরণ, ভীমসেনকর্তৃক যুদ্ধে দুঃশাসনের বক্ষঃস্থল বিদারণপূর্ব্বক রক্তপান এবং অর্জুনের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে কর্ণের নিপাত; এই সমস্ত বর্ণিত আছে। ভারতের অষ্টম পর্ব্ব নির্দিষ্ট হইল। এই কর্ণপর্ব্বে একোনসপ্ততি অধ্যায় ও চারি সহস্র নয় শত চতুঃষষ্টি শ্লোক কীর্ত্তিত আছে।
অতঃপর বিচিত্র শল্যপর্বের বিষয় কথিত হইতেছে। কুরুসৈন্য বীরশূন্য হইলে, মদ্রাধিরাজ শল্য সৈনাপত্যকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। শল্যপর্ব্বে যাবতীয় রথযুদ্ধ ও প্রধান প্রধান কৌরবদিগের বধ বর্ণিত আছে। এই পর্ব্বে মহাত্মা যুধিষ্ঠিরকর্তৃক শল্যের বধ ও সহদেবকর্তৃক শকুনির বিনাশ, কথিত আছে। দুর্য্যোধন, অল্পমাত্রাবশিষ্ট সৈন্য দেখিয়া দ্বৈপায়নহ্রদে প্রবেশ-পূর্ব্বক জলস্তম্ভ' করিয়া তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। ব্যাধেরা হ্রদমধ্যে দুর্য্যোধনের আত্মগোপন বৃত্তান্ত ভীমকে বলিয়া দিল। মহামানী দুর্য্যোধন ধীমান যুধিষ্ঠিরের তিরস্কারবাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া হ্রদ হইতে উত্থিত হইলেন ও ভীমের সহিত গদাযুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। সংগ্রাম সময়ে বলরাম আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এই পর্ব্বে সরস্বতী ও অন্যান্য তীর্থ সমুদায়ের পবিত্রতা-কীর্তন ও তুমুল গদাযুদ্ধ বর্ণন আছে। যুদ্ধে বৃকোদর ভয়ানক গদাঘাতে দুর্য্যোধনের উরুদ্বয় ভগ্ন করিলেন। ভারতের নবম পর্ব্ব নির্দিষ্ট হইল। এই পর্ব্বে নানাবৃত্তান্ত-যুক্ত একোনষষ্টি অধ্যায় কথিত আছে। এক্ষণে শ্লোক-সংখ্যা কথিত হইতেছে। কুরুবংশ-যশঃকীর্ত্তক মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে তিন সহস্র, দুইশত, বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
অনন্তর দারুণ সৌপ্তিকপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। পাণ্ডবেরা সংগ্রামক্ষেত্র হইতে শিবিরে গমন করিলে, সায়ংকালে কৃতবর্মা, কৃপাচার্য্য ও অশ্বত্থামা, রুধিরাক্তকলেবর, ভগ্নোরুযুগল অভিমানী রাজা দুর্য্যোধনের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মহারাজ রণক্ষেত্রে পতিত আছেন। মহাক্রোধ দ্রোণাত্মজ প্রতিজ্ঞা করিলেন, "ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালদিগকে ও অমাত্যসহিত পাণ্ডবগণকে বিনষ্ট না করিয়া বৰ্ম্মত্যাগ করিব না" রাজাকে এইরূপ কহিয়া তিনজনেই সে স্থান হইতে অপক্রান্ত হইয়া প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের তলে উপবিষ্ট হইলেন। এই স্থানে অশ্বত্থামা রাত্রিকালে পেচককে বহু সংখ্যক কাক নষ্ট করিতে দেখিয়া, পিতৃনিধন-বৃত্তান্ত-স্মরণ-পূর্ব্বক ক্রোধান্ধ হইয়া নিদ্রাতুর পাঞ্চালদিগের বধে সপ্রতিজ্ঞ হইলেন। এই স্থির করিয়া শিবিরদ্বারে গমনপূর্ব্বক দেখিলেন যে, একটা বিকটমূর্ত্তি ভয়ঙ্কর রাক্ষস আকাশপর্য্যন্ত ব্যাপিয়া রহিয়াছে। অশ্বত্থামা অস্ত্র ত্যাগ করিতে লাগিলেন, কিন্তু রাক্ষসের কিছুতেই কিছু হইল না। তখন তিনি দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রসন্ন করিয়া, কৃতবর্মা ও কৃপাচার্য্যের সহায়তায়, সুষুপ্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালগণকে ও সপরিবারে দ্রৌপদীর পুত্রগণকে বিনাশ করিলেন। কেবল কৃষ্ণবলে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা ও ধনুর্দ্ধর সাত্যকি রক্ষা পাইলেন, আর সকলেই বিনষ্ট হইল। ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরাদিকে সমাচার দিল যে, অশ্বত্থামা প্রসুপ্ত পাঞ্চালদিগকে বধ করিয়াছে। দ্রৌপদী পুত্র, পিতা ও ভ্রাতৃগণের নিধন-বার্তা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত অধীরার ন্যায় অনশন সঙ্কল্প করিয়া স্বামিগণের নিকট উপবিষ্টা হইলেন। মহাবলপরাক্রান্ত ভীম দ্রৌপদীর মনস্তুষ্টি করণার্থ ক্রোধান্বিত হইয়া গদাগ্রহণ পুরঃসর অশ্বত্থামার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অশ্বত্থামা ভীম-ভয়াক্রান্ত হইয়া সক্রোধে "অদ্য আমি মেদিনী পাণ্ডববিহীনা করিব” এই বলিয়া অস্ত্রত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণ "এমন করিও না” এই বলিয়া অশ্বত্থামাকে নিবারণ করিলেন। অর্জুন পাপাত্মা অশ্বত্থামাকে অনিষ্টাচরণে অভিনিবিষ্ট দেখিয়া স্বকীয় অস্ত্রদ্বারা অশ্বত্থামার অস্ত্রচ্ছেদন করিলেন এবং অশ্বত্থামা ও ব্যাসাদি পরস্পরের প্রতি শাপ প্রদান করিলেন। পাণ্ডবগণ মহারথ দ্রোণাত্মজের নিকট হইতে মণিগ্রহণ করিয়া সানন্দে দ্রৌপদীকে প্রদান করিলেন। ভারতের দশম সৌপ্তিকপর্ব্ব নির্দিষ্ট হইল। ব্রহ্মবাদী মহাত্মা উত্তমতেজাঃ বেদব্যাস এই পর্ব্বে অষ্টাদশ অধ্যায় ও অষ্টশত সপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন। ঐষীকপর্ব্ব এই পর্ব্বের অন্তর্গত।
এক্ষণে করুণ-রসোদ্বোধক স্ত্রীপর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে, পুত্রশোকার্ত প্রজ্ঞাচক্ষুঃ রাজা ধৃতরাষ্ট্র ভীমসেনকে সংহার করিতে সঙ্কল্প করিয়া লৌহময়ী ভীম-প্রতিমূর্তি ভগ্ন করেন। বিদুর মোক্ষোপদেশক হেতুবাদদ্বারা পুত্রশোকাভিসন্তপ্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সাংসারিক মোহনিবারণ, ও তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করেন। শোকার্ত ধৃতরাষ্ট্র অন্তঃপুর-মহিলাগণের সহিত রণস্থল দর্শনার্থ গমন করেন। বীরবনিতা-গণের করুণস্বরে রোদন এবং গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের ক্রোধ ও মোহ। ক্ষত্রিয়পত্নিগণ, সমরে অপরাঙ্মুখ, নিহত পিতা, ভ্রাতা ও পুত্রগণকে দেখিলেন। কৃষ্ণ পুত্র-পৌত্র শোকাকুলা গান্ধারীর ক্রোধোপশমন করেন। সর্ব্বধর্মজ্ঞশ্রেষ্ঠ, মহাপ্রাজ্ঞ রাজা যুধিষ্ঠির, শাস্ত্রানুসারে নৃপতিগণের শরীর দাহ করাইলেন। ভূপতিগণের উদকক্রিয়া আরব্ধ হইলে, কুন্তী কর্ণকে আপনার গৃঢ়োৎপন্ন পুত্র বলিয়া স্বীকার ও প্রকাশ করেন। মহর্ষি বেদব্যাস এই একাদশ পর্ব্ব রচনা করিয়াছেন। এই পর্ব্ব শ্রবণ কিংবা পাঠ করিলে সহৃদয় জনের হৃদয় শোকাকুল ও নয়ন অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হয়। এই পর্ব্বে বেদব্যাস সপ্তবিংশতি অধ্যায় ও সপ্তশত পঞ্চসপ্ততি শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
অতঃপর ধীশক্তিবর্দ্ধক শান্তিপর্ব্বের কথা লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতৃ, ভ্রাতৃ, পুত্র, সম্বন্ধী ও মাতুলগণকে বধ করাইয়া সাতিশয় নির্বিঘ্ন হইলেন। শর-শয্যাশায়ী ভীষ্মদেব, রাজা যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্মোপদেশ প্রদান করেন। ঐ সকল ধর্ম সম্যক্ জ্ঞানলাভেচ্ছু ব্যক্তিদিগের অবশ্য জ্ঞাতব্য। ঐ সমস্ত ধর্ম্মের যথার্থ জ্ঞানদ্বারা লোকে সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করে। ইহাতে বিচিত্র মোক্ষধর্ম্মের কথাও সবিস্তারে কথিত আছে। মহাভারতের দ্বাদশ পর্ব্ব নির্দিষ্ট হইল। হে তপোধনগণ। এই শান্তিপর্ব্বে মহামুনি বেদব্যাস ত্রিশত উনচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও চতুর্দশ সহস্র সপ্তশত সপ্ত শ্লোেক রচনা করিয়াছেন।
ইহার পর অত্যুৎকৃষ্ট অনুশাসন পর্ব্ব। এই পর্ব্বে কুরুরাজ যুধিষ্ঠির ভাগীরথীপুত্র ভীষ্মদেবের নিকট ধর্মনিচয় শ্রবণ করিয়া বিগতশোক ও স্থিরচিত্ত হইলেন। এই পর্ব্বে, ধর্মার্থ-সম্বন্ধ ব্যবহার সমুদায় কথন, বিবিধ দানের বিবিধ প্রকার ফল নির্দেশ, সৎপাত্র ও অসৎপাত্রের বিশেষ বিবেচনা, দান-বিধান কথন, আচার বিনির্ণয়, সত্যের স্বরূপ-কথন, গো-গণের ও ব্রাহ্মণগণের মহত্ত্বকীর্ত্তন, দেশ কালানুযায়ী ধৰ্ম্মরহস্য কথন ও ভীষ্মের অমর-লোকসম্প্রাপ্তি কীর্ত্তিত আছে। ধৰ্ম্ম-নির্ণায়ক নানা বৃত্তান্তসঙ্কলিত অনুশাসনাভিধান, ভারতের ত্রয়োদশ পর্বে নির্দিষ্ট হইল। এই অনুশাসনপর্ব্বে মুনিসত্তম পরাশরাত্মজ একশত ষচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র শ্লোক নির্ণয় করিয়াছেন।
অতঃপর আশ্বমেধিক নামক চতুৰ্দ্দশ পর্ব্বের বিষয় কথিত হইতেছে। এই পর্ব্বে, সম্বর্ত্তমুনি ও মরুত্ত রাজার আখ্যান, যুধিষ্ঠিরের হিমালয়স্থিত সুবর্ণস্তূপ সম্প্রাপ্তি ও পরীক্ষিতের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার অস্ত্রানলে দগ্ধ হইয়াছিলেন; কৃষ্ণ তাঁহাকে জীবিত প্রদান করেন। অত্যুৎকৃষ্ট যজ্ঞতুরঙ্গ রক্ষার্থ তৎপশ্চাদগামী অর্জুনের নানাদেশে ক্রোধন-রাজপুত্রগণের সহিত সংগ্রাম, চিত্রাঙ্গদার গর্তে সমুদ্ভূত স্বসুত বহুবাহনের সহিত যুদ্ধে ধনঞ্জয়ের জীবন-সংশয়। মহান্ অশ্বমেধযজ্ঞের সমাপ্তানন্তর নকুলের বৃত্তান্ত। এই পরমাদ্ভূত আশ্বমেধিক পর্ব্বের বিষয়ে কথিত হইল। এই পর্ব্বে, অশেষ তত্ত্ববিৎ ভগবান্ পরাশরসূনু এ্যধিকশত অধ্যায় ও তিন সহস্র তিন শত বিংশতি শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
অনন্তর আশ্রমবাসাখ্য পঞ্চদশ পৰ্ব্ব। এই পর্ব্বে, রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যত্যাগ করিয়া গান্ধারী ও বিদুরের সহিত অরণ্যানী' প্রবেশ করিলেন। গুরুশুশ্রূষায় একান্ত অনুরক্তা, সাধ্বী কুন্তীও ধৃতরাষ্ট্রকে বনে গমন করিতে দেখিয়া পুত্ররাজ্য পরিত্যাগ করত তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র, সমরে নিহত লোকান্তরগত পুত্র, পৌত্র এবং অন্যান্য ক্ষত্রিয় বীর পুরুষগণকে পুনরাগত দেখিলেন। তিনি মহামুনি বেদব্যাসের প্রসাদে এই আশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শন করিয়া অবশেষে শোক পরিত্যাগ করত পরমসিদ্ধি লাভ করিলেন। বিদুর ও জিতেন্দ্রিয় গবদ্গণনন্দন সঞ্জয়, অমাত্যের সহিত ধৰ্ম্মপথ অবলম্বন করিয়া চরমে সদ্গতি প্রাপ্ত হইলেন। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, তপোধন নারদকে সন্দর্শন করিলেন এবং তৎপ্রমুখাৎ যদুকুলধ্বংসের কথা অবগত হইলেন। এই অত্যদ্ভুত আশ্রমবাসাখ্য পর্ব্বের বিষয় কথিত হইল। মহামুনি বেদব্যাস এই পর্ব্বে, দ্বিচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও এক সহস্র পঞ্চশত ষট্ শ্লোকের সংখ্যা করিয়াছেন।
হে তপোধনগণ! অতঃপর দারুণ মৌষলপর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে, লবণ-সমুদ্র-সমীপে ব্রহ্মশাপগ্রস্ত পুরুষসিংহ যাদবগণ আপাণে মদ্যপানদ্বারা মত্ত হইয়া দারুণ দৈবদুর্বিপাক-বশতঃ এরকা' রূপ বজ্রদ্বারা পরস্পর আঘাত করেন। কৃষ্ণ ও বলভদ্র উভয়ে আপনাদিগের কুলক্ষয় করিয়া পরিশেষে আপনারাও সর্ব্বসংহৰ্ত্তা সমুপস্থিত কালের করাল-কবলে নিপতিত হয়েন। নরোত্তম অর্জুন দ্বারবর্তী নগরীতে আগমন করিয়া, ঐ নগরীকে যাদবশূন্য নিরীক্ষণ করত বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন। তিনি নরশ্রেষ্ঠ মাতুল বসুদেবের সংস্কার করিলেন এবং তৎপরে কৃষ্ণ ও বলরামের সংস্কার করিয়া পরিশেষে অন্যান্য প্রধান প্রধান বৃষ্ণিগণেরও সংস্কার করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকা হইতে বৃদ্ধ ও বালকগণকে লইয়া গমন করিতে করিতে ঘোরতর আপৎকালে গাণ্ডীবের প্রভাব ক্ষয় ও দিব্যাস্ত্রসমুদায়ের অপ্রসন্নতা দেখিলেন। তৎপরে তিনি যাদব-মহিলাগণের নাশ ও প্রভুত্বের অনিত্যতা দর্শনে সাতিশয় নির্ব্বেদ প্রাপ্ত হইয়া ব্যাসোপদেশে যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করত সন্ন্যাসধৰ্ম্ম-গ্রহণের বাসনা করিলেন। ষোড়শ-সংখ্যক মৌষলপর্ব্ব কীর্ত্তিত হইল। তত্ত্ববিৎ পরাশরাত্মজ এই পর্ব্বে, আট অধ্যায় ও তিন শত বিংশতি শ্লোক গণনা করিয়াছেন।
তদনন্তর মহাপ্রাস্থানিক নামক সপ্তদশ পর্ব্বের বিষয় লিখিত হইতেছে। এই পর্ব্বে, পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবগণ স্বকীয় রাজ্য পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রৌপদী দেবীকে সমভিব্যাহারে লইয়া মহা-প্রস্থানে প্রস্থিত হইলেন। তাঁহারা লৌহিত্যার্ণবের কূলে অগ্নি-সন্দর্শন পাইলেন। অর্জুন মহানুভব অগ্নিকর্তৃক আদিষ্ট হইয়া তাঁহাকে পূজা করত অত্যুৎকৃষ্ট গাণ্ডীবধনু প্রদান করিলেন। যুধিষ্ঠির, ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীকে নিপতিত ও নিহত দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপও না করিয়া সমস্ত মায়া মোহ পরিত্যাগ করত প্রস্থান করিলেন। মহাপ্রস্থানিকাখ্য সপ্তদশ পর্ব্ব কথিত হইল। এই পর্ব্বে, অশেষতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ পরাশরনন্দন তিন অধ্যায় ও তিন শত বিংশতি শ্লোকে নির্দ্ধারিত করিয়াছেন।
অনন্তর আশ্চর্য্য অলৌকিক স্বর্গ-পর্ব্ব জানিবেন। এই পর্ব্বে, দয়ার্দ্রচিত্ত মহাপ্রাজ্ঞ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আপনার কুকুর বিহীনে দেবলোক হইতে আগত দৈবরথ আরোহণে সম্মত হইলেন না। ধৰ্ম্ম স্বয়ং যুধিষ্ঠিরের ধর্মে অবিচলিত অনুরাগ বুঝিতে পারিয়া কুকুররূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহাকে দর্শন দিলেন। পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির ধর্ম্মের সহিত এক রথে উপবিষ্ট হইয়া স্বর্গে গমন করিলেন। দেবদূত ছল করিয়া তাঁহাকে নরক দর্শন করাইলেন। পরমধার্ম্মিকাগ্রগণ্য যুধিষ্ঠির তৎস্থানস্থিত নির্দেশানুবর্তী ভ্রাতৃগণের করুণরসোদ্দীপক ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করিলেন। ধৰ্ম্ম ও দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহার মনোদুঃখ নিবারণ করেন। তৎপরে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সুরদীর্ঘিকায়' স্নান করিয়া মানুষ কলেবর পরিত্যাগ করত স্বর্গে নিজধৰ্ম্মার্জিত স্থান পাইয়া ইন্দ্রাদি দেবগণকর্তৃক পরম সমাদৃত হইয়া পরমানন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন। হে তপোধনগণ। অশেষ ধীশক্তিসম্পন্ন নানাতত্ত্বদর্শী মহর্ষি বেদব্যাস এই অষ্টাদশপর্ব্ব রচনা এবং ইহাতে পাঁচ অধ্যায় ও দুই শত নব শ্লোকের সংখ্যা করিয়া গিয়াছেন।
এই অষ্টাদশ পৰ্ব্ব সবিস্তারে উক্ত হইল। ইহার পর হরিবংশ ও ভবিষ্যপর্ব্ব কথিত আছে। মহর্ষি হরিবংশে দ্বাদশ সহস্র শ্লোক সংখ্যা করিয়াছেন। মহাভারতের পর্ব্বসংগ্রহ নিদ্দিষ্ট হইল।
যুদ্ধ করিবার নিমিত্ত অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা আসিয়া-ছিল। সেই ঘোর সংগ্রাম অষ্টাদশ দিবস ব্যাপিয়া হয়।
যে দ্বিজ, অঙ্গ ও উপনিষদের সহিত চারিবেদ উত্তমরূপে অধ্যয়ন করিয়াছেন, কিন্তু মহাভারতাখ্যান জানেন না, তাঁহাকে বিচক্ষণ বলিতে পারা যায় না। অপরিমিত ধী-শক্তিমান্ বেদব্যাস এই ভারতকে অর্থশাস্ত্র, ধৰ্ম্মশাস্ত্র ও কামশাস্ত্র-স্বরূপ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যেমন পরম সুমধুর পুংস্কোকিলের কলরব শ্রবণ করিয়া কর্কশ কাকধ্বনি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা হয় না, সেইরূপ এই আখ্যান শ্রবণ করিলে, অন্য শাস্ত্র শ্রবণে রুচি থাকে না। যেমন পঞ্চভূত হইতে ত্রিবিধ লোকের উৎপত্তি হয়, সেইরূপ এই সর্বোৎকৃষ্ট ইতিহাস হইতে কবিগণের বুদ্ধি উৎপন্ন হয়। হে বিপ্রোত্তমগণ। যেমন জরায়ুজাদি চতুর্ব্বিধ শরীরী অন্তরীক্ষের' অন্তর্গত, সেইরূপ যাবতীয় পুরাণ এই আখ্যানের অন্তর্ভূত। যেমন বিচিত্র মানসিক ক্রিয়া সমস্ত ইন্দ্রিয়গণের আশ্রয়, সেইরূপ এই ইতিহাস যাবতীয় দানাধ্যয়নাদি ক্রিয়া ও শমদমাদি গুণের আশ্রয়। যেমন আহার বিনা শরীরীর শরীরধারণের উপায়ান্তর নাই, সেইরূপ এই সুললিত ইতিহাসা-ন্তর্গত কথা ব্যতিরেকে ভূমণ্ডলে অন্য কথা নাই। যেমন সমুন্নতিপ্রেপ্স ভৃত্যগণ সদ্বংশজ প্রভুর আরাধনা করে, সেইরূপ কবিষরাগ্রগণ্যগণ এই বিচিত্র ইতিহাসের উপাসনা করিয়া থাকেন। যেমন অন্যান্য আশ্রমাপেক্ষা গৃহস্থাশ্রম উৎকৃষ্ট, সেইরূপ এই কাব্য অন্যান্য কবিকৃত কাব্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
হে মহর্ষিগণ! তোমাদিগের ধর্ম্মে মতি হউক; কারণ লোকান্তরগত জনের ধর্মই অদ্বিতীয় বন্ধু। অর্থ ও স্ত্রী সাতিশয়া-নুরাগপূর্ব্বক সেবিত হইলেও কখন স্থির ও আত্মীয় হয় না। যে ব্যক্তি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ওষ্ঠনির্গত অপ্রমেয় পরম পবিত্র পাপনাশক মঙ্গলবিধায়ক পাঠ্যমান ভারত শ্রবণ করে, তাহার পুষ্করজলে স্নান করিবার প্রয়োজন কি? ব্রাহ্মণ দিবাভাগে নিরঙ্কুশ ইন্দ্রিয়গণ প্রভাবে যে পাপরাশি সঞ্চয় করেন, সন্ধ্যা-কালে মহাভারত পাঠদ্বারা সেই সকল পাপপুঞ্জ হইতে মুক্ত হয়েন; আর নিশাকালে কৰ্ম্ম, মনঃ ও বাক্য দ্বারা যে সকল পাপ সঞ্চয় করেন, প্রাতঃকালে মহাভারত পাঠ করিয়া সেই সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। যে ব্যক্তি বেদজ্ঞ ও বহুশ্রুত ব্রাহ্মণকে কনকমণ্ডিতশৃঙ্গ গো শত দান করে, আর যে ব্যক্তি পরম পবিত্র ভারত কথা প্রত্যহ শ্রবণ করে, এই দুই জনের তুল্য ফল লাভ হয়। যেমন অর্ণব পোতাদি দ্বারা সুবিস্তীর্ণ অগাধজলধি অনায়াসে পার হওয়া যায়, সেইরূপ অগ্রে পরিসংগ্রহ শ্রবণদ্বারা অত্যুৎকৃষ্ট মহার্থযুক্ত এই উপাখ্যান সুখবোধ হয় জানিবেন।
পৌষ্য পর্ব্বাধ্যায়।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন; কুরুক্ষেত্রে পরীক্ষিতপুত্র রাজা জনমেজয় ভ্রাতৃগণ-সমভিব্যাহারে এক দীর্ঘ সত্র' অনুষ্ঠান করিতেছেন। তাঁহার তিন সহোদর; শ্রুতসেন, উগ্রসেন ও ভীমসেন। তাঁহাদিগের যজ্ঞানুষ্ঠানকালে একটা কুকুর তথায় উপস্থিত হইল। জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ ক্রোধান্ধ হইয়া তাহাকে প্রহার করিলে সে রোদন করিতে করিতে মাতৃসন্নিধানে গমন করিল। সরমা তাহাকে অকস্মাৎ রোদন করিতে দেখিয়া কহিল "তুমি কেন কাঁদিতেছ, কে তোমাকে প্রহার করিয়াছে, বল" জননীকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সে কহিল, "জনমেজয়ের ভ্রাতৃগণ আমাকে প্রহার করিয়াছেন" তাহা শুনিয়া দেবশুনী কহিল, "বোধ হয় তুমি তাহাদিগের কোন অপকার করিয়া থাকিবে।” সে পুনর্ব্বার প্রত্যুত্তর করিল, "আমি তাঁহাদিগের কিছুমাত্র অপকার করি নাই, যজ্ঞের হবিঃও নিরীক্ষণ করি নাই, তাঁহারা অকারণে আমাকে প্রহার করিয়াছেন।” তৎশ্রবণে সরমা অতি দুঃখিতা হইয়া যথায় জনমেজয় ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে বহুবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, তথায় সমুপস্থিত হইয়া রোষভাবে কহিতে লাগিল, আমার পুত্র তোমাদিগের কিছুমাত্র অপকার করে নাই, যজ্ঞের হবিঃ অবেক্ষণ ও অবলেহন করে নাই, তোমরা কি নিমিত্ত ইহাকে প্রহার করিয়াছ, বল। তাঁহারা কিছুই প্রত্যুত্তর দিলেন না। তখন সরমা কহিল, তোমরা নিরপরাধকে প্রহার করিয়াছ, অতএব অনুপলক্ষিত' ভয় তোমাদিগকে আক্রমণ করিবে। জনমেজয় দেবগুনী সরমার এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিষণ্ণ ও সন্ত্রস্ত হইলেন।
অনন্তর সেই যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে জনমেজয় হস্তিনাপুরে আগমন ও সরমা-শাপ-নিবারণের নিমিত্ত সাতিশয় প্রযত্ন-সহকারে এক অনুরূপ পুরোহিত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। একদা মৃগয়ায় নির্গত হইয়া জনমেজয় স্বীয় জনপদের অন্তর্গত এক আশ্রম দর্শন করিলেন। তথায় শ্রুতশ্রবাঃ নামক এক ঋষি বাস করিতেন। তাঁহার সোমশ্রবাঃ নামে এক পুত্র ছিল। জনমেজয় ঋষিপুত্রের সন্নিহিত হইয়া তাঁহাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিলেন এবং ঋষিকে নমস্কার করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, ভগবন্! আপনার এই পুত্র আমার পুরোহিত হউন। রাজার এইরূপ কথা শ্রবণ করিয়া শ্রুতশ্রবাঃ কহিলেন, হে জনমেজয়! একদা এক সর্পী আমার শুক্র পান করিয়াছিল। ঐ শুক্রে তাহার গর্ভ সঞ্চার হয়; আমার এই পুত্র ঐ গর্ন্তে জন্মেন। ইনি মহাতপস্বী অধ্যয়ন-নিরত ও মদীয় তপোবীর্য্য-সম্ভূত। মহাদেবের অভিশাপ ব্যতিরেকে তোমার সমুদায় পাপশান্তি করিতে সমর্থ হইবেন। কিন্তু ইহার একটী নিগূঢ় ব্রত আছে যে, যদি কোন ব্রাহ্মণ ইঁহার সন্নিধানে কোন বিষয় প্রার্থনা করেন, ইনি তৎক্ষণাৎ তাহা প্রদান করিয়া থাকেন, যদি ইহাতে সাহস হয়, তবে ইঁহাকে লইয়া যাও। শ্রুতশ্রবার এইরূপ কথা শুনিয়া জনমেজয় প্রত্যুত্তর করিলেন, মহাশয়। আপনি যাহা অনুমতি করিতেছেন, আমি তাহাতে সম্মত আছি। এই কথা কহিয়া - পুরোহিত সহিত স্বনগরে প্রত্যাগমন করত ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, আমি এই মহাত্মাকে পৌরোহিত্যে বরণ করিয়াছি, ইনি যখন যাহা অনুজ্ঞা করিবেন, তোমরা তদ্বিষয়ে কোন বিচার না করিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিবে, কিছুতেই যেন তাহার ব্যতিক্রম না হয়। সহোদরদিগকে এইরূপ আদেশ করিয়া তক্ষশিলায় প্রস্থান করিলেন ও অনতিবিলম্বেই সেই প্রদেশ আপন অধিকারে আনিলেন।
ইত্যবসরে (প্রসঙ্গক্রমে একটী উপাখ্যানের উল্লেখ হইতেছে) আয়োধধৌম্য নামক এক ঋষি ছিলেন। উপমন্যু, আরুণি ও বেদ নামে তাঁহার তিনটী শিষ্য ছিল। তিনি এক দিন পাঞ্চালদেশীয় আরুণি নামক শিষ্যকে আহ্বান করিয়া ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে অনুমতি করিলেন। আরুণি উপাধ্যায়ের উপদেশ-ক্রমে ক্ষেত্রে গমন করিয়া অশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়াও পরিশেষে আলি বাঁধিতে অশক্ত হইলেন। অগত্যা তথায় শয়ন করিয়া জলনির্গম নিবারণ করিলেন। কোন সময়ে উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যগণকে জিজ্ঞাসিলেন, পাঞ্চালদেশীয় আরুণি কোথায় গিয়াছে। তাহারা কহিল, ভগবন্! আপনি তাহাকে ক্ষেত্রের আলি বাঁধিতে প্রেরণ করিয়াছেন। তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, যথায় আরুণি গমন করিয়াছে, চল আমরাও তথায় যাই। অনন্তর সেই স্থানে গমন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এইরূপে তাঁহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন, "ভো বৎস আরুণি! কোথায় গিয়াছ, আইস।" তৎশ্রবণে আরুণি সহসা তথা হইতে উত্থিত ও উপাধ্যায়ের সন্নিহিত হইয়া অতি বিনীতবচনে নিবেদন করিলেন, ক্ষেত্রের যে জল নিঃসৃত হইতেছিল, তাহা অবারণীয়, সুতরাং তৎপ্রতিরোধের নিমিত্ত আমি তথায় শয়ন করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনার কথা শ্রবণ করত সহসা কেদার' খণ্ড বিদারণ করিয়া আপনার সম্মুখীন হইলাম, অভিবাদন করি, আর কি অনুষ্ঠান করিব, অনুমতি করুন। আরুণি এইরূপ কহিলে উপাধ্যায় উত্তর করিলেন, বৎস! যেহেতু তুমি কেদার' খণ্ড বিদারণ করিয়া উত্থিত হইয়াছ, অতএব অদ্যাবধি তোমার নাম উদ্দালক বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে এবং আমার আজ্ঞা পালন করিয়াছ, এই নিমিত্ত তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। সকল বেদ ও সকল ধর্মশাস্ত্র সর্ব্বকাল সমভাবে তোমার অন্তরে প্রতিভাত হইবে। পরে আরুণি উপাধ্যায়ের আদেশ লাভ করিয়া অভিলষিত দেশে গমন করিলেন।
আয়োধধৌম্যের উপমন্যু নামে আর একটী শিষ্য ছিল। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, "বৎস উপমন্যু! সতত সাবধানে আমার গোধন রক্ষা কর।" এই বলিয়া তাঁহাকে গোচারণে প্রেরণ করিলেন। উপমন্যু তাঁহার অনুমতিক্রমে দিবাভাগে গোচারণ করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিতেন। একদিন উপাধ্যায় তাঁহাকে স্থূলকায় দেখিয়া কহিলেন, বৎস উপমন্যু! তোমাকে ক্রমশঃ অতিশয় হৃষ্টপুষ্ট দেখিতেছি, এক্ষণে কিরূপ আহার করিয়া থাক, বল। তিনি উত্তর করিলেন, ভগবন্! আমি এক্ষণে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি। তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, দেখ আমাকে না জানাইয়া ভিক্ষালব্ধ দ্রব্যজাত উপযোগ করা তোমার বিধেয় নহে। উপমন্যু তাহাই স্বীকার করিয়া ভিক্ষান্ন আহরণপূর্ব্বক গুরুকে প্রত্যর্পণ করিলেন। উপাধ্যায় সমস্ত ভিক্ষান্ন গ্রহণ করিলেন। ভক্ষণার্থ তাঁহাকে কিছুই দিলেন না। অনন্তর উপমন্যু দিবাভাগে গো রক্ষা করিয়া সায়াহ্নে গুরুগৃহে আগমন ও তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে অত্যন্ত পুষ্ট দেখিয়া কহিলেন, বৎস উপমন্যু। তোমার ভিক্ষান্ন সমুদায়ই গ্রহণ করিয়া থাকি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকায় দেখিতেছি; এখন কি আহার করিয়া থাক বল। তিনি এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, ভগবন্। একবার ভিক্ষা করিয়া আপনাকে প্রদান করি, দ্বিতীয় বার কয়েক মুষ্টি তণ্ডুল আহরণ করিয়া আপনার উদরপূরণ করিয়া থাকি। উপাধ্যায় কহিলেন, দেখ, ইহা ভদ্রলোকের ধর্ম ও সমুচিত কৰ্ম্ম নহে। ইহাতে অন্যের বৃত্তিরোধ হইতেছে, আরও এইরূপ অনুষ্ঠান করিলে তুমিও ক্রমশঃ লোভপরায়ণ হইবে। উপাধ্যায়কর্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও সায়ংকালে গুরুগৃহে আগমন করিলে উপাধ্যায় তাঁহাকে কহিলেন, বৎস উপমন্যু! তুমি ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া যে ভিক্ষান্ন আহরণ কর, তাহা আমি সম্পূর্ণ লইয়া থাকি এবং প্রতিষেধ করিয়াছি বলিয়া তুমিও দ্বিতীয়বার ভিক্ষা কর না, তথাপি তোমাকে পূর্ব্বাপেক্ষা সমধিক স্থূলকায় দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল। এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, ভগবন্। এক্ষণে ধেনুগণের দুগ্ধ পান করিয়া প্রাণ ধারণ করিতেছি। উপাধ্যায় কহিলেন, দেখ, আমি তোমাকে অনুমতি করি নাই, সুতরাং ধেনুর দুগ্ধ পান করা তোমার অত্যন্ত অন্যায় হইতেছে। গুরুবাক্য অঙ্গীকার করিয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গোচারণ ও গুরুগৃহে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নমস্কার করিলেন। গুরু তাঁহাকে বিলক্ষণ স্থূল দেখিয়া কহিলেন, বৎস উপমন্যু! তুমি ভিক্ষান্ন ভক্ষণ ও দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্যটন কর না এবং ধেনুর দুগ্ধপান করিতেও তোমাকে নিবারণ করিয়াছি, তথাপি তোমাকে অতিশয় স্থূলকলেবর দেখিতেছি, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল। উপমন্যু কহিলেন, বৎসগণ মাতৃস্তন্য পান করিয়া যে ফেন উদ্দ্গার করে, আমি তাহা পান করি। উপাধ্যায় কহিলেন, অতি শান্তস্বভাব বৎসগণ তোমার প্রতি অনুকম্পা করিয়া অধিক পরিমাণে ফেন উদ্দ্গার করিয়া থাকে সুতরাং তুমি তাহাদিগের আহারের ব্যাঘাত করিতেছ। অতঃপর তোমার ফেন পান করাও বিধেয় নহে। এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গো রক্ষা করিতে লাগিলেন।
এইরূপে উপাধ্যায়কর্তৃক প্রতিষিদ্ধ হইয়া তিনি আর ভিক্ষান্ন ভক্ষণ করিতেন না, দ্বিতীয়বার ভিক্ষার্থ পর্য্যটন করিতেন না, ধেনুর দুগ্ধপান ও দুগ্ধের ফেনোপযোগেও বিরত হইলেন। একদা তিনি অরণ্যে গোচারণে ক্ষুধার্ত হইয়া অর্কপত্র ভক্ষণ করিলেন। সেই সকল ক্ষার, তিক্ত, কটু, রুক্ষ ও তীক্ষ্ণবিপাক অর্কপত্র উপযোগ' করাতে চক্ষুদোষ জন্মিয়া অন্ধ হইলেন। অন্ধ হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক কূপে নিপতিত হইলেন।
অনন্তর ভগবন্ দিনমণি অস্তাচল-চূড়াবলম্বী হইলে উপাধ্যায় আয়োধধৌম্য শিষ্যদিগকে কহিলেন, দেখ, উপমন্যু এখনও আসিতেছে না। শিষ্যেরা কহিলেন, ভগবন্! উপমন্যুকে আপনি গোচারণের নিমিত্ত অরণ্যে প্রেরণ করিয়াছেন। উপাধ্যায় কহিলেন, দেখ আমি উপমন্যুকে সর্ব্বপ্রকার আহার করিতে নিষেধ করিয়াছি, বোধ হয়, সে কুপিত হইয়াছে; এই নিমিত্ত প্রত্যাগত হইতেছে না। চল, আমরা তাহার অনুসন্ধান করিগে। এই বলিয়া শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে বন-গমনপূর্ব্বক "বৎস উপমন্যু কোথায় গিয়াছ" এই বলিয়া মুক্তকণ্ঠে তাঁহাকে আহ্বান করিতে লাগিলেন। উপমন্যু উপাধ্যায়ের স্বরসংযোগ শ্রবণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, আমি কূপে পতিত হইয়াছি। তাহা শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, তুমি কিরূপে কূপে নিপতিত হইয়াছ। তিনি প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি অর্কপত্র-ভক্ষণে অন্ধ হইয়া কূপে পতিত হইলাম। উপাধ্যায় কহিলেন, তুমি দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারের স্তব কর। তাহা হইলে তোমার চক্ষুর্লাভ হইবে। উপমন্যু উপাধ্যায়ের উপদেশানুসারে বেদবাক্যদ্বারা অশ্বিনীকুমার দেবতাদ্বয়ের স্তব আরম্ভ করিলেন। হে অশ্বিনীকুমারদ্বয়! তোমরা সৃষ্টির প্রারম্ভে বিদ্যমান ছিলে; তোমরাই সৰ্ব্বভূত-প্রধান হিরণ্যগর্ন্তরূপে উৎপন্ন হইয়াছ, পরে তোমারই সংসারে প্রপঞ্চস্বরূপে প্রকাশমান হইয়াছ। দেশ, কাল ও অবস্থা দ্বারা তোমাদিগের ইয়ত্তা করা যায় না; তোমরাই মায়া ও মায়ারূঢ় চৈতন্যরূপে দ্যোতমান আছ, তোমরা শরীরবৃক্ষে পক্ষিরূপে অবস্থান করিতেছ; তোমরা সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় পরমাণু সমষ্টি ও প্রকৃতির সহযোগিতার আবশ্যকতা রাখ না; তোমরা বাক্য ও মনের অগোচর; তোমরাই স্বীয় প্রকৃতির বিক্ষেপশক্তিদ্বারা নিখিল বিশ্বকে সুপ্রকাশ করিয়াছ। এক্ষণে আমি নির্ব্যাধি হইবার জন্য শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন' দ্বারা তোমাদিগের আরাধনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। তোমরা পরম রমণীয় ও নির্লিপ্ত, বিলীন জগতের অধিষ্ঠানভূত, মায়া বিকাররহিত এবং জন্ম-মৃত্যু-বিবর্জিত; তোমরা সর্ব্বকাল সমভাবে বিরাজমান আছ; তোমরা ভাস্কর সৃষ্টি করিয়া দিন-যামিনী-রূপ শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ সূত্রদ্বারা সংবৎসররূপ বস্ত্র-বয়ন করিতেছ; তোমরা জীবদিগকে সুবিহিত পথ সতত প্রদর্শন কর; তোমরা পরমাত্ম-শক্তিরূপ কালপাশ হইতে বিমুক্ত করিয়া জীবাত্মা স্বরূপ পক্ষিণীকে মোক্ষরূপ সৌভাগ্যশালিনী করিয়াছ। জীবেরা যাবৎ অজ্ঞানান্ধকারাচ্ছন্ন থাকিয়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র থাকে, তাবৎ তাহারা সর্ব্বদোষ স্পর্শশূন্য চৈতন্যস্বরূপ তোমাদিগকে শরীরী বলিয়া ভাবনা করে। ত্রিশত ষষ্টি দিবস স্বরূপ গো সকল, সংবৎসররূপ যে বৎস উৎপাদন করে, তত্ত্বজিজ্ঞাসুরা ঐ বৎসকে আশ্রয় করিয়া পৃথক্ ফল ক্রিয়াসমূহরূপ গো হইতে তত্ত্বজ্ঞান স্বরূপ দুগ্ধ দোহন করেন, উৎপাদক ও সংহারক সেই বৎসকে তোমরাই প্রসব করিয়াছ। অহোরাত্র-স্বরূপ সপ্তশত বিংশতি অর', সংবৎসর-রূপ নাভিতে সংস্থিত এবং দ্বাদশ মাসরূপ প্রধি দ্বারা পরিবেষ্টিত যুগ্মৎ প্রকাশিত নেমিশূন্য মায়াত্মক অক্ষয় কালচক্র নিরন্তর পরিবর্তিত হইতেছে। দ্বাদশ রাশিরূপ অর, ছয় ঋতু স্বরূপ নাভি ও সংবৎসররূপ অক্ষ' সংযুক্ত এবং ধৰ্ম্ম ফলের আধার-ভূত একখানি চক্র আছে, যাহাতে কালা-ভিমানিনী দেবতা সতত অবস্থিত আছেন। হে অশ্বিনীকুমারযুগল। তোমরা ঐ চক্র হইতে আমাকে মুক্ত কর, আমি জন্মমরণ ক্লেশে অতিশয় ক্লিষ্ট আছি। তোমরা সনাতন ব্রহ্ম হইয়াও জড়স্বভাব বিশ্ব স্বরূপ, তোমরাই কৰ্ম্ম ও কর্মফল স্বরূপ। আকাশাদি সমস্ত জড় পদার্থ তোমাদের স্বরূপে লয় প্রাপ্ত হয়, তোমরাই অবিদ্যাপ্রভাবে তত্ত্বজ্ঞান উপার্জন করিতে বিমুখ হইয়াও বিষম বিষয়রসাস্বাদ-সুখ-ভোগ দ্বারা ইন্দ্রিয়বৃত্তি-চরিতার্থ করিয়া সংসার-মায়াজালে জড়িত হও। তোমরা সৃষ্টির পূর্ব্বে দশদিক্, আকাশ ও সূর্য্যমণ্ডলের উদ্ভাবন করিয়াছ; মহর্ষিগণ সূর্য্য-বিহিত-সময়ানুসারে বেদ-প্রতিপাদ্য কার্যকলাপ নির্বাহ করেন এবং নিখিল দেবগণ ও মনুষ্যেরা বিবিধ ঐশ্বর্য্য ভোগ করেন। তোমরা আকাশাদি সূক্ষ্ম পঞ্চভূত সৃষ্টি করিয়া তাহাদের পঞ্চীকরণ করিয়াছ, সেই পঞ্চভূত হইতে অখিল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হইয়াছে, প্রাণিগণ ইন্দ্রিয়পরবশ হইয়া বিষয়ানুরক্ত হইতেছে এবং নিখিল দেবগণ ও সমগ্র মনুষ্য, অধিষ্ঠানভূতা এই পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত আছে। তোমাদিগকে ও তোমাদের কণ্ঠদেশা-বলম্বিত কমলমালিকাকে প্রণাম করি। নিত্যমুক্ত কৰ্ম্মফলদাতা অশ্বিনীকুমারযুগলের সাহায্য বিনা অন্যান্য দেবগণ স্বকীয় কার্য্য-সাধনে সক্ষম নহেন। হে অশ্বিনীকুমারদ্বয়। তোমরা অগ্রে মুখদ্বারা অন্নরূপ গর্ব গ্রহণ কর, পরে অচেতন দেহ, ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই গর্ন্ত প্রসব করে, ঐ গর্ন্ত প্রসূতমাত্র মাতৃস্তন্যপানে নিযুক্ত হয়। এক্ষণে তোমরা আমার চক্ষুদ্বয়ের অন্ধত্ব মোচন করিয়া প্রাণ রক্ষা কর। অশ্বিনীকুমারযুগল উপমন্যুর এইরূপ স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া তথায় আবির্ভূত হইলেন এবং কহিলেন, আমরা তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হইয়াছি, অতএব তোমাকে এক পিষ্টক দিতেছি ভক্ষণ কর। এইরূপ আদিষ্ট হইয়া তিনি কহিলেন, আপনাদিগের কথা অবহেলন করিবার যোগ্য নয়। কিন্তু আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া পূপ [পিষ্টক] ভক্ষণ করিতে পারি না। তখন অশ্বিনীতনয়দ্বয় কহিলেন, পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় আমাদিগকে স্তব করিয়াছিলেন। আমরা তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া এক পিষ্টক দিয়াছিলাম, কিন্তু তিনি গুরুর আদেশ না লইয়া তাহা উপযোগ করেন, অতএব তোমার উপাধ্যায় যেরূপ করিয়াছিলেন, তুমিও সেইরূপ কর। এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু কহিলেন, আপনাদিগকে অনুনয় করিতেছি, আমি গুরুকে নিবেদন না করিয়া অপূপ' ভক্ষণ করিতে পারিব না। অশ্বিনীকুমার কহিলেন, তোমার এই প্রকার অসাধারণ গুরুভক্তি দর্শনে আমরা অতিশয় প্রসন্ন হইলাম, তোমার উপাধ্যায়ের দন্তসকল লৌহময়, তোমারও হিরণ্ময় হইবে এবং চক্ষুঃও শ্রেয়োলাভ করিবে। উপমন্যু অশ্বিনীকুমারের বরদানপ্রভাবে পূর্ব্ববৎ চক্ষুরত্ন লাভ করিয়া গুরু-সন্নিধানে গমন ও অভিবাদন করত আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং কহিলেন, অশ্বিনীতনয়েরা যেরূপ কহিয়াছেন, তুমি সেইরূপ মঙ্গললাভ করিবে। সকল বেদ ও সকল ধর্মশাস্ত্র সর্ব্বকাল তোমার স্মৃতিপথে থাকিবে। উপমন্যুর এই পরীক্ষা হইল।
আয়োধধৌম্যের বেদ নামে অপর একটী শিষ্য ছিল। একদা উপাধ্যায় তাঁহাকে আদেশ করিলেন, বৎস বেদ! তুমি আমার গৃহে থাকিয়া কিছুকাল শুশ্রূষা কর, তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। বেদ তদীয় বাক্য শিরোধারণপূর্ব্বক গুরু-শুশ্রূষায় রত হইয়া বহুকাল গুরুগৃহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। গুরু যখন যাহা নিয়োগ করিতেন, তিনি শীত, উত্তাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা প্রভৃতি অশেষ ক্লেশ গণনা না করিয়া ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তৎক্ষণাৎ তাহা অনুষ্ঠান করিতেন, কখন কোন বিষয়ে অবহেলা করিতেন না। এইরূপে বহুকাল অতীত হইলে, উপাধ্যায় তাঁহার প্রতি অতি প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তখন বেদ, গুরুর প্রসাদে শ্রেয়ঃ ও সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করিলেন। বেদের এই পরীক্ষা হইল।
অনন্তর বেদ উপাধ্যায়ের অনুমতিক্রমে গুরুকুল হইতে প্রত্যাগত হইয়া গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করিলেন। ঐ আশ্রমে অবস্থানকালে তাঁহারও তিনটী শিষ্য হইল। বেদ শিষ্যদিগকে কোন কর্মে নিয়োগ বা আত্মশুশ্রুষা করিতে আদেশ করিতেন না। কারণ গুরুকুলবাসের দুঃখ তাঁহার মনোমধ্যে সতত জাগরূক ছিল। এই নিমিত্ত তিনি শিষ্যগণকে ক্লেশ দিতে পরাঙ্মুখ হইলেন।
কিয়ৎকাল পরে রাজা জনমেজয় ও পৌষ্য নামক অপর এক ভূপাল বেদের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে উপাধ্যায়রূপে বরণ করিলেন। একদা তিনি যাজনকার্য্যোপলক্ষ্যে স্থানান্তরে প্রস্থান করিবার কালে উতঙ্ক নামক শিষ্যকে আদেশ করিলেন, বৎস! আমার অনবস্থান কালে মদীয় গৃহে যে কোন বিষয়ের অসদ্ভাব হইবে, তাহা তুমি তৎক্ষণাৎ সম্পন্ন করিবে। উতঙ্ককে এইরূপ আদেশ দিয়া বেদ প্রবাসে গমন করিলেন। উতঙ্ক গুরুকুলে বাস করিয়া গুরুর অনুজ্ঞা পালন করিতে লাগিলেন।
একদিন উপাধ্যায় পত্নীরা উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, তোমার উপাধ্যায়ানী ঋতুমতী হইয়াছেন। এ সময়ে তোমার গুরু গৃহে নাই। যাহাতে তাঁহার ঋতু নিষ্ফল না হয় তুমি তাহা কর, কাল অতিক্রান্ত হইয়াছে। উতঙ্ক এতাদৃশ অসঙ্গত কথা শুনিয়া কহিলেন, আমি স্ত্রীলোকের কথায় এরূপ কুকর্মে কদাচ প্রবৃত্ত হইতে পারি না, এবং গুরু আমাকে অন্যায় আচরণ করিতে কহিয়া যান নাই। কিয়ৎকাল পরে উপাধ্যায় প্রবাস হইতে গৃহে আগমন করিয়া উতঙ্কের সুচরিত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত প্রসন্ন হইলেন এবং তাঁহাকে কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! তোমার কি প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিব বল। তুমি ধৰ্ম্মতঃ আমার শুশ্রূষা করিয়াছ, তাহাতে আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি, অতএব এক্ষণে তোমাকে অনুজ্ঞা করিতেছি, তোমার সকল মনোরথ সফল হউক; গমন কর। গুরু কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া উতঙ্ক কহিলেন, ভগবন্! আমি গুরুদক্ষিণা দিতে প্রার্থনা করি, কারণ এইরূপ শ্রুতি আছে যে, যিনি দক্ষিণা গ্রহণ না করিয়া শিক্ষাদান করেন ও যে ব্যক্তি দক্ষিণা না দিয়া অধ্যয়ন করে, তাহাদের মধ্যে একজন মৃত্যু বা বিদ্বেষ প্রাপ্ত হয়। অতএব অনুমতি করিলে আপনার ইচ্ছানুরূপ দক্ষিণা আহরণ করি। উপাধ্যায় কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! অবসরক্রমে আদেশ করিব। উতঙ্ক আর একদিন গুরুকে নিবেদন করিলেন, মহাশয় আজ্ঞা করুন; কিরূপ দক্ষিণা আপনার অভিমত, তাহা আহরণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। তাহা শুনিয়া উপাধ্যায় কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! গুরুদক্ষিণা আহরণ করিব বলিয়া আমাকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিয়া থাক, অতএব তোমার উপাধ্যায়ানীকে বল, তাঁহার যাহা অভিরুচি সেইরূপ গুরুদক্ষিণা আহরণ কর। উতঙ্ক উপাধ্যায়ের আদেশক্রমে গুরুপত্নী-সমীপে গমন পূর্ব্বক কহিলেন, মাতঃ। গৃহে যাইতে উপাধ্যায় আমাকে অনুমতি করিয়াছেন, এক্ষণে আপনার অভিলষিত গুরুদক্ষিণা দিয়া ঋণ-মুক্ত হইতে বাসনা করি। বলুন, কি দক্ষিণা আপনার অভিপ্রেত। উপাধ্যায়ানী কহিলেন, বৎস! পৌষ্য রাজার ধর্মপত্নী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করিয়া আছেন, তাহা আনয়ন করিয়া আমাকে প্রদান কর। আগামী চতুর্থ দিবসে এক ব্রত উপলক্ষ্যে মহা-সমারোহ হইবে, সেই দিন ঐ দুই কুণ্ডল ধারণ করিয়া নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণদিগের পরিবেশন করিব; অতএব তুমি সত্বর গমন কর, ইহা করিতে পারিলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে, অন্যথা মঙ্গল হওয়া সুকঠিন।
উতঙ্ক এইরূপ অভিহিত হইয়া প্রস্থান করিলেন। গমন করিতে করিতে পথিমধ্যে অতি বৃহৎ এক বৃষ দেখিলেন। ঐ বৃষে বৃহৎকায় এক পুরুষ আরোহণ করিয়া ছিলেন। তিনি উতঙ্ককে আহ্বান করিয়া কহিলেন, ওহে উতঙ্ক! তুমি এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর। উতঙ্ক তাহাতে অসম্মত হইলেন। তখন ঐ পুরুষ পুনর্ব্বার তাহাকে কহিলেন, উতঙ্ক! তুমি মনোমধ্যে কোন প্রকার বিচার না করিয়া এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর, পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় ইহার পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন। তখন উতঙ্ক ঐ কথায় স্বীকার করিয়া সেই বৃষের মূত্র ও পুরীষ ভক্ষণ করিলেন। অনন্তর সত্বর আচমন করিতে করিতে সসম্ভ্রমে প্রস্থান করিলেন এবং আসনাসীন পৌষ্যের সন্নিধানে গমন করিয়া আশীর্ব্বাদ প্রয়োেগ পুরঃসর কহিলেন, মহারাজ! আমি অর্থিভাবে আপনার নিকট অভ্যাগত হইয়াছি। রাজা তাঁহাকে অভিবাদন করিয়া কহিলেন, ভগবন্। এই কিঙ্কর আপনার কি উপকার করিবে বলুন। উতঙ্ক কহিলেন, মহারাজ। আপনার মহিষী যে কুণ্ডলদ্বয় ধারণ করেন, গুরুদক্ষিণা প্রদান বাসনায় আপনার নিকট আমি তাহা প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি। পৌষ্য কহিলেন, মহাশয়! অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া আমার সহধর্মিণীর নিকট উহা যাজ্ঞা করুন। উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অন্তঃপুরে গমন করিয়া রাজমহিষীকে দেখিতে পাইলেন না, তখন তিনি পুনর্ব্বার পৌষ্যের নিকট আসিয়া কহিলেন, মহারাজ। আমার প্রতি এইরূপ মিথ্যা আচরণ করা আপনার উচিত হয় নাই। অনেক অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু অন্তঃপুরে আপনার মহিষীকে দেখিতে পাইলাম না। পৌষ্য ক্ষণকাল বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, মহাশয়। বোধ হয় আপনি অশুচি আছেন, মনে করিয়া দেখুন। আমার গৃহিণী অতি পতিব্রতা, অপবিত্র থাকিলে কেহই তাঁহার সন্দর্শন পায় না। এইরূপ অভিহিত হইলে উতঙ্ক সমুদায় স্মরণ করিয়া কহিলেন, আমি বৃষ-পুরীষ ভক্ষণানন্তর সত্বরে উত্থিত হইয়া গমনকালে আচমন করিয়াছিলাম। পৌষ্য প্রত্যুত্তর করিলেন, মহাশয়! আপনার ইহাই ব্যতিক্রম হইয়াছে। উত্থানাবস্থায় ও গমনকালে আচমন করা আর না করা উভয়ই তুল্য। তখন উতঙ্ক প্রাম্মুখে উপবেশন এবং কর, চরণ ও বদন প্রক্ষালনপূর্ব্বক নিঃশব্দ অফেন অনুষ্ণ ও হৃদয়দেশ পর্য্যন্ত গমন করিতে পারে এইরূপ পরিমাণে জল তিনবার আচমন-পূর্ব্বক অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন এবং রাজমহিষীকে দেখিতে পাইলেন। রাজমহিষী তাঁহার দর্শনমাত্র সত্বরে উত্থিত হইয়া অভিবাদন করিলেন এবং স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, ভগবন্। এ কিঙ্করী আপনার কি করিবে, আজ্ঞা করুন। উতঙ্ক কহিলেন, গুরুদক্ষিণা প্রদান করিবার নিমিত্ত তোমার নিকট কুণ্ডলদ্বয় ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি, আমাকে তাহা দান কর। রাজমহিষী তাঁহার তাদৃশ প্রার্থনায় প্রীতা ও প্রসন্না হইয়া সৎপাত্র বোধে তৎক্ষণাৎ কর্ণ হইতে উন্মোচন পূর্ব্বক কুণ্ডলদ্বয় তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিলেন এবং কহিলেন, নাগরাজ তক্ষক আগ্রহা-তিশয় সহকারে ইহা প্রার্থনা করেন। অতএব সাবধান হইয়া লইয়া যাউন। উতঙ্ক কহিলেন, তুমি কোনরূপ আশঙ্কা করিও না। নিশ্চয় কহিতেছি, তক্ষক আমার কিছুই করিতে পারিবে না।
উতঙ্ক ইহা কহিয়া সমুচিত সংবৰ্দ্ধনাপূর্ব্বক তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া পৌষ্যসকাশে গমন করিলেন এবং কহিলেন, মহারাজ। অভিলষিত ফললাভে আমি অতিশয় প্রীত হইয়াছি। অনন্তর পৌষ্য কহিলেন, ভগবন্। সকল সময় সুপাত্র-সমাগম হয় না। আপনি গুণবান্ অতিথি উপস্থিত হইয়াছেন। ইচ্ছা হয় আতিথ্য করি অতএব কালনিৰ্দ্দেশ করুন। উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি এক্ষণেই প্রস্তুত আছি আপনি অন্ন আনয়ন করুন। রাজা তদীয় আদেশানুসারে অন্ন উপস্থিত করিয়া তাঁহাকে উপযোগ করিতে দিলেন। তিনি তাহা শীতল ও কেশসংস্পর্শে অশুচি দেখিয়া কহিলেন, তুমি আমাকে দূষিত অন্ন ভোজন করিতে দিয়াছ অতএব অন্ধ হইবে। পৌষ্য এইরূপ অভিশাপ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, তুমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিলে অতএব তোমারও বংশ লোপ পাইবে। তখন উতঙ্ক কহিলেন, দেখ তুমি অশুচি অন্ন ভোজন করিতে দিয়া পুনর্ব্বার প্রতিশাপ প্রদান করিতেছ, ইহা তোমার সমুচিত কৰ্ম্ম হইল না। বরং তুমি অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ কর। পৌষ্য অন্নের অশুচিত্ব স্পষ্টই দেখিতে পাইলেন। পরে উতঙ্ককে বিনয়বাক্যে কহিলেন, ভগবন্! আমি সবিশেষ না জানিতে পারিয়া এই অশুচি অন্ন আহরণ করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। আপনি প্রসন্ন হইয়া যাহাতে আমি অন্ধ না হই এইরূপ অনুগ্রহ করুন।
তখন উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, দেখ আমার বাক্য মিথ্যা হইবার নহে, সুতরাং একবার অন্ধ ও অনতিবিলম্বে চক্ষুষ্মান্ হইবে সন্দেহ নাই। কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ তাহা হইতে আমাকে মুক্ত কর। পৌষ্য কহিলেন, এখনও আমার ক্রোধের উপশম হয় নাই; অতএব শাপ প্রতিসংহার করিতে পারি না। আর আপনি কি জানেন না যে, ব্রাহ্মণের হৃদয় নবনীতের ন্যায় সুকোমল ও বাক্য খরধার ক্ষুরের ন্যায় নিতান্ত তীক্ষ্ণ; ক্ষত্রিয়দিগের উভয়ই বিপরীত অর্থাৎ তাহাদিগের বাক্য নবনীতবৎ কোমল ও হৃদয় ক্ষুরধার তুল্য সুতীক্ষ্ণ, সুতরাং আমি স্বভাব-সুলভ তীক্ষ্ণভাব প্রযুক্ত এক্ষণে প্রদত্ত শাপের অন্যথা করিতে পারি না। উতঙ্ক কহিলেন, আমি অদূষিত অন্নে দোষারোপ করিয়া তোমাকে অভিসম্পাত করিয়াছি এই ভাবিয়া তুমি আমাকে প্রতিশাপ প্রদান করিয়াছিলে, এক্ষণে অন্নের দোষ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া অনুনয় বিনয়পূর্ব্বক আমাকে প্রসন্ন করিলে এবং শাপ বিমোচন করিয়া লইলে, কিন্তু তুমি যে শাপ দিয়াছ তাহা মোচন করিতে চাহিতেছ না, এই প্রবঞ্চনা প্রযুক্ত সে শাপ আমাকে লাগিবে না; আমি চলিলাম। এই বলিয়া কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।
পথিমধ্যে দেখিলেন, এক নগ্ন ক্ষপণক' আসিতেছে, কিন্তু সে মধ্যে মধ্যে অদৃশ্য হইতেছে। উতঙ্ক সেই সময়ে পৌষ্য-মহিষীদত্ত কুণ্ডলদ্বয় ভূতলে রাখিয়া স্নান তর্পণাদির নিমিত্ত সরোবরে গমন করিলেন। ইত্যবসরে ক্ষপণক নিঃশব্দ পদ-সঞ্চারে সত্বর তথায় আগমন ও কুণ্ডলদ্বয় অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। উতঙ্ক স্নানাহ্নিক সমাপনানন্তর অতি পূতমনে দেবতা ও গুরুকে প্রণাম করিয়া প্রবলবেগে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তিনি সেই ক্ষপণকের সন্নিকৃষ্ট হইবামাত্র সে ক্ষপণকরূপ পরিহারপূর্ব্বক তক্ষকরূপ পরিগ্রহ করিল এবং অকস্মাৎ ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হইয়া তাহার সম্মুখে এক মহা গর্ত সমুৎপন্ন হইল। তক্ষক সেই মহাগৰ্ত্ত দিয়া নাগলোকস্থ স্বীয় ভবনে গমন করিলেন। তখন উতঙ্ক পৌষ্য-মহিষীর কথা স্মরণ করিয়া প্রাণপণে তক্ষকের অনুসরণে যত্নবান্ হইলেন এবং প্রবেশদ্বার বিস্তার করিবার নিমিত্ত দণ্ডকাষ্ঠদ্বারা খনন করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন। না। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁহাকে কষ্টভোগ করিতে দেখিয়া স্বীয় বজ্রাস্ত্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বজ্র! তুমি যাইয়া এই ব্রাহ্মণের সাহায্য কর। বজ্র প্রভুর আদেশক্রমে তদ্দণ্ডে দণ্ডকাষ্ঠে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া গর্ত্তদ্বার বিস্তীর্ণ করিল। উতঙ্ক তদ্দ্বারা রসাতলে প্রবেশ করিলেন। তিনি এইরূপে নাগলোকে প্রবেশ করিয়া বহুবিধ প্রাসাদ, হর্ম্য, বলভী ও নানাবিধ ক্রীড়া কৌতুকের রমণীয় স্থান অবলোকন করিলেন এবং বক্ষ্যমাণ প্রকারে নাগগণের স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন।
"ঐরাবত যে সকল সর্পের অধিরাজ এবং যাঁহারা যুদ্ধে অতিশয় শোভমান, সৌদামিনী সহকৃত পবন-চালিত মেঘমালার ন্যায় বেগবান, সেই সকল সর্পদিগকে স্তব করি। ঐরাবতসম্ভূত অন্যান্য সুরূপ ও বহুরূপ বিচিত্র কুণ্ডলধারী সর্প, যাঁহারা প্রচণ্ড দিবাকরের ন্যায় অমরলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিরাজমান আছেন এবং ভাগীরথীর উত্তরতীরে যে সকল নাগের বাসস্থান আছে, সেই সকল সুমহৎ পন্নগদিগকে স্তব করি। ঐরাবত ব্যতিরেকে আর কে সূর্য্য-কিরণে বিচরণ করিতে পারে। যখন ধৃতরাষ্ট্র-সর্প গমন করেন, তৎকালে বিংশতি সহস্র, অষ্টশত, অশীতি সর্প তাঁহার অনুসরণ করেন। যাঁহারা ধৃতরাষ্ট্রের সমভিব্যাহারে গমন করেন ও যাঁহারা অতি দূরে বাস করেন সেই সমস্ত ঐরাবতের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদিগকে নমস্কার করি। পূর্ব্বে খাণ্ডব-প্রন্থে ও কুরুক্ষেত্রে যাঁহার বাসস্থান ছিল, কুণ্ডলের নিমিত্ত সেই নাগরাজ তক্ষককে স্তব করি। তক্ষক ও অশ্বসেন এই উভয়ে নিত্যকাল সহচর হইয়া স্রোতস্বতী ইক্ষুমতীতীরে সতত বাস করিতেন। মহাত্মা তক্ষকের কনিষ্ঠ পুত্র শ্রুতসেন যিনি সর্ব্বনাগের আধিপত্য লাভ করিবার প্রত্যাশায় কুরুক্ষেত্রে বাস করিয়া সূর্য্যোপাসনা করিয়াছিলেন, তাঁহাকেও প্রণাম করি।”
উতঙ্ক এইরূপে সর্পদিগকে স্তব করিয়াও যখন কুণ্ডলদ্বয় লাভ করিতে পারিলেন না, তখন অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন এবং দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, দুইটি স্ত্রীলোক সুচারু বাপদণ্ডযুক্ত তন্ত্রে' বস্ত্র বয়ন করিতেছে। সেই তন্ত্রের সূত্র সকল শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ এবং দেখিলেন, দ্বাদশ অর যুক্ত একখানি চক্র ছয়টী শিশুকর্তৃক পরিবর্তিত হইতেছে। আর একজন পুরুষ ও মনোহর একটী অশ্ব নিরীক্ষণ করিলেন। এইরূপ অবলোকন করিয়া তিনি তাঁহাদিগকেও স্তব করিতে লাগিলেন।
"সতত ভ্রাম্যমাণ চতুর্বিংশতি পৰ্ব্বযুক্ত এই চক্রে তিন শত, ষষ্টি তত্ত্ব সমর্পিত আছে। ইহাকে ছয়জন কুমারে পরিবর্তিত করিতেছে। বিশ্বরূপ দুই যুবতী শুক্ল ও কৃষ্ণ সূত্রদ্বারা এই তন্ত্রে বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, এই দুই যুবতী সমস্ত প্রাণী ও চতুৰ্দ্দশ ভুবন উৎপাদন করেন। নিখিলভুবনের রক্ষাকর্তা বৃত্রাসুর ও নমুচির হন্তা বজ্রধর ইন্দ্র যিনি সেই কৃষ্ণবর্ণ বসন-যুগল পরিধান করিয়া ত্রিলোকে সত্যমিথ্যা উভয়ই বিচার করেন, সেই ত্রিলোকনাথ পুরন্দরকে নমস্কার করি।”
অনন্তর সেই পুরুষ উতঙ্ককে কহিলেন, তোমার এইরূপ স্তবে আমি অতিশয় প্রীত হইলাম, এক্ষণে কি উপকার করিব বল। উতঙ্ক কহিলেন, ভগবন্। এই করুন, যেন সমস্ত নাগগণ আমার বশবর্তী হয়। তখন সেই পুরুষ কহিলেন, ভাল তুমি অশ্বের এই অপানদেশে ফুৎকার প্রদান কর। তদীয় বাক্যা-নুসারে উতঙ্ক অশ্বের অপানদেশে ফুৎকার প্রদান করিলে তাহার শরীর প্রধূমিত হইয়া উঠিল এবং ইন্দ্রিয়রন্ধ্র হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সকল নির্গত হইতে লাগিল। তদ্দ্বারা নাগলোক সাতিশয় সন্তপ্ত হইলে পর, তক্ষক অগ্ন্যুৎপাত ভয়ে ভীত ও ব্যাকুলিত হইয়া কুণ্ডলদ্বয়ের সহিত স্বীয় বাসভবন হইতে সহসা নিষ্ক্রান্ত হইলেন এবং উতঙ্ক সমীপে আসিয়া কহিলেন, আপনার এই কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণ করুন; উতঙ্ক কুণ্ডল লইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, অদ্য ব্রতোপলক্ষ্যে মহাসমারোহ হইবে, কিন্তু আমি অতি দূরে রহিলাম, অতএব এক্ষণে কিরূপে উপাধ্যায়ানীর মনোরথ সম্পূর্ণ হইবে? পরে সেই পুরুষ উতঙ্ককে চিন্তাকুল দেখিয়া কহিলেন, উতঙ্ক! তুমি আমার এই অশ্বে আরোহণ কর, অনতিবিলম্বেই গুরুকুলে উপস্থিত হইতে পারিবে। উতঙ্ক তাঁহার আদেশানুসারে অশ্বে অধিরূঢ় হইয়া ক্ষণকালমধ্যে গুরুগৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। তৎকালে তাঁহার উপাধ্যায়ানী স্নান পূজাদি সমাপনা-নন্তর কেশ-বিন্যাস করিতেছিলেন, তিনি উতঙ্কের বিলম্ব দেখিয়া অভিসম্পাত করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে উতঙ্ক গুরুগৃহে প্রবেশপূর্ব্বক উপাধ্যায়ানীকে অভিবাদন করিয়া কুণ্ডল দিলেন। তিনি তাহা গ্রহণ করিয়া কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! ভাল আছ ত, বৎস তুমি ভাল সময়ে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ। আমি এখনই অকারণে তোমাকে শাপ দিতাম, ভাগ্যে দিই নাই। এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করি, তুমি চিরকাল কুশলে থাক।
অনন্তর উতঙ্ক গুরুপত্নী-সন্নিধানে বিদায় গ্রহণ করিয়া উপাধ্যায়ের নিকট উপস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে প্রত্যাগত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস! ভাল আছ ত? এত বিলম্ব হইল কেন? উতঙ্ক প্রত্যুত্তর করিলেন, ভগবন্! নাগরাজ তক্ষক কুণ্ডলাহরণ বিষয়ে অতিশয় বিঘ্ন করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত আমি নাগলোকে গমন করিয়াছিলাম, তথায় দেখিলাম দুইটি স্ত্রীলোক কৃষ্ণ ও শুক্লবর্ণ সূত্র তন্ত্রে আরোপণ করিয়া বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, তাহা কি? ছয়টি কুমার দ্বাদশ অরসংযুক্ত একখানি চক্র নিয়ত পরিবর্ত্তিত করিতেছে তাহাই বা কি? এবং তথায় এক পুরুষ ও এক বৃহদাকার অশ্ব দেখিলাম তাহাই বা কি? আর পথিমধ্যে গমন করিতে করিতে এক বৃষ দেখিলাম, ঐ বৃষে এক পুরুষ আরোহণ করিয়া আছেন, তিনি আমাকে বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিতে অনুরোধ করিলেন এবং কহিলেন, পূর্ব্বে তোমার উপাধ্যায় এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছিলেন। পরে তাঁহার নির্দেশক্রমে আমি সেই বৃষের পুরীষ উপযোগ করিলাম, ঐ বৃষ ও বৃষারূঢ় পুরুষই বা কে? আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই সমস্ত বর্ণনা করুন, আমি শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি।
উতঙ্কের প্রার্থনায় উপাধ্যায় কহিলেন, বৎস! তুমি যে দুইটি স্ত্রীলোক দেখিয়াছ, তাঁহারা পরমাত্মা ও জীবাত্মা! দ্বাদশ অরসংযুক্ত যে চক্র দেখিয়াছ, উহারা সংবৎসর। শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ যে সকল তত্ত্ব দেখিয়াছিলে উহা দিবারাত্রি। ছয়টি কুমার ছয়টি ঋতু। যে পুরুষ দেখিয়াছ, তিনি পর্জন্য। আর অশ্বটি অগ্নি। | পথিমধ্যে যে বৃষভ অবলোকন করিয়াছিলে তিনি নাগরাজ ঐরাবত। আর ঐ অশ্বে যে পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনি দেবরাজ ইন্দ্র। যে পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছ তাহা অমৃত। বৎস! সেই অমৃত ভক্ষণ করিয়াছিলে বলিয়াই নাগলোকে পরিত্রাণ পাইয়াছ। ভগবান্ ইন্দ্র আমার সখা, তিনি কৃপারস-পরবশ হইয়া তোমাকে রক্ষা করিয়াছেন, নতুবা নাগলোক হইতে কুণ্ডল লইয়া আগমন করা দুষ্কর হইত। বৎস! এক্ষণে আমি তোমাকে অনুমতি করিতেছি, গৃহে গমন কর এবং তোমার শ্রেয়োলাভ হউক।
উতঙ্ক উপাধ্যায়ের অনুজ্ঞালাভানন্তর তক্ষকের প্রতি জাতক্রোধ হইয়া তাহার প্রতীকার সঙ্কল্পে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন এবং অনতিকাল বিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা জনমেজয়ের সহিত সমাগত হইলেন। তৎকালে মহারাজ জনমেজয় অমাত্যগণে পরিবৃত হইয়া বসিয়াছিলেন। উতঙ্ক অবসর বুঝিয়া রাজা জনমেজয়কে যথাবিধি আশীর্ব্বাদ বিধানপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! প্রকৃত কার্য্যে অনাস্থা করিয়া বালকের ন্যায় সামান্য কার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন।
জনমেজয় তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আমি সুতনির্বিশেষে প্রজাপালন করিয়া ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম প্রতিপালন করিতেছি, এক্ষণে আপনি কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছেন আজ্ঞা করুন। উতঙ্ক কহিলেন, মহারাজ! আমি যে কার্য্যের নিমিত্ত আগমন করিয়াছি, উহা আপনারই কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। দুরাত্মা তক্ষক আপনার পিতার প্রাণ হিংসা করিয়াছিল, এক্ষণে তাহার প্রতিবিধান করুন। ঐ অবশ্যকর্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠানকাল উপস্থিত হইয়াছে; অতএব হে মহারাজ! আপনার পিতৃবৈরী তক্ষককে সমুচিত প্রতিফল প্রদান করুন। সেই দুরাত্মা বিনাদোষে আপনার পিতাকে দংশন করিয়াছিল, তাহাতেই তিনি বজ্রাহত বৃক্ষের ন্যায় ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েন। বলদৃপ্ত পন্নগাধম তক্ষক বিনা অপরাধে আপনার পিতার প্রাণসংহার করিয়া কি দুষ্কর্ম করিয়াছে, একবার স্থিরচিত্তে ভাবিয়া দেখুন। কাশ্যপ বিষচিকিৎসাদ্বারা রাজর্ষি-বংশরক্ষক দেবতানুভব মহারাজ পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করিতে আসিতে-ছিলেন, পথিমধ্যে পাপাধম তক্ষক পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে নিবৃত্ত করে, অতএব মহারাজ! অবিলম্বে সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়া হইলে আপনার পিতার বৈরনির্য্যাতন এবং আমারও অভীষ্ট সাধন হইবে সন্দেহ নাই। মহারাজ। আমি গুরুদক্ষিণা আহরণ করিতে গিয়াছিলাম, ঐ পাপিষ্ঠ পথিমধ্যে আমার যথেষ্ট বিঘ্ন অনুষ্ঠান করিয়াছিল।
রাজা জনমেজয় তাহা শ্রবণ করিয়া তক্ষকের প্রতি অত্যন্ত কোপাবিষ্ট হইলেন। যেমন ঘৃত-সংযোগে অগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠে, উতঙ্কের বাক্যে রাজার রোষানলও সেইরূপ উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। তখন রাজা জনমেজয় অতিশয় দুঃখিত হইয়া উতঙ্ক সমক্ষে পিতার স্বর্গপ্রাপ্তির নিমিত্ত স্বীয় অমাত্যবর্গকে বারংবার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন এবং উতঙ্কমুখে পিতৃবধ-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অবধি শোকে ও দুঃখে নিতান্ত আক্রান্ত ও একান্ত অভিভূত হইলেন।
পৌলোম পর্ব্বাধ্যায়।
সৌতি কহিলেন, নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনকের দ্বাদশ-বর্ষব্যাপী যজ্ঞে যে সকল মহর্ষিগণ সমাগত হইয়াছিলেন, সুতবংশসম্ভূত লোমহর্ষণাত্মজ উগ্রশ্রবাঃ পুরাণ পাঠদ্বারা তাঁহা-দিগের শুশ্রূষা করিতেছিলেন। উগ্রশ্রবাঃ কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে নিবেদন করিলেন, হে মহর্ষিগণ। উতঙ্কচরিত আদ্যোপান্ত কহিলাম এক্ষণে আপনারা আর কি শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করেন আজ্ঞা করুন।
মুনিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণনন্দন! আমরা প্রসঙ্গক্রমে তোমাকে যখন যে কথা জিজ্ঞাসা করিব, তুমি সেই সমুদায় বর্ণনা করিও। কিন্তু কুলপতি শৌনক এক্ষণে অগ্নি-শরণে’ অবস্থিতি করিতেছেন, তিনি সুরাসুর, মনুষ্য, সর্প, গন্ধর্ব্বাদি-। ঘটিত বিচিত্র অলৌকিক বৃত্তান্ত জানেন; বিদ্বান, ধীমান, কর্মদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সত্যবাদী, শাস্তিগুণাবলম্বী, তপোনিরত, সেই মহর্ষি আমাদিগের সকলেরই মান্য, তাঁহার অপেক্ষা কর। তিনি পরমার্জিত আসনে অধ্যাসীন হইয়া যে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাহাই কহিবে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভাল, সেই মহর্ষি আসনে উপবিষ্ট হইয়া জিজ্ঞাসিলেই বিবিধ পবিত্র কথা বলিব। ক্ষণকাল পরে বিপ্রশ্রেষ্ঠ শৌনকধাবি দেবযজ্ঞ ও পিতৃতর্পণ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ বিবিপূর্ব্বক সমাপ্ত করিয়া যে স্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ সিদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সুখাসীন আছেন, সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পরে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া এই কথা প্রস্তাব করিলেন।
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন। তোমার পিতা মহর্ষি বেদব্যাসের নিকট সমস্ত পুরাণ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তুমিও কি সেই সমুদায় অধ্যয়ন করিয়াছ? তোমার পিতার মুখে শ্রবণ করিয়াছি, পুরাণে অলৌকিক কথাসকল ও আদিবংশ-বৃত্তান্ত সকল বর্ণিত আছে, তন্মধ্যে প্রথমতঃ ভৃগুবংশের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি, বর্ণনা কর।
মহর্ষি শৌনকের আজ্ঞালাভানন্তর সূতনন্দন উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দ্বিজাগ্রণী মহাত্মা বৈশম্পায়ন প্রভৃতি যাহা সম্যকরূপে অধ্যয়ন ও কীর্তন করিয়াছেন, আমার পিতা যাহা অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট আমি যাহা প্রযত্নপূর্ব্বক অধ্যয়ন করিয়াছি, সেই সমস্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
সুবিখ্যাত ভৃগুবংশ ইন্দ্রাদি দেবগণ ও অশেষ ঋষিগণের পূজনীয়। এই বংশ পুরাণে যেরূপ বর্ণিত আছে, তাহা আমি যথাবৎ বর্ণন করিতেছি। স্বয়ং ব্রহ্মা বরুণের যজ্ঞ করিতেছিলেন, আমরা শুনিয়াছি, সেই যজ্ঞাগ্নি হইতে মহর্ষি ভৃগু সমুত্থিত হয়েন। ভৃগুর পুত্র চ্যবন পিতার প্রিয়পাত্র ছিলেন; চ্যবনের পুত্র প্রমতি অতিশয় ধর্মপরায়ণ ছিলেন, ঘৃতাচীর গর্তে প্রমতির রুরুনামা এক পুত্র উৎপন্ন হয়, রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে আপনার প্রপিতামহ শুনক জন্ম গ্রহণ করেন। মহর্ষি শুনক বেদাধ্যয়ন-সম্পন্ন, তপোনিরত, যশস্বী, অশেষ শাস্ত্রজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞানী, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় ছিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন। যেরূপে সেই মহাত্মা ভৃগুনন্দন চ্যবন নামে বিখ্যাত হইলে, তাহা আমার নিকট সবিশেষ বর্ণন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাত্মা ভৃগুর পুলোমানাম্নী প্রিয়তমা ধৰ্ম্মপত্নী ছিলেন, তিনি ঐ মহর্ষির সহযোগে গৰ্ত্তিণী হয়েন। একদা ধাৰ্ম্মিকাগ্রগণ্য মহর্ষি ভৃগু স্নানার্থ গমন করিলে পুলোমা নামে এক রাক্ষস তাঁহার আশ্রমে উপস্থিত হইল। ঐ পাপাত্মা আশ্রমে প্রবেশ করিয়া ভৃগুগৃহিণীর মনোহারিণী মূর্তি দর্শনে কন্দর্প-শরে জর্জরিত ও মূর্ছিতপ্রায় হইল। সুচারুদর্শনা পুলোমা অনায়াসলভ্য বন্য ফলমূলাদি দ্বারা সেই অভ্যাগত রাক্ষসের অতিথি-সৎকার করিলেন। দুর্বৃত্ত রাক্ষস কুসুমশরের বিষম শরে নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত-চিত্ত হইয়া "এই বরবর্ণিনীকে হরণ করিব” এইরূপ সঙ্কল্প করিবামাত্র সাতিশয় হৃষ্টমনা হইল। পুলোমা রাক্ষস পূর্ব্বে ঐ সুচারুহাসিনী কন্যাকে ভার্য্যাত্বরূপে বরণ করিয়াছিল, কিন্তু কন্যার পিতা তাহাকে না দিয়া মহাত্মা ভৃগুকে বিধিপূর্ব্বক কন্যা সম্প্রদান করেন। সেই অন্যায় কার্য্যের অনুষ্ঠান তাহার মনে সর্ব্বদা জাগরূক ছিল, এক্ষণে সে অবসর পাইয়া হরণ করিতে অভিলাষ করিল।
রাক্ষস, পুলোমাহরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া অগ্নিশরণস্থ প্রজ্বলিত হুতাশন সমীপে গমনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিল, হে হুতাশন। তুমি সর্ব্ব দেবগণের মুখ্য। তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, সত্য করিয়া বল, এই সুন্দরী কাহার ভার্য্যা? আমি পূর্ব্বে এই কামিনীকে স্বীয় সহচারিণী করিব বলিয়া বরণ করিয়াছিলাম, কিন্তু ইহার পিতা আমাকে কন্যাদান না করিয়া ভৃগুকে সম্প্রদান করেন। অতএব যদি এই নির্জনবাসিনী বরবর্ণিনী ভৃগুর ভার্য্যা হয়, তবে বল আমি আশ্রম হইতে ইহাকে অপহরণ করিব। ভৃগু যে আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত সুরূপা রমণীর পাণিগ্রহণ করিয়াছে সেই ক্রোধাগ্নিতে আমার হৃদয় অদ্যাপি দগ্ধ হইতেছে। দুরাত্মা রাক্ষস ভৃগুপত্নী বিষয়ে এইরূপ সন্দিগ্ধচিত্ত হইয়া প্রজ্বলিত অগ্নিকে আমন্ত্রণ করিয়া পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসিতে লাগিল। পরে সম্বোধন করিয়া কহিল, হে হুতবহ! তুমি সর্ব্বদা সর্ব্বজীবের অন্তরে পাপ-পুণ্যের সাক্ষি-স্বরূপ অবস্থিতি কর, অতএব তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি, সত্য করিয়া বল, পাপিষ্ঠ ভৃগু আমার পূর্ব্বপ্রাথিত ভার্য্যাকে গ্রহণ করিয়াছে, সেই কামিনী আমার হইতে পারে কি না? তোমার নিকট ইহার যথার্থ শ্রবণ করিয়া তোমার সাক্ষাতেই এই ভৃগুপত্নীকে হরণ করিব, অগ্নি রাক্ষসের জিজ্ঞাসানন্তর এক পক্ষে মিথ্যাকথন ও পক্ষান্তরে ভৃগুশাপ এই উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়া অতিশয় ভীত হইলেন, এবং মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে দানবতনয়। পূর্ব্বে তুমি ইঁহাকে বরণ করিয়াছিলে যথার্থ বটে, কিন্তু তোমার যথাবিধি বিবাহ করা হয় নাই। এই নিমিত্ত যশস্বিনী পুলোমার পিতা সৎপাত্র-লাভে ইঁহাকে ভৃগুর হস্তে সমর্পণ করেন। মহাতপাঃ ভৃগু বেদবিধি-পূর্ব্বক আমার সমক্ষে ইঁহার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। তথাপি তুমি ইহাকে পূর্ব্বে বরণ করিয়াছিলে বলিয়া ইনি বিচারমতে তোমারই পত্নী হইতে পারেন। আমি মিথ্যা কহিতে পারি না, যেহেতু মিথ্যাবাদী সর্ব্বত্র অনাদরণীয় হয়।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দুরাত্মা রাক্ষস অগ্নির সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া, বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক ভৃগুজায়াকে অপহরণ করিয়া বায়ুবেগে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন পুলোমার গর্ভস্থ বালক রাক্ষসের এই গর্হিত অনুষ্ঠান অবলোকনে ক্রোধান্বিত হইয়া মাতৃগৰ্ত্ত হইতে নির্গত হইলেন। তাহাতেই তাঁহার নাম চ্যবন হইল। রাক্ষস, সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী সদ্যোজাত সেই শিশুকে অবলোকন করিবামাত্র পুলোমাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক ভস্মীভূত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। অনন্তর দুঃখাভিভূতা পুলোমা ভৃগুর ঔরসপত্র চ্যবনকে ক্রোরে লইয়া রোদন করিতে করিতে আশ্রমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মা সেই অনিন্দিতা ভৃগুপত্নীকে বাষ্পা-কুলিত-লোচনা দেখিয়া সমীপে গিয়া অশেষ প্রকার প্রবোধ বাক্যে তাঁহাকে সান্ত্বনা করিলেন। ভৃগুপত্নীর নয়ন-নিপতিত জলধারায় এক মহানদী প্রবাহিত হইল। পিতামহ ব্রহ্মা সেই নদীকে পুত্রবধূ পুলোমার অনুসরণ করিতে দেখিয়া তাহার নাম "বধূসরা” রাখিলেন।
পরে পুলোমা চ্যবনকে ক্রোড়ে লইয়া আসিতেছিলেন, ইত্যবসরে মহর্ষি ভৃগু স্নান-পূজাদি সমাপনানন্তর প্রত্যাগমন-পূর্ব্বক স্বীয় ধৰ্ম্মপত্নী ও পুত্রকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধান্ধ হইলেন এবং সহধর্মিণী পুলোমাকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মধুরহাসিনি। হরণেচ্ছু দুরাত্মা রাক্ষস তোমাকে আমার ভার্য্যা বলিয়া জানিত না, তুমি সত্য করিয়া বল, কে তাহার নিকট তোমার পরিচয় প্রদান করিল? আমি এক্ষণেই সেই পরিচয়-দাতাকে শাপ প্রদান করিব। কোন্ ব্যক্তির এই দুষ্ট কর্ম্মের অনুষ্ঠানে সাহস হইল? আমার শাপে ভীত না হয় এমন লোক কে? ভৃগুকর্তৃক এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পুলোমা কহিলেন, ভগবন্! অগ্নি সেই রাক্ষসের সমীপে আমার পরিচয় দেন, পরে সেই পাপাত্মা রাক্ষস আমাকে রোরুদ্যমানা কুররীর' ন্যায় অপহরণ করিল। তদনন্তর তোমার এই পুত্রের তেজঃপ্রভাবে সে ভস্মীভূত হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে, তাহাতেই আমি রক্ষা পাইলাম। ভৃগু পুলোমার এই বাক্য শ্রবণে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া "অদ্যাবধি তুমি সর্ব্বভক্ষ হইবে" বলিয়া অগ্নিকে শাপ প্রদান করিলেন।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভৃগু এইরূপ শাপ প্রদান করিলে অগ্নি সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আপনি কেন অকারণে আমাকে এই নিদারুণ অভিসম্পাত করিলেন? আমি তৎকর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া ধৰ্ম্ম প্রতিপালনার্থ সত্য কথা কহিয়াছি, ইহাতে আমার দোষ কি? যে ব্যক্তি জিজ্ঞাসিত হইয়া জানিয়া শুনিয়াও মিথ্যা বলে, সে আপনার ঊর্দ্ধতন সপ্তপুরুষ ও অধস্তন সপ্তপুরুষকে নরকে পাতিত করে। আর যে ব্যক্তি যথার্থ জানিয়াও না কহে, সেও সেই পাপে লিপ্ত হয়, ইহাতে সন্দেহ নাই। যাহা হউক, আমিও আপনাকে শাপ প্রদান করিতে পারি, কিন্তু আমি ব্রাহ্মণদিগকে মান্য করি, এই নিমিত্ত বিরত হইলাম। আপনি সর্ব্বজ্ঞ, তথাপি আপনাকে কিছু কহিতেছি শ্রবণ করুন। আমি যোগবলে আত্মাকে বহুধা বিভক্ত করিয়া শরীরভেদে অগ্নিহোত্র, গর্ভাধান ও জ্যোতিষ্টোমাদি ক্রিয়াকলাপে অধিষ্ঠিত আছি। বেদোক্তবিধিপূর্ব্বক আমাতে হুত যে হবিঃ, তদ্দ্বারা দেবগণ ও পিতৃগণ পরিতৃপ্ত হয়েন। হুয়মান সোমরসাদি সামগ্রীসকল দেবগণ ও পিতৃগণের শরীররূপে পরিণত হয়, দেবগণ ও পিতৃগণকে উদ্দেশ করিয়া একত্র দর্শ ও পৌর্ণমাস যজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়, অতএব দেবগণ ও পিতৃগণ অভিন্নস্বরূপ এবং প্রতিপর্ব্বে কখন একত্র কখন বা পৃথক্ পৃথক্ পূজিত হইয়া থাকেন। আমাতে যে আহুতি সকল প্রদত্ত হয়, সেই সকল আহুতি দেবগণ ও পিতৃগণ ভক্ষণ করেন। তন্নিমিত্ত আমি দেবগণ ও পিতৃগণের মুখস্বরূপ। অমাবস্যাতে পিতৃগণকে ও পূর্ণিমাতে দেবগণকে উদ্দেশ করিয়া আমাতে যে আহুতি প্রদত্ত হয়, তাঁহারাও আমারই মুখদ্বারা তাহা ভক্ষণ করেন, অতএব আমি কি প্রকারে সর্ব্বভক্ষ হইব?
পরে অগ্নি ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বিপ্রগণের অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞক্রিয়া হইতে আপনাকে তিরোহিত করিলেন। তাঁহার অন্তর্দ্ধানানন্তর প্রজাগণ ওঙ্কার, বর্ষস্কার ও স্বধা, স্বাহা বিবর্জিত হইয়া দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইল। ঋষিগণ তদ্দর্শনে উদ্বিগ্নমনে দেবগণ-সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, হে দেবগণ! অগ্নির অন্তর্দ্ধানপ্রযুক্ত ক্রিয়ালোপ হওয়াতে ত্রিলোকী ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইয়াছে, অতএব এ বিষয়ে যাহা কর্তব্য হয়, শীঘ্র বিধান করুন, আর কালাতিপাত করিবেন না।
অনন্তর ঋষিগণ ও দেবগণ ব্রহ্মার নিকট গমন করিয়া অগ্নির শাপ ও তন্নিবন্ধন ক্রিয়ালোপের বৃত্তান্ত নিবেদন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! মহর্ষি ভৃগু কোন কারণবশতঃ "অগ্নিকে সর্ব্বভক্ষ হও” বলিয়া শাপ দিয়াছেন কিন্তু অগ্নি দেবগণের মুখ ও যজ্ঞের অগ্রভাগভোক্তা হইয়া কিরূপে সর্ব্বভক্ষ হইবেন? বিধাতা তাঁহাদিগের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া অগ্নিকে আহ্বান করিলেন এবং মধুর বাক্যে সান্ত্বনা করিয়া কহিতে লাগিলেন, বৎস! তুমি সর্ব্বলোকের কর্তা ও সংহর্তা এবং অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়াকলাপের প্রবর্ত্তয়িতা, তুমিই এই ত্রিলোকী ধারণ করিতেছ; অতএব হে ত্রিলোকেশ হুতবহ! এক্ষণে যাহাতে ক্রিয়াকলাপের উচ্ছেদ না হয়, তাহা কর। তুমি সর্ব্বলোকের ঈশ্বর হইয়া এরূপ বিমূঢ়প্রায় হইতেছ কেন? তুমি সর্ব্বলোকে সর্ব্বদা পবিত্র এবং সর্ব্বজীবের গতিস্বরূপ; অতএব আমি বলিতেছি তুমি সর্ব্ব-শরীরে সর্ব্বভক্ষ হইবে না। অপানদেশে তোমার যে সকল শিখা আছে, তাহারাই সকল বস্তু ভক্ষণ করিবে এবং তোমার মাংসভক্ষিকা যে তনু আছে সেই সৰ্ব্বভক্ষ হইবে। যেমন রবিকিরণসংস্পর্শে সকল বস্তু শুচি হয়, সেইরূপ তোমার শিখাদ্বারা দগ্ধ হইয়া সকল বস্তু শুচি হইবে। হে হুতাশন। তুমি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তেজঃ পদার্থ, তুমি আপনার প্রভাবে আপনি বিনির্গত হইয়াছ, এক্ষণেও স্বকীয় তেজঃপ্রভাবে ঋষির শাপ সত্য কর এবং তোমার মুখে হুত দেবভাগ ও আত্মভাগ গ্রহণ কর।
অগ্নি সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া "যে আজ্ঞা” বলিয়া তদীয় আজ্ঞা পালনার্থে গমন করিলেন।
দেবগণ ও ঋষিগণ আহ্লাদিত হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। মহর্ষিগণ পূর্ব্বের ন্যায় যাগ যজ্ঞাদি ক্রিয়াসকল সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। স্বর্গে দেবগণ ও ধরাতলে নরগণ অত্যন্ত হৃষ্টচিত্ত হইলেন। অগ্নিও শাপবিনির্মুক্ত হইয়া সাতিশয় প্রীতি লাভ করিলেন। পূর্ব্বকালে ভগবান্ অগ্নি মহর্ষি ভৃগু হইতে এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়াছিলেন। অগ্নির শাপ, পুলোমারাক্ষসের নিধন ও চ্যবনের জন্ম-বৃত্তান্ত ঘটিত প্রাচীন ইতিহাস এই।
সূত কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! ভৃগুনন্দন চ্যবন সুকন্যার গর্তে পরম তেজস্বী প্রমতি নামে এক পুত্র উৎপাদন করেন। ঘৃতাচীর গর্তে প্রমতির রুরুনামা এক সন্তান হয়। রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্বে শুনক নামে তনয় জন্মে। সেই মহাতেজা রুরুর সমস্ত বৃত্তান্ত সবিস্তার বর্ণনা করিতেছি শ্রবণ করুন।
পূর্ব্বকালে সর্ব্বভূতহিতৈষী, সর্ব্ববিদ্যা-বিশারদ, তপো-নিরত স্থূলকেশ নামে এক মহর্ষি ছিলেন। ঐ সময়ে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর সংযোগে অপ্সরা মেনকা গর্ভবতী হইয়াছিল। অকরুণা মেনকা প্রসবকাল উপস্থিত দেখিয়া মহর্ষি স্থূলকেশের আশ্রমে গমন এবং তথায় গর্ব-বিমোচন করিয়া নদীতীরে পলায়ন করিল। সেই গর্ন্তে এক পরমা সুন্দরী কুমারী জন্মিয়াছিল। তপোধনাগ্রণী স্থূলকেশ কিয়ংক্ষণ পরে আশ্রমে উপস্থিত হইয়া, সেই সুরকন্যাতুল্য সদ্যঃ-প্রসূত কন্যাকে অসহায়িনী নির্জনে পতিতা দেখিয়া, কারুণ্য-রসে আর্দ্রচিত্ত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে গ্রহণ করিয়া ঔরসকন্যা-নির্বিশেষে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনি স্বয়ং তাহার জাতকৰ্ম্মাদি সমস্ত কৰ্ম্ম বিধিপূর্ব্বক নির্ব্বাহ করিলেন। কন্যা সেই আশ্রমে শশিকলার ন্যায় দিনে দিনে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। মহর্ষি স্থূলকেশ সেই কন্যাকে কি রূপে, কি গুণে, কি শীলে, সর্ব্বপ্রকারেই সমস্ত প্রমদাগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দেখিয়া তাহার নাম প্রমদ্বরা রাখিলেন।
একদা প্রমতিনন্দন রুরু স্কুলকেশের আশ্রমে সেই প্রমদ্বরাকে নিরীক্ষণ করিয়া অত্যন্ত কামাতুর হইলেন। পরে আপন বয়স্যগণদ্বারা পিতার নিকট স্বীয় অভিলাষ জানাইলেন। প্রমতি তদনুসারে মহর্ষি স্কুলকেশের নিকট গিয়া আপন পুত্রের নিমিত্ত সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। মহর্ষি স্থূলকেশ ফল্গুনী-নক্ষত্রযুক্ত দিবসে বিবাহের দিন নির্দ্ধারিত করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা সম্প্রদান করিলেন।
একদা বরবর্ণিনী প্রমদ্বরা আপন সহচরিগণ সমভি-ব্যাহারে ক্রীড়া কৌতুক করিতে করিতে দৈবগত্যা প্রসুপ্ত ও কেলিভূমিতে পতিত এক কৃষ্ণসর্পকে পদাহত করিল। সর্প ক্রুদ্ধ হইয়া দশনপংক্তিদ্বারা তৎক্ষণাৎ তাহাকে দংশন করাতে সে বিবর্ণা, বিচেতনা ও ভ্রষ্টাভরণা হইয়া ছিন্নমূল কদলীর ন্যায় ভূতলে পড়িল। তদীয় সখিগণ তাহাকে মুক্তকেশা, ভ্রষ্টবেশা ও ভূপৃষ্ঠে পতিতা দেখিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু প্রমদ্বরা ভুজঙ্গমবিষে অভিভূতা ও বিবর্ণা হইয়াও পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয় হইয়া উঠিল। ফলতঃ তখন তাহাকে বোধ হইতে লাগিল যেন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে।
তদীয় পিতা মহর্ষি স্কুলকেশ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ প্রমদ্বরাকে বিগতাসু ভূতলে পতিত দেখিলেন। তদনন্তর স্বস্ত্যাত্রেয়, মহাজানু, কুশিক, সঙ্গমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভারদ্বাজ, কৌণকুৎস, আষ্টিষেণ, গৌতম, প্রমতি, রুরু ও অন্যান্য তপোবনবাসী তপোধনগণ কারুণ্য-রস-পরবশ হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে সেই পরমাসুন্দরী কন্যাকে আশীবিষ'-বিষাদৃত, মৃত ও ভূতলে পতিত দেখিয়া সকলেই রোদন করিতে লাগিলেন। রুরু প্রিয়তমাকে তদবস্থ দেখিয়া নিতান্ত উদ্ভ্রান্ত ও একান্ত কাতর হইয়া তথা হইতে বহির্গমন করিলেন।
সৌতি কহিলেন, সেই সকল মহাত্মা দ্বিজগণ তথায় উপবিষ্ট হইলে রুরু সাতিশয় দুঃখিত হইয়া অরণ্যানী প্রবেশ-পূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন এবং শোকে একান্ত ব্যাকুল হইয়া স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে স্মরণ করিয়া করুণস্বরে এইরূপে বিলাপ করিতে লাগিলেন। "আমার ইহা অপেক্ষা আর দুঃখের বিষয় কি হইতে পারে যে, আমার ও বন্ধুবর্গের শোকবর্দ্ধিনী সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী রমণী ধরাতলে পড়িয়া আছে। আমি যদি দান, তপশ্চরণ ও গুরুজনের শুশ্রূষা করিয়া থাকি, তবে আমার প্রিয়া পুনঃসঞ্জীবিতা হউক। আমি জন্মাবধি আত্মসংযম ও ব্রতানুষ্ঠান করিয়া যে সকল পুণ্যসঞ্চয় করিয়াছি, এক্ষণে আমার প্রাণপ্রিয়া প্রমদ্বরা সেই পুণ্যবলে ভূমিশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুন।"
রুরু স্বীয় প্রিয়তমা প্রমদ্বরাকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, ইত্যবসরে দেবদূত তৎসন্নিধানে আসিয়া কহিলেন, রুরু! তুমি দুঃখার্ত্ত হইয়া যেরূপ প্রার্থনা করিতেছ, উহা নিতান্ত অসম্ভব; যেহেতু মনুষ্য একবার কালগ্রাসে পতিত হইলে আর কদাচ পুনর্জীবিত হয় না। এই প্রমদ্বরা গন্ধর্ব্বের ঔরসে অপ্সরাগর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এক্ষণে আয়ুশেষ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। অতএব হে বৎস! তুমি আর শোক-সাগরে নিমগ্ন হইও না। পূর্ব্বে দেবগণ এই বিষয়ে একটি উপায় নির্দেশ করিয়াছেন, যদি তাহা করিতে পার তবে পুনর্ব্বার প্রমদ্বরাকে লাভ করিতে পারিবে। রুরু কহিলেন, হে দেবদূত। দেবগণ এই বিষয়ে কি উপায় স্থির করিয়াছেন যথার্থ করিয়া বল, আমি এই দণ্ডেই তদনুযায়ী কৰ্ম্ম করিব। দেবদূত কহিলেন, হে ভৃগুনন্দন! তুমি স্বীয় ভার্য্যাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনর্জীবিতা হইবে। রুরু কহিলেন, আচ্ছা আমি প্রমদ্বরাকে আপনার পরমায়ুর অর্দ্ধভাগ প্রদান করিলাম, সে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করুক। তখন গন্ধর্ব্বরাজ ও দেবদূত উভয়ে যমসমীপে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, ধর্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুর মৃতভার্য্যা প্রমদ্বরা স্বীয় ভর্তার অর্দ্ধায়ুঃ লইয়া পুনর্জীবিতা হয়। ধর্মরাজ কহিলেন, হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে রুরুপত্নী রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ুঃ পাইয়া পুনর্জীবিতা হউক।
ধর্মরাজ এই কথা কহিবামাত্র প্রমদ্বরা রুরুর অর্দ্ধ পরমায়ুঃ প্রাপ্ত হইল এবং তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতার ন্যায় ধরাতল হইতে গাত্রোত্থান করিল। এইরূপে প্রমদ্বরা পুনর্জীবিতা হইলে, রুরুর পিতা এবং প্রমদ্বরার পিতা উভয়ে আনন্দসাগরে মগ্ন হইয়া শুভলগ্নে পুত্র কন্যার বিবাহবিধি নির্ব্বাহ করিলেন। তাঁহারাও পরস্পরের হিতসাধনে তৎপর হইয়া পরমানন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। রুরু এইরূপে কমল-সমপ্রভা সুদুর্লভা প্রিয়তমাকে পুনর্লাভ করিয়া সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। সর্প অবলোকন করিবামাত্র তিনি ক্রোধে কম্পান্বিত-কলেবর হইয়া শস্ত্রাঘাতে তাহাকে বিনাশ করিতেন।
একদা তিনি এক নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, এক অতি জীর্ণ-কলেবর ডুণ্ডুভ সর্প শয়ন করিয়া রহিয়াছে। রুরু তাহাকে দেখিবামাত্র ক্রোধান্ধ হইয়া যমদণ্ডের ন্যায় নিজ দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহার নিধনসাধনে উদ্যত হইলেন। ডুণ্ডুভ তাঁহাকে জিঘাংসু দেখিয়া কহিল, হে তপোধন! আমি ত তোমার কোন অপরাধ করি নাই, তবে কেন অকারণে রোষ-পরবশ হইয়া আমার প্রাণবধে উদ্যত হইতেছ?
রুরু কহিলেন, হে ভুজঙ্গম! এক দুষ্ট সর্প আমার প্রাণতুল্যা প্রেয়সীকে দংশন করিয়াছিল, সেই অবধি আমি এই অনুল্লঙ্ঘনীয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, সর্প দেখিতে পাইলেই তাহার প্রাণ সংহার করিব। অতএব আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অদ্য আমার হস্তে তোমার প্রাণসংহার হইবে। ডুণ্ডুভ কহিল, হে ব্রহ্মন্! যে সকল সর্পেরা মনুষ্যদিগকে দংশন করে, তাহারা স্বতন্ত্র জাতি; ডুণ্ডুভেরা সেরূপ নহে। ইহারা কখন কাহারও হিংসা করে না; অতএব হে মহর্ষে। কেবল সর্পনামের গন্ধমাত্র পাইয়া নিরপরাধ ডুণ্ডুভগণকে বধ করা তোমার সমুচিত কৰ্ম্ম হয় না। ডুণ্ডুভদিগের সুখভোগাভিলাষ অন্যান্য ভুজঙ্গের সদৃশ নহে, কিন্তু ইহারা অনর্থ ঘটনার সময় তাহাদের সমভাগী, অতএব তুমি ধার্মিক হইয়া এবস্তৃত হতভাগ্য নিরপরাধ ডুণ্ডুভদিগকে বধ করিও না।
রুরু ভয়ার্ত্ত ডুন্ডুভের এই কাতরোক্তি শ্রবণে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হইয়া তাহার প্রাণসংহারে পরাম্মুখ হইলেন এবং শান্ত-বাক্যে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ভুজঙ্গম। তুমি কে, কি কারণেই বা সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, আমাকে বল। সর্প কহিল, আমি পূর্ব্বে সহস্রপাদনামা মুনি ছিলাম। পরে ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া ভুজঙ্গকলেবর ধারণ করিয়াছি। ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, হে ভুজঙ্গোত্তম! ব্রাহ্মণ কি নিমিত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছিলেন, আর কত কালই বা তোমাকে এই শরীরে থাকিতে হইবে, সবিস্তর শুনিতে ইচ্ছা করি।
ডুণ্ডুভ কহিল, সত্যবাদী ও তপোবীর্য্য-সম্পন্ন খগম নামে এক ব্রাহ্মণ আমার বাল্যকালের সখা ছিলেন। একদা তিনি অগ্নিহোত্র কার্য্যানুষ্ঠানে অত্যন্ত আসক্ত আছেন, এমত সময়ে আমি বাল-স্বভাবসুলভ কৌতুকের পরতন্ত্র হইয়া তৃণনিৰ্ম্মিত ভুজঙ্গমদ্বারা তাঁহাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিয়াছিলাম। তদ্দর্শনে তিনি মূর্ছিত হইয়া মেদিনীপৃষ্ঠে পতিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে চৈতন্যপ্রাপ্ত হইলে ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া আমাকে কহিলেন, তুমি আমাকে ভয় প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত, যাদৃশ বীর্য্যহীন সর্প নির্মাণ করিয়াছ, আমি তোমাকে শাপ দিতেছি, তুমি সেইরূপ নির্ব্বীর্য্য সর্প হও। আমি তদীয় তপঃপ্রভাব অবগত ছিলাম; অতএব অত্যন্ত উদ্বিগ্নচিত্তে তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলাম, "ভ্রাতঃ। আমি সখা বলিয়া পরিহাসার্থ তোমার প্রতি এই কুকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি। অতএব এক্ষণে ক্ষমা প্রদর্শন পুরঃসর আমাকে শাপ হইতে বিমুক্ত কর।”
খগম আমাকে এইরূপ ব্যাকুলিত দেখিয়া 'বারংবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব এক্ষণে যাহা কহিতেছি তাহা সাবধানে শুনিয়া সর্ব্বকাল মনে করিয়া রাখিবে। মহাত্মা প্রমতির রুরু নামে এক পরম পবিত্র পুত্র জন্মিবে, তাঁহাকে দর্শন করিলেই তোমার শাপবিমোচন হইবে। আপনি সেই প্রমতি-পুত্র রুরু, আজি আমি আপনার সন্দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে আমি স্বীয় পূর্ব্বরূপ লাভ করিয়া আপনাকে কিছু হিতোপদেশ দিতেছি, শুনুন।
শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ এই বলিয়া সর্প-কলেবর পরিত্যাগ-পূর্ব্বক নিজ ভাস্বরমূর্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, হে মহাত্মন্ রুরো! অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম, এই নিমিত্ত ব্রাহ্মণদিগের কখন কোন জীবহিংসা করা উচিত নহে। বেদে এইরূপ কথিত আছে যে, ব্রাহ্মণেরা সর্ব্বদা শান্তমূর্তি, বেদ-বেদাঙ্গবেত্তা ও সর্ব্বজীবের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যবাক্য, ক্ষমা ও বেদবাক্য ধারণ এইগুলি ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম। দণ্ডধারণ, উগ্রত্ব ও প্রজাপালন এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের পরম ধৰ্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষত্রিয়ধর্ম অবলম্বন করা অনুচিত। দেখুন, পূর্ব্বকালে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। কিন্তু তপোবল-সম্পন্ন, বেদবেদাঙ্গপারগ, ব্রাহ্মণাগ্রগণ্য আস্তীক মহাশয় ভয়ার্ত্ত সর্পগণকে পরিত্রাণ করেন।
রুরু কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! ভূপতি জনমেজয় কি - নিমিত্ত সর্পকুল ধ্বংস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, আর কি জন্যই বা ধীমান্ আস্তীক মুনি তাহাদিগকে রক্ষা করিলেন, আমি সবিশেষ শুনিতে ইচ্ছা করি। "আপনি ব্রাহ্মণদিগের মুখে আস্তীক-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিবেন" এই বলিয়া মহর্ষি সহস্রপাদ অন্তর্হিত হইলেন। রুরু তিরোহিত ঋষিকে অন্বেষণ করিয়া সমস্ত বন ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত মোহ-পরতন্ত্র হইয়া অচেতন-প্রায় ধরাতলে পড়িলেন। অনন্তর চৈতন্য লাভ করিয়া সহস্রপাদের উপদেশবাক্য পুনঃপুনঃ স্মরণ করিতে করিতে স্বকীয় আশ্রমে প্রত্যাগমন করিলেন এবং স্বীয় জনক-সন্নিধানে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করাতে, তিনি তাঁহাকে আস্তীকাখ্যান সবিস্তার শ্রবণ করাইলেন।
